শেয়ারবাজারে ইনসাইডার ট্রেডিং, কারসাজি ও তথ্য ফাঁসের মতো অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মাসুদ খান। তিনি বলেছেন, ভবিষ্যতে বাজারে কোনো ধরনের কারসাজি বা ইনসাইডার ট্রেডিংয়ের যৌক্তিক সন্দেহ দেখা দিলে দীর্ঘসূত্রতার সুযোগ না দিয়ে রিয়েল টাইম মনিটরিংয়ের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির শেয়ার লেনদেনও সাময়িকভাবে স্থগিত করা হতে পারে।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর কমিশনের মাল্টিপারপাস হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। একই দিনে কমিশনের তিন নতুন কমিশনারও দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক উপস্থিত ছিলেন।
মাসুদ খান বলেন, অতীতে অনেক ক্ষেত্রে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে ৭ থেকে ১৪ দিন অপেক্ষা করা হতো। কিন্তু এখন থেকে কারসাজি, ইনসাইডার ট্রেডিং বা তথ্য ফাঁসের মতো গুরুতর বিষয়ে যৌক্তিক সন্দেহ দেখা দিলে দ্রুত তদন্ত ও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এসব কর্মকাণ্ড আরও গভীরভাবে তদন্ত করা হবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
তিনি বলেন, বিএসইসির তত্ত্বাবধানে স্টক এক্সচেঞ্জকে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হবে। কোনো কোম্পানির ক্ষেত্রে ইনসাইডার ট্রেডিং, কারসাজি বা তথ্য ফাঁসের সন্দেহ দেখা দিলে প্রয়োজনে ওই কোম্পানির শেয়ার লেনদেন সাময়িকভাবে স্থগিত করা হতে পারে।
নতুন চেয়ারম্যান বলেন, বাজার তদারকির সময় সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড শনাক্ত হলে এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ ও বাজারের সততা রক্ষার প্রয়োজন দেখা দিলে দ্রুত লেনদেন স্থগিত করার নির্দেশ দেওয়া হবে। তবে বিএসইসির উদ্দেশ্য কোনোভাবেই শেয়ারের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা নয়।
তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য বাজারের স্বাভাবিক উত্থান-পতন থামানো নয়। আমরা ফেয়ার প্রাইস বা ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে চাই। পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের জন্য তথ্যের সমান প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে চাই।
মাসুদ খান আরও বলেন, “মূল্য নির্ধারণ করবে বাজার, কারসাজিকারক নয়। সৎ বিনিয়োগকারী ও সৎ উদ্যোক্তাদের ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। তবে যারা বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট করবে, বাজারে কারসাজি করবে কিংবা সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘন করবে, তাদের অতীতের তুলনায় আরও কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।
তিনি বলেন, বাজারে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, বিনিয়োগকারী সুরক্ষা, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং সিকিউরিটিজ আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে কমিশন সম্পূর্ণরূপে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে বাজার তদারকি ও আইন প্রয়োগ বিভাগকে আরও শক্তিশালী করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও জানান, বিএসইসি, স্টক এক্সচেঞ্জ ও সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) সমন্বয়ে একটি আধুনিক সার্ভেইল্যান্স বা বাজার নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। এতে রিয়েল টাইমে বাজার পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা থাকবে। যদিও পুরো বাজার তদারকির আওতায় থাকবে, তবে প্রাথমিক পর্যায়ে ‘জেড’ ক্যাটাগরির সিকিউরিটিজগুলোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই বাজারে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে কঠোর অবস্থানের বার্তা দিয়ে নতুন চেয়ারম্যান জানান, বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং সুষ্ঠু পুঁজিবাজার গঠনে কমিশন সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
বিশ্বজুড়ে চলমান সংঘাত, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে দেশের জনশক্তি রপ্তানি খাতে। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার কারণে গত কয়েক মাসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মী পাঠানোর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। দেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরবে গত ছয় মাসে কর্মী রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় অর্ধেকের বেশি কমেছে। মধ্যপ্রাচ্যের বাকি শ্রমবাজারগুলোর পরিস্থিতিও একই। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বৈদেশিক আয়ে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধাক্কা আসতে পারে। সংকট নিরসনে বিকল্প শ্রমবাজার খোঁজার পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে জোর দেওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। অভিবাসনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সামরিক উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতিকে চরম মন্দার দিকে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে গাজা ও লোহিত সাগরের নিরাপত্তা সংকট আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল, জ্বালানি তেল ও জাহাজ চলাচল খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে যেসব দেশ নতুন নতুন অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্প নিচ্ছিল, তারা অনেক কাজ সাময়িকভাবে স্থগিত বা সংকুচিত করেছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ছয় মাসে বিদেশে কর্মী রপ্তানি বিগত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ২০২৫ সালের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৫ লাখ ৭৯ হাজার ৫৭৯ জন কর্মী বাংলাদেশ থেকে বিদেশে গিয়েছিলেন। অথচ চলতি বছরে এ সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৩৮ হাজার ৯৫৪ জনে। কর্মী রপ্তানি কমায় শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশের বৃহৎ শ্রমবাজার সৌদি আরব। একই অবস্থা কুয়েত, কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোতেও। আঞ্চলিক যুদ্ধের ফলে দেশগুলোর নির্মাণ খাত ও ভারী শিল্পে নতুন কাজের সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। গত ছয় মাসে সৌদি আরবে গেছেন মাত্র ১ লাখ ৬৭ হাজার ৮৫ জন। অথচ ২০২৫ সালের একই সময়ে দেশটিতে পাঠানো হয়েছিল ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৪০০ জন কর্মী। ফলে এক বছরে দেশটিতে কর্মী পাঠানো কমেছে প্রায় ৫৭ শতাংশ। একই অবস্থা মধ্যপ্রাচ্যের বাকি দেশগুলোতেও। কাতারে গত বছর ৫৬ হাজার ৯৬ জন কর্মী গেলেও এ বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৪ হাজার ৪০৩ জনে। কুয়েতে ২৭ হাজার ৮৬ জন থেকে কমে ১৩ হাজার ৭৪৫ জনে দাঁড়িয়েছে। তবে বিপরীত চিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাজারে। গত বছর দেশটিতে যেখানে মাত্র ৬ হাজার ৭৮৯ জন কর্মী গিয়েছিলেন সেখানে চলতি বছরে গেছেন ১৪ হাজার ৮৭৫ জন। এদিকে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে এ সংকটের পেছনে তিনটি বিষয়কে দায়ী করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে রিয়েল এস্টেট ও নির্মাণ খাতে বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় নতুন কর্মীর চাহিদা কমেছে। পাশাপাশি বিমান ভাড়া এবং অন-অ্যারাইভাল প্রশাসনিক খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় রিক্রুটিং এজেন্সির খরচ অনেক বেড়ে গেছে এবং ইউরোপীয় দেশগুলোতে কর্মী পাঠানোর যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, স্থানীয় সীমান্ত নিরাপত্তাজনিত কড়াকড়ি ও অর্থনৈতিক মন্দার কারণে সেখানেও সংকট দেখা দিয়েছে। এজন্য বিকল্প শ্রমবাজার খোঁজার তাগিদ দিচ্ছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, কর্মী রপ্তানির এই ধস সামাল দিতে বাংলাদেশকে এখন একক বাজারকেন্দ্রিক নির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি বিকল্প হিসেবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, পূর্ব ইউরোপ ও আফ্রিকার উদীয়মান বাজারগুলোতে কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে শুধু অদক্ষ শ্রমিকের ওপর নির্ভর না করে কারিগরি ও আইটিতে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে বিদেশে পাঠানোর উদ্যোগ নিতে হবে। যাতে বৈশ্বিক যেকোনো সংকটেও শ্রমবাজার তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত থাকে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বাংলাদেশের শ্রমবাজার মূলত দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক এবং সবচেয়ে বড় নির্ভরতা সৌদি আরবের ওপর। নীতিনির্ধারণী জায়গায় শ্রমবাজারকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সম্প্রসারণ, ঝুঁকি কমানো বা বিকল্প বাজার তৈরির মতো কাঠামোগত উদ্যোগ যথেষ্ট দৃশ্যমান হয়নি। ফলে বড় কোনো সংকট এলে বাংলাদেশকে সরাসরি ধাক্কা খেতে হচ্ছে। বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অঞ্চলটিতে থাকা শ্রমিকদের কাজের নিরাপত্তা ও বেতন নিয়মিত হওয়া নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। যা দীর্ঘ মেয়াদে আমাদের রেমিট্যান্স প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করবে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শক্তিশালী দ্বিপক্ষীয় চুক্তি কাঠামো ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ও অস্থিরতার পর পশ্চিম এশিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ শুরু হলে শ্রমিকের চাহিদা বাড়তে পারে বলে মনে করে সরকার। বৃহস্পতিবার সংসদে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নুর জানান, নতুন শ্রমবাজার খোঁজা এবং বাংলাদেশি কর্মীদের বিদেশে যাওয়ার সুযোগ বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া সফর করেছেন। এরপর গত জুলাইয়ের শেষ দিকে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও মন্ত্রী দেশটি সফর করেন। এর ফলে শিগগিরই মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর পথ আরও সহজ হবে বলে আশা করছে সরকার। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারের এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অনেক নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান চাহিদাপত্র ইস্যু করেও শেষ মুহূর্তে স্থগিত করছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে চলতি অর্থবছর শেষে রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের আঘাত আসতে পারে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টের নামে প্রভাব খাটিয়ে ৪১টি বেসরকারি ব্যাংকের সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল থেকে ২৭৬ কোটি ৩৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার বোন শেখ রেহানা এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সাবেক সভাপতি ও এক্সিম ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম মজুমদারকে আসামি করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে এ মামলা দায়ের করা হয়। দুদক সচিব মো. সাইদুর রহমান জানান, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে অসৎ উদ্দেশ্যে অবৈধ প্রভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে ৪১টি তফসিলি ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ঘটনায় দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৪০৯ ও ১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার এজাহার অনুযায়ী, ১৯৯৪ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ৩০৪১ নম্বর দলিলের মাধ্যমে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ট্রাস্টের গঠনতন্ত্রে শেখ হাসিনাকে আজীবন সভাপতি এবং তার অনুপস্থিতিতে শেখ রেহানাকে সভাপতির দায়িত্ব পালনের কথা উল্লেখ করা হয়। তবে এজাহারে দাবি করা হয়েছে, ট্রাস্টটির সমাজসেবা অধিদপ্তর বা এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর বৈধ অনুমোদন ছিল না। এরপরও আসামিরা পারস্পরিক যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ট্রাস্টের নামে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে সিএসআর তহবিলের অর্থ সংগ্রহ করেন। দুদকের অভিযোগ, ট্রাস্টের পক্ষ থেকে সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনার প্রতিশ্রুতি থাকলেও সে অনুযায়ী কার্যক্রম না করেই ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়। এজাহারে আরও বলা হয়, বিএবির সাবেক সভাপতি মো. নজরুল ইসলাম মজুমদার নিয়ম বহির্ভূতভাবে নির্বাহী কমিটির সভার এজেন্ডায় না থাকা সত্ত্বেও বিষয়টি সভায় উত্থাপন করেন। পরে ৪১টি তফসিলি ব্যাংক থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টকে সিএসআর তহবিল দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে অর্থ পাঠানোর জন্য চিঠি দেওয়া হয়। এ প্রক্রিয়ায় অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে মোট ২৭৬ কোটি ৩৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা গ্রহণ করা হয়েছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী, এভাবে ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে অর্থ গ্রহণের মাধ্যমে রাষ্ট্রের বিপুল আর্থিক ক্ষতি করা হয়েছে এবং অপরাধজনক বিশ্বাসভঙ্গের ঘটনা ঘটেছে।
ঋণ পুনর্গঠনে ছাড় দেওয়ার পরেও দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। এর আগে গত মার্চ শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২.৭৮ শতাংশ। এমন সময়ে খেলাপি ঋণের এই তথ্য এলো, যখন বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি রেকর্ড সর্বনিম্ন ৪.৪৭ শতাংশে নেমে এসেছে। এতে স্পষ্ট যে, ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ায় বিদ্যমান ঋণগুলো ক্রমাগত খেলাপিতে পরিণত হচ্ছে। খেলাপি ঋণে লাগাম টানতে এক বছর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক যে বিশেষ ঋণ পুনঃ তফসিল প্যাকেজ চালু করেছিল, তাতেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে সুবিধা নেওয়া অনেক গ্রাহক পুনরায় খেলাপিতে পরিণত হওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্র্রতি আরো নমনীয় শর্তে দ্বিতীয় বারের মতো বিশেষ পুনঃ তফসিল সুবিধার মেয়াদ বাড়িয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে ঘোষিত বিশেষ সুবিধার আওতায় প্রায় ৩০০ জন ঋণগ্রহীতা তাদের প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার ঋণ পুনঃ তফসিল বা পুনর্গঠন করেছিলেন। ঐ প্যাকেজে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছরের মধ্যে ঋণ পরিশোধের সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। আগের সুবিধা নেওয়া অনেক গ্রাহক এখনো তাদের দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডের মধ্যেই রয়েছেন, তা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ব্যাংক এবার নতুন প্যাকেজের আওতায় তাদের পুনরায় আবেদন করার সুযোগ দিয়েছে। গত ৩১ আগস্ট ঘোষিত সর্বশেষ প্যাকেজে শর্তসমূহ আরো শিথিল করা হয়েছে। এখন থেকে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ থাকা গ্রাহকেরা দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বমোট ১৫ বছর পর্যন্ত ঋণ পুনঃ তফসিল করতে পারবেন। পাশাপাশি ঋণ পুনর্গঠনের মেয়াদ দুই বছর থেকে বাড়িয়ে চার বছর করা হয়েছে। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, আগের সহায়তার পর থেকে শিল্পখাত একের পর এক চাপের মুখোমুখি হয়েছে। আগের সুবিধাটি দেওয়ার পর দেশ গ্যাস-সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। ইরান যুদ্ধের কারণে তেলের দামেও প্রভাব পড়েছে। একাধিকবার অর্থনীতি চাপের মুখে পড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে শিল্প খাতে। সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেই ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা কিছুটা শিথিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প খাতকে পুনরুদ্ধার ও সহায়তা দিতে স্বল্প সুদে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি নতুন প্রণোদনা প্যাকেজ চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আশা করা হচ্ছে, ব্যাবসায়িক গতিশীলতা ফিরলে গ্রাহকেরা ঋণ পরিশোধে সক্ষম হবেন এবং খেলাপি ঋণের পরিমাণও ধীরে ধীরে কমে আসবে। দেশের সব বাণিজ্যিক ব্যাংকই এই প্রণোদনা কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারবে।