চলতি আগস্টের প্রথম ২২ দিনে দেশে ২১৪ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসী। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ধরে স্থানীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ ২৬ হাজার ৪২০ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
রোববার (২৩ আগস্ট) এ তথ্য জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি আগস্টের ২২ দিনে রেমিট্যান্স প্রবাহে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৫ সালের ১-২২ আগস্ট দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ১৭১ কোটি ১০ লাখ ডলার। আর চলতি বছরে একই সময়ে এসেছে ২১৪ কোটি ৮০ লাখ ডলার। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে এবার রেমিট্যান্স বেড়েছে ৪৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার বা প্রায় ২৫ দশমিক ৫২ শতাংশ।
এদিকে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২২ আগস্ট পর্যন্ত দেশে মোট ৫০০ কোটি ৬০ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ৪১৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে অর্থবছরের শুরু থেকে ২২ আগস্ট পর্যন্ত রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে ৮১ কোটি ৮০ লাখ ডলার বা ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ।
ব্যাংকারদের মতে, বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রবাসীদের আগ্রহ বৃদ্ধি, ব্যাংকিং সেবার সহজলভ্যতা এবং রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রক্রিয়া আরও সহজ হওয়ায় দেশে প্রবাসী আয় বাড়ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে সামনের দিনগুলোতে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
বাংলাদেশ প্রস্তাবিত তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের রিগ্যাসিফিকেশন সেবার জন্য একটি চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে বর্তমানে পরিশোধিত ব্যয়ের চেয়ে ৩৫ থেকে ৩৭ শতাংশ বেশি ফি দিতে যাচ্ছে। মহেশখালীর কুতুবজোমে ৬০০ থেকে ৭৫০ এমএমসিএফডি ক্ষমতার অফশোর এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের জন্য চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিএনইই) বিল্ড-ওন-অপারেট (বিওও) মডেলের অধীনে ১৫ বছর মেয়াদি চুক্তিতে দৈনিক ৩ লাখ ৪২ হাজার ডলার ফি নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে। বিওও কাঠামোর কারণে টার্মিনালের মালিকানা অনির্দিষ্টকালের জন্য এই চীনা প্রতিষ্ঠানের হাতেই থেকে যাবে, যেখানে পূর্ববর্তী প্রস্তাবিত চুক্তিগুলো মূলত বিল্ড-ওন-অপারেট-ট্রান্সফার (বিওওটি) মডেলে করা হয়েছিল এবং নির্দিষ্ট সময় শেষে পেট্রোবাংলাকে বিনামূল্যে টার্মিনালের মালিকানা হস্তান্তরের শর্ত যুক্ত ছিল। বর্তমান বাজার ব্যবস্থার সাথে তুলনা করলে দেখা যায়, সিএনইই-র দাবি করা ফি এক্সিলারেট এনার্জির দৈনিক ২ লাখ ৫৪ হাজার ডলার এবং সামিট এলএনজি টার্মিনালের ২ লাখ ৪৯ হাজার ১১৫ ডলার ফির তুলনায় বহুগুণ বেশি। এই প্রস্তাবিত ফি এক্সিলারেটের তুলনায় প্রায় ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশ এবং সামিটের তুলনায় প্রায় ৩৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। এমনকি ২০২৪ সালের মার্চে সামিটের বাতিল হওয়া দ্বিতীয় এফএসআরইউর জন্য বিওওটি মডেলে পেট্রোবাংলা যে দৈনিক ৩ লাখ ডলারের ফি নির্ধারণ করেছিল, নতুন এই বিওও চুক্তির প্রস্তাবিত চার্জ তার চেয়েও অনেক বেশি। এছাড়া রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) ২০২৫ সালের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় সুপারিশকৃত দৈনিক ২ লাখ ৩৯ হাজার ৬৫৩ ডলারের বেঞ্চমার্ক হারের চেয়েও চীনা কোম্পানিটির প্রস্তাবিত ফি অনেক উপরে। সামিটের বাতিল হওয়া দ্বিতীয় এলএনজি টার্মিনাল প্রকল্পটি বিওওটি মডেলে বাস্তবায়নের কথা ছিল। দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সামিট চুক্তিটি পুনর্বহালের অনুরোধ জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তাদের প্রস্তাবিত প্রকল্প চালু হলে ১৫ বছর পর ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিট (এফএসআরইউ), মুরিং ব্যবস্থা এবং সাবসি পাইপলাইনের মালিকানা বিনা মূল্যে পেট্রোবাংলার কাছে হস্তান্তর করা যেত। পেট্রোবাংলায় পাঠানো সাম্প্রতিক চিঠিতে দৈনিক ফির পার্থক্য তুলে ধরে সামিট জানিয়েছে, শুধু এ খাতেই ১৫ বছরে ২৩ কোটি মার্কিন ডলার সাশ্রয় সম্ভব। এদিকে, দরকষাকষির বিভিন্ন ধাপে সিএনইই তাদের প্রাথমিক চাওয়া ৩ লাখ ৫৪ হাজার ১৭৪ ডলার থেকে কিছুটা কমিয়ে আনে। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আবদুল মান্নানের নেতৃত্বাধীন ৭ সদস্যের দরকষাকষি কমিটি সরকারের কাছে বিওও মডেলে ১৫ বছর মেয়াদে দৈনিক ৩ লাখ ৪২ হাজার ডলার অথবা ২০ বছর মেয়াদে ৩ লাখ ২৯ হাজার ডলার ফি গ্রহণের সুপারিশ তুলে ধরেছে, যার মোট বাধ্যবাধকতার আর্থিক মূল্য দাঁড়াবে প্রায় ১২ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে যুদ্ধ ও জাহাজ নির্মাণ সামগ্রীর চড়া দামের অজুহাত দেখিয়ে সিএনইই বিওও মডেলে এই বাড়তি দাম চাইলেও নিরপেক্ষ পর্যালোচনা ছাড়া এমন বিওও বা বিওওটি সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া ঠিক হবে না বলে মন্তব্য করেছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। কোনো প্রতিযোগিতা ছাড়া সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে বিওও ভিত্তিতে এই বিশাল চুক্তি সম্পন্ন করা এবং অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও মাত্র ১৮ মাসের মধ্যে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় এই সিদ্ধান্ত পুনরায় ভেবে দেখার তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে কাতার এনার্জি ২০২৬ সালের জন্য নির্ধারিত এলএনজি সরবরাহ অর্ধেক কমিয়ে দেওয়ায় দেশে জ্বালানি সংকট চরমে পৌঁছেছে, যার ফলে বাংলাদেশকে চড়া দামে স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস কিনতে হচ্ছে এবং চলতি অর্থবছরে এলএনজি ভর্তুকি বেড়ে ৪০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাবে বলে প্রাক্কলন করা হচ্ছে।
গ্রামীণ ঋণগ্রহীতাদের বেশিরভাগের আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ চলে যাচ্ছে ঋণের কিস্তি পরিশোধে। কিস্তি পরিশোধে আয়ের ৪০ শতাংশের বেশি ব্যয় করেন এমন ঋণগ্রহীতার হার এক বছরে ২২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪১ শতাংশ হয়েছে। সবচেয়ে দরিদ্র এক-পঞ্চমাংশ ঋণগ্রহীতার ক্ষেত্রে এ হার ৭৯ শতাংশ। কিস্তি পরিশোধ ও জরুরি খরচ মেটাতে অনেক পরিবারকে আবার মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে। এতে গ্রামীণ পরিবারগুলোর ঋণনির্ভরতা বাড়লেও কৃষিতে অর্থায়নের অংশ কমছে। সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) ও আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইএফপিআরআই) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের খাদ্যব্যবস্থায় অর্থায়ন : প্রমাণ ও নীতিসংলাপ’ শীর্ষক কর্মশালায় উপস্থাপিত গবেষণায় এসব তথ্য উঠে আসে। এতে বক্তব্য দেন পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের, বিআইডিএসের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. একে এনামুল হক, ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রক সংস্থার (এমআরএ) নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খান প্রমুখ। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে ঋণ নেওয়া গ্রামীণ পরিবারের হার ৩৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪২ শতাংশ হয়েছে। অথচ মোট গ্রামীণ ঋণে কৃষির অংশ ২৫ শতাংশ থেকে কমে ১৬ শতাংশে নেমেছে। অর্থাৎ গ্রামীণ পরিবারে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বাড়লেও কৃষি খাতে ঋণের অংশ কমছে। গ্রামীণ ঋণের প্রায় ৭৫ শতাংশ আসছে এনজিও ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান থেকে। ঋণ পরিশোধের চাপের পাশাপাশি এক ঋণ শোধ করতে আরেক ঋণ নেওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে। এনজিও থেকে ঋণ নেওয়া পরিবারগুলোর মধ্যে একই সঙ্গে মহাজনের কাছ থেকেও ঋণ নেওয়ার হার ২৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৯ শতাংশ হয়েছে। এতে ঋণ পরিশোধের দায় মেটাতে গিয়ে পরিবারগুলো আরও ব্যয়বহুল ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। কর্মশালায় বক্তারা বলেন, কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থায় অর্থায়নকে শুধু ঋণ বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। কৃষি উপকরণ সরবরাহ, উৎপাদন, সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণ- পুরো ব্যবস্থায় অর্থায়নের সুযোগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে কৃষকের আয় ও উৎপাদন মৌসুমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঋণের কিস্তি নির্ধারণ করা জরুরি। পিকেএসএফের এমডি ফজলুল কাদের বলেন, খাদ্যব্যবস্থায় অর্থায়নের ক্ষেত্রে শুধু উৎপাদন পর্যায়ে ঋণ দিলেই হবে না; সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন ধাপেও বিনিয়োগ প্রয়োজন। কৃষিতে উৎপাদন খরচ কমাতে এবং মূল্য সংযোজন বাড়াতে পরিবেশবান্ধব কৃষিপদ্ধতি ও কার্যকর অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ। বিআইডিএসের মহাপরিচালক এনামুল হক বলেন, ক্ষুদ্র কৃষকের অর্থায়নের ক্ষেত্রে ঝুঁকি ভাগাভাগির ব্যবস্থা জরুরি। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা না গেলে কৃষকের ঋণের বোঝা বাড়তে পারে এবং অনেকে কৃষি ছেড়ে দিতে পারেন। এমআরএ’র নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, ক্ষুদ্রঋণ খাতের অর্থায়ন ও সেবামূল্যের বিষয়টি নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তার উপস্থাপনায় বলা হয়, ক্ষুদ্রঋণ খাতের সঞ্চিত উদ্বৃত্ত ২০০৬ সালের ৩ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৬৯ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বর্তমানে সর্বোচ্চ সেবামূল্য ২৪ শতাংশ। ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বেশি সঞ্চয় সংগ্রহ করতে পারলে অর্থায়নের খরচ ও সেবামূল্য কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি পরিবারের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়েও গবেষণা প্রয়োজন। কৃষি সচিব সেলিম খান কৃষির যান্ত্রিকীকরণে অর্থায়নের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি তুলে ধরেন। গবেষণায় দেখা গেছে, দুই শতাংশেরও কম কৃষক পরিবারের নিজস্ব ট্রাক্টর বা পাওয়ার টিলার রয়েছে। কৃষিযন্ত্র কেনার অর্থের মাত্র ২ থেকে ৭ শতাংশ ব্যাংক থেকে আসে। ফলে অনেক উদ্যোক্তাকে যন্ত্র বিক্রেতাদের কাছ থেকে কিস্তিতে যন্ত্র কিনতে হয়। কৃষিযন্ত্রের আয়ও মৌসুমনির্ভর। বিশেষ করে ধান কাটার মৌসুমে এপ্রিল ও মে মাসে আয়ের বড় অংশ আসে। কিন্তু মাসিক কিস্তি পরিশোধের বাধ্যবাধকতা থাকায় বছরের অন্য সময়ে অর্থসংকট তৈরি হয়। গবেষণায় বলা হয়েছে, গবাদিপশু খাতেও অর্থায়নের ঘাটতি রয়েছে। দেশের কৃষি জিডিপির ৭ দশমিক ৬ শতাংশ আসে এ খাত থেকে এবং ৯০ শতাংশ গবাদিপশুর মালিক ক্ষুদ্র কৃষক। অথচ কৃষিঋণের ৫ শতাংশেরও কম এ খাতে যায়। গবেষণায় গরু মোটাতাজাকরণে ছয় মাসে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ মুনাফার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। এ খাতে ঝুঁকি ভাগাভাগিভিত্তিক অর্থায়ন কৃষকের অংশগ্রহণ বাড়াতে পারে কি-না, তা নিয়েও গবেষণা হয়েছে। কর্মশালায় আলোচকরা মনে করেন, কৃষকের আয় ও উৎপাদন মৌসুমের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিস্তি, কৃষিযন্ত্র কেনায় সহজ অর্থায়ন এবং ঝুঁকি ভাগাভাগির কার্যকর ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। ঋণ পরিশোধে আয়ের বড় অংশ ব্যয় করতে হলে পরিবারের দৈনন্দিন চাহিদা মেটানো ও উৎপাদনে নতুন করে বিনিয়োগের সুযোগ সংকুচিত হয়। তাই শুধু ঋণের প্রবাহ বাড়ানো নয়, ঋণের শর্ত ও অর্থায়নের কাঠামোও পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
পুঁজিবাজারে সম্ভাব্য ইনসাইডার ট্রেডিং ও শেয়ারের দর কারসাজির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। খুলনা পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (কেপিসিএল), ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার লেনদেন তদন্তের আওতায় এসেছে। গত ৭ অক্টোবর জারি করা সংশোধিত নির্দেশনায় বিএসইসি জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট লেনদেনে ইউনাইটেড গ্রুপের চিফ অ্যাডভাইজার হাসান মাহমুদ রাজা এবং ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের (ইউইসিএল) চেয়ারম্যান মঈনউদ্দিন হাসান রশিদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো সম্পৃক্ততা ছিল কি না, তা যাচাই করা হবে। বিএসইসির পরিচালক মোহাম্মদ শামসুর রহমানকে আহ্বায়ক করে গঠিত তদন্ত কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন যুগ্ম পরিচালক জিয়াউর রহমান ও সহকারী পরিচালক আলী আহসান। কমিটিকে সংশোধিত আদেশ জারির দিন থেকে ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। কমিশনের মার্কেট ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টের পরিদর্শন ও তদন্ত শাখা থেকে এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এতে পুঁজিবাজারের স্বচ্ছতা, শৃঙ্খলা এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় অভিযোগগুলো বিস্তারিত অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়। জানা গেছে, এম এম হাবিবুল্লাহ ও নুরুজ্জামান জিন্নাহর দাখিল করা অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, অন্য ব্যক্তির নামে খোলা বেনামি বিও ও ট্রেডিং অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে প্রকৃত মালিকানা আড়াল করা হয়েছে। এসব হিসাবের মাধ্যমে বেআইনি ইনসাইডার ট্রেডিং ও শেয়ারের দর প্রভাবিত করার ঘটনা ঘটেছে কি না, তা অনুসন্ধান করবে কমিশন। তদন্তের অংশ হিসেবে ইউনাইটেড পাওয়ার, সংশ্লিষ্ট সহযোগী প্রতিষ্ঠান, মালিকানা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রাসঙ্গিক ব্যাংক হিসাব, বিও ও ট্রেডিং অ্যাকাউন্ট পরীক্ষা করা হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সহযোগী ও নিকটাত্মীয়দের হিসাবও প্রয়োজন অনুযায়ী যাচাইয়ের আওতায় আসতে পারে। এসব হিসাবের প্রকৃত মালিক, নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তি এবং লেনদেন থেকে সুবিধা পাওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেবে তদন্ত কমিটি। এ ছাড়া শেয়ার কেনার অর্থের উৎস, ব্যাংকিং লেনদেনের গতিপথ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কোনো সন্দেহজনক অর্থ স্থানান্তর হয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা হবে। শেয়ার লেনদেন থেকে পাওয়া নগদ লভ্যাংশ ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধার চূড়ান্ত প্রাপক কারা, সেটিও অনুসন্ধানের আওতায় থাকবে। কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, সন্দেহভাজন বিও অ্যাকাউন্টে থাকা শেয়ারের প্রকৃত মালিকানা এবং এসব হিসাব পরিচালনার ক্ষমতা কার হাতে ছিল, তা যাচাই করা হবে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান জটিল আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে প্রকৃত সুবিধাভোগীর পরিচয় গোপন করেছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তে কেপিসিএল ও ইউনাইটেড পাওয়ারসহ সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দর কৃত্রিমভাবে বাড়ানো, প্রতারণামূলক লেনদেন বা সংঘবদ্ধ বাজার কারসাজির কোনো ঘটনা ঘটেছে কি না, তা গুরুত্ব পাবে। একই সঙ্গে অপ্রকাশিত মূল্যসংবেদনশীল তথ্য (পিএসআই) ব্যবহার করে শেয়ার কেনাবেচা করা হয়েছে কি না, সংশ্লিষ্ট তথ্য কার কাছে ছিল এবং কীভাবে তা বিনিময় হয়েছে, সেসব বিষয়ও পর্যালোচনা করবে কমিটি। তদন্তের আওতায় হাসান মাহমুদ রাজা ও মঈনউদ্দিন হাসান রশিদের পাশাপাশি অভিযোগকারী এম এম হাবিবুল্লাহ ও নুরুজ্জামান জিন্নাহসহ সংশ্লিষ্ট অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আইনবহির্ভূত সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শুধু ব্যক্তি বা কোম্পানি নয়, সংশ্লিষ্ট ব্রোকারেজ হাউস, মার্চেন্ট ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক, সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) এবং অন্যান্য আর্থিক মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের ভূমিকাও তদন্তে পর্যালোচনা করা হবে। বিশেষ করে হিসাব খোলা, শেয়ার কেনাবেচার নির্দেশ বাস্তবায়ন, লভ্যাংশ প্রদান ও অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম, অবহেলা কিংবা সহযোগিতার প্রমাণ পাওয়া যায় কি না, তা খতিয়ে দেখবে তদন্ত দল। সিকিউরিটিজ আইন, ইনসাইডার ট্রেডিং নিষিদ্ধকরণ বিধিমালা এবং প্রকৃত সুবিধাভোগীর মালিকানা গোপনসংক্রান্ত বিধিবিধান লঙ্ঘিত হয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করাই তদন্তের অন্যতম উদ্দেশ্য। বিএসইসির নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, নির্ধারিত তদন্তের বিষয়গুলোর বাইরে সংশ্লিষ্ট অনিয়মের নতুন কোনো তথ্য বা প্রমাণ পাওয়া গেলে সেগুলোও তদন্তের আওতায় আনা যাবে। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণের ভিত্তিতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়তে পারে।