সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট সরকারি ডিগ্রি কলেজ ক্যাম্পাসে টিকটক, লাইকিসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ধারণ ও প্রচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ।
সোমবার (২৭ অক্টোবর) দুপুরে কলেজের অধ্যক্ষ মো. জুনাব আলী স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কলেজ চলাকালীন ও পাঠদানের সময় কলেজ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কলেজ ক্যাম্পাসে মোবাইল, ক্যামেরা কিংবা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইস দিয়ে ভিডিও ধারণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। শিক্ষার্থীদের টিকটক বা লাইকিতে কলেজ ক্যাম্পাসের সচিত্র ধারণকৃত ভিডিওতে দেখা গেলে বা কলেজ ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীর কাছে স্মার্টফোন পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ ক্ষেত্রে আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে কলেজ প্রশাসন।
কলেজ সূত্রে জানা যায়, বেশ কিছুদিন ধরে কিছু শিক্ষার্থী ও বহিরাগতরা কলেজ ক্যাম্পাসে টিকটক ও লাইকির ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করছিল, যা কলেজের শৃঙ্খলা, শিক্ষার পরিবেশ ও মর্যাদার পরিপন্থি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে কলেজ প্রশাসন এমন নির্দেশনা জারি করেছে।
কলেজের অধ্যক্ষ মো. জুনাব আলী বলেন, আমরা চাই শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় মনোযোগী হোক, কলেজের পরিবেশ যেন শিক্ষাবান্ধব থাকে। টিকটক বা লাইকির মতো প্ল্যাটফর্মে ভিডিও তৈরি করা শিক্ষার্থীদের মনোযোগ নষ্ট করে এবং শিক্ষাঙ্গণের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে। তাই এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। নিয়ম ভঙ্গ করলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, কলেজ ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীর কাছে স্মার্টফোন পাওয়া গেলে বা ভিডিও ধারণের প্রমাণ মিললে, কলেজ প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারিতে গ্যাস নিঃসরণজনিত দুর্ঘটনায় নয়জনের প্রাণহানির এক দিন পরও ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের জাহাজটির বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসমুক্ত করার কাজ শেষ হয়নি। শনিবার দিনভর চেষ্টার পরেও ওই জাহাজের দুর্ঘটনা ঘটা অংশে গ্যাস ‘বিপজ্জনক মাত্রার নিচে’ নামানো সম্ভব হয়নি। বিকালে বিশেষজ্ঞরা গ্যাস মুক্ত করার কাজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেন। রোববার আবার ওই কাজ শুরু হবে। প্রাণহানির ওই ঘটনায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি শনিবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে সভা করেছে। ১১ সদস্যের ওই কমিটি রোববার ফেরদৌস শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে জাহাজটি পরিদর্শনে যাবে। শনিবার দুপুরে ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড পরিদর্শনে গিয়ে শিল্প সচিব আব্দুন নাসের খান বলেন, “আমরা দেখছি কেন ঘটনাটা ঘটল। যদি এখানে কারও কোনো অবহেলা থেকে থাকে, দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে ভবিষ্যতে যেন এরকম ঘটনা না ঘটে।” ‘ওয়াটার ট্যাংকে জমেছিল’ বিষাক্ত গ্যাস ২৮০ মিটার দৈর্ঘে্যর এলএনজিবাহী ‘এমটি রাসি’ নামের জাহাজটি ভাঙার জন্য ২০২৫ সালের জুলাই মাসে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারি স্টেশন রোড এলাকার ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে নিয়ে আসা হয়। শুক্রবার সকালে ওই জাহাজের নিচের দিকের একটি অংশে কাটার কাজ চলছিল। একটি ট্যাংকারের একাংশ কাটার পর সেটি সরিয়ে নিতে গেলে গ্যাসের প্রভাবে অচেতন হয়ে যান কয়েকজন। পরে তাদের উদ্ধারে গিয়ে বাকিরাও অচেতন হয়ে যান। ওই ঘটনায় নয়জনের প্রাণ যায়; চিকিৎসাধীন আছেন ৭ জন। জাহাজটি কাটার আগে অনুমোদন নেওয়ার বিষয়ে বিস্ফোরক অধিদপ্তর চট্টগ্রামের পরিদর্শক এস এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “জাহাজ বিচিং (তীরে ভেড়ানো) এর সময় আমরা কার্গো ট্যাংক পরীক্ষা করে থাকি। তেল ও গ্যাস কার্গো ট্যাংক পরিদর্শন শেষে আমরা অনুমতি দিই। “এটারও কার্গো ট্যাংক পরিদর্শন করা হয়েছিল। কার্গো ট্যাংকে কিছু হয়নি। যে ঘটনা ঘটেছে সেটা ওয়াটার ট্যাংকে। তাতে গ্যাস জমে গিয়েছিল। সেটা কীভাবে ও কেন হয়েছে, তা তদন্ত শেষে জানা যাবে।” শনিবার দুপুরে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “শুক্রবার বিকালে আমরা দুর্ঘটনা এলাকা পরিদর্শন করি। মাল্টি গ্যাস ডিটেক্টরের মাধ্যমে হাইড্রোজেন সালফাইড অতিরিক্ত মাত্রায় ছিল বলে শনাক্ত করতে পেরেছি। আমাদের ধারণা ঘটনার মূল কারণ হাইড্রোজেন সালফাইডের বিষাক্ততা।” তিনি বলেন, “সমন্বিত যে কমিটি হয়েছে, কমিটির মাধ্যমে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যে হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতি আমরা পেয়েছি সেটাকে বের করে নিরাপদ করা হবে। পরে অন্য কোনো কারণ আছে কিনা খতিয়ে দেখা হবে।” ফায়ার সার্ভিস ও বিস্ফোরক অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞ দল জাহাজের ওই অংশে যান। তারা শনিবার বিকাল পর্যন্ত সেখানে কাজ করেন। রাতে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের পরিদর্শক সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “হাইড্রোজেন সালফাইড পানিতে মিশে থাকে এমন একটি ভারী গ্যাস। এই গ্যাস সরাতে হলে পানি দিয়ে বের করতে হবে। কিন্তু এটা করার মত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সেখানে নেই। তাই আজ কাজ স্থগিত রাখা হয়েছে। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “২০ পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন) পর্যন্ত হাইড্রোজেন সালফাইড সহনীয়। ২০-১০০ পিপিএম হল বিপজ্জনক মাত্রার। ১০০ পিপিএম এর উপর এই গ্যাস প্রাণঘাতী।” স্থানীয়রা বলছেন, শুক্রবার দুর্ঘটনার পর অচেতন হয়ে পড়াদের উদ্ধারে যারা জাহাজের ওই অংশে গিয়েছিল তারাও অচেতন হয়ে পড়ে। আর যারা ওই জাহাজটির কাছাকাছি এগিয়ে গিয়েছিলেন তারাও তীব্র গ্যাসের গন্ধ পেয়েছেন। ফায়ার সার্ভিস চট্টগ্রাম অঞ্চলের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ তৌফিকুল ইসলাম ভুঁইয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আজ (শনিবার) বিকালে পরিবেশ অধিদপ্তর মাল্টি ডিটেকটর দিয়ে পরিমাপ করে দেখেছে। সেখানে ৮৪ পিপিএম, মানে উচ্চমাত্রার গ্যাস রয়ে গেছে। “গ্যাসের এরকম উপস্থিতি থাকায় আজ আর কাজ করা হয়নি। কাল আবার কাজ শুরু হবে।” বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ড (বিএসআরবি) এর মহাপরিচালক এ এস এম শফিউল আলম তালুকদার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দুর্ঘটনাস্থলে পানি দিলে বিষাক্ত গ্যাস সরে যাচ্ছিল। পরে আবার গ্যাসের অস্তিত্ব পাওয়ায় আজ (শনিবার) কাজ স্থগিত রাখা হয়েছে।” জাহাজটি সাগরের তীরে ভিড়িয়ে ভাঙার কাজ চলছে। জাহাজের দুর্ঘটনা যে অংশে ঘটেছে সেখানে জোয়ারের পানি আসা-যাওয়া করে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, দুর্ঘটনাস্থলে জমা হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস জোয়ারের পানিতে মিশে আশেপাশে ছড়িয়ে আছে। মামলা হয়েছিল ফেরদৌস স্টিল শিপ ইয়ার্ডে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ঘাটতি থাকায় গত জুলাই মাসে মামলা করেছিল কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর। শ্রমিকদের নিরাপত্তা বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন না করা, ঝুঁকি মূল্যায়নের প্রতিবেদন না দেওয়া এবং নির্ধারিত সময়ের বেশি কাজ করালেও অতিরিক্ত সময়ের টাকা না দেওয়ার অনিয়ম ধরা পড়ে ওই শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে। চলতি বছরের শুরুর দিকে পরিদর্শনে অনিয়ম ধরা পড়ে। বিষয়গুলো সংশোধনে প্রতিষ্ঠানটিকে একাধিকবার নোটিশ দেয় কলকারখানা অধিদপ্তর। তবে যথাযথ জবাব না পেয়ে জুলাই মাসে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে মামলা করা হয়। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা নিয়মিত বিভিন্ন কারখানা পরিদর্শন করি। সেখানে শ্রমিকরা যাযথ বেতন-বোনাস ও চাকরির বেনিফিট পান কিনা, নিরাপত্তার জন্য সরঞ্জাম আছে কিনা এবং আরো কিছু বিষয় আমরা দেখি। “এরকম নিরাপত্তাজনিত কিছু বিষয়ে ঘাটতি থাকায় নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল।” কোনো জাহাজ কাটার আগে গ্যাস মুক্ত করেই তা কাটতে হয় জানিয়ে তিনি বলেন, “এক্ষেত্রে সেটা হয়েছে কিনা, তা টেকনিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বিশেষজ্ঞরা বলতে পারবেন। তদন্ত কমিটি হয়েছে। কমিটি তথ্য সংগ্রহ ও তদন্ত শেষে প্রতিবেদন দেবে।” জাহাজটিতে গ্যাস নিঃসরণজনিত দুর্ঘটনায় নয়জনের প্রাণহানির পর ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের কার্যক্রম স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ড। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ইয়ার্ডটির সব কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে।
কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্তব্যরত নারী চিকিৎসকদের ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’ ছাড়া অন্য কোনো সম্বোধন না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ জন্য জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসকের কক্ষের দরজায় হাতে লেখা একটি নির্দেশনাও টানানো হয়। এতে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে অসন্তুষ্টি দেখা দিয়েছে। নির্দেশনাটির ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। আজ শুক্রবার বিকেলে বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। পরে নির্দেশনাটি সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলে জানান মুরাদনগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে থাকা আবুল কালাম আজাদ। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, সরকারি চাকরির বিধিমালায় কোনো চিকিৎসককে ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’ বলে সম্বোধন করতেই হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। জরুরি বিভাগের দরজায় এমন নির্দেশনা লাগানোকে ‘অযৌক্তিক’ বলে মন্তব্য করেছেন আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেন, ‘সরকারি চাকরির বিধিমালায়ও এমন কোনো নির্দেশনা নেই। জরুরি বিভাগের দরজায় লাগানো নির্দেশনাটির বিষয়টি আজ আমার নজরে এসেছে। বিকেলে আমি নিজে স্টাফদের মাধ্যমে সেটি ছিঁড়ে ফেলেছি। একজন চিকিৎসকের সবচেয়ে বড় গুণ হলো তিনি মানবিক হবেন। রোগীদের সেবা দেওয়াই তাঁর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। স্যার ও ম্যাডাম—এভাবে বলতেই হবে, এমন নির্দেশনা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।’ হাসপাতালের একটি সূত্র জানায়, প্রায় এক মাস আগে জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসকের দরজায় হাতে লেখা ওই নির্দেশনা টানানো হয়। বিষয়টি নিয়ে হাসপাতালের ভেতরেও আলোচনা–সমালোচনা ছিল। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্দেশনাটির ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে যাওয়া বেশির ভাগ মানুষই গ্রামের মানুষ। তাঁদের কেউ হতদরিদ্র, কেউ কম শিক্ষিত, আবার কেউ সহজ–সরল প্রকৃতির। আঞ্চলিক ভাষা ও প্রচলিত সামাজিক রীতি অনুযায়ী তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসকদের ‘ভাই’ বা ‘আপা’ বলে সম্বোধন করেন। এতে চিকিৎসকদের অসম্মান করার কোনো উদ্দেশ্য থাকে না বলে তাঁরা জানান। তাঁদের মতে, চিকিৎসা নিতে এসে সম্বোধনের ধরন নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়া রোগীদের জন্য অস্বস্তিকর। সম্প্রতি মুরাদনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নেওয়া নবীপুর এলাকার বাসিন্দা ফাতেমা বেগম বলেন, ‘আমরা গ্রামের মানুষ। মহিলাগোরে আপা আর পুরুষদের ভাই বইল্যা ডাকি। এই হাসপাতালের ডাক্তাররারে ভাই বা আপা কইলে তারা চেইত্যা যায়। সেবা দেওনের বদলে উল্টা রাগারাগি করে।’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের এক কর্মচারী বলেন, কয়েক মাস আগে হাসপাতালে নতুন কয়েকজন নারী চিকিৎসক যোগ দেওয়ার পর এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ওই কর্মচারী বলেন, ‘আমিও একবার এক নারী চিকিৎসককে “আপা” বলে সম্বোধন করেছিলাম। এতে তিনি রাগান্বিত হন এবং পরে “ম্যাডাম” অথবা “স্যার” বলে সম্বোধন করতে বলেন।’ তবে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেরই কয়েকজন চিকিৎসক জানান, এমন নির্দেশনার কারণে পুরো হাসপাতালের চিকিৎসকদের নিয়ে যেন নেতিবাচক ধারণা তৈরি না হয়। তাঁদের মতে, চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যে পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখার পাশাপাশি রোগীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাই গুরুত্বপূর্ণ। কোন নারী চিকিৎসকের কারণে ওই নির্দেশনা লাগানো হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নন বলে জানান উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেন, ‘এই হাসপাতালে নবীন কয়েকজন নারী ডাক্তার আছেন। তাঁদের মধ্য থেকে কারও কারণে এমন নির্দেশনা দরজায় লাগানো হয়েছে বলে শুনেছি। তবে নির্দিষ্ট কোনো ডাক্তার বা কোন নারী চিকিৎসকের কারণে এমন অদ্ভুত নির্দেশনা লাগানো হয়েছে, সেটি আমি খতিয়ে দেখছি।’ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির বিষয়ে খোঁজ নিয়ে দেখবেন বলে জানান কুমিল্লার সিভিল সার্জন আলী নূর মোহাম্মদ বশীর আহমেদ। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘আমি চাকরি করি মানুষকে সেবা দেওয়ার জন্য। এটাই আমার দায়িত্ব। আমাকে কেউ “তুই” বলে সম্বোধন করলেও আমি কিছু মনে করি না। মুরাদনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিষয়টি আমার জানা নেই। বিষয়টির বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে দেখব। কোনো ডাক্তারকে স্যার ও ম্যাডাম বলে ডাকতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।’
হবিগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে টানা তৃতীয় দিনের মতো গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এতে জেলার ছোট-বড় ১৭১টি শিল্পকারখানার প্রায় সবকটির উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। কোথাও শ্রমিকরা অলস সময় কাটাচ্ছেন, আবার কোথাও তাদের ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকলে চাকরি হারানোর আশঙ্কায় শ্রমিকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ছাঁটাই আতঙ্ক। গ্যাসের অভাবে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও শ্রমিকদের বেতন, বিদ্যুৎ, রক্ষণাবেক্ষণসহ অন্যান্য খরচ বহন করতে হচ্ছে শিল্পমালিকদের। এতে প্রতিদিনই বাড়ছে লোকসান। উদ্যোক্তাদের দাবি, গ্যাস সংকটের কারণে প্রতিদিন শত শত কোটি টাকার উৎপাদন ও রপ্তানি আয় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এরই মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠানের বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার বাতিল হতে শুরু করেছে। স্কয়ার ডেনিম লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মাজেদ হোসেন বলেন, শুক্রবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত তাদের কারখানায় গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি শূন্য ছিল। তিনি বলেন, ‘মেশিন, বিদ্যুৎ—সবকিছু বন্ধ। বেশি সময় এভাবে বন্ধ থাকলে মেশিনগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ তিনি জানান, কারখানার একটি লাইনে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ১ লাখ ২ হাজার ৫৯৭ ঘনমিটার এবং অপর লাইনে ৮৬ হাজার ২৮ ঘনমিটার। অথচ প্রায় তিন দিন ধরে কোনো গ্যাসই পাওয়া যাচ্ছে না। এসএম স্পিনিংয়ের মহাব্যবস্থাপক মো. আবুল বাশার বলেন, প্রতি মাসে তাদের প্রায় ১০ লাখ ৩৫ হাজার ঘনমিটার গ্যাস প্রয়োজন। সে হিসাবে দৈনিক প্রয়োজন প্রায় ৩৪ হাজার ৫০০ ঘনমিটার। তিনি বলেন, ‘শুক্রবার সকালে ৬০ শতাংশ গ্যাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দুপুর ১২টায় হঠাৎ সরবরাহ ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। এ অবস্থায় মেশিন চালানো অত্যন্ত কঠিন। বারবার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করলে মেশিনও বিকল হয়ে যেতে পারে।’ আবুল বাশার আরও বলেন, ‘প্রতিনিয়ত ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। মালিকপক্ষ কতদিন লোকসান গুনবে? এভাবে চলতে থাকলে একসময় মানুষ চাকরি হারাবে।’ তিনি জানান, ইতোমধ্যে তাদের রপ্তানি ১৩ শতাংশ কমে গেছে। বিভিন্ন কোম্পানির অর্ডার বাতিল হচ্ছে বলেও জানান তিনি। তার ভাষ্য, শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কয়েক লাখ মানুষের জীবিকা জড়িত। সুতা থেকে কাপড় তৈরি এবং সেই কাপড় রপ্তানি না হলে পুরো সরবরাহব্যবস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা জানান, গ্যাস না থাকায় অনেক কারখানার ইটিপি (বর্জ্য শোধনাগার) বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘ সময় ইটিপি বন্ধ থাকলে এর ভেতরের প্রয়োজনীয় ব্যাকটেরিয়া মারা যেতে পারে। এতে প্রতিষ্ঠানগুলো বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ার পাশাপাশি পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কাও রয়েছে। তাই অন্তত ইটিপি চালু রাখার মতো গ্যাস সরবরাহের দাবি জানান তিনি। গ্যাস সংকটে উদ্বিগ্ন শ্রমিকরাও। স্থানীয় একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মচারী ফরাস দেবনাথ বলেন, কয়েকদিন ধরেই গ্যাসের চাপ কম থাকায় ঠিকমতো উৎপাদন করা যাচ্ছিল না। এখন পুরোপুরি গ্যাস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কারখানার কাজও বন্ধ। তিনি বলেন, ‘কারখানা বন্ধ থাকায় শ্রমিক-কর্মচারীরা অলস সময় পার করছেন। এভাবে দীর্ঘদিন চললে আমাদের আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যাবে। সংসার চালানো কঠিন হবে। চাকরি থাকবে কি না, সেটাও নিয়ে আমরা চিন্তায় আছি।’ শ্রমিক রুজিনা বেগম বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন কাজ করে সংসার চালাই। কারখানা বন্ধ থাকলে আমাদের কাজ নেই, আয়ও নেই। কতদিন এভাবে চলবে, সেটাও জানি না। দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে আমাদের মতো শ্রমিকদের পরিবার সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়বে।’ গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব শুধু শিল্পকারখানা ও শ্রমিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; মাধবপুরের আবাসিক এলাকা ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। মাধবপুর শিল্পাঞ্চল ঘিরে গড়ে ওঠা আবাসিক এলাকাগুলোর অনেক বাড়িওয়ালার প্রধান আয়ের উৎস শ্রমিকদের কাছ থেকে পাওয়া বাড়িভাড়া। আবার অনেকেই ব্যাংকঋণ নিয়ে বাড়ি নির্মাণ করেছেন। ফলে শিল্পকারখানা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে শ্রমিকদের বেতন বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি বাড়িভাড়া আদায়েও সংকট তৈরি হতে পারে। বাড়ির মালিক মো. হোসাইন আহমেদ বলেন, ‘মাধবপুরে অনেক মানুষ ব্যাংক থেকে হাউজ লোন নিয়ে বাড়ি করেছেন। এসব বাড়িতে শিল্পকারখানার শ্রমিক-কর্মচারীরা ভাড়া থাকেন। কারখানা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে শ্রমিকরা বেতন পাবেন না। বেতন না পেলে অনেকেই সময়মতো বাড়িভাড়া দিতে পারবেন না। তখন বাড়ির মালিকরাও বিপদে পড়বেন। কারণ আমাদেরও ব্যাংকের কিস্তি দিতে হয়।’ তিনি বলেন, ‘একটা কারখানা বন্ধ মানে শুধু শ্রমিকের সমস্যা নয়। এর সঙ্গে বাড়িওয়ালা, দোকানদার, পরিবহন শ্রমিকসহ অনেক মানুষের আয়-রোজগার জড়িত। তাই দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা দরকার।’ সিলেট জোন শিল্প পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিল্লুল রায় জানান, হবিগঞ্জ জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে ১৭১টি শিল্পকারখানা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিতে শিল্প পুলিশ কাজ করছে। তবে কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক ও কর্মকর্তাদের দাবি, গ্যাস সংকটের এই সময়ে তারা এখনো শিল্প পুলিশের কার্যকর উপস্থিতি দেখতে পাননি। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেলার এসব শিল্পকারখানায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেড় লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানান, প্রায় ২০ দিন ধরে হবিগঞ্জে গ্যাস সংকট চলছে। প্রথমদিকে চাহিদার তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ বা এক-চতুর্থাংশ গ্যাস সরবরাহ করা হলেও কোনোভাবে উৎপাদন চালু রাখা হয়েছিল। কিন্তু বুধবার (১২ আগস্ট) থেকে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গ্যাসের অভাবে অনেক প্রতিষ্ঠানের ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে উৎপাদনের পাশাপাশি বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনাতেও সংকট তৈরি হয়েছে। সার্বিক বিষয়ে জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক মো. রুহুল করিম চৌধুরী বলেন, ‘সারাদেশের যে অবস্থা, আমাদেরও একই অবস্থা। কোনো উন্নতি নেই, আগের মতোই আছে। গতরাতে (বৃহস্পতিবার) কিছুটা গ্যাস পেয়েছিলাম। কিন্তু কিছু সময় পরই আবার আগের মতো বন্ধ হয়ে গেছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা শুনেছিলাম ১৫ আগস্ট থেকে পরিস্থিতি ঠিক হবে। কিন্তু অফিসিয়ালি আমাদের কিছু জানানো হয়নি। আমরা শুধু বিতরণ করি। গ্যাসের নিয়ন্ত্রণ করে পেট্রোবাংলা।’ এর আগে গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। শিল্প উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে উৎপাদন ক্ষতির পাশাপাশি রপ্তানি বাজারেও বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একের পর এক অর্ডার বাতিল হলে দীর্ঘমেয়াদে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা হারানোর ঝুঁকিও রয়েছে। অন্যদিকে, কারখানা বন্ধ থাকলে শ্রমিকদের আয় কমবে, বাড়িভাড়া আদায়ে সংকট তৈরি হবে এবং ব্যাংকঋণের কিস্তি পরিশোধেও চাপ বাড়বে। ফলে হবিগঞ্জের শিল্পাঞ্চলের গ্যাস সংকট এখন শুধু কারখানার উৎপাদন বন্ধের সমস্যা নয়; এটি শ্রমিক, বাড়িওয়ালা, ব্যবসায়ী ও ঋণগ্রহীতাসহ স্থানীয় অর্থনীতির বড় একটি অংশকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। শিল্প উদ্যোক্তা, শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করে শিল্পকারখানার উৎপাদন সচল করা হোক।