দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষি বিকল্প নেই। কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে প্রচলিত প্রবাদটি যথার্থই। কৃষিই পারে দেশের অর্থনৈতিক চাকা ঘুড়িয়ে দিতে। এ জন্য দরকার সঠিক পরিকল্পনা ও তদারকি। দেশের অর্থনৈতিক খাতের অন্যতম অংশীদার শিল্প ও সেবা খাত বাদে একমাত্র কৃষিখাতই নিরবচ্ছিন্নভাবে উৎপাদনমুখী খাত হিসেবে বিবেচিত হয়ে আছে এবং থাকবে।
২০২৪-২৫ সালে জিডিপিতে পৌনে ১৩ শতাংশ অবদান রেখেছে কৃষি খাত। চলতি শুষ্ক মৌসুমে দিনাজপুর-রংপুর অঞ্চল থেকে ন্যূনতম দশ হাজার কোটি টাকার বেশি ফসল উৎপাদিত হবে। যা সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে যুক্ত হবে। আর কয়েকদিনের মধ্যেই জিআই স্বীকৃতিপ্রাপ্ত দিনাজপুরের প্রসিদ্ধ লিচু ও গোপালভোগ, মিশ্রিভোগ আম, জিআই স্বীকৃতিপ্রাপ্ত রংপুরের হাড়িভাঙ্গা আম, পঞ্চগড়ের তরমুজ, লাল শুকনো মরিচ, ঠাকুরগাঁওয়ের বৃন্দা বনি আম বাজার রাঙ্গাতে শুরু করবে। ইতোমধ্যেই আম-লিচু আর মৌসুমী ফল ব্যবসাকে ঘিরে কুরিয়ার, কোচসহ পরিবহন খাত ও খাচা বানানোর কাজে নিয়োজিত নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের খেটে খাওয়া নিম্নআয়ের নারী-পুরুষরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
অপরদিকে একরের পর একর জুড়ে দোল খাচ্ছে ইরি-বোরো ধান, গম ও ভুট্টার শীষ ও দানাযুক্ত গাছ দেখে কৃষকের বছরের অর্থনৈতিক চাহিদাপত্রের খাতা সাজাতে শুরু করেছে। এর বাহিরেও দিনাজপুরের সাদা সোনা খ্যাত রসুনসহ শত শত ট্রাক বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছে। ক্রমাগতভাবে আলোকিত হচ্ছে বিভাগের পড়ে থাকা চরাঞ্চলের জমিসহ পতিত জমিসমূহ। যা আগামীতে কৃষিখাতের ভূমিকাকে আরো শক্তিশালী করে তুলবে। অপর একটি সূত্র মতে, উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এখন দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
কৃষির পাশাপাশি শিল্পেও এগিয়ে যেতে শুরু করেছে উত্তরাঞ্চলের জেলাসমূহ নীলফামারীর উত্তরা ইপিজেডে একাধিক ইন্ডাস্ট্রির পাশাপাশি ইপিজেডের বাহিরে একাধিক পড়চুলা কারখানা, মিনি গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। যার ৮০ শতাংশই চায়না অংশীদারিত্ব ও সরাসরি অংশগ্রহণে কৃষির পাশাপাশি এসব শিল্প প্রতিষ্ঠানের কারণে উন্নত ঢাকা চট্টগ্রামের পর তৃতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে আবির্ভূত হবে। যা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, এবার দিনাজপুর অঞ্চলে জিআই স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বেদেনাসহ দিনাজপুরে উৎপাদিত বিভিন্ন জাতের লিচু থেকেই আয় হবে এক হাজার কোটি টাকা। জেলায় ৫ হাজার ৪৮৪ হেক্টর জমি থেকে লিচু উৎপাদন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ৩৬ হাজার মেট্রিক টন লিচু। যদিও বেসরকারি হিসাবে আবাদ, উৎপাদন এবং বিক্রির পরিমাণ আরো অনেক বেশি হবে। ১৫ মে থেকে দিনাজপুর অঞ্চলে মাদ্রাজী জাতের লিচু বাজারে উঠতে শুরু করেছে। এরপরই ক্রমান্বয়ে আসবে বেদানা, বোম্বাই, চায়না-থ্রি কাঁঠালি জাতের লিচু। এদিকে জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়ায় চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি বিদেশেও রফতানির পথ সুগম হয়েছে। লিচু মৌসুমে কেবলমাত্র বাগান রক্ষণাবেক্ষণ, ভাঙা, প্যাকেজিং এবং পরিবহনে ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়ে থাকে বলে কৃষি বিভাগের সূত্রে জানা গেছে।
কর্মসংস্থান হয় ব্যবসায়ী, শ্রমিক এবং পরিবহন খাতের সাথে জড়িত হাজার হাজার শ্রমিক ও পরিবারের। দিনাজপুরে চলতি ২০২৬ মৌসুমে দিনাজপুরে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৮৪০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে, যেখানে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ লাখ ৭০ হাজার ৫০ মেট্রিক টন। বেসরকারিভাবে এর পরিমাণ ৮.৫ লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের আশা প্রকাশ করা হয়েছে। বছরের প্রধান অর্থকরী ফসল হিসেবে বিবেচিত ইরি-বোরো ধান থেকেই আয় হবে দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি। ইরি-বোরো ধানের ওপর নির্ভরশীল শত শত অটো রাইস মিল, রাইস মিল এবং এর সাথে জড়িত হাজার হাজার পরিবারের বাৎসরিক খরচ যোগান হয়ে থাকে এই আবাদ থেকেই। হালে কৃষি ক্ষেত্রে যোগ হয়েছে ভুট্টার আবাদ। এই আবাদ শুধু দিনাজপুর নয় রংপুর, পঞ্চগড়, নীলফামারী, গাইবান্ধা লালমনিরহাটসহ উত্তরের প্রতিটি জেলায় এর আবাদ বিস্তার লাভ করেছে। ভুট্টার ব্যাপক আবাদকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বড় বড় ফিড মিল।
একইভাবে হাড়িভাঙা আম পাল্টে দিয়েছে রংপুরের কৃষি অর্থনীতি। গত কয়েকবছর ধরে এই আম রংপুরের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। ইতোমধ্যে এই আম জিআই পণ্য (ভৌগোলিক নির্দেশক) হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয় এই আম রংপুরের ঐতিহ্য হিসেবে পরিচিত। চলতি মৌসুমে হাঁড়িভাঙা আম বিক্রি করে রংপুর অঞ্চলে ৩শ’ কোটি টাকারও বেশি বাণিজ্যের সম্ভাবনা দেখছেন আম চাষিরা। এক সময় রংপুর অঞ্চলের মানুষ কাজের অভাবে অলস সময় কাটাতো। কাজ ও খাদ্যাভাবের কারণে বছরের বেশির ভাগ সময় এখানে মঙ্গা বিরাজ করতো। এখন সেই মঙ্গাকে জয় করেছে এ অঞ্চলের মানুষ ও প্রকৃতি। এক ফসলা জমি এখন তিন অবস্থান ভেদে চার ফসলা জমিতে পরিণত হয়েছে। বাড়ির উঠান কিংবা আশপাশের পরিত্যক্ত জমিগুলো এখন আমের বাগানে ভরে গেছে। এতটুকু জমিও এখন আর পরিত্যক্ত নেই।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, এ বছর ২৫০ কোটিরও বেশি টাকার বাণিজ্য হবে হাঁড়িভাঙা আম বিক্রি করে। এবার হাঁড়িভাঙা আমের গাছে প্রচুর আম ধরেছে। গত বছরের চেয়ে বেশি জমিতে হাঁড়িভাঙা ও অন্যান্য আরো বেশ কয়েক জাতের আম চাষ হয়েছে। ২০২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি হাঁড়িভাঙা আম রংপুরের নিজস্ব জিআই পণ্য হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করেছে। প্রতি হেক্টরে গড় ফলন ১০-১২ টন হিসাবে মোট বাজারমূল্য ৩শ’ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর হাঁড়িভাঙার ‘ব্র্যান্ড ভ্যালু’ বেড়েছে। দেশের ভেতরে সরাসরি বাগান থেকে আম সরবরাহ বেড়েছে। বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। তবে হিমাগার বা আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে চাষিদের কিছুটা দুশ্চিন্তা রয়েছে। হিমাগার থাকলে চাষিরা আম সংরক্ষণ করে তা বিক্রি করতে পারতেন। এতে লাভ বেশি হতো।
এদিকে, আম ছাড়াও ভুট্টার বাম্পার ফলন রংপুর অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছে। জেলার বিভিন্ন এলাকার উঁচু জমি ছাড়াও তিস্তা, ধরলা, দুধকুমোর ও যমুনেশ্বরী নদীর রূপালী চরগুলোতে এখন ভুট্টা, কাউন, বাদাম, মিষ্টি আলু, মিষ্টি কুমড়ার ব্যাপক ফলন হচ্ছে। এক সময়কার পরিত্যক্ত রূপালী চর এখন এ অঞ্চলে সোনার খনিতে পরিণত হয়েছে। চরাঞ্চলের মানুষ ছাড়াও নদী তীরবর্তী মানুষ এসব চরে উল্লেখিত ফসলের পাশাপাশি রবিশস্য চাষ করে নিজেদের ভাগ্য বদলে দিয়েছেন এবং এ অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে বিরাট ভূমিকা রাখছেন। তাছাড়া গত কয়েক বছর ধরে এ অঞ্চলের সর্বত্রই আলুর বাম্পার ফলন হচ্ছে। রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলার বিভিন্ন নদীর চরে বিশেষ করে রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া, পীরগাছাসহ গাইবান্ধা জেলার সাতটি উপজেলায় ভুট্টা চাষ হলেও সদর, সাঘাটা, সুন্দরগঞ্জ ও ফুলছড়ি উপজেলার ১৬৫টি ছোট-বড় চরে সবচেয়ে বেশি ভুট্টা চাষ হচ্ছে। একইভাবে কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী জেলার প্রায় আড়াই শতাধিক নদীর চরে ভুট্টা চাষ করছেন কৃষকরা।
কৃষি বিভাগের দেয়া তথ্য মতে, এবার ভুট্টা চাষের জন্য রংপুর কৃষি অঞ্চলে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১ লাখ ১৫ হাজার হেক্টর জমি। সে হিসাব ছাড়িয়ে কৃষকরা অতিরিক্ত ১২ হাজার হেক্টর জমিতে ভুট্টা চাষ করেছেন। ভুট্টা বর্তমানে হাজারো কৃষকের প্রধান জীবিকা হয়ে উঠেছে। হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত মহানন্দা নদীর ভাটিতে অবস্থিত ভেসে আসা নূড়ী পাথরের কারণে সেরকম কোনো আবাদই হতো না। সেই পঞ্চগড় এখন দেশের দ্বিতীয় চা উৎপাদনকারী জেলায় নাম লিখিয়েছে। হাজার হাজার একর জুড়ে পঞ্চগড়ের চা বাগান এখন ভারতের দার্জিলিং ও শিলিগুড়িতে চোখ রাঙ্গাচ্ছে। আবাদ হচ্ছে ইরি-বোরো ধানের পাশাপাশি মরিচ। মৌসুমের শুরুতে এখন পঞ্চগড়ের যত্র-তত্র শুকোতে দেয়া লাল মরিচের গালিচা শোভা পাচ্ছে। চলতি মৌসুমে বোরো ধান রোপণ হয়েছে ৩২ হাজার ৭৩২ হেক্টর, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৭৪৩ মেট্রিকটন। এছাড়াও বাদাম, গম, আলু, মরিচসহ বিভিন্ন জাতের ফসল উৎপাদন হচ্ছে। দুই যুগ আগে ২ হাজার টাকা মূল্যের এক একর জমি এক কোটি টাকাতেও পাওয়া মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। চা বাদে কেবলমাত্র মৌসুম ভিত্তিক ফসল শুকনা মরিচ থেকে ৭০০ কোটি, গম থেকে ২০০ কোটি, ভুট্টা থেকে ৭০০ কোটি, আলু থেকে ৩০০ কোটি টাকাসহ অন্যান্য মওসুমি ফসল থেকেই দেড় হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হবে।
একইভাবে গমের জন্য বিখ্যাত ঠাকুরগাঁও জেলার বৃন্দাবনি আম ব্যাপক জনপ্রিয়, ঠাকুরগাঁওতে গড়ে উঠেছে দেশের সর্ববৃহৎ কমলা ও মাল্টার বাগান। জেলার পীরগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত এই বাগানের কমলা ও মাল্টা বিদেশি ফলগুলোকেও হার মানিয়েছে। চাহিদাও ব্যাপক। বাগান থেকেই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে এখানকার মাল্টা ও কমলা। দীর্ঘদিনের অবহেলা ও বঞ্চনা থেকে ঠাকুরগাঁও জেলা কৃষি থেকে এখন বাণিজ্যিক ও শিক্ষা নগরীতে উন্নীত হতে যাচ্ছে।
ঠাকুরগাঁওয়ের কৃতি সন্তান বিএনপির মহাসচিব এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মাত্র আড়াই মাসে ঠাকুরগাঁও জন্য যা এনে দিয়েছেন সম্ভবত অন্য কোনো সরকারের সময় একেবারে অবহেলিত একটি জেলা পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আস্থাভাজন মির্জা ফখরুল আজিবন কাজ করেছেন ঠাকুরগাঁওবাসীর জন্য। ইতোমধ্যে একটি বিশ্ববিদ্যালয়, একটি মেডিক্যাল কলেজ পেয়েছে ঠাকুরগাঁওবাসী। পেতে যাচ্ছে পরিত্যক্ত বিমানবন্দরের মর্যাদা, নার্সিং কলেজসহ আরো অনেক কিছু। ফলে ঠাকুরগাঁও জেলা শিক্ষার পাশাপাশি কৃষিতেও আরো বেশি ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানসহ গত ১৫ বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সব সদস্যের তথ্য ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র তলব করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। রিজার্ভ চুরি, হলমার্ক কেলেঙ্কারি, এস আলম গ্রুপের ঋণ জালিয়াতি এবং ব্যাংকিং খাতে নানা অনিয়মের অভিযোগে চলমান অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে এসব নথি চাওয়া হয়েছে। বুধবার (১ জুলাই) দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম বলেন, অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের স্বার্থে এসব নথি পাঠানোর জন্য অনুরোধ করে চিঠি দিয়েছে দুদক। তলব করা নথিপত্র বিশ্লেষণের পর প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদসহ পরবর্তী অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করবে দুদক। দুদক সূত্রে জানা যায়, অভিযোগ অনুসন্ধানে উপ-পরিচালক মো. মোমিনুল ইসলাম, উপ-পরিচালক রণজিৎ কুমার কর্মকার ও উপ-সহকারী পরিচালক মো. ইয়াছিন মোল্লার সমন্বয়ে তিন সদস্যের একটি অনুসন্ধান দল গঠন করেছে দুদক। দুদকের চিঠিতে বলা হয়েছে, সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে ঋণখেলাপিদের সুবিধা দিতে নীতিমালা প্রণয়ন, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি, হলমার্ক কেলেঙ্কারি, এস আলম গ্রুপের ঋণ জালিয়াতি এবং বিভিন্ন ব্যাংকে অনিয়ম ও জালিয়াতির সুযোগ সৃষ্টি করে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশের ব্যাংকিং খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে। অনুসন্ধানের স্বার্থে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন বিভাগ থেকে ছয় ধরনের তথ্য ও রেকর্ডপত্র চেয়েছে দুদক। এর মধ্যে রয়েছে ২০১৬ এবং ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ডিপার্টমেন্ট অব অফ-সাইট সুপারভিশন (ডিওএস) ও ব্যাংকিং রেগুলেশন অ্যান্ড পলিসি ডিপার্টমেন্ট (বিআরপিডি) থেকে সিঙ্গেল বরোয়ার এক্সপোজার লিমিট ও বড় ঋণ পুনঃতফসিল/পুনর্গঠনসংক্রান্ত জারি করা সব অনাপত্তিপত্রের সত্যায়িত অনুলিপি। এ ছাড়া ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সব সদস্যের নাম, ঠিকানা, দায়িত্বকালসহ বিস্তারিত তথ্য, ২০২০ সালের বিআরপিডি সার্কুলার-৮ অনুযায়ী শিল্প ও সেবা খাতে দেওয়া প্রণোদনা ঋণ গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের তালিকা ও প্রণোদনার পরিমাণও চাওয়া হয়েছে। চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, এস আলম গ্রুপকে কয়েকটি ব্যাংকের মালিকানা প্রদানের অনুমোদনপত্র ও এ-সংক্রান্ত নোটশিটের সত্যায়িত অনুলিপি, সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের সময়ে এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন কয়েকটি ব্যাংককে নগদ সহায়তা দেওয়ার অনুমোদনসংক্রান্ত নথি এবং সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভীর দোহার বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি-সংক্রান্ত অনুসন্ধান প্রতিবেদনের কপিও দুদক চেয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের জন্য নীতিগত সুদের হার (রেপো রেট) ১০ শতাংশেই রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থাৎ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আগের মতোই কঠোর মুদ্রানীতি চালিয়ে যাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একই সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য সচল করা, উৎপাদন বাড়ানো এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরির জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। মঙ্গলবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদের নতুন মুদ্রানীতিতে নীতিসুদ ১০ শতাংশেই বহাল রাখে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সাধারণত যে হারে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে স্বল্পমেয়াদি ঋণ নেয় তাকেই রেপো রেট বলা হয়। এই হার ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ১০ শতাংশে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, তাদের প্রধান লক্ষ্য হলো মূল্যস্ফীতি কমিয়ে স্থিতিশীল রাখা। কারণ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকলে অর্থনীতি ভালো থাকে, বিনিয়োগ বাড়ে, টাকার মান স্থিতিশীল থাকে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সহজ হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ১১.৭ শতাংশ, যা ২০২৬ সালের মে মাসে কমে ৯.৪ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে এটি এখনও সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। তাই মূল্যস্ফীতি আরও কমাতে কঠোর মুদ্রানীতি চালিয়ে যাওয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, রেপো রেট ১০ শতাংশ, স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) ১১.৫ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) ৭.৫ শতাংশ অপরিবর্তিত থাকবে। তারা আরও বলেছে, দেশের অর্থনীতি এখনও বেশ কিছু সমস্যার মুখে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যাওয়া, কর্মসংস্থানের সংকট, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক উত্তেজনা। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার কারণে বিশ্ববাজারে তেল ও সারের সরবরাহে সমস্যা দেখা দিতে পারে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়বে এবং মূল্যস্ফীতিও বাড়তে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত মে মাসে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৫ শতাংশে। এর কারণ হলো সুদের হার বেড়ে যাওয়া, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি এবং সরকারের বেশি ঋণ নেওয়ার কারণে নতুন ঋণ নিতে আগ্রহ হারিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ফলে অনেক ব্যাংক তাদের অতিরিক্ত টাকা সরকারি বন্ড ও সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করছে। এদিকে, অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে শিল্প, কৃষি এবং কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (সিএমএসএমই) জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ প্রণোদনা তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত অর্থ থেকে দেওয়া হবে এবং ১৯ হাজার কোটি টাকা দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের আশা, এই কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান হবে। এমনকি শিল্পকারখানাগুলো আবার উৎপাদন বাড়াতে পারবে বলেও প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, টাকার বিনিময় হার বাজারের চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে নির্ধারণের নীতি চালু থাকবে। এর ফলে রফতানি বাড়বে, প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) বাড়বে এবং বৈদেশিক খাত আরও শক্তিশালী হবে। খেলাপি ঋণ কমাতে কঠোর তদারকি, উন্নত নিরীক্ষা এবং নতুন আইন কার্যকর করার কথাও জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর লক্ষ্য হলো ব্যাংকিং খাতকে আরও শক্তিশালী ও সুশৃঙ্খল হিসেবে গড়ে তোলা।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফিরে অফিস শুরু করছেন শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মাসুদ খান। সোমবার (২৯ জুন) সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটের দিকে তিনি বিএসইসিতে এসেছেন। কমিশন সূত্রে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। বিএসইসিতে যোগদানের একদিন পরেই ছেলের স্নাতক শিক্ষা সমাপনী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রে যান তিনি। ২০ দিন ছুটি কাটিয়ে তিনি গতকাল রোববার (২৮ জুন) দেশে ফিরেছেন। মাসুদ খানের অবর্তমানে কমিশনের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয় কমিশনার তানভীর হাবিব রহমানকে। তিনি নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসেবে চেয়ারম্যানের রুটিন দায়িত্ব পালন করেন। প্রসঙ্গত, গত ৪ জুন অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পদত্যাগপত্র জমা দেন বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ, কমিশনার মু. মহসীন চৌধুরী, মো. আলী আকবর, ফারজানা লালারুখ ও মো. সাইফুদ্দিন। ওই দিনই নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে মাসুদ খান এবং কমিশনার হিসেবে ঢাকা ব্যাংক সিকিউরিটিজের এমডি মো. নাফিজ আল তারিক, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নাহিদ মাহতাব ও আশা ইন্টারন্যাশনালের ফাইন্যান্স ডিরেক্টর তানভীর হাবিব রহমানকে নিয়োগ দেয় সরকার। একই দিনে তারা বিএসইসিতে যোগ দেন।