দেশে হাম আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ৬০ শিশুর যে তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাওয়া গেছে, সেখানে নয় মাসের কম বয়সি রয়েছে ২৯ জন।
বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি-ইপিআই যে সময়সূচি ধরে শিশুদের টিকা দেয়, সে অনুযায়ী নয় মাস পূর্ণ হওয়ার আগে এই শিশুদের হাম-রুবেলা বা এমআর টিকা পাওয়ার কথা নয়।
তাহলে নয় মাস পূর্ণ হওয়ার আগে শিশুরা হাম থেকে কীভাবে সুরক্ষিত থাকে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি শিশুদের ছয় মাস পর্যন্ত সুরক্ষা দেওয়ার কথা।
তাহলে কেন চলতি বছর নয় মাসের কম বয়সি এত শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে এবং মারা যাচ্ছে? এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে নানা আলোচনা চলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা পাওয়ার আগে শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম একটি কারণ তাদের শরীরে হামের অ্যান্টিবডি তৈরি না হওয়া। এর পেছনে অপুষ্টিসহ আরো কারণ থাকতে পারে, তা নিয়ে গবেষণা হওয়া প্রয়োজন।
সরকারি হিসাবে সারাদেশে ১৫ মার্চ থেকে বুধবার পর্যন্ত ৪৮১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে হাম আক্রান্ত হয়ে এবং এ রোগের উপসর্গ নিয়ে। এর মধ্যে হাম আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৮০ শিশু।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য কী বলছে?
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৬০ শিশু মৃত্যুর বিস্তারিত তথ্য বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে ছেলে ৩১ ও মেয়ে ২৯টি; ঢাকায় মারা গেছে ৪৮টি শিশু, বাকি ১২টি শিশু ঢাকার বাইরে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিন মাস বয়সি চারজন, চারমাস বয়সি পাঁচজন, পাঁচ মাস বয়সি দুইজন, ছয়মাস বয়সি চারজন, সাত মাসের সাতজন, আট মাসের সাতজন রয়েছে মৃতদের এ তালিকায়।
নয় মাস বয়সী তিনজন, ১০ মাস বয়সী আটজন এবং ১১ মাস বয়সী চারজন শিশু মারা গেছে।
১২ মাস বয়সী দুইজন, ১৩ মাস বয়সী দুইজন, ১৫ মাস বয়সী দুইজন এবং ১৬ মাস বয়সী একজন শিশু মারা গেছে।
দুই বছর বা ২৪ মাস বয়সী একজন, ২৭ মাস বয়সী দুইজন, ৩০ মাস বয়সী একজন, তিন বছর বা ৩৬ মাস বয়সী দুইজন, ৪২ মাস বয়সী একজন, ৫১ মাস বয়সী একজন এবং নয় বছর বা ১০৮ মাস বয়সী একজন শিশুর মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
এই বিশ্লেষণ বলছে, নয় মাস থেকে ১৫ মাস বয়সী শিশু মারা গেছে ২১ জন। আর নয় মাসের কম বয়সী ২৯ শিশু মারা গেছে।
ইপিআইয়ের টিকাদানের সময়সূচি অনুযায়ী ছয় মাস থেকে আট মাস বয়সী ১৮ শিশু হামের টিকার প্রথম ডোজ পাওয়ার কথা। আর নয় থেকে ১৫ মাস বয়সী ২১ শিশুই দুই ডোজ টিকাই পাওয়ার কথা।
তাহলে কী এই শিশুরা টিকার কোনো ডোজ পায়নি অথবা পূর্ণ ডোজ টিকা পায়নি?
বিগত সরকারগুলোর সময়ে কয়েক বছর ধরে টিকাদান কার্যক্রমে ছেদ পড়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। ২০২০ সালে কভিড মহামারী ও ২০২৪ সালে টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার কথা আলোচনায় আসছে।
টিকা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, টিকার কার্যকারিতা নির্ভর করে মূলত বয়স এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর। হামের টিকা ছয় থেকে নয় মাস বয়সীদের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ কাজ করে। নয় থেকে ১২ মাস বয়সীদের ক্ষেত্রে ৮৫ শতাংশ কাজ করে। আর ১২ থেকে ১৫ মাস বয়সী শিশুদের ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত কাজ করে।
তবে দুই ডোজ নেওয়ার পরও কারো হাম হতে পারে। সেটি নির্ভর করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর,” বলেন এই বিশেষজ্ঞ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মৃত্যুর যে তথ্য দিয়েছে, সেখানে তারিখ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভর্তির দিনই পাঁচটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ভর্তির এক দিনের মধ্যে মারা গেছে নয় শিশু। ভর্তির দুই দিনের মধ্যে মারা গেছে নয় শিশু। দেখা যাচ্ছে, ভর্তির পর প্রথম ৪৮ ঘণ্টায় ২৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
তবে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার কত দিন পর শিশুরা মারা যাচ্ছে, তা সব শিশুর মৃত্যুর ক্ষেত্রে বলেনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
মৃত শিশুদের তালিকায়, বরিশালে শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং পদ্মা জেনারেল হাসপাতালে মারা যাওয়া পাঁচজনের মৃত্যু তারিখ রয়েছে। তবে তারা কবে ওই হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়েছিল, সেই তারিখ নেই।
এ ছাড়া শিশুদের টিকার তথ্য, হাসপাতালের আইসিইউ তথ্য বা অন্য কোনো জটিলতা ছিল কিনা, এ ধরনের তথ্যও নেই সেখানে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “রোগীদের মৃত্যু যাচাই খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটির জন্য রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি, শারীরিক অবস্থাসহ অনেক বিষয়ে তথ্য সংরক্ষণে রাখতে হয়। কারণ এর আলোকে জটিল রোগীদের জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, “মৃত্যু পর্যালোচনা করা খুব সহজ বিষয় নয়। তবে আমরা বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ করে রাখছি। এ বিষয়ে আমাদের পরামর্শক সংস্থা নাইট্যাগ বা অন্যরা কোনো কিছু জানায়নি।
তাই এ বিষয়ে অধিদপ্তর বিশেষভাবে কোনো কাজ করছে না। তবে আইসিডিডিআর,বি হাম নিয়ে কাজ করছে।
এবার কেন হামে এত শিশুর মৃত্যু হল, মিউটেশনের মাধ্যমে ভাইরাসের কোনো নতুন ধরন তৈরি হল কিনা, সেসব বিষয়ে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ-আইসিডিডিআর,বি বিস্তারিত কাজ করছে।
আলোচনায় ‘অ্যান্টিবডি’
অ্যান্টিবডি হলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার মূল উপাদান। গর্ভাবস্থায় মায়ের কাছে থেকে অ্যান্টিবডি পায় শিশুরা। আর জন্মের পর পর তাদের শরীরে নিজস্ব অ্যান্টিবডি তৈরি হতে থাকে।
রাজধানীর মহাখালী ডিএনসিসি হাম ডেডিকেটেড হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার আসিফ হায়দার বলেন, মায়ের শরীর থেকে মূলত বাচ্চারা অ্যান্টিবডি পায়। কিন্তু বর্তমানে অনেক মায়েরাই অপুষ্টিতে ভুগছেন, আবার নানা কারণে শিশুরাও অপুষ্ট হচ্ছে। এতে করে হামের প্রকোপ বাড়ছে। তাই মা ও শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করা সবার আগে জরুরি।
ডা. আসিফ বলেন, আগে আমরা এক ধরনের শক্তিশালী, ৯৫ শতাংশ মানুষের ‘হার্ড ইমিউনিটির’ বলয়ে ছিলাম। সেটি ভেঙে যাওয়ার ফলে এবার বড় প্রকোপ দেখা দিয়েছে।
ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কমিটি ফর মিজেলস অ্যান্ড রুবেলা এলিমিনেশন-এনভিসি চেয়ারপারসন অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, “মায়ের শরীরে যদি হামের অ্যান্টিবডি না থাকে বা টিকা নেওয়া না থাকে তাহলে শিশুরা অ্যান্টিবডি পাবে না। এ ছাড়া আরো কিছু কারণে অ্যান্টিবডি তৈরি নাও হতে পারে। এসব বিষয়ে নিয়ে আমাদের দেশের সেভাবে ‘স্টাডি’ নেই।
তাই এসব বিষয়ে জানা-শোনা এবং গবেষণা হওয়া প্রয়োজন তারপর বোঝা যাবে আসলে কোন ‘ফ্যাক্টরের’ জন্য হামের এই পরিস্থিতি।
হাম ভাইরাসের কোনো মিউটেশন হয়েছে কিনা জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বেনজির আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এখন পর্যন্ত হামের কোনো মিউটেশনের খবর পাওয়া যায়নি।
তিনি বলছেন, শিশুরা মায়ের কাছ থেকে সঠিক ‘অ্যান্টিবডি’ পাচ্ছে কি না সেটা দেখা প্রয়োজন।
ডা. বেনজিরের মতে, বর্তমানে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তানের জন্ম দেওয়া মায়ের যে শাল দুধ বাচ্চাকে খাওয়াতে হয়, এটি আর সম্ভব হয় না। এমন কিছু কারণে বাচ্চাদের ইমিউনিটি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হচ্ছে।
টিকা ও পুষ্টি ঘাটতি
ইপিআইয়ের মাধ্যমে দেশের নয় মাস বয়সী শিশুদের হামের টিকার প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাকে কার্যকর করতে হলে ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা দরকার।
কিন্তু করোনার কারণে ২০২০ সালে টিকাদান কর্মসূচি সেভাবে হয়নি। পরবর্তীতে ২০২৪ সালে আরেকবার এ কর্মসূচি হয়নি।
সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেছে, গেল বছর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও হামের টিকাদান কার্যক্রম বন্ধ ছিল। হয়নি ভিটামিন ‘এ’ কর্মসূচি।
গেল ১১ মে ইউনিসেফ ও প্রথম আলো আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে ইউনিসেফের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপক রিয়াদ মাহমুদ তার উপস্থাপনায় বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৮৫ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী। আরও উদ্বেগজনক তথ্য হল, আক্রান্ত শিশুদের ৬৫ শতাংশ কোনো টিকাই পায়নি, আর ২১ শতাংশ আংশিক টিকাপ্রাপ্ত।
এভাবে টিকা থেকে বাদ পড়া শিশুর সংখ্যা কয়েক বছর ধরে বেড়েছে। যার ফলে এবারের হামে এত মৃত্যু হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জাতীয় পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ২০২৫ সালে একাধিকবার বার ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা থাকলেও সেটি হয়নি। তাই শিশুদের পুষ্টির ঘাটতিও হয়েছে।

টিকাদানের সময়সূচি
ইপিআই অনুযায়ী, রোগ প্রতিরোধের জন্য জন্মের পর থেকে ১৫ মাস বয়সের মধ্যে শিশুকে মোট ১০টি টিকা দেওয়া হয়। এসব টিকা হল-
• জন্মের পরপরই যক্ষ্মা প্রতিরোধে বিসিজি টিকা দেওয়া হয়।
• ৬, ১০ ও ১৪ সপ্তাহ বয়সে পেন্টাভ্যালেন্ট টিকা (ডিপথেরিয়া, ধনুষ্টঙ্কার, হুপিং কাশি, হেপাটাইটিস বি, হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জি) এবং ওপিভি (পোলিও) ও পিসিভি (নিউমোনিয়া) টিাকা দেওয়া হয়।
• ৬ ও ১৪ সপ্তাহ বয়সে ‘ইনজেকটেবল’ পোলিও (এফআইপিভি) দেওয়া হয়।
• ৯ ও ১৫ মাস বয়সে হাম ও রুবেলা প্রতিরোধে দুই ডোজ এমআর টিকা দেওয়া হয়।
• টাইফয়েড জ্বর প্রতিরোধের জন্য ১৫ মাস বয়সে এক ডোজ টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন (টিসিভি) দেওয়া হয়।
এছাড়া জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধে কিশোরীদের হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি) টিকা দেওয়া হয়। মূলত পঞ্চম থেকে নবম শ্রেণির ছাত্রী বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে থাকা ১০–১৪ বছর বয়সীদের দেওয়া হয় এ টিকা।
আর প্রজননযোগ্য বয়সী নারীদের (১৫–৪৯ বছর) ধনুষ্টঙ্কার বা টিটেনাস থেকে সুরক্ষার জন্য ৫ ডোজ টিকা দেওয়া হয়। এটি মা ও ভবিষ্যৎ সন্তানের দু’জনকেই প্রাণঘাতী ধনুষ্টঙ্কার থেকে রক্ষা করে।
ইপিআইয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুসারে নাইট্যাগ শিশুদের টিকাদানের বয়স নির্ধারণ করে দেয়।
হামের টিকা ছয় মাস বয়সে
দেশে শিশুদের হামের টিকা দেওয়া হয় নয় মাস ও ১৫ মাস বয়সে। এবার প্রাদুর্ভাব বিবেচনায় বাংলাদেশের টিকাবিষয়ক সর্বোচ্চ কারিগরি কমিটি ন্যাশনাল ইমুনাইজেশন অ্যান্ড টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজারি গ্রুপ (নাইট্যাগ) ছয় মাস বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
গেল ২০ এপ্রিল শুরু হয়ে বুধবার শেষ হওয়া মাসব্যাপী টিকাদান কর্মসূচিতে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের টিকার আওতায় আনা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ ও জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে নয় মাসের আগেই শিশুরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে। এবার পরিস্থিতি বিবেচনায় নয় মাসের পরিবর্তে ছয় মাস বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনভিসি চেয়ারপারসন অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, গত কয়েক বছর ধরে আমরা দেখেছি দেশের শিশুরা টিকা নেওয়ার বয়সের আগে হামে আক্রান্ত হচ্ছে। পরে এটি নিয়ে ‘স্টাডি’ হয়েছে, সেটির ভিত্তিতে ইউনিসেফ, গ্যাভি ও আমাদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে ক্যাম্পেইনের জন্য বয়স ছয় মাস নির্ধারণ করা হয়েছে।
এখনো নিয়মিত টিকার ক্ষেত্রে বয়স নয় মাসই রাখা হয়েছে। এ ছাড়া নয় মাস বয়সী শিশুদের শরীরেও সেভাবে অ্যান্টিবডি পাওয়া যাচ্ছে না। তাই টিকা দেওয়ার সময় কমিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে।
টিকা দেওয়ার বয়স কমিয়ে আনা এবং টিকার কার্যকারিতার বিষয়ে জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বেনজির আহমেদ বলেন, “আসলে এবারের প্রকোপ থেকে বাঁচাতেই বয়স কমিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। এই কম বয়সে টিকা খুব বেশি কাজ করে না। তবে যে ৫০ শতাংশ বা তার বেশি কাজ করে সেটার মাধ্যমেও অনেক শিশুকে প্রকোপ থেকে বাঁচানো সম্ভব হবে।
ইউনিসেফ বলছে টিকা পায়নি অনেকে
হামের সংক্রমণ ঠেকাতে প্রথম ৫ এপ্রিল দেশের ১৮টি জেলার ৩০টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় টিকা দেওয়া শুরু হয়। ১২ এপ্রিল ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় টিকাদান শুরু হয়। ২০ এপ্রিল থেকে সারাদেশে টিকা দেওয়া শুরু হয়, চলে ২০ মে পর্যন্ত। টিকাদানের এই কর্মসূচির আওতায় ১ কোটি ৮০ লাখ ১৬ হাজার ৯১৪ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
টিকাদান কর্মসূচির শেষ দিন বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তরফে বলা হয়েছে, ১ কোটি ৮৩ লাখ ৫৯ হাজার ৮৭০ জন শিশু টিকা পেয়েছে। টিকার আওতায় ১০২ শতাংশ শিশুকে আনা হয়েছে বলেও দাবি করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
অন্যদিকে গেল ১১ মে টিকাদান পরিস্থিতি দ্রুত যাচাই পদ্ধতি-আরসিএমের ভিত্তিতে ইউনিসেফের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপক রিয়াদ মাহমুদ বলেছিলেন, তখন পর্যন্ত শহর এলাকায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ এবং গ্রাম এলাকায় ১৫ শতাংশ শিশু টিকা পায়নি।
নাম প্রকাশ না করে ইপিআইয়ের একজন কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, আসলে টার্গেট শিশুদের গণনার সময়ও কিছু শিশু বাদ পড়তে পারে। এই বাদ পড়া শিশুদের পরবর্তীতে টিকা দেওয়ার কার্যক্রমও চালু আছে আমাদের।
টিকা বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম বলেন, আরসিএম পদ্ধতিতে যাচাই করে যেসব শিশু টিকা পায়নি তাদের খুঁজে বের করে টিকা দিতে হবে। এটির জন্য মাঠকর্মীদের ভালোভাবে কাজে লাগাতে হবে।
আর টিকার কভারেজ শুধু পাঁচ বছরের বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে নয়, বরং আরো কিছু বেশি বয়সী শিশুদেরও টিকায় আওতায় নিয়ে আসা জরুরি।
বাদ পড়া শিশুদের টিকা দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, আমাদের টিকা কার্যক্রম চালু আছে। যেসব শিশুরা এখনো টিকা পায়নি তারা যেকোনো সেন্টার থেকে টিকা নিতে পারবে। এটির জন্য আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার চালাচ্ছি।
মৃত্যু থামবে কবে?
বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলেছে, ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৭ হাজার ৮৫৬। তাদের মধ্যে ৮ হাজার ৬৭ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। এদিন সকাল ৮টার পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হাম শনাক্ত হয়েছে ১৩৮ জনের।
অর্থাৎ প্রতিদিনই হামের রোগী শনাক্ত হচ্ছে, মৃত্যুও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কভিড-১৯ মহামারী মোকাবিলায় যেভাবে ‘কভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যানডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস (ইআরপিপি)’ তৈরি করা হয়েছিল, তেমন একটি জরুরি টিম করা প্রয়োজন। এতে মৃত্যু কমানো যাবে।
আর চলতি মাসের শেষের দিক থেকে হামে আক্রান্ত ও মৃত্যু কমতে পারে, এমন আশার কথা বলেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম বলেন, হামে মৃত্যু কবে কমবে, এটি বলা খুবই কঠিন। তবে হাম মোকাবিলার জন্য সর্বতোভাবে কাজ করলে দ্রুত সময়েই কমতে পারে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মো. মাহবুবুল হক বলেন, “হামের চিকিৎসায় কোনো ‘অ্যান্টিভাইরাল’ ওষুধ নেই। হামের কারণে নিউমোনিয়া হলে তা জটিল হয়। হাম হলে আরও অনেক জটিলতা দেখা দেয়।
হাসপাতালে শিশুদের আনা হচ্ছে অনেক জটিলতা হওয়ার পর। লাইফ সাপোর্ট দিয়েও তাদের বাঁচানো যাচ্ছে না। তবে আমরা সব শিশুর ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।
একটি জরুরি টিম থাকলে কাজ করা আরো সহজ হতো বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন।
তিনি বলেন, করোনার সময় যেমন আদালত কোথায় বেড, আইসিইউ ফাঁকা রয়েছে সেগুলোর তথ্য প্রকাশ করার আদেশ দিয়েছিল, এটি করতে পারলে সাধারণ মানুষরা দ্রুত চিকিৎসা নিতে পারবে। রোগীরাও সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাবে।
এখন প্রতিদিন গণমাধ্যমে খবর আসে রোগীরা হাসপাতালে-হাসপাতালে ঘুরছে।
ডা. মুশতাক বলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীদের চিকিৎসার ব্যয়সহ যাতায়াতের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। এটি না করলে অনেক মানুষই মনে করে হাসপাতালে নিয়ে আসা অনেক খরচের ব্যাপার। কিন্তু পরে যখন অবস্থা খুব খারাপ হয়, তারা হাসপাতালে শিশুদের নিয়ে আসে। এতে শিশুদের মৃত্যু হচ্ছে। এসব ব্যবস্থা নিলে শিশুদের মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব হবে মনে করেন তিনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, “আসলে হাম মোকাবিলার প্রধান একটি বিষয় হলো টিকা প্রদান। আমরা সেটি সফলভাবে সম্পন্ন করেছি। সরকার খুব আন্তরিকতার সঙ্গে হাম মোকাবিলায় চেষ্টা করছে।
আসলে আমাদের ক্যাম্পেইন শুরু হয়েছে গত মাসের ২০ তারিখ থেকে। আর টিকা গ্রহণের পর অন্তত তিন সপ্তাহ লাগে শিশুদের শরীরে ইমিউনিটি বৃদ্ধি পেতে, তাই চলতি মাসের ২০ তারিখের পর থেকে হামের প্রকোপ কমবে।
এখনো যারা টিকা পায়নি তাদের টিকা দেওয়ার কার্যক্রম চলছে তুলে ধরে তিনি আগামী জুন মাসের মাঝামাঝি থেকে হামের প্রকোপ একেবারে কমে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন।
আমরা শুরুতে উচ্চঝুঁকি বিবেচনায় ৫ এপ্রিল থেকে যেসব এলাকায় টিকা দিয়েছিলাম সেখানে বর্তমানে হামের সংক্রমণ খুবই কম। সেদিক বিবেচনায় জুন মাসের শেষে হামের প্রকোপ দৃশ্যমানভাবে কমবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বিগত সরকারের সময় ‘পরিকল্পনা ছাড়াই’ আমদানি করা চিকিৎসা যন্ত্রপাতি প্যাকেটবন্দি অবস্থায় ভাঙারির দোকানে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেছেন, রেডিওথেরাপি মেশিন বসানোর জন্য প্রয়োজনীয় ‘সুরক্ষা বাংকার’ (রেডিয়েশন বাংকার) তৈরি না করেই খুলনা ও ফরিদপুরের জন্য ১৮ কোটি টাকা করে দুটি যন্ত্র কেনা হয়েছিল। সেগুলো এখন পড়ে আছে। সোমবার জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের জামায়াতে ইসলামীর সদস্য সাবিকুন্নাহারের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হলে প্রথমে প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠিত হয়। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সাবিকুন্নাহার বলেন, প্রায় ছয় লাখ মানুষের জন্য হাসপাতালটিতে মাত্র ১০ জন চিকিৎসক কাজ করছেন। সেখানে ৬৮টি পদ শূন্য থাকার পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ ও নারী চিকিৎসক এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট রয়েছে। জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, গত ১৭ বছরের শাসনামলে নিয়োগ না হওয়া, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও জনস্বার্থ উপেক্ষার কারণে স্বাস্থ্য খাতের বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের সমস্যার কথা বলতে এক ঘণ্টা সময় পেলেও শেষ করা যাবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। অপরিকল্পিতভাবে চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার অভিযোগ তুলে মন্ত্রী বলেন, অনেক হাসপাতালে এক্সরে মেশিন পাঠানো হলেও সেগুলো চালানোর মানুষ নেই। একইভাবে ল্যাবরেটরির যন্ত্রপাতি থাকলেও ল্যাব টেকনিশিয়ান নেই বলে জানান তিনি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বিগত সরকারের সময় প্রয়োজন অনুযায়ী জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়নি। কিছু পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলেও নির্দিষ্ট ব্যক্তির সুযোগ দিতে বিভিন্ন শর্ত যুক্ত করায় সেগুলো নিয়ে আদালতে মামলা হয়েছে। কুমিল্লা-৯ আসনের বিএনপির সদস্য মো. আবুল কালামের প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৮-১৯ অনুযায়ী দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের ১২ দশমিক ৬ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত। তবে আক্রান্তদের ৯২ শতাংশের বেশি কোনো ধরনের চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেন না। দেশে প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার জনবল রয়েছে মাত্র ১ দশমিক ১৭ জন। সরকারি খাতে নিবন্ধিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন প্রায় ৩৫০ জন।
গ্রীষ্মকালীন ফল হিসেবে কাঁঠালের জনপ্রিয়তা সবখানেই। তবে সাধারণত আমরা কাঁঠালের কোষ খাওয়ার পর এর বিচিগুলো ফেলে দিই। অথচ জানলে অবাক হবেন, একটি কাঁঠালে ১০০ থেকে ৪০০টি পর্যন্ত ভোজ্য এবং পুষ্টিকর বিচি থাকতে পারে। আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, এই বিচিগুলো কেবল সুস্বাদুই নয়; বরং স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। তবে এর কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও রয়েছে, যা আমাদের জেনে রাখা জরুরি। পুষ্টির পাওয়ার হাউস কাঁঠালের বিচি প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট এবং ফাইবারের চমৎকার উৎস। ১০০ গ্রাম কাঁঠালের বিচিতে রয়েছে প্রায় ২৫.৮ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট এবং ১.৫ মিলিগ্রাম আয়রন। এ ছাড়া এতে উচ্চমাত্রায় পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম এবং ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়। বিশেষ করে ভিটামিন বি-কমপ্লেক্সের অন্তর্গত থায়ামিন এবং রিবোফ্লাভিন এতে প্রচুর পরিমাণে থাকে, যা শরীরের শক্তি উৎপাদনে এবং পুষ্টি শোষণে সাহায্য করে। কেন খাবেন কাঁঠালের বিচি? হজমশক্তি বৃদ্ধি ও কোষ্ঠকাঠিন্য রোধ: এতে থাকা উচ্চমাত্রার ফাইবার হজম প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে। কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ: গবেষণায় দেখা গেছে, কাঁঠালের বিচি শরীরের খারাপ কোলেস্টেরল (LDL) কমাতে এবং ভালো কোলেস্টেরল বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে, যা হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়ক: কাঁঠালের বিচিতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যেমন—ফ্ল্যাভোনয়েড ও স্যাপোনিন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং কোষের ডিএনএ ক্ষতি মেরামত করতে সাহায্য করে। এতে থাকা ‘জ্যাকালিন’ নামক উপাদানটি ক্যানসার বিরোধী হিসেবে পরিচিত। জীবাণুনাশক গুণ: কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, এটি ই-কোলাই এবং সালমোনেলার মতো ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে। কখন এটি ক্ষতিকর হতে পারে? উপকারী হলেও সবার জন্য বা সব অবস্থায় কাঁঠালের বিচি নিরাপদ নাও হতে পারে। বিশেষ করে যারা রক্ত পাতলা করার ওষুধ (যেমন: অ্যাসপিরিন, অ্যান্টিপ্লেটলেট বা অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ড্রাগ) গ্রহণ করছেন, তাদের জন্য কাঁঠালের বিচি রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। কারণ এটি রক্ত জমাট বাঁধার গতি কমিয়ে দেয়। এ ছাড়া কাঁচা কাঁঠালের বিচিতে ট্যানিন এবং ট্রিপসিন ইনহিবিটর থাকে, যা শরীরকে সঠিক পুষ্টি শোষণে বাধা দেয়। সঠিক প্রস্তুতিই সুস্থতার চাবিকাঠি কাঁঠালের বিচি থেকে সর্বোচ্চ উপকার পেতে এবং ক্ষতিকর প্রভাব এড়াতে এটি কখনোই কাঁচা খাওয়া উচিত নয়। তাপ প্রয়োগ করলে এর মধ্যকার ক্ষতিকর উপাদানগুলো নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। কীভাবে প্রস্তুত করবেন? সিদ্ধ করা: ২০-৩০ মিনিট পানিতে সিদ্ধ করে নিয়ে সালাদ বা তরকারিতে ব্যবহার করতে পারেন। রোস্ট করা: ওভেনে ২০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ২০ মিনিট বেক করে বা খোলায় ভেজে মচমচে স্ন্যাকস হিসেবে খাওয়া যায়। অন্যান্য ব্যবহার: এটি শুকিয়ে গুঁড়ো করে আটা হিসেবে বেকিংয়ে ব্যবহার করা যায়, এমনকি স্মুদি বা হুমাসেও যোগ করা সম্ভব। সুতরাং, প্রয়োজনীয় সতর্কতা মেনে চললে কাঁঠালের বিচি আপনার দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় একটি চমৎকার পুষ্টিকর যোগ হতে পারে। তথ্যসূত্র: হেলথ লাইন
সারাদিনের কর্মব্যস্ততা শেষে এক চিলতে প্রশান্তির ঘুমের বিকল্প নেই। আর সেই ঘুমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে আমরা অনেকেই বেছে নিই নরম তুলতুলে আরামদায়ক বালিশ। তবে অনেক সময় দেখা যায়, এই বালিশই হয়ে ওঠে সকালের ঘাড় বা পিঠ ব্যথার কারণ। মূলত ঘুমের সময় মেরুদণ্ডকে সঠিক অবস্থানে রাখা এবং শরীরের সাথে ঘাড়ের সামঞ্জস্য বজায় রাখাই বালিশের প্রধান কাজ। তবে বর্তমান সময়ে স্বাস্থ্যসচেতনদের মধ্যে একটি প্রশ্ন বেশ জোরালো হয়ে উঠেছে, সুস্থ থাকতে বালিশ কি আসলেই প্রয়োজন, নাকি বালিশ ছাড়াই ঘুমানো বেশি উপকারী? চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, বালিশ ছাড়া ঘুমানোর সুফল সবার জন্য এক নয়, বরং এটি অনেকাংশে নির্ভর করে আপনার ঘুমানোর ভঙ্গির ওপর ঘুমানোর ভঙ্গি ও এর প্রভাব যারা মূলত উপুড় হয়ে বা পেটে ভর দিয়ে ঘুমান, তাদের জন্য বালিশ ছাড়া ঘুমানো কিছুটা উপকারী হতে পারে। পেটে ভর দিয়ে ঘুমালে শরীরের অধিকাংশ ওজন মাঝের অংশে থাকে, যা মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক বক্রতাকে বজায় রাখতে বাধা দেয় এবং ঘাড় ও পিঠে চাপ সৃষ্টি করে। এক্ষেত্রে বালিশ ছাড়া ঘুমালে মাথা বিছানার সমতলে থাকে, যা ঘাড়ের ওপর চাপ কমায় এবং শরীরের সঠিক সারিবদ্ধতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। তবে আপনি যদি পিঠে ভর দিয়ে বা কাত হয়ে ঘুমান, তবে বালিশ ছাড়া ঘুমানো উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি করতে পারে। বালিশ ছাড়া ঘুমালে ঘাড়ের পেশি ও জয়েন্টে অসমভাবে চাপ পড়তে পারে, যার ফলে ঘাড় ব্যথা, পেশি শক্ত হয়ে যাওয়া এবং মাথাব্যথাও হতে পারে। চুলের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব অনেকে মনে করেন বালিশ ছাড়া ঘুমালে চুলের স্বাস্থ্য ভালো থাকে। তবে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বালিশ ব্যবহার করা বা না করার সাথে চুলের স্বাস্থ্যের কোনো সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। কেউ কেউ রেশমি বালিশের কভার ব্যবহারের পরামর্শ দিলেও এর স্বপক্ষেও পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য নেই। বালিশ ছাড়া ঘুমানোর অভ্যাস করতে চাইলে যদি আপনি আপনার বালিশটি সরিয়ে ফেলার কথা ভাবেন, তবে কিছু নিয়ম মেনে চলা জরুরি: ধীরে ধীরে অভ্যাস করুন: হঠাৎ করে বালিশ সরিয়ে না ফেলে প্রথমে পাতলা ভাঁজ করা তোয়ালে বা কম্বল ব্যবহার করুন এবং ধীরে ধীরে সেটির উচ্চতা কমিয়ে আনুন। শরীরের অন্যান্য অংশে সাপোর্ট: পেটে ভর দিয়ে ঘুমানোর সময় মেরুদণ্ডের অবস্থান উন্নত করতে তলপেট ও পেলভিসের নিচে একটি বালিশ রাখুন। আবার পিঠে ভর দিয়ে ঘুমালে হাঁটুর নিচে এবং কাত হয়ে ঘুমালে দুই হাঁটুর মাঝে বালিশ রাখা উপকারী। সঠিক গদি নির্বাচন: বালিশ ছাড়া ঘুমানোর সময় গদিটি খুব নরম হলে মেরুদণ্ড ঝুলে যেতে পারে এবং পিঠে ব্যথা হতে পারে। তাই সঠিক সাপোর্ট দেয় এমন গদি বেছে নিন। সতর্কতা আপনার যদি ঘাড় বা পিঠের দীর্ঘমেয়াদী ব্যথা থাকে কিংবা মেরুদণ্ডের কোনো সমস্যা (যেমন: স্কোলিওসিস) থাকে, তবে বালিশ ছাড়া ঘুমানোর আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সারকথা বালিশ ছাড়া ঘুমানোর উপকারিতা মূলত নির্ভর করে আপনার ঘুমানোর অভ্যাসের ওপর। পেটে ভর দিয়ে ঘুমানোর ক্ষেত্রে এটি সহায়ক হলেও পিঠ বা কাত হয়ে ঘুমানোর জন্য বালিশ থাকাই শ্রেয়। দিনশেষে, আপনি বিছানায় কতটা আরামদায়ক এবং ব্যথামুক্ত বোধ করছেন, সেটিই সুস্থ ঘুমের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তথ্যসূত্র: হেলথ লাইন