অন্তর্বর্তী সরকারের ঘটনাবহুল দেড় বছরের শাসন পেরিয়ে ত্রয়োদশ নির্বাচনে ক্ষমতায় আসা বিএনপির নতুন সরকার কয়েকদিন পর নতুন অর্থবছরের বাজেট দেবে।
তার আগে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি ও সরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা নেমে এসেছে। প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগও নিম্নমুখী।
এ অবস্থায় ক্ষমতার ১০০ দিন পার করা তারেক রহমান সরকারের নেতৃত্বে অর্থনীতি কতটা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে এবং বিনিয়োগ স্থবিরতা কাটবে কীভাবে, সে আলোচনা সামনে এসেছে।
লাগামহীন মূল্যস্ফীতি এড়াতে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি, উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে গতিহীনতা, আর পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি খাতের অস্থিরতায় দেশে শিল্প স্থাপনের নতুন উদ্যোগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণ স্থবির হয়ে আছে।
নতুন সরকার আসায় ব্যবসায়ী ও শিল্প মালিকরা বিনিয়োগ নিয়ে আশবাদী হয়ে উঠলেও ব্যাংক ঋণের সুদের হার বেশি হওয়ায় বিনিয়োগ কতটা বাড়বে—তা নিয়ে সংশ্রয় প্রকাশ করেছেন তারা।
অন্যদিকে বর্তমান সময়কে একটি ‘বহুমাত্রিক’ সংকটের কাল হিসেবে অভিহিত করে অর্থনীতির গবেষক বলছে, নতুন সরকারকে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে; অর্থনীতির চাকা সচল করতে এর বিকল্প কিছু নেই বলে তারা মনে করছেন।
অর্থনীতির গবেষক ও বিশ্ব ব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “নতুন সরকারের মূল্যায়নের সময় এখনও আসেনি। আরও কিছুদিন সময় লাগবে। তবে আমি বলবো—সবার আগে বিনিয়োগের দিকে নজর দিতে হবে।
সেটার লক্ষণ অবশ্য দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। দেখা যাক কী হয়?
সর্বনিম্ন ঋণ প্রবৃদ্ধি
কোরবানির ঈদের ছুটির আগে ২৪ মে বাংলাদেশ ব্যাংক যে ‘উইকলি সিলেক্টেড ইকোনমিক ইন্ডিকেটরস’ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যায়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের নবম মাস মার্চ শেষে বেসরকারি খাতে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৫৪৩ কোটি টাকা।
২০২৫ সালের মার্চ শেষে, অর্থাৎ আগের (২০২৪-২৫) অর্থবছরের নয় মাসে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ১৯ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা।
এ হিসাবে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ। এর মানে হচ্ছে—চলতি বছরের মার্চে ব্যাংকগুলো গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৪ দশমিক ৭২ দশমিক বেশি ঋণ বিতরণ করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে ২০০৩ সাল থেকে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির তথ্য আছে। তাতে দেখা যায়, দুই যুগের মধ্যে গত মার্চ মাসে সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বেসরকারি ঋণে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আসলে দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি। এর আগে এত কম প্রবৃদ্ধি কখনই হয়নি।”
চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ানি-জুন) মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা আছে ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ।
মার্চ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধির হিসাব অনুযায়ী, লক্ষ্যের চেয়ে ৩ দশমিক ৭৮ শতাংশীয় পয়েন্ট কম প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, প্রকৃতপক্ষে ঋণ না বাড়লেও কেবল সুদ যোগ হয়ে স্থিতি বেড়ে সামান্য হলেও প্রবৃদ্ধি হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুদহার বিবেচনায় নিলে প্রকৃতপক্ষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমেছে। কেননা এ খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হিসাব করা হয় সুদহার যোগ করে।
গত মার্চে ব্যাংকগুলো গড়ে ১১ দশমিক ৯৬ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করেছে। আমানতের গড় সুদহার ছিল ৬ দশমিক ২৪ শতাংশ। ঋণ ও আমানতে সুদহারের গড় ব্যবধান (স্প্রেড) ছিল ৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষ মাস জুন শেষে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই সূচকের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের শেষ মাস জুনে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের সময় ২০২৪ সালের অগাস্টে এ প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
যদিও কোভিড মহামারীর সময় বিনিয়োগ স্থবিরতার মধ্যেও ২০২০-২১ অর্থবছরের শেষ মাস জুনে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৭ শতাংশের ওপরে ছিল।
আঁটসাঁট মুদ্রার নীতির উল্টো ফল?
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে মূল্যস্ফীতি চড়তে শুরু করে, এক পর্যায়ে নীতি সুদহার বাড়িয়ে লাগাম টেনে ধরার চেষ্টা করা হয়।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময় ব্যাপক সহিংসতা, অবরোধ, ইন্টারনেট বন্ধসহ নানা কারণে অর্থনীতি ধাক্কা খায়। মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারও ‘মব সন্ত্রাস’সহ নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে আরও আঁটসাঁট মুদ্রানীতির পথে হাঁটে।
গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের সময় কয়েক দফা নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশে আনা হয়, তাতে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ধাক্কা খেলেও মুদ্রাস্ফীতি কমেছে সামান্যই।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএসের সবশেষ তথ্যে দেখা যায়, এপ্রিলে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। তার মানে, গেল বছর এপ্রিলে মাসে যে পণ্য বা সেবা ১০০ টাকায় মিলেছে, তা চলতি বছর এপ্রিলে কিনতে খরচ করতে হয়েছে ১০৯ টাকা ৪ পয়সা।
কিন্তু বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ দুই সূচক বিপরীত ধারায় উল্টো দিকে গেছে।
ফেব্রুয়ারিতে সংসদ নির্বাচন দিয়ে ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নিয়েছে, সে মাসে বেসরকারি ঋণ খাতে প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, কোভিড মহামারীর পর অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর মুখে ইউক্রেইন যুদ্ধ শুরু হয়। তার প্রভাব পড়ে টালমাটাল অর্থনীতিতে।
তারপরেও মহামারীর পর ২০২২ সালের অগাস্টে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশে উঠেছিল। ওই মাসে সার্বিক মূল্যাস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৫২ শতাংশ।
এরপর থেকে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি কমেছে, আর মূল্যস্ফীতি বাড়া-কমার মধ্যে ছিল।
বেসরকারি মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে সঙ্কোচনমুখী মুদ্রানীতি গ্রহণ করছে। ফলে সব ধরনের ঋণের সুদহার বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধিও কমে গেছে।
এক্ষেত্রে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনেরও একটা প্রভাব পড়েছে বলে মনে করেন ব্যাংকের নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ-এবিবির সাবেক এই সভাপতি।
মাহবুবুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, যেকোনো দেশের বিনিয়োগের পূর্বশর্ত হচ্ছে বিনিয়োগ সহায়ক অনুকূল পরিবেশ। মাঝে দেশে স্থিতিশীলতা ছিল না; অনিশ্চয়তা ছিল। ওমন পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করবেন—তেমনটা আশা করা মোটেই সমীচীন ছিল না।
তিনি বলেন, “নতুন সরকার এসেছে; এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে। আশা করছি—বিনিয়োগ বাড়ছে; কর্মসংস্থানও হবে।”
দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও বাংলাদেশ চেম্বারের বর্তমান সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, ইরান যুদ্ধ নতুন সরকারের শুরুতেই বড় ধাক্কা দিয়েছে। এই ধাক্কা সামলে ওঠা খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিজিএমইএর সাবেক এই নেতা বলেন, “যুদ্ধের কারণে গোটা বিশ্বই এখন টালমাটাল; থামবে থামবে বলেও থামছে না। রপ্তানি আয় কমছে। বাড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় দেশে বিনিয়োগ বাড়বে বলে মনে হয় না।
“সবচেয়ে বড় কথা—১৫/১৬ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করবে কে? সত্যিকার অর্থে দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে হলে সুদের হার কমাতেই হবে।”
তিনি বলেন, করোনা ভাইরাস মহামারী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ডলারের দর বৃদ্ধি, দেশের ভেতরে রাজনৈতিক অস্থিরতা-সংঘাত, ইরান যুদ্ধ—একের পর এক ধাক্কায় আমাদের অর্থনীতি চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি বাড়ায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে।
এমনটা চলতে থাকলে আমাদের কপালে কী আছে কে জানে, বলেন আনোয়ার-উল আলম।
এডিপি বাস্তবায়নে ধীরগতি
গত দেড় বছরের বেশি সময় ধরে সরকারের বিনিয়োগে চলছে ধীরগতি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় উন্নয়ন প্রকল্প কাঁটছাঁট করার ধারাবাহিকতায় সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি-এডিপি বাস্তবায়ন মন্থর হয়ে পড়ে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) এডিপি ৪১ দশমিক ৪১ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে ৮৬ হাজার ৫১৬ কোটি ৮ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।
যদিও এডিপির মাধ্যমে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার।
বাস্তবায়নের হার হতাশাজনক হওয়ায় গত ১২ জানুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় এডিপির আকার ৩০ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে ২ লাখ ৮ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়।
এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতেও অর্থবছরের বাকি দুই মাসে (মে ও জুন) ১ লাখ ২২ হাজার ৪২০ কোটি টাকা খরচ করতে হবে সরকারকে।
তার আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম দশ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) ৯৩ হাজার ৪২৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা খরচ হয়েছিল। বাস্তবায়নের হার ছিল ৪১ দশমিক ৩১ শতাংশ।
অর্থাৎ গেল অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ের চেয়ে চলতি অর্থবছরের একই সময়ে ৬ হাজার ৯০৯ কোটি টাকা কম ব্যয় হয়েছে।
কমেছে বিদেশি বিনিয়োগ
সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি কমেছে বিদেশি বিনিয়োগ।
গেল ৬ মে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত নয় মাসের বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যের (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট-বিওপি) তথ্য প্রকাশ করে।
এই তথ্য বলছে, এই নয় মাসে ১০০ কোটি ৬০ লাখ (১ বিলিয়ন) ডলারের নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিযোগ-এফডিআই পেয়েছে বাংলাদেশ। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ১৩১ কোটি ৬০ লাখ (১.৩১ বিলিয়ন) ডলার।
অর্থাৎ জুলাই-মার্চ সময়ে দেশে নিট এফডিআই কমেছে ৩১ কোটি ডলার বা ২৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে মোট যে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আসে, তা থেকে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান তাদের মুনাফার অর্থ দেশে নিয়ে যাওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকে, তাই নিট বিদেশি বিনিয়োগ।
চলতি অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিক অর্থাৎ জানুয়ারি-মার্চ সময়ে ১৯ কোটি ৯০ লাখ ডলারের এফডিআই এসেছে দেশে। গত অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে ৭৮ কোটি ৮০ লাখ ডলারের নিট এফডিআই পেয়েছিল বাংলাদেশ।
দেশে গণতন্ত্রহীনতা নিয়ে সমালোচনার জবাবে ‘উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার’ কথা বলত আওয়ামী লীগ সরকার।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সেই সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে অস্থিরতা, সহিংসতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৭১ কোটি ২০ লাখ (১.৭১ বিলিয়ন) ডলারের নিট বিদেশি বিনিয়োগ পেয়েছিল বাংলাদেশ, যা ছিল আগের অর্থবছরের চেয়ে ২০ দশমিক ১৪ শতাংশ বেশি।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে নিট বিদেশি বিনিয়োগ এসেছিল ১৪২ কোটি ৫০ লাখ (১.৪২ বিলিয়ন) ডলার।
জিডিপির অনুপাতে সবচেয়ে কম বিনিয়োগ
সরকারি হিসাবেই মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির অনুপাতে দশ বছরের মধ্যে বিনিয়োগ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
বিবিএসের হালনাগাদ তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ৪৫৬ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার, টাকার হিসাবে ৫৫ লাখ ১৫ লাখ ২৬ কোটি টাকা। এ সময়ে সব মিলিয়ে দেশে বিনিয়োগ হয়েছে ১৫ লাখ ৭৪ হাজার ৪৯ কোটি টাকা।
এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, জিডিপির ২৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ বিনিয়োগ হয়েছে দেশে। দশ বছর পর জিডিপির সাপেক্ষে বিনিয়োগ ৩০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।
বিবিএসের তথ্য বিশ্লেষণ বলছে, এই বিনিয়োগের মধ্যে বেসরকারি খাতে হয়েছে জিডিপির ২২ দশমিক ০৩ শতাংশ। আর সরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ৬ দশমিক ৫১ শতাংশ।
২০১৫-১৬ অর্থবছরে জিডিপির ২৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ বিনিয়োগ হয়েছিল। এর পর এত কম বিনিয়োগ আর হয়নি দেশে। এমনকি কোভিড মহামারীর সময়েও এর চেয়ে বেশি বিনিয়োগ হয়েছিল।
করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের আগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জিডিপির ৩২ দশমিক ২১ শতাংশ অর্থ দেশে বিনিয়োগ হয়, যা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ। এ সময় বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ছিল জিডিপির ২৫ দশমিক ২৫ শতাংশ। আর সরকারের বিনিয়োগ ছিল ৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ।
কোভিড মহামারীর ধাক্কায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিনিয়োগ কমে জিডিপির ৩১ দশমিক ৩১ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা আরো কমে ৩১ দশমিক ০২ শতাংশ হয়। তখন বেসরকারি বিনিয়োগ ছিল ২৩ দশমিক ৭০ শতাংশ; সরকারের ৭ দশমিক ৩২ শতাংশ।
অর্থনীতির গবেষক জাহিদ হোসেন মনে করেন, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে ঘিরে দেশে বিনিয়োগের একটি আবহ তৈরি হয়েছিল, সে কারণেই ওই সময় দেশে বিনিয়োগ বেড়েছিল।
তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন এক সরকার ক্ষমতায় থাকার ধারাবাহিকতার কারণে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমস্যা থাকলেও অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ছিল। রাজনৈতিক অস্থিরতা খুব একটা ছিল না। ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের মধ্যে স্বস্তি ছিল, আস্থা ছিল। মেগা প্রকল্পগুলো নিয়ে এক ধরনের উৎসাহ-উদ্দীপনা ছিল। সব মিলিয়ে বিনিয়োগের একটা অনুকুল পরিবেশ ছিল দেশে। সে কারণেই বিনিয়োগ খানিকটা বেড়েছিল।
কিন্তু মাঝের দেড় বছর দেশের পরিস্থিতি আমরা সবাই জানি। কোনো কিছুই ঠিকঠাক মতো চলেনি। আইনশৃংখলা পরিস্থিতি ভালো ছিল না। নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে ছিলেন ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা। এ সবের কারণেই দেশে বিনিয়োগে মন্দা দেখা দিয়েছিল।
জাহিদ হোসেন বলেন, নতুন সরকার এসেছে। ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থা ফিরে আসছে। এখন দেখা যাক, কী হয়।
‘বিনিয়োগ সচল না হলে সব আটকে যাবে’
বিএনপি সরকার সরকার অর্থনীতির গতি ফেরাতে বন্ধ কারখানা চালু ও বিশেষ ঋণ প্যাকেজ ঘোষণা করেছে।
৬০ হাজার কোটি টাকার এই প্যাকেজের ৪১ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করা হবে বাণিজ্যিক ব্যাংকে থাকা অতিরিক্ত তারল্য থেকে। বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকার তহবিল দেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
করোনা ভাইরাস মহামারীর পরেও অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে সরকারের তরফে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছিল। এবার বিএনপির নতুন সরকারের এই প্যাকেজে অর্থনীতি কতটা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ’ এর চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম বলেন, দেশের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উত্তরণে বিনিয়োগকে সচল করার কোনো বিকল্প নেই। বিনিয়োগ যদি সচল করা না যায়, তবে কর্মসংস্থান, রপ্তানি, বৈচিত্র্যকরণ এবং উৎপাদনশীলতা—সবকিছুই আটকে যাবে।
বর্তমানে বিনিয়োগ পরিস্থিতি একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে, যা থেকে উত্তরণে বড় ধরনের সংস্কার অপরিহার্য।
তার মতে, বর্তমান সময় একটি বহুমাত্রিক সংকটের কাল।
আমাদের অর্থনীতির চাকা ধীর হয়ে গেছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। এটি বিনিয়োগের জন্য এক অশনিসংকেত।
অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে বিনিয়োগ বাড়াতে, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি তুলে ধরে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান বলেন, বিনিয়োগ পরিবেশ এখন একটি ভাঙা ঘর। এই বাড়ি মেরামত না করে যদি আমরা ভাড়াটে বা বিনিয়োগকারী খুঁজতে যাই, তবে তারা হতাশ হয়ে ফিরে যাবে। তাই নতুন সরকারকে বিনিয়োগেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
এ বিষয়ে তিনটি পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
মাসরুর রিয়াজ বলেন, “যেহেতু আগামী বছরেও রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী হবে না, তাই সরকারকে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) বা বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করতে হবে। যে প্রকল্পগুলো থেকে বাণিজ্যিক রিটার্ন আসার সম্ভাবনা আছে, সেখানে সরকারি টাকা খরচ না করে বেসরকারি খাতকে সুযোগ দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বাজেট বাস্তবায়নের জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে। আর তৃতীয়ত, কেবল উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বা ‘অ্যাসপিরেশনাল প্ল্যান তৈরি করলেই হবে না; এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের ঘটনাবহুল দেড় বছরের শাসন পেরিয়ে ত্রয়োদশ নির্বাচনে ক্ষমতায় আসা বিএনপির নতুন সরকার কয়েকদিন পর নতুন অর্থবছরের বাজেট দেবে। তার আগে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি ও সরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা নেমে এসেছে। প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগও নিম্নমুখী। এ অবস্থায় ক্ষমতার ১০০ দিন পার করা তারেক রহমান সরকারের নেতৃত্বে অর্থনীতি কতটা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে এবং বিনিয়োগ স্থবিরতা কাটবে কীভাবে, সে আলোচনা সামনে এসেছে। লাগামহীন মূল্যস্ফীতি এড়াতে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি, উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে গতিহীনতা, আর পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি খাতের অস্থিরতায় দেশে শিল্প স্থাপনের নতুন উদ্যোগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণ স্থবির হয়ে আছে। নতুন সরকার আসায় ব্যবসায়ী ও শিল্প মালিকরা বিনিয়োগ নিয়ে আশবাদী হয়ে উঠলেও ব্যাংক ঋণের সুদের হার বেশি হওয়ায় বিনিয়োগ কতটা বাড়বে—তা নিয়ে সংশ্রয় প্রকাশ করেছেন তারা। অন্যদিকে বর্তমান সময়কে একটি ‘বহুমাত্রিক’ সংকটের কাল হিসেবে অভিহিত করে অর্থনীতির গবেষক বলছে, নতুন সরকারকে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে; অর্থনীতির চাকা সচল করতে এর বিকল্প কিছু নেই বলে তারা মনে করছেন। অর্থনীতির গবেষক ও বিশ্ব ব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “নতুন সরকারের মূল্যায়নের সময় এখনও আসেনি। আরও কিছুদিন সময় লাগবে। তবে আমি বলবো—সবার আগে বিনিয়োগের দিকে নজর দিতে হবে। সেটার লক্ষণ অবশ্য দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। দেখা যাক কী হয়? সর্বনিম্ন ঋণ প্রবৃদ্ধি কোরবানির ঈদের ছুটির আগে ২৪ মে বাংলাদেশ ব্যাংক যে ‘উইকলি সিলেক্টেড ইকোনমিক ইন্ডিকেটরস’ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যায়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের নবম মাস মার্চ শেষে বেসরকারি খাতে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৫৪৩ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের মার্চ শেষে, অর্থাৎ আগের (২০২৪-২৫) অর্থবছরের নয় মাসে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ১৯ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা। এ হিসাবে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ। এর মানে হচ্ছে—চলতি বছরের মার্চে ব্যাংকগুলো গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৪ দশমিক ৭২ দশমিক বেশি ঋণ বিতরণ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে ২০০৩ সাল থেকে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির তথ্য আছে। তাতে দেখা যায়, দুই যুগের মধ্যে গত মার্চ মাসে সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বেসরকারি ঋণে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আসলে দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি। এর আগে এত কম প্রবৃদ্ধি কখনই হয়নি।” চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ানি-জুন) মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা আছে ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। মার্চ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধির হিসাব অনুযায়ী, লক্ষ্যের চেয়ে ৩ দশমিক ৭৮ শতাংশীয় পয়েন্ট কম প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, প্রকৃতপক্ষে ঋণ না বাড়লেও কেবল সুদ যোগ হয়ে স্থিতি বেড়ে সামান্য হলেও প্রবৃদ্ধি হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুদহার বিবেচনায় নিলে প্রকৃতপক্ষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমেছে। কেননা এ খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হিসাব করা হয় সুদহার যোগ করে। গত মার্চে ব্যাংকগুলো গড়ে ১১ দশমিক ৯৬ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করেছে। আমানতের গড় সুদহার ছিল ৬ দশমিক ২৪ শতাংশ। ঋণ ও আমানতে সুদহারের গড় ব্যবধান (স্প্রেড) ছিল ৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষ মাস জুন শেষে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই সূচকের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের শেষ মাস জুনে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের সময় ২০২৪ সালের অগাস্টে এ প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ। যদিও কোভিড মহামারীর সময় বিনিয়োগ স্থবিরতার মধ্যেও ২০২০-২১ অর্থবছরের শেষ মাস জুনে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৭ শতাংশের ওপরে ছিল। আঁটসাঁট মুদ্রার নীতির উল্টো ফল? আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে মূল্যস্ফীতি চড়তে শুরু করে, এক পর্যায়ে নীতি সুদহার বাড়িয়ে লাগাম টেনে ধরার চেষ্টা করা হয়। ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময় ব্যাপক সহিংসতা, অবরোধ, ইন্টারনেট বন্ধসহ নানা কারণে অর্থনীতি ধাক্কা খায়। মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারও ‘মব সন্ত্রাস’সহ নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে আরও আঁটসাঁট মুদ্রানীতির পথে হাঁটে। গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের সময় কয়েক দফা নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশে আনা হয়, তাতে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ধাক্কা খেলেও মুদ্রাস্ফীতি কমেছে সামান্যই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএসের সবশেষ তথ্যে দেখা যায়, এপ্রিলে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। তার মানে, গেল বছর এপ্রিলে মাসে যে পণ্য বা সেবা ১০০ টাকায় মিলেছে, তা চলতি বছর এপ্রিলে কিনতে খরচ করতে হয়েছে ১০৯ টাকা ৪ পয়সা। কিন্তু বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ দুই সূচক বিপরীত ধারায় উল্টো দিকে গেছে। ফেব্রুয়ারিতে সংসদ নির্বাচন দিয়ে ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নিয়েছে, সে মাসে বেসরকারি ঋণ খাতে প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, কোভিড মহামারীর পর অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর মুখে ইউক্রেইন যুদ্ধ শুরু হয়। তার প্রভাব পড়ে টালমাটাল অর্থনীতিতে। তারপরেও মহামারীর পর ২০২২ সালের অগাস্টে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশে উঠেছিল। ওই মাসে সার্বিক মূল্যাস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৫২ শতাংশ। এরপর থেকে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি কমেছে, আর মূল্যস্ফীতি বাড়া-কমার মধ্যে ছিল। বেসরকারি মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে সঙ্কোচনমুখী মুদ্রানীতি গ্রহণ করছে। ফলে সব ধরনের ঋণের সুদহার বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধিও কমে গেছে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনেরও একটা প্রভাব পড়েছে বলে মনে করেন ব্যাংকের নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ-এবিবির সাবেক এই সভাপতি। মাহবুবুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, যেকোনো দেশের বিনিয়োগের পূর্বশর্ত হচ্ছে বিনিয়োগ সহায়ক অনুকূল পরিবেশ। মাঝে দেশে স্থিতিশীলতা ছিল না; অনিশ্চয়তা ছিল। ওমন পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করবেন—তেমনটা আশা করা মোটেই সমীচীন ছিল না। তিনি বলেন, “নতুন সরকার এসেছে; এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে। আশা করছি—বিনিয়োগ বাড়ছে; কর্মসংস্থানও হবে।” দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও বাংলাদেশ চেম্বারের বর্তমান সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, ইরান যুদ্ধ নতুন সরকারের শুরুতেই বড় ধাক্কা দিয়েছে। এই ধাক্কা সামলে ওঠা খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে। বিজিএমইএর সাবেক এই নেতা বলেন, “যুদ্ধের কারণে গোটা বিশ্বই এখন টালমাটাল; থামবে থামবে বলেও থামছে না। রপ্তানি আয় কমছে। বাড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় দেশে বিনিয়োগ বাড়বে বলে মনে হয় না। “সবচেয়ে বড় কথা—১৫/১৬ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করবে কে? সত্যিকার অর্থে দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে হলে সুদের হার কমাতেই হবে।” তিনি বলেন, করোনা ভাইরাস মহামারী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ডলারের দর বৃদ্ধি, দেশের ভেতরে রাজনৈতিক অস্থিরতা-সংঘাত, ইরান যুদ্ধ—একের পর এক ধাক্কায় আমাদের অর্থনীতি চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি বাড়ায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। এমনটা চলতে থাকলে আমাদের কপালে কী আছে কে জানে, বলেন আনোয়ার-উল আলম। এডিপি বাস্তবায়নে ধীরগতি গত দেড় বছরের বেশি সময় ধরে সরকারের বিনিয়োগে চলছে ধীরগতি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় উন্নয়ন প্রকল্প কাঁটছাঁট করার ধারাবাহিকতায় সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি-এডিপি বাস্তবায়ন মন্থর হয়ে পড়ে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) এডিপি ৪১ দশমিক ৪১ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে ৮৬ হাজার ৫১৬ কোটি ৮ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। যদিও এডিপির মাধ্যমে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। বাস্তবায়নের হার হতাশাজনক হওয়ায় গত ১২ জানুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় এডিপির আকার ৩০ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে ২ লাখ ৮ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতেও অর্থবছরের বাকি দুই মাসে (মে ও জুন) ১ লাখ ২২ হাজার ৪২০ কোটি টাকা খরচ করতে হবে সরকারকে। তার আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম দশ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) ৯৩ হাজার ৪২৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা খরচ হয়েছিল। বাস্তবায়নের হার ছিল ৪১ দশমিক ৩১ শতাংশ। অর্থাৎ গেল অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ের চেয়ে চলতি অর্থবছরের একই সময়ে ৬ হাজার ৯০৯ কোটি টাকা কম ব্যয় হয়েছে। কমেছে বিদেশি বিনিয়োগ সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি কমেছে বিদেশি বিনিয়োগ। গেল ৬ মে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত নয় মাসের বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যের (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট-বিওপি) তথ্য প্রকাশ করে। এই তথ্য বলছে, এই নয় মাসে ১০০ কোটি ৬০ লাখ (১ বিলিয়ন) ডলারের নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিযোগ-এফডিআই পেয়েছে বাংলাদেশ। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ১৩১ কোটি ৬০ লাখ (১.৩১ বিলিয়ন) ডলার। অর্থাৎ জুলাই-মার্চ সময়ে দেশে নিট এফডিআই কমেছে ৩১ কোটি ডলার বা ২৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ। বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে মোট যে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আসে, তা থেকে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান তাদের মুনাফার অর্থ দেশে নিয়ে যাওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকে, তাই নিট বিদেশি বিনিয়োগ। চলতি অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিক অর্থাৎ জানুয়ারি-মার্চ সময়ে ১৯ কোটি ৯০ লাখ ডলারের এফডিআই এসেছে দেশে। গত অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে ৭৮ কোটি ৮০ লাখ ডলারের নিট এফডিআই পেয়েছিল বাংলাদেশ। দেশে গণতন্ত্রহীনতা নিয়ে সমালোচনার জবাবে ‘উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার’ কথা বলত আওয়ামী লীগ সরকার। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সেই সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে অস্থিরতা, সহিংসতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৭১ কোটি ২০ লাখ (১.৭১ বিলিয়ন) ডলারের নিট বিদেশি বিনিয়োগ পেয়েছিল বাংলাদেশ, যা ছিল আগের অর্থবছরের চেয়ে ২০ দশমিক ১৪ শতাংশ বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নিট বিদেশি বিনিয়োগ এসেছিল ১৪২ কোটি ৫০ লাখ (১.৪২ বিলিয়ন) ডলার। জিডিপির অনুপাতে সবচেয়ে কম বিনিয়োগ সরকারি হিসাবেই মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির অনুপাতে দশ বছরের মধ্যে বিনিয়োগ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। বিবিএসের হালনাগাদ তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ৪৫৬ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার, টাকার হিসাবে ৫৫ লাখ ১৫ লাখ ২৬ কোটি টাকা। এ সময়ে সব মিলিয়ে দেশে বিনিয়োগ হয়েছে ১৫ লাখ ৭৪ হাজার ৪৯ কোটি টাকা। এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, জিডিপির ২৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ বিনিয়োগ হয়েছে দেশে। দশ বছর পর জিডিপির সাপেক্ষে বিনিয়োগ ৩০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। বিবিএসের তথ্য বিশ্লেষণ বলছে, এই বিনিয়োগের মধ্যে বেসরকারি খাতে হয়েছে জিডিপির ২২ দশমিক ০৩ শতাংশ। আর সরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ৬ দশমিক ৫১ শতাংশ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে জিডিপির ২৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ বিনিয়োগ হয়েছিল। এর পর এত কম বিনিয়োগ আর হয়নি দেশে। এমনকি কোভিড মহামারীর সময়েও এর চেয়ে বেশি বিনিয়োগ হয়েছিল। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের আগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জিডিপির ৩২ দশমিক ২১ শতাংশ অর্থ দেশে বিনিয়োগ হয়, যা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ। এ সময় বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ছিল জিডিপির ২৫ দশমিক ২৫ শতাংশ। আর সরকারের বিনিয়োগ ছিল ৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ। কোভিড মহামারীর ধাক্কায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিনিয়োগ কমে জিডিপির ৩১ দশমিক ৩১ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা আরো কমে ৩১ দশমিক ০২ শতাংশ হয়। তখন বেসরকারি বিনিয়োগ ছিল ২৩ দশমিক ৭০ শতাংশ; সরকারের ৭ দশমিক ৩২ শতাংশ। অর্থনীতির গবেষক জাহিদ হোসেন মনে করেন, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে ঘিরে দেশে বিনিয়োগের একটি আবহ তৈরি হয়েছিল, সে কারণেই ওই সময় দেশে বিনিয়োগ বেড়েছিল। তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন এক সরকার ক্ষমতায় থাকার ধারাবাহিকতার কারণে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমস্যা থাকলেও অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ছিল। রাজনৈতিক অস্থিরতা খুব একটা ছিল না। ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের মধ্যে স্বস্তি ছিল, আস্থা ছিল। মেগা প্রকল্পগুলো নিয়ে এক ধরনের উৎসাহ-উদ্দীপনা ছিল। সব মিলিয়ে বিনিয়োগের একটা অনুকুল পরিবেশ ছিল দেশে। সে কারণেই বিনিয়োগ খানিকটা বেড়েছিল। কিন্তু মাঝের দেড় বছর দেশের পরিস্থিতি আমরা সবাই জানি। কোনো কিছুই ঠিকঠাক মতো চলেনি। আইনশৃংখলা পরিস্থিতি ভালো ছিল না। নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে ছিলেন ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা। এ সবের কারণেই দেশে বিনিয়োগে মন্দা দেখা দিয়েছিল। জাহিদ হোসেন বলেন, নতুন সরকার এসেছে। ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থা ফিরে আসছে। এখন দেখা যাক, কী হয়। ‘বিনিয়োগ সচল না হলে সব আটকে যাবে’ বিএনপি সরকার সরকার অর্থনীতির গতি ফেরাতে বন্ধ কারখানা চালু ও বিশেষ ঋণ প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। ৬০ হাজার কোটি টাকার এই প্যাকেজের ৪১ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করা হবে বাণিজ্যিক ব্যাংকে থাকা অতিরিক্ত তারল্য থেকে। বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকার তহবিল দেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। করোনা ভাইরাস মহামারীর পরেও অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে সরকারের তরফে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছিল। এবার বিএনপির নতুন সরকারের এই প্যাকেজে অর্থনীতি কতটা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ’ এর চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম বলেন, দেশের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উত্তরণে বিনিয়োগকে সচল করার কোনো বিকল্প নেই। বিনিয়োগ যদি সচল করা না যায়, তবে কর্মসংস্থান, রপ্তানি, বৈচিত্র্যকরণ এবং উৎপাদনশীলতা—সবকিছুই আটকে যাবে। বর্তমানে বিনিয়োগ পরিস্থিতি একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে, যা থেকে উত্তরণে বড় ধরনের সংস্কার অপরিহার্য। তার মতে, বর্তমান সময় একটি বহুমাত্রিক সংকটের কাল। আমাদের অর্থনীতির চাকা ধীর হয়ে গেছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। এটি বিনিয়োগের জন্য এক অশনিসংকেত। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে বিনিয়োগ বাড়াতে, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি তুলে ধরে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান বলেন, বিনিয়োগ পরিবেশ এখন একটি ভাঙা ঘর। এই বাড়ি মেরামত না করে যদি আমরা ভাড়াটে বা বিনিয়োগকারী খুঁজতে যাই, তবে তারা হতাশ হয়ে ফিরে যাবে। তাই নতুন সরকারকে বিনিয়োগেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। এ বিষয়ে তিনটি পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। মাসরুর রিয়াজ বলেন, “যেহেতু আগামী বছরেও রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী হবে না, তাই সরকারকে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) বা বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করতে হবে। যে প্রকল্পগুলো থেকে বাণিজ্যিক রিটার্ন আসার সম্ভাবনা আছে, সেখানে সরকারি টাকা খরচ না করে বেসরকারি খাতকে সুযোগ দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, বাজেট বাস্তবায়নের জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে। আর তৃতীয়ত, কেবল উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বা ‘অ্যাসপিরেশনাল প্ল্যান তৈরি করলেই হবে না; এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে।
দেশের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল ও শক্তিশালী করতে এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে ‘প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রণোদনা স্কিম নীতিমালা, ২০২৬’-এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। এই যুগান্তকারী নীতিমালার আওতায় বিশেষ আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রণোদনা দেওয়ার মাধ্যমে প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধা ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত অনাবাসী বাংলাদেশিসহ দেশের সব সাধারণ নাগরিককে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ দেশে আনতে সক্রিয়ভাবে অবদান রাখার সুযোগ তৈরি করে দিল সরকার। বৃহস্পতিবার (৪ জুন) রাতে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই নীতিমালার নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে পাঠানো এক বিশেষ সরকারি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দেশের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক খাতের এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। মন্ত্রিসভার এই নতুন সিদ্ধান্তের ফলে এখন থেকে কোনো বাংলাদেশী নাগরিক বা প্রবাসী উদ্যোক্তা যদি আন্তর্জাতিক কোনো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান বা বিদেশি বিনিয়োগকারীকে বাংলাদেশে শিল্প স্থাপন বা বাণিজ্যিক প্রজেক্টে অর্থায়নে উদ্বুদ্ধ ও সফল করতে পারেন, তবে সরকার তাঁকে এই নীতিমালার আলোকে বিশেষ স্বীকৃতি ও আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করবে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও ডলার সংকটের এই সময়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে সরকারের এই কৌশলগত উদ্যোগ অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। এই নীতিমালার মাধ্যমে প্রবাসীরা কেবল রেমিট্যান্স পাঠানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে, দেশের শিল্পায়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে সরাসরি অংশ নেওয়ার আইনি সুযোগ লাভ করলেন। আজকের একই মন্ত্রিসভার বৈঠকে দেশের চিকিৎসা খাতের আধুনিকায়ন ও উচ্চতর গবেষণার মানোন্নয়নে ‘বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সংশোধন) আইন, ২০২৬’–এর খসড়ারও নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাসেবা, চিকিৎসাশিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক মানের গবেষণার পরিধি ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব অর্থায়নে মুনাফাভিত্তিক বা অমুনাফাভিত্তিক স্বায়ত্তশাসিত কোম্পানি বা সংগঠন গঠন করতে পারবে। একই সাথে এই ধরণের কোম্পানি বা সহযোগী সংগঠনের শেয়ার অর্জন, অংশীদারিত্ব ও পরিচালনার সুনির্দিষ্ট বিধান অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যেই এই আইনটি সংশোধন করা অত্যন্ত প্রয়োজন বলে মনে করে মন্ত্রিসভা। এই আইন পাস হলে দেশের মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজস্ব গবেষণালব্ধ ফলাফল বা ফার্মাসিউটিক্যালস আবিষ্কার বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে নিজস্ব তহবিল গঠনে স্বাবলম্বী হতে পারবে। বৈঠকের শেষ অংশে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বিপুল ভোটে সাইপ্রাসের প্রার্থীকে পরাজিত করে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় পুরো মন্ত্রিসভার পক্ষ থেকে তাঁকে আন্তরিক অভিনন্দন ও রাষ্ট্রীয় শুভেচ্ছা জানানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও মন্ত্রিসভার সদস্যরা একযোগে উল্লেখ করেন যে, বিশ্বমঞ্চের এই শীর্ষ পদে বাংলাদেশের এই বিজয় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের কূটনৈতিক মর্যাদা ও ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানকে এক নতুন এবং সুদৃঢ় উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
দেশের কর ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে হাঁটছে সরকার। প্রতি বছর বাজেটে করহার ও করমুক্ত আয়সীমা নিয়ে অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে এবার প্রথমবারের মতো দীর্ঘমেয়াদি কর পরিকল্পনা বা ‘ট্যাক্স রোডম্যাপ’ ঘোষণা করতে যাচ্ছে সরকার। আগামী ১১ জুন জাতীয় বাজেটের মাধ্যমে ২০৩০-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত ব্যক্তি করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা, করহার এবং কর কাঠামো সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হতে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এই পরিকল্পনার আওতায় বর্তমান ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার করমুক্ত আয়সীমা ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ২০৩০-৩১ অর্থবছরে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত করা হবে। অর্থাৎ আগামী পাঁচ বছরে করমুক্ত আয়সীমা এক লাখ টাকা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। করদাতাদের জন্য এটি এক ধরনের ‘মাস্টারপ্ল্যান’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ এর মাধ্যমে চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী এবং বিনিয়োগকারীরা আগাম জানতে পারবেন ভবিষ্যতে তাদের কর দায় কতটা বাড়তে বা কমতে পারে। ফলে ব্যক্তিগত আর্থিক পরিকল্পনা, সঞ্চয়, বিনিয়োগ এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনা আরও সহজ হবে। কেন আসছে এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা? বাংলাদেশে এতদিন করনীতি মূলত এক বছরের জন্য নির্ধারণ করা হতো। প্রতি বাজেটের আগে করমুক্ত আয়সীমা বাড়বে কিনা, করহার পরিবর্তন হবে কিনা কিংবা নতুন কোনও কর আরোপ করা হবে কিনা—তা নিয়ে করদাতাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হতো। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকার এখন কর ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, পূর্বানুমানযোগ্য এবং বিনিয়োগবান্ধব করতে চায়। সেই লক্ষ্য থেকেই দীর্ঘমেয়াদি কর পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ১৪ মে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এ পরিকল্পনার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছেন। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী তার প্রথম বাজেটেই এই রোডম্যাপ তুলে ধরতে পারেন। কোন বছরে করমুক্ত আয় কত হবে? বর্তমানে একজন ব্যক্তি বছরে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করলে আয়কর দিতে হয় না। সরকারের নতুন পরিকল্পনায় ধাপে ধাপে এই সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী— বর্তমানে করমুক্ত আয়সীমা: ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ২০২৭-২৮ অর্থবছর: ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, ২০২৮-২৯ অর্থবছর: ৪ লাখ টাকা, ২০২৯-৩০ অর্থবছর: ৪ লাখ টাকা, ২০৩০-৩১ অর্থবছর: ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। অর্থাৎ আগামী পাঁচ বছরে করমুক্ত আয়ের সীমা ধীরে ধীরে বাড়ানো হবে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনায় রেখে সাধারণ করদাতাদের কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কারা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন? কর বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন পরিকল্পনার ফলে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের করদাতারা সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবেন। বিশেষ করে যাদের বার্ষিক আয় করমুক্ত সীমার কাছাকাছি, তারা কিছুটা কর সাশ্রয়ের সুযোগ পাবেন। চাকরিজীবীদের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভবিষ্যৎ আয়, সঞ্চয় এবং বিনিয়োগ পরিকল্পনা করতে কর কাঠামো সম্পর্কে আগে থেকেই ধারণা পাওয়া যাবে। ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরাও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা প্রণয়নে সুবিধা পাবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। মূল্যস্ফীতির বাস্তবতায় কতটা কার্যকর হবে? যদিও করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর পরিকল্পনাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা, তবে অনেকের প্রশ্ন—এই বৃদ্ধি কি বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? বাংলাদেশে ২০২৩ সালের মার্চ থেকে মূল্যস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে প্রায় ৯ শতাংশের আশপাশে রয়েছে। খাদ্য, বাসাভাড়া, পরিবহন, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ০৪ শতাংশ। এই অবস্থায় অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত করার চেয়ে ৫ লাখ টাকা বা তারও বেশি করা প্রয়োজন ছিল। তাদের মতে, কয়েক বছর আগে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার যে ক্রয়ক্ষমতা ছিল, বর্তমানে সেই একই জীবনযাত্রার মান বজায় রাখতে অনেক বেশি অর্থ প্রয়োজন হচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, সরকারের এই উদ্যোগের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো নীতির পূর্বানুমানযোগ্যতা। তাদের মতে, করদাতারা যদি আগেই জানতে পারেন আগামী কয়েক বছরে কর কাঠামো কী হবে, তাহলে তারা নিজেদের আর্থিক পরিকল্পনা আরও ভালোভাবে করতে পারবেন। ‘মিডল ক্লাস স্কুইজ’-এর আশঙ্কা করনীতি বিশ্লেষকরা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কথা বলছেন। সেটি হলো ‘মিডল ক্লাস স্কুইজ’ বা মধ্যবিত্তের ওপর অতিরিক্ত চাপ। তাদের মতে, যদি শুধু করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হয় কিন্তু পরবর্তী কর স্তরগুলো অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে মধ্যবিত্ত করদাতারা দ্রুত উচ্চ করসীমার আওতায় চলে যেতে পারেন। ফলে কাগজে-কলমে তাদের আয় বাড়লেও বাস্তবে করের বোঝা আরও বাড়তে পারে। ‘ব্র্যাকেট ক্রিপ’ কী? বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, দীর্ঘ সময় ধরে একই করসীমা বহাল থাকলে ‘ব্র্যাকেট ক্রিপ’ নামে একটি সমস্যা দেখা দেয়। ধরা যাক, মূল্যস্ফীতির কারণে একজন চাকরিজীবীর বেতন বেড়েছে। কিন্তু সেই বেতন বৃদ্ধি যদি কেবল মূল্যস্ফীতির ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার জন্য হয়, তাহলে প্রকৃত অর্থে তার জীবনমানের উন্নতি হয়নি। কিন্তু করসীমা অপরিবর্তিত থাকলে তিনি উচ্চতর করস্তরে প্রবেশ করবেন এবং আগের তুলনায় বেশি কর দিতে বাধ্য হবেন। বিশ্বের অনেক দেশ এই সমস্যা এড়াতে করসীমাকে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বয় করে থাকে। সরকারের জন্যও চ্যালেঞ্জ কম নয় একদিকে করদাতাদের স্বস্তি দিতে হবে, অন্যদিকে রাজস্ব আদায়ও বাড়াতে হবে। কারণ বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও অনেক উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় কম। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংকসহ উন্নয়ন সহযোগীরা দীর্ঘদিন ধরে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। এ কারণে সরকারকে করদাতাদের স্বার্থ এবং রাজস্ব আহরণের প্রয়োজন— দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে। এনবিআর সংস্কারের সঙ্গেও রয়েছে সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি কর রোডম্যাপ ঘোষণার বিষয়টি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চলমান সংস্কার প্রক্রিয়ার সঙ্গেও সম্পর্কিত। সরকার ইতোমধ্যে করনীতি প্রণয়ন ও কর প্রশাসনকে পৃথক করার উদ্যোগ নিয়েছে। এর ফলে করনীতি নির্ধারণে দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সামনে কী অপেক্ষা করছে? অর্থনীতিবিদদের মতে, ২০৩১ সাল পর্যন্ত করমুক্ত আয়সীমা ও করনীতির রোডম্যাপ ঘোষণা বাংলাদেশের কর ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন হতে পারে। এটি করদাতাদের জন্য যেমন স্বচ্ছতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতা তৈরি করবে, তেমনি বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে মূল্যস্ফীতির গতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যতে কর কাঠামো কতটা বাস্তবমুখীভাবে সমন্বয় করা হয় তার ওপর। সব মিলিয়ে করদাতাদের জন্য সরকারের এই নতুন ‘মাস্টারপ্ল্যান’ কর ব্যবস্থায় একটি নতুন যুগের সূচনা করতে পারে। এখন দেখার বিষয়, ঘোষিত রোডম্যাপ বাস্তব জীবনে সাধারণ মানুষের করের চাপ কতটা কমাতে পারে এবং মূল্যস্ফীতির অভিঘাত থেকে কতটা সুরক্ষা দিতে সক্ষম হয়।