লক্ষ্মীপুরের মেঘনা উপকূলীয় জনপদ রায়পুর, সদর ও রামগতি উপজেলা। বিশাল মেঘনা নদীর কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই তিন জনপদে প্রকৃতি যেন উদার হাতে বিলিয়েছে সৌন্দর্য। জেলার ৫টি উপজেলায় ভালো মানের কোন বিনোদন কেন্দ্র না থাকায় ঈদের দ্বিতীয় দিন (শুক্রবার) সন্ধ্যা পর্যন্ত মেঘনা নদীর পাড় যেন এক ‘মিনি কক্সবাজারে’ পরিণত হয়েছে।
অব্যাহত নদীভাঙনের শিকার রায়পুরের চরবংশীর আলতাফ মাষ্টার ঘাট, সাজু মোল্লার ঘাট, সদরের মজুচৌধুরীর লঞ্চ ঘাট ও রামগতির চর আলেকজান্ডারের পাশ দিয়েই বয়ে গেছে উত্তাল মেঘনা নদী।
সরকারি ছুটির দিন ও ঈদের ছুটিতে জেলা সদরের দালালবাজার জমিদার বাড়ি, খোয়াসাগর দিঘির পাড় ও রায়পুরের জ্বীনের মসজিদে উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।
রায়পুর প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় গত ৫৪ বছরেও গড়ে ওঠেনি কোন বিনোদন কেন্দ্র। ভূমি সংক্রান্ত জটিলতায় হাইকোর্টের মামলায় নির্মিত শিশুপার্কটির সব মালামাল চুরি হয়ে গেছে। গত ৫ বছর চরম অবহেলায় পড়ে রয়েছে পার্কটি। উপজেলা পরিষদ থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মেঘনা নদীর পাড়ে চরবংশী ইউনিয়নের সাজু মোল্লা ও আলতাফ মাষ্টার ঘাট। সদর উপজেলা পরিষদ থেকে বরিশালের ভোলা নৌপথে মজু চৌধুরীর লঞ্চ ঘাট ১২ কিলোমিটার এবং রামগতি উপজেলা পরিষ ভবন থেকে মাত্র একশ গজ দূরেই নদীর পাড়—দাঁড়ালেই চোখে পড়ে বিস্তীর্ণ জলরাশি।
অন্যদিকে রামগতি উপজেলা আলেকজেন্ডার এলাকা মেঘনার ভাঙন রোধে নির্মিত শক্ত বাঁধ এখন শুধু সুরক্ষাই দিচ্ছে না, তৈরি করেছে নতুন এক প্রাকৃতিক বিনোদনকেন্দ্র। বাঁধের ওপর দাঁড়ালে যত দূর চোখ যায়, শুধু পানি আর পানি। জোয়ার–ভাটার ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে কিনারে। নদীর বুক চিরে বয়ে যাওয়া বাতাসে ভেসে আসে এক ধরনের নির্মল প্রশান্তি। পিনপতন নীরবতার মাঝে বাতাসের মৃদু শব্দ যেন মন জুড়িয়ে দেয় আগত দর্শনার্থীদে।
বিকেল গড়ালে পশ্চিম আকাশে রক্তিম সূর্যাস্ত আর নদীর ঢেউ মিলিয়ে তৈরি হয় এক অপার্থিব দৃশ্যপট। সোনালি আলো নদীর জলে প্রতিফলিত হয়ে সৃষ্টি করে মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। প্রকৃতির এমন রূপ কাছ থেকে দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন হাজারো মানুষ। ঈদের দিনে দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত মানুষের উপচে পড়া ভিড়, চোখে পড়ার মতো।
নদীর পাড়ে জেগে ওঠা নতুন বালুর বেলাভূমি, ঢেউয়ের ছন্দ, জলের মিষ্টি শব্দ—সব মিলিয়ে দর্শনার্থীরা খুঁজে পান অন্যরকম এক প্রশান্তি। বাতাসের দোলায় শরীর ও মন জুড়িয়ে যায় মুহূর্তেই। অনেকের কাছেই এটি এখন ‘স্বল্প খরচে স্বর্গীয় ভ্রমণ’।
তিনি বলেন, এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষায় প্রয়োজন নিয়মিত পরিচর্যা। পাশাপাশি অসমাপ্ত বাঁধ নির্মাণ দ্রুত শেষ করা দরকার।
তবে বিনোদনের এই আনন্দের মাঝেও রয়েছে শঙ্কা। নদীতে কোনো ধরনের নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই ট্রলার ও স্পিডবোটে ঘুরছেন পর্যটকরা। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা নেয়ামত হোসেন বলেন, সবাই মিলে ট্রলারে ঘুরছি, কিন্তু লাইফ জ্যাকেট বা কোনো নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল না। যাত্রীও ছিল অতিরিক্ত। কিছুটা ভয় কাজ করছিল।
তিনি আরও বলেন, গত কয়েকদিন ধরে রায়পুরের ইউএনও মেহেদী হাসান কাউছার প্রশাসনের তহবিল থেকে অর্থ ব্যয় করে চমৎকার পরিবেশে (অসাধারণ পর্যটনকেন্দ্র) তৈরি করে দিয়েছেন। আমরা তাকে ধন্যবাদ জানাই।
এ বিষয়ে ট্রলারচালক কিরন মাঝি বলেন, ১২ বছর ধরে এই নদীতে ট্রলার চালাই। জোয়ার–ভাটা বুঝেই চলাচল করি। জোয়ারের সময় যাত্রী তুলি না। এখনো বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি।
মেঘনা পাড়ের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জেলা প্রশাসক এসএম মেহেদী হাসান বলেন, চারটি উপজেলার মানুষের কাছে মেঘনা পাড় এখন অন্যতম বিনোদন কেন্দ্র। ঈদ উপলক্ষে দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়েছে কয়েকগুণ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। ট্রলার ও স্পিডবোটে ভ্রমণ ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নদীর বিশালতা, নির্মল বাতাস আর মানুষের প্রাণোচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে রায়পুর–রামগতির মেঘনা পাড় এখন দক্ষিণাঞ্চলের এক অনন্য ভ্রমণগন্তব্য। স্থানীয়দের কাছে এটি যেন সত্যিই আরেক ‘কক্সবাজার’।
মেঘনা উপকূলীয় এই অঞ্চলে রায়পুর ও সদরে আধুনিক বিনোদনকেন্দ্র না থাকায় পরিবার–পরিজন নিয়ে মানুষ ছুটে আসছেন এখানে। ঈদকে ঘিরে উৎসবের আমেজে প্রাণচাঞ্চল্য বেড়েছে কয়েকগুণ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভ্রমণপিপাসুরা ভিড় করছেন মেঘনার পাড়ে। কেউ নৌকাভ্রমণে নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করছেন, কেউবা পরিবার নিয়ে ছবি তুলছেন বালু চরে। শিশুদের উচ্ছ্বাস আর বড়দের স্বস্তি—সব মিলিয়ে প্রাণবন্ত হয়ে উঠে পুরো এলাকা।
বৃহস্পতিবার (২৮ মে) সন্ধ্যায় ঈদ উপলক্ষে রায়পুরের সাজু মোল্লার ঘাটে স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে ঘুরতে আসেন চাকরিজীবী হেলাল আহম্মেদ। তিনি বলেন, জেলা শহরে ভালো কোনো বিনোদন কেন্দ্র নেই। সিনেমা হলগুলোও বহু বছর ধরে বন্ধ। শহরের একঘেয়ে জীবন থেকে বের হয়ে নদীর পাড়ে এসে দারুণ স্বস্তি লাগছে। এখান প্রকৃতি সত্যিই মন ভরিয়ে দেয়।
খুশবু আক্তার নামে এক গৃহবধূ বলেন, স্বামী ও সন্তানকে নিয়ে এখানে এসে সমুদ্রসৈকতে ঘোরার মতোই আনন্দ পাচ্ছি। নদীতে এখন মাছ ধরা বন্ধ থাকায় ইলিশ দেখা যায় না, তবে অন্য সময় জীবন্ত ইলিশও দেখা মেলে। ট্রলারে করে দূরের জেগে ওঠা নতুন চরে ঘুরে আসা সত্যিই রোমাঞ্চকর।
ঈদ উপলক্ষে আশপাশের জেলা থেকেও নানা বয়সী মানুষ ভিড় করছেন এখানে। ষাটোর্ধ্ব মহসিন মিয়া নাতি-নাতনিদের নিয়ে ঘুরতে এসে বলেন, জেলায় ভালো কোনো পার্ক নেই। তাই ঈদে বাচ্চাদের নিয়ে কোথাও যাওয়ার সুযোগ হয় না। মেঘনা পাড়ই এখন আমাদের প্রধান বিনোদনস্থল। তবে পর্যটকদের বসার ব্যবস্থা ও অবকাঠামো আরও উন্নত করা প্রয়োজন।
স্থানীয় স্কুল শিক্ষক সজিব হোসেন জানান, ভয়াবহ ভাঙনে যখন রায়পুরের উত্তর ও দক্ষিণ চরবংশী এবং রামগতির আলেকজান্ডার শহর হুমকির মুখে পড়ে, তখন সেনাবাহিনীর উদ্যোগে নদীর পাড়ে বাঁধ নির্মাণ করা হয়। সেই বাঁধে পলি জমে প্রাকৃতিক বেলাভূমি সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
লক্ষ্মীপুরের মেঘনা উপকূলীয় জনপদ রায়পুর, সদর ও রামগতি উপজেলা। বিশাল মেঘনা নদীর কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই তিন জনপদে প্রকৃতি যেন উদার হাতে বিলিয়েছে সৌন্দর্য। জেলার ৫টি উপজেলায় ভালো মানের কোন বিনোদন কেন্দ্র না থাকায় ঈদের দ্বিতীয় দিন (শুক্রবার) সন্ধ্যা পর্যন্ত মেঘনা নদীর পাড় যেন এক ‘মিনি কক্সবাজারে’ পরিণত হয়েছে। অব্যাহত নদীভাঙনের শিকার রায়পুরের চরবংশীর আলতাফ মাষ্টার ঘাট, সাজু মোল্লার ঘাট, সদরের মজুচৌধুরীর লঞ্চ ঘাট ও রামগতির চর আলেকজান্ডারের পাশ দিয়েই বয়ে গেছে উত্তাল মেঘনা নদী। সরকারি ছুটির দিন ও ঈদের ছুটিতে জেলা সদরের দালালবাজার জমিদার বাড়ি, খোয়াসাগর দিঘির পাড় ও রায়পুরের জ্বীনের মসজিদে উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। রায়পুর প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় গত ৫৪ বছরেও গড়ে ওঠেনি কোন বিনোদন কেন্দ্র। ভূমি সংক্রান্ত জটিলতায় হাইকোর্টের মামলায় নির্মিত শিশুপার্কটির সব মালামাল চুরি হয়ে গেছে। গত ৫ বছর চরম অবহেলায় পড়ে রয়েছে পার্কটি। উপজেলা পরিষদ থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মেঘনা নদীর পাড়ে চরবংশী ইউনিয়নের সাজু মোল্লা ও আলতাফ মাষ্টার ঘাট। সদর উপজেলা পরিষদ থেকে বরিশালের ভোলা নৌপথে মজু চৌধুরীর লঞ্চ ঘাট ১২ কিলোমিটার এবং রামগতি উপজেলা পরিষ ভবন থেকে মাত্র একশ গজ দূরেই নদীর পাড়—দাঁড়ালেই চোখে পড়ে বিস্তীর্ণ জলরাশি। অন্যদিকে রামগতি উপজেলা আলেকজেন্ডার এলাকা মেঘনার ভাঙন রোধে নির্মিত শক্ত বাঁধ এখন শুধু সুরক্ষাই দিচ্ছে না, তৈরি করেছে নতুন এক প্রাকৃতিক বিনোদনকেন্দ্র। বাঁধের ওপর দাঁড়ালে যত দূর চোখ যায়, শুধু পানি আর পানি। জোয়ার–ভাটার ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে কিনারে। নদীর বুক চিরে বয়ে যাওয়া বাতাসে ভেসে আসে এক ধরনের নির্মল প্রশান্তি। পিনপতন নীরবতার মাঝে বাতাসের মৃদু শব্দ যেন মন জুড়িয়ে দেয় আগত দর্শনার্থীদে। বিকেল গড়ালে পশ্চিম আকাশে রক্তিম সূর্যাস্ত আর নদীর ঢেউ মিলিয়ে তৈরি হয় এক অপার্থিব দৃশ্যপট। সোনালি আলো নদীর জলে প্রতিফলিত হয়ে সৃষ্টি করে মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। প্রকৃতির এমন রূপ কাছ থেকে দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন হাজারো মানুষ। ঈদের দিনে দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত মানুষের উপচে পড়া ভিড়, চোখে পড়ার মতো। নদীর পাড়ে জেগে ওঠা নতুন বালুর বেলাভূমি, ঢেউয়ের ছন্দ, জলের মিষ্টি শব্দ—সব মিলিয়ে দর্শনার্থীরা খুঁজে পান অন্যরকম এক প্রশান্তি। বাতাসের দোলায় শরীর ও মন জুড়িয়ে যায় মুহূর্তেই। অনেকের কাছেই এটি এখন ‘স্বল্প খরচে স্বর্গীয় ভ্রমণ’। তিনি বলেন, এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষায় প্রয়োজন নিয়মিত পরিচর্যা। পাশাপাশি অসমাপ্ত বাঁধ নির্মাণ দ্রুত শেষ করা দরকার। তবে বিনোদনের এই আনন্দের মাঝেও রয়েছে শঙ্কা। নদীতে কোনো ধরনের নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই ট্রলার ও স্পিডবোটে ঘুরছেন পর্যটকরা। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা নেয়ামত হোসেন বলেন, সবাই মিলে ট্রলারে ঘুরছি, কিন্তু লাইফ জ্যাকেট বা কোনো নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল না। যাত্রীও ছিল অতিরিক্ত। কিছুটা ভয় কাজ করছিল। তিনি আরও বলেন, গত কয়েকদিন ধরে রায়পুরের ইউএনও মেহেদী হাসান কাউছার প্রশাসনের তহবিল থেকে অর্থ ব্যয় করে চমৎকার পরিবেশে (অসাধারণ পর্যটনকেন্দ্র) তৈরি করে দিয়েছেন। আমরা তাকে ধন্যবাদ জানাই। এ বিষয়ে ট্রলারচালক কিরন মাঝি বলেন, ১২ বছর ধরে এই নদীতে ট্রলার চালাই। জোয়ার–ভাটা বুঝেই চলাচল করি। জোয়ারের সময় যাত্রী তুলি না। এখনো বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। মেঘনা পাড়ের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জেলা প্রশাসক এসএম মেহেদী হাসান বলেন, চারটি উপজেলার মানুষের কাছে মেঘনা পাড় এখন অন্যতম বিনোদন কেন্দ্র। ঈদ উপলক্ষে দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়েছে কয়েকগুণ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। ট্রলার ও স্পিডবোটে ভ্রমণ ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নদীর বিশালতা, নির্মল বাতাস আর মানুষের প্রাণোচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে রায়পুর–রামগতির মেঘনা পাড় এখন দক্ষিণাঞ্চলের এক অনন্য ভ্রমণগন্তব্য। স্থানীয়দের কাছে এটি যেন সত্যিই আরেক ‘কক্সবাজার’। মেঘনা উপকূলীয় এই অঞ্চলে রায়পুর ও সদরে আধুনিক বিনোদনকেন্দ্র না থাকায় পরিবার–পরিজন নিয়ে মানুষ ছুটে আসছেন এখানে। ঈদকে ঘিরে উৎসবের আমেজে প্রাণচাঞ্চল্য বেড়েছে কয়েকগুণ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভ্রমণপিপাসুরা ভিড় করছেন মেঘনার পাড়ে। কেউ নৌকাভ্রমণে নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করছেন, কেউবা পরিবার নিয়ে ছবি তুলছেন বালু চরে। শিশুদের উচ্ছ্বাস আর বড়দের স্বস্তি—সব মিলিয়ে প্রাণবন্ত হয়ে উঠে পুরো এলাকা। বৃহস্পতিবার (২৮ মে) সন্ধ্যায় ঈদ উপলক্ষে রায়পুরের সাজু মোল্লার ঘাটে স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে ঘুরতে আসেন চাকরিজীবী হেলাল আহম্মেদ। তিনি বলেন, জেলা শহরে ভালো কোনো বিনোদন কেন্দ্র নেই। সিনেমা হলগুলোও বহু বছর ধরে বন্ধ। শহরের একঘেয়ে জীবন থেকে বের হয়ে নদীর পাড়ে এসে দারুণ স্বস্তি লাগছে। এখান প্রকৃতি সত্যিই মন ভরিয়ে দেয়। খুশবু আক্তার নামে এক গৃহবধূ বলেন, স্বামী ও সন্তানকে নিয়ে এখানে এসে সমুদ্রসৈকতে ঘোরার মতোই আনন্দ পাচ্ছি। নদীতে এখন মাছ ধরা বন্ধ থাকায় ইলিশ দেখা যায় না, তবে অন্য সময় জীবন্ত ইলিশও দেখা মেলে। ট্রলারে করে দূরের জেগে ওঠা নতুন চরে ঘুরে আসা সত্যিই রোমাঞ্চকর। ঈদ উপলক্ষে আশপাশের জেলা থেকেও নানা বয়সী মানুষ ভিড় করছেন এখানে। ষাটোর্ধ্ব মহসিন মিয়া নাতি-নাতনিদের নিয়ে ঘুরতে এসে বলেন, জেলায় ভালো কোনো পার্ক নেই। তাই ঈদে বাচ্চাদের নিয়ে কোথাও যাওয়ার সুযোগ হয় না। মেঘনা পাড়ই এখন আমাদের প্রধান বিনোদনস্থল। তবে পর্যটকদের বসার ব্যবস্থা ও অবকাঠামো আরও উন্নত করা প্রয়োজন। স্থানীয় স্কুল শিক্ষক সজিব হোসেন জানান, ভয়াবহ ভাঙনে যখন রায়পুরের উত্তর ও দক্ষিণ চরবংশী এবং রামগতির আলেকজান্ডার শহর হুমকির মুখে পড়ে, তখন সেনাবাহিনীর উদ্যোগে নদীর পাড়ে বাঁধ নির্মাণ করা হয়। সেই বাঁধে পলি জমে প্রাকৃতিক বেলাভূমি সৃষ্টি হয়েছে।
সকাল থেকে আশেপাশের এলাকা থেকে এক-দুইটা করে কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া কিনে গুলশান ২ এলাকায় ফড়িয়াদের কাছে বিক্রি করেছিলেন মৌসুমি ব্যবসায়ী হালিম। সকালে যে মাপের চামড়া ৯০০ টাকা করে বিক্রি করেছিলেন, বিকাল ৫টায় এসে তার দাম ৭০০ টাকা করে পেয়েছেন বলে দাবি তার। দরদকষাকষি করে ৭০০ টাকা দরে চামাড় বিক্রি করে অসন্তোষই প্রকাশ করলেন হালিম। তিনি বলেন, “দাম নাই। দাম তো কমই। “আমার চামড়া এখন নিল ৭০০ টাকা করে। সকালে এই চামড়া ৯০০ টাকা কইরা নিয়া গেছে।” গুলশানের আশেপাশের এলাকা থেকে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করেছিলেন তিনি তবে দাম নিয়ে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের দাবি উড়িয়ে দেন সেখানে চামড়া কেনার দায়িত্বে থাকা ইসলাম ট্রেডার্সের প্রতিনিধি আব্দুর রশিদ। সরাসরি হেমায়েতপুরে হরিণধরার চামড়া শিল্পনগরীতে এ চামড়া পাঠাবেন, এমন তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, “দাম কম তো বলবেই! কম হলে তো আর কেউ দিত না।” তিনি কত টাকা করে কিনছেন, এমন প্রশ্নে রশিদ বলেন, “আমরা প্রতি ফুট চামড়ায় ৩৫-৪০ টাকা করে দিচ্ছি। এরপর লবণ ও শ্রমিক খরচ মিলে প্রতি চামড়ায় ৩০০ টাকা আছে। “দর তো সরকার থেকে নির্ধারণ করে দিয়েছে। আমরা সেভাবেই দাম দিচ্ছি। দাম নিয়ে অসন্তুষ্ট হলে তো আর কেউ দিত না।” তিনি বিকাল ৫টা পর্যন্ত ৫০০ এর মতো কোরবানির গরুর কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করার কথা বলেছেন। “হাজার টাকা যায়নি কোনোটা। গড়ে ধরেন ৭৫০ টাকা করে কিনছি।” গুলশান ২ সার্কেলে ঘুরে গুটিকয়েক ফড়িয়া পাওয়া যায়; হেমায়েতপুরে ট্যানারি মালিকদের কাছে কাছে যারা বিক্রি করবেন, তাদেরই প্রতিনিধি তারা। সে কারণে এখানে দাম তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। সায়েন্সল্যাব মোড়ে কাঁচা চামড়া সংগ্রহের স্থান ও সবশেষ এক সময়কার কাঁচা চামড়া সংগ্রহের সবচেয়ে বড় আড়ৎ রাজধানীর লালবাগের পোস্তা ঘুরেও বেলার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম কমার বিষয়টি জানা যায়। বেলার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে গড়ে সাড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা দরে চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এবার এক কোটির বেশি পশু কোরবানি হয়েছে। এবার ঢাকার ভেতরে লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট গরুর কাঁচা চামড়ার দাম ৬২ থেকে ৬৭ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছরের তুলনায় ঢাকায় প্রতি বর্গফুটে গড়ে ২ টাকা এবং ঢাকার বাইরে সমপরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া সারাদেশে লবণযুক্ত খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ২৫ টাকা থেকে ৩০ টাকা দরে বিক্রি হবে ট্যানারিতে, যা গত বছর ছিল ২২ টাকা থেকে ২৭ টাকা, আর বকরির চামড়া প্রতি বর্গফুট ২২ থেকে ২৫ টাকা, যা গতবার ছিল ২০ টাকা থেকে ২২ টাকা। তবে দাম নিয়ে গতবছরের মতো এবারও হতাশা দেখা যায় বিক্রেতাদের মধ্যে; আড়তদার ও ফড়িয়ারা দায়ী করছেন ট্যানারি শিল্প মালিকদেরকে। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম নগরীতেও গরুর কাঁচা চামড়ার দাম নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। তারা অভিযোগ করেছেন আড়তদাররা ‘সিন্ডিকেট’ করে চামড়ার দাম কমিয়েছেন। তবে আড়তদাররা তাদের এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন। চট্টগ্রামে নগরীতে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা গরুর কাঁচা চামড়া বিক্রির তথ্য মিলেছে। গেল বছর চট্টগ্রামে চামড়া বিক্রি করতে না পেরে অনেকেই সড়কে চামড়া ফেলে যান, তাতে বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া সড়কেই নষ্ট হয়ে যায়। এর আগে ২০১৯ সালেও একই ঘটনা ঘটেছিল। সরকার নির্ধারিত দাম নিয়ে ক্ষোভ সরকার কাঁচা চামড়ার যে দাম বেঁধে দিয়েছে, তা নিয়ে মৌসুমি ব্যবসায়ী ও ফড়িয়া উভয়ের মধ্যেই ক্ষোভ দেখা গেছে। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকার যে দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে, তা তারা পাচ্ছেন না। আর ফড়িয়ারা বলছেন, তারা বেশি দামে কিনেছেন, কিন্তু পরে ট্যানারি মালিকদের কাছে দাম পাবেন কিনা শঙ্কায় আছেন। বিকাল সোয়া ৫টার দিকে গুলশান ২ গোলচত্ত্বরে দুটি চামড়া নিয়ে আসেন মহাখালী রেললাইন কওমী মাদ্রাসার শিক্ষক আবু ইউসুফ। চামড়ার দাম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন “আমরা তো ছোটো ব্যবসায়ী। বাজার যাচাই করতে মাত্র দুইটা নিয়ে এসেছি। আরও ছয়টা সংগ্রহে আছে। “কিন্তু দাম তো অনেক কম। দুইটা বলে ১ হাজার ১০০ টাকা। আমরা তো ভাবছি দুইটা হবে দুই হাজার টাকার ওপরে।” ২০১৬-১৭ এর দিকে এমন একেকটা চামড়া ৩ হাজার ২০০ টাকা করেও বিক্রি করেছেন বলে দাবি করেন ইউসুফ। তখন এক ফড়িয়া টিপ্পনি কেটে বলে উঠেন, “আমরাও ৫ হাজার টাকা করে কিনেছি।” সন্ধ্যা ৬টার দিকে সায়েন্সল্যাব এলাকায় কথা হয় রামপুরার আফতাবনগর থেকে চামড়া বিক্রি করতে আসা মো. শিহাব উদ্দিনের সঙ্গে, তিনি দুটি মাদ্রাসার প্রতিনিধি হয়ে এসেছেন। শিহাব উদ্দিন বলেন, “দাম কম মানে, অনেক কম। দাম যেখানে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা হওয়া উচিত ছিল। সেখানে দাম দিচ্ছে ৫৫০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা।” বিক্রির জন্য ১৩২টি চামড়া এনেছেন তারা। বিক্রি করেছেন গড়ে ৫৮০ টাকা করে। সরকারি মূল্যে বিক্রি করতে না পারায় সরকারেরও সমালোচনা করে শিহাব উদ্দিন বলেন, “সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে এই সরকার দিয়ে আমরা কী করব?” তিনি দাবি করেন, এই দামে গরুর চামড়া বিক্রি করে স্বেচ্ছাসেবক ও শ্রমিকদের টাকা দিয়ে ‘আর কিছুই থাকবে না’। সায়েন্সল্যাবে একসঙ্গে আড়াইশর মতো চামড়া কিনছিলেন নজির লেদার এক্সপোর্টের স্বত্বাধিকারী মো. নজির। তিনি বলেন, “আমিসহ এখানে সবাই গড়ে ৫০ টাকা করে বর্গফুট কিনতেছি। লবণ ছাড়াই। “এরপর লবণ দিমু। প্রতি ফুটে খরচ পড়ে যাইব আরও ১০ টাকা। ৬০ টাকা তাইলে পড়েই গেল। কিন্তু পরে দাম আমরা পামু কিনা জানি না। যাচাই-বাছাইতে অনেক বাদ পড়ে যায় দাবি করে নজির বলেন, “লবণ দেওয়ার পর আবার বাছাই করতে হবে। কাটা হলে বাদ। করোনা (চামড়ায় ছোপ ছোপ দাগ ভাইরাসের কারণে) হলে বাদ। “কিন্তু আমরা তো কিনতেছি গড়ে। সবাই টিভি দেখে দাম দিতেছে। আমরাও দিতেছি। কিন্তু সরকারি রেট আমরা পামু কিনা জানি না।” তিনি সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ৭০০টির মতো চামড়া সংগ্রহ করেছেন সায়েন্সল্যাব থেকে। ঢাকার আরও তিন জায়গা থেকে একই হারে চামড়া সংগ্রহ করার কথা বলেছেন নজির। তিনি বলেন, এসব চামড়ার কিছু তিনি হেমায়েতপুরে বিক্রি করবেন, আর কিছু নিজে রপ্তানি করবেন। নজিরের সঙ্গে থাকা তার ছেলে বলছিলেন, গড়ে ৫৫০ টাকা ও ৬০০ টাকা দরে চামড়া কিনেছেন তারা। ‘লাভের চিন্তা করছি না’ রাজধানীর লালবাগের পোস্তায় কাঁচাবাজার বাজারে আগের মতো সেই চাঙা ভাব না থাকলেও বেশকিছু দিন ধরেই ব্যস্ত যাচ্ছে সেখানকার আড়তদারদের। নানা টানাপড়নের মধ্যে হারানো সেই জৌলুস ফেরাতে চান তারা। তবে পুরনো সুরেই কথা বলছিলেন তারা। ট্যানারি মালিকদের কাছে পুঁজি হারিয়ে আড়তদাররা প্রকাশ করেছেন নিজেদের বাড়তি মূল্যে কাঁচা চামড়া সংগ্রহের অক্ষমতার কথা। একই সঙ্গে তারা যে কেবল পুনোনো পৈত্রিক ব্যবসার ‘ঘানি টানছেন, লাভের আশা দেখছেন না’, তাও বললেন। সন্ধ্যা ৭টায় পোস্তায় গিয়ে দেখা যায় ট্রাক, ভ্যান ও পিকআপে করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে চামড়া নিয়ে আসছেন ফড়িয়া, মাদ্রাসার প্রতিনিধি ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। বাজার কেমন যাচ্ছে, এমন প্রশ্নে শাহাদাত অ্যান্ড কোম্পানির পরিচালক আজীজ বলছেন, “দাম কমই। আমরা কত দাম পাব জানি না। “লাভের চিন্তা তাই করছি না। এখন কিনতেছি শুধু। পরে কী দাম পাই আল্লাহ জানেন। পরে দেখা যাইব।” তিনি বলেন, “এখন কিনে লবণ দিচ্ছি। আমরা তিন দিন ধরে সংগ্রহ করব। ট্যানাররা এক সপ্তাহ পর থেকে আসতে শুরু করবেন।” কত করে কিনছেন জানতে চাইলে বলেন, ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা করে। পরে লবণ ও শ্রমিকদের খরচ মিলিয়ে প্রতি চামড়ায় ১৫০ টাকা করে পড়ে। বৃষ্টির জন্য চামড়ার মান খারাপ হওয়ার শঙ্কা আছে? জবাবে আজীজ বলেন, “আজ তো কেবল কোরবানি হল। আগের বৃষ্টিতে কিছু হবে না। লবণ দিলেই সব ‘ওকে’।” তখনও একের পর এক পিকআপ ভ্যানে করে চামড়া আসছিল তার আড়তে। বললেন, “লক্ষ্য হচ্ছে ৪০০০-৫০০০ পিস কেনা।” দাম নিয়ে একই সুর ফড়িয়াদের সমিতির নেতা মো. শামীমের। সরকারের বেঁধে দেওয়া দামেরও সমালোচনা করেন তিনি। এর সঙ্গে ট্যানারি মালিকরা ‘টাকা মেরে দেন’ বলেও অভিযোগ তার। এছাড়াও সরকার থেকে লবণে ভর্তুকি দিলে বেশি দামে চামড়া কেনা যেত, বলেন তিনি। চামড়া সংগ্রহকারীদের এ নেতা বলেন, “সবচেয়ে বড় কথা হল কি জানেন, যে সরকার যে মাদ্রাসারে লবণটা দেয়, সে লবণটা আমাদেরকে দিক। মাদ্রাসাতো লবণ লাগায় না, মাল কিনে না, মাল মাগনা (বিনামূল্যে) পাইয়া মাগনা বেচে। “তো তারে লবণটা কি দেওয়ার দরকার? লবণটা আমরা যদি মাগনা পাই, তাহলে আমরা ২০০ টাকা ১০০ টাকা বাড়ায়া চামড়াটা কিনতে পারবো। আমাদের কষ্ট কমবে, আমরা ওদেরকে দামটা দিতে পারব।” লবণ ও শ্রমিক মিলে প্রতি চামড়ায় ৪০০ টাকা করে খরচ বলে দাবি তার। শামীম বলেন, “১১০০ থেকে ১২০০ টাকা লবণের বস্তা। পাঁচটা থেকে ছয়টা মালে (চামড়া) এক বস্তা লবণ দিতে হয়। ২০০ তে ২২০ টাকা লবণ লাগে। “এই একটা চামড়ায় লবণ দিতে ৬০ টাকা, মাল টানতে ১৫ টাকা, আড়তদারি ৫০ টাকা, আপনার মোট ৪০০ টাকা খরচ। মালটা কিনবেন কয় টাকা আপনি? এর মধ্যে বাদ আছে, কাটা আছে। আমরা যত বাইছা লই, তারপরও বাদ আছে।” তিনি বলেন, “আমরা ট্যানারির মালিকদের কাছে বেচি। আমাদেরতো মনে করেন টাকা মাইর খেতে খেতে, কোম্পানির মালিকরা টাকা না দিতে দিতে আমাদের পুঁজি হয়া গেছে ছোট। “আমরা ধার-কর্জ নিয়া কোরবানির কামটা করি। অর্থাৎ ২ লাখ, অর্থাৎ ৪ লাখ, অর্থাৎ ৫ লাখ নিয়া এটা করি। যেহেতু চামড়ার সাথে জড়িত একটা সিজন, না করলেও বাইধ্য। ঘুমায়ে থাকলেও ‘উস-পিস’ লাগবে। তাই এই কামটা আমাদের করতেই হইবো। তিনি বলেন, ঈদের দিন ৪০০-৬০০ চামড়া কেনার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন তিনি। আর ঈদের দ্বিতীয় ২০০-৩০০ এবং তৃতীয় দিন ২০০-৩০০টি চামড়া কেনার কথা বলেন শামীম। শুধু কোরবানির সময় নয় পোস্তায় সারা বছর রাজধানীতে জবাই হওয়া পশুর চামড়া আসে। কাছের জেলা মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ থেকেও চামড়া আসে দৈনিক। কাঁচা চামড়ার এসব ব্যবসায়ীদের বেশির ভাগই উত্তরাধিকার সূত্রে এ ব্যবসা চালিয়ে আসছেন। তাদের আবাসও পোস্তাসহ পুরান ঢাকার আশপাশের এলাকায়। ‘রপ্তানি বাজার মাথায় রেখে দাম’ ফড়িয়াদের নেতা মো. শামীম বলেন, “সরকার যে রেটটা দিছে, এই রেটটা আমাদের জনগণ বুঝতেছে আমাগোকে দিছে। কিন্তু সরকার এইটা ফরেন বাজার (রপ্তানি) ঠিক রাখবার জন্য দিছে।” তার ভাষ্য, “চামড়া তো এইডি চলেনা। ভালো চামড়া চলে। কাটা চলবে না, দুই চারটা কাটা হলে চলবে। চারটা, পাঁচটা, ১০টা কাটা হইলে তো চলবে না। “এখন সরকারেরটা (দাম) হইলো বিদেশি বাজারের হিসাব। যাতে বিদেশি বাজারে সমস্যা না হয়, এজন্য সরকার বাজারটা (চামড়ার দাম নির্ধারণ) দিছে।” সরকার প্রকাশ্যে দাম কম বললে রপ্তানির বাজারে মুখ থুবড়ে পড়বে, এমন ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, “আমরা যদি কম দাম বলি, বিদেশের বাজারে সমস্যায় পড়ব। “বিদেশি এরা, আমাদের গ্রাহকরা, আমাদের কম দাম লাগাবে। তখন চামড়ার বাজারে আরও ধস নামবে। এইটার জন্য সরকার, এইটারে বিদেশি বাজার ঠিক রাখার জন্য সরকার একটা নির্ধারণ করে দিছে। না হলে আসলে কিন্তু চামড়ার বাজারতো সেরকম না।” আগামী ৩০ জুন শেষ হতে চলা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) চামড়া রপ্তানি খাত থেকে আয় বেড়েছে প্রায় ৬ শতাংশ। সবশেষ এপ্রিল মাসে বেড়েছে ৩৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়েছিল ১০ দশমিক ১৯ শতাংশ। তার আগের দুই বছরে ধস নেমেছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কমেছিল ১১ দশমিক ৬০ শতাংশ। ৫ দশমিক ৬০ শতাংশ কমেছিল ২০২২-২৩ অর্থবছরে। ট্যানারি মালিকরা ইচ্ছেমত দাম দেয়’ হাজী আব্দুর রাজ্জাক অ্যান্ড কোম্পানির স্বত্বাধিকারী শাহাব উদ্দীন অভিযোগ করেন, ট্যানারি মালিকরা ‘ইচ্ছেমত’ দাম দেন। একই সঙ্গে কাঁচা চামড়া কেনার পর বাছাইয়ে অনেক বাদ দেওয়ার কারণে দাম কমে যাওয়ার কথা বলেন তিনি। শাহাব উদ্দীন বলেন, “মূল কথা হইল গিয়ে, মালের মধ্যে বাদ হয়ে যায় অনেক। এই যে লুকানো বাদ দেওয়ার ব্যাপার যেটা, এটা চামড়া কিনতে গিয়ে বুঝতে পারি না। “যেগুলি বুঝি, চামড়াওয়ালারা যারা নিয়ে আসে, এরা বোঝে না। এইখানে সমস্যাটা হয়ে গেছে।” তিনি বলেন, বাজারে ৫০০ থেকে ৭০০, ৮০০ টাকা পর্যন্ত দরে চামড়া কিনছে। ৫০০ টাকার চামড়া তারা নেন না। ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত দরে নিচ্ছেন। চামড়ায় ছোপ ছোপ দাগ থাকার সমস্যার কথাও তুলে ধরেন তিনি। ট্যানারি শিল্প মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ প্রসঙ্গে শাহাব উদ্দীন বলেন, “ওরা তো কোনো দাম বলে না। ওরা আমাদেরকে বিগত কয়েক বছর যাবৎ কোনোই দাম বলে না। ওদের ‘ইচ্ছামত’ দাম দেয়। এটা আমরা কোনো কিছু করেও পারিনি। “আমাদের বলে একটা- এত পর্যন্ত। কিন্তু কেনার সময় দেখা যায়- যে আরও ১০ টাকা ২০ টাকা করে কম দাম দেয়। আর তো আপনার খরচ বেশি, কারণ একটা মালের মধ্যে ৪০০, ৪৫০ টাকা খরচ। তারপর বাদ দিলে গড়ে ৬০০ টাকার মত খরচ হয়ে যায়। কারণ ২০-৩০ শতাংশ বাদ দিয়ে দেয়।” এরপর আর ‘লবণের টাকা ওঠে আসে না’ দাবি করে তিনি বলেন, “এক্কেবারে লবণের টাকা উঠে না।” বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব টিপু সুলতানও বললেন একই কথা। নতুন মৌসুমি ব্যবসায়ী আসায় কাঁচা চামড়ার মান ও দাম দুই-ই সংকটে পড়ার আশঙ্কার কথা তুলে ধরে এ ব্যবসা ‘পুরনোদের’ কাছে রাখার দাবি জানান তিনি। সেক্ষেত্রে সহজে লবণপ্রাপ্তি, পুঁজির জন্য ঋণ সহায়তা এবং ট্যানারি মালিকদের কাছে যে পাওনা আছে তা পেতে সরকারকে এগিয়ে আসার কথা বলেন টিপুর সুলতান। তার ভাষ্য, “শুধুমাত্র পুরনো ব্যবসায়ীদের কাছে এ ব্যবসাটা না থাকলে এ খাত ধ্বংস হবে।” কারো থেকে অর্থ সহায়তা না পেয়ে নিজেদের পুঁজিতে এ ব্যবসা করতে হচ্ছে এবং সেক্ষেত্রে ধার-কর্জ করে এ ব্যবসা চালিয়ে নিচ্ছেন বলে দাবি করেন এই ব্যবসায়ী নেতা। তিনি বলেন, “সেই পুঁজিও ট্যানারি মালিকদের কাছে আটকে আছে। এজন্য লবণ কিনে যে চামড়া সংরক্ষণ করব, বেশি দামে বেচব, রপ্তানি করব এটিও ‘চ্যালেঞ্জ হয়ে গেছে’। পোস্তায় ঘুরে আড়তদাররা বেশিরভাগ চামড়া সাড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা মূল্যে গড়ে কিনতে দেখা যায়। সর্বোচ্চ দাম ৮০০ টাকা এবং সর্বনিম্ন দাম ৪০০ টাকায় কেনাবেচা হয়েছে। বিটিএ নেতা যা বললেন সাধারণত বড় আকারের গরুর চামড়া ৩১ থেকে ৪০ বর্গফুট, মাঝারি আকারের গরুর চামড়া ২১ থেকে ৩০ এবং ছোট আকারের গরুর চামড়া ১৬ থেকে ২০ বর্গফুটের হয়। সে হিসাবে লবণযুক্ত ছোট আকারের একটি চামড়ার দাম ৯৯০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। আর মাঝারি আকারের লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৮৫০ টাকা এবং বড় আকারের লবণযুক্ত গরুর চামড়া ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এবার চামড়ার দাম কম কেন, এ প্রশ্নে ট্যানারি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ পরিস্থিতি, বৈশ্বিক অবস্থা—এ সবকিছুই কিন্তু যে কোনো বাজার দরের উপর নির্ভর করে। যুদ্ধের কারণে গোটা বিশ্বই এখন টালমাটাল; থামবে থামবে বলেও থামছে না। এ অবস্থায় আমাদের রপ্তানি বাজার নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে।” তার দাবি, দেশে মূল্যস্ফীতি বেশি; ৯ শতাংশের ওপরে। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। “এবার কিন্তু দেখবেন, প্রচুর গরু বিক্রি না হয়ে ফেরত গেছে; ব্যবসায়ীরা হা-হুতাশ করছেন। তাদের নাকি অনেক ক্ষতি হয়েছে। আমার মনে হয়, এবার মানুষ আগের চেয়ে কম পশু কোরবানি দিয়েছে। বেশ কিছুদিন ধরে দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য খারাপ। নতুন সরকার আসলেও পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি।” বিনিয়োগের খারাপ অবস্থা তুলে ধরে শাহীন আহমেদ বলেন, বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে নেমে এসেছে। এর আগে কখনও এত কম প্রবৃদ্ধি দেখা যায়নি।” “এ সবের প্রভাব চামড়ার দামের ক্ষেত্রেও পড়েছে বলে আমার মনে হয়।” “আরেকটি কারণ আছে—সেটি হচ্ছে, রাজনৈতিক কারণে আওয়ামী লীগের লোকজনও (নেতা) কিন্তু এবারও কোরবানি দিতে পারেনি। এটাও কোরবানি কম হওয়ার কারণ বলে আমার মনে হয়,” বলেন শাহীন আহমেদ। সতর্ক রয়েছে সরকার’ কোরবানির ঈদের দিন বৃহস্পতিবার ঢাকার আমিন বাজারের চামড়া বিক্রয় কেন্দ্র আকস্মিকভাবে পরিদর্শন করেছে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। মন্ত্রণালয়ে সংবাদিক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, যাতে কোনো ধরনের অব্যবস্থাপনা, ‘সিন্ডিকেট’ বা চামড়ার অপচয় না ঘটে সে বিষয়ে সরকার সতর্ক রয়েছে বলে মন্ত্রী বলেছেন। মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকি কার্যক্রম অব্যাহত থাকার কথাও বলেছেন তিনি। বাণিজ্যমন্ত্রী কাঁচা চামড়ার ক্রেতা ও বিক্রেতা, আড়তদার ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং বাজার পরিস্থিতি, মূল্য, সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও সামগ্রিক কার্যক্রম সম্পর্কে খোঁজখবর নেন।
ঈদুল আজহায় কোরবানির পশু জবাই করতে গিয়ে অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও একদিনের জন্য কসাই সেজে অংশ নেওয়ায় নোয়াখালীতে ৬ ঘণ্টায় ৩০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বৃহস্পতিবার (২৮ মে) সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত আহত ব্যক্তিরা নোয়াখালী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। জেলা শহরসহ বিভিন্ন এলাকায় কোরবানির পশু জবাইয়ের সময় এ সব দুর্ঘটনা ঘটে। অধিকাংশই ছুরি ফসকে, পশুর ধাক্কায় পড়ে গিয়ে বা অসাবধানতাবশত আহত হন। হাসপাতালে আসা এক রোগী মাজহার রাকিব জানান, ঈদের দিনে অনেকেই নিজেরাই কোরবানির পশু জবাই ও মাংস কাটার কাজে নেমে পড়েন। এতে দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়ে যায় এবং হাসপাতালে ভিড় তৈরি হয়। ইমার্জেন্সি মেডিক্যাল অফিসার ডা. রানা চৌধুরী বলেন, ঈদের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ৩০ জন আহত অবস্থায় হাসপাতালে এসেছেন। তাদের মধ্যে হাত কাটা, পা কাটা এবং ছুরি ফসকে আহত হওয়ার ঘটনা বেশি। তিনি আরও জানান, আহতদের বেশিরভাগই তরুণ ও মাঝবয়সি, যারা সাধারণত পেশাদার কসাই নন। পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকে কোরবানির কাজে অংশ নিতে গিয়ে তারা দুর্ঘটনায় পড়েছেন। চিকিৎসকদের মতে, কোরবানির সময় সতর্কতা ও অভিজ্ঞতার অভাবে এমন দুর্ঘটনা প্রতি বছরই ঘটছে।