হরমুজ প্রণালীর নীল জলরাশি এখন যেন এক উত্তপ্ত রণক্ষেত্র। সামরিক বিশ্লেষকদের অনেকেই আশির দশকের ভয়াবহ ‘ট্যাঙ্কার যুদ্ধ’-এর স্মৃতি টেনে আনছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে তেলবাহী জাহাজ সুরক্ষায় নৌবাহিনীর এসকর্ট পাঠানোর কথা ভাবছেন, তখন ইতিহাসবিদরা বলছেন—এ দৃশ্য একেবারেই নতুন নয়। প্রায় চার দশক আগে ঠিক এই একই জলসীমায় মার্কিন নৌবাহিনী ও ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছিল। সেই সংঘাতের শিক্ষা আজও প্রাসঙ্গিক, যেখানে একটি ছোট ভুলই বড় ধরনের বিপর্যয়ের সূচনা করতে পারে। এই উত্তেজনার সূত্রপাত আশির দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধ থেকে। ইরাকি নেতা সাদ্দাম হোসেন ইরানের অর্থনীতি দুর্বল করতে তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলা শুরু করেন। পাল্টা হিসেবে ইরানও ইরাকের মিত্র দেশগুলোর বাণিজ্যিক জাহাজে আঘাত হানে। পারস্য উপসাগর উত্তাল হয়ে উঠলে কুয়েত তাদের জাহাজ রক্ষায় আন্তর্জাতিক সহায়তা চায়। সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথম এগিয়ে এলেও যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত কৌশল বদলে কুয়েতি জাহাজগুলোকে নিজেদের পতাকায় পুনঃনিবন্ধন করে ‘অপারেশন আর্নেস্ট উইল’-এর আওতায় সুরক্ষা দিতে শুরু করে। কিন্তু শুরুতেই বড় ধাক্কা খায় মার্কিন নৌবাহিনী। ১৯৮৭ সালের মে মাসে ইউএসএস স্টার্ক নামের একটি যুদ্ধজাহাজ ইরাকি যুদ্ধবিমানের ছোড়া দুটি মিসাইলে বিধ্বস্ত হয়। এতে ৩৭ জন মার্কিন নাবিক নিহত হন। পরে ইরাক এটিকে ‘ভুল’ হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও ঘটনাটি প্রমাণ করে—যুদ্ধে ভুল সিদ্ধান্ত কতটা ভয়াবহ হতে পারে। এরপর ঘটে আরেকটি বিব্রতকর ঘটনা। মার্কিন সুরক্ষায় থাকা ‘ব্রিজেটন’ নামের একটি বিশাল তেলবাহী জাহাজ ইরানি মাইনে আঘাত পায়। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোই নিরাপত্তার জন্য ওই ট্যাঙ্কারের পেছনে অবস্থান নেয়। ঘটনাটি মার্কিন নৌবাহিনীর মাইন শনাক্ত ও অপসারণ সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা বিশ্বজুড়ে প্রকাশ করে দেয়। আজও সেই মাইন আতঙ্ক হরমুজে বড় উদ্বেগ হয়ে আছে। যদিও প্রযুক্তি উন্নত হয়েছে, বিশেষজ্ঞদের মতে ইরানের মাইন বসানোর কৌশল এখন আরও আধুনিক ও কার্যকর। বর্তমানে মার্কিন নৌবাহিনীর মাইন অপসারণকারী জাহাজের সংখ্যা তুলনামূলক কম। বাজেট সংকোচনের কারণে এই খাতটি দীর্ঘদিন অবহেলিত ছিল। মিত্র দেশগুলোর কাছ থেকে সহায়তার আশা থাকলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো শক্তিশালী পদক্ষেপ নেই। ১৯৮৮ সালের ‘অপারেশন প্রেয়িং ম্যান্টিস’ ছিল এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় প্রতিক্রিয়া। ইউএসএস স্যামুয়েল বি. রবার্টস ইরানি মাইনে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা হামলা চালায়। এটি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন নৌবাহিনীর অন্যতম বড় সরাসরি নৌযুদ্ধ। তবে ২০২৬ সালের বাস্তবতা আরও জটিল। ইরান এখন শুধু মিসাইল বা মাইনে সীমাবদ্ধ নয়; ড্রোন প্রযুক্তিতেও তারা শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। সমুদ্রপথে সস্তা কিন্তু কার্যকর ড্রোন মার্কিন রণতরীর জন্য নতুন হুমকি হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে আশির দশকের মতো ইরান এখন অন্য কোনো বড় যুদ্ধে জড়িত নয়। ফলে তাদের মনোযোগ পুরোপুরি হরমুজ প্রণালীর দিকে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, সমুদ্রের মাইন শুধু কৌশলগত বাধা নয়—এটি ভয় সৃষ্টি করে, নৌ চলাচল সীমিত করে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি ‘হতাশার বহিঃপ্রকাশ’ বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি বলেন, এসব হুমকি ইরানের বিরুদ্ধে ব্যর্থতারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে পেজেশকিয়ান বলেন, ইরানকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার যে ধারণা প্রকাশ করা হচ্ছে, তা একটি ইতিহাসগড়া জাতির ইচ্ছাশক্তির বিরুদ্ধে হতাশার প্রকাশ। তিনি জানান, হুমকি ও সন্ত্রাস ইরানের জাতীয় ঐক্যকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে। তিনি আরও বলেন, হরমুজ প্রণালি সব দেশের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে, তবে যারা ইরানের ভূখণ্ড লঙ্ঘন করে তাদের জন্য নয়। যেকোনো অযৌক্তিক হুমকির বিরুদ্ধে ইরান দৃঢ়ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে বলেও জানান তিনি। এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও একই সুরে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ নয়, তবে বর্তমান পরিস্থিতির কারণে জাহাজ চলাচলে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, যুদ্ধের কারণে বীমা কোম্পানিগুলো ঝুঁকি নিতে চাইছে না, যার ফলে জাহাজগুলো চলাচলে দ্বিধায় পড়ছে—এ জন্য ইরান দায়ী নয়। আরাগচি জোর দিয়ে বলেন, কোনো ধরনের হুমকিতে ইরান বা ইরানি জনগণ প্রভাবিত হবে না। এদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা ও ঝুঁকি বৃদ্ধির জন্য সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দায়ী।
ইরান সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব ধীরে ধীরে বিশ্ব অর্থনীতির নানা খাতে ছড়িয়ে পড়ছে। তবে কিছু দেশ ইতোমধ্যেই বড় ধরনের ঝুঁকির সম্মুখীন। বিশেষ করে ইউরোপের বড় অর্থনীতির দেশগুলো নতুন করে চাপের মুখে পড়তে পারে। জার্মানির মতো শিল্পনির্ভর দেশে জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতালিতেও তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা বেশি। আর ব্রিটেন গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় জ্বালানি মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এদিকে জাপান চাহিদার প্রায় পুরো তেলই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে, যার বড় অংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে। ফলে এ রুটে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে দেশটির অর্থনীতি সরাসরি চাপে পড়বে। একইভাবে ভারতও তেল ও এলপিজি আমদানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বড় ঝুঁকিতে রয়েছে। ইতোমধ্যে দেশটির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমছে এবং মুদ্রার মানও ক্রমাগত কমছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোও ঝুঁকির বাইরে নয়। হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে কুয়েত, কাতার, বাহরাইনের মতো দেশগুলোর জ্বালানি রপ্তানি মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এতে পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও মিশর। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় এসব দেশে ইতোমধ্যে নানা কৃচ্ছ্রসাধনমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। জ্বালানি ব্যয়, মুদ্রাস্ফীতি ও বৈদেশিক ঋণের চাপ তাদের অর্থনীতিকে আরও ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ইসরায়েলের মহাকাশ গবেষণা সংস্থায় হামলা হয়েছে। রোববার (২২ মার্চ) ইরানের সেনাবাহিনী এ দাবি করে। তবে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে কোনো সত্যায়ন পাওয়া যায়নি। হামলার শিকার সংস্থাটি ইসরায়েলের অন্যতম প্রধান রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরায়েল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ (আইএআই)। এর স্থাপনা লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালায় ইরান। ইসরায়েল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ (আইএআই) দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত। উন্নত ড্রোন ও মিসাইল সিস্টেম তৈরি করার কাজে সংস্থাটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। ইরানের সেনাবাহিনী দাবি করে, তাদের ড্রোনগুলো ইসরায়েলের বেন গুরিয়ান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে অবস্থিত আইএআই-এর স্থাপনাগুলোতে সফলভাবে আঘাত হেনেছে। তবে এ হামলার পর তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। এদিকে সম্মুখ শত্রুর পাশাপাশি গুপ্তচরদের সঙ্গে লড়তে হচ্ছে ইরানি বাহিনীকে। এই ধারাবাহিকতায় সন্দেহভাজন ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ইরানের গোয়েন্দা মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানিয়েছে। খবর আলজাজিরার। গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ইরানের মারকাজি প্রদেশ থেকে ২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে সামরিক স্থাপনার তথ্য ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমে সরবরাহ এবং ‘অশান্তি’ সৃষ্টির অভিযোগ আনা হয়েছে। একই সময় গোলেস্তান প্রদেশ থেকে পুলিশের কেন্দ্রে হামলার পরিকল্পনার অভিযোগে আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানে বিভিন্ন অভিযোগে এ পর্যন্ত কয়েক শ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ইরানের গোয়েন্দা সংস্থা আরও জানায়, বিদেশে থাকা ১৫ জন ইরানি নাগরিকের ‘অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড’ নথিবদ্ধ করে বিচার বিভাগে পাঠানো হয়েছে।
ইরান থেকে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। এতে ইসরায়েলজুড়ে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। রোববার (২২ মার্চ) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় এ তথ্য জানিয়েছে ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্সেস (আইডিএফ)। আইডিএফ জানায়, ইরান থেকে তাদের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ফের ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় রাখা হয়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের মোবাইল ফোনে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে। এদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি দাবি করেছে, নতুন করে হামলার এই ধাপ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। অন্যদিকে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, রোববার তারা ইরান থেকে নিক্ষিপ্ত চারটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২৫টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে সংস্থাটি আরও জানায়, ইরানের ‘প্রকাশ্য আগ্রাসন’ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোট ৩৪৫টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ১৫টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১৭৭৩টি ড্রোন প্রতিহত করেছে। এর আগে ইসরায়েলের মধ্যাঞ্চলে ইরানি হামলার পর জেরুজালেমে বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ইরান থেকে ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্রের বিষয়ে সতর্ক করার পরপরই এই বিস্ফোরণগুলো ঘটে।
যুক্তরাজ্যে আঘাত হানতে সক্ষম এমন দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের কাছে রয়েছে বলে দাবি করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। তবে এমন দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাজ্যের আবাসন মন্ত্রী স্টিভ রিড। ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) দাবি করেছে যে, তেহরানের কাছে ৪ হাজার কিলোমিটার দূরত্বে হামলা চালাতে পারে, এমন দূরপাল্লার অস্ত্র রয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে স্টিভ রিড বিবিসিকে বলেছেন, ‘ইরানিরা যুক্তরাজ্যকে লক্ষ্যবস্তু করছে, কিংবা চাইলেও তারা তা করতে পারবে—এমন কোনো সুনির্দিষ্ট মূল্যায়ন আমাদের কাছে নেই।’ এর আগে গত শুক্রবার রাতে ভারত মহাসাগরের চাগোস দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের যৌথ সামরিক ঘাঁটিতে ইরান হামলা চালানোর পরই এসব মন্তব্য সামনে এলো। ওই দ্বীপপুঞ্জটি ইরান থেকে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ব্রিটিশ ভূখণ্ডের কত কাছাকাছি পৌঁছেছিল তা প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানান মন্ত্রী রিড। তিনি বলেছেন যে, তিনি ওই হামলার অপারেশনাল তথ্য প্রকাশ করতে পারবেন না। শুক্রবার রাতভর ডিয়েগো গার্সিয়া অভিমুখে ইরান দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে, যার মধ্যে একটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে মাঝপথে পড়ে যায় এবং অন্যটি প্রতিহত করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ চলাকালে সংঘটিত গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবিতে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। গত শুক্রবার কংগ্রেস সদস্য গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান এ প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন। এতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হত্যাযজ্ঞ, ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি এবং নারীদের ওপর নির্যাতনের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। প্রস্তাবটি এখন কংগ্রেসের বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক কমিটিতে পর্যালোচনার জন্য পাঠানো হয়েছে। এতে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর দ্বারা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের ওপর বৈষম্যের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি একাত্তরে জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানি বাহিনীকে সহায়তা করেছিল—এ অভিযোগ তুলে তাদের বিচারের দাবিও জানানো হয়েছে। প্রস্তাবে বলা হয়, সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের ‘জেনোসাইড’ প্রতিবেদন এবং ঢাকায় মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাডের পাঠানো ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ প্রমাণ করে, পাকিস্তানের অপারেশন সার্চলাইট ছিল একটি পরিকল্পিত গণহত্যা। এ প্রস্তাবের মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে ১৯৭১ সালের ঘটনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গণহত্যা’ ও ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি অপরাধীদের জবাবদিহি নিশ্চিত এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই ইতিহাস সংরক্ষণেরও দাবি জানানো হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় ইরাক থেকে তেল আমদানি কমিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য সংস্থা ইআইএ’র ভাষ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে ইরাকি তেল আমদানি কমে দৈনিক ১ লাখ ১৩ হাজার ব্যারেলে নেমে এসেছে। আগের সপ্তাহে এ পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৯ হাজার ব্যারেল। ফলে এক সপ্তাহে প্রায় ১ লাখ ৯৬ হাজার ব্যারেল কমেছে। হরমুজ প্রণালিতে চলাচল ব্যাহত হওয়ায় ইরাকসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর তেল সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। তবে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মোট তেল আমদানি বেড়েছে। ৯টি প্রধান দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্র দৈনিক প্রায় ৬৩ লাখ ৯১ হাজার ব্যারেল তেল আমদানি করেছে, যা আগের সপ্তাহের তুলনায় বেশি। তেলের সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী ছিল কানাডা। এরপর রয়েছে সৌদি আরব, মেক্সিকো ও ভেনেজুয়েলা। এছাড়া ইকুয়েডর, কলম্বিয়া, ব্রাজিল ও নাইজেরিয়া থেকেও তেল আমদানি করা হয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তেল ব্যবহারকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল ব্যবহার করে। এর বড় অংশই আমদানির ওপর নির্ভরশীল। সূত্র : শাফাক নিউজ, আনাদোলু এজেন্সি
বাহরাইনে সাম্প্রতিক বড় বিস্ফোরণের ঘটনায় নতুন তথ্য সামনে এসেছে। শুরুতে এ ঘটনার জন্য ইরানকে দায়ী করা হলেও এখন বিশ্লেষকরা বলছেন, এতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত মিসাইল জড়িত থাকতে পারে। গত ৯ মার্চ ভোরে রাজধানী মানামার কাছে সিত্রা এলাকায় শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটে। এতে অন্তত ৩২ জন আহত হন এবং আশপাশের বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রথমে যুক্তরাষ্ট্র ও বাহরাইন জানায়, ইরানের একটি ড্রোন হামলার কারণে এ বিস্ফোরণ হয়েছে। তবে পরে জানা যায়, ওই রাতে আকাশ প্রতিরক্ষায় ‘প্যাট্রিয়ট’ মিসাইল ব্যবহার করা হয়েছিল। বাহরাইন বলেছে, মিসাইলটি ইরানি ড্রোন প্রতিহত করতে ব্যবহার করা হয়। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, এই মিসাইল থেকেই বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। ঘটনার সময় কাছাকাছি একটি তেল শোধনাগারেও হামলা হয়, যা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তারা শুধু নিজেদের ও মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। তবে এই নির্দিষ্ট ঘটনার বিষয়ে তারা বিস্তারিত কিছু বলেনি। সূত্র : রয়টার্স
কাতারে একটি সামরিক হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় সাতজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে তিনজন তুরস্কের নাগরিক। তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে একজন তুর্কি সেনা সদস্য এবং দুজন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যাসেলসানের নিরাপত্তা কর্মী ছিলেন। বাকি চারজন কাতার সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য। রোববার ভোরে কাতার জানায়, নিয়মিত দায়িত্ব পালনের সময় যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত হয়। শুরুতে ছয়জন নিহত এবং একজন নিখোঁজের কথা জানানো হয়েছিল। পরে উদ্ধার অভিযান শেষে মোট সাতজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। তবে এখনো একজনের মরদেহ উদ্ধার করা যায়নি বলে জানানো হয়েছে। দুর্ঘটনার কারণ জানতে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে কাতার কর্তৃপক্ষ। সূত্র : আলজাজিরা
শত্রু দেশ ছাড়া অন্য সব দেশের জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত থাকবে বলে জানিয়েছে ইরান। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো জাহাজ এই সুবিধা পাবে না। ইরানের মেহের নিউজ এজেন্সির বরাতে দেশটির আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনে (আইএমও) প্রতিনিধি আলী মুসাভি বলেন, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে চলাচল চালু রাখা হবে। তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমানে এই পথ অচল হয়ে পড়ার মূল কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ‘আগ্রাসন’। মুসাভি আরও বলেন, ইরান কূটনৈতিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দেয়। তবে এর জন্য আগ্রাসন বন্ধ হওয়া এবং পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠন জরুরি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হিসেবে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে বড় প্রভাব ফেলছে। তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্ভাব্য ইরান চুক্তির জন্য ছয়টি প্রধান শর্ত নির্ধারণ করেছেন। চলমান উত্তেজনার মধ্যেই ওয়াশিংটন নতুন করে শান্তি প্রক্রিয়ার পথ খুঁজছে বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস। প্রতিবেদনে বলা হয়, এখনো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি কোনো আলোচনা শুরু হয়নি। তবে মিসর, কাতার ও যুক্তরাজ্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বার্তা আদান-প্রদান করছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের মতে, ইরানের কাছে যেসব শর্ত দেওয়া হয়েছে, সেগুলো হলো— চুক্তির জন্য ইরানকে ‘খুব কঠিন’ ছয়টি শর্ত দিলেন ট্রাম্প ইরান ইস্যুতে নিউইয়র্ক টাইমসে ট্রাম্পের উত্তেজনাপূর্ণ প্রতিক্রিয়া ৫ বছরের জন্য ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি স্থগিত করা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ করা নাতানজ, ইসফাহান ও ফোরদো পারমাণবিক স্থাপনা বন্ধ করা পারমাণবিক কর্মসূচিতে কঠোর আন্তর্জাতিক নজরদারি মেনে নেওয়া আঞ্চলিক ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা ১,০০০-এ সীমাবদ্ধ রাখা হিজবুল্লাহ, হুতি ও হামাসের মতো গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বন্ধ করা আলোচনার মূল ইস্যু অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, তারা আলোচনায় আগ্রহী হলেও শর্তগুলো ‘খুব কঠিন’। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে আগে হামলা বন্ধ করতে হবে এবং ভবিষ্যতে আক্রমণ না করার নিশ্চয়তা দিতে হবে। বিশ্লেষকদের মতে, কঠোর এই শর্তগুলোর কারণে দ্রুত কোনো সমঝোতা হওয়া কঠিন হতে পারে। তথ্যসূত্র : শাফাক নিউজ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরান চুক্তিতে আগ্রহী হলেও তিনি কোনো সমঝোতা চান না। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প এ মন্তব্য করেন। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে তাদের লক্ষ্য অর্জন করেছে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের একটি বিশ্লেষণের প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা ইরানকে মানচিত্র থেকে মুছে দিয়েছি।’ তিনি আরও দাবি করেন, নির্ধারিত সময়ের আগেই যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক লক্ষ্য পূরণ করেছে। ইরানে নিজের ব্যর্থতার অভিযোগ নাকচ করে ট্রাম্প বলেন, দেশটির নেতৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং তাদের নৌ ও বিমান সক্ষমতা ধ্বংস হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘ইরানের কোনো প্রতিরোধব্যবস্থা নেই। এখন তারা একটি চুক্তি করতে চায়, কিন্তু আমি চাই না।’ ট্রাম্পের এই বক্তব্য নতুন করে উত্তেজনা বাড়াবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তথ্যসূত্র: বিবিসি
রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করার অভিযোগ তুলেছেন। এক টেলিভিশন ভাষণে তিনি দাবি করেন, সম্পদসমৃদ্ধ দেশগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তার করতে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন সময় অভ্যুত্থান, অপহরণ ও রাজনৈতিক হত্যার মতো কৌশল ব্যবহার করে। লাভরভ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র মূলত নিজের স্বার্থেই পরিচালিত হয় এবং বৈশ্বিক নীতিমালা বা অন্য দেশের মতামতকে গুরুত্ব দেয় না। তার মতে, ওয়াশিংটনের প্রধান লক্ষ্য অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুবিধা অর্জন, বিশেষ করে জ্বালানি খাতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তার স্বার্থ রক্ষায় যেকোনো উপায় ব্যবহার করতে প্রস্তুত। উদাহরণ হিসেবে তিনি ভেনেজুয়েলা ও ইরানের কথা উল্লেখ করেন। তার দাবি, এই দুই দেশের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি মূলত তেল ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব বিস্তারের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্য বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে বিরোধ আরও বাড়াতে পারে।
কাতারের পর এবার ইরানি দূতাবাসের কর্মীদের বহিষ্কার করেছে সৌদি আরব। ইরানি দূতাবাসের সামরিক অ্যাটাশেসহ কয়েকজন কর্মীকে ‘পারসোনা নন গ্রাটা’ বা অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে সৌদি সরকার। তাঁদের আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সৌদি আরব ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর আগে গত বুধবার কাতারও একই ধরনের পদক্ষেপ নেয়। রাজধানী দোহায় অবস্থিত ইরানি দূতাবাসের সামরিক ও নিরাপত্তা অ্যাটাশের পাশাপাশি তাঁদের কর্মীদেরও অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে দেশটি। মূলত ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে ইসরায়েলের হামলার জেরে কাতারের প্রধান গ্যাস স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালায় তেহরান। ওই হামলার পরই ইরানি কূটনীতিকদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয় উপসাগরীয় দেশটি। এরপরই একই পথে হাঁটল সৌদি আরব। সূত্র: আল–জাজিরা
সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতের দুটি সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালানোর দাবি জানিয়েছে ইরান। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে এসব হামলা চালানো হয় বলে ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবির খবরে বলা হয়েছে। টেলিগ্রামে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আইআরআইবি বলেছে, আরব আমিরাতের আল-মিনহাদ ঘাঁটি এবং কুয়েতের আলি আল সালেম বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা হয়। এতে ঘাঁটির হ্যাঙ্গার ও জ্বালানি ট্যাংকগুলোতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি ইরানের। আল জাজিরা লিখেছে, তারা ইরানের এ দাবি যাচাই করে দেখতে পারেনি। কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্যও আসেনি। সূত্র: আল-জাজিরা
ইসরায়েলের পারমাণবিক স্থাপনা থাকা দিমোনা শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। এ হামলায় শহরটির একটি ৩ তলা ভবন ধসে পড়েছে। এতে অন্তত ৩৯ জন আহত হয়েছেন। শনিবার (২১ মার্চ) ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের বরাতে আল-জাজিরা এ তথ্য জানিয়েছে। ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার মুহূর্তটি দেখা গেছে। এতে দেখা যায়, আকাশ থেকে একটি বিশাল গোলা তীব্র গতিতে নিচে নেমে আসছে। এরপর একটি বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এদিকে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি ইসরায়েলের জরুরি চিকিৎসাসেবা বিভাগ ম্যাগেন ডেভিড অ্যাডমের (এমডিএ) বরাত দিয়ে জানিয়েছে, এই হামলায় অন্তত ৪৭ জন আহত হয়েছেন। এমডিএ জানায়, আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। এর আগে ইসরায়েলি অ্যাম্বুলেন্স সেবাবিভাগ তাদের প্রাথমিক চিকিৎসাও দেয়। আহত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই বোমার স্প্লিন্টারের আঘাতে জখম হয়েছেন। এর মধ্যে ১০ বছর বয়সী এক শিশুর অবস্থা আশঙ্কাজনক। দিমোনা শহর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে ইসরায়েলের নেগেভ পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র অবস্থিত। ধারণা করা হয়, দিমোনার বাইরের এই স্থাপনাটিতে ইসরায়েলের অঘোষিত পারমাণবিক অস্ত্রের মজুত রয়েছে। যদিও ইসরায়েল কখনোই নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্র থাকার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেনি। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, দিমোনা শহরে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার খবরের বিষয়ে তারা অবগত আছে। সংস্থাটি আরও জানায়, নেগেভ পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রের কোনো ক্ষয়ক্ষতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। এক বিবৃতিতে আইএইএ বলেছে, হামলাকবলিত এলাকায় অস্বাভাবিক কোনো তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ধরা পড়েনি।
ইরানের জ্বালানি তেল বাণিজ্যে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে (৩০ দিনের জন্য) শিথিল করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামের অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে নেওয়া এ সিদ্ধান্তে ইরানের সমুদ্রে ভাসমান তেল রফতানিতে আপাতত আর বাধা থাকছে না। তবে এমন উদ্যোগের পরও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে কোনো স্বস্তি আসেনি। বরং দাম ঊর্ধ্বমুখীই রয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসন চাপে পড়েছে। বাজার স্থিতিশীল করতে নেওয়া একাধিক পদক্ষেপ ব্যর্থ হওয়ার পরই শেষ পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা শিথিলের পথে হাঁটতে হয়েছে তাদের। ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সংঘাত চতুর্থ সপ্তাহে গড়িয়েছে। এই যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় ৫৪ শতাংশ বেড়েছে। সর্বশেষ ফিউচার মার্কেটে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেল প্রায় ১১২ ডলারে পৌঁছেছে, যা সাড়ে তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চের কাছাকাছি। স্পট মার্কেটেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের মারবান ক্রুডের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪৬ ডলার ৪০ সেন্টে, আর আরব লাইট ক্রুডের মূল্য পৌঁছেছে ১২৭ ডলার ৫ সেন্টে। বিশ্লেষকরা বলছেন, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা এবং সরবরাহ অনিশ্চয়তার কারণে বাজারে চাপ আরও বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত মজুদ থেকে তেল ছাড়াসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও দাম নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। এদিকে, নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রকে রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলেছে বলেও মত বিশেষজ্ঞদের। একদিকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক চাপ, অন্যদিকে অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি—এ দ্বৈত অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, এ উদ্যোগের মাধ্যমে তেলের সরবরাহ বাড়ানো এবং বাজারে চাপ কমানো সম্ভব হবে। তাদের মতে, এতে নতুন ক্রেতারা ইরানের তেল কিনতে পারবে, যা সরবরাহ সংকট কিছুটা হলেও লাঘব করবে। বর্তমানে সমুদ্রে ভাসমান প্রায় ১৪০ মিলিয়ন ব্যারেল ইরানি তেল দ্রুত বাজারে এলে স্বল্পমেয়াদে কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে। তবে এটি বৈশ্বিক চাহিদার মাত্র দেড় দিনের সমান হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে সংকট কাটবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দক্ষিণ ইসরায়েলের ডিমোনা শহরে একটি ভবন ধসে পড়েছে। এ ঘটনায় অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ১০ বছর বয়সী একটি শিশুও রয়েছে। এখনো উদ্ধারকাজ চলছে। শনিবার (২১ মার্চ) এ হামলার ঘটনা ঘটে বলে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। প্রকাশিত ফুটেজে দেখা যায়, আকাশ থেকে একটি ক্ষেপণাস্ত্র তীব্র গতিতে নেমে এসে ভবনে আঘাত হানে। মুহূর্তেই ঘটে বিকট বিস্ফোরণ, যার পরপরই ভবনটি ধসে পড়ে। দেশটির জরুরি চিকিৎসা সেবা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, হামলায় আহতদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে এবং তাদের চিকিৎসা চলছে। এদিকে, উত্তর ইসরায়েলের মা’লোত-তারশিহা এলাকাতেও রকেট হামলার ঘটনা ঘটেছে। সেখানে অন্তত আটজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, ওই এলাকায় একযোগে একাধিক রকেট নিক্ষেপ করা হয়, যার পেছনে হিজবুল্লাহর সম্পৃক্ততার দাবি করা হয়েছে।
ইরানের নাতানজ পারমাণবিক কেন্দ্রে হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে রাশিয়া। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে। মস্কো বলছে, এ ধরনের হামলা পুরো অঞ্চলের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা এক বিবৃতিতে বলেন, ঘটনাটি নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। তার মতে, এমন ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি করতে পারে। এর আগে ইরান জানিয়েছে, শনিবার নাতানজ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটেছে এবং বিষয়টি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাকে (আইএইএ) অবহিত করা হয়েছে। তবে তেহরানের দাবি, এ হামলায় কোনো তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ছড়িয়ে পড়েনি। সূত্র : আল-জাজিরা
ভারত মহাসাগরে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের যৌথ সামরিক ঘাঁটি দিয়েগো গার্সিয়া সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরান হামলার চেষ্টা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্য। তবে ব্রিটিশ সূত্রের দাবি, এই হামলা সফল হয়নি এবং তা প্রতিহত করা হয়েছে। বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে যুক্তরাজ্যের এক কর্মকর্তা বলেন, ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়লেও তা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারেনি। এর আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ইরান ঘাঁটিটির দিকে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। যুক্তরাজ্য আরও জানায়, এই হামলার চেষ্টা ঘটে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের কিছু সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার ঘোষণার আগেই। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার মধ্যে এই ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংঘটিত এজাহারভুক্ত হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ও মিরাজ হোসেন পলাতক রয়েছেন। ব্যাংক প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খুনের শিকার কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুল হালিম ছিলেন কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেনের নাম রয়েছে। তারা বর্তমানে নিজেদের সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। ব্যাংক সূত্রে গেছে, তারা চাঁদাবাজি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এসব আসামিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেন। এতে আরও যুক্ত রয়েছেন ডিজিএম সৈয়দ লিয়াকত হোসেন, হাবিব উন নবী, ডিএমডি খালেকুজ্জামান জুয়েল ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে আব্দুল হালিমের মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক সজীব কুমার সিং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জানান, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাত ১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান। হালিমের ছেলে ফয়সাল বলেন, তার বাবা ২০১৪ সাল থেকে কৃষি ব্যাংক সিবিএর সভাপতি ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গত নভেম্বরেই মতিঝিল থানায় একটি জিডি (নং ০৫/১১/২০২৪ - ৩৩৫) করেছিলেন তার বাবা। তিনি আরও বলেন, বুধবার রাতে আমার বাবাকে তার অফিসের সহকর্মীরা মারধর করে হত্যা করেছে। সিবিএর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জানান, ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হই। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট বিনা নির্বাচনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে আমাদের অফিস দখল করে নেয় ফয়েজ ও মিরাজ। এ নিয়ে মামলা চলছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা অস্থায়ী জামিনে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন—যাদের মধ্যে আছেন ড্রাইভার সাইফুল, শাহেদ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মেহেদী ও অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনার সিরাজ। এদিকে, মামলার ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের প্রধান মহাব্যবস্থাপক জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। কারণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য না করার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।