দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান জাতীয় সংসদ। জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সেখানে গিয়ে আইন প্রণয়ন ও পরিবর্তনসহ জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলে থাকেন। ব্যাপক ব্যয়বহুল প্রতিটি অধিবেশনে সময় মেপে বক্তব্য রাখার সুযোগ পান সংসদ সদস্যরা। এক্ষেত্রে কার্যপ্রণালি-বিধিসহ নানা নিয়ম-কানুন মানতে হয় তাদের। তবে বিভিন্ন সময়ে অনেক এমপিকে চরম বেফাঁস ও অপ্রয়োজনীয় বক্তব্য দিতে শোনা গেছে।
বিগত বিভিন্ন সংসদের ধারাবাহিকতায় চলতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদেও এ চিত্র দেখা যাচ্ছে। ইতোমধ্যে এই সংসদে সরকারি ও বিরোধীদলের কিছু এমপির বেফাঁস কথার যেন প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। তাদের একের পর এক অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্যে ব্যক্তিগত ও সংসদের মান-মর্যাদাহানির মুখোমুখি হওয়ার পাশাপাশি নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান সময়। অথচ সময়স্বল্পতার কারণে জনগুরুত্বপূর্ণ অনেক ইস্যুতে কথা বলার সুযোগ হারাচ্ছেন তারা।
এবার অনেক এমপিই নতুন ও ব্যতিক্রমী এই সংসদে মন খুলে কথা বলার সুযোগ পাওয়ায় বেফাঁস কিছু কথা বেরিয়ে আসছে বলে কেউ কেউ মনে করছেন। তবে আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে এবারের সংসদ অনেক প্রাণবন্ত বলেও দাবি করছেন তারা। এ ক্ষেত্রে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন, এমপি ও সংসদের মান-মর্যাদা রক্ষায় বিতর্কিত বক্তব্য এড়িয়ে কার্যপ্রণালি বিধি মানাসহ প্রয়োজনীয় স্টাডি করে অধিবেশনে আসার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সূত্রমতে, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬ বছরে জাতীয় সংসদকে চরম বিতর্কিত করা হয়। সে সময় সংসদের প্রতি সাধারণ মনুষের আস্থা অনেকটাই নষ্ট হয়ে যায়। জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নিয়ে তাই মানুষের নতুন প্রত্যাশা সৃষ্টি হয় । নানা কারণে ব্যতিক্রমধর্মী এই সংসদের যাত্রাটাও বেশ সফলভাবেই হয়েছে।
গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার ভাষণে বলেছিলেন— জাতীয় সংসদকে তিনি সব যুক্তিতর্ক এবং জাতীয় সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে চান।
অপরদিকে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান আশা প্রকাশ করেছিলেন যে, নবগঠিত সংসদ একটি গতিশীল, প্রাণবন্ত ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে, যা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে এবং জনগণের কল্যাণে কাজ করবে। তিনি বলেন, সংসদীয় আলোচনায় ব্যক্তিগত আক্রমণ বা চরিত্র হননের পরিবর্তে জনগণের কল্যাণমূলক বিষয়গুলো প্রাধান্য পাওয়া উচিত।
পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সংসদ নেতা ও বিরোধীদলীয় নেতার পক্ষ থেকে সংসদকে প্রাণবন্ত রাখার চেষ্টা করেন। বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারি ও বিরোধী দলের সরব ভূমিকায় বেশ উত্তাপ ছড়িয়ে ৩০ এপ্রিল শেষ হয় প্রথম অধিবেশন।
তবে গত ৭ এপ্রিল শুরু হওয়া দ্বিতীয় অধিবেশনে (বাজেট অধিবেশন) এসে সেই উত্তাপের মাত্রা মোড় নিয়েছে ভিন্ন দিকে। এমপিদের নানা বক্তব্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হচ্ছে। বাজেটের ওপর বক্তৃতা দিতে গিয়ে অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে সময় ব্যয় করছেন কেউ কেউ। তাদের আপত্তিকর কথাগুলো এক্সপাঞ্জ করতে হচ্ছে স্পিকারকে। এমনকি স্পিকারের বক্তব্য নিয়েও বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ছে। অথচ সংসদ অধিবেশনে প্রতি মিনিটে দুই লাখ ৭২ হাজার টাকা খরচ হয় বলে জানা গেছে।
সংসদ অধিবেশনে এমপিদের বেফাঁস কথা প্রসঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্থার কমিশনের প্রধান ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, জাতীয় সংসদে সদস্যরা যে ধরনের নিম্নমানের কথাবার্তা বলেন, তা মর্যাদাহানিকর। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ বিষয়ে সংসদ নেতা ও বিরোধীদলীয় নেতার বার্তা দেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রস্থল জাতীয় সংসদে যারা নির্বাচিত হয়ে আসেন, তারা যদি সে ধরনের আচরণ না করেন, তাহলে নিজেদের মর্যাদাহানির পাশাপাশি সংসদকেও নেতিবাচক ধারণায় ফেলবেন। এটা পরিবর্তন হওয়া দরকার। সংসদের পদের গুরুত্ব বিবেচনা করে তাদের সে ধরনের আচরণ করা উচিত। সংসদে বক্তব্যের ক্ষেত্রে কার্যপ্রণালী-বিধি মানাসহ স্টাডি করে আসার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
নির্বাচন ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ বদিউল আলম মজুমদার আরো বলেন, নির্বাচিতদের অনেকেই সংসদীয় কাজে আগ্রহী নন। তারা স্থানীয় উন্নয়ন কাজে আগ্রহী, যা সংবিধান পরিপন্থী। সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে— সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব ভিন্ন। তাই ভবিষ্যতে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার ব্যাপারেও মনে রাখতে হবে যে, যারা আইন প্রণয়ন ও নীতি-নির্ধারণী কাজে আগ্রহীদের যেন মনোনয়ন দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব আছে। আর এটা খেয়াল রাখলে দক্ষ ও সংসদীয় কাজে আগ্রহীরাই মনোনয়নের সুযোগ পাবেন।
মামুনুল হককে নিয়ে বিতর্কিত বক্তব্য এক্সপাঞ্জ
সূত্রমতে, গত ১৮ জুন বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে অপ্রাসঙ্গিকভাবে পতিত আওয়ামী লীগ আমলে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকের রিসোর্টে যাওয়ার একটি ঘটনা তুলে ধরেন ঢাকা-১ আসনের সরকারদলীয় এমপি খোন্দকার আবু আশফাক। তিনি তার ‘মুতা বিয়ে’ সম্পর্কে জানতে চান। সংসদের বাইরের এক ব্যক্তিকে নিয়ে এ ধরনের বক্তব্যের একপর্যায়ে তাৎক্ষণিকভাবে প্রধানমন্ত্রী ইশারা দিলে তিনি প্রসঙ্গ পরিবর্তন করেন। যদিও এ নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের বিতর্ক ও অনুরোধের পর বক্তব্যটি এক্সপাঞ্জ করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
এ সময় এমপি আশফাককে স্পিকার বলেন, অপ্রাসঙ্গিক কোনো বিষয় বক্তব্যে না আনাই ভালো। তবে তিনি মুতা বিয়ে সম্পর্কে যে বর্ণনা দেন তা নিয়ে নতুন বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ে।
এ প্রসঙ্গে বিরোধী দলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের স্পিকারকে উদ্দেশ করে বলেন, মামুনুল হকের বিষয়ে যে তথ্য দিয়েছেন, এটা একেবারেই ভুল তথ্য। উনি মুতা বিয়ে করেননি। উনি বিয়ে করেছিলেন, এটা স্টাবলিশ। বিয়ে করা জায়েজ। বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করার অনুরোধ করেন তিনি।
একইভাবে বক্তব্যটি এক্সপাঞ্জ করার অনুরোধ করেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম। তখন স্পিকার বলেন, মাওলানা মামুনুল হকের এ বিষয়টি সংসদের কার্যবিবরণীতে আসার প্রয়োজন নেই। তাছাড়া এখনো কিন্তু তিনি (মামুনুল হক) তার অবস্থান পরিষ্কার করেননি। একজন রাজনৈতিক নেতার জীবনের অন্ধকার অংশ এখানে আলোচিত হোক চাই না।
এদিকে সংসদে মামুনুল হককে নিয়ে বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায় তার দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। এই বক্তব্যের প্রতিবাদে দলটি রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশও করে।
নিজের বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করলেন স্পিকার
মামুনুল হকের ‘কথিত পরকীয়া’ বিষয়ে সংসদে বিএনপির এমপি আবু আশফাকের দেওয়া বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করেছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে একজন রাজনৈতিক নেতার জীবনের ‘অন্ধকার অংশ’ নিয়ে নিজের মন্তব্যও কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। গতকাল রোববার জাতীয় সংসদে এ কথা বলেন স্পিকার।
তিনি বলেন, যেহেতু যার পক্ষে সংসদে এসে আত্মপক্ষ সমর্থন করার সুযোগ নেই, তার সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করা অনুচিত। তাই আবু আশফাকের বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করেছি।
তিনি বলেন, আমারও একটি বক্তব্য উল্লেখ করেছিলাম— বলেছিলাম কোনো ব্যক্তির জীবনের অন্ধকার অধ্যায় সম্পর্কে আমার বক্তব্যে এসেছিল। সে অন্ধকারাচ্ছন্ন অধ্যায়, এটিকেও এক্সপাঞ্জ করা হলো।
ভবিষ্যতে বাজেট বক্তব্যসহ অন্যান্য বক্তৃতায় সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে স্পিকার বলেন, যার পক্ষে এখানে এসে নিজেকে ডিফেন্ড করা সম্ভব নয়, তার উদ্দেশে কোনো বিরূপ মন্তব্য আপনারা করবেন না, এটাই আশা করি।
বাবাকে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা দাবি নিয়ে বিতর্ক
বাজেট অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে নিজের জীবিত বাবাকে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বলে উল্লেখ করেন নীলফামারী–৪ (সৈয়দপুর-কিশোরগঞ্জ) আসনে জামায়াতের এমপি আব্দুল মুনতাকিম। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার পর ওই বক্তব্যের জন্য ভুল স্বীকার করেন তিনি। বক্তব্য সংশোধনের জন্য তিনি স্পিকারকে চিঠিও দেন বলে জানা গেছে।
গত ১৪ জুন বক্তব্যে আব্দুল মুনতাকিম দাবি করেন, মুক্তিযুদ্ধে তার পরিবারের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা আছে। তিনি বলেন, ‘আমার বাবা, আমার দাদা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ। আমার আব্বারা (বাবা–চাচা) সাত ভাই, চারজন মুক্তিযোদ্ধা। আমার দাদারা ১৯ জন, ১১ জন মুক্তিযোদ্ধা। আমার পরিবারে ৪৭ জন মুক্তিযোদ্ধা। আমার মা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। আমি জুলাই যোদ্ধা।’ এ নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের পর সৈয়দপুর উপজেলা জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল— এটা এমপির ‘স্লিপ অব টাং’। বিষয়টি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখাই ভালো।
ঋণখেলাপি নিয়ে বক্তব্য এক্সপাঞ্জ দাবি
গত ১৮ জুন প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে স্বতন্ত্র এমপি রুমিন ফারহানার বক্তব্যে এবারের সংসদকে ‘ঋণ খেলাপির সংসদ’ আখ্যা দেওয়া নিয়ে সরকারি ও বিরোধীদলের সদস্যদের মাঝে বেশ বিতর্ক হয়। সরকারি দলের সদস্য ফজলুল হক মিলন দাবি করেন, এখানে (সংসদে) কেউ ঋণখেলাপি নেই। শব্দটি এক্সপাঞ্জ করা হোক। তখন ডেপুটি স্পিকার বলেন, বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও একইভাবে বলেন, এখানে কেউ ঋণখেলাপি না, তবে ঋণগ্রস্ত হতে পারেন। এ সময় বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, সার্বভৌম সংসদে ঋণখেলাপিদের ঋণখেলাপি বলতে না পারলে কোথায় বলবেন? পরে রুমিন ফারহানা তার বক্তব্যের পক্ষে ফের যুক্তি তুলে ধরেন।
ওয়াশিং মেশিন-ওভেন চাওয়া নিয়ে বিতর্ক
গত ১৭ জুন বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে সংসদ সদস্যদের বরাদ্দ দেওয়া ফ্ল্যাটে ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওভেন ও পর্দা দেওয়ার দাবি জানান চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের জামায়াতের এমপি মিজানুর রহমান। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ে।
পরদিন সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে দেওয়া বক্তব্যে এমপি মিজানুর রহমানকে মাইক্রোওভেন দিতে চান বিজেপির এমপি আন্দালিভ রহমান পার্থ। একই সঙ্গে তিনি ওই সদস্যের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ওয়াশিং মেশিন ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে পর্দা দেওয়ার অনুরোধও জানান। এ নিয়েও বিতর্ক বাড়ে।
পার্থের এই বক্তব্যের পর পাল্টা প্রশ্ন রেখে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘ওনার কাছে চাইছে নাকি?’ আমাদের মানসিকতাগুলো এমন হওয়া উচিত, এখানে দাঁড়িয়ে কারও সম্মানে আঘাত করব না।
পার্থের বক্তব্যের বিষয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, বিষয়টি পয়েন্ট অব অর্ডারের মধ্যে পড়ে না। বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক না বাড়ানোরও আহ্বান জানান তিনি।
স্পিকার আরো বলেন, বাজেট আলোচনায় অনেক বিষয়ে বক্তব্য রাখা যায়। একজন সদস্য তার সুবিধা-অসুবিধার কথা বলেছেন। তিনি নিজের জন্য চাননি। তবে এটা সংসদে না বললেও হতো। কিন্তু এটা বলে বিরোধী দলের ওই সদস্য কোনো গর্হিত অপরাধ করেননি।
চেয়ার নিয়ে অভিযোগ
১৭ জুন পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষের চেয়ার নিয়ে অভিযোগ করেন বিএনপির সংসদ সদস্য জয়নাল আবদিন ফারুক। তিনি বলেন, চেয়ারগুলোর পেছনের পিন খোলা থাকায় সংসদ সদস্যদের হাত কেটে যাচ্ছে। চেয়ারগুলোর ওজন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
তিনি বলেন, এখানে ৩০০টির বেশি চেয়ার আছে। এ চেয়ারগুলোর পেছনে গ্যাপ তিন ইঞ্চি। যখন এখানে বসা হয়, তখন গ্যাপটা পূরণের ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। অনেক তরুণ এমপিও বসতে পারেন না। তবে সংসদে এ ধরনের প্রসঙ্গে আলোচনা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে বেশ সমালোচনা করতে দেখা যায়।
পর্দা নিয়ে ‘আপত্তিকর’ বক্তব্য
জামায়াতের সংরক্ষিত আসনের নারী সংসদ সদস্যদের পোশাক নিয়ে সরকারদলীয় এমপি মনিরুল হক চৌধুরীর বক্তব্য নিয়ে সংসদে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়ায়। এমনকি বিষয়টিকে ফরজ বিধানের অবমাননা আখ্যায়িত করে সংসদের বাইরেও ধর্মীয় দলগুলো তীব্র প্রতিবাদ করে।
গত ১৪ জুন মনিরুল হক চৌধুরী তার বক্তব্যের একপর্যায়ে বিরোধীদলীয় নারী এমপিদের ইঙ্গিত করে বলেন, ‘…কিন্তু বুঝলাম না তো কারা আপনারা?’ তার এমন মন্তব্যে বিরোধী দলের সব সংসদ সদস্য সংসদে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করলে সংসদ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিষয়টি নিয়ে কয়েক মিনিটের জন্য সংসদের কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটে।
এ সময় ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে মনিরুল হক চৌধুরীর মন্তব্যটি এক্সপাঞ্জ করলে উত্তেজনা প্রশমিত হয়। পরে অবশ্য বিরোধীদলীয় হুইপ নাহিদ ইসলাম পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বলেন, সংসদে বিরোধী দলের নারী এমপিদের পোশাক নিয়ে যে ধরনের কথা বললেন, তা অমার্জনীয় অপরাধ। একজন সংসদ সদস্য হিসেবে এই বক্তব্য একটি বর্ণবাদী আচরণ।
পরে মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, এ পরিস্থিতি আমি প্রত্যাশা করিনি। যদি আমার কোনো বক্তব্যে আকার-ইঙ্গিতে কারো লেগে থাকে, তাহলে অবশ্যই এক্সপাঞ্জ করার অনুরোধ করব। আমার মনে হয় ওনারা ভুল বুঝেছেন।
ইংরেজি-বাংলা মিশ্রিত বক্তব্য
গত ১৬ জুন বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে সংরক্ষিত নারী আসনের বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য জীবা আমিন খান বাংলা ও ইংরেজির মিশ্রণে একটি বক্তব্য দেন। দেশের কাঁচা রাস্তা ও ভাঙাচোরা সড়ক নিয়ে বিরোধী দলের এক সদস্যের সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘সিক্সটিন হানড্রেড মাইল অফ কাঁচা রাস্তা। দ্য রাস্তাস আর ভেরি ভেরি ব্যাড সিচুয়েশন, দিস ইজ ডিউ টু দুর্নীতি। দ্যাট ইউ হ্যাভ সিন, ফ্রম দ্য প্রিভিয়াস রিজিম।’ তার এই ব্যাকরণগতভাবে ভুল ও মিশ্র ভাষারীতির ১১ মিনিটের বক্তব্যটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মাঝে ব্যাপক হাস্যরসের সৃষ্টি হয়।
চানাচুরের পুষ্টিগুণ নিয়ে বক্তব্য
চানাচুরের পুষ্টিগুণ তুলে ধরেছেন গাইবান্ধা-৪ আসনের এমপি মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন। গত ১৪ জুন বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি চানাচুরের পুষ্টিগুণ বর্ণনা করেন। তিনি মূলত, বিরোধী দলকে কটাক্ষ করে বলেন, ‘উজিরে খামাখা একজন ছিলেন, তার সঙ্গে টকশো করতে গিয়ে শুনলাম আট লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকার ছায়া বাজেট করেছেন।’
বাজেট নিয়ে বিরোধী দলের সমালোচনার জবাবে মোহাম্মদ শামীম কায়সার বলেন, বাজেটে চানাচুরের পুষ্টিগুণ জানা সম্পর্কে একটা কমিটি যদি করার জন্য বরাদ্দ রাখা হতো, তাহলে খুব ভালো হতো। চানাচুরের ডিব্বা না চানাচুরের পুষ্টিগুণ। আমি দেখলাম যে, নরমাল গুণ যদি আমরা একটু সার্চ করে থাকি তাহলেই পেয়ে যাচ্ছি চানাচুরের কিছু পুষ্টিগুণ আছে। যে কেউ খুঁজলে পাবেন, ক্যালরি প্রায় ৫০০-৫৫০ কিলোক্যালরি, ফ্যাট আছে ৩৫ গ্রাম, প্রোটিন ১০ গ্রাম, ফাইবার ৫ গ্রাম। সোডিয়াম ৮০০ মিলিগ্রাম, প্রতি ১০০ গ্রাম চানাচুরের মধ্যে।
তিনি বলেন, ‘এটা বলার কারণ হলো বাজেটটা নাকি চানাচুরের মতো খেতে ভালো লাগে কিন্তু কোনো পুষ্টিগুণ নেই। তো বিষয়টা আসলে এরকম নয়।’
এর আগে প্রস্তাবিত বাজেট প্রতিক্রিয়ায় বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছিলেন, এই বাজেট দেখতে সুন্দর এবং সাময়িকভাবে আকর্ষণীয় বা খেতে ভালো হলেও এতে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের মতো প্রয়োজনীয় কোনো ‘পুষ্টিগুণ’ নেই।
‘অশ্লীল’ উপমা দেওয়া বক্তব্য এক্সপাঞ্জ
গত ১৬ জুন নীলফামারী-১ আসনে জামায়াতের এমপি মোহাম্মদ আব্দুস সাত্তার তার বাজেট নিয়ে আলোচনায় উদাহরণ হিসেবে চালুনি ও সুচের কথোপকথন তুলে ধরেন। এতে কিছু অংশকে ‘অরুচিকর ও অশ্লীল’ উল্লেখ করে তা কার্যবিবরণী থেকে এক্সপাঞ্জ করার নির্দেশ দেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে সংসদের রীতিনীতি মেনে চলার বিষয়ে সংসদ সদস্যদের সতর্ক করেন তিনি।
মুক্তিযোদ্ধাদের জামায়াত করা নিয়ে বক্তব্য
এর আগে প্রথম অধিবেশনে কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক ছড়ায়। তিনি বলেছিলেন— মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য জামায়াত করতে পারে না, যদি কেউ করে সেটা ‘ডাবল অপরাধ’।
এই বক্তব্য নিয়ে সংসদে উত্তপ্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ কাউকে নিবৃত্ত করতে পারছিলেন না। তিনি একপর্যায়ে দাঁড়িয়ে যান। পরে পরিস্থিতি শান্ত হলে স্পিকার সরকারি ও বিরোধী দলের উদ্দেশে বলেন, সারা জাতি দেখছে। সরাসরি সম্প্রচার হচ্ছে। সংসদ যদি বিধি মোতাবেক না চলে, তাহলে এই সংসদ আর থাকবে না।
সদস্যদের কর্মকাণ্ডে শিশুরাও লজ্জা পাবে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, যারা এরই মধ্যে দাদা হয়ে গিয়েছেন, তাদের নাতিরা হয়তো এখানে গ্যালারিতে বসে দেখছেন। তারা কী ভাববে এ সম্পর্কে?
এছাড়া চলতি ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম ও চলতি অধিবেশনে দেশের জাতীয় ও জনগুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ইস্যুর পাশাপাশি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে সরকারি ও বিরোধীদলীয় সিনিয়র সদস্যদের নানা বিতর্কিত বক্তব্যে সংসদে ও বাইরে উত্তাপ ছড়াচ্ছে বলে জানা গেছে।
সরকারি ও বিরোধীদলীয় এমপিদের মন্তব্য
সংসদে বেফাঁস ও বিতর্কিত কথাবার্তা প্রসঙ্গে বিরোধীদলীয় হুইপ ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান আমার দেশকে বলেন, সংসদকে প্রাণবন্ত ও কার্যকর রাখার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু তারা অপ্রাসঙ্গিক ও অতিরিক্ত কথা বলে সংসদে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করছে। অনেক সময় অতিরিক্ত দলীয় কর্মসূচি নিয়ে সংসদে হাজির হচ্ছে। যেমন ব্যাংকলুটকারী এস আলমের পক্ষে তারা বক্তব্য দিয়েছেন। আমরা সংসদকে সুষ্ঠু ও সচল রাখার দাবি জানাই।
বিভিন্ন বক্তব্য এক্সপাঞ্জ হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকারি দলের এমপিদের অনেক বক্তব্য এক্সপাঞ্জ হচ্ছে। আমাদেরও এ ধরনের কথা বলা উচিত না। আমাদের এমপিরা সংসদে তাদের এলাকার উন্নয়ন ও প্রয়োজনে কথা বলছেন। আগামীতে যাতে আরো সংযত ভাষায় প্রয়োজনীয় কথা বলতে পারেন, সেই প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।
সরকারদলীয় সিনিয়র সংসদ সদস্য ও বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, এবার অনেকে প্রথমবারের মতো সংসদে এসেছেন। তারা মনের থেকে কথা বলতে গিয়ে হয়তো অপ্রয়োজনীয় কথা এসে যায়। তবে আগের সংসদগুলোতে আরো বেশি অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা হতো।
তিনি বলেন, এবারের সংসদের চিত্র ভিন্ন। আশা করি, এই সংসদ জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সফল হবে। সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী কথা বলার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। এ বিষয়ে স্পিকার সবাইকে সতর্ক করছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সূত্রমতে, জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধিতে এমপিদের বক্তৃতাকালে কিছু নির্দেশনা মানার কথা বলা হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে— বিচারাধীন কোনো বিষয় উল্লেখ না করা, কোনো আক্রমণাত্মক, কটু বা অশ্লীল ভাষা ব্যবহার না করা ইত্যাদি। এসব নির্দেশনা মানলে এমপিদের বক্তব্য আরো বিতর্কমুক্ত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
চিত্রনায়ক মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন ওরফে সালমান শাহ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যাওয়ার তিন দিনের মাথায় খলনায়ক আশরাফুল হক ডনের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেছেন আদালত। বুধবার (১২ আগস্ট) দুপুরে ডনের পক্ষে তার আইনজীবী এম ফরিদুল ইসলাম, তারিকুল ইসলাম জুয়েলসহ কয়েকজন আইনজীবী জামিনের আবেদন করেন। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলাম তার জামিন আবেদন নাকচ করে দেন। সালমান শাহর আইনজীবী আবিদ হাসান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী ডনের জামিনের বিরোধিতা করে বক্তব্য দেন। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা জামিনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত জামিন নামঞ্জুরের আদেশ দেন। জামিন আবেদনে বলা হয়, ডনের বিরুদ্ধে এজাহার ও গ্রেপ্তারি ফরোয়ার্ডিংয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ নেই। তিনি কথিত ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তাই তাকে জামিন দেওয়া প্রয়োজন। এর আগে গত ৯ আগস্ট রোববার সৌদি আরবে ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে যাওয়ার সময় ডনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। জানা গেছে, সালমান শাহ হত্যা মামলার কারণে তার বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা ছিল। ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার পর তাকে হেফাজতে নেয় সিআইডি। সালমান শাহ ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটনের বাসায় মারা যান। শুরুতে তার মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলা হলেও পরে এ ঘটনায় হত্যা মামলা করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত এই মামলার তদন্তে বিভিন্ন সময়ে একাধিক ব্যক্তির নাম উঠে আসে। ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তার ভাই মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম বাদী হয়ে রমনা থানায় সামিরা হকসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। মামলার অন্য আসামিরা হলেন—সামিরা হকের মা লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই, খলনায়ক ডন, ডেভিড, জাভেদ, ফারুক, রুবী, আ. ছাত্তার, সাজু ও রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদ।
রাজধানীর বকশীবাজারে সরকারি মাদরাসা-ই-আলিয়ার প্রবেশপথে পুলিশের ব্যারিকেড বসানো হয়েছে। শনিবার (৮ আগস্ট) দুপুর ১২টার পর বকশীবাজার রোডে এ ব্যারিকেড দেওয়া হয়। এর ফলে ওই সড়ক দিয়ে মাদরাসার দিকে কোনো যানবাহন প্রবেশ করতে পারছে না, তবে মাদরাসা এলাকা থেকে যানবাহন বের হওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, দুপুর সাড়ে ১২টায় আবাসিক হলে সম্মিলিতভাবে প্রবেশের ঘোষণা দেন হলের ‘বৈধ সাধারণ শিক্ষার্থী ও ছাত্রশিবিরের নেতারা’। শুক্রবার (৭ আগস্ট) দেওয়া এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ কর্মসূচির কথা জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে অভিযোগ করা হয়, ৪ আগস্ট যুবদল নেতা নয়নের নেতৃত্বে যুবদল ও ছাত্রদলের হামলার ঘটনার পর থেকে বৈধ আবাসিক শিক্ষার্থীরা একাধিকবার হলে ফিরতে চাইলেও পুলিশ ও মাদরাসা প্রশাসনের বাধার মুখে ব্যর্থ হয়েছেন। আরও অভিযোগ করা হয়, হলে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের ল্যাপটপ, মোটরসাইকেল, নগদ অর্থ, ইলেকট্রনিক সামগ্রী, একাডেমিক সনদ ও পাসপোর্টসহ মূল্যবান জিনিসপত্র লুটপাটের হাত থেকে রক্ষা করতে পুলিশ ও প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে। প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়, ছাত্রদলের কিছু নেতাকর্মী হলে অবস্থান করে কক্ষ ভাঙচুর ও লুটপাটের সুযোগ পাচ্ছেন, অন্যদিকে বৈধ শিক্ষার্থীদের হলে ফিরতে দেওয়া হচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে সাধারণ শিক্ষার্থী, ছাত্রশিবির এবং ঢাকা আলিয়া মাদরাসা শাখার নেতারা সব বাধা অতিক্রম করে হলে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানানো হয়। কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে হলের সামনে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করলেও এখন পর্যন্ত কোনো সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়নি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ঢাকা কলেজে আয়োজিত আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ছাত্রশিবির ও জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতারা অভিযোগ করেছেন, কলেজ প্রশাসন তাদের কোনো প্রতিনিধি বা দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানায়নি। বুধবার (৫ আগস্ট) সকাল ১১টায় কলেজের শহীদ আ ন ম নজীব উদ্দিন খান খুররম অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস। অনুষ্ঠানে ছাত্রদল, ছাত্র অধিকার পরিষদ ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের নেতাদের উপস্থিতি থাকলেও নিজেদের বাদ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন ঢাকা কলেজ ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি সাইমুম ইসলাম সানি। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর সব পক্ষকে নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু কলেজ প্রশাসন তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ করেনি। সাইমুম ইসলাম সানির অভিযোগ, যাদের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন, সেই ছাত্রদলের প্রতিনিধিদের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হলেও ছাত্রশিবিরকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এতে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন ঢাকা কলেজ শাখা জাতীয় ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক সজিব উদ্দিন। তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে জাতীয় ছাত্রশক্তিকে আমন্ত্রণ না জানানো অনাকাঙ্ক্ষিত এবং জুলাই-পরবর্তী সময়ের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস এবং উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক আনোয়ার মাহমুদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।