চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারিতে গ্যাস নিঃসরণজনিত দুর্ঘটনায় নয়জনের প্রাণহানির এক দিন পরও ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের জাহাজটির বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসমুক্ত করার কাজ শেষ হয়নি।
শনিবার দিনভর চেষ্টার পরেও ওই জাহাজের দুর্ঘটনা ঘটা অংশে গ্যাস ‘বিপজ্জনক মাত্রার নিচে’ নামানো সম্ভব হয়নি। বিকালে বিশেষজ্ঞরা গ্যাস মুক্ত করার কাজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেন। রোববার আবার ওই কাজ শুরু হবে।
প্রাণহানির ওই ঘটনায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি শনিবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে সভা করেছে। ১১ সদস্যের ওই কমিটি রোববার ফেরদৌস শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে জাহাজটি পরিদর্শনে যাবে।
শনিবার দুপুরে ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড পরিদর্শনে গিয়ে শিল্প সচিব আব্দুন নাসের খান বলেন, “আমরা দেখছি কেন ঘটনাটা ঘটল। যদি এখানে কারও কোনো অবহেলা থেকে থাকে, দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে ভবিষ্যতে যেন এরকম ঘটনা না ঘটে।”
‘ওয়াটার ট্যাংকে জমেছিল’ বিষাক্ত গ্যাস
২৮০ মিটার দৈর্ঘে্যর এলএনজিবাহী ‘এমটি রাসি’ নামের জাহাজটি ভাঙার জন্য ২০২৫ সালের জুলাই মাসে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারি স্টেশন রোড এলাকার ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে নিয়ে আসা হয়।
শুক্রবার সকালে ওই জাহাজের নিচের দিকের একটি অংশে কাটার কাজ চলছিল। একটি ট্যাংকারের একাংশ কাটার পর সেটি সরিয়ে নিতে গেলে গ্যাসের প্রভাবে অচেতন হয়ে যান কয়েকজন। পরে তাদের উদ্ধারে গিয়ে বাকিরাও অচেতন হয়ে যান।
ওই ঘটনায় নয়জনের প্রাণ যায়; চিকিৎসাধীন আছেন ৭ জন।
জাহাজটি কাটার আগে অনুমোদন নেওয়ার বিষয়ে বিস্ফোরক অধিদপ্তর চট্টগ্রামের পরিদর্শক এস এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “জাহাজ বিচিং (তীরে ভেড়ানো) এর সময় আমরা কার্গো ট্যাংক পরীক্ষা করে থাকি। তেল ও গ্যাস কার্গো ট্যাংক পরিদর্শন শেষে আমরা অনুমতি দিই।
“এটারও কার্গো ট্যাংক পরিদর্শন করা হয়েছিল। কার্গো ট্যাংকে কিছু হয়নি। যে ঘটনা ঘটেছে সেটা ওয়াটার ট্যাংকে। তাতে গ্যাস জমে গিয়েছিল। সেটা কীভাবে ও কেন হয়েছে, তা তদন্ত শেষে জানা যাবে।”
শনিবার দুপুরে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “শুক্রবার বিকালে আমরা দুর্ঘটনা এলাকা পরিদর্শন করি। মাল্টি গ্যাস ডিটেক্টরের মাধ্যমে হাইড্রোজেন সালফাইড অতিরিক্ত মাত্রায় ছিল বলে শনাক্ত করতে পেরেছি। আমাদের ধারণা ঘটনার মূল কারণ হাইড্রোজেন সালফাইডের বিষাক্ততা।”
তিনি বলেন, “সমন্বিত যে কমিটি হয়েছে, কমিটির মাধ্যমে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যে হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতি আমরা পেয়েছি সেটাকে বের করে নিরাপদ করা হবে। পরে অন্য কোনো কারণ আছে কিনা খতিয়ে দেখা হবে।”
ফায়ার সার্ভিস ও বিস্ফোরক অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞ দল জাহাজের ওই অংশে যান। তারা শনিবার বিকাল পর্যন্ত সেখানে কাজ করেন।
রাতে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের পরিদর্শক সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “হাইড্রোজেন সালফাইড পানিতে মিশে থাকে এমন একটি ভারী গ্যাস। এই গ্যাস সরাতে হলে পানি দিয়ে বের করতে হবে। কিন্তু এটা করার মত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সেখানে নেই। তাই আজ কাজ স্থগিত রাখা হয়েছে।
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “২০ পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন) পর্যন্ত হাইড্রোজেন সালফাইড সহনীয়। ২০-১০০ পিপিএম হল বিপজ্জনক মাত্রার। ১০০ পিপিএম এর উপর এই গ্যাস প্রাণঘাতী।”
স্থানীয়রা বলছেন, শুক্রবার দুর্ঘটনার পর অচেতন হয়ে পড়াদের উদ্ধারে যারা জাহাজের ওই অংশে গিয়েছিল তারাও অচেতন হয়ে পড়ে। আর যারা ওই জাহাজটির কাছাকাছি এগিয়ে গিয়েছিলেন তারাও তীব্র গ্যাসের গন্ধ পেয়েছেন।
ফায়ার সার্ভিস চট্টগ্রাম অঞ্চলের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ তৌফিকুল ইসলাম ভুঁইয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আজ (শনিবার) বিকালে পরিবেশ অধিদপ্তর মাল্টি ডিটেকটর দিয়ে পরিমাপ করে দেখেছে। সেখানে ৮৪ পিপিএম, মানে উচ্চমাত্রার গ্যাস রয়ে গেছে।
“গ্যাসের এরকম উপস্থিতি থাকায় আজ আর কাজ করা হয়নি। কাল আবার কাজ শুরু হবে।”
বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ড (বিএসআরবি) এর মহাপরিচালক এ এস এম শফিউল আলম তালুকদার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দুর্ঘটনাস্থলে পানি দিলে বিষাক্ত গ্যাস সরে যাচ্ছিল। পরে আবার গ্যাসের অস্তিত্ব পাওয়ায় আজ (শনিবার) কাজ স্থগিত রাখা হয়েছে।”
জাহাজটি সাগরের তীরে ভিড়িয়ে ভাঙার কাজ চলছে। জাহাজের দুর্ঘটনা যে অংশে ঘটেছে সেখানে জোয়ারের পানি আসা-যাওয়া করে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, দুর্ঘটনাস্থলে জমা হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস জোয়ারের পানিতে মিশে আশেপাশে ছড়িয়ে আছে।
মামলা হয়েছিল
ফেরদৌস স্টিল শিপ ইয়ার্ডে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ঘাটতি থাকায় গত জুলাই মাসে মামলা করেছিল কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর।
শ্রমিকদের নিরাপত্তা বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন না করা, ঝুঁকি মূল্যায়নের প্রতিবেদন না দেওয়া এবং নির্ধারিত সময়ের বেশি কাজ করালেও অতিরিক্ত সময়ের টাকা না দেওয়ার অনিয়ম ধরা পড়ে ওই শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে।
চলতি বছরের শুরুর দিকে পরিদর্শনে অনিয়ম ধরা পড়ে। বিষয়গুলো সংশোধনে প্রতিষ্ঠানটিকে একাধিকবার নোটিশ দেয় কলকারখানা অধিদপ্তর। তবে যথাযথ জবাব না পেয়ে জুলাই মাসে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে মামলা করা হয়।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা নিয়মিত বিভিন্ন কারখানা পরিদর্শন করি। সেখানে শ্রমিকরা যাযথ বেতন-বোনাস ও চাকরির বেনিফিট পান কিনা, নিরাপত্তার জন্য সরঞ্জাম আছে কিনা এবং আরো কিছু বিষয় আমরা দেখি।
“এরকম নিরাপত্তাজনিত কিছু বিষয়ে ঘাটতি থাকায় নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল।”
কোনো জাহাজ কাটার আগে গ্যাস মুক্ত করেই তা কাটতে হয় জানিয়ে তিনি বলেন, “এক্ষেত্রে সেটা হয়েছে কিনা, তা টেকনিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বিশেষজ্ঞরা বলতে পারবেন। তদন্ত কমিটি হয়েছে। কমিটি তথ্য সংগ্রহ ও তদন্ত শেষে প্রতিবেদন দেবে।”
জাহাজটিতে গ্যাস নিঃসরণজনিত দুর্ঘটনায় নয়জনের প্রাণহানির পর ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের কার্যক্রম স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ড। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ইয়ার্ডটির সব কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
বিকেলে নির্জন সৈকতে হাঁটুপানি পর্যন্ত নেমে গোসল করছিলেন ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে বেড়াতে আসা দুই দলের ১২ জন। হঠাৎ একের পর এক বড় ঢেউ আছড়ে পড়ে তাঁদের ওপর। পায়ের নিচ থেকে সরে যায় বালু, ভেসে যায় একটি দল। গত বুধবার বিকেলে কক্সবাজারের হিমছড়ি সৈকতে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় দলটি। এই ঘটনায় পাঁচজন প্রাণ হারান। এটি একটি ঘটনা। কক্সবাজারের সৈকতে এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। অপর্যাপ্ত লাইফগার্ড সেবা, বৈরী আবহাওয়ায় সাগরে নেমে গোসল, সাঁতার না জানার পর গভীর পানিতে যাওয়ায় এমন দুর্ঘটনা বাড়ছে। ২০১৪ সাল থেকে পর্যটকদের উদ্ধারে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা সি-সেফ লাইফগার্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সাল থেকে চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী এলাকায় সাগরে ডুবে ৮৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ১ হাজার ১২০ জনকে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত তিন বছরে মারা গেছেন ৪৬ জন। এর মধ্যে গত বছর ২০ জন এবং তার আগের বছর ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২০২২ ও ২০২৩ সালে ছয়জন করে পর্যটকের মৃত্যু হয়। সমুদ্রবিজ্ঞানী ও আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাগরের আবহাওয়া ও ঢেউয়ের ধরনে ঘন ঘন পরিবর্তন ঘটছে। জোয়ারের পানি প্রবল বেগে তীরে আছড়ে পড়ায় সৈকতের বিভিন্ন স্থানে গুপ্তখাল ও গভীর গর্ত তৈরি হচ্ছে। সর্বশেষ দুর্ঘটনা যেভাবে গত বুধবার বিকেলে কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে রামু উপজেলার হিমছড়ির প্যাঁচারদ্বীপে মেরিনা রিসোর্টের জাদুঘরসংলগ্ন সৈকতে নেমেছিলেন ওই ১২ জন। এই ঘটনায় সর্বশেষ গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এস এম নাফিসুর রহমান নিবিড়ের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ নিয়ে পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করা হলো। এ ছাড়া মুমূর্ষু অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন রাকিব হাসান (১৯) নামের একজন। এই দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে ফেরা চট্টগ্রামের মোহাম্মদ সানি বলেন, ‘আমরা হাঁটুপানিতে নেমেছিলাম। হঠাৎ বড় বড় ঢেউ পরপর আমাদের ওপর আছড়ে পড়ে। উল্টো স্রোতে ভেসে যাচ্ছিলাম। সবাই হাবুডুবু খাচ্ছিলাম। পায়ের নিচ থেকে বালু সরে যাচ্ছিল। কোনোমতে পাঁচ-ছয়জন তীরে উঠে আসতে পারলেও ছয়জন সাগরে তলিয়ে যান।’ সমুদ্র দেখতে এসে গোসল করতে নেমে পর্যটকের মৃত্যুর আরেকটি বড় ঘটনা ঘটেছিল ২০২৫ সালের জুলাইয়ে। সেই সময় হিমছড়ির এই সৈকতে গোসল করতে নেমে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) তিন শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়। অরিত্র হাসান নামে বিশ্ববিদ্যালয়টির উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের এক শিক্ষার্থীর খোঁজও মেলেনি। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাগরে ডুবে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন মেহেরপুর সদরের হেলাল উদ্দিন নামে এক ব্যক্তি। তিন কিলোমিটার সৈকতের বাইরে নেই সুরক্ষাব্যবস্থা কক্সবাজারের নাজিরারটেক থেকে টেকনাফের বদরমোকাম পর্যন্ত প্রায় ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত। এর মধ্যে শহরের লাবণী থেকে কলাতলী পর্যন্ত তিন কিলোমিটার এলাকায় গোসল করতে নেমে বিপদে পড়া পর্যটকদের উদ্ধারের ব্যবস্থা রয়েছে। এর বাইরে দরিয়ানগর, হিমছড়ি, ইনানী, পাটুয়ারটেক ও টেকনাফের কয়েকটি সৈকতে প্রতিদিন হাজারো পর্যটক গোসল করতে নামেন। এসব এলাকায় কেউ গুপ্তখাল বা উল্টো স্রোতে পড়ে ভেসে গেলে তাৎক্ষণিক উদ্ধারের ব্যবস্থা নেই। জেলা প্রশাসনের বিচ কর্মীদের সুপারভাইজার মাহবুব আলম বলেন, সাম্প্রতিক ভারী বৃষ্টি ও উত্তাল সাগরের কারণে সৈকতের বিভিন্ন স্থানে গুপ্তখাল ও বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করে লাল নিশানা টাঙানো এবং মাইকিং করে পর্যটকদের সতর্ক করা হচ্ছে। তবে নির্জন সৈকতগুলোতে এই ব্যবস্থা নেই। বৈরী আবহাওয়ায় বদলাচ্ছে সাগরের পরিস্থিতি চলতি বছর বৈরী আবহাওয়ার কারণে সমুদ্রে অন্তত ১১ বার সতর্কসংকেত জারি করা হয়েছিল। এপ্রিল থেকে বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করছে। অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে সাগর শান্ত হওয়ার কথা থাকলেও এখনো তা উত্তাল। পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের প্রভাবে সৈকতের বিভিন্ন স্থানে বালিয়াড়ি ভেঙে গুপ্তখাল ও গভীর খাদ তৈরি হয়েছে। কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মোহাম্মদ আবদুল হান্নান বলেন, নভেম্বর পর্যন্ত ঘূর্ণিঝড় কিংবা দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই সাগরে নামার আগে জোয়ার-ভাটার সময়সূচি ও আবহাওয়া সম্পর্কে জানা জরুরি। ২০২৪ সালের অক্টোবরে সৈকতের ভাঙন ও গুপ্তখাল নিয়ে গবেষণা করছেন বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বোরি) বিজ্ঞানীরা। তাঁদের গবেষণায় জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডের কারণে সৈকতের গঠনে ঘন ঘন পরিবর্তন ঘটার তথ্য উঠে এসেছে। বোরির সামুদ্রিক পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান আবু শরীফ মো. মাহবুব-ই কিবরিয়া বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আবহাওয়ার অস্বাভাবিক আচরণ বাড়ছে। চার-পাঁচ বছর ধরে কক্সবাজার উপকূলের সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রে এর বড় প্রভাব দেখা যাচ্ছে। এই প্রসঙ্গে কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি আ ন ম হেলাল উদ্দিন বলেন, বাস, রেল ও উড়োজাহাজে আসা পর্যটকদের সৈকতে নামার আগে সতর্কতা ও বিপদ এড়ানোর উপায় জানানো জরুরি। ঝুঁকিপূর্ণ সৈকতে পর্যটকদের বিচরণ নিয়ন্ত্রণেও ব্যবস্থা নিতে হবে।
কুমিল্লার লালমাইয়ে দেশীয় অস্ত্র ও এয়ারগানসহ কিশোর গ্যাংয়ের এক নেতাকে গ্রেফতার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় উপজেলার বেলঘর ইউনিয়নের ইছাপুর এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এসআরবি জানায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অস্ত্রের মহড়ার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি যাচাই-বাছাই শুরু করা হয়। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, কিশোর গ্যাং লিডার আসিফ নিজ বাড়িতে দেশীয় অস্ত্র ও পাইপগান তৈরির সঙ্গে জড়িত। এরপর ওই বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ সময় ১৬টি ছোট-বড় রামদা, চাকু-চাপাতি, দুটি এয়ারগান, এক বক্স কার্তুজ, একটি ড্রিল মেশিন, একটি কাটার মেশিন ও একটি সামুরাই উদ্ধার করা হয়। এসআরবি-১১ সিপিসি-২ কোম্পানি কমান্ডার মেজর সাদমান ইবনে আলম বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্রের প্রদর্শন করতেন আসিফ। বিষয়টি আমাদের নজরে এলে গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে খোঁজ-খবর নিয়ে আজ সন্ধ্যায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে বিপুল দেশীয় অস্ত্রসহ আসিফকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
কানের স্বর্ণের দুল, সামান্য সম্পদের লোভ এবং মাদকের প্রতিবাদ করায় আপন ছোট ভাই ও ভাবির চক্রান্তে নওগাঁয় হত্যার শিকার হয়েছেন ৬৫ বছরের বৃদ্ধা হালিমা বেগম। ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে নিহত হালিমার ছোট ভাই মজনু রহমান (৫৬) ও তার স্ত্রী হোসনে আরাসহ (৪২) মোট ৫ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বুধবার (২১ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নওগাঁ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম এসব তথ্য জানান।গ্রেফতারকৃত অন্য আসামিরা হলেন— রবিউল ইসলাম (৩৯), হামিদুর রহমান (৫৫) এবং মোশারফ হোসেন (৪৫)। একই সাথে তাদের কাছ থেকে হত্যায় ব্যবহৃত রশি ও ওড়না জব্দ করা হয়েছে। এসপি মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম জানান, গত ১৯ অক্টোবর সকালে ছিলিমপুর (তালবোনা) গ্রামের এক বাঁশঝাড়ের পাশে ধানী জমির আইলে হালিমা বেগমের রক্তাক্ত লাশ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয়রা। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখতে পায়, বৃদ্ধার একটি কানের লতি কাটা ও অন্যটি ছেঁড়া অবস্থায় রয়েছে। ঘটনার পরপরই ধামইরহাট থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হলে গভীর রাতে অভিযান চালিয়ে প্রথমে মজনু ও তার স্ত্রীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে তাদের দেওয়া স্বীকারোক্তি অনুযায়ী আলমপুর ও ছিলিমপুর এলাকা থেকে বাকি তিন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়। এসপি বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা জানায় নিঃসন্তান ও স্বামী পরিত্যক্তা হালিমা বেগম তার বাবার বাড়িতে ছোট ভাই মজনুর ঘরের পেছনে এক ছাপড়া ঘরে বসবাস করতেন। মানুষের বাড়িতে কাজ করার পাশাপাশি গরু, ছাগল ও হাঁস-মুরগি পালন করে তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন। হালিমার জমানো টাকা ও গবাদিপশুর প্রতি মজনু ও তার স্ত্রীর লোভ ছিল। এর পাশাপাশি স্থানীয় মাদক বিক্রিতে বাধা দেওয়ায় রবিউল এবং জমিজমা সংক্রান্ত পুরোনো বিরোধের কারণে হামিদুর ও মোশারফ হালিমার ওপর ক্ষুব্ধ ছিল। এসব কারণে ঘটনার প্রায় ৫ দিন পূর্বে পাঁচজন মিলে হালিমাকে হত্যার পরিকল্পনা করে। এসপি আরও বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৮ অক্টোবর রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে আসামি হামিদুর কৌশলে হালিমাকে ঘর থেকে ডেকে বের করে। আসামিরা তাৎক্ষণিক তার মুখ চেপে ধরে ২০০ গজ দূরে খড়ের পালার পেছনে নিয়ে যায়। সেখানে তার হাত রশি দিয়ে বেঁধে পরিহিত ওড়না গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। এরপর কানের সোনার দুল খুলে নেওয়ার জন্য হামিদুর নৃশংসভাবে বৃদ্ধার এক কানের লতি কেটে ও অপর কানের লতি ছিঁড়ে ফেলে। পরে লাশটি বাঁশঝাড়ের আড়ালে ফেলে রেখে আসামিরা কানের দুল দুটি ভাগ বাটোয়ারা করে পালিয়ে যায়। আসামিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ শেষ করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।