অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প সফরের পর একটা আশা জেগেছিল আশ্রিত এই জনগোষ্ঠীর বুকে। হয়তো মিয়ানমার তাদের দ্রুত ফিরিয়ে নেবে। পরবাসী রোহিঙ্গারা ভেবেছিল হয়তো পরবর্তী ঈদ করবে তারা নিদের বাড়িতে গিয়ে। বাস্তবে তা হয়নি, বরং আশা এখন দুঃস্বপ্নে রূপ নিয়েছে। নিজ দেশে প্রত্যাবাসন এক অনিশ্চয়তায় পরিণত হয়েছে। কেউ জানে না—আসলে কত বছর লাগবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিজ দেশে ফেরত যেতে। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট বাংলাদেশের সীমান্ত অভিমুখে নেমেছিল রোহিঙ্গাদের ঢল। আজ সেই দিনটির ৯ বছর পূর্ণ হলো।
২০১৭ সালের এই দিন থেকে মিয়ানমারের রাখাইনে সেনা অভিযান ও নির্যাতনের মুখে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় লাখো রোহিঙ্গা। পুরোনোদেরসহ বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩২টি শরণার্থী শিবিরে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর’র তথ্য অনুযায়ী, গত ৩১ জুলাই পর্যন্ত নিবন্ধিত রোহিঙ্গা নাগরিকদের সংখ্যা ১২ লাখ ২ হাজার ২৪ জন। এর মধ্যে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে জুলাই পর্যন্ত নতুন নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১ লাখ ৫৪ হাজার ৬৯০ জন। অর্থাৎ তারা নতুন করে প্রবেশ করেছেন।
বছরের পর বছর কাঁটাতারের ভেতর বন্দি জীবন কাটাতে কাটাতে রোহিঙ্গাদের কাছে এখন বড় আকাঙ্ক্ষা একটাই—নিজ ভূমি আরাকানে নিরাপদ ও সম্মানজনকভাবে ফিরে গিয়ে আবারও পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করা। তবে মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন। ২০২৩ সাল থেকে রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তীব্র যুদ্ধ চলছে, বর্তমানে রাখাইনের বেশিরভাগ অঞ্চল আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ফলে প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনও তৈরি হয়নি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মানবিক সংকটের সঙ্গে বাড়ছে উদ্বেগ
সংকটের মানবিক দিক আরও গভীর হচ্ছে। জাতিসংঘের তথ্যের বরাতে সেভ দ্য চিলড্রেন জানিয়েছে, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার থেকে নৌকায় পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা গত বছরের তুলনায় ৯০ শতাংশ বেড়েছে। গত জুলাই মাসে মালয়েশিয়ার পথে মানবপাচারকারীদের নৌকায় যাত্রা করা অন্তত ৫৩০ রোহিঙ্গা প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে নিখোঁজ রয়েছেন—যা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় সমুদ্র ট্র্যাজেডি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অপরদিকে ইউএনএইচসিআর বলছে, বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রার চেষ্টা করা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য ২০২৫ সাল ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছর। ২০২৫ সালে আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগরে প্রায় ৯০০ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী মারা গেছেন বা নিখোঁজ রয়েছেন। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) তথ্যমতে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সমুদ্রপথে চলাচলের ক্ষেত্রে এটি এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছর। ওই বছর ৬ হাজার ৫০০-এরও বেশি রোহিঙ্গা ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথ পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেন—যাদের প্রতি সাত জনে একজন নিখোঁজ বা মৃত বলে জানা গেছে— যা শরণার্থী ও অভিবাসীদের যেকোনও প্রধান সমুদ্রপথের মধ্যে বিশ্বে সর্বোচ্চ মৃত্যুহার। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই পথে যাত্রা করা মানুষদের অর্ধেকেরও বেশি ছিলেন নারী ও শিশু। এই ধারা ২০২৬ সালেও অব্যাহত রয়েছে—জানুয়ারি থেকে গত ১৩ এপ্রিলের মধ্যে ২ হাজার ৮০০-এরও বেশি রোহিঙ্গা বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রা করেছেন।
প্রত্যাবাসন এখনও দুঃস্বপ্ন
প্রথমবারের মতো ২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বর বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত চুক্তি সই করেন। এরপর ১৯ ডিসেম্বর যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন ও এর কার্যপ্রণালি ঠিক করা হয়। পরের বছরের ১৬ জানুয়ারি মাঠপর্যায়ের চুক্তি ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট চূড়ান্ত ও স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী শর্ত ছিল, মিয়ানমার প্রতিদিন ৩০০ করে প্রতি সপ্তাহে দেড় হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত নেবে এবং দু’বছরের মধ্যে এই রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শেষ করা হবে।
কিন্তু, সেই চুক্তি মোতাবেক কিছুই হয়নি। তিন বছর স্থবির থাকে প্রত্যাবাসন, একজনকেও ফেরত পাঠানো যায়নি। এরপর আবার প্রত্যাবাসনের আলো জ্বালানো হয়। মিয়ানমারের সামরিক সরকার রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে আগ্রহ প্রকাশ করে। পরিচয় যাচাই করে তাদের ফেরত নেওয়া হবে বলে ২০২২ সালে মিয়ানমারের জান্তা সরকার জানায়। কিন্তু, কবে নাগাদ প্রত্যাবাসন শুরু হবে সেই সম্পর্কে কোনও ধারণা তখনও পাওয়া যায়নি।
এর আগে ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বর প্রত্যাবাসনের তারিখ ঘোষণা করেছিল দু’দেশ। কিন্তু রোহিঙ্গারা ‘যেতে রাজি না’ হওয়ায় সেটা পণ্ড হয় যায়। একইভাবে ২০১৯ সালের ২২ আগস্ট থেকে প্রত্যাবাসন শুরু হওয়ার কথা থাকলেও নাগরিকত্বের বিষয়টি সুরাহা না হওয়ায় রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় ফিরতে চাইনি। রাখাইনে স্বেচ্ছায় ফেরার বিষয়ে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আলোচনার দায়িত্বে ছিল ইউএনএইচসিআর। পরিচয় যাচাই-বাছাই করে ওইবার সাড়ে তিন হাজার রোহিঙ্গার তালিকা ইউএনএইচসিআরকে দিয়েছিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। রোহিঙ্গারা যে সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে দেশ ছেড়ে এসেছে, সেই অবস্থায় এই পরিচয় যাচাইয়ের বিষয়টি মিয়ানমারকে শিথিল করতে বলে চীন।
১২ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে, মানছে না মিয়ানমার
বাংলাদেশে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের তথ্যকে সঠিক নয় বলে দাবি করেছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে এই প্রসঙ্গে প্রতিবেদন প্রকাশের পর গত ১৫ আগস্ট এক বিবৃতিতে এই দাবি করেছে মিয়ানমার। এতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রাখাইন রাজ্য থেকে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তি এবং অন্যান্য দেশে সাগর পাড়ি দিয়ে অভিবাসিত, পাশাপাশি বাংলাদেশের কক্সবাজারের ক্যাম্পে বসবাসকারীদের বিভিন্ন বিবরণ উপস্থাপন করেছে। লক্ষ করা গেছে যে এই প্রতিবেদন, প্রকাশনা এবং সম্প্রচারগুলো একতরফা এবং ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে। তাই মিয়ানমার রাখাইন রাজ্য থেকে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের প্রকৃত হিসাব নিম্নরূপ পরিষ্কার করতে চায়।
মিয়ানমার দাবি করেছে, উত্তর রাখাইন রাজ্য থেকে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের বিষয়ে বাস্তবতা ছিল যে ২০১৬ সালের অক্টোবর এবং নভেম্বর এবং ২০১৭ সালের আগস্ট, আরসা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী উত্তর রাখাইন রাজ্যের পুলিশ ফাঁড়ি এবং ব্যাটালিয়নে একযোগে এবং সমন্বিত হামলা চালায়। এ ছাড়া সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটি সরকারি কর্মচারী ও স্থানীয় জাতিগত লোকজনকে হত্যা করেছে। একটি প্রতিরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়ায়, তাতমাদাওকে সন্ত্রাসবিরোধী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়েছিল। আরসা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হুমকি ও আক্রমণের ফলে স্থানীয় জাতিগত লোকজন অন্যান্য শহর ও গ্রামে পালিয়ে যায় এবং বিপুল সংখ্যক ‘বাঙালি’ বাংলাদেশে প্রবেশ করে।
তাদের দাবি, রেকর্ড অনুসারে, আরসা সন্ত্রাসী হামলার আগে রাখাইন রাজ্যের বুথিডং, মংডো এবং রাথেডং টাউনশিপে ৭ লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি ‘বাঙালি’ বসবাস করতো। এই ঘটনার পরে, ২ লাখেরও বেশি ‘বাঙালি’ এই অঞ্চলে রয়ে যায় এবং ৫ লাখ ৪০ হাজারেও বেশি বাঙালি বাংলাদেশে পালিয়ে যায়। এসব পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে রাখাইন রাজ্য থেকে ১০ লাখেরও বেশি বাস্তুচ্যুত ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে, তা সঠিক নয়।
মিয়ানমার বলছে, বাস্তুচ্যুতদের প্রত্যাবাসনে মিয়ানমার দুই মাসের মধ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে তিনটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সম্পাদন করে। এই চুক্তি অনুসারে, মিয়ানমার তিনটি অনুষ্ঠানে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের গ্রহণ করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করেছিল, তবে বাস্তুচ্যুতদের কেউই মিয়ানমারে ফেরেননি।
বাংলাদেশ কর্তৃক প্রদত্ত ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ বাস্তুচ্যুত ব্যক্তির তালিকার মধ্যে, মিয়ানমার ২০২৬ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জন ব্যক্তিকে যাচাই করেছে। যাচাইকৃতদের মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জন ব্যক্তি রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা বলে প্রমাণিত হয়েছে। যেখানে ৪ হাজার ২৪১ জন ব্যক্তি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে প্রমাণিত হয়েছে, তবে ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য যাচাই করা যায়নি।
ফেরত পাঠানো চ্যালেঞ্জ, রাজনৈতিক সমাধান খুঁজছে সরকার
মিয়ানামার সরকারের এমন বিবৃতির বিরোধিতা করেছে ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মিয়ানমারের দাবি প্রত্যাখ্যান করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করা সঠিক নয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মিয়ানমার অনুবিভাগের মহাপরিচালক তৌফিক-উর-রহমান মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে বলেন, ওই বিবৃতির অনেক তথ্যই ভুল পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে।
মিয়ানমারের চলমান অসন্তোষ এবং ভিত্তিহীন দাবির পরিপ্রেক্ষিতে রোহিঙ্গা সংকটে সরকার রাজনৈতিক সমাধান খুঁজছে, কারণ এটা শুধু মানবিক সংকট নয়, এখন এটা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় জাতীয় নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া কার্যত ব্যর্থ, নিরাপত্তা ঝুঁকি বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক তহবিল কমে যাওয়া, মিয়ানমারের নতুন কৌশল, সমুদ্রপথে পাচার রোধে চাপকে ঘিরে রাজনৈতিক সমাধানের দিকেই ঝুঁকছে বাংলাদেশ। এই কারণে সরকার এখন শুধু মানবিক সহায়তা বা দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ওপর নির্ভর না করে, আসিয়ান, চীন, তুরস্ক, মালয়েশিয়া ও নরওয়ের মতো দেশগুলোকে যুক্ত করে একটি রাজনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজছে—যেখানে মিয়ানমারে নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের নিশ্চয়তা থাকবে।
এই প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘‘রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান আমাদের কাছে নেই। এটি শুরু যেখান থেকে তাদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। আমরা চাই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিরাপদ, টেকসই এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন। মিয়ানমার যদি চায় আমরা অবশ্যই তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিয়ে যেতে সহায়তা করবো।’’
এ বিষয়ে সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ূন কবির বলেন, ‘‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কেমন সময় লাগবে এটা বলা মুশকিল। এটা নির্ভর করবে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর। তবে, আমাদের দিক থেকে আমরা চাই ওরা যত দ্রুত চলে যায়। রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে কম সময়ে সেটা সম্ভব, যদি দুপক্ষই সমস্যাটা দ্রুত সমাধান করার বিষয়ে সক্রিয় থাকে।’’
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমার থেকে, এর টেকসই সমাধান শেষ পর্যন্ত মিয়ানমারের খুঁজে বের করতে হবে। এর চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে, রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছাসেবী, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবর্তন। এটি কেবল একটি নীতিগত অগ্রাধিকার নয়, এটাই একমাত্র টেকসই পথ। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী নিজেরাই বারবার দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। আমাদের অবশ্যই তাদের কথা শুনতে হবে। তাদের আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান করতে হবে। এছাড়া, একটি শরণার্থী শিবির কখনোই স্বদেশের স্থায়ী বিকল্প হওয়া উচিত নয়।
তিনি বলেন, ‘‘আমাদেরও যাচাইয়ের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। ক্যাম্পে জন্মগ্রহণকারী শিশুদের বিবেচনায় নিয়ে সম্মত দ্বিপক্ষীয় দলিলের ভিত্তিতে যাচাইকরণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে হবে। ২০১৭ সাল থেকে যারা রাখাইন থেকে এসেছেন তাদেরও বিবেচনায় নিতে হবে। সঠিক তথ্য অপরিহার্য, বিশ্বাসযোগ্য যাচাইকরণ অপরিহার্য এবং একটি বিশ্বাসযোগ্য যাচাইকরণ প্রক্রিয়া উভয়পক্ষের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ আস্থা তৈরির ব্যবস্থা হয়ে উঠতে পারে। এ জন্য বাংলাদেশ গঠনমূলকভাবে সম্পৃক্ত হতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা দ্বিপাক্ষিক চ্যানেলের মাধ্যমে, জাতিসংঘের মাধ্যমে, আঞ্চলিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এবং আমাদের আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবো।
ইউএনএইচসিআর’র মুখপাত্র শারি নিজমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশ থেকে শরণার্থীদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই উপায়ে স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের জন্য অনুকূল নয়। প্রতিটি শরণার্থীর তাদের জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়ার একটি অবিচ্ছেদ্য অধিকার আছে এবং এই নীতিটি অবশ্যই সমুন্নত রাখতে হবে। অনেক রোহিঙ্গা দ্রুত সময়ে মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার আশা প্রকাশ করেছেন। চূড়ান্তভাবে এই সংকটের সমাধান মিয়ানমারের মধ্যে রয়েছে। যেকোনও প্রত্যাবাসন অবশ্যই স্বেচ্ছায়, আগে থেকে অবহিত এবং নিরাপদ ও মর্যাদার সঙ্গে পরিচালিত হতে হবে।’’
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৫ কেজি ৪০ গ্রাম কুশ, ৩ লিটার বিদেশি মদ ও ২৪টি ভারতীয় শাড়িসহ দুই ভারতীয় নাগরিককে গ্রেফতার করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি)। গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন সানোয়ার আলী (৩৬) ও ইমতিয়াজ আহমেদ (৩৬)। তাদের কাছ থেকে ভারতীয় পাসপোর্টও উদ্ধার করা হয়েছে। সোমবার (২৪ আগস্ট) দুপুরে বিমানবন্দরের নিচতলায় আগমনী হলের গ্রিন চ্যানেল থেকে তাদের আটক করা হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। ডিএনসি সূত্র জানায়, গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে ডিএনসির ঢাকা মেট্রো (উত্তর) ও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ড. মো. আবু সাঈদ মিয়ার নেতৃত্বে একটি বিশেষ দল বিমানবন্দরের গ্রিন চ্যানেলে অবস্থান নেয়। এ সময় ব্যাংকক থেকে থাই এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে আসা দুই ভারতীয় নাগরিককে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়। পরে উপস্থিত সাক্ষী ও বিমানবন্দরে কর্মরত বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের সামনে তাদের ট্রাভেল ট্রলি তল্লাশি করা হয়। তল্লাশিতে কাপড়ের নিচে লুকানো ৫ কেজি ৪০ গ্রাম কুশ, ৩ লিটার বিদেশি মদ ও ২৪টি ভারতীয় শাড়ি উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় বিমানবন্দর থানায় মামলা হয়েছে। ডিএনসির ঢাকা মেট্রো (উত্তর) বিমানবন্দর সার্কেলের পরিদর্শক শাহরিয়া শারমিন বাদী হয়ে মামলাটি করেন। ডিএনসি জানিয়েছে, তাদের সঙ্গে সহযোগী হিসেবে থাকা কয়েকজন বাংলাদেশিকে ইতোমধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।
পবিত্র ঈদ-ই মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে সীরাতুন্নবী (সা.) অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সন্ধ্যা ৭টায় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করবেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দায়িত্বগ্রহণের পর বঙ্গভবনের বাইরে এটি তার প্রথম কর্মসূচি। আয়োজক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে রাষ্ট্রপতি সেখানে গিয়ে মাগরিবের নামাজ আদায় করবেন। তার আগমন ঘিরে ইতোমধ্যে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, গত ২০ আগস্ট ক্ষমতাসীন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে হারিয়ে দেশের ১১তম রাষ্ট্রপতি হন মির্জা ফখরুল। পরদিন ২১ আগস্ট বঙ্গভবনে শপথ নেন তিনি। ২৩ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’-তে বাংলাদেশ আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। সোমবার (২৪ আগস্ট) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান। হুমায়ুন কবির বলেন, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়ে বাংলাদেশ আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং এ উদ্যোগকে স্বীকৃতি দেয়। বাংলাদেশেরও এতে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ রয়েছে। তিনি বলেন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিষয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রতি বিশ্ব নেতাদের আমন্ত্রণ রয়েছে। একই সঙ্গে মক্কার সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের আবেগ ও ধর্মীয় সম্পর্কের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, মক্কা বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে বিশেষ জায়গা দখল করে আছে। মধ্যপ্রাচ্য বা ইসলামিক দেশগুলোর মধ্যে কোনো নিরাপত্তা জোট গঠিত হলে সেখানে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ অস্বাভাবিক হবে না। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’-তে স্বাক্ষর করে। চুক্তির মাধ্যমে তিন দেশ পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে।