আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে ঢাকার গণপরিবহন-ব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছিল মেট্রোরেল। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে এর পাশাপাশি মনোরেল চালুর কথা বলেছেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। মোহাম্মদপুর, বনানীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে মনোরেলকে মেট্রোরেলের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা তুলে ধরেন তিনি।
২০ জানুয়ারি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রুহের মাগফিরাত কামনায় বনানী সোসাইটি আয়োজিত দোয়া মাহফিল ও মতবিনিময় সভায় মনোরেলের পরিকল্পনা তুলে ধরেন তারেক রহমান। এর আগে গত জুনে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগর চট্টগ্রামেও মনোরেল চালুর উদ্যোগ নেয় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। সাড়ে ৫৪ কিলোমিটার দীর্ঘ তিনটি রুটে মনোরেল নির্মাণ করতে অন্তত ২৫ হাজার কোটি টাকা খরচ হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ওরাসকম কনস্ট্রাকশন ও আরব কন্ট্রাক্টরস—এ দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করা হয়।
চট্টগ্রামে মনোরেলের সম্ভাব্য রুটগুলো হচ্ছে—কালুরঘাট থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত ২৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার, সিটি গেট থেকে শহীদ বশিরুজ্জামান চত্বর পর্যন্ত ১৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার এবং অক্সিজেন থেকে ফিরিঙ্গিবাজার পর্যন্ত ১৪ দশমিক ৫ কিলোমিটার।
ঢাকার পাশের নগর নারায়ণগঞ্জেও মনোরেল নির্মাণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শোনা যাচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ২০০৫ সালে ঢাকার ২০ বছরের কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (এসটিপি) প্রণয়ন করে সরকার। পরে জাপানের অর্থায়নে এবং জাপানের পরামর্শকদের সহায়তায় ২০১৪ সালে এসটিপি সংশোধন করে আরএসটিপি তৈরি করা হয়। এর আলোকেই ঢাকার গণপরিবহন উন্নয়নে নানা প্রকল্প নেয় এবং বাস্তবায়ন করে বিগত সরকার।
এসটিপি প্রণয়নের সময়ই কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ ঢাকায় মনোরেল চালুর পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে এসটিপিতে উড়ালসড়ক, মেট্রোরেল (উড়াল ও পাতাল পথে) এবং বাসের জন্য বিশেষ লেন (বিআরটি) চালুর সুপারিশ করা হয়। এর ভিত্তিতেই ঢাকায় ছয়টি মেট্রোরেল লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এর মধ্যে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত একটি মেট্রোরেল লাইন চালু হয়েছে।
মনোরেল কী
মনোরেল হচ্ছে একটি মাত্র লাইনের ওপর দিয়ে চলাচলকারী গণপরিবহন ব্যবস্থা। একটি মাত্র বিমের ওপর ট্রেন চলে। প্রচলিত রেল বা মেট্রোরেলের মতো আলাদা দুটি লাইন প্রয়োজন হয় না। বর্তমানে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত চলমান মেট্রোরেলের বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য বড় বড় খুঁটির ওপর তার টানতে হয়েছে। কিন্তু মনোরেলে বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা লাইনের সঙ্গেই যুক্ত থাকে। ফলে খুঁটি বা তারের জন্য বাড়তি ভার বহনের কাঠামোর প্রয়োজন হয় না।
মনোরেল চলাচল ও অবকাঠামো নির্মাণে তুলনামূলকভাবে কম জায়গার প্রয়োজন হয়। সরু পথ ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সহজেই এটি নির্মাণ করা যায়। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—মেট্রোরেলের তুলনায় মনোরেলের নির্মাণ ব্যয় কম। এ ছাড়া মনোরেল আঁকাবাঁকা পথে চলতে পারে। মেট্রোরেলের ক্ষেত্রে লাইন বাঁকা হলে গতি কমাতে হয় এবং নির্মাণে বাড়তি খরচ পড়ে।
বিশ্বের বড় বড় শহরে মেট্রোরেল জনপ্রিয় গণপরিবহন। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে মেট্রোরেল বেশি চলে পাতাল পথে। জাপান, চীন, ভারতসহ অনেক দেশে উড়ালপথে মেট্রোরেল চলাচল করে।
চীন, ভারত, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বহু দেশেই মেট্রোরেলের পাশাপাশি মনোরেল চালু রয়েছে। মিসরের কায়রো ও চীনের গুইলিনে মনোরেল নির্মাণকাজ চলমান। তবে মনোরেলের যাত্রী পরিবহনক্ষমতা মেট্রোরেলের তুলনায় কম।
মেট্রোরেলের পরিপূরক
মেট্রোরেল ও মনোরেল—দুটিই গণপরিবহন। প্রশ্ন হচ্ছে, ঢাকায় মনোরেলের প্রয়োজনীয়তা কোথায়? ঢাকার জনঘনত্ব বেশি এবং শহরটি অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। ফলে সব এলাকায় মেট্রোরেল নির্মাণ সম্ভব নয়। যেমন পুরান ঢাকার অনেক এলাকায় সড়ক এতটাই সরু যে সেখানে বাস চলাচলও সম্ভব নয়। একই অবস্থা খিলগাঁও, গোড়ান, বাসাবোসহ কিছু এলাকার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব এলাকায় মেট্রোরেল নির্মাণ করতে হলে পাতাল পথে যেতে হবে, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল, সময়সাপেক্ষ এবং ঝুঁকিপূর্ণ। তুলনামূলকভাবে এসব এলাকায় মনোরেল সহজে নির্মাণ করা যায়। আঁকাবাঁকা পথ হলেও তাতে সমস্যা হয় না।
তবে মনোরেল সব শহর বা সব এলাকার জন্য উপযোগী নাও হতে পারে। যেমন ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা শহরের মনোরেল প্রকল্প বাতিল করা হয়েছিল। বড় শহরে যাত্রীচাপ মনোরেল সামাল দিতে পারবে কি না—সেই প্রশ্নও ওঠে। আবার বিশ্বে বহু শহরে মনোরেল সফলভাবে চলছে। ফলে অনেক দেশেই মেট্রোরেল, মনোরেল, উড়ালসড়ক ও বিআরটি মিলিয়ে বহুমাত্রিক গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। ভারতের মুম্বাই শহরে মেট্রোরেলের পাশাপাশি মনোরেলও রয়েছে।
গণপরিবহন-বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, মেট্রোরেলের জন্য ঢাকার সবচেয়ে উপযোগী ও যাত্রীঘন পথ হচ্ছে উত্তরা-মতিঝিল রুট। এরপরও উচ্চ ব্যয়ের কারণে ভাড়া তুলনামূলক বেশি নির্ধারণ করতে হয়েছে। পরবর্তী মেট্রোরেল লাইনগুলোর বড় অংশই পাতাল পথে নির্মিত হবে, এতে ব্যয় আরও বাড়বে। তখন ভাড়া আরও বাড়াতে হলে সেটি আর প্রকৃত অর্থে গণপরিবহন থাকবে না।
তিনি আরও বলেন, মেট্রোরেলের পাশাপাশি বিকল্প হিসেবে মনোরেল নিয়ে ভাবতে হবে। তুলনামূলক সরু ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাকে এতে যুক্ত করা সম্ভব। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, বর্তমান মেট্রোরেল বিজয় সরণি থেকে খামারবাড়িতে এসে বড় মোড় নেয়। মনোরেল হলে বাঁকা করেই মূল সড়ক দিয়ে চালানো যেত, এতে খরচও কম হতো।
মেট্রো ও মনোরেল—ব্যয় বড় প্রশ্ন
উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ঢাকার প্রথম মেট্রোরেল চালু হলেও এটি কমলাপুর পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এই লাইনের প্রতি কিলোমিটার নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। পুরো লাইনটি উড়ালপথে নির্মিত।
বর্তমানে কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত এবং নর্দা থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত আরেকটি মেট্রোরেল প্রকল্প (এমআরটি লাইন-১) চলমান রয়েছে। পাশাপাশি সাভারের হেমায়েতপুর থেকে মিরপুর ও গুলশান হয়ে ভাটারা পর্যন্ত এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর) নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। এসব লাইনের কিছু অংশ উড়াল এবং কিছু অংশ পাতাল পথে হবে। ঠিকাদার নিয়োগপ্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এসব মেট্রোরেল লাইনের প্রতি কিলোমিটার নির্মাণে ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হতে পারে।
ভারতের মুম্বাই শহরে ২০ কিলোমিটার মনোরেল নির্মাণে ব্যয় হয়েছে বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় প্রায় ১৬৪ কোটি টাকা। সেখানে মেট্রোরেল নির্মাণে প্রতি কিলোমিটার ব্যয় হয় ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার মধ্যে। মুম্বাইয়ের মনোরেলের একাংশ চালু হয় ২০১৪ সালে এবং বাকি অংশ ২০১৯ সালে।
মুম্বাইয়ের মনোরেল দৈনিক দেড় থেকে দুই লাখ যাত্রী পরিবহন করতে পারে। বিপরীতে ঢাকার মেট্রোরেল দিনে গড়ে প্রায় ৪ লাখ যাত্রী বহন করছে। এই প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা।
মিসরের ৯৬ কিলোমিটার মনোরেল প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে সাড়ে ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার। প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় প্রায় পৌনে পাঁচ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬০০ কোটি টাকার সমান। এ প্রকল্পে নির্মাণের পাশাপাশি ৩০ বছর পর্যন্ত পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশে মেট্রোরেলসহ বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। আশপাশের দেশের তুলনায় এখানে ব্যয় বেশি হওয়ায় গণপরিবহন অবকাঠামোর বিকল্প পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা চলছেই।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ইউরেনিয়াম রাশিয়া থেকে বাংলাদেশে এসে পৌঁছেছে। শুক্রবার রাত ১১টা ৪৪ মিনিটে রাশিয়া থেকে একটি জ্বালানিবাহী কার্গো হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রাশিয়ার পারমাণবিক সংস্থা-রোসাটমের বাংলাদেশের পিআর সংস্থা-ট্রাইউইন গ্রুপের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। এই কর্মকর্তা বলেন, প্লেন থেকে ইউরেনিয়াম গাড়িতে লোড করতে ৪ ঘণ্টা লাগবে। সেক্ষেত্রে শনিবার ভোর রাত ৪টার দিকে ঢাকা থেকে ইউরেনিয়ামবাহী গাড়ি কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুর প্রকল্প এলাকায় নিয়ে যাওয়া হবে। এর আগে, শুক্রবার বিকেলে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানান, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের জ্বালানিবাহী বিমানটি ইতোমধ্যে রাশিয়া থেকে রওনা হয়েছে। ভারতে বিরতি নিয়ে ইউরেনিয়ামবাহী বিমানটি ঢাকায় পৌঁছাবে। মন্ত্রী জানান, জ্বালানিবাহী বিমানটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর রূপপুরে নেওয়ার সব প্রস্তুতিও সম্পন্ন হয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নিরাপত্তায় ইউরেনিয়ামের চালানটি রূপপুরে পৌঁছাবে। আগামী নভেম্বর-ডিসেম্বরের মধ্যে ৯টি ফ্লাইটে দেশে আসবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের জন্য বাড়তি ৪৮টি ও দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য ১৬৩টি ইউরেনিয়াম অ্যাসেম্বল। রাশিয়া থেকে কাজাখস্তান, তুর্কমেনিস্তান, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও ভারত হয়ে ইউরেনিয়ামের এই চালান দেশে আসার কথা। এর আগে, ২৪ সেপ্টেম্বর এই ইউরেনিয়াম আসার কথা থাকলেও পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারে জটিলতা থাকায় তা শেষ পর্যন্ত দেশে আসতে পারেনি। তারও আগে ২০২৩ সালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের জ্বালানি এসেছিল। চলতি বছরের মে মাসে সেই জ্বালানি পারমাণবিক চুল্লিতে বসানো হয়েছে।
দেশের সবাইকে স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনা (ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ) এবং চিকিৎসা খাতকে ভবিষ্যৎমুখী ও টেকসই করে গড়ে তুলতে জাপানের সহযোগিতা ও প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্ব চেয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এম. এ. মুহিত। আজ জাপানের টোকিওতে বাংলাদেশ দূতাবাসে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ হেলথকেয়ার বিজনেস সেমিনার’-এ এক ভিডিও বার্তায় প্রতিমন্ত্রী এ আহ্বান জানান। জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) এবং জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো)’র যৌথ উদ্যোগে এই সেমিনারের আয়োজন করা হয়। এতে জাপানের বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগকারী ও স্বাস্থ্য খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। ভিডিও বার্তায় প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, স্বাস্থ্য খাতের আধুনিকায়ন এবং আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিত করতে জাপানি বিনিয়োগ ও অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সেমিনারে জাপানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. দাউদ আলী বলেন, জাপান দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন অংশীদার। মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য, কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবা, টিকাদান কর্মসূচি, অবকাঠামো নির্মাণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে অব্যাহত সহায়তার জন্য তিনি জাইকা ও জাপান সরকাকে ধন্যবাদ জানান। রাষ্ট্রদূত উল্লেখ করেন, ১৭ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার বাংলাদেশে বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা, আধুনিক হাসপাতাল, রোগনির্ণয় ব্যবস্থা, মেডিকেল প্রযুক্তি এবং দক্ষ জনবলের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। অন্যদিকে জাপানে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়ায় সেখানে নার্স ও কেয়ারগিভারদেও চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি করে জাপানের এই চাহিদা মেটানো সম্ভব বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। পাশাপাশি বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প, বায়োটেকনোলজি, ভ্যাকসিন এবং ওষুধের কাঁচামাল (এপিআই) উৎপাদনে জাপানি বিনিয়োগ ও যৌথ উদ্যোগের আহ্বান জানান রাষ্ট্রদূত। সেমিনারে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব শাহ ইমাম আলী রেজা এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস দু’টি পৃথক উপস্থাপনার মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের বর্তমান অবস্থা ও সম্ভাবনার চিত্র তুলে ধরেন। এছাড়া জাইকার দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের মহাপরিচালক তেতসুয়া ইয়ামাদা, দক্ষিণ এশিয়া বিভাগ-৪-এর উপ-পরিচালক হিরোকি সাসাকি এবং জ্যাট্রোর গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজি (সাউথ ওয়েস্ট এশিয়া) বিভাগের সিনিয়র ডিরেক্টর ইউজি আন্দো বাংলাদেশ-জাপান স্বাস্থ্য সহযোগিতা ও বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে আলোচনা করেন। বাংলাদেশে কাজের অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন ইয়োগলেনা কোম্পানি লিমিটেডের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার নাও নিত্তা। অনুষ্ঠানের শেষ অংশে একটি প্রশ্নোত্তর পর্ব ও নেটওয়ার্কিং সেশন অনুষ্ঠিত হয়।
কুমিল্লা টাউনহল মাঠে আজ থেকে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী কারিগরি শিক্ষা ও উদ্ভাবনী মেলা। কুমিল্লা জেলার সরকারি ও বেসরকারি কারিগরি, ‘ভোকেশনাল এডুকেশন ও ট্রেইনিং ইন্সটিটিউশন ফোরাম’ (টিভিইটি) আয়োজিত এই মেলা শুক্রবার দুপুরে ফিতা কেটে শুভ উদ্বোধন করেন প্রধান অতিথি সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মনিরুল হক চৌধুরী। প্রধান অতিথি’র বক্তব্যে তিনি বলেন, কারিগরি শিক্ষা নির্ভর শিক্ষা নীতি জাতির জন্য প্রয়োজন। তিনি বলেন, আজকের জেনারেশন আগুনের গোলা, তাদের সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারলে ইনশাআল্লাহ বাংলাদেশ একদিন সমস্ত ক্ষেত্রে নাম করবে। তিনি আরো বলেন, আগামী নভেম্বরে আমরা কুমিল্লাবাসী একত্রিত হবো ‘দ্য এডুকেশন পলিসি কুমিল্লা কনসেপ্ট’ নিয়ে। সেখানে এক নম্বরে রয়েছে কারিগরি শিক্ষা পদ্ধতি। তিনি উদ্ভাবনীর মেলার বিভিন্ন স্টল ও শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবন দেখে ভূয়সী প্রসংশা করেন। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য তিনি বলেন, পোলাতো নয় যেন আগুনের গোলা, মেয়েতো নয় ওরা আগুনের গোলা। তিনি আরো বলেন, তারেক রহমান যতদিন আছেন দেশ বিপথগামী হবে না, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি কোর্স চালুর যে সিদ্ধান্ত হয়েছে তা খুবই সম্ভাবনাময়। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ প্রকৌশলী মোহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম চৌধুরী। বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষার বর্তমান অবস্থা, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করনীয় শীর্ষক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিসিএন শিক্ষা পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. তারিকুল ইসলাম চৌধুরী। সভাপতির বক্তব্য রাখেন কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) সুলতানা রাজিয়া। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরো উপস্থিত ছিলেন, কারিগরি শিক্ষার চট্টগ্রাম বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক উপ সচিব কাজী ফারুক আহম্মেদ। মঞ্চে আরো উপস্থিত ছিলেন, কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপি’র সহ সভাপতি মো. আমিরুজ্জামান আমির। এছাড়া অনুষ্ঠানে কুমিল্লা টাউনহল সাধারণ সম্পাদক মো. সাজ্জাদুল কবীর সাজ্জাদ, সদর দক্ষিণ উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি অ্যাড. মো. আক্তার হোসেন, সিসিএন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মো. জামাল নাছের, লিবারেল আর্টস অনুষদ ডিন অধ্যাপক ড. আলী হোসেন চৌধুরী, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকগণ উপস্থিত ছিলেন।