আলোচিত তোষাখানার দ্বিতীয় মামলার রায়ের প্রতিবাদে দেশব্যাপী বিক্ষোভের আহ্বান জানিয়েছেন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। স্থানীয় সময় শনিবার (২০ ডিসেম্বর) নিজের আইনজীবীর মাধ্যমে এই বিক্ষোভের ডাক দেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী। এই রায়ের বিপক্ষে হাইকোর্টে আবেদনের ঘোষণাও দেন। এক প্রতিবেদনে দেশটির সংবাদমাধ্যম ডন নিউজ এ তথ্য জানায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ইমরান খানের পক্ষ থেকে একটি পোস্ট করেন তার আইনজীবী। যেখানে বলা হয়, রাজপথে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিতে। এরইমাঝে খাইবার পাখতুনখোয়ার মুখ্যমন্ত্রী সোহাইল আফ্রিদিকে বার্তা পাঠিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি নিজেদের অধিকার আদায়ে পুরো জাতিকে জেগে উঠার আহ্বান জানান তিনি।
এই মামলাটি ইতালির বিশালবহুল ব্র্যান্ড বুলগারির একটি ‘জুয়েলারি সেট’ কেনার সঙ্গে সম্পর্কিত। সেই উপহার নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগে শনিবার (২০ ডিসেম্বর) সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও তার স্ত্রী বুশরা বিবিকে মোট ১৭ বছরের কারাদণ্ডের পাশাপাশি ১ কোটি ৬৪ লাখ রুপি জরিমানা করেছে আদালত।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালের মে মাসে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইমরান খান সরকারি সফরে সৌদি আরবে গেলে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ইমরানকে বুলগারির ওই জুয়েলারি সেটটি উপহার দিয়েছিলেন। পরে ইমরান নামমাত্র মূল্য দিয়ে সেটি নিজের কাছে রেখে দেন।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংঘটিত এজাহারভুক্ত হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ও মিরাজ হোসেন পলাতক রয়েছেন। ব্যাংক প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খুনের শিকার কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুল হালিম ছিলেন কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেনের নাম রয়েছে। তারা বর্তমানে নিজেদের সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। ব্যাংক সূত্রে গেছে, তারা চাঁদাবাজি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এসব আসামিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেন। এতে আরও যুক্ত রয়েছেন ডিজিএম সৈয়দ লিয়াকত হোসেন, হাবিব উন নবী, ডিএমডি খালেকুজ্জামান জুয়েল ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে আব্দুল হালিমের মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক সজীব কুমার সিং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জানান, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাত ১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান। হালিমের ছেলে ফয়সাল বলেন, তার বাবা ২০১৪ সাল থেকে কৃষি ব্যাংক সিবিএর সভাপতি ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গত নভেম্বরেই মতিঝিল থানায় একটি জিডি (নং ০৫/১১/২০২৪ - ৩৩৫) করেছিলেন তার বাবা। তিনি আরও বলেন, বুধবার রাতে আমার বাবাকে তার অফিসের সহকর্মীরা মারধর করে হত্যা করেছে। সিবিএর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জানান, ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হই। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট বিনা নির্বাচনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে আমাদের অফিস দখল করে নেয় ফয়েজ ও মিরাজ। এ নিয়ে মামলা চলছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা অস্থায়ী জামিনে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন—যাদের মধ্যে আছেন ড্রাইভার সাইফুল, শাহেদ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মেহেদী ও অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনার সিরাজ। এদিকে, মামলার ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের প্রধান মহাব্যবস্থাপক জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। কারণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য না করার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, বড় যুদ্ধ শুধু মানচিত্র বদলায় না, যুদ্ধের ধরনও পাল্টে দেয়। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে, আমরা হয়তো এমন এক নতুন যুগে ঢুকে পড়েছি, যেখানে যুদ্ধের পুরোনো নিয়ম আর খাটছে না। এখন আর শত্রুর আকাশসীমায় ঢুকে লড়াই করা জরুরি নয়—দূরে বসেই আঘাত হানা যাচ্ছে, আর সেটাই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ইসরায়েল কাতারে হামলা চালায়। সেখানে কোনো যুদ্ধক্ষেত্র ছিল না, কোনো সরাসরি সংঘর্ষও চলছিল না। লক্ষ্য ছিল দোহার একটি বৈঠক, যেখানে হামাসের নেতারা যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করতে বসেছিলেন। সেই প্রস্তাব আবার এসেছিল ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে, আর তাতে ইসরায়েল নিজেও সম্পৃক্ত ছিল। অর্থাৎ যে আলোচনায় নিজেরাও অংশ নিচ্ছিল, সেই বৈঠককেই লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছিল। দোহায় ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার সঙ্গে সঙ্গেই বোঝা যায়, এটা শুধু একটি হামলা নয়—এটি একটি নতুন নজির। এই একই ধরনের কৌশল আবার দেখা যায় ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। আমেরিকা ও ইসরায়েলের ইরান যুদ্ধের শুরুতেই তেহরানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কম্পাউন্ডকে লক্ষ্য করে আঘাত হানা হয়। দুটি ঘটনার মধ্যে সময়ের ব্যবধান থাকলেও কৌশল একেবারে একই। দুটি ক্ষেত্রেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ইসরায়েলের যুদ্ধবিমান টার্গেট করা দেশের আকাশসীমায় ঢোকেনি। তারা দূর থেকেই ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। সেই ক্ষেপণাস্ত্র নিজে নিজেই গিয়ে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করেছে। এর ফলে বিমানযুদ্ধের সবচেয়ে বড় বাধা—শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষা ভেদ করা—প্রায় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেল। দোহায় হামলাটি কৌশলগতভাবে ভুল ছিল বলেই ধরা হচ্ছে। কারণ, এতে ইসরায়েলের এই নতুন সামরিক ক্ষমতা অপ্রয়োজনীয়ভাবে সবার সামনে চলে আসে। লক্ষ্যটিও ছিল মূলত রাজনৈতিক, সামরিক নয়। পরে ইসরায়েল এই হামলার জন্য ক্ষমা চাইলেও, একবার যে প্রযুক্তি প্রকাশ্যে চলে এসেছে, তা আর লুকিয়ে রাখা যায়নি। এই হামলাগুলোতে প্রচলিত বোমাবর্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়নি। বরং এক জটিল সমন্বিত প্রযুক্তিব্যবস্থার মাধ্যমে পুরো অপারেশন পরিচালিত হয়েছে। এখানে গোয়েন্দা তথ্য, নজরদারি, সাইবারব্যবস্থা, যোগাযোগ, কমান্ড—সবকিছুকে একসঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া, বাস্তব সময়ের পরিস্থিতি বোঝা এবং নিখুঁতভাবে আঘাত করা সম্ভব হয়েছে। ফলে বোঝা যায়, এখানে বিমান নয়, আসল শক্তি এই সমন্বিত ব্যবস্থাটাই। কাতারের ক্ষেত্রে একটি ইসরায়েলি এফ-১৫ আই যুদ্ধবিমান লোহিত সাগরের আন্তর্জাতিক জলসীমার ওপর দিয়ে উড়ে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দরের কাছাকাছি অবস্থান নেয়। কিন্তু তারা সৌদি আকাশসীমায় ঢোকেনি। কারণ, সৌদি আরবের বহুস্তরীয় শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়াই ছিল লক্ষ্য। এই অবস্থান থেকেই বিমানটি একটি আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে, যা স্প্যারো পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। সেটি সম্ভবত সিলভার স্প্যারো ধরনের। এটি এমন একধরনের ক্ষেপণাস্ত্র, যা প্রথমে বিমানের সঙ্গে থাকে, কিন্তু একবার ছেড়ে দিলে তা নিজের মতো করে এগোয়, অনেকটা মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মতো। ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রথমে রকেট বুস্টারের সাহায্যে ওপরে উঠে যায়। এটি ওঠে প্রায় বায়ুমণ্ডলের বাইরের স্তর পর্যন্ত। তারপর সেটি একটি বাঁকানো পথে এগিয়ে চলে, যেখানে সাধারণ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পৌঁছাতে পারে না। শেষ পর্যায়ে এটি অত্যন্ত দ্রুত গতিতে প্রায় সোজা নিচে নেমে আসে। এই সময় ক্ষেপণাস্ত্রের গতি থাকে হাইপারসনিক বা অতিস্বনক মাত্রায়, অর্থাৎ শব্দের গতির চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি। বায়ুমণ্ডলে ঢোকার সময় ঘর্ষণে প্রচণ্ড তাপ তৈরি হয় এবং তার চারপাশে প্লাজমার স্তর তৈরি হয়। এতে রাডারের পক্ষে সঠিকভাবে তাকে ধরা কঠিন হয়। ফলে প্রতিরক্ষাব্যবস্থার হাতে সময় থাকে খুবই কম—মাত্র কয়েক সেকেন্ড। এই অল্প সময়ে লক্ষ্য শনাক্ত করা, তার গতিপথ বোঝা এবং প্রতিরোধ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এমনকি অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও এই সমস্যার পুরো সমাধান করতে পারে না। তারা কিছুটা সাহায্য করতে পারে, কিন্তু সময় বাড়াতে পারে না। আর এই সময়ের সীমাবদ্ধতাই সবচেয়ে বড় বাধা, যা প্রযুক্তি দিয়ে পুরো কাটানো যায় না। তেহরানের হামলাতেও সম্ভবত ব্লু স্প্যারো ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে একই কৌশল ব্যবহার করা হয়। এবার বিমানটি সিরিয়া বা ইরাকের দিক থেকে উড়ে এসে ইরানের দিকে উত্তর দিক থেকে আঘাত হানে। ভৌগোলিক অবস্থান বদলালেও কৌশল একটাই ছিল—দূর থেকে আঘাত, দ্রুতগতি এবং প্রতিরক্ষা এড়িয়ে যাওয়া। এই প্রযুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এটি ব্যবহার করতে গেলে বিমানের ভেতরের সফটওয়্যার ও মিশন সিস্টেমের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকতে হয়। অর্থাৎ শুধু বিমান থাকলেই হবে না, তার ভেতরের কোড ও ডেটার ওপরও নিজের কর্তৃত্ব থাকতে হবে। ইসরায়েল সেই নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে বলেই তারা এই ধরনের অপারেশন চালাতে পারছে। এখানেই বড় প্রশ্ন ওঠে। সৌদি আরব বিশ্বের সবচেয়ে বড় মার্কিন অস্ত্র ক্রেতা এবং তাদের কাছে বিপুলসংখ্যক এফ-১৫ বিমান রয়েছে। তবু তাদের বিমান এই ধরনের স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ পায় না। কাতারের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তাহলে এক দেশের ক্ষেত্রে এই সুযোগ দেওয়া হলো, অন্যদের ক্ষেত্রে নয় কেন? এই প্রশ্ন শুধু প্রযুক্তিগত নয়, সামরিক স্বাধীনতা এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের মূল প্রশ্ন হয়ে আছে। এর থেকেও বড় বিষয় হলো—এই কৌশল এখন আর গোপন নেই। কাতার ও ইরানে সফলভাবে ব্যবহার করে ইসরায়েল দেখিয়ে দিয়েছে, এটি কাজ করে। আর একবার কোনো পদ্ধতি কাজ করে দেখানো হলে, অন্য দেশগুলোও সেটি অনুসরণ করতে পারে। এই প্রযুক্তির জন্য যেসব উপাদান দরকার, তা হলো—শক্তিশালী যুদ্ধবিমান, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, উন্নত নির্দেশনাব্যবস্থা। এর সবই অনেক দেশের কাছে রয়েছে। আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স, পাকিস্তান—অনেক দেশই চাইলে এই ধরনের ব্যবস্থা তৈরি করতে পারবে। এর ফলে যুদ্ধ এখন এমন এক জায়গায় পৌঁছাচ্ছে, যা পুরোপুরি আকাশ নয়, আবার পুরোপুরি মহাকাশও নয়—মাঝামাঝি এক স্তর। একবার এই সীমারেখা ভেঙে গেলে, তা আর আগের অবস্থায় ফিরবে না। এর ফল খুবই গভীর। এখন আর কোনো দেশই পুরোপুরি নিরাপদ নয়। দূরত্ব বা ভৌগোলিক অবস্থান আর আগের মতো সুরক্ষা দেবে না। যে দূরত্ব একসময় নিরাপত্তার দেয়াল তৈরি করত, এখন তা আর তেমন কাজ করছে না। ইসরায়েল এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে শুধু নিজের শক্তি বাড়ায়নি, অন্যদের জন্য পথও খুলে দিয়েছে। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা—কবে অন্য দেশগুলোও একইভাবে এই কৌশল ব্যবহার করতে শুরু করবে। এই পরিবর্তনের ফলে যুদ্ধ আরও অনিশ্চিত, দ্রুত এবং বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ও কমে আসবে—দিন নয়, মিনিটের মধ্যে বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এই অস্ত্র শুধু যুদ্ধের জন্য নয়, রাজনৈতিক চাপ তৈরি করা, আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং কৌশলগত দ্বন্দ্ব মেটানোর ক্ষেত্রেও ব্যবহার হতে পারে। সব মিলিয়ে, যুদ্ধের ধারণাই বদলে যাচ্ছে। আর সেই সঙ্গে বদলে যাচ্ছে নিরাপত্তা সম্পর্কে আমাদের পুরোনো ধারণাও।
ভারতের আলোচিত ব্যবসায়ী গৌতম আদানি ও তাঁর ভাতিজা সাগর আদানির বিরুদ্ধে আনা সব ফৌজদারি অভিযোগ স্থায়ীভাবে প্রত্যাহার করে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ। প্রসিকিউটররা এসব অভিযোগ প্রমাণ করতে পারবেন না, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পর নিউইয়র্কের এই হাই প্রোফাইল সিকিউরিটিজ ও ওয়্যার ফ্রড (প্রতারণা) মামলার পুরোপুরি শেষ হলো। আদালতের নথি অনুযায়ী, ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসন গতকাল সোমবার গৌতম আদানির বিরুদ্ধে ফৌজদারি প্রতারণার অভিযোগ খারিজ করার পদক্ষেপ নিয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর প্রধান প্রতিষ্ঠান আদানি এন্টারপ্রাইজেসের বিরুদ্ধে ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের অভিযোগেরও মীমাংসা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে গত দু-এক দিনে ভারতীয় এই ব্যবসায়ী গ্রুপের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক ও আইনি সংস্থার একাধিক তদন্তের সব কটিই বন্ধ হয়ে গেল। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস গত সপ্তাহে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল, আদানির আইনজীবী রবার্ট জিউফ্রা জুনিয়র (যিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পেরও ব্যক্তিগত আইনজীবী) এক উপস্থাপনায় বলেছিলেন, আদানি যুক্তরাষ্ট্রে এক হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মামলার কারণে তা করতে পারছিলেন না। আদানির বিরুদ্ধে অভিযোগ, ভারতের বৃহত্তম সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অনুমোদন পেতে আদানি গ্রুপ সে দেশের সরকারি কর্মকর্তাদের ২৬ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার ঘুষ দিতে রাজি হয়েছিল। আদানি গ্রুপ শুরু থেকেই কোনো ধরনের অন্যায়ের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। আদানি এই কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান। এর আগে গতকাল আদানি এন্টারপ্রাইজেস লিমিটেড (এইএল) ইরানের ওপর ‘অফিস অব ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল’–এর (ওএফএসি) আরোপিত নিষেধাজ্ঞা স্পষ্টভাবে লঙ্ঘনের কারণে সৃষ্ট সম্ভাব্য দেওয়ানি দায় মেটাতে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের ওএফএসির সঙ্গে একটি চুক্তি করেছে। এ জন্য তারা ২৭ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার পরিশোধ করতে রাজি হয়েছে। এক্সচেঞ্জ ফাইলিংয়ে আদানি এন্টারপ্রাইজেস (এইএল) জানিয়েছে, ওএফএসির আনা অভিযোগ স্বীকার না করেই এই সমঝোতা করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে এটি এ ধরনের দ্বিতীয় চুক্তি। এইএল জানায়, সমঝোতা চুক্তি অনুযায়ী কোম্পানি ওএফএসিকে ২৭ লাখ ৫০ লাখ ডলার জরিমানা দিতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা আইনগত সর্বোচ্চ জরিমানা ৩৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার থেকে কিছুটা কমানো হয়েছে। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) গৌতম আদানি ও সাগর আদানির বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সম্মতিসূচক রায়ের সিদ্ধান্ত এগিয়ে নেয়। এর আগে তাঁদের বিরুদ্ধে ২০২১ সালে ‘আদানি গ্রিন এনার্জি লিমিটেড’-এর বন্ড ছাড়ার ক্ষেত্রে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর বিবৃতি দেওয়ার অভিযোগ এনেছিল এসইসি। আদালত এটি অনুমোদন করলে গৌতম আদানি ও সাগর আদানিকে দেওয়ানি আর্থিক জরিমানা হিসেবে যথাক্রমে ৬০ লাখ ডলার এবং ১ কোটি ২০ লাখ ডলার দিতে হবে। ওএফএসির মতে, ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত আদানি এন্টারপ্রাইজেস দুবাইভিত্তিক এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে এলপিজি কিনেছিল। ওই ব্যবসায়ী ওমানি ও ইরাকি গ্যাস সরবরাহ করছে বলে দাবি করেছিল। ওএফএসি এক বিবৃতিতে বলেছে, কিছু সতর্কবার্তা বা ইঙ্গিত ছিল, যা থেকে আদানি এন্টারপ্রাইজেসের বোঝা উচিত ছিল, ওই এলপিজি আসলে ইরান থেকে এসেছিল। ওএফএসি বলেছে, ওই সময়ের মধ্যে আদানি এন্টারপ্রাইজেস ওই চালান বাবদ মার্কিন আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে ৩২টি কিস্তি পরিশোধ করেছিল, যার মোট পরিমাণ ছিল প্রায় ১৯ কোটি ২১ লাখ ৪ হাজার ৪৪ ডলার। ওএফএসি আরও বলেছে, জরিমানার এই পরিমাণ নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে ওএফএসির বিবেচনা ছিল, আদানির এই নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন ছিল অত্যন্ত গুরুতর এবং তারা নিজেরা এটি স্বেচ্ছায় প্রকাশ করেনি। তবে আচরণটি ধরা পড়ার পর আদানি এন্টারপ্রাইজেস যে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে এবং ওএফএসির তদন্তে যে সহযোগিতা করেছে—সে জন্য জরিমানার পরিমাণ কমানো হয়েছে। ২০২৩ সালের জুনে আদানি এন্টারপ্রাইজেস এলপিজি আমদানি করে ভারতের গ্রাহকদের কাছে বিক্রির মাধ্যমে এলপিজি বাজারে প্রবেশ করে। তবে এর আগে আদানি এন্টারপ্রাইজেস বা তাদের কোনো সহযোগী প্রতিষ্ঠান মুন্দ্রা বন্দরের মাধ্যমে নিজস্ব উদ্যোগে এলপিজি ব্যবসা করেনি। ওএফএসি জানিয়েছে, এই ব্যবসায়িক সম্পর্কের শুরুর দিনগুলো থেকেই বেশ কিছু সতর্কবার্তা দুবাইয়ের ওই সরবরাহকারীর জ্বালানির আসল উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। ওএফএসির মতে, ২০২৩ সালের মার্চ থেকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে অন্তত চারটি ভিন্ন সময়ে আদানি এন্টারপ্রাইজেস তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে জানতে পেরেছিল, দুবাইয়ের সরবরাহকারীর পাঠানো জ্বালানি ইরান থেকে এসে থাকতে পারে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য সংযোগের সতর্কবার্তা থাকা সত্ত্বেও আদানি এন্টারপ্রাইজেস অসতর্কভাবে কাজ করেছে এবং এই স্পষ্ট লঙ্ঘনের বিষয়টি তাদের জানার কারণ ছিল। এর মধ্যে রয়েছে তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে পাওয়া সতর্কবার্তা। এতে ইঙ্গিত ছিল, আদানি এন্টারপ্রাইজেসের আমদানি করা এলপিজি ইরানের হতে পারে। এই জ্বালানির উৎস ও মূল্যের বিষয়টি অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও লজিস্টিক্যালি অসম্ভব বা অবিশ্বাস্য ছিল। ওএফএসি বলেছে, আদানি এন্টারপ্রাইজেস ওএফএসিকে ব্যাপক সহযোগিতা করেছে। যার মধ্যে রয়েছে দ্রুততম সময়ে এবং বিপুল খরচ করে একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ, স্বাধীন অভ্যন্তরীণ তদন্ত পরিচালনা, ওএফএসির তথ্যের অনুরোধে দ্রুত সাড়া দেওয়া এবং এই স্পষ্ট লঙ্ঘনসংক্রান্ত বিশাল তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ করা। ওএফএসি আরও বলেছে, এই স্পষ্ট লঙ্ঘনের প্রতিক্রিয়ায় আদানি এন্টারপ্রাইজেস উল্লেখযোগ্য সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। যার মধ্যে রয়েছে ভারতে এলপিজি আমদানি বন্ধ করা, তাদের নিষেধাজ্ঞা পরিপালন নীতি ও নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা এবং নির্দিষ্ট কিছু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা।
জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা ও বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানিতে আরও ৩০ দিনের জন্য অস্থায়ী ছাড় দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ। এই সিদ্ধান্তের ফলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ কিছুটা স্থিতিশীল থাকবে বলে দাবি করা হয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের মতে, এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হলো বাজারে ভারসাম্য বজায় রাখা এবং নির্দিষ্ট কোনো দেশ যেন এককভাবে কম দামে রাশিয়ার তেল মজুদ করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা। তবে এই সিদ্ধান্তের পরও নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসেনি ভারত। দেশটির পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাশিয়া থেকে তেল আমদানির সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা বা ছাড়ের ওপর নির্ভর করে না, বরং এটি ভারতের জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের বিষয়। মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব সুজাতা শর্মা বলেছেন, ভারত অতীতেও রাশিয়ার তেল আমদানি করেছে, বর্তমানে করছে এবং ভবিষ্যতেও করবে—এই নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসবে না। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণ ও দামের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।