কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন কারাগারে মারা যান গত শনিবার সকালে। এই খবর জানার পরই ঠাকুরগাঁওয়ে তার বাসায় ছুটে যান জেলার সদর আসনে বিএনপির প্রার্থী ও দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। কিছুক্ষণ পরই রমেশ চন্দ্র সেনের বাসভবনে সমবেদনা জানাতে দেখা যায় জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেনকেও।
আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে বিএনপি ও জামায়াত—দুই দলের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর ছুটে যাওয়ার এই ঘটনা রাজনৈতিকভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ।
কারণ বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে দুই দলই টার্গেট করছে আওয়ামী লীগের ভোট।
শুধু ঠাকুরগাঁও জেলায় নয়, বরং সারা দেশেই দুই দলের নেতারা আওয়ামী লীগের ভোট টানার চেষ্টা করছেন। যদিও আওয়ামী লীগ বলছে, ভোট বর্জনের কথা। কিন্তু এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সাধারণ ভোটাররা কতটা অংশ নেবেন, অংশ নিলে তাদের সমর্থন কোন দলের দিকে যাবে—এমন নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সবখানে।
আবার আওয়ামী লীগের ভোটাররা আদৌ ভোট দিতে যাবেন কি না, সেটাও একটা বড় প্রশ্ন।
নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোটাররা ভোট দিতে গেলে সেটা যেমন ভোটার অংশগ্রহণের হার বাড়াবে, তেমনই আবার ভোট দিতে না গেলে ভোটের হার কমেও যেতে পারে বলে অনেকে মনে করেন।
আওয়ামী লীগের ভোট কত?
আওয়ামী লীগের এখন কার্যক্রম নিষিদ্ধ। দলটির নেতারা ছত্রভঙ্গ।
যদিও দলটির বড় সমর্থকগোষ্ঠী আছে বলেই সব সময় মনে করা হয়। কিন্তু ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর দলটির ‘বড় সমর্থকগোষ্ঠী’ কতটা অবশিষ্ট আছে তা স্পষ্ট নয়।
ভোটারদের মধ্যেও দলটির সমর্থন কতটা আছে সেটাও একটা প্রশ্ন। এর সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর নেই, কারণ তথ্য নেই। তবে এখানে একটু ইতিহাসের দিকে তাকানো যায়।
নির্বাচন কমিশনের হিসেবে আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ ভোট ছিল ১৯৭৩ সালে ৭৩ শতাংশ। কিন্তু এর পরের নির্বাচনেই, ১৯৭৯ সালে দলটির ভোট সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে যায়। সেটা হচ্ছে ২৪ শতাংশ। এরপর ১৯৮৬ সালে ২৬ শতাংশ, ১৯৯১ সালে ৩০ শতাংশ, ১৯৯৬ সালে ৩৭ শতাংশ, ২০০১ সালে ৪০ শতাংশ এবং ২০০৮ সালে ৪৮ শতাংশ ভোট পায় আওয়ামী লীগ। অর্থাৎ একবার পড়ে যাওয়ার পর দলটির ভোট ক্রমান্বয়ে আবার বেড়েছে।
তবে ২০২৬ সালে এসে বির্পযস্ত আওয়ামী লীগের ভোটের হার কেমন হতে পারে সেটা বুঝতে ১৯৭৯ সালের নির্বাচন একটা গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হতে পারে। সেই নির্বাচনের চার বছর আগেই আওয়ামী লীগের প্রধান নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। তখনো দলটি বির্পযস্ত অবস্থার মোকাবিলা করছিল। তবে দলটির নেতারা দেশেই ছিলেন।
১৯৭৯ সালের সেই নির্বাচনে বিপর্যস্ত অবস্থায় আওয়ামী লীগ ভোট পায় দলটির ইতিহাসের সর্বনিম্ন ২৪ শতাংশ। তবে এবারো যে আওয়ামী লীগের সমর্থন ২৪ বা ২৫ শতাংশই হবে তেমনটা নাও হতে পারে।
বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, আওয়ামী লীগের ভোট ২০ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যেই থাকতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনীতি বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন বলেন, ‘আওয়ামী লীগের জনসমর্থন কমেছে নাকি বেড়েছে তা নিয়ে নানা জরিপ হয়েছে। কিন্তু এই সংখ্যাটা জরিপের ওপর নির্ভর করছে না। আমার কাছে মনে হয়, এটা দেখতে গেলে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সুযোগ দিতে হতো। আমি যদি তাদের ভোট ৩০ শতাংশও ধরি, তাহলে এই সংখ্যক ভোটারকে নির্বাচনের বাইরে রাখলে সেটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে না।’
ভোট নিয়ে আওয়ামী লীগ এবং ভোটাররা কী বলছেন?
সারা দেশে যখন নির্বাচনের আমেজ, রাজনৈতিক দলগুলো ইতোমধ্যে ভোটের প্রচারণা শেষ করে ফেলেছে, তখন নির্বাচনের বাইরে থাকা কাযক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ মূলত সামাজিক মাধ্যমে ভোট বর্জনের প্রচারণা করছে। দলীয় পেজগুলোয় এবং সমর্থকদের আইডিগুলোতে লেখা হচ্ছে, ‘নো বোট, নো ভোট’ অর্থাৎ ‘নৌকা নেই, ভোটও নেই’।
এর মধ্যেই তিন দিন আগে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় তার ফেসবুক পেজে এক বক্তব্যে জানিয়েছেন, তার ভাষায়, এটি ‘একটি সাজানো নির্বাচন’ যেখানে আওয়ামী লীগকে বাইরে রাখা হয়েছে। এই নির্বাচনে ‘ভোট দিয়ে কোনো লাভ নেই’ মন্তব্য করে তিনি ভোট বর্জনের আহ্বান জানান।
তবে ভোট দিতে যাওয়া না যাওয়া নিয়ে আওয়ামী লীগ করেন বা সাধারণ ভোটারদের মধ্যে নানা প্রতিক্রিয়া আছে।
ঢাকার বাইরে আওয়ামী লীগের একটি জেলার উপজেলা কমিটিতে আছেন, এমন একজন ব্যক্তি আহসান হাবিব (এটা তার ছদ্মনাম)। তিনি নাম-পরিচয় গোপন রাখার শর্তে কথা বলেন বিবিসি বাংলার সঙ্গে।
তিনি বলেন, “আমি তো ভোট দিতে যাবই না। আমার পরিবারের কেউই যাবে না। অনেকে মনে করতে পারেন যে, গিয়ে হয়তো ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিতে পারি। আসলে সেটাও দেব না।”
কিন্তু ভোট না দিলে কী লাভ—এমন প্রশ্নে পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক সেই নেতা জানান, এতে ভোটের হার কমে যাবে। ‘এখানে লাভ হলো, প্রথমত, এটা নেত্রীর নির্দেশ। দ্বিতীয় হচ্ছে, আমরা যদি ভোট দিতে না যাই, তাহলে ভোটের হার কম হবে। ভোটের হার যদি কম হয়, তাহলে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না, বিশ্বাসযোগ্য হবে না।’ এই ব্যক্তির কথায় দুটি বিষয় স্পষ্ট—
এক. নির্বাচন যে হচ্ছে, দলটির তৃণমূল সেটা মেনে নিয়েছে। এর আগে অনেকেই বিশ্বাস করতেন, নির্বাচন হবে না।
দুই. যেহেতু নির্বাচন হয়ে যাবে বলেই মনে করছে, সেহেতু এখন চেষ্টা হচ্ছে ভোট বর্জন করে ভোটার উপস্থিতি কম রাখা।
বিভিন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোটের হার
তবে আওয়ামী লীগ ভোট বর্জনের আহ্বান করলেও দলটির জন্য মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বেশ কঠিন। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের কমিটিতে নেই কিন্তু দলটির সাধারণ সমর্থক এমন ভোটারদের কেউ কেউ বলছেন, তারা ভোট দিতে যাবেন। এরকমই একজনের সঙ্গে কথা হয় বিবিসি বাংলার। তিনিও পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি।
‘পরিবার থেকে ওই আতঙ্কটা সবসময় বিরাজ করে যে, আমরা তো আওয়ামী পরিবার। এখন আমরা যদি ভোট দিতে না যাই, তাহলে আক্রান্ত হবো। আমাদেরকে চিহ্নিত করে রাখা হবে। আসলে ভোট দিতে যেতে হবে ভয়ে। ভয়টাই মূল কারণ। আমাকে তো বাঁচতে হবে। আমার তো দুর্নীতির টাকা নেই যে অন্য নেতাদের মতো দেশ থেকে পালিয়ে যেতে পারবো।’
একই রকম পরিস্থিতির কথা জানান, একটি জেলার উপজেলা কমিটির সদস্য আহসান হাবিব। তিনি অবশ্য দুটি কারণ উল্লেখ করেন।
এক. আওয়ামী লীগ ফিরে আসতে পারবে কি-না তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে অনেকের মধ্যে। ফলে তারা ‘যেকোনো একটা সাইডে (দলে)’ চলে যাচ্ছে।
দুই. ব্যবসা-বাণিজ্যসহ এলাকায় টিকে থাকার চেষ্টায় অনেক সমর্থক কোনো না কোনো দলে ভিড়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।দলগুলো থেকেও ভোট দিতে যাওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের ভোট ‘গেম চেঞ্জার’?
নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোট তিনটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এক. আওয়ামী লীগের ভোটাররা অংশ নিচ্ছেন কি-না সেটা ভোটের হার কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়ার পেছনে ভূমিকা রাখবে।
দুই. আওয়ামী লীগের ভোটাররা নির্দিষ্ট কোনো দলের দিকে ঝুঁকে গেলে সেটা জয়-পরাজয়ে বড় ভূমিকা রাখবে।
তিন. আওয়ামী ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে না যাওয়া সত্ত্বেও যদি ভোটের হার বেশি হয় এবং অংশগ্রহণমূলক হয় তাহলে সেটাও আওয়ামী লীগের জন্য নতুন বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সাব্বির আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, আওয়ামী লীগের ভোটাররা কী করেন তার ওপর নির্ভর করছে অনেক কিছু। ‘আমি যদি গড়ে ধরি যে আওয়ামী লীগরে ৩০ শতাংশ ভোট আছে, তাহলে এর বড় অংশটাই ভোট দিতে যাবে না। পাঁচ থেকে ১০ শতাংশ ভোটার হয়তো যেতে পারে। এর বেশি হবে বলে মনে হয় না।’
তবে এই নির্দিষ্ট সংখ্যক ভোটারও যদি নির্দিষ্ট কোনো দলকে ভোট দিয়ে বসে তাহলে সেটা সেই দলের বিজয় নিশ্চিত করবে বলে মনে করেন তিনি।
যদিও এভাবে ‘দলবদ্ধভাবে ভোট দেওয়ার প্রবণতা’ ঘটবে না বলেই তিনি মনে করেন, ‘দলের কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে যদি বলে দেওয়া হয় যে, তোমরা বিএনপিকে ভোট দাও। তাহলে হয়তো দলে দলে সেই ভোট নির্দিষ্ট দলের দিকে যাবে। কিন্তু আমার মনে হয় না এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত আওয়ামী লীগ নিয়েছে বা নেবে। তারা ভোট বর্জনের কথাই বলছে।’
আওয়ামী লীগ বলছে, তাদের ছাড়া নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে না। যদিও অভ্যুত্থানের পক্ষে থাকা বিএনপি-জামায়াতসহ অন্যান্য দলগুলো বলছে, নির্বাচন ভোটাররা অংশ নিতে পারলে সেটাই অংশগ্রহণমূলক ভোট হবে।
এমনকি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও অনেকে অংশগ্রহণমূলক ভোট বলতে ভোটের হার এবং নারী-পুরুষ, ধর্মীয় জনগোষ্ঠীসহ সব ধরনের ভোটারের উপস্থিতির কথা বলেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যদি সব ধরনের ভোটার ভোট দিতে না আসেন, অর্থাৎ ভোটের হার যদি সন্তোষজনক না হয় তাহলে কী হবে?
সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘এটা একটা বৈধতার সংকট হিসেবে সমালোচনা হবে। বৈধতার প্রশ্নটা উঠবে। বৈধতাটা যতটা না আইনি প্রশ্ন তার চেয়ে বেশি নৈতিক।’
কিন্তু যদি আবার সবধরনের ভোটার ভোট দিতে যান এবং ভোটের হারও অন্তত ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কিংবা তারও বেশি হয় তাহলে সেটা আবার আওয়ামী লীগের জন্য আরেকটি রাজনৈতিক বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।
কারণ সেক্ষেত্রে আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাই শুধু নয়, একইসঙ্গে এতে অভ্যুত্থানের প্রতি সমর্থনও নতুন করে স্পষ্ট হবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
ফলে বৃহস্পতিবারের নির্বাচন যে শুধু বিএনপি-জামায়াতের লড়াই তা নয়, একইসঙ্গে এখানে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যতও নির্ভর করছে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংঘটিত এজাহারভুক্ত হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ও মিরাজ হোসেন পলাতক রয়েছেন। ব্যাংক প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খুনের শিকার কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুল হালিম ছিলেন কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেনের নাম রয়েছে। তারা বর্তমানে নিজেদের সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। ব্যাংক সূত্রে গেছে, তারা চাঁদাবাজি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এসব আসামিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেন। এতে আরও যুক্ত রয়েছেন ডিজিএম সৈয়দ লিয়াকত হোসেন, হাবিব উন নবী, ডিএমডি খালেকুজ্জামান জুয়েল ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে আব্দুল হালিমের মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক সজীব কুমার সিং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জানান, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাত ১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান। হালিমের ছেলে ফয়সাল বলেন, তার বাবা ২০১৪ সাল থেকে কৃষি ব্যাংক সিবিএর সভাপতি ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গত নভেম্বরেই মতিঝিল থানায় একটি জিডি (নং ০৫/১১/২০২৪ - ৩৩৫) করেছিলেন তার বাবা। তিনি আরও বলেন, বুধবার রাতে আমার বাবাকে তার অফিসের সহকর্মীরা মারধর করে হত্যা করেছে। সিবিএর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জানান, ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হই। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট বিনা নির্বাচনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে আমাদের অফিস দখল করে নেয় ফয়েজ ও মিরাজ। এ নিয়ে মামলা চলছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা অস্থায়ী জামিনে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন—যাদের মধ্যে আছেন ড্রাইভার সাইফুল, শাহেদ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মেহেদী ও অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনার সিরাজ। এদিকে, মামলার ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের প্রধান মহাব্যবস্থাপক জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। কারণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য না করার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে কেন্দ্র দখল বা নাশকতার যে কোনো অপচেষ্টার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক একেএম শহিদুর রহমান। বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত লালমাটিয়া মহিলা কলেজ ও রাজধানী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র পরিদর্শন শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। র্যাব মহাপরিচালক বলেন, যারা জাল ভোট দেওয়ার চেষ্টা করবে, কেন্দ্র দখলের অপচেষ্টা চালাবে কিংবা ফলাফল মেনে না নিয়ে নাশকতায় জড়াবে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নির্ভয়ে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেন। এদিকে নির্বাচন নির্বিঘ্ন করতে রাজধানীজুড়ে নেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। বিভিন্ন মোড়ে রোবাস্ট ও ফুট পেট্রোলিং জোরদার করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞা থাকায় মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচলে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। উপযুক্ত কারণ দেখাতে না পারলে যানবাহন জব্দ করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, নির্দিষ্ট কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি না থাকলেও সম্ভাব্য নাশকতা প্রতিরোধে সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। রাজধানীর অলিগলি ও প্রধান সড়কে বিজিবি টহল দিচ্ছে। পিকআপ ও সাজোয়াঁ যান (এপিসি) নিয়ে সাইরেন বাজিয়ে টহল কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। সেনাবাহিনীও মাঠে রয়েছে এবং নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় দায়িত্ব পালন করছে। বিস্ফোরক ও আগ্নেয়াস্ত্র পরিবহন ঠেকাতে বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি অব্যাহত রয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আজ (১১ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচন কমিশন এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। ইসি সূত্র জানায়, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ভাষণ রেকর্ড করা হয়েছে। বুধবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতারসহ দেশের সব বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ও রেডিওতে একযোগে এটি সম্প্রচার করা হবে। ধারণা করা হচ্ছে, ভাষণে সিইসি নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি সম্পর্কে দেশবাসীকে অবহিত করবেন। একই সঙ্গে ভোটারদের নিরাপদে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগের আহ্বান জানাবেন। এছাড়া নির্বাচনী সামগ্রী বিতরণ, ৪২ হাজার ৬৫৯টি ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ৯ লাখ ৫৮ হাজার সদস্য মোতায়েন, ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন এবং ড্রোন নজরদারির মাধ্যমে সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়ও ভাষণে উঠে আসবে। ভাষণে নির্বাচন কমিশন একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে তাদের দৃঢ় অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করবেন। উল্লেখ্য, গত বছরের ১১ ডিসেম্বর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে সিইসি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করেছিলেন।
গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রংপুর বিভাগে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে ৬ স্তরের নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে পুলিশ। ভোটকেন্দ্রগুলোতে গোয়েন্দা পুলিশের নজরদারির পাশাপাশি ব্যবহার করা হবে পুলিশের বডিওর্ন ক্যামেরা। রংপুর বিভাগের ৩৩টি সংসদীয় আসনে এক কোটি ৩৪ লাখ ৫৪ হাজার ৪৫৬ ভোটারের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে ৪ হাজার ৫৪৬টি ভোটকেন্দ্র। এর মধ্যে ২ হাজার ৫৬১টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে প্রশাসন। এসবের মধ্যে ৮২৭টি কেন্দ্রকে ধরা হয়েছে অতিঝুঁকিপূর্ণ। চরাঞ্চল, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এলাকা এবং কোনো কোনো প্রার্থীর বাড়ির কাছাকাছি কেন্দ্রগুলোতে বাড়তি সতর্কতা নেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের বিভিন্ন সূত্র জানায়, এসব কেন্দ্রে অতীতে ভোটকেন্দ্র দখল, সংঘর্ষ, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ছিল। সে কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, অতিরিক্ত অস্ত্রধারী পুলিশ ও আনসার সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে। পাশাপাশি ভিজিলেন্স টিম ও স্ট্রাইকিং ফোর্স কাজ করবে। রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি আমিনুল ইসলাম বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবে পুলিশ। প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন থাকবে এবং পুলিশ সদস্যদের শরীরে থাকা বডিওর্ন ক্যামেরার লাইভ মনিটরিং করা হবে ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে। এদিকে জেলা পুলিশ সুপার মারুফাত হুসাইন জানান, জেলার আওতাধীন ৬৬৯টি কেন্দ্রে পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকায় মোবাইল টিম, স্ট্রাইকিং ফোর্স, সাব-সেক্টর ও সেক্টর ভাগ করে ভোটার, প্রার্থী ও নির্বাচনি সরঞ্জামের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। ৩১৫টি কেন্দ্রে পুলিশের কাছে থাকবে বডিওর্ন ক্যামেরা। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনে পুলিশ ছাড়াও সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব, আনসারসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দায়িত্ব পালন করবে। রংপুর জেলায় মোট ৮৭৩টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৬৬৯টি জেলা পুলিশের আওতাধীন এবং এসব কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। রংপুর জেলায় ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র ২১৬টি রংপুর জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনে ৮৭৩টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ২১৬টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রংপুর সিটি করপোরেশন এলাকায় ১২১টি এবং আট উপজেলায় ৯৫টি কেন্দ্র রয়েছে। ভোটার সংখ্যা বেশি, অতীতে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর, সীমানা প্রাচীর না থাকা, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বাড়ির নিকটবর্তী কেন্দ্র এবং দূরবর্তী ও জনবহুল এলাকা—এসব বিবেচনায় কেন্দ্রগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক জানান, ছয়টি আসনে মোট ভোটার ২৫ লাখ ৯৯ হাজার ২০২ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ১৩ লাখ ৬ হাজার ৩৩৩ জন, পুরুষ ভোটার ১২ লাখ ৯২ হাজার ৮৩৮ জন এবং হিজড়া ভোটার ৩১ জন। মোট ৪ হাজার ৯৮৮টি বুথে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে ৪৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। প্রস্তুত সেনাবাহিনীর কমান্ডো গ্রুপ নির্বাচনের দিন যেকোনো ধরনের উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় রংপুরে প্রস্তুত রয়েছে সেনাবাহিনীর ৬৬ পদাতিক ডিভিশনের কমান্ডো গ্রুপ। প্রত্যন্ত এলাকায় প্রয়োজন হলে হেলি ড্রপের মাধ্যমে তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করবে। চার জেলায় ৩ হাজার বিজিবি সদস্য মোতায়েন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধা—এই চার জেলায় ৩ হাজার বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ২৬টি বেজ ক্যাম্পে ৭৪ প্লাটুন বিজিবি মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে কাজ করছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে বিশেষ নজরদারির পাশাপাশি তল্লাশি কার্যক্রম, ডগ স্কোয়াড, টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর পাশাপাশি র্যাব, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীও নির্বাচনি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাঠে কাজ করছে।