সস্তার প্রোটিন দাতা, নাকি নদী-বিলের বাস্তুতন্ত্রের আন্তর্জাতিক ত্রাস? জাপানি রাজপ্রাসাদের উপহার থেকে মেসের ফ্রাইপ্যানে আসার পেছনে রয়েছে তেলাপিয়ার এক রোমাঞ্চকর ইতিহাস।
ঢাকার যেকোনো ব্যাচেলর মেস কিংবা সাধারণ মধ্যবিত্তের বাজারের থলেতে যে মাছটি সবচেয়ে বিশ্বস্ততার সঙ্গে জায়গা করে নেয়, তার নাম তেলাপিয়া। কাঁচাবাজারে ইলিশের দাম যখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে, আর রুই-কাতলা যখন বিশেষ কোনো উৎসবের খোরাক, তখন কম খরচে মেসের বাসিন্দা থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে তেলাপিয়ার জুড়ি মেলা ভার।
কিন্তু প্রতিদিনের পাতে থাকা এই সাধারণ চ্যাপ্টা মাছটির সঙ্গে যে জড়িয়ে আছে নীল নদের রাজকীয় আভিজাত্য, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বৈশ্বিক খাদ্যসংকট এবং আধুনিক জেনেটিক্সের রোমাঞ্চকর গল্প, তা গরম তেলে মাছভাজার ধোঁয়ায় অনেকটাই ঢাকা পড়ে যায়।
কীভাবে আফ্রিকার কাদামাটি থেকে যাত্রা শুরু করে তেলাপিয়া বিশ্ববাজারে জায়গা করে নিল, আর কেনই বা একইসঙ্গে এটি কোটি মানুষের খাদ্যনিরাপত্তার নায়ক এবং উন্মুক্ত জলাশয়ের বাস্তুতন্ত্রের চিহ্নিত ভিলেন হয়ে গেল?
তেলাপিয়ার আদি নিবাস মূলত আফ্রিকা মহাদেশ ও মধ্যপ্রাচ্যের নীল নদ অববাহিকা। প্রাচীন মিশরীয় প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা এবং নীল নদের উপকূলীয় সমাধিগাত্রের দেয়ালচিত্র থেকে জানা যায়, আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগেই এই মাছ মিশরীয়দের খাদ্য ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
কায়রো ও লুক্সরের প্রাচীন সমাধিফলকে আঁকা চিত্রে তেলাপিয়াকে ‘ইন্ত’ নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রাচীন মিশরীয়রা বিশ্বাস করত, এই মাছ সৃষ্টির দেবতা ‘রা’-এর সূর্যতরী পাহারা দেয়। তাই তৎকালীন সমাজে তেলাপিয়াকে উর্বরতা ও পুনর্জন্মের প্রতীক হিসেবে দেখা হতো।
মাছটির এই আধ্যাত্মিক সুনামের পেছনে অবশ্য রয়েছে একটি নিখাদ জীববৈজ্ঞানিক কারণ। জীববিজ্ঞানের পরিভাষায় তেলাপিয়া হলো মুখে পোনা আগলে রাখা মাছ বা মাউথব্রুডার। মা তেলাপিয়া ডিম ফুটে বের হওয়া সদ্যোজাত পোনাগুলোকে বিপদের সময় নিজের মুখের ভেতর লুকিয়ে রাখে। চারপাশ নিরাপদ মনে হলে আবার মুখ খুলে পোনাগুলোকে বের করে দেয়।
পানির নিচের এই বৈজ্ঞানিক আচরণের ব্যাখ্যা না বুঝে প্রাচীন মিশরীয়রা ভাবত, মাছটি বুঝি মুখ থেকেই অলৌকিকভাবে নতুন জীবনের জন্ম দিচ্ছে।
মিশরীয় লোকগাথি পেরিয়ে তেলাপিয়ার প্রবেশ ঘটে বাইবেলের পাতাতেও।
নিউ টেস্টামেন্টের ঐতিহাসিক বিবরণ ও মধ্যপ্রাচ্যের মৎস্যবিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুসারে, গ্যালিলি সাগরে প্রেরিত সেন্ট পিটার বড়শিতে যে মাছটি ধরেছিলেন এবং যিশু খ্রিষ্ট যে মাছ দিয়ে হাজারো ক্ষুধার্ত মানুষের পেট ভরিয়েছিলেন বলে ধর্মগ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে, তা মূলত তেলাপিয়া গোত্রের মাছ।
এই ঐতিহাসিক সূত্র ধরেই পশ্চিমা বিশ্বে তেলাপিয়াকে অনেক জায়গায় ‘সেন্ট পিটারের মাছ’ নামেও খাবার টেবিলে পরিবেশন করা হয়।
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত তেলাপিয়া মূলত আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বুনো জলাশয়েই সীমাবদ্ধ ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তীব্র খাদ্যসংকট এর ভাগ্য বদলে দেয়।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ঐতিহাসিক মৎস্যবিষয়ক গবেষণা নথি অনুযায়ী, যুদ্ধের পর বিশ্বজুড়ে প্রোটিনের ঘাটতি দেখা দিলে গবেষকেরা এমন একটি জলজ প্রাণীর সন্ধান করছিলেন, যা প্রতিকূল পরিবেশেও দ্রুত বংশবৃদ্ধি করতে পারে এবং সস্তা খাবারেও বেঁচে থাকতে পারে।
আফ্রিকার খনি শ্রমিকদের কম খরচে পুষ্টি জোগাতে ঔপনিবেশিক শাসকেরা যে মাছের কৃত্রিম চাষের পরীক্ষা চালিয়েছিল, সেটিই পরে আন্তর্জাতিক ত্রাণ ও টেকসই উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) আওতায় এশিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
তবে আধুনিক তেলাপিয়া চাষের ইতিহাসে বড় মোড় আসে ১৯৬৫ সালে।
থাইল্যান্ডের মৎস্য বিভাগ ও সে দেশের রাজকীয় নথি অনুযায়ী, ওই বছরের মার্চে জাপানের তৎকালীন যুবরাজ এবং পরবর্তী সম্রাট আকিহিতো থাইল্যান্ড সফর করেন। খ্যাতিমান মৎস্যবিজ্ঞানী ও সম্রাট আকিহিতো থাইল্যান্ডের রাজা নবম ভূমিবল অতুল্যতেজকে ৫০টি নীল নদের তেলাপিয়া উপহার দেন।
রাজা ভূমিবল ব্যাংককের রাজপ্রাসাদের পুকুরে মাছগুলোর নিবিড় প্রজনন করান। দ্রুত বৃদ্ধি ও পুষ্টিগুণে মুগ্ধ হয়ে তিনি মাছটির নাম দেন ‘প্লা নিল’, যার অর্থ থাই ভাষায় নীল নদের মাছ। পরে থাই রাজপ্রাসাদ থেকে এই মাছের পোনা সারা দেশের গ্রামীণ কৃষকদের মধ্যে বিনা মূল্যে বিতরণ করা হয়।
থাইল্যান্ডের সেই রাজকীয় পুকুর থেকেই মূলত এশিয়াজুড়ে আধুনিক নাইল তেলাপিয়া চাষের বিস্তার শুরু হয়।
বাংলাদেশে তেলাপিয়ার আগমনও খুব একটা মসৃণ ছিল না।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ও সরকারি মৎস্য অধিদপ্তরের নথি অনুযায়ী, ১৯৫৪ সালে জাতিসংঘের সহায়তায় থাইল্যান্ড থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রথম আনা হয় মোজাম্বিক তেলাপিয়া।
কিন্তু এই মাছ বাঙালি ভোজনরসিকদের মন জয় করতে পারেনি। ছোট আকার, কালচে রং এবং পুকুরে ছাড়ার পর নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ডিম পেড়ে জলাশয় অপরিপক্ব ছোট মাছে ভরে ফেলার কারণে চাষিরা একে কার্যত পুকুরের আগাছা মনে করতেন।
এরপর ১৯৭৪ সালে সরাসরি থাইল্যান্ড থেকে উন্নত জাতের নাইল তেলাপিয়া আমদানি করা হয়। তবে বাংলাদেশের তেলাপিয়া চাষে বড় বিপ্লব আসে নব্বইয়ের দশকে।
ফিলিপাইনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশ্ব মাছ গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন দেশ থেকে সংগৃহীত তেলাপিয়ার বুনো ও খামারি জাতের মধ্যে কৃত্রিম প্রজনন ঘটিয়ে তৈরি করা হয় দ্রুত বর্ধনশীল একটি বিশেষ জাত। এর নাম জিনগতভাবে উন্নত খামারি তেলাপিয়া, সংক্ষেপে ‘গিফট’ জাত।
১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট এই বিশেষ জাত দেশে নিয়ে আসে এবং বাংলাদেশের আবহাওয়ার উপযোগী করে তোলে। সাধারণ জাতের তুলনায় এটি প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ দ্রুত বাড়ে।
এর পর যুক্ত হয় আধুনিক মৎস্যবিজ্ঞানের আরেক গুরুত্বপূর্ণ কৌশল—পুরুষ তেলাপিয়া বা মনোসেক্স চাষ।
গবেষণায় দেখা যায়, সাধারণ পুকুরে পুরুষ ও স্ত্রী তেলাপিয়া একসঙ্গে থাকলে তারা খাবার খেয়ে বড় হওয়ার চেয়ে বংশবৃদ্ধি ও প্রতিযোগিতায় বেশি শক্তি ব্যয় করে। তাছাড়া পুরুষ তেলাপিয়া স্ত্রী মাছের তুলনায় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ দ্রুত বাড়ে এবং ওজনে ভারী হয়।
এই সমস্যা এড়াতে কৃত্রিম হ্যাচারিতে ডিম ফোটার পরপরই রেণু পোনাকে বিশেষ খাদ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পুরুষ তেলাপিয়ায় রূপান্তর করা হয়। এভাবে মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষের ফলে মাত্র চার থেকে পাঁচ মাসে প্রতিটি মাছ ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রামের বাণিজ্যিক ওজনে পৌঁছাতে পারে।
এই দ্রুত বর্ধনশীল জাত ও মনোসেক্স চাষপদ্ধতির ওপর ভর করেই বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ তেলাপিয়া উৎপাদনকারী দেশগুলোর কাতারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
পুষ্টি ও অর্থনীতির দিক থেকে তেলাপিয়া যদি উন্নয়নশীল বিশ্বের খাদ্যনিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হয়, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের বিচারে এর বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকাও দীর্ঘ।
আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থার বৈশ্বিক আক্রমণাত্মক প্রজাতি তথ্যভাণ্ডারে মোজাম্বিক তেলাপিয়াকে বিশ্বের একশত শীর্ষ ক্ষতিকর আক্রমণাত্মক প্রজাতির একটি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
বন্যা বা অসাবধানতার কারণে কোনো বদ্ধ খামার থেকে তেলাপিয়া প্রাকৃতিক নদী, হাওর কিংবা উন্মুক্ত বিলে ছড়িয়ে পড়লে তা স্থানীয় জলজ পরিবেশের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। আন্তর্জাতিক মৎস্য ও পরিবেশবিজ্ঞানবিষয়ক গবেষণা সাময়িকীগুলোর তথ্য থেকে কয়েকটি ঝুঁকির কথা জানা যায়।
প্রথমত, মাউথব্রুডিং স্বভাবের কারণে তেলাপিয়ার ডিম ও পোনা প্রাকৃতিক শিকারিদের হাত থেকে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সুরক্ষা পায়। বিপরীতে রুই, কাতলা, মলা, ঢেলা বা খলসের মতো দেশি মাছের ডিম খোলা পানিতে থাকায় সেগুলোর বড় অংশ অন্য মাছের খাদ্যে পরিণত হয় বা নষ্ট হয়ে যায়। ফলে অনুকূল পরিবেশে তেলাপিয়া দ্রুত সংখ্যায় বাড়তে পারে এবং উন্মুক্ত জলাশয়ে দেশি মাছের সঙ্গে খাদ্য ও জায়গার প্রতিযোগিতা তৈরি করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, যুক্তরাজ্যের মাছ জীববিজ্ঞানবিষয়ক একটি জার্নালের গবেষণায় দেখা যায়, প্রজনন মৌসুমে পুরুষ তেলাপিয়া জলাশয়ের তলদেশের কাদা খুঁড়ে বড় বড় বৃত্তাকার গর্ত তৈরি করে। এতে পানির নিচের শেকড়যুক্ত জলজ ঘাস ও গাছপালা উপড়ে যেতে পারে। এসব উদ্ভিদ ছিল অন্যান্য দেশি মাছের ডিম পাড়ার ও আশ্রয়ের জায়গা।
তৃতীয়ত, তলদেশের মাটি ক্রমাগত আলোড়িত হলে কাদার নিচে জমে থাকা বিভিন্ন খনিজ উপাদান পানিতে মিশতে পারে। এর ফলে ক্ষতিকর শেওলার অতিরিক্ত বৃদ্ধি ঘটতে পারে, যা পানির দ্রবীভূত অক্সিজেন কমিয়ে দেশি মাছের জন্য প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
চতুর্থত, আন্তর্জাতিক জৈব আক্রমণবিষয়ক গবেষণা সাময়িকীর তথ্য অনুযায়ী, সর্বভুক তেলাপিয়া পানির ক্ষুদ্র উদ্ভিদ, পোকামাকড় ও তলদেশের নানা খাদ্য উপাদান খায়। ফলে স্থানীয় প্রজাতির মাছের সঙ্গে খাবারের জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে।
তাহলে দিন শেষে তেলাপিয়া আমাদের কাছে কী?
প্রকৃতপক্ষে, তেলাপিয়া নিজের ইচ্ছায় নীল নদ ছেড়ে আমাদের পুকুরে আসেনি। মানুষই পেটের তাগিদ ও বাণিজ্যিক লাভের আশায় একে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততার এই সময়ে, যখন অন্যান্য মাছের চাষ কঠিন হয়ে পড়ছে, তেলাপিয়ার চরম সহনশীলতা কোটি মানুষের পুষ্টির জোগান নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তাই তেলাপিয়াকে এক কথায় নায়ক বা ভিলেন বলা কঠিন। মানুষের নিয়ন্ত্রিত পুকুরে এটি সস্তা ও সহজলভ্য প্রোটিনের উৎস। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উন্মুক্ত জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়লে একই মাছ স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
কয়েকটি বিদেশি দূতাবাসে ই-মেইলের মাধ্যমে হুমকির খবর পাওয়ার পর রাজধানীর কূটনৈতিক এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করেছে পুলিশ। বারিধারা ও গুলশানে অবস্থিত দূতাবাসগুলোতে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। পাশাপাশি পোশাকধারী ও সাদা পোশাকে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন, চেকপোস্ট ও টহল জোরদারের পাশাপাশি কুইক রেসপন্স টিমও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। হুমকির ঘটনাটি তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)। রোববার (২৩ আগস্ট) বিকেলে ডিপ্লোমেটিক সিকিউরিটি বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) আবু খায়ের গণমাধ্যমকে এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, এ ঘটনায় পুলিশের কাছে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি। তবে হুমকির খবর পাওয়ার পর নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে কূটনৈতিক এলাকায় মনিটরিং ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়ানো হয়েছে। আবু খায়ের বলেন, চীনা দূতাবাস কর্তৃপক্ষ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পুলিশ সদর দপ্তরকে বিষয়টি জানিয়েছে। পরে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজমসহ সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকে বিষয়টি জানানো হয়। এরপর সিটিটিসি এ ঘটনা তদন্ত করছে। তিনি বলেন, বিষয়টি জানার পর আগের তুলনায় নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে চেকপোস্ট, টহল এবং দূতাবাসগুলোর সামনে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি কুইক রেসপন্স টিমগুলোকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, কূটনৈতিক এলাকায় সবসময়ই সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে। কোনো ধরনের ঘটনা বা বার্তা পাওয়া গেলে তা লিখিত কিংবা মৌখিক—যেভাবেই আসুক, তৎপরতা বাড়ানো পুলিশের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ। এ ঘটনায় আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। এর আগে রোববার সকালে ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, দূতাবাসগুলোতে চাঁদা দাবি করে হুমকি দেওয়ার ঘটনায় যারা নেপথ্যে রয়েছে, তাদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। তিনি জানান, ঢাকার তিন-চারটি বিদেশি দূতাবাস ও কয়েকটি সরকারি দপ্তরেও একই ধরনের হুমকি দেওয়া হয়েছে। শত্রুতাবশত এবং দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করতেই এ ধরনের অপতৎপরতা চালানো হচ্ছে বলে ধারণা করছে পুলিশ।
বিভিন্ন দূতাবাস ও সরকারি দপ্তরে ইমেইলের মাধ্যমে চাঁদা দাবি করে একটি প্রতারক চক্র হুমকি দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম। কূটনীতিকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতেই চক্রটি এমন কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে বলে জানান তিনি। রোববার (২৩ আগস্ট) বেলা সাড়ে ১১টায় ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান তিনি। ডিবিপ্রধান বলেন, ‘সম্প্রতি এমন হয়ে আসছে, এটা নিয়ে আমরা কাজ করতেছি। ওরা মেইল করে হুমকি দিচ্ছে। তারা যে বিকাশ নম্বরগুলো দিয়েছে তিন-চারজনকে নিয়ে এসেছিলাম জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। তারা কিছুই জানে না।’ ডিএমপির ডিবিপ্রধান বলেন, ‘তারা দুটো মেইল করেছে। মেইল করে বিকাশ নম্বর দিয়েছে। বিকাশ নম্বরগুলো যাদের, তারা সম্পূর্ণ নিরীহ লোক। তারা এ ব্যাপারে কোনো কিছুই জানে না। তবে সম্প্রতি ঢাকায় চিকিৎসকদের ওপর হামলা ও চাঁদাবাজির ঘটনায় জড়িতদের সঙ্গে দূতাবাসে হুমকি দেওয়ার ঘটনায় কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছেন ডিবিপ্রধান। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার আরও বলেন, ‘তিন-চারটা দূতাবাস এবং কয়েকটা সরকারি দপ্তরে অভিযোগ দিয়েছে।’ তিনি বলেন, চক্রটি কয়েকটি ক্ষেত্রে অল্প পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে। তবে বড় ধরনের কোনো সাফল্য তারা পায়নি। এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরও তিন-চারজন গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছে। তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার ব্যাপারে পুলিশ আশাবাদী। ডিবিপ্রধান আরও বলেন, চক্রটির বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চলছে। তাদের বিরুদ্ধে দেশের অন্য কোনো থানায় আগের মামলা রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এখন পর্যন্ত অন্য কোনো থানায় মামলা পাওয়ার তথ্য নেই। ধারণা করা হচ্ছে, তারা নতুন করে এ ধরনের প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড শুরু করেছে।
বন্ধ কলকারখানা চালুসহ অর্থনীতি চাঙা করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিল ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই তহবিলের মাধ্যমে নতুন করে ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের আশা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি আদালতে বিচারাধীন মামলা বহাল রাখলে তাদের প্রণোদনা বা নীতিসহায়তা দেওয়া যাবে না। কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (ফাইন্যান্স কোম্পানি) গ্রাহক সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে করা রিট পিটিশনসহ যেকোনো মামলা প্রত্যাহার করলেই কেবল নীতিসহায়তার আবেদন বিবেচনা করা যাবে। আগে ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রেও একই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। ফলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান উভয় গ্রাহকদের জন্য এখন একই ধরনের নির্দেশনা প্রযোজ্য হবে। সম্প্রতি এ–সংক্রান্ত আলাদা আলাদা নির্দেশনা জারি করা হয়। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা পুনর্গঠন, আর্থিক খাত কাঙ্ক্ষিত অবস্থায় ফিরিয়ে আনা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের আওতায় ব্যাংক–বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে ঋণগ্রহীতাদের প্রণোদনা ও নীতিসহায়তা দেওয়া হচ্ছে। তবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, কোনো কোনো গ্রাহক এক বা একাধিক সুবিধা গ্রহণ করলেও সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট ফাইন্যান্স কোম্পানির বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা বা রিট পিটিশন অব্যাহত রেখেছেন। এতে আর্থিক খাতে অপ্রয়োজনীয় মামলাজট তৈরি হচ্ছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, মামলাজট নিরসনে এখন থেকে অনিষ্পন্ন মামলা প্রত্যাহারের শর্তে গ্রাহকের প্রণোদনা প্যাকেজ বা যেকোনো নীতিসহায়তার আবেদন বিবেচনা করা যাবে। এ ছাড়া আরও কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে। তাতে বলা হয়েছে, গ্রাহকের আবেদন পর্যালোচনার পর ফাইন্যান্স কোম্পানি নীতিগত সম্মতি দিলে গ্রাহককে আগে মামলা প্রত্যাহারের ব্যবস্থা নিতে হবে। মামলা প্রত্যাহারের পর প্রত্যাহার করা মামলার তালিকাসহ একটি হলফনামা জমা দিতে হবে। এতে স্পষ্ট থাকতে হবে যে ‘সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ফাইন্যান্স কোম্পানির বিরুদ্ধে দায়ের করা কোনো মামলা অনিষ্পন্ন নেই’। গ্রাহক থেকে হলফনামা পাওয়ার পর ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলো গ্রাহকের সুবিধার্থে দেওয়া নীতিসহায়তা বা প্রণোদনার শর্ত পরিবর্তন করতে পারবে না। নীতিগত সম্মতির আলোকেই এসব সুবিধা বাস্তবায়ন করতে হবে।