বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘আগামী সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, অর্থনীতিকে সচল করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, দুর্নীতিকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। দিস আর দ্য চ্যালেঞ্জ।’
আজ শুক্রবার বিকেলে নিজের নির্বাচনী এলাকা ঠাকুরগাঁও থেকে ঢাকায় ফিরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ টার্মিনালের বাইরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিএনপি মহাসচিব এসব কথা করেন।
তিনি বলেন, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করায় বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে আগামী সরকার গঠন করব।
নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘এই ফলাফল এক হচ্ছে আনন্দময়, আরেকটা হচ্ছে বিষাদময়। আমাদের দলের প্রয়াত চেয়ারপার্সন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এই অভূতপূর্ব বিজয় দেখে যেতে পারলেন না, এটা বিষাদময়।’
‘অনেক শত, হাজার রক্তের বিনিময়ে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পরে একটি চমৎকার উৎসবমুখর এবং একটি স্বচ্ছ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে... আমি ব্যক্তিগতভাবে ডেফিনেটলি অভিভূত-মুগ্ধ। এই ধারাবাহিকতা যদি আমরা রাখতে পারি— তাহলে গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা আমরা রক্ষা করতে পারব।’
আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন হলো, এই দলটি নিয়ে আপনাদের ভাবনা কী এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আওয়ামী লীগের ব্যাপারে ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পরবর্তীকালে বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে উঠে আসবে পরবর্তী সিদ্ধান্ত।’
বিমানবন্দর থেকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গুলশানে দলটির চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে যান। সেখানে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ফুল দিয়ে অভিনন্দন জানান বিএনপি মহাসচিব। এসময় দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ইসমাইল জবিউল্লাহ উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংঘটিত এজাহারভুক্ত হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ও মিরাজ হোসেন পলাতক রয়েছেন। ব্যাংক প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খুনের শিকার কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুল হালিম ছিলেন কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেনের নাম রয়েছে। তারা বর্তমানে নিজেদের সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। ব্যাংক সূত্রে গেছে, তারা চাঁদাবাজি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এসব আসামিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেন। এতে আরও যুক্ত রয়েছেন ডিজিএম সৈয়দ লিয়াকত হোসেন, হাবিব উন নবী, ডিএমডি খালেকুজ্জামান জুয়েল ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে আব্দুল হালিমের মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক সজীব কুমার সিং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জানান, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাত ১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান। হালিমের ছেলে ফয়সাল বলেন, তার বাবা ২০১৪ সাল থেকে কৃষি ব্যাংক সিবিএর সভাপতি ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গত নভেম্বরেই মতিঝিল থানায় একটি জিডি (নং ০৫/১১/২০২৪ - ৩৩৫) করেছিলেন তার বাবা। তিনি আরও বলেন, বুধবার রাতে আমার বাবাকে তার অফিসের সহকর্মীরা মারধর করে হত্যা করেছে। সিবিএর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জানান, ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হই। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট বিনা নির্বাচনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে আমাদের অফিস দখল করে নেয় ফয়েজ ও মিরাজ। এ নিয়ে মামলা চলছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা অস্থায়ী জামিনে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন—যাদের মধ্যে আছেন ড্রাইভার সাইফুল, শাহেদ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মেহেদী ও অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনার সিরাজ। এদিকে, মামলার ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের প্রধান মহাব্যবস্থাপক জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। কারণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য না করার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আজ জাতীয় সংসদে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ত্রৈমাসিক (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বাজেট বাস্তবায়ন অগ্রগতি প্রতিবেদন উপস্থাপন করেছেন। প্রতিবেদনে আয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে উন্নতি এবং ধীরে ধীরে ম্যাক্রোইকোনমিক স্থিতিশীলতার দিকে এগোনোর বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে, যা বৈশ্বিক ও দেশীয় চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও অর্জিত হয়েছে। প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, প্রথম ত্রৈমাসিকে মোট রাজস্ব আয় ১৭.৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে বৃদ্ধি ছিল ৪.৪ শতাংশ। সরকারি মোট ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে ১০ শতাংশ, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৪ শতাংশ। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন প্রথম ত্রৈমাসিকে মোট বরাদ্দের ৪.৫৮ শতাংশে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ৩.৯৭ শতাংশ ছিল। অর্থমন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ২৪.৮৬ বিলিয়ন থেকে ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ৩১.৪৩ বিলিয়ন ডলারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বাহ্যিক স্থিতিশীলতার উন্নতি নির্দেশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথম ত্রৈমাসিকে রফতানি আয় ৫.২৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং আমদানি ব্যয় ৯.৪৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ৯.৪৫ শতাংশে অবস্থান করেছে, যা আগের বছরের ৯.৯৭ শতাংশের তুলনায় সামান্য কম। অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সঙ্কট ও বৈশ্বিক রাজনৈতিক উত্তেজনা রফতানিতে প্রভাব ফেলেছে। তবে দেশের অর্থনীতি সংস্কার উদ্যোগ, নীতি সমন্বয় এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার দিকে এগোচ্ছে। তিনি বলেন, বিশ্ববাজারে শুল্ক বাধা, প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, উচ্চ সুদের হার এবং অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতা রফতানি, বেসরকারি খাতের ঋণ বৃদ্ধির এবং বিনিয়োগে চাপ সৃষ্টি করছে, এবং রাজস্ব আহরণে কিছু ঘাটতি দেখা দিয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি প্রত্যাশিত হারে কমছে না, যা সরবরাহ শৃঙ্খল সীমাবদ্ধতা, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং বহিরাগত প্রভাবের কারণে হয়েছে। তবে কৃষি, রফতানিমুখী শিল্প এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য লক্ষ্য ভিত্তিক ঋণ সহায়তা অব্যাহত আছে। অর্থমন্ত্রী বলেন, শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদা, প্রচুর শ্রমশক্তি এবং উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধিই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে সহায়তা করছে। তিনি নীতি ধারাবাহিকতা, প্রতিষ্ঠান সক্ষমতা বৃদ্ধি, সুশাসন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, রফতানি বৈচিত্র্য এবং প্রযুক্তি ভিত্তিক উৎপাদনের ওপর জোর দিয়েছেন। অর্থমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেছেন, বাংলাদেশ সকল চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে পারবে এবং সমন্বিত প্রচেষ্টা ও বাস্তবসম্মত সংস্কার কর্মসূচির মাধ্যমে ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হবে।
আফ্রিকার উদীয়মান অর্থনীতির দেশ নাইজেরিয়া জনসংখ্যা, অর্থনীতির কাঠামো ও বৈদেশিক বাণিজ্যের দিক থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে অনেকটাই সমান। তবে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির আকারে দুই দেশের চিত্র ভিন্ন। প্রায় ২৪ কোটি মানুষের নাইজেরিয়ার জিডিপি বর্তমানে ২৮৫ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের জিডিপি একই সময়ে ৪৫৬ বিলিয়ন ডলার বলে সরকারি হিসাব। পাকিস্তানও জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক কাঠামোর দিক থেকে বাংলাদেশের সমপর্যায়ের, প্রায় সাড়ে ২৫ কোটি জনসংখ্যার এই দেশের জিডিপি ৩৪০ বিলিয়ন ডলার। বৈদেশিক বাণিজ্যের আকারে দুই দেশের পার্থক্য কম, কিন্তু মাথাপিছু বিদ্যুৎ ব্যবহার পাকিস্তানকে বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে দিয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রায় দেড় দশকের শাসনামলে বাংলাদেশের জিডিপি এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক সূচক অতিরঞ্জিত বা ভুয়া পরিসংখ্যানের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে। এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণ ও উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরতে গিয়েই মূলত জিডিপির আকার ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হয়েছে। বিপরীতে প্রকৃত অবস্থা থেকে কম দেখানো হয়েছে মূল্যস্ফীতির হার। জিডিপির অতিরঞ্জিত এ আকার কেবল সরকারের জন্য বাড়তি ঋণ সুবিধাই সৃষ্টি করেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) চূড়ান্ত হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে দেশের জিডিপির আকার ছিল ৪৫৬ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে দেশী-বিদেশী উৎস থেকে সরকার ঋণ নেয় ২১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি। প্রতি ডলারের দর ১২২ টাকা হিসাবে সরকারের নেয়া এ ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৭৬ বিলিয়ন ডলার। সে অনুযায়ী বাংলাদেশের ডেট টু জিডিপি রেশিও বা ঋণ-জিডিপির অনুপাত ৩৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। তবে সরকারের এ ঋণের হিসাবে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর নেয়া ঋণের তথ্য যোগ করা হয়নি। সেটি যোগ করলে এর স্থিতি সাড়ে ২৩ লাখ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকে। দেশী-বিদেশী বিভিন্ন নথি এবং অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যমতে, বাংলাদেশের জিডিপির প্রকৃত আকার পাকিস্তান ও নাইজেরিয়ার সমপর্যায়ের। সেক্ষেত্রে দেশের জিডিপির আকার হতে পারে ৩০০ থেকে ৩৫০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে। কিন্তু গত দেড় দশকে এটিকে টেনে প্রকৃত পরিমাণের চেয়ে অন্তত ১০০ বিলিয়ন ডলার বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার যে শ্বেতপত্র কমিটি গঠন করেছিল, তাদের প্রতিবেদনে বিবিএসের ভুয়া তথ্যের বিষয়টি উঠে আসে। ওই সময় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস বহুবার অতিরঞ্জিত জিডিপির বিষয়টি বিশ্বমহলে তুলে ধরেছিলেন। একই সঙ্গে জিডিপির ভুয়া তথ্য সংশোধনের কথাও বলেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো সংস্কারমূলক পদক্ষেপ বাস্তবায়ন হয়নি। এখন জিডিপির হিসাব সংশোধন করলে ঋণ-জিডিপির অনুপাত ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে। এতে সরকারের ঋণ নেয়ার সক্ষমতা অনেক কমে যাবে। আর বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোও সরকারকে আর খুব বেশি ঋণ দিতে আগ্রহী হবে না। জিডিপির অতিরঞ্জিত পরিসংখ্যান তৈরিসহ গত দেড় দশকে অর্থনীতির মৌলিক সূচকগুলোর ভুয়া তথ্য ও জরিপ তৈরি করেছে বিবিএস। সরকারি এ সংস্থার কাঠামোগত সংস্কারে একটি স্বাধীন টাস্কফোর্সও গঠন করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। গত বছরের সেপ্টেম্বরে টাস্কফোর্সের পক্ষ থেকে বিবিএসের নাম পরিবর্তনসহ বেশ কিছু সুপারিশ করে প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়। বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান এর নেতৃত্বে কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সদস্য ছিলেন বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। জিডিপির ভুয়া পরিসংখ্যানসহ বিবিএস সংস্কারের বিষয়ে জানতে চাইলে ফাহমিদা খাতুন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জিডিপির আকার ও প্রবৃদ্ধির হিসাবের অতিরঞ্জিত তথ্য নিয়ে বহু বছর ধরেই আমরা প্রতিবাদ করে আসছি। বিবিএসের দেয়া মূল্যস্ফীতির তথ্যেও গোঁজামিল আছে। সংস্থাটির তথ্যের উৎস ও জরিপের পদ্ধতিতে কী ধরনের দুর্বলতা রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে সরকারের কাছে সুপারিশ দিয়েছি।’ টাস্কফোর্সের সুপারিশের ভিত্তিতে বিবিএসে কোনো পরিবর্তন দেখেন কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘বিবিএস মার্চের মূল্যস্ফীতির যে পরিসংখ্যান দিয়েছে, সেটি বিশ্বাসযোগ্য হয়নি। ইরানসহ মধ্যপ্রচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে বাজারে পণ্যের দাম বেড়েছে। সেবা নিতেও মানুষের হয়রানি ও ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু বিবিএস মূল্যস্ফীতি কমার তথ্য দিয়েছে। তাহলে মানুষ কীভাবে সংস্থাটির তথ্য বিশ্বাস করবে?’ বিগত সময়ে জিডিপির তথ্য ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানোর বিষয়টি বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরও তুলে ধরেছেন। ২৯ মার্চ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক মতবিনিময় সভায় অংশ নিয়ে বলেন, ‘অতীতের সরকারগুলো যেভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বা মোট জিডিপির পরিমাণ ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখিয়েছে, সেটার সংস্কার আমরা এরই মধ্যে শুরু করেছি। শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির মাধ্যমে আপনারা জেনেছেন যে অর্থনীতির প্রতিটি সেক্টরে কীভাবে তথ্যের কারচুপি হয়েছে। তাই জিডিপির প্রকৃত আকার যখন আমরা পাব, তখন করের সঙ্গে এর আনুপাতিক হারটিও বাস্তবসম্মত হবে।’ ‘কান্ট্রি ইকোনমিক মেমোরেন্ডাম: চেঞ্জ অব ফ্যাব্রিক’ শিরোনামে ২০২২ সালে বিশ্বব্যাংক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে ১৩০ দেশের তিন দশকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করা হয়। প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দেশের গড় প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশ বলা হলেও প্রকৃত হার ছিল ৪.২ শতাংশ। অর্থাৎ সরকারি হিসাবে ওই দশকে গড় প্রবৃদ্ধির হার বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে ২.৮ শতাংশীয় পয়েন্ট। প্রতিবেদনে যুক্ত ছিলেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের তৎকালীন মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘উন্নয়নের বয়ান তৈরির উদ্দেশ্যেই ওই সময় জিডিপির হিসাব ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হয়েছিল। উন্নয়নের কারণে মানুষের মাথাপিছু আয় বাড়ছে—এ ধরনের একটি তত্ত্ব সরকারের তরফ থেকে প্রচার করা হতো। ওই সময় জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে দেখালেও মূল্যস্ফীতি কমিয়ে দেখানো হয়েছে। এ কারণে প্রকৃত জিডিপির হিসাব বের করা এখন বেশ কঠিন।’ বণিক বার্তায় ২০২৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত ‘জিডিপির আকার ১০০ বিলিয়ন ডলার অতিরঞ্জিত হতে পারে’ প্রতিবেদনে বলা হয়, জিডিপির প্রকৃত পরিমাণ বের হলে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলোয়ও বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। উদাহরণ হিসেবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি ৩০০ বিলিয়ন ডলার হলে বিদেশী ঋণের অনুপাত বেড়ে দাঁড়াবে ২৯.৬৫ শতাংশ। মোট ঋণের ক্ষেত্রে অনুপাত ৩৬.৩০ থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ৪৪.৫৭ শতাংশে। মাথাপিছু জিডিপি কমে আসে প্রায় ২,০৪০ ডলার। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সমসাময়িক প্রতিযোগী অর্থনীতির তুলনায় বিনিয়োগ, রফতানি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, বিদেশী বিনিয়োগ ও ব্যবসার পরিবেশে বাংলাদেশ পিছিয়ে। স্যাটেলাইট ইমেজে আলোকছটা বিশ্লেষণেও দেশের অর্থনীতির প্রসারিত হওয়ার আলামত পাওয়া যায়নি। সিটি ব্যাংক ক্যাপিটাল রিসোর্সেসের ‘ম্যাক্রো ইকোনমিক আউটলুক ২০২৫’ প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিপরীতে উৎপাদনের হিসাব বাংলাদেশের জিডিপি বড় দেখানোর সঙ্গে অসঙ্গতি আছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকারি হিসাবের ঋণ-জিডিপি অনুপাত ৩৬ শতাংশের কিছু বেশি হলেও প্রকৃত জিডিপি হিসাব করলে তা ৫৫ শতাংশে পৌঁছতে পারে। ঋণ বৃদ্ধির চিত্রও উদ্বেগজনক। ২০০৯-১০ অর্থবছরে সরকারের মোট ঋণ ছিল ২ লাখ ৭৬ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক ও আর্থিক খাত থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার ঋণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংক ও আর্থিক খাত থেকে ইতোমধ্যে ৬২ হাজার ২৪৬ কোটি টাকার ঋণ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের সরকারি ঋণ নেয়ার প্রবৃদ্ধি ২৯.৬৬ শতাংশ, যেখানে বেসরকারি খাতের ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর ২০২৬ সালের জানুয়ারি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জাতীয় আয় বা জিডিপি-সংক্রান্ত পরিসংখ্যানকে ‘সি’ রেটিং দিয়েছে। বিশেষ করে ‘সাপ্লাই অ্যান্ড ইউজ টেবিল’ নিয়মিত হালনাগাদ না হওয়ায় উৎপাদনের প্রকৃত চিত্র উঠে আসছে না। তুলনায়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালয়েশিয়ার জিডিপি ২০২৫ সালে ৪৭০ বিলিয়ন ডলার, জনসংখ্যা ৩.৪২ কোটি। বাংলাদেশের সাথে জিডিপির আকারে পার্থক্য কম হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। মালয়েশিয়ার অর্থনীতি বৈচিত্র্যময়, স্থিতিশীল মূল্যস্ফীতি, শক্তিশালী বৈদেশিক রিজার্ভ, এবং সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের বৈশ্বিক হাব।
তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে বিদ্যুৎ সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে যশোর। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় শহর ও গ্রামজুড়ে বাড়ছে লোডশেডিং, ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ ও কৃষকরা। রোববার (৫ এপ্রিল) আকাশ মেঘলা থাকলেও আগের কয়েকদিন জেলার তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি ছিল। এই পরিস্থিতিতে প্রতিদিন শহরে ৪ থেকে ৫ বার বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও খারাপ বলে জানা গেছে। ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো)-এর যশোর বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জিএম মাহমুদ প্রধান জানান, দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা ৫৮ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ মিলছে মাত্র ৪৬ থেকে ৪৮ মেগাওয়াট। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১০ মেগাওয়াট ঘাটতি থাকছে এবং বাধ্য হয়ে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং করা হচ্ছে। অন্যদিকে, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন শার্শা, বেনাপোল, ঝিকরগাছা ও বাঘারপাড়া এলাকায় চাহিদা ১৫৬ মেগাওয়াটের বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে প্রায় ১০০ মেগাওয়াট। এতে গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে সেচ কার্যক্রমে। বিদ্যুৎ কর্মকর্তারা জানান, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাব দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে পড়েছে। গ্রীষ্মকালে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সংকট আরও প্রকট হয়েছে। এ কারণে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সরকার অফিস ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সময়সূচিতে পরিবর্তন এনেছে। স্থানীয় বাসিন্দা শিলা খাতুন বলেন, দিনে কয়েকবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে এবং ফিরে আসতে দীর্ঘ সময় লাগছে। এতে গরমে জীবনযাপন কষ্টকর হয়ে উঠেছে। রিকশাচালক ফারুক হোসেন বলেন, তীব্র রোদে কাজ করা কঠিন, তার ওপর লোডশেডিং পরিস্থিতি আরও অসহনীয় করে তুলেছে। চৌগাছার কৃষক শহিদুল ইসলাম জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় ইরি ধানে সেচ দিতে সমস্যা হচ্ছে। এতে ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, শনিবার জেলায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৮ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। খুলনা বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় গত কয়েকদিন ধরে তাপপ্রবাহ অব্যাহত রয়েছে।