কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ সুবিধার সুযোগ নিয়ে ঋণ পুনঃতফসিলের পরিমাণ বাড়ছে ব্যাংকগুলোতে। বছর কয়েক ধরে এ প্রবণতা চলতে থাকার মধ্যে ২০২৫ সালে এক বছরের ব্যবধানে পুনঃতফসিল বেড়েছে ৮৪ হাজার ৮২৪ কোটি টাকার বেশি বা ৯৯ শতাংশ।
খেলাপি ঋণের বোঝা বাড়তে থাকার মধ্যে আর্থিক প্রতিবেদনের স্বাস্থ্য ভালো দেখাতে গ্রাহকের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতে ব্যাংকগুলোর এমন কৌশল নেওয়ার কথা বলছেন ব্যাংকার ও বিশ্লেষকরা।
ব্যাংক খাতে পুনঃতফসিল করা ঋণের তথ্য বলছে, গত ৫ বছরে পুনঃতফসিল করা ঋণের হার বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৫ গুণ। ২০২৫ সালে খেলাপি হওয়ার আগে পুনঃতফসিল করা হয়েছে ৬০ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং খেলাপির পরে পুনঃতফসিল করা হয়েছে ৩৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ ঋণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ ‘ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে যা বেড়েছে ৮৪ হাজার ৮২৪ কোটি টাকার বেশি বা ৯৯ শতাংশ। ২০২৪ সালে পুনঃতফসিল করা ঋণের পরিমাণ ছিল ৮৫ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংক সময়ে সময়ে বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতি ও কারণে খেলাপি ঋণকে নিয়মিত করার সুবিধা দিতে বিশেষ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেয়। এর বাইরে সাধারণ নীতিমালা মেনেও ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক মোস্তফা কে মুজেরি বলেন, এখন সেই সুযোগের ‘অপব্যবহার’ করা হচ্ছে। বারবার পুনঃতফসিল করা মানেই বিশেষ সুযোগটি জায়েজ হয়ে যায় না।
খেলাপি ঋণের পরিমাণ যখন বেড়ে যায় তখনই মূলত পুনঃতফসিলে যায় ব্যাংক।”
এক বছরে বিশাল অঙ্কের ঋণ পুনঃতফসিলের পরও ২০২৫ সালে ব্যাংক খাতে নতুন ঋণ খেলাপি হয়েছে ২ লাখ ১১ হাজার ৪৫২ কোটি টাকার বেশি।
খেলাপি ঋণ বেশি হলে ব্যাংকের মুনাফা থেকে সেই অনুপাতে বেশি অর্থ নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) হিসেবে সংরক্ষণ করতে হয়। এতে ব্যাংকের মুনাফা কমে যায়। এজন্য পুনঃতফশিলের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো খেলাপির পরিমাণ কম দেখানোর চেষ্টা করে বলে ব্যাংকাররা তুলে ধরেন।
নিয়মিত ঋণের বিপরীতে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশি এবং খেলাপি ঋণের বিপরীতে মানভেদে শতভাগ পর্যন্ত নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন অনুযায়ী, সার্বিকভাবে ১০০ টাকা ঋণের মধ্যে ৩০ শতাংশের বেশি খেলাপি হয়ে যাচ্ছে। এরমধ্যে বড় ঋণ গ্রহীতার ঋণ ৪০ শতাংশ।
ব্যাংক খাতের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে বারবার পুনঃতফসিল সুবিধা দেওয়া বন্ধ করার পরামর্শ দিয়েছেন মোস্তফা কে মুজেরি, যিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদের দায়িত্বও পালন করেছেন।
তিনি বলেন, ব্যাংকগুলো এ নীতিমালার যথেচ্ছ ব্যবহার করছে কি না, তা মূল্যায়ন করতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংকে। বারবার পুনঃতফসিল করা মানেই হচ্ছে ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্য এক সময়ে আরো দুর্বল হয়ে পড়বে।
গত ডিসেম্বরে ব্যাংক খাতে ঋণ স্থিতি ছিল ১৭ লাখ ৭৪ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা। এর মধ্যে পুনঃতফসিল করা ঋণের স্থিতি ছিল ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা বা ২৫ দশমিক ১৪ শতাংশ।
পুনঃতফসিল করা ঋণের এ অঙ্ক গত ডিসেম্বরের মোট খেলাপি হওয়া ঋণের ৮০ শতাংশ। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে মোট খেলাপির পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা।
ব্যাংকাররা বলছেন, পুনঃতফসিল করার সুযোগ না দিলে ডিসেম্বর শেষেই মোট খেলাপির অঙ্ক বেড়ে ১০ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেত।
ব্যাংকের নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান সেলিম আর এফ হোসেন বলেন, প্রভিশন রাখার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শক্ত পদক্ষেপের কারণে ‘প্রভিশন শর্টফল’ থেকে বাঁচতে ব্যাংকগুলো পুনঃতফসিলে বেশি আগ্রহী উঠেছে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, ‘‘খেলাপি ঋণের পুরো তথ্য এখনো উঠে আসছে না। নানা কারণেই সেটি করা হচ্ছে না। ব্যাংক চায় তার ব্যালেন্স শিট (আর্থিক প্রতিবেদন) ভালো দেখাতে। তাই পুনঃতফসিলের প্রস্তাব পেলেই আগ্রহী হয়ে ওঠে। এখন দেখা দরকার কতটা যৌক্তিকভাবে এটা বিচার করা হল।’’
এভাবে পুনঃতফসিলের হার বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা তার। বলেন, “এগুলো এক সময়ে খেলাপি হয়েই যাবে। কেন আমরা আগেই দেখাব না। ব্যাংকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ বিষয়ে আরো শক্ত হতে হবে। কেন পুনঃতফসিল করা হচ্ছে তার প্রকৃত ব্যাখ্যা থাকা উচিত।’’
৫ বছরে পুনঃতফসিল বেড়েছে সাড়ে ৫ গুণ
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে পুনঃতফসিল করা হয় ২৬ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। কোভিডের মধ্যে বিশেষ সুযোগ থাকার কারণে তা ২০২২ সালে এক লাফে বেড়ে হয় ৬৩ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা এবং ২০২৩ সালে ৯১ হাজার ২২১ কোটি টাকা।
পরের দুই বছরও এ ধারা বজায় থাকে; ২০২৪ সালে কিছু কমে ৮৫ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা হলেও ২০২৫ সালে পুনঃতফসিল করা হয় ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকার ঋণ।
২০২১ সাল শেষে ব্যাংকিং খাতে পুনঃতফসিল করা ঋণের স্থিতি ছিল ১ লাখ ৬৮ হাজার ৪০১ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। এ বছরে পুনঃতফসিল করা ঋণের স্থিতি বাড়ে ৫৯ হাজার ৯২০ কোটি টাকা বা ২০ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
সবশেষ ২০২৫ সাল শেষে পুনঃতফসিল করা ঋণের স্থিতি ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকায় উন্নীত হয়।
বড় ঋণে পুনঃতফসিল বেশি
পুনঃতফসিল করা ঋণের মধ্যে প্রায় শিল্প ঋণের অংশই বেশি; ২৯ দশমিক ৫৬ শতাংশ। সাধারণ বড় ঋণ গ্রহীতারা এমন ঋণ নিয়ে থাকেন।
টাকার অঙ্কে শিল্প ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৩২ হাজার ১০২ কোটি টাকা। এর মধ্যে বড় বা করপোরেট ঋণ ৭২ দশমিক ৩৮ শতাংশ বা ৯৫ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা। মধ্যম মানের শিল্প খাতে ৮ দশমিক ৭৮ শতাংশ, ছোট আকারের ৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ, ক্ষুদ্র ও কুটির খাতের ১ দশমিক ৬ শতাংশ ও অন্যান্য খাতের ১০ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
এছাড়া তৈরি পোশাক খাতের ১৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ, চলতি মূলধনের ১৩ শতাংশ, আমদানি ঋণের ১০ দশমিক ১৯ শতাংশ, বাণিজ্যিক ঋণের ৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ, নির্মাণ খাতের ৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ এবং কৃষি ঋণের ৩ শতাংশ পুনঃতফসিল করা হয়েছে।
অন্য খাতগুলোর মধ্যে জাহাজ ভাঙা খাতের ২ দশমিক ৩৯ শতাংশ, পরিবহন ও যোগাযোগ খাতের শূন্য দশমিক ৬৯ শতাংশ, রপ্তানি খাতের শূন্য দশমিক ৬৮ শতাংশ, ভোক্তা ঋণের শূন্য দশমিক ২৬ শতাংশ এবং অন্যান্য ঋণের মধ্যে পুনঃতফসিল করার হার ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ।
পুনঃতফসিলে আগ্রহ কেন
শুধু যে খেলাপি হলেই ঋণ পুনঃতফসিল করা যাবে, এরকম কোনো বিধিনিষেধ নেই। নিয়মিত ঋণও পুনঃতফসিল করার সুযোগ রাখা হয়েছে ২০২২ সালের জুলাই মাসে জারি করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক সার্কুলারে।
পুনঃতফসিল করার ক্ষেত্রে মেয়াদী, চলমান ও তলবী ঋণের বেলায় মোট বকেয়া ঋণের আড়াই থেকে সাড়ে ৪ শতাংশ নগদ টাকায় ডাউন পেমেন্ট দিতে হয়।
অন্যদিকে নিয়মিত ঋণের বেলায় কোনো ডাউনপেমেন্ট দিতে হয় না। আবেদনের পরই ব্যাংক চাইলে তা মঞ্চুর করতে পারে। মেয়াদ বাড়িয়ে দিয়ে ঋণের অঙ্ক বা সীমা বাড়ানোরও সুযোগ থাকে সেখানে।
এ কারণে খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি দেখা দিলেই ব্যাংক ও গ্রাহক নিজ নিজ স্বার্থে ঋণ পুনঃতফসিল করতে এগিয়ে আসতে পারে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও ইউনিয়ন ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন কবির বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘অনেক সময় সময়মত গ্যাস, বিদ্যুৎ না পাওয়ায় নির্দিষ্ট সময়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালু করা সম্ভব হয় না। তাদের রিলিফ দিতেই এমন সুযোগ।”
এ সুযোগের অপব্যবহারের সুযোগ নিয়ে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, “সবসময়ই কিছু গ্রাহক অ্যাডভ্যানটেজ নিতে চাইবে। এখন ব্যাংক কাকে দেবে, কাকে দিলে ভালো হবে, কোন ক্ষেত্রে ব্যাংকের কোনো সমস্যা হবে না, সেটা ব্যাংকের বুঝে নিতে হবে। অনেক সময় প্রভাব বিস্তার করা হয়। সেটাও কতটুকু নেওয়া যায় দেখতে হবে।’’
নীতি সুবিধার যথেচ্ছ ব্যবহার হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অনেক সময়ে দেখা গেছে, মেয়াদী ঋণ পাঁচ বছরের জন্য নিয়েছে, কিন্তু তিন বছর পরে ব্যবসার আয় হয়ত আসছে না, কিংবা তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী বা সময় মত বিদ্যুৎ, জ্বালানি বা অন্য কোনো কারণে ব্যবসা শুরু করা করা যায়নি।
“এখন ঋণের মেয়াদ যদি না বাড়ায়, তাহলে এত টাকা দিতে পারবে না আগেই বুঝতে পারেন অনেকে। খেলাপি হওয়ার দায় থেকে মুক্তি পেতে তখন মেয়াদী ঋণ পুনঃতফসিল বা পনর্গঠনের সুযোগটি নিতে চান।”
ঝুঁকিতে থাকা এসব ঋণ পুনঃতফসিল করা হলেও ভবিষ্যতে অর্থপরিশোধে ব্যর্থ হলে খেলাপির পরিমাণ আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।
ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ মনে করেন, এ সমস্যার সমাধানের উপায় হতে পারে উদ্যোক্তাদের বন্ড মার্কেট বা পুঁজিবাজার থেকে অর্থ তুলতে উৎসাহিত করা।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “ব্যাংক সর্বোচ্চ ৫ বছরের জন্য স্বল্প সুদে ঋণ দেবে। এর বেশি সময়ের জন্য কোনোভাবেই না। তাদেরকে (ব্যবসায়ীদের) পুঁজিবাজারে পাঠাতে হবে। এটাই নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কাজ। যে যে সুবিধা দিলে ব্যবসায়ীরা পুঁজিবাজারে যাবে, তা দিতে হবে।
‘‘যতই মিষ্টি কথা বলি, এমনি এমনি বললে কেউ আসবে না। তাদের আনতে হবে, বাধ্য করতে হবে। বিনিয়োগকারীরা তো বসে আছে টাকা দিতে। এটা না করলে খেলাপী ঋণ কোনোভাবে কমবে না।”
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৩০৫ জন। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত হেলথ বুলেটিনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, চলতি বছর এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হামে ১০১ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে ৯৬২ জনের মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৩ জনে। বুলেটিনে বলা হয়, রোববার সকাল ৮টা থেকে সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে ঢাকা ও সিলেট বিভাগে। দুই বিভাগেই দুজন করে মারা গেছেন। কোন বিভাগে কত রোগী গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১ হাজার ৩০৫ রোগীর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৪৮৮ জন, চট্টগ্রামে ২৯১ জন, সিলেটে ১৩১ জন, বরিশালে ১৪৫ জন, খুলনায় ৯০ জন, ময়মনসিংহে ৭৩ জন, রাজশাহীতে ৩১ জন এবং রংপুরে ২৬ জন ভর্তি হয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ১৫ মার্চ থেকে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১ লাখ ৫৯ হাজার ৮০৪ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১ লাখ ৫৩ হাজার ৪৮৮ জন। সন্দেহজনক রোগী ১ লাখ ৮১ হাজারের বেশি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে সন্দেহজনক হামের রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮১ হাজার ৩৫ জনে। তাদের মধ্যে পরীক্ষায় ২০ হাজার ৬৪৬ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে। হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা অব্যাহত থাকায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে এ সংক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
অ্যালার্জি সাধারণত শৈশবেই শুরু হয়—এমন ধারণা অনেকের। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, জীবনের যেকোনও পর্যায়েই নতুন করে অ্যালার্জি দেখা দিতে পারে। এমনকি দীর্ঘদিন কোনও খাবার বা পরিবেশগত উপাদানে সমস্যা না থাকলেও প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে হঠাৎ সেটির বিরুদ্ধে শরীরের প্রতিরোধব্যবস্থা অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। অ্যালার্জি বিশেষজ্ঞ কেলি কোলাস বলেন, যেকোনও মানুষ জীবনের যেকোনও সময় নতুন কোনও অ্যালার্জিতে আক্রান্ত হতে পারেন। গবেষকেরা এখন মনে করছেন, এর পেছনে শুধু বংশগত কারণ নয়; বরং সংক্রমণ, রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার পরিবর্তন, অন্ত্রের জীবাণুর ভারসাম্য, হরমোনের ওঠানামা এবং কিছু ক্ষেত্রে পোকামাকড়ের কামড়ও ভূমিকা রাখতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয়ের নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ফুড অ্যালার্জি অ্যান্ড অ্যাজমা রিসার্চের পরিচালক রুচি গুপ্তার মতে, কারও শরীরে অ্যালার্জির জিনগত প্রবণতা থাকলেও শুধু জিনই সবকিছু নির্ধারণ করে না। কোনও কোনও ক্ষেত্রে এমন একটি ঘটনা প্রয়োজন হয়, যা রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে অ্যালার্জির দিকে ঠেলে দেয়। কোভিড-১৯ কি অ্যালার্জির ‘সুইচ’ চালু করতে পারে? নতুন অ্যালার্জির সম্ভাব্য উদ্দীপক হিসেবে এখন কোভিড-১৯ নিয়েও গবেষণা হচ্ছে। ২০২৬ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কোভিড-১৯ আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে পরবর্তী সময়ে অ্যালার্জিক রাইনাইটিস—সাধারণভাবে যাকে হে ফিভার বলা হয়—এবং হাঁপানির ঝুঁকি বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে। সুইডেনের কারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ও গবেষণাটির সহলেখক ফিলিপ কারম্যান বলেন, সংক্রমণ অ্যালার্জির ঝুঁকি বাড়িয়েছে, আর টিকাদান সেই ঝুঁকি কমিয়েছে। গবেষকদের ব্যাখ্যা, কোভিড-১৯-এর মতো সংক্রমণের সময় শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা ব্যাপকভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং শরীরে প্রদাহ বাড়তে পারে। এই প্রদাহের কিছু ধরন অ্যালার্জিজনিত রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত। শিশুদের ক্ষেত্রে রেসপিরেটরি সিনসিশিয়াল ভাইরাস (আরএসভি) এবং সর্দি-জ্বরের জন্য দায়ী রাইনোভাইরাসের মতো ভাইরাসের সঙ্গেও পরবর্তী সময়ে অ্যালার্জি দেখা দেওয়ার সম্পর্কের ইঙ্গিত পেয়েছেন গবেষকেরা। গুপ্তার ব্যাখ্যা, কোনও ভাইরাসের বিরুদ্ধে শরীর যখন তীব্রভাবে লড়াই করছে, ঠিক তখন খাবার বা পরিবেশের কোনও সাধারণ উপাদান শরীরে প্রবেশ করলে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা সেটিকেও হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে। ফলে এমন কোনও পদার্থের বিরুদ্ধেও প্রতিক্রিয়া শুরু হতে পারে, যা স্বাভাবিক অবস্থায় ক্ষতিকর নয়। অ্যান্টিবায়োটিকেও বদলাতে পারে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা শুধু সংক্রমণ নয়, কোনও রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধও পরবর্তী সময়ে অ্যালার্জির ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের পর অ্যালার্জির ঝুঁকি বাড়তে পারে—এমন সম্পর্ক বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমের পরিবর্তনের কথা বলছেন। মানুষের অন্ত্রে বিপুলসংখ্যক ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য অণুজীব বসবাস করে, যাদের সামগ্রিকভাবে মাইক্রোবায়োম বলা হয়। হজম, বিপাক এবং রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রমে এদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অ্যান্টিবায়োটিক ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার পাশাপাশি অন্ত্রের উপকারী জীবাণুগুলোকেও প্রভাবিত করতে পারে। ফলে মাইক্রোবায়োমের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হলে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার কার্যক্রমেও পরিবর্তন আসতে পারে। গুপ্তার ভাষায়, এর ফলে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থায় এক ধরনের ‘বিভ্রান্তি’ তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ সাধারণত নিরীহ কোনও পদার্থকেও শরীর ভুল করে বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করে তার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। গর্ভাবস্থা ও হরমোনের পরিবর্তনের প্রভাব নারীদের ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থাও রোগ প্রতিরোধব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালার্জি বিশেষজ্ঞ কেলি কোলাসের মতে, আগে থেকেই পরিবেশগত অ্যালার্জি থাকা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নারীর গর্ভধারণের পর উপসর্গ আরও বেড়ে যেতে পারে। আবার এমন একটি অবস্থাও দেখা যায়, যাকে ‘প্রেগন্যান্সি রাইনাইটিস’ বলা হয়। এতে আগে কখনও অ্যালার্জি না থাকা গর্ভবতী নারীরও হাঁচি, নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং নাক দিয়ে পানি পড়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে এটি প্রকৃত অ্যালার্জি নয় বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। সন্তান জন্মের পর সাধারণত এসব উপসর্গ চলে যায়। হরমোনের ওঠানামার সঙ্গে এ অবস্থার সম্পর্ক রয়েছে বলে ধারণা করা হলেও এর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। এস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরনের মতো নারী প্রজনন হরমোন রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলে। মেনোপজের সময়ও হরমোনে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, এ সময়ও কিছু নারীর নতুন করে অ্যালার্জি দেখা দিতে পারে। এঁটেল পোকার কামড়ে মাংসে অ্যালার্জি! নতুন অ্যালার্জির সবচেয়ে অদ্ভুত উদাহরণগুলোর একটি হলো আলফা-গাল সিনড্রোম—যেখানে এঁটেল পোকার কামড়ের পর গরু, খাসি বা শূকরের মতো স্তন্যপায়ী প্রাণীর মাংসে অ্যালার্জি তৈরি হতে পারে। এ ধরনের অ্যালার্জির সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত উত্তর আমেরিকার ‘লোন স্টার’ এঁটেল পোকা। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই এঁটেল পোকার বিস্তার নতুন নতুন এলাকায় ঘটছে বলে গবেষকেরা মনে করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাবিজ্ঞান ও মাইক্রোবায়োলজির অধ্যাপক থমাস প্ল্যাটস-মিলস নিজেই এমন অ্যালার্জির অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন। ২০০৭ সালে লন্ডনে এক সফরের সময় তিনি ভেড়ার মাংস খাওয়ার পর রাতে হঠাৎ সারা শরীরে চাকা ওঠার মতো অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়ার শিকার হন। এর কয়েক মাস আগে হাঁটার সময় লার্ভা পর্যায়ের এঁটেল পোকা তার শরীরে লেগে কামড় দিয়েছিল। পরবর্তী রক্ত পরীক্ষায় তার শরীরে অ্যালার্জির সঙ্গে সম্পর্কিত অ্যান্টিবডির উচ্চমাত্রা পাওয়া যায়। তার নিজের অভিজ্ঞতা তার গবেষক দলকে এঁটেল পোকার কামড় ও মাংসে অ্যালার্জির মধ্যকার সম্পর্ক আরও গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করে। এঁটেল পোকার লালায় আলফা-গাল নামের একটি শর্করা অণু থাকতে পারে। অধিকাংশ স্তন্যপায়ী প্রাণীর শরীরে এটি স্বাভাবিকভাবে পাওয়া যায়, কিন্তু মানুষের শরীরে এটি থাকে না। ফলে এঁটেল পোকার কামড়ের মাধ্যমে মানুষের শরীরে আলফা-গাল প্রবেশ করলে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা সেটিকে বিদেশি উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করে অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পারে। পরবর্তীতে কেউ গরু বা খাসির মাংস খেলে শরীরের ওই অ্যান্টিবডি আলফা-গালকে শনাক্ত করে অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। এতে চাকা ওঠা, শরীর ফুলে যাওয়া এবং পেটের অস্বস্তির মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে আলফা-গাল সিনড্রোমের শনাক্তকরণ দ্রুত বাড়ছে। সরকারি তথ্যানুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দেশটিতে ৯০ হাজারের বেশি মানুষ এ সমস্যায় শনাক্ত হয়েছেন। হঠাৎ হওয়া অ্যালার্জি কি পুরোপুরি ভালো করা যায়? সব ধরনের নতুন অ্যালার্জি প্রতিরোধ বা পুরোপুরি সারিয়ে তোলার নিশ্চিত উপায় এখনও নেই। কোনও সংক্রমণ, এঁটেল পোকার কামড় বা অন্য কোনও কারণে একবার অ্যালার্জি তৈরি হলে সেটি অনেকের ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। অ্যালার্জির মূল প্রক্রিয়াটি মোটামুটি একই। শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা কোনও নিরীহ পদার্থকে ভুল করে বিপজ্জনক বিদেশি উপাদান হিসেবে শনাক্ত করে এবং তার বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে একই পদার্থ শরীরে প্রবেশ করলে প্রতিরোধব্যবস্থা আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখায়। এর ফলে নাক দিয়ে পানি পড়া, হাঁচি, চোখ চুলকানো থেকে শুরু করে গুরুতর ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী অ্যানাফাইল্যাক্সিসও হতে পারে। তবে নতুন অ্যালার্জির সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা যত বেশি জানতে পারছেন, প্রতিরোধ ও চিকিৎসার সম্ভাবনাও তত বাড়ছে। অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের পর অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমের ভারসাম্য রক্ষায় প্রোবায়োটিক, প্রিবায়োটিক, দই ও ফারমেন্টেড খাবার গ্রহণ সহায়ক হতে পারে বলে গুপ্তা মনে করেন। তবে এসব ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যক্তির স্বাস্থ্যগত অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ। ভাইরাস সংক্রমণের সময় শরীরে অতিরিক্ত প্রদাহ নিয়ন্ত্রণ করা গেলে পরবর্তী সময়ে হাঁপানি বা অ্যালার্জির মতো জটিলতা কমানো সম্ভব কি না, সেটিও এখন গবেষণার বিষয়। রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে ‘প্রশিক্ষিত’ করার চেষ্টা অ্যালার্জি নিয়ন্ত্রণে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে তৈরি কিছু ওষুধ নিয়েও গবেষণা এগোচ্ছে। জোলএয়ার (ওমালিজুমাব)-এর মতো ওষুধ রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার নির্দিষ্ট অংশকে লক্ষ্য করে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া কমাতে ব্যবহৃত হচ্ছে। হাঁপানির চিকিৎসায় দীর্ঘদিন ব্যবহারের পর এটি খাবারে অ্যালার্জির কিছু প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। এছাড়া গবেষকেরা এমন ভ্যাকসিন তৈরির সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছেন, যা অ্যালার্জেনের প্রতি রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া আরও নিয়ন্ত্রিত করতে পারে। আরেক ধরনের পরীক্ষামূলক চিকিৎসায় একবারের ডোজে সরাসরি অ্যালার্জেন-প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি শরীরে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। তবে এসব গবেষণা এখনও অ্যালার্জি পুরোপুরি নির্মূল করার নিশ্চয়তা দেয় না। গুপ্তার মতে, নতুন অ্যালার্জি পুরোপুরি উল্টে দেওয়ার নিশ্চিত পদ্ধতি এখনও হাতে আসেনি। তবে গত দুই দশকে বিশেষ করে খাদ্য অ্যালার্জি নিয়ে গবেষণায় যে অগ্রগতি হয়েছে, তাতে ভবিষ্যৎ চিকিৎসা নিয়ে আশাবাদী হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। সূত্র: বিবিসি
বয়স ৩০ থেকেই কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তুললে বয়স ৭০-এ এসেও সুস্থ ও সক্রিয় থাকা সম্ভব। নিয়মিত হাঁটা, ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, পরিমিত খাবার এবং অ্যালকোহল কমানোর মতো অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে শরীর ও মস্তিষ্কের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে মানুষের পেশি, হাড়, বিপাকক্রিয়া ও মস্তিষ্কে কিছু পরিবর্তন আসে। তবে গবেষকদের মতে, এসব পরিবর্তন পুরোপুরি অনিবার্য নয়। জীবনযাপনে পরিবর্তন আনলে অনেক মানুষ ৯০ বা ৯৫ বছর বয়স পর্যন্তও ভালো স্বাস্থ্যে থাকতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার বাক ইনস্টিটিউট ফর রিসার্চ অন এজিংয়ের প্রধান নির্বাহী এরিক ভারদিন বলেন, বয়স যেকোনো পর্যায়েই স্বাস্থ্যকর অভ্যাস শুরু করা যায়। তবে যত আগে শুরু করা যায়, তত ভালো ফল পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। গবেষকদের মতে, বয়স ৩০ শরীরের সক্ষমতা বাড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময় পেশির শক্তি, হাড়ের ঘনত্ব ও বিপাকক্রিয়ায় বয়সজনিত সূক্ষ্ম পরিবর্তন শুরু হতে পারে। তাই এই সময় থেকেই শরীরকে শক্তিশালী রাখার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। ম্যানচেস্টার মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির পুষ্টি ও বিপাকক্রিয়া বিভাগের শিক্ষক পল মরগান বলেন, বয়স ৩০-এ শরীরের সক্ষমতা যতটা সম্ভব বাড়ানো উচিত। বিশেষ করে শ্বাস-প্রশ্বাসের ক্ষমতা, নমনীয়তা এবং পেশির শক্তির দিকে নজর দেওয়া দরকার। তিনি বলেন, পায়ের পেশি শক্তিশালী রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ৭০ বছর বয়সের পর পড়ে গিয়ে আহত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। পায়ের পেশি শক্তিশালী থাকলে চলাফেরা ও নিজের কাজ নিজে করার ক্ষমতা দীর্ঘদিন বজায় রাখা সম্ভব। টেনিস, ব্যাডমিন্টন, সাইক্লিং ও নিয়মিত হাঁটা এ ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, র্যাকেট খেলা ও নিয়মিত সাইক্লিং দীর্ঘায়ু এবং সুস্থ থাকার সঙ্গে সম্পর্কিত। সপ্তাহে ৭৫ মিনিটের বেশি দৌড়ানোও বয়সজনিত কিছু পরিবর্তন ধীর করতে পারে। তবে অতিরিক্ত পরিশ্রম বা শরীরকে চরম পর্যায়ে ঠেলে দেওয়া সবসময় উপকারী নয়। পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক আদিতি গুরকার বলেন, প্রতিদিন মাত্র পাঁচ মিনিট মাঝারি থেকে কঠিন ধরনের শরীরচর্চাও মস্তিষ্কের বয়স বাড়ার গতি ধীর করতে পারে। খাবারের পর ১৫ মিনিট দ্রুত হাঁটাও উপকারী। শুধু শরীর নয়, বয়স ৩০ থেকেই মস্তিষ্কের যত্ন নেওয়াও জরুরি। নিয়মিত দাঁতের পরীক্ষা, ভালোভাবে দাঁত পরিষ্কার করা, ধূমপান না করা এবং অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার কম খেলে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। গবেষণায় মাড়ির রোগের সঙ্গে পরবর্তী জীবনে স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। মাড়ির রোগ শরীরে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ তৈরি করতে পারে। এই প্রদাহ মস্তিষ্কের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হয়। বয়স ৩০ থেকেই অ্যালকোহল পান কমানো উচিত। অ্যালকোহল শরীরের কোষে বয়সজনিত পরিবর্তন বাড়াতে পারে। এটি ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দও নষ্ট করে। নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস মস্তিষ্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমানো এবং একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠার চেষ্টা করা উচিত। পর্যাপ্ত ঘুম শরীরের কোষ মেরামতে সাহায্য করে। ঘুম কম হলে বিপাকক্রিয়া বদলে যেতে পারে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস ধরে রাখার আগ্রহ ও শক্তিও কমে যায়। পুষ্টির দিকেও বয়স ৩০ থেকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ধরে না খেয়ে থাকার অভ্যাস কিছু মানুষের জন্য উপকারী হতে পারে। তবে এর জন্য কঠোর নিয়ম মানার প্রয়োজন নেই। ১২ ঘণ্টা খাবার গ্রহণ এবং ১২ ঘণ্টা না খাওয়ার অভ্যাসও অনেকের জন্য সহজ হতে পারে। খাবারে ফল ও সবজি বাড়ানো এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার কমানোও জরুরি। মিষ্টি আলু, গাজর, আম ও এপ্রিকটের মতো খাবারে থাকা ক্যারোটিনয়েড নামের উপাদান কোষকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে পারে। এতে বয়স বাড়ার গতি কিছুটা ধীর হতে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। মায়ো ক্লিনিকের বয়সজনিত রোগবিষয়ক গবেষক জোয়াও পাসোস বলেন, বয়স ৩০-এ স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তুললে পরবর্তী জীবনে হৃদ্রোগ, স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া এবং শারীরিক দুর্বলতার ঝুঁকি কমতে পারে। তবে এসব অভ্যাস বয়স বাড়ার প্রক্রিয়া পুরোপুরি বন্ধ করতে পারে না। বরং এগুলো বয়সজনিত পরিবর্তনের গতি ধীর করতে এবং দীর্ঘদিন সুস্থ ও স্বনির্ভর থাকতে সাহায্য করতে পারে। সূত্র: বিবিসি