ক্যাডেট কলেজের আদলে দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনে ৬০০ মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছে সরকার। প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতিটি আসনে ছেলেদের জন্য একটি এবং মেয়েদের জন্য একটি সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো হবে আবাসিক এবং তাতে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে।
সরকারের নির্দেশনায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) ৬০০টি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে একটি প্রাথমিক খসড়া প্রস্তাব তৈরি করেছে। ‘নির্বাচিত এলাকাসমূহে ৬০০টি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ নির্মাণ প্রকল্প’ নামের এই প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় ৬৮ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে হিসাব করা হয়েছে।
দেশে এখন পুরোপুরি আবাসিক সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় নেই। অল্প কিছু পুরোনো স্কুল অ্যান্ড কলেজে ছাত্রাবাস রয়েছে। অন্যদিকে বেসরকারিভাবে অনেক আবাসিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসা গড়ে উঠেছে। সেগুলোর সংখ্যা কত, সে হিসাব পাওয়া যায়নি।
ক্যাডেট কলেজ আছে ১২টি। তার মধ্যে ৯টি ছেলেদের এবং ৩টি মেয়েদের। ক্যাডেট কলেজ আবাসিক। সেখানে সপ্তম শ্রেণি থেকে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। পড়াশোনা হয় এইচএসসি পর্যন্ত।
শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের অনেকে মনে করছেন, সরকারিভাবে আবাসিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তটি ইতিবাচক। এর মাধ্যমে স্বল্প ও সীমিত আয়ের পরিবারের সন্তানদের আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার সুযোগ তৈরি হবে; কিন্তু কোথায় কোথায় এ ধরনের আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, সেটির সমীক্ষা প্রয়োজন। পার্বত্য চট্টগ্রাম, সুনামগঞ্জের মতো হাওরাঞ্চল, চরাঞ্চল কিংবা দুর্গম ও শিক্ষাবঞ্চিত এলাকা এবং জনবহুল এলাকায় পরিকল্পিতভাবে আবাসিক মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হলে তা ইতিবাচক ফল দিতে পারে।
নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি দেশের বিদ্যমান প্রাথমিক, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মানোন্নয়ন, শিখনঘাটতি কাটিয়ে ওঠা, শিক্ষকসংকট নিরসন এবং অবকাঠামো উন্নয়নে জোরালো উদ্যোগ নেওয়াও জরুরি বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের অনেকে।
জানতে চাইলে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি পর্যায়ে ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ গড়ে তোলাই এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চমানের শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে এসব প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে নতুন প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিদ্যমান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার মান উন্নয়নেও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে এবং সে লক্ষ্যেও কাজ করা হবে।
বেসরকারি খাতের কিছু স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উদাহরণ দিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সরকারি ব্যবস্থাতেও একই ধরনের মানসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা সরকারি পর্যায়েই উচ্চমানের শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পায়।
মাউশির প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য প্রায় তিন একর জমি প্রয়োজন হবে। জমি অধিগ্রহণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া ৬০০টি একাডেমিক ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি ভবন হবে ১০ তলাবিশিষ্ট এবং প্রতিটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৮০ কোটি টাকা। এ খাতে মোট ব্যয় হবে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা।
প্রস্তাবিত প্রকল্পে ছাত্র ও ছাত্রীদের জন্য মোট ৬০০টি হোস্টেল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটির ব্যয় ১০ কোটি টাকা হিসাবে মোট ব্যয় হবে ৬ হাজার কোটি টাকা। পাশাপাশি ৬০০টি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ল্যাব স্থাপনে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে পাঁচ বছরে, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে। এ প্রকল্পের প্রশাসনিক খরচ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, মূলধন ব্যয় এবং আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে মোট ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৬৮ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বৈদেশিক ঋণসহায়তা নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।
মাউশি বলছে, দেশের সব অঞ্চলে, বিশেষ করে গ্রামীণ, অনগ্রসর ও অবকাঠামোগতভাবে পিছিয়ে থাকা এলাকায় এখনো সমমানের আধুনিক শিক্ষাসুবিধা পৌঁছায়নি। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী শিক্ষাক্ষেত্রে সামাজিক ও ভৌগোলিক বৈষম্য কমানো এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা সম্প্রসারণের লক্ষ্য রয়েছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, ৬০০টি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য—দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে পিছিয়ে থাকা এলাকায় মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ করা। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রকল্পের ব্যয়, প্রয়োজনীয়তা, সম্ভাব্যতা ও বিদ্যমান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়নের বিষয়গুলো বিবেচনা করা হবে।
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী আছে ৯৪ লাখের বেশি। এর মধ্যে ১৯ হাজারের বেশি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী প্রায় ৭৮ লাখ; আর স্কুল অ্যান্ড কলেজের সংখ্যা (এসব প্রতিষ্ঠানেও মাধ্যমিক স্তরে পড়ানো হয়) ১ হাজার ৫১৪। এগুলোতে শিক্ষার্থী আছে ১৫ লাখ ৬৪ হাজারের বেশি।
এর বাইরে মাদ্রাসাগুলোতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। সেই হিসাব সরকারি সংস্থার কাছে নেই। ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করে ২৯ হাজারের মতো শিক্ষার্থী।
দেশের মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক-শিক্ষিকার অনুমোদিত পদ ১৫ হাজার ২৯৩টি। এর মধ্যে ২ হাজার ৮৪২টি পদ শূন্য, অর্থাৎ ১৮ শতাংশের বেশি পদে শিক্ষক নেই।
মাউশির পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন শাখার গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা ইংরেজি ও গণিতে দক্ষতা অর্জনে বেশ পিছিয়ে। এমনকি বাংলায়ও শিক্ষার্থীদের অবস্থা কাঙ্ক্ষিত মানের নয়। মূলত বিদ্যালয়গুলোতে ঠিকমতো পড়াশোনা না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা কোচিং ও গৃহশিক্ষকের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হয়।
অনেক অভিভাবকের অভিযোগ, শিক্ষকেরা ক্লাসে ভালোভাবে পড়ানোর বদলে প্রাইভেট পড়ানোর দিকে বেশি মনোযোগ দেন। ফলে খরচের বোঝা পড়ে পরিবারগুলোর ওপর।
জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো ২০২৩ সালে এক গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য দিয়ে বলেছিল, বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে ব্যয়ের ৭১ শতাংশই বহন করতে হচ্ছে পরিবারগুলোকে।
শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অতীতেও বিভিন্ন সময়ে মডেল স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে সব প্রতিষ্ঠান প্রত্যাশিত মানে পৌঁছাতে পারেনি। কিছু ক্ষেত্রে অবকাঠামো নির্মাণ করা হলেও শিক্ষার গুণগত মান, শিক্ষকসংকট বা ব্যবস্থাপনা দুর্বলতার কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। এ কারণে নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়ার আগে আগের উদ্যোগগুলোর সাফল্য-ব্যর্থতা মূল্যায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয়ের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহবুব মোর্শেদ প্রথম আলোকে বলেন, সরকারের উদ্দেশ্য হয়তো ভালো। তবে এখানে মূল প্রশ্ন প্রয়োজনীয়তা ও বাস্তবতা নিয়ে। দেশের সব এলাকায় আবাসিক মডেল স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন আছে কি না, সেটি আগে বিবেচনা করা দরকার। তাঁর মতে, বর্তমানে বিদ্যমান প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর মানোন্নয়নেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। অবশ্য প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় এ ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যেতে পারে।
মুহাম্মদ মাহবুব মোর্শেদ বলেন, বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ না নিয়ে কিছুটা সময় নিয়ে পুরো শিক্ষা খাত সামনে রেখে সমন্বিত পরিকল্পনা করা উচিত। যাতে সীমিত সরকারি সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে বেশি সুফল পাওয়া যায়।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
গাইবান্ধার ফুলছড়িতে একটি কেন্দ্রে ২০২৫ সালের প্রশ্নে ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার ঘটনায় কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (কেন্দ্র সচিব) ও ট্যাগ অফিসারসহ সংশ্লিষ্ট ৯ জনকে দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। সোমবার (৬ জুন) সন্ধ্যায় বিষয়টি ঢাকা পোস্টকে নিশ্চিত করেছেন ফুলছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোস্তাফিজুর রহমান। এর আগে গত বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) উপজেলার ‘ফুলছড়ি সরকারি ডিগ্রি কলেজ’ কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে। অব্যাহতি পাওয়াদের মধ্যে রয়েছেন ফুলছড়ি সরকারি ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ ও কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (কেন্দ্র সচিব) আসাদুল হক ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মনোয়ার হোসেন। তিনি ওই কেন্দ্রের ট্যাগ অফিসার হিসেবে দায়িত্বপালন করছিলেন। এ ছাড়া অন্যরা হলেন, কেন্দ্রের পরীক্ষা পরিচালনা কমিটির সদস্য তিনজন (শিক্ষক) ও দুই কক্ষে পরিদর্শকের দায়িত্বে থাকা চার শিক্ষক। ফুলছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোস্তাফিজুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, পরীক্ষাকেন্দ্রে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে কেন্দ্র সচিব, ট্যাগ অফিসার, পরীক্ষা পরিচালনা কমিটির তিন সদস্য ও দুই কক্ষে দায়িত্বরত চার শিক্ষকসহ ৯ জনকে দায়িত্ব থেকে অব্যহতি দেওয়া হয়েছে। ফুলছড়ি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার সৈয়দ মনিরুল হাসান ঢাকা পোস্টকে বলেন, সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব অবহেলার কারণে সেদিন ২০২৬ সালের নিয়মিত পরীক্ষার্থীরা ২০২৫ সালের অনিয়মিতদের প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়েছেন এবং পক্ষান্তরে ২০২৫ সালের অনিয়মিতদের প্রশ্নে ২০২৬ সালের নিয়মিত পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিয়েছিলেন। এটি অনেক বড় দায়িত্বহীনতা। এ সময় তিনি বলেন, সেদিন এমন ঘটনার শুরুর দিকে আমাকে মিস ইনফরমেশন (অসত্য তথ্য) দেওয়া হয়েছিল। আসলে ভুল প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়েছেন মোট ৬১ জন পরীক্ষার্থী। তাদের মধ্যে ২০২৬ সালের নিয়মিত পরীক্ষার্থী ছিল ৫০ জন এবং ২০২৫ সালের অনিয়মিত পরীক্ষার্থী ছিলো ১১ জন। এর আগে গত বৃহস্পতিবার জেলার ফুলছড়ি উপজেলার ফুলছড়ি সরকারি ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে বাংলা ১ম পত্রে ২০২৫ সালের প্রশ্নে পরীক্ষা দেয় ৫০ জন নিয়মিত পরীক্ষার্থী এবং ২০২৬ সালের প্রশ্নে অনিয়মিত ১১ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষা দেন। পরে পরীক্ষা শেষে বিষয়টি বুঝতে পেরে পরীক্ষার ফলাফল কি হবে তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। পরে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা ফলাফল শঙ্কার কথা জানিয়ে অধ্যক্ষ ও কেন্দ্র সচিবের কক্ষে কথা বলতে যান। এ সময় সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা ফলাফলে কোনো সমেম্যা হবে না বলে জানান। এক পর্যায়ে সেখানে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। একইদিন দিনাজপুর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর মোহাম্মদ বোরহান উদ্দিন স্বাক্ষরিত একটি পত্রে সংশ্লিষ্টদের অব্যাহতি দিতে নির্দেশনা দিয়ে গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক বরাবর একটি পত্র দেন। পরদিন ৩ জুলাই জেলা প্রশাসক মাসুদুর রহমান মোল্লা স্বাক্ষরিত এক পত্রে সেই নির্দেশনা অনুযায়ী কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও অধ্যক্ষ, প্রফেসর এস.এম আশাদুল ইসলামকে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়। একইসঙ্গে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে ওই কলেজের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদকে নিয়োগ প্রদান করা হয়। এ ছাড়া ওই পত্রে ট্যাগ অফিসার ও পরিক্ষা কমিটির আহ্বায়কসহ সংশ্লিষ্ট কক্ষের সব কক্ষ প্রত্যাবেক্ষককে অব্যহতির কথা জানানো হয়। প্রসঙ্গত, ২ জুলাই ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে সারা দেশে সকাল ১০টায় শুরু হওয়া এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা চলে ১টা পর্যন্ত। তবে, এসময়ে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের আলিম এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষাগুলো অনুষ্ঠিত হয় পৃথক প্রশ্নপত্রে। প্রথম দিনে সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে বাংলা প্রথমপত্র পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে আলিমের কোরআন মাজিদ এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে এইচএসসি (বিএমটি)-এর বাংলা-২ বিষয়ের পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। চলমান এইচএসসি পরীক্ষায় গাইবান্ধায় জেনারেল, মাদরাসা ও কারিগরি বিভাগে মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ১৭ হাজার ৪৭১ জন।
দেশজুড়ে আজ বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) শুরু হচ্ছে ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। প্রথম দিনে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে বাংলা প্রথমপত্র, মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডে আলিমের কোরআন মাজিদ এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে এইচএসসি (বিএমটি) বাংলা-২ বিষয়ের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। সকাল ১০টায় পরীক্ষা শুরু হয়ে চলবে দুপুর ১টা পর্যন্ত। দ্বিতীয় শিফটের পরীক্ষা হবে দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা শুরুর অন্তত ৩০ মিনিট আগে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে হবে। এবার পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে এবং অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে নিয়মিত ও অনিয়মিত মিলিয়ে মোট ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছেন। এর মধ্যে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পরীক্ষার্থী ১০ লাখ ৬৯ হাজার ৭১৪ জন এবং মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ২ লাখ ৮৬৯ জন। মোট পরীক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্র ৬ লাখ ২১ হাজার ৯৬৯ জন এবং ছাত্রী ৬ লাখ ৪৮ হাজার ৬১৪ জন। গত বছরের তুলনায় পরীক্ষার্থী বেড়েছে ১৯ হাজার ৪৭২ জন। লিখিত পরীক্ষা চলবে ৮ আগস্ট পর্যন্ত। এরপর ১৫ আগস্টের মধ্যে ব্যবহারিক পরীক্ষা শেষ করার নির্দেশনা রয়েছে। পরীক্ষা সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও নকলমুক্ত পরিবেশে সম্পন্ন করতে শিক্ষা বোর্ডগুলো ৩৫ দফা নির্দেশনা জারি করেছে। প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা, কেন্দ্র পরিচালনা, পরীক্ষার্থী প্রবেশ, কক্ষ ব্যবস্থাপনা, উত্তরপত্র সংরক্ষণ এবং ডিজিটাল নজরদারির বিষয়ে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতি ২০ জন পরীক্ষার্থীর জন্য একজন করে কক্ষপরিদর্শক দায়িত্ব পালন করবেন। তবে কোনো কক্ষে দুইজনের কম পরিদর্শক রাখা যাবে না। পরীক্ষার্থীদের বসার ক্ষেত্রেও নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ করা হবে। প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরীক্ষা শুরুর তিন দিন আগে ট্রেজারি বা থানা লকারে সংরক্ষিত প্রশ্নপত্র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে যাচাই করা হয়েছে। পরীক্ষার দিন ট্যাগ অফিসার ও পুলিশের পাহারায় প্রশ্নপত্র কেন্দ্রে পৌঁছানো হবে। মোবাইলের মাধ্যমে নির্ধারিত সেট কোড পাওয়ার পরই প্রশ্নপত্র খোলা যাবে। নির্ধারিত সেটের বাইরে কোনো প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এবার দেশের ২ হাজার ৯৯৭টি কেন্দ্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে ১৪৫টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার ৪০টি রাজধানী ঢাকায়। পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা চালু রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কেন্দ্রগুলোর ক্যামেরার তথ্য শিক্ষা বোর্ডে জমা দেওয়া হয়েছে এবং সার্বক্ষণিক ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমে নজরদারি চালানো হবে। কোনো কেন্দ্রে সিসিটিভি অকার্যকর থাকলে বা নিরাপত্তায় শৈথিল্য পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছাড়া অন্য কেউ মোবাইল ফোন বা কোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবেন না। পরীক্ষার্থীরাও কেবল সাধারণ হাতঘড়ি ব্যবহার করতে পারবেন। এছাড়া পরীক্ষা চলাকালে অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তির উপস্থিতি নিষিদ্ধ, শৌচাগার তল্লাশি, প্রশ্ন ও উত্তরপত্র পরিবহনে পুলিশের সম্পৃক্ততা এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের উত্তরপত্র পৃথকভাবে সংরক্ষণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষা উপলক্ষে কেন্দ্রের ২০০ গজের মধ্যে সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। পরীক্ষা সংক্রান্ত সার্বিক সমন্বয় ও জরুরি যোগাযোগের জন্য ঢাকা শিক্ষা বোর্ড কন্ট্রোল রুম চালু করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনেট অধিবেশনে শেখ পরিবারের নামে যে পাঁচ স্থাপনা রয়েছে, সেগুলোর নাম পরিবর্তন না হওয়ায় ক্ষোভে সভা থেকে ‘ওয়াকআউট’ (বর্জন) করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের পাঁচ সদস্য। সোমবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট অধিবেশনে এ ঘটনা ঘটে। সিনেট সভার চেয়ারম্যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখ পরিবারের নামে (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল, রাসেল টাওয়ার, বঙ্গবন্ধু টাওয়ার, সুলতানা কামাল হোস্টেল) পাঁচ স্থাপনার নাম পরিবর্তনের জন্য সিনেট সদস্যদের মতামত আহ্বান করেন। এ সময় সিনেট সদস্য অধ্যাপক লুৎফর রহমান এ সিদ্ধান্তটি সিন্ডিকেট কর্তৃক গৃহীত হয়েছে কি না, জানতে চাইলে সিনেটের চেয়ারম্যান হয়নি বলে জানান। এ ক্ষেত্রে অধ্যাপক লুৎফর রহমান সিনেটের নিয়ম মোতাবেক কোনো সিদ্ধান্ত সিনেটে আসার আগে সিন্ডিকেট কর্তৃক অনুমোদনের জন্য আহ্বান জানান। তবে সে নিয়মকে উপেক্ষা করে নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত এদিনই সিনেট অধিবেশনে নেওয়া যায় কি না, সে দাবি জানান ডাকসুর ভিপি আবু সাদিক কায়েম ও জিএস এস এম ফরহাদ। এস এম ফরহাদ বলেন, ফ্যাসিবাদের আইকনগুলো এখনো থাকায় সেই হলগুলোর শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন জায়গায় বঞ্চিত হচ্ছেন। সে ক্ষেত্রে এ বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলেন তিনি। ডাকসুর ভিপি আবু সাদিক কায়েম একটা ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘স্মৃতিসৌধে শেখ মুজিবুর রহমান হলের শিক্ষার্থীরা ফুল দিতে গেলে সেখানে পুলিশের সদস্যরা তাঁদের দৌড়ানি দেয় শুধু এ নাম দেখে। এরপর এই নাম দেখে ডিবেট ক্লাবে অনেকে ফান্ড না দেওয়ায় কার্যক্রম চালানো যায়নি। এর দ্বারা শিক্ষার্থীরা ভিক্টিমাইজড (ভুক্তভোগী) হচ্ছেন।’ এ সময় উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বিষয়টি সিন্ডিকেটে নিয়ে নিয়ম মোতাবেক পরিবর্তন করার কথা জানালে ডাকসু থেকে মনোনীত পাঁচ সদস্য ওয়াকআউট করেন। এই সদস্যরা হলেন ডাকসুর ভিপি আবু সাদিক কায়েম, জিএস এস এম ফরহাদ, এজিএস মুহা. মহিউদ্দিন, পরিবহন সম্পাদক আসিফ আবদুল্লাহ ও কার্যনির্বাহী সদস্য সাবিকুন্নাহার তামান্না।