ভোরের আলো তখন পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের রেজু আমতলী সীমান্তঘেঁষা পাহাড়ি কলাবাগানে কাজ করছিলেন কয়েকজন শ্রমিক। কেউ আগাছা কাটছিলেন, কেউ গাছের গোড়া পরিষ্কার করছিলেন। তাদের মাঝেই ছিলেন আব্দুল খালেক (৩০)।
কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকা খালেক প্রায়ই স্থানীয় শ্রমিকদের সঙ্গে সীমান্ত এলাকার পাহাড়ি বাগানে কাজ করতে আসতেন।
মঙ্গলবার (৯ জুন) সকালে কাজ করার সময় হঠাৎ বিকট বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা। মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন খালেক। বিস্ফোরণে তার দুই পা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।
সহকর্মীরা প্রথমে হতভম্ব হয়ে পড়েন। আশপাশে আরও মাইন থাকতে পারে—এমন আতঙ্কে কেউ কাছে যেতে সাহস পাচ্ছিলেন না। পরে কয়েকজন ঝুঁকি নিয়ে তাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনেন। কাপড় ছিঁড়ে রক্তপাত বন্ধের চেষ্টা করা হয়। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো যায়নি।
ঘটনাস্থল ছিল নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ইউনিয়নের রেজু আমতলী সীমান্তের ৩৯ ও ৪০ নম্বর পিলারের মধ্যবর্তী এলাকা। স্থানীয় বাসিন্দাদের ধারণা, সেখানে আগে থেকেই পুঁতে রাখা ছিল অ্যান্টি-পার্সোনেল মাইন।
১৬ দিনে ৫ জনের মৃত্যু, দেড়বছরে নিহত ১০
আব্দুল খালেকের মৃত্যুর কয়েকদিন আগেই বাইশফাঁড়ি সীমান্তে একই ধরনের বিস্ফোরণে মারা যায় এক কিশোর। এর আগে, গত ২৪ মে তুমব্রু সীমান্তের ৪১ ও ৪২ নম্বর পিলারের মাঝামাঝি এলাকায় একসঙ্গে প্রাণ হারান তিন বাংলাদেশি পাহাড়ি শ্রমিক। সব মিলিয়ে মাত্র ১৬ দিনের ব্যবধানে নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে নিহত হয়েছেন পাঁচজন। আহত হয়েছেন আরও অন্তত চারজন।
বিজিবি, স্থানীয় প্রশাসন ও সীমান্তবাসীর তথ্যমতে, ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে মাইন ও অবিস্ফোরিত গোলার বিস্ফোরণে নিহত হয়েছেন অন্তত ১০ জন এবং আহতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৪০ এর অধিক। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশি কৃষক, পাহাড়ি শ্রমিক, রোহিঙ্গা শরণার্থী, কাঠুরে এবং বিজিবি সদস্যও।
একজনকে বাঁচাতে গিয়ে আরও দুইজনের মৃত্যু
গত ২৪ মে দুপুরে ঘুমধুম ইউনিয়নের ভালুকিয়াপাড়া এলাকার কয়েকজন পাহাড়ি শ্রমিক সীমান্তঘেঁষা কলাবাগানে কাজ করতে যান। এলাকাটি ছিল তুমব্রু সীমান্তের ৪১ ও ৪২ নম্বর পিলারের মধ্যবর্তী দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল।
সেখানে প্রথম বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই নিহত হন অক্যমং তংচঙ্গ্যা (৪০)। বিস্ফোরণের শব্দ শুনে তার দিকে ছুটে যান চিক্যং তংচঙ্গ্যা (৩৪) ও শৈফুচিং তংচঙ্গ্যা (৩২)। কিন্তু কিছুদূর এগোতেই আবারও বিস্ফোরণ। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে নিভে যায় তিনটি প্রাণ। তিনজনই ছিলেন দরিদ্র পাহাড়ি পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। প্রতিদিন পাহাড়ে কাজ না করলে তাদের সংসার চলত না।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য অংসাই মারমা বলেন, এটা ছিল খুবই ভয়ংকর দৃশ্য। একজনকে বাঁচাতে গিয়ে আরও দুজন মারা গেলেন। তিনটি পরিবার একসঙ্গে নিঃস্ব হয়ে গেছে।
অক্যমং তংচঙ্গ্যার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাঁশের বেড়ার ছোট ঘরের এক কোণে এখনো ঝুলছে তার ব্যবহৃত কাপড়। কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তার স্ত্রী। তিনি বলেন, সকালেও বলছিল বিকেলে ফিরে মাছ নিয়ে আসবে। আমি জানতাম না এটাই শেষ কথা।
দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে আহতদের কাটছে মানবেতর জীবন
প্রায় তিন বছর আগে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত এলাকায় মাইন বিস্ফোরণে পা হারান ঘুমধুম ইউনিয়নের অং না থিং (২৮), বেঁচে গেলেও তিনি আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন এক নির্মম স্মৃতি।
দীর্ঘ সময় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন, চিকিৎসকরা অনেক চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত তার পা রক্ষা করতে পারেননি। পরে হাঁটুর নিচ থেকে কেটে ফেলতে হয়। বর্তমানে ঘুমধুম এলাকায় রাস্তার পাশে ছোট্ট একটি পান-সিগারেটের দোকান চালিয়ে কোনোমতে জীবিকা নির্বাহ করছেন অং না থিং।
তিনি বলেন, অনেকেই সাহায্যের কথা বলেছিল। কেউ টাকা দেবে, কেউ পাশে থাকবে বলেছিল। কিন্তু আমার হারানো পা কি কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবে?
সীমান্তজুড়ে আতঙ্ক, মাইন অপসারণের দাবি
নিহত তিন শ্রমিকের পরিবারসহ মাইন বিস্ফোরণে হতাহতদের খোঁজখবর নিতে সম্প্রতি ঘুমধুম সীমান্ত পরিদর্শন করেন এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম সুজা উদ্দিন।
তিনি বলেন, মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দারা এখন এক নীরব মানবিক সংকটের মধ্যে দিনযাপন করছেন। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতকরণ, মাইন অপসারণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
আগামী ১৩ জুন নাইক্ষ্যংছড়ির পার্শ্ববর্তী কক্সবাজার জেলায় এক দিনের সফরে আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার ও মাইন অপসারণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে তার সুদৃষ্টি কামনা করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
ঘুমধুমের স্থানীয় সাংবাদিক মাহমুদুল হাসান বলেন, সীমান্ত এলাকায় মাইন অপসারণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। একইসঙ্গে যারা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে মাইন পুঁতে রেখেছে, তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মামলা করা উচিত। নিরাপদ ভূখণ্ড ও নিরাপদ জীবন আমাদের ন্যায্য অধিকার।
নাইক্ষ্যংছড়ির স্কুলশিক্ষক মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, সীমান্ত এলাকার মানুষ সবসময় আতঙ্কে থাকেন। মাটির নিচে যেন মৃত্যু লুকিয়ে আছে। বারবার প্রাণহানির ঘটনায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।
মাইনে বিস্ফোরণে প্রাণ গেছে বিজিবি সদস্যেরও
মাইন বিস্ফোরণে শুধু সাধারণ মানুষ নয়, প্রাণ হারিয়েছেন বিজিবির এক সদস্য। ২০২৫ সালের ১২ অক্টোবর তুমব্রু সীমান্তের ৪১ নম্বর পিলার-সংলগ্ন এলাকায় টহলের সময় মাইন বিস্ফোরণে গুরুতর আহত হন কক্সবাজার ৩৪ বিজিবি ব্যাটালিয়নের নায়েক মোহাম্মদ আক্তার হোসেন।
বিস্ফোরণে তার একটি পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে গুরুতর আঘাত লাগে। প্রথমে তাকে কক্সবাজার, পরে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি করা হয়। দীর্ঘ ১৯ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ৩১ অক্টোবর রাতে তার মৃত্যু হয়।
বিজিবি জানিয়েছে, সীমান্তের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে লাল পতাকা টানিয়ে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করা হচ্ছে।
৩৪ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম খায়রুল আলম বলেন, বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় টহল জোরদারের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে নানা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। একইসঙ্গে হতাহতদের সহায়তাও দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, অ্যান্টি-পার্সোনেল মাইন বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্রগুলোর একটি। কারণ এসব মাইন সৈন্যদের চেয়ে বেশি ক্ষতি করে সাধারণ মানুষের।
১৯৯৭ সালের অটোয়া চুক্তি অনুযায়ী অ্যান্টি-পার্সোনেল মাইন ব্যবহার, মজুত ও উৎপাদন নিষিদ্ধ। বিশ্বের অধিকাংশ দেশ এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে।
জাতিসংঘ বলছে, প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে হাজারো মানুষ মাইন বিস্ফোরণের শিকার হন। হতাহতদের বড় অংশই শিশু ও বেসামরিক নাগরিক। যুদ্ধ শেষ হওয়ার বহু বছর পরও এসব মাইন মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশ সীমান্তে। বিশেষ করে আরাকান আর্মি ও মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সংঘর্ষের কারণে সীমান্তের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় মাইন পুঁতে রাখা হচ্ছে বলে ধারণা করা হয়।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
এক মাস আগে বিকেলে কর্মস্থল থেকে ফেরার পথে সড়কে বেশ কিছু টাকা পড়ে থাকতে দেখেন পোশাকশ্রমিক কবির মিয়া। টাকাগুলো কুড়িয়ে নিয়ে সেদিন রাত ৯টা পর্যন্ত এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে মালিকের খোঁজ করেন। এরপর প্রতিদিন কর্মস্থলে যাওয়া–আসার পথে অটোরিকশাচালক, কারখানার শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার মানুষের কাছে জানতে চান, কেউ টাকা হারিয়েছেন কি না। এত চেষ্টার পরও প্রকৃত মালিকের সন্ধান পাননি কবির মিয়া। গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত মালিকানা দাবি করে কেউ টাকাগুলো নিতে আসেননি। শেষ চেষ্টা হিসেবে এক হাজার টাকা খরচ করে ঘটনাস্থল ও আশপাশের কয়েকটি এলাকায় মাইকিং করিয়েছেন কবির মিয়া। গতকাল দিনভর নরসিংদীর পলাশ উপজেলার ডাঙ্গা ইউনিয়ন ও ঘোড়াশাল পৌরসভার বিভিন্ন সড়কে এ মাইকিং করা হয়। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। কবির মিয়া পলাশ উপজেলার ডাঙ্গা ইউনিয়নের হাসনহাটা গ্রামের মো. আকবর আলীর ছেলে। তিনি স্থানীয় একটি পোশাক কারখানায় শ্রমিকের কাজ করেন। কুড়িয়ে পাওয়া টাকার সুনির্দিষ্ট পরিমাণ না বললেও তিনি জানিয়েছেন, টাকার পরিমাণ পাঁচ অঙ্কের ঘরে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সকাল থেকে ডাঙ্গার চরকা পোশাক কারখানা, ডাঙ্গা বাজার, ঘোড়াশালের ঘোড়া চত্বর ও ভিরিন্দা এলাকায় মাইকিং করেন কবির মিয়া। পরে কারখানার বিভিন্ন ফটকের সামনেও মাইকিং করা হয়। আগে থেকে ধারণ করা মাইকিংয়ে বলা হয়, ‘গত মাসে অক্টোবরের তিন তারিখ রোজ শনিবার ঘোড়াশাল থেকে দৃষ্টিনন্দন ও ফকিরার রাস্তা ধরে আসার পথে বেশ কিছু টাকা পাওয়া যায়। সঠিক তথ্য দিয়ে টাকাগুলো নেওয়ার জন্য বিনীতভাবে অনুরোধ করা হলো। যোগাযোগের ঠিকানা: পূর্ব হাসনহাটার মরহুম সাহাজউদ্দিনের বাড়ির জামে মসজিদের ইমাম সাহেবের সঙ্গে।’ এ সময় নিজের মুঠোফোন নম্বরও প্রচার করেন কবির মিয়া। ওই মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগ করলে কবির মিয়া বলেন, গত ৩ অক্টোবর বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে ঘোড়াশাল–ডাঙ্গা সড়কের হাসনহাটা এলাকায় টাকাগুলো পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। কুড়িয়ে নেওয়ার পর এলাকাবাসীকে বিষয়টি জানান। রাত ৯টা পর্যন্ত খোঁজাখুঁজি করেও মালিককে না পেয়ে স্থানীয় মসজিদের ইমামের পরামর্শে কয়েক দিন অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, ওই দিন প্রাণ–আরএফএল গ্রুপের চরকা কারখানার শ্রমিকদের বেতন দেওয়া হয়েছিল। সেখানে গিয়েও মাইকে টাকা পাওয়ার বিষয়টি জানানো হয়। এ ছাড়া প্রতিদিন কাজে যাওয়া–আসার পথেও খোঁজ নিতে থাকেন। কিন্তু এক মাসেও কেউ টাকার খোঁজে না আসায় গতকাল মাইকিং করানোর সিদ্ধান্ত নেন কবির। টাকাগুলো দান বা খরচ না করে মালিকের খোঁজে মাইকিং করার কারণ জানতে চাইলে কবির বলেন, ‘জানি না কার টাকা। হয়তো অনেক কষ্টের টাকা। অন্যের টাকা তো আমি খরচ করতে পারি না, আবার দানও করতে পারি না। ইমাম সাহেব কেউ আসে কি না, অপেক্ষা করে দেখতে বলায় এত দিন অপেক্ষা করেছি।’ কবির মিয়া আরও বলেন, মাইকিংয়ের জন্য কুড়িয়ে পাওয়া টাকা থেকে এক হাজার টাকা খরচ করা হয়েছে। সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আগামী সাত দিনের মধ্যে কেউ না এলে টাকাগুলো এতিমখানায় দেওয়া হবে। পূর্ব হাসনহাটা বাইতুন নূর জামে মসজিদের ইমাম নাজমুল হাসান বলেন, টাকাগুলো কোনো শ্রমিকের বেতনও হতে পারে। কিন্তু প্রকৃত মালিককে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মালিকের সন্ধানে মাইকিং করা ছাড়া বিকল্প না পেয়ে কবির এ উদ্যোগ নেন। তাঁর ভাষ্য, কবির সততার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। নির্লোভ থেকে অন্যের সম্পদ ফেরত দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন তিনি।
রাজধানীর বিমানবন্দরে পরপর দুটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। তবে এতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) রাত পৌনে ১২টার দিকে বিমানবন্দরের গোলচত্বরে এ ঘটনা ঘটে। তবে কে বা কারা ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটিয়েছে, তা জানাতে পারেনি পুলিশ। বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল হাসান তালুকদার বলেন, কে বা কারা উড়াল সেতু থেকে দুটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটিয়ে পালিয়ে যায়। এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি, ট্রাফিক) উত্তরা বিভাগে কর্মকরত ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) বলেন, ‘বিমানবন্দরের বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) উড়াল সেতু থেকে দুর্বৃত্তরা পরপর দুটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। বিকট শব্দে ককটেল বিস্ফোরণের কারণে বিমানবন্দর এলাকায় আতঙ্কের সৃষ্টি হয়।’
লাগাতার অবরোধে রাঙামাটির বাঘাইছড়ির সাজেক উপত্যকায় জনজীবন চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) পর্যন্ত পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ পঞ্চম দিনেও (চতুর্থ পর্যায়ের অংশ) কঠোরভাবে পালিত হয়েছে। এদিন সকাল থেকে দীঘিনালা-সাজেক সড়কের বিভিন্ন স্থানে গাছের গুঁড়ি ফেলে এবং আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করেন আন্দোলনকারীরা। সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের ডাকে ৫ দফা দাবিতে এ অবরোধ চলছে। জানা যায়, চলমান অবরোধ ও নিরাপত্তার সংকটের কারণে বাঘাইহাট এলাকায় অবস্থিত বনানী বন বিহারের ঐতিহ্যবাহী কঠিন চীবর দানোৎসব এ বছর বাতিল করা হয়েছে। পরিচালনা কমিটির সভাপতি বিমল কান্তি চাকমা জানিয়েছেন, সাজেকে এমন থমথমে ও অবরোধপূর্ণ পরিস্থিতিতে ধর্মীয় উৎসব পালন করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই বিহারটিতে শুক্র-শনিবার কঠিন চীবর দানোৎসব আয়োজন করা হলেও শেষ মুহূর্তের আগে তা বাতিল করা হয়েছে। এদিকে গত ২২ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া অবরোধের চতুর্থ পর্যায় চলছে। তবে কৃষিপণ্য ও শিক্ষার্থীদের যানের পাশাপাশি অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস এবং গণমাধ্যমকর্মীদের গাড়ি এ অবরোধের আওতা থেকে শিথিল রাখা হয়েছে। টানা দীর্ঘদিন ধরে যোগাযোগ বন্ধ থাকায় সাজেক উপত্যকায় খাদ্য ও চিকিৎসা সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা অচল হয়ে পড়েছে বলে জানান স্থানীয়রা। অন্যদিকে অবরোধকারীদের পাঁচ দফার মধ্যে চারটি দাবি প্রশাসন মেনে নিলেও সাজেক থেকে সন্তু লারমা গ্রুপের (জেএসএস) সশস্ত্র সদস্যদের অপসারণের দাবি নিয়ে এখনো প্রশাসনের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সমঝোতা হয়নি। তবে সাজেকে সাম্প্রতিক সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পুনর্বাসন ও সহায়তার বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করেছে মন্ত্রণালয়টির সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে একটি সুপারিশমালা পেশ করা হয়, যেখানে পাহাড়ি জনপদের সামগ্রিক শান্তি ও জনজীবন স্বাভাবিক করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। তবে নিরাপত্তার কারণে সাজেক পর্যটন কেন্দ্রে পর্যটকদের ভ্রমণে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমেনা মারজান। অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচির কারণে সাজেক-দীঘিনালা সড়কে সব ধরনের সাধারণ ও বাণিজ্যিক যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। গত ২২ অক্টোবর থেকে সাজেক সড়কে তৃতীয় দফায় অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধ কর্মসূচি শুরু করে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন। পরে গত ১ নভেম্বর মাত্র একদিনের জন্য অবরোধ কিছুটা শিথিল করা হলেও, গত ২ নভেম্বর থেকে ফের চতুর্থ দফায় অবরোধ শুরু হয়। শুক্রবার আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন স্থানে গাছের গুঁড়ি ফেলে ও আগুন জ্বালিয়ে ব্যারিকেড সৃষ্টি করেছেন। স্থানীয়রা জানান, সাজেক উপত্যকা বর্তমানে সম্পূর্ণ পর্যটকশূন্য। রিসোর্ট ও কটেজগুলো খালি পড়ে থাকায় প্রতিদিন কোটি টাকার বেশি লোকসান হচ্ছে এবং পরিবহণ শ্রমিক ও চালকরা কর্মহীন হয়ে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক রাহুল চাকমা। সাজেক থানার ওসি তোফাজ্জল হোসেন জানিয়েছেন, এলাকার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং যেকোনো ধরনের সংঘাত বা অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বাত্মক সতর্কতায় রয়েছে। তবে চলমান এ কঠোর অবরোধের জেরে সাজেক সড়কে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ থাকলেও বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।