ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, বড় যুদ্ধ শুধু মানচিত্র বদলায় না, যুদ্ধের ধরনও পাল্টে দেয়। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে, আমরা হয়তো এমন এক নতুন যুগে ঢুকে পড়েছি, যেখানে যুদ্ধের পুরোনো নিয়ম আর খাটছে না। এখন আর শত্রুর আকাশসীমায় ঢুকে লড়াই করা জরুরি নয়—দূরে বসেই আঘাত হানা যাচ্ছে, আর সেটাই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।
২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ইসরায়েল কাতারে হামলা চালায়। সেখানে কোনো যুদ্ধক্ষেত্র ছিল না, কোনো সরাসরি সংঘর্ষও চলছিল না। লক্ষ্য ছিল দোহার একটি বৈঠক, যেখানে হামাসের নেতারা যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করতে বসেছিলেন।
সেই প্রস্তাব আবার এসেছিল ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে, আর তাতে ইসরায়েল নিজেও সম্পৃক্ত ছিল। অর্থাৎ যে আলোচনায় নিজেরাও অংশ নিচ্ছিল, সেই বৈঠককেই লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছিল। দোহায় ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার সঙ্গে সঙ্গেই বোঝা যায়, এটা শুধু একটি হামলা নয়—এটি একটি নতুন নজির।
এই একই ধরনের কৌশল আবার দেখা যায় ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। আমেরিকা ও ইসরায়েলের ইরান যুদ্ধের শুরুতেই তেহরানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কম্পাউন্ডকে লক্ষ্য করে আঘাত হানা হয়। দুটি ঘটনার মধ্যে সময়ের ব্যবধান থাকলেও কৌশল একেবারে একই।
দুটি ক্ষেত্রেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ইসরায়েলের যুদ্ধবিমান টার্গেট করা দেশের আকাশসীমায় ঢোকেনি। তারা দূর থেকেই ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। সেই ক্ষেপণাস্ত্র নিজে নিজেই গিয়ে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করেছে। এর ফলে বিমানযুদ্ধের সবচেয়ে বড় বাধা—শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষা ভেদ করা—প্রায় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেল।
দোহায় হামলাটি কৌশলগতভাবে ভুল ছিল বলেই ধরা হচ্ছে। কারণ, এতে ইসরায়েলের এই নতুন সামরিক ক্ষমতা অপ্রয়োজনীয়ভাবে সবার সামনে চলে আসে। লক্ষ্যটিও ছিল মূলত রাজনৈতিক, সামরিক নয়। পরে ইসরায়েল এই হামলার জন্য ক্ষমা চাইলেও, একবার যে প্রযুক্তি প্রকাশ্যে চলে এসেছে, তা আর লুকিয়ে রাখা যায়নি।
এই হামলাগুলোতে প্রচলিত বোমাবর্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়নি। বরং এক জটিল সমন্বিত প্রযুক্তিব্যবস্থার মাধ্যমে পুরো অপারেশন পরিচালিত হয়েছে। এখানে গোয়েন্দা তথ্য, নজরদারি, সাইবারব্যবস্থা, যোগাযোগ, কমান্ড—সবকিছুকে একসঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া, বাস্তব সময়ের পরিস্থিতি বোঝা এবং নিখুঁতভাবে আঘাত করা সম্ভব হয়েছে। ফলে বোঝা যায়, এখানে বিমান নয়, আসল শক্তি এই সমন্বিত ব্যবস্থাটাই।
কাতারের ক্ষেত্রে একটি ইসরায়েলি এফ-১৫ আই যুদ্ধবিমান লোহিত সাগরের আন্তর্জাতিক জলসীমার ওপর দিয়ে উড়ে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দরের কাছাকাছি অবস্থান নেয়। কিন্তু তারা সৌদি আকাশসীমায় ঢোকেনি। কারণ, সৌদি আরবের বহুস্তরীয় শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়াই ছিল লক্ষ্য।
এই অবস্থান থেকেই বিমানটি একটি আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে, যা স্প্যারো পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। সেটি সম্ভবত সিলভার স্প্যারো ধরনের। এটি এমন একধরনের ক্ষেপণাস্ত্র, যা প্রথমে বিমানের সঙ্গে থাকে, কিন্তু একবার ছেড়ে দিলে তা নিজের মতো করে এগোয়, অনেকটা মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মতো।
ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রথমে রকেট বুস্টারের সাহায্যে ওপরে উঠে যায়। এটি ওঠে প্রায় বায়ুমণ্ডলের বাইরের স্তর পর্যন্ত। তারপর সেটি একটি বাঁকানো পথে এগিয়ে চলে, যেখানে সাধারণ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পৌঁছাতে পারে না। শেষ পর্যায়ে এটি অত্যন্ত দ্রুত গতিতে প্রায় সোজা নিচে নেমে আসে।
এই সময় ক্ষেপণাস্ত্রের গতি থাকে হাইপারসনিক বা অতিস্বনক মাত্রায়, অর্থাৎ শব্দের গতির চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি। বায়ুমণ্ডলে ঢোকার সময় ঘর্ষণে প্রচণ্ড তাপ তৈরি হয় এবং তার চারপাশে প্লাজমার স্তর তৈরি হয়। এতে রাডারের পক্ষে সঠিকভাবে তাকে ধরা কঠিন হয়। ফলে প্রতিরক্ষাব্যবস্থার হাতে সময় থাকে খুবই কম—মাত্র কয়েক সেকেন্ড। এই অল্প সময়ে লক্ষ্য শনাক্ত করা, তার গতিপথ বোঝা এবং প্রতিরোধ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
এমনকি অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও এই সমস্যার পুরো সমাধান করতে পারে না। তারা কিছুটা সাহায্য করতে পারে, কিন্তু সময় বাড়াতে পারে না। আর এই সময়ের সীমাবদ্ধতাই সবচেয়ে বড় বাধা, যা প্রযুক্তি দিয়ে পুরো কাটানো যায় না।
তেহরানের হামলাতেও সম্ভবত ব্লু স্প্যারো ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে একই কৌশল ব্যবহার করা হয়। এবার বিমানটি সিরিয়া বা ইরাকের দিক থেকে উড়ে এসে ইরানের দিকে উত্তর দিক থেকে আঘাত হানে। ভৌগোলিক অবস্থান বদলালেও কৌশল একটাই ছিল—দূর থেকে আঘাত, দ্রুতগতি এবং প্রতিরক্ষা এড়িয়ে যাওয়া।
এই প্রযুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এটি ব্যবহার করতে গেলে বিমানের ভেতরের সফটওয়্যার ও মিশন সিস্টেমের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকতে হয়। অর্থাৎ শুধু বিমান থাকলেই হবে না, তার ভেতরের কোড ও ডেটার ওপরও নিজের কর্তৃত্ব থাকতে হবে। ইসরায়েল সেই নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে বলেই তারা এই ধরনের অপারেশন চালাতে পারছে।
এখানেই বড় প্রশ্ন ওঠে। সৌদি আরব বিশ্বের সবচেয়ে বড় মার্কিন অস্ত্র ক্রেতা এবং তাদের কাছে বিপুলসংখ্যক এফ-১৫ বিমান রয়েছে। তবু তাদের বিমান এই ধরনের স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ পায় না। কাতারের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তাহলে এক দেশের ক্ষেত্রে এই সুযোগ দেওয়া হলো, অন্যদের ক্ষেত্রে নয় কেন?
এই প্রশ্ন শুধু প্রযুক্তিগত নয়, সামরিক স্বাধীনতা এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের মূল প্রশ্ন হয়ে আছে।
এর থেকেও বড় বিষয় হলো—এই কৌশল এখন আর গোপন নেই। কাতার ও ইরানে সফলভাবে ব্যবহার করে ইসরায়েল দেখিয়ে দিয়েছে, এটি কাজ করে। আর একবার কোনো পদ্ধতি কাজ করে দেখানো হলে, অন্য দেশগুলোও সেটি অনুসরণ করতে পারে।
এই প্রযুক্তির জন্য যেসব উপাদান দরকার, তা হলো—শক্তিশালী যুদ্ধবিমান, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, উন্নত নির্দেশনাব্যবস্থা। এর সবই অনেক দেশের কাছে রয়েছে। আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স, পাকিস্তান—অনেক দেশই চাইলে এই ধরনের ব্যবস্থা তৈরি করতে পারবে।
এর ফলে যুদ্ধ এখন এমন এক জায়গায় পৌঁছাচ্ছে, যা পুরোপুরি আকাশ নয়, আবার পুরোপুরি মহাকাশও নয়—মাঝামাঝি এক স্তর। একবার এই সীমারেখা ভেঙে গেলে, তা আর আগের অবস্থায় ফিরবে না।
এর ফল খুবই গভীর। এখন আর কোনো দেশই পুরোপুরি নিরাপদ নয়। দূরত্ব বা ভৌগোলিক অবস্থান আর আগের মতো সুরক্ষা দেবে না। যে দূরত্ব একসময় নিরাপত্তার দেয়াল তৈরি করত, এখন তা আর তেমন কাজ করছে না।
ইসরায়েল এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে শুধু নিজের শক্তি বাড়ায়নি, অন্যদের জন্য পথও খুলে দিয়েছে। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা—কবে অন্য দেশগুলোও একইভাবে এই কৌশল ব্যবহার করতে শুরু করবে।
এই পরিবর্তনের ফলে যুদ্ধ আরও অনিশ্চিত, দ্রুত এবং বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ও কমে আসবে—দিন নয়, মিনিটের মধ্যে বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এই অস্ত্র শুধু যুদ্ধের জন্য নয়, রাজনৈতিক চাপ তৈরি করা, আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং কৌশলগত দ্বন্দ্ব মেটানোর ক্ষেত্রেও ব্যবহার হতে পারে।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধের ধারণাই বদলে যাচ্ছে। আর সেই সঙ্গে বদলে যাচ্ছে নিরাপত্তা সম্পর্কে আমাদের পুরোনো ধারণাও।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের পরিচিত মুখ জোশুয়া ওংকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। বৃহস্পতিবার শহরটির জাতীয় নিরাপত্তা আইনে বিদেশি সংস্থার সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগে তাকে এই সাজা দেওয়া হয়। ২০২০ সালে চীন হংকংয়ে কঠোর জাতীয় নিরাপত্তা আইন চালু করে। এর আগে শহরটিতে গণতন্ত্রের দাবিতে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছিল, যার মধ্যে কিছু বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেয়। নতুন এই আইনের ফলে গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনে যুক্ত অনেক তরুণের প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কার্যত বেআইনি হয়ে পড়ে। জোশুয়া ওং ছিলেন তাদেরই একজন। হাইকোর্টের বিচারক উইলিয়াম ট্যাম জনাকীর্ণ আদালতে রায় ঘোষণার সময় বলেন, ‘অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করেই শাস্তি দেওয়া উচিত।’ তবে জোশুয়া ওংকে দেওয়া ১০ বছরের কারাদণ্ড জাতীয় নিরাপত্তা আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের চেয়ে কম। বিচারক আরো বলেন, ‘জাতীয় নিরাপত্তা বিপন্ন করার উদ্দেশ্যে বিদেশি শক্তি বা বাইরের পক্ষের সঙ্গে যোগসাজশ করে ওং যে পরিকল্পনা ও কর্মকাণ্ড চালিয়েছেন, তার প্রতি সমাজের তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা আদালতের রায়ের মাধ্যমে প্রকাশ করা জরুরি।’ বর্তমানে ৩০ বছর বয়সী জোশুয়া ওংয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি স্বেচ্ছায় নির্বাসনে থাকা আন্দোলনকর্মী নাথান ল এবং অন্যদের সঙ্গে মিলে চীনের বাইরের বিভিন্ন দেশ, সংস্থা ও ব্যক্তির কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, এসব দেশ ও সংস্থা যেন হংকং সরকারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, অবরোধ দেয় অথবা অন্য কোনো বৈরী পদক্ষেপ নেয়। হংকংয়ে জাতীয় নিরাপত্তা আইন কার্যকরের বিষয়টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এবং পশ্চিমা ও এশিয়ার কয়েকটি দেশ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এই আইনের আওতায় ওংসহ অন্যদের বিচারও তাদের নজরদারিতে রয়েছে। এর আগে, ফেব্রুয়ারিতে চীনের কট্টর সমালোচক ও হংকংয়ের গণমাধ্যমের ধনকুবের জিমি লাইকে বিদেশি শক্তির সঙ্গে আঁতাত ও রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তার এই বিচার আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনার জন্ম দেয়। রায় ঘোষণার আগে আদালতে উপস্থিত দর্শকদের দিকে বারবার মাথা নেড়ে সাড়া দেন ওং। সাজা কমানোর আবেদনের শুনানিতে তিনি বলেন, ‘আমি কখনো হংকংয়ের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলিনি কিংবা চীনের পতন বা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের প্রচার চালাইনি।’ চীনের সরকার জানিয়েছে, হংকংয়ে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতেই জাতীয় নিরাপত্তা আইন চালু করা হয়েছিল। শহরটির জাতীয় নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান সুপারিনটেনডেন্ট স্টিভ লি বলেন, জোশুয়া ওং কোনো ‘শত্রু’ নন। তবে তাঁকে আইন মেনে চলতে এবং ‘নিজের দেশকে বুঝতে’ শিখতে হবে। বিদেশি শক্তির সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ বিভিন্ন অঞ্চলের রাজনীতিবিদদের সঙ্গে জোশুয়া ওংয়ের বৈঠককে কেন্দ্র করে বেইজিং ক্ষুব্ধ ছিল। চীন তাঁকে বিদেশি শক্তির ‘অশুভ হাত’ হিসেবে অভিহিত করে। বিচারক উইলিয়াম ট্যাম জানান, ২০২০ সালের ১ জুলাই থেকে ২৩ নভেম্বরের মধ্যে এসব অপরাধ সংঘটিত হয়। সে সময় হংকং জাতীয় নিরাপত্তা ও আইনের শাসন নিয়ে বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি। সেপ্টেম্বরের এক শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ জানায়, ওংয়ের নেতৃত্বাধীন বিলুপ্ত রাজনৈতিক দল ডেমোসিস্টো ২০১৯ ও ২০২০ সালে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক প্রচারণার মাধ্যমে হংকং ও চীনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপসহ বিভিন্ন বৈরী পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। এ উদ্দেশ্যে দলটির সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে গিয়ে লবিং করেন। তারা তৎকালীন মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি এবং সিনেটর মার্কো রুবিওর সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে রুবিও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হন। এ ছাড়া হংকংয়ের সার্বভৌমত্ব নিয়ে গণভোট আয়োজনের পক্ষেও অবস্থান নিয়েছিল দলটি। বিচারক ট্যাম বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা আইন কার্যকর হওয়ার আগেই ওং ও স্বেচ্ছায় নির্বাসিত আন্দোলনকর্মী নাথান ল বিদেশে চীনের বিরুদ্ধে প্রচার শুরু করেছিলেন। আইন কার্যকর হওয়ার পরও তারা সেই কর্মকাণ্ড চালিয়ে যান এবং নিজেদের পরিকল্পনা ও কৌশলে পরিবর্তন আনেন। তবে সাজা নির্ধারণের সময় ওংয়ের দোষ স্বীকার, অনুশোচনা এবং কারাগারে থাকাকালে পড়াশোনার বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে জানান বিচারক।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ—কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি। ফলে তার দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি দুই বছর আইন প্রণয়ন ও নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সমঝোতা করতে হবে। একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত ও নজরদারির সুযোগও বাড়বে ডেমোক্র্যাটদের। এতে নিজের রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে নানা বাধার মুখে পড়তে পারেন তিনি। ডেমোক্র্যাটরা এবার যা করতে পারবে— ১. ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে পারবে। মন্ত্রী ও আধিকারিকদের সংসদীয় কমিটিতে তলব করতে পারবে। ২. ট্রাম্পের নতুন আইন পাশ করানোর পথে বাধা দিতে পারবে। ৩. গুরুত্বপূর্ণ বিচারপতি ও প্রশাসনিক পদে ট্রাম্পের মনোনীত ব্যক্তিদের নিয়োগ আটকে দিতে পারবে। ৪. ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্টের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবে। তবে প্রেসিডেন্টকে সরাতে সেনেটে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন। সেটা ডেমোক্র্যাটদের এখনও নেই কিন্তু ট্রাম্পের হাতেও ক্ষমতা থাকছে। তিনি প্রেসিডেন্ট থাকবেন। বিদেশনীতি পরিচালনা করতে পারবেন, সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক থাকবেন, প্রশাসনিক নির্দেশ দিতে পারবেন, এক্সিকিউটিভ অর্ডার জারি করতে পারবেন। অর্থাৎ ডেমোক্র্যাটরা সংসদের নিয়ন্ত্রণ পেলেই ট্রাম্পের সব ক্ষমতা শেষ হয়ে যাচ্ছে না। আমেরিকার এই রাজনৈতিক ব্যবস্থার মূল দর্শন হল, একজন মানুষের হাতে যাতে সমস্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত না হয়। প্রেসিডেন্ট, আইনসভা এবং বিচারবিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় থাকে। এই ব্যবস্থাকেই বলা হয় CHECKS AND BALANCES। সহজ কথায়, প্রেসিডেন্ট যতই শক্তিশালী হোন, তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্যও সাংবিধানিক ব্যবস্থা রয়েছে।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর আশা প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি জানান, ডেমোক্র্যাটরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তাই একটি সমঝোতা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। একই সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন তিনি। ট্রাম্পের দাবি, ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া যাবে না। ট্রাম্প বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ভালো কাজ করেছে এবং হরমুজ প্রণালি এখন উন্মুক্ত। তার দাবি, মার্কিন বাহিনী ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করেছে। তাই যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি ভিন্ন কোনো সিদ্ধান্ত নিতেন না। যুদ্ধের প্রভাব মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলে পড়তে পারে বলেও স্বীকার করেন ট্রাম্প। তবে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখাকে তিনি অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য, সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম সাময়িকভাবে কিছুটা বেড়েছে। তবে তেলের দাম আরও অনেক বাড়বে বলে তিনি আগে ধারণা করেছিলেন। সুযোগ পেলে আবারও একই সিদ্ধান্ত নিতেন বলেও জানান তিনি। ট্রাম্প আরও বলেন, যেসব পদক্ষেপে তার আপত্তি রয়েছে, সেগুলোতে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা তার আছে। তবে ডেমোক্র্যাটরা বাধা সৃষ্টি না করলে তাদের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব।