কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন কারাগারে মারা যান গত শনিবার সকালে। এই খবর জানার পরই ঠাকুরগাঁওয়ে তার বাসায় ছুটে যান জেলার সদর আসনে বিএনপির প্রার্থী ও দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। কিছুক্ষণ পরই রমেশ চন্দ্র সেনের বাসভবনে সমবেদনা জানাতে দেখা যায় জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেনকেও।
আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে বিএনপি ও জামায়াত—দুই দলের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর ছুটে যাওয়ার এই ঘটনা রাজনৈতিকভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ।
কারণ বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে দুই দলই টার্গেট করছে আওয়ামী লীগের ভোট।
শুধু ঠাকুরগাঁও জেলায় নয়, বরং সারা দেশেই দুই দলের নেতারা আওয়ামী লীগের ভোট টানার চেষ্টা করছেন। যদিও আওয়ামী লীগ বলছে, ভোট বর্জনের কথা। কিন্তু এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সাধারণ ভোটাররা কতটা অংশ নেবেন, অংশ নিলে তাদের সমর্থন কোন দলের দিকে যাবে—এমন নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সবখানে।
আবার আওয়ামী লীগের ভোটাররা আদৌ ভোট দিতে যাবেন কি না, সেটাও একটা বড় প্রশ্ন।
নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোটাররা ভোট দিতে গেলে সেটা যেমন ভোটার অংশগ্রহণের হার বাড়াবে, তেমনই আবার ভোট দিতে না গেলে ভোটের হার কমেও যেতে পারে বলে অনেকে মনে করেন।
আওয়ামী লীগের ভোট কত?
আওয়ামী লীগের এখন কার্যক্রম নিষিদ্ধ। দলটির নেতারা ছত্রভঙ্গ।
যদিও দলটির বড় সমর্থকগোষ্ঠী আছে বলেই সব সময় মনে করা হয়। কিন্তু ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর দলটির ‘বড় সমর্থকগোষ্ঠী’ কতটা অবশিষ্ট আছে তা স্পষ্ট নয়।
ভোটারদের মধ্যেও দলটির সমর্থন কতটা আছে সেটাও একটা প্রশ্ন। এর সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর নেই, কারণ তথ্য নেই। তবে এখানে একটু ইতিহাসের দিকে তাকানো যায়।
নির্বাচন কমিশনের হিসেবে আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ ভোট ছিল ১৯৭৩ সালে ৭৩ শতাংশ। কিন্তু এর পরের নির্বাচনেই, ১৯৭৯ সালে দলটির ভোট সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে যায়। সেটা হচ্ছে ২৪ শতাংশ। এরপর ১৯৮৬ সালে ২৬ শতাংশ, ১৯৯১ সালে ৩০ শতাংশ, ১৯৯৬ সালে ৩৭ শতাংশ, ২০০১ সালে ৪০ শতাংশ এবং ২০০৮ সালে ৪৮ শতাংশ ভোট পায় আওয়ামী লীগ। অর্থাৎ একবার পড়ে যাওয়ার পর দলটির ভোট ক্রমান্বয়ে আবার বেড়েছে।
তবে ২০২৬ সালে এসে বির্পযস্ত আওয়ামী লীগের ভোটের হার কেমন হতে পারে সেটা বুঝতে ১৯৭৯ সালের নির্বাচন একটা গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হতে পারে। সেই নির্বাচনের চার বছর আগেই আওয়ামী লীগের প্রধান নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। তখনো দলটি বির্পযস্ত অবস্থার মোকাবিলা করছিল। তবে দলটির নেতারা দেশেই ছিলেন।
১৯৭৯ সালের সেই নির্বাচনে বিপর্যস্ত অবস্থায় আওয়ামী লীগ ভোট পায় দলটির ইতিহাসের সর্বনিম্ন ২৪ শতাংশ। তবে এবারো যে আওয়ামী লীগের সমর্থন ২৪ বা ২৫ শতাংশই হবে তেমনটা নাও হতে পারে।
বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, আওয়ামী লীগের ভোট ২০ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যেই থাকতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনীতি বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন বলেন, ‘আওয়ামী লীগের জনসমর্থন কমেছে নাকি বেড়েছে তা নিয়ে নানা জরিপ হয়েছে। কিন্তু এই সংখ্যাটা জরিপের ওপর নির্ভর করছে না। আমার কাছে মনে হয়, এটা দেখতে গেলে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সুযোগ দিতে হতো। আমি যদি তাদের ভোট ৩০ শতাংশও ধরি, তাহলে এই সংখ্যক ভোটারকে নির্বাচনের বাইরে রাখলে সেটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে না।’
ভোট নিয়ে আওয়ামী লীগ এবং ভোটাররা কী বলছেন?
সারা দেশে যখন নির্বাচনের আমেজ, রাজনৈতিক দলগুলো ইতোমধ্যে ভোটের প্রচারণা শেষ করে ফেলেছে, তখন নির্বাচনের বাইরে থাকা কাযক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ মূলত সামাজিক মাধ্যমে ভোট বর্জনের প্রচারণা করছে। দলীয় পেজগুলোয় এবং সমর্থকদের আইডিগুলোতে লেখা হচ্ছে, ‘নো বোট, নো ভোট’ অর্থাৎ ‘নৌকা নেই, ভোটও নেই’।
এর মধ্যেই তিন দিন আগে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় তার ফেসবুক পেজে এক বক্তব্যে জানিয়েছেন, তার ভাষায়, এটি ‘একটি সাজানো নির্বাচন’ যেখানে আওয়ামী লীগকে বাইরে রাখা হয়েছে। এই নির্বাচনে ‘ভোট দিয়ে কোনো লাভ নেই’ মন্তব্য করে তিনি ভোট বর্জনের আহ্বান জানান।
তবে ভোট দিতে যাওয়া না যাওয়া নিয়ে আওয়ামী লীগ করেন বা সাধারণ ভোটারদের মধ্যে নানা প্রতিক্রিয়া আছে।
ঢাকার বাইরে আওয়ামী লীগের একটি জেলার উপজেলা কমিটিতে আছেন, এমন একজন ব্যক্তি আহসান হাবিব (এটা তার ছদ্মনাম)। তিনি নাম-পরিচয় গোপন রাখার শর্তে কথা বলেন বিবিসি বাংলার সঙ্গে।
তিনি বলেন, “আমি তো ভোট দিতে যাবই না। আমার পরিবারের কেউই যাবে না। অনেকে মনে করতে পারেন যে, গিয়ে হয়তো ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিতে পারি। আসলে সেটাও দেব না।”
কিন্তু ভোট না দিলে কী লাভ—এমন প্রশ্নে পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক সেই নেতা জানান, এতে ভোটের হার কমে যাবে। ‘এখানে লাভ হলো, প্রথমত, এটা নেত্রীর নির্দেশ। দ্বিতীয় হচ্ছে, আমরা যদি ভোট দিতে না যাই, তাহলে ভোটের হার কম হবে। ভোটের হার যদি কম হয়, তাহলে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না, বিশ্বাসযোগ্য হবে না।’ এই ব্যক্তির কথায় দুটি বিষয় স্পষ্ট—
এক. নির্বাচন যে হচ্ছে, দলটির তৃণমূল সেটা মেনে নিয়েছে। এর আগে অনেকেই বিশ্বাস করতেন, নির্বাচন হবে না।
দুই. যেহেতু নির্বাচন হয়ে যাবে বলেই মনে করছে, সেহেতু এখন চেষ্টা হচ্ছে ভোট বর্জন করে ভোটার উপস্থিতি কম রাখা।
বিভিন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোটের হার
তবে আওয়ামী লীগ ভোট বর্জনের আহ্বান করলেও দলটির জন্য মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বেশ কঠিন। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের কমিটিতে নেই কিন্তু দলটির সাধারণ সমর্থক এমন ভোটারদের কেউ কেউ বলছেন, তারা ভোট দিতে যাবেন। এরকমই একজনের সঙ্গে কথা হয় বিবিসি বাংলার। তিনিও পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি।
‘পরিবার থেকে ওই আতঙ্কটা সবসময় বিরাজ করে যে, আমরা তো আওয়ামী পরিবার। এখন আমরা যদি ভোট দিতে না যাই, তাহলে আক্রান্ত হবো। আমাদেরকে চিহ্নিত করে রাখা হবে। আসলে ভোট দিতে যেতে হবে ভয়ে। ভয়টাই মূল কারণ। আমাকে তো বাঁচতে হবে। আমার তো দুর্নীতির টাকা নেই যে অন্য নেতাদের মতো দেশ থেকে পালিয়ে যেতে পারবো।’
একই রকম পরিস্থিতির কথা জানান, একটি জেলার উপজেলা কমিটির সদস্য আহসান হাবিব। তিনি অবশ্য দুটি কারণ উল্লেখ করেন।
এক. আওয়ামী লীগ ফিরে আসতে পারবে কি-না তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে অনেকের মধ্যে। ফলে তারা ‘যেকোনো একটা সাইডে (দলে)’ চলে যাচ্ছে।
দুই. ব্যবসা-বাণিজ্যসহ এলাকায় টিকে থাকার চেষ্টায় অনেক সমর্থক কোনো না কোনো দলে ভিড়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।দলগুলো থেকেও ভোট দিতে যাওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের ভোট ‘গেম চেঞ্জার’?
নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোট তিনটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এক. আওয়ামী লীগের ভোটাররা অংশ নিচ্ছেন কি-না সেটা ভোটের হার কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়ার পেছনে ভূমিকা রাখবে।
দুই. আওয়ামী লীগের ভোটাররা নির্দিষ্ট কোনো দলের দিকে ঝুঁকে গেলে সেটা জয়-পরাজয়ে বড় ভূমিকা রাখবে।
তিন. আওয়ামী ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে না যাওয়া সত্ত্বেও যদি ভোটের হার বেশি হয় এবং অংশগ্রহণমূলক হয় তাহলে সেটাও আওয়ামী লীগের জন্য নতুন বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সাব্বির আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, আওয়ামী লীগের ভোটাররা কী করেন তার ওপর নির্ভর করছে অনেক কিছু। ‘আমি যদি গড়ে ধরি যে আওয়ামী লীগরে ৩০ শতাংশ ভোট আছে, তাহলে এর বড় অংশটাই ভোট দিতে যাবে না। পাঁচ থেকে ১০ শতাংশ ভোটার হয়তো যেতে পারে। এর বেশি হবে বলে মনে হয় না।’
তবে এই নির্দিষ্ট সংখ্যক ভোটারও যদি নির্দিষ্ট কোনো দলকে ভোট দিয়ে বসে তাহলে সেটা সেই দলের বিজয় নিশ্চিত করবে বলে মনে করেন তিনি।
যদিও এভাবে ‘দলবদ্ধভাবে ভোট দেওয়ার প্রবণতা’ ঘটবে না বলেই তিনি মনে করেন, ‘দলের কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে যদি বলে দেওয়া হয় যে, তোমরা বিএনপিকে ভোট দাও। তাহলে হয়তো দলে দলে সেই ভোট নির্দিষ্ট দলের দিকে যাবে। কিন্তু আমার মনে হয় না এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত আওয়ামী লীগ নিয়েছে বা নেবে। তারা ভোট বর্জনের কথাই বলছে।’
আওয়ামী লীগ বলছে, তাদের ছাড়া নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে না। যদিও অভ্যুত্থানের পক্ষে থাকা বিএনপি-জামায়াতসহ অন্যান্য দলগুলো বলছে, নির্বাচন ভোটাররা অংশ নিতে পারলে সেটাই অংশগ্রহণমূলক ভোট হবে।
এমনকি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও অনেকে অংশগ্রহণমূলক ভোট বলতে ভোটের হার এবং নারী-পুরুষ, ধর্মীয় জনগোষ্ঠীসহ সব ধরনের ভোটারের উপস্থিতির কথা বলেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যদি সব ধরনের ভোটার ভোট দিতে না আসেন, অর্থাৎ ভোটের হার যদি সন্তোষজনক না হয় তাহলে কী হবে?
সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘এটা একটা বৈধতার সংকট হিসেবে সমালোচনা হবে। বৈধতার প্রশ্নটা উঠবে। বৈধতাটা যতটা না আইনি প্রশ্ন তার চেয়ে বেশি নৈতিক।’
কিন্তু যদি আবার সবধরনের ভোটার ভোট দিতে যান এবং ভোটের হারও অন্তত ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কিংবা তারও বেশি হয় তাহলে সেটা আবার আওয়ামী লীগের জন্য আরেকটি রাজনৈতিক বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।
কারণ সেক্ষেত্রে আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাই শুধু নয়, একইসঙ্গে এতে অভ্যুত্থানের প্রতি সমর্থনও নতুন করে স্পষ্ট হবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
ফলে বৃহস্পতিবারের নির্বাচন যে শুধু বিএনপি-জামায়াতের লড়াই তা নয়, একইসঙ্গে এখানে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যতও নির্ভর করছে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘জনগণের অর্থ কোনোভাবেই বিদেশে পাচার হতে দেয়া হবে না; বরং তা জনগণের কল্যাণ ও জীবনমান উন্নয়নে ব্যয় করা হবে।’ বুধবার (১৭ জুন) দুপুরে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণ শেষে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি বলেছেন, ‘অনেকেই নানা কথা ও বিভ্রান্ত ছড়াতে চায়। এরা বলে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের টাকা কোথা থেকে আসবে? আপনাদের সবাইকে সাক্ষী রেখে তাদের উদ্দেশ্যে আমি বলতে চাই, বিগত এক যুগ ধরে জনগণের অর্থ এই দেশ থেকে পাচার হয়ে গিয়েছিল। আমরা জনগণের টাকা আর পাচার হতে দেব না।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জনগণের টাকা দিয়ে জনগণের জন্য কাজ করা হবে। জনগণের অর্থ দিয়ে দেশের জন্য কাজ করা হবে, দেশের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য কাজ করা হবে। কাজেই ইনশাআল্লাহ টাকার কোনো অভাব হবে না।’ তিনি বলেন, ‘যারা এই দেশ থেকে টাকা পাচার করেছে, যারা এ দেশ থেকে জনগণের অর্থ বিদেশে পাঠাতে চায়, আমরা আজ থেকে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করব। আমরা যদি সবার চোখ-কান খোলা রাখি, তাহলে এ দেশের অর্থ কেউ বিদেশে পাচার করতে পারবে না। আমরা সবাই মিলে পরিশ্রম করব এবং সেই অর্থ দিয়ে দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করব।’ দেশের মানুষের ভাগ্য বদলে সরকারের উদ্যোগের সঙ্গে সবাই আছেন কি না জানতে চাইলে উপস্থিত হাজার হাজার চা শ্রমিকসহ শ্রীমঙ্গলের নারী-পুরষরা সমস্বরে ‘হ্যাঁ’ সূচক জবাব দেন। বিএনপিকে গণ-মানুষের দল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপি সবসময় জনগণের কাতারে ছিল, সেজন্যই বিএনপির সবচেয়ে বড় শক্তি জনগণের শক্তি। সেই জন্যই বিএনপি সবসময় বলে থাকে জনগণই আমাদের সব ক্ষমতার উৎস। যতবার ভোট দেয়ার সুযোগ এসেছে দেশের মানুষ বিএনপিকে ভোট দিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় এনেছে।’ বেগম খালেদা জিয়াকে স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দেখেছি বিভিন্ন সময়ে যখন দেশে জনগণ যখন ফুঁসে উঠেছিল গণতন্ত্র রক্ষা করার জন্য, তখন অনেক বড় রাজনৈতিক নেতারা এ দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া দেশের জনগণকে রেখে কোথাও যাননি। খালেদা জিয়া বলেছিল বাংলাদেশই হচ্ছে আমার প্রথম ঠিকানা, বাংলাদেশই হচ্ছে আমাদের আমার শেষ ঠিকানা।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা হলাম খালেদা জিয়ার সৈনিক। তাই এই দেশই আমাদের প্রথম এবং শেষ ঠিকানা। আমাদের একটাই কাজ বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা। কাজেই আসুন এই দেশ আমাদেরকেই গড়তে হবে। এই দেশে আমাদের ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাতকে শ্রমিকের হাতে রূপান্তরিত করতে হবে, তাহলেই আমরা এই বাংলাদেশের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে পারব। বক্তব্যের শুরুতে উপস্থিত জনগণের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার জন্য আজকে একটা খুব আনন্দের দিন। কেন জানেন? আজকে থেকে কয়েক মাস আগে যখন নির্বাচনের প্রথম প্রচার অভিযান শুরু হয়, আমি সিলেটের পবিত্র মাটি থেকে সেই প্রচার অভিযান কাজ শুরু করেছিলাম এবং সেই দিনই সিলেটের জনসভা মঞ্চ থেকে বলেছিলাম যে, বিএনপি যদি সরকার গঠন করতে সক্ষম হয়, তাহলে আমরা আমাদের চা-বাগানে শ্রমিক হিসেবে যে সব মায়েরা কাজ করে তাদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড দেব।’ তিনি আরও বলেন, ‘আজকে আল্লাহর কাছে আমি হাজারও শুকরিয়া জানাই, লক্ষ শুকরিয়া জানাই যে, আল্লাহ আমাকে সেই তৌফিক দিয়েছেন। আমি আমার কথা রাখতে পেরেছি। আমার সরকার আজকে চা-বাগানের শ্রমিকদের মধ্যে যারা নারী শ্রমিক আছেন, তাদের কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দিয়েছি।’ আগামী এক বছরের মধ্যে আমরা প্রায় সব নারী শ্রমিকের কাছে, চা-বাগানের সবার কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেয়ার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘দেশকে যদি সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয় তাহলে সবাইকে একসঙ্গে আমাদের সহযোগিতা করতে হবে। সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সেজন্য পুরুষদের পাশাপাশি আমরা যদি নারীদেরকে সাহায্য করতে না পারি স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য, তাহলে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।’ তিনি বলেন, সেজন্যই নারীদেরকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার জন্য আমরা এই ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলেছিলাম। বাংলাদেশে প্রায় ৪ কোটির মতো পরিবার রয়েছে। আমরা বলেছিলাম যে, আমরা যদি সরকার গঠন করতে সক্ষম হই তাহলে পর্যায়ক্রমিকভাবে সব পরিবারের কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেব, বিশেষ করে নারী প্রধানদের কাছে। আমরা নির্বাচন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এক মাসেরও কম সময়ের ভেতরে আমাদের এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছিলাম।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজকে ফ্যামিলি কার্ড দেয়ার পাশাপাশি চা বাগানের নারী শ্রমিকদের ঘর প্রদানের জন্য ২ লাখ টাকা করে দিয়েছি। এখানে স্টেজের মধ্যে তিনজনের হাতে সেই ২ লাখ টাকার চেক তুলে দিয়েছি আর প্রশাসনের মাধ্যমে বাকিদের কাছে ইনশাআল্লাহ আমরা সেই টাকা পৌঁছে দেব।’ সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আসুন তাহলে আজকের এই আনন্দের দিনে আমাদের প্রতিজ্ঞা হবে আমাদের প্রতিশ্রুতি হবে একটাই করবো কাজ গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ এবং একই সঙ্গে আরেকটা নতুন কথা বলি, করবো কাজ গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ।’ এদিন অনুষ্ঠানে ১০ জন নারীর হাতে সরাসরি ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। পরে কম্পিউটারে বাটন চেপে ফ্যামিলি কার্ড তৃতীয় পর্যায় কর্মসূচির উদ্বোধন করেন তিনি। একই সঙ্গে চা শ্রমিক আবাসন সমস্যা সমাধানে শ্রমিকদের দুই লাখ টাকা করে অনুদান, চা শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য বৃত্তি প্রদান, প্রতিবন্ধীদের জন্য আর্থিক অনুদানের চেকও প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী। বক্তব্য শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেখানে একটি জাম ও কৃষ্ণচূড়া গাছের চারা রোপণ করেন। সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেনের সভাপতিত্বে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, মৌলভীবাজার জেলা কমিটির আহ্বায়ক ফয়জুল করিম নয়ন, মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান চৌধুরী, সমাজকল্যাণ মন্ত্রাণালয়ের অতিরিক্তি সচিব কামাল উদ্দিন বিশ্বাস এবং ফ্যামিলি কার্ড পাওয়া নারীদের মধ্যে শিউলী রানি দাস ও ওয়াজেদা বেগম বক্তব্য রাখেন। ২০ বছরের অধিক সময় পরে তারেক রহমান শ্রীমঙ্গলে আসলেন।
তৃতীয় পর্যায়ের ফ্যামেলি কার্ডের পাইলটিং কর্মসূচীর উদ্বোধন করতে শ্রীমঙ্গল পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার (১৭ জুন) দুপুর ১টার দিকে শ্রীমঙ্গল পৌঁছায় প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী গাড়িবহর। এর আগে সকাল সাড়ে ৯টায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সিলেটের উদ্দেশে রওয়ানা হন তিনি। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে প্রধানমন্ত্রী সিলেট পৌঁছান। পরে সেখান থেকে তিনি শ্রীমঙ্গলের উদ্দেশে রওয়ানা হন। দুপুর ১টায় শ্রীমঙ্গল ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে উপস্থিত হয়ে ফ্যামেলি কার্ড বিতরণ কর্মসূচীতে যোগ দেবেন। এ কর্মসূচির আওতায় শ্রীমঙ্গল উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ১৫৫টি পরিবারের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করা হবে। এদিকে প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে মৌলভীবাজার ও শ্রীমঙ্গলে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়। পুরো মৌলভীবাজারকে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ঢেকে ফেলা হয়েছে। মোড়ে মোড়ে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকেরা নিরাপত্তা ব্যবস্থা তদারকি করছেন। দুপুর আড়াইটায় মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ১৫২টি পরিবারের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করা হবে। বিকালে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ থেকে দুসাই রিসোর্টের উদ্দেশে রওনা হবেন তারেক রহমান। সেখানে পৌঁছে কিছুক্ষণ বিশ্রাম শেষে দুসাই রিসোর্টে আয়োজিত রাজনৈতিক সভায় যোগ দেবেন। সভা শেষে সন্ধ্যায় সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা হবেন।
মাগুরার শ্রীপুর উপজেলায় খড় (বিচালি) নিয়ে পারিবারিক বিরোধের জেরে সামেলা বেগম (৫৪) নামে এক গৃহবধূর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় তার স্বামী সাহেব আলী জোয়ার্দারকে আটক করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার (১৬ জুন) দুপুরে উপজেলার সব্দালপুর ইউনিয়নের কাজলী গ্রামের মুচিপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানায়, খড় সংরক্ষণকে কেন্দ্র করে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে বিরোধ তীব্র আকার ধারণ করলে সাহেব আলী জোয়ার্দার তার স্ত্রীকে মারধর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে সামেলা বেগম গুরুতর আহত হন। পরে পরিবারের সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। খবর পেয়ে শ্রীপুর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে এবং অভিযুক্ত স্বামীকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওলি মিয়া জানান, মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মাগুরা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।