দেশের কর ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে হাঁটছে সরকার। প্রতি বছর বাজেটে করহার ও করমুক্ত আয়সীমা নিয়ে অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে এবার প্রথমবারের মতো দীর্ঘমেয়াদি কর পরিকল্পনা বা ‘ট্যাক্স রোডম্যাপ’ ঘোষণা করতে যাচ্ছে সরকার। আগামী ১১ জুন জাতীয় বাজেটের মাধ্যমে ২০৩০-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত ব্যক্তি করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা, করহার এবং কর কাঠামো সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এই পরিকল্পনার আওতায় বর্তমান ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার করমুক্ত আয়সীমা ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ২০৩০-৩১ অর্থবছরে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত করা হবে। অর্থাৎ আগামী পাঁচ বছরে করমুক্ত আয়সীমা এক লাখ টাকা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
করদাতাদের জন্য এটি এক ধরনের ‘মাস্টারপ্ল্যান’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ এর মাধ্যমে চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী এবং বিনিয়োগকারীরা আগাম জানতে পারবেন ভবিষ্যতে তাদের কর দায় কতটা বাড়তে বা কমতে পারে। ফলে ব্যক্তিগত আর্থিক পরিকল্পনা, সঞ্চয়, বিনিয়োগ এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনা আরও সহজ হবে।
কেন আসছে এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা?
বাংলাদেশে এতদিন করনীতি মূলত এক বছরের জন্য নির্ধারণ করা হতো। প্রতি বাজেটের আগে করমুক্ত আয়সীমা বাড়বে কিনা, করহার পরিবর্তন হবে কিনা কিংবা নতুন কোনও কর আরোপ করা হবে কিনা—তা নিয়ে করদাতাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হতো।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকার এখন কর ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, পূর্বানুমানযোগ্য এবং বিনিয়োগবান্ধব করতে চায়। সেই লক্ষ্য থেকেই দীর্ঘমেয়াদি কর পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ১৪ মে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এ পরিকল্পনার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছেন। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী তার প্রথম বাজেটেই এই রোডম্যাপ তুলে ধরতে পারেন।
কোন বছরে করমুক্ত আয় কত হবে?
বর্তমানে একজন ব্যক্তি বছরে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করলে আয়কর দিতে হয় না। সরকারের নতুন পরিকল্পনায় ধাপে ধাপে এই সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী—
বর্তমানে করমুক্ত আয়সীমা: ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
২০২৭-২৮ অর্থবছর: ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা,
২০২৮-২৯ অর্থবছর: ৪ লাখ টাকা,
২০২৯-৩০ অর্থবছর: ৪ লাখ টাকা,
২০৩০-৩১ অর্থবছর: ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
অর্থাৎ আগামী পাঁচ বছরে করমুক্ত আয়ের সীমা ধীরে ধীরে বাড়ানো হবে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনায় রেখে সাধারণ করদাতাদের কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
কারা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন?
কর বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন পরিকল্পনার ফলে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের করদাতারা সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবেন। বিশেষ করে যাদের বার্ষিক আয় করমুক্ত সীমার কাছাকাছি, তারা কিছুটা কর সাশ্রয়ের সুযোগ পাবেন।
চাকরিজীবীদের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভবিষ্যৎ আয়, সঞ্চয় এবং বিনিয়োগ পরিকল্পনা করতে কর কাঠামো সম্পর্কে আগে থেকেই ধারণা পাওয়া যাবে।
ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরাও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা প্রণয়নে সুবিধা পাবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মূল্যস্ফীতির বাস্তবতায় কতটা কার্যকর হবে?
যদিও করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর পরিকল্পনাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা, তবে অনেকের প্রশ্ন—এই বৃদ্ধি কি বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
বাংলাদেশে ২০২৩ সালের মার্চ থেকে মূল্যস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে প্রায় ৯ শতাংশের আশপাশে রয়েছে। খাদ্য, বাসাভাড়া, পরিবহন, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ০৪ শতাংশ।
এই অবস্থায় অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত করার চেয়ে ৫ লাখ টাকা বা তারও বেশি করা প্রয়োজন ছিল।
তাদের মতে, কয়েক বছর আগে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার যে ক্রয়ক্ষমতা ছিল, বর্তমানে সেই একই জীবনযাত্রার মান বজায় রাখতে অনেক বেশি অর্থ প্রয়োজন হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, সরকারের এই উদ্যোগের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো নীতির পূর্বানুমানযোগ্যতা।
তাদের মতে, করদাতারা যদি আগেই জানতে পারেন আগামী কয়েক বছরে কর কাঠামো কী হবে, তাহলে তারা নিজেদের আর্থিক পরিকল্পনা আরও ভালোভাবে করতে পারবেন।
‘মিডল ক্লাস স্কুইজ’-এর আশঙ্কা
করনীতি বিশ্লেষকরা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কথা বলছেন। সেটি হলো ‘মিডল ক্লাস স্কুইজ’ বা মধ্যবিত্তের ওপর অতিরিক্ত চাপ।
তাদের মতে, যদি শুধু করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হয় কিন্তু পরবর্তী কর স্তরগুলো অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে মধ্যবিত্ত করদাতারা দ্রুত উচ্চ করসীমার আওতায় চলে যেতে পারেন।
ফলে কাগজে-কলমে তাদের আয় বাড়লেও বাস্তবে করের বোঝা আরও বাড়তে পারে।
‘ব্র্যাকেট ক্রিপ’ কী?
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, দীর্ঘ সময় ধরে একই করসীমা বহাল থাকলে ‘ব্র্যাকেট ক্রিপ’ নামে একটি সমস্যা দেখা দেয়।
ধরা যাক, মূল্যস্ফীতির কারণে একজন চাকরিজীবীর বেতন বেড়েছে। কিন্তু সেই বেতন বৃদ্ধি যদি কেবল মূল্যস্ফীতির ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার জন্য হয়, তাহলে প্রকৃত অর্থে তার জীবনমানের উন্নতি হয়নি।
কিন্তু করসীমা অপরিবর্তিত থাকলে তিনি উচ্চতর করস্তরে প্রবেশ করবেন এবং আগের তুলনায় বেশি কর দিতে বাধ্য হবেন।
বিশ্বের অনেক দেশ এই সমস্যা এড়াতে করসীমাকে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বয় করে থাকে।
সরকারের জন্যও চ্যালেঞ্জ কম নয়
একদিকে করদাতাদের স্বস্তি দিতে হবে, অন্যদিকে রাজস্ব আদায়ও বাড়াতে হবে। কারণ বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও অনেক উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় কম।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংকসহ উন্নয়ন সহযোগীরা দীর্ঘদিন ধরে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে।
এ কারণে সরকারকে করদাতাদের স্বার্থ এবং রাজস্ব আহরণের প্রয়োজন— দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে।
এনবিআর সংস্কারের সঙ্গেও রয়েছে সম্পর্ক
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি কর রোডম্যাপ ঘোষণার বিষয়টি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চলমান সংস্কার প্রক্রিয়ার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
সরকার ইতোমধ্যে করনীতি প্রণয়ন ও কর প্রশাসনকে পৃথক করার উদ্যোগ নিয়েছে। এর ফলে করনীতি নির্ধারণে দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সামনে কী অপেক্ষা করছে?
অর্থনীতিবিদদের মতে, ২০৩১ সাল পর্যন্ত করমুক্ত আয়সীমা ও করনীতির রোডম্যাপ ঘোষণা বাংলাদেশের কর ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন হতে পারে।
এটি করদাতাদের জন্য যেমন স্বচ্ছতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতা তৈরি করবে, তেমনি বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে মূল্যস্ফীতির গতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যতে কর কাঠামো কতটা বাস্তবমুখীভাবে সমন্বয় করা হয় তার ওপর।
সব মিলিয়ে করদাতাদের জন্য সরকারের এই নতুন ‘মাস্টারপ্ল্যান’ কর ব্যবস্থায় একটি নতুন যুগের সূচনা করতে পারে। এখন দেখার বিষয়, ঘোষিত রোডম্যাপ বাস্তব জীবনে সাধারণ মানুষের করের চাপ কতটা কমাতে পারে এবং মূল্যস্ফীতির অভিঘাত থেকে কতটা সুরক্ষা দিতে সক্ষম হয়।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বিদ্যমান সংকট কাটিয়ে রফতানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ, কাস্টমস বন্ড অডিট সহজীকরণ, বিমানবন্দরের কার্গো সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং লজিস্টিকস উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের নীতিগত সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। একই সঙ্গে পোশাক শিল্পের সার্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে সমন্বিত শুল্ক, কর ও আর্থিক নীতিমালা প্রণয়নেরও আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। বুধবার (২২ জুলাই) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদের প্রতিনিধিদল এসব দাবি ও প্রস্তাব তুলে ধরে। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, অর্থ উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং উপদেষ্টা মাহদি আমিন। বৈঠকে দেশের অর্থনীতির প্রধান রফতানি খাত হিসেবে তৈরি পোশাক শিল্পের বর্তমান চ্যালেঞ্জ, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, পণ্য বৈচিত্র্যকরণ, রফতানি বাজার সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান বিজিএমইএ নেতারা জানান, সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিকল্প উপায়ে উৎপাদন চালিয়ে যেতে গিয়ে ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এতে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে রফতানিমুখী শিল্পের জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি কাস্টমস, ব্যাংকিং, গ্যাস ও বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা চালুর দাবি জানায় বিজিএমইএ। বন্ড অডিট, কার্গো শেড ও লজিস্টিকস উন্নয়নের প্রস্তাব বৈঠকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ঘন ঘন বন্ড অডিটের জটিলতা কমাতে স্বনামধন্য পেশাদার অডিট ফার্মের মাধ্যমে বছরে একবার কাস্টমস অডিট সম্পন্ন করার স্থায়ী নীতিমালা প্রণয়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়। এছাড়া হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতার ঘাটতির কারণে লিড টাইম বাড়ছে উল্লেখ করে জরুরি ভিত্তিতে একটি অস্থায়ী কার্গো শেড নির্মাণের দাবি জানানো হয়। ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য সহজ করতে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি সহজ করা, মিথ্যা ঘোষণার (মিসডিক্লারেশন) প্রবণতা রোধ এবং বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএর যৌথ সেবা ডেস্ক স্থাপনের অনুমতিও চাওয়া হয়। শ্রমিক হাসপাতাল ও ভবন নির্মাণ বিধিমালা সহজ করার আহ্বান গাজীপুরে বিপুলসংখ্যক পোশাকশ্রমিকের জন্য একটি আধুনিক বিশেষায়িত শ্রমিক হাসপাতাল নির্মাণে উপযুক্ত খাস জমি বরাদ্দের আবেদন জানায় বিজিএমইএ। একই সঙ্গে কারখানার সম্প্রসারণ সহজ করতে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া আরও সহজ করারও প্রস্তাব দেওয়া হয়। সার্কুলার অর্থনীতি ও ‘বাটেক্সপো ২০২৬’ বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিবেশগত নীতির আলোকে পোশাক খাতে শতভাগ বর্জ্য পুনর্ব্যবহার বা সার্কুলারিটি বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়েও আলোচনা হয়। বিজিএমইএ জানায়, টেক্সটাইল বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এবং টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে তারা বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও বাড়াবে। এই সময় আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য আন্তর্জাতিক পোশাক প্রদর্শনী ‘বাটেক্সপো ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হলে তিনি এতে সম্মতি জানান। উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের নির্দেশ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রফতানি আয়ে তৈরি পোশাক শিল্পের অবদানের প্রশংসা করেন। তিনি বিজিএমইএর উত্থাপিত বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আশ্বাস দেন এবং সচল কারখানার স্থায়িত্ব, বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু, নীতিগত সহায়তা সহজীকরণ ও শিল্পের টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সরকারের ধারাবাহিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে জানান। এছাড়া বিজিএমইএর উত্থাপিত বিষয়গুলো পর্যালোচনা ও দ্রুত সমাধানের লক্ষ্যে বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, অর্থ উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খানকে নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকে বিজিএমইএর প্রথম সহসভাপতি সেলিম রহমান, সিনিয়র সহসভাপতি ইনামুল হক খান, সহসভাপতি মো. রেজোয়ান সেলিম, সহসভাপতি (অর্থ) মিজানুর রহমান, সহসভাপতি ভিদিয়া অমৃত খান, সহসভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরীসহ সংগঠনের পরিচালকরাও উপস্থিত ছিলেন।
দেশের বাজারে গতকাল মঙ্গলবার সোনার দাম ভরিতে এক হাজার ৬৩৩ টাকা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। ফলে ভ্যাটসহ সবচেয়ে ভালো মানের প্রতি ভরি সোনার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ২১ হাজার ৪৪১ টাকা, ২১ ক্যারেটের এক ভরি সোনার দাম এক হাজার ৫৭৫ টাকা বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ১১ হাজার ৪৬৮ টাকা। নতুন এই দাম গতকাল সকাল ১০টা থেকেই কার্যকর হয়েছে এবং আজ বুধবারও একই দামেই বিক্রি হচ্ছে। বাজুস জানায়, ১৮ ক্যারেটের এক ভরি সোনার দাম এক হাজার ৩৪১ টাকা বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৮১ হাজার ৬০৮ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনার দাম এক হাজার ৫০ টাকা বাড়িয়ে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৩৬৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে গত ১৪ জুলাই ভ্যাটসহ সবচেয়ে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম ২ হাজার ১৫৮ টাকা কমিয়ে ২ লাখ ১৯ হাজার ৮০৮ টাকা, ২১ ক্যারেটের এক ভরি সোনার দাম ২ হাজার ১০০ টাকা কমিয়ে ২ লাখ ০৯ হাজার ৮৯৩ টাকা, ১৮ ক্যারেটের এক ভরি সোনার দাম ১ হাজার ৮০৮ টাকা কমিয়ে ১ লাখ ৮০ হাজার ২৬৭ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনার দাম ১ হাজার ৪৫৮ টাকা কমিয়ে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৩১৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এদিকে সোনার দাম বাড়ানো হলেও অপরিবর্তিত রয়েছে রুপার দাম। ভ্যাটসহ ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপার দাম ৪ হাজার ৬০৭ টাকা, ২১ ক্যারেটের এক ভরি রুপার দাম ৪ হাজার ৩৭৪ টাকা, ১৮ ক্যারেটের এক ভরি রুপার দাম ৩ হাজার ৭৯০ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির এক ভরি রুপার দাম ২ হাজার ৮৫৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এ নিয়ে চলতি বছর এখন পর্যন্ত দেশের বাজারে ৯২ বার সমন্বয় করা হয়েছে সোনার দাম। যেখানে দাম ৪৫ দফা বাড়ানো হয়েছে; কমানো হয়েছে ৪৭ দফা। আর গত ২০২৫ সালে দেশের বাজারে মোট ৯৩ বার সোনার দাম সমন্বয় করা হয়েছিল; যেখানে ৬৪ বার দাম বাড়ানো হয়েছিল, আর কমানো হয়েছিল ২৯ বার।
চলতি (২০২৬-২৭) অর্থবছরের প্রথম ১৮ দিনে দেশে প্রায় ১৮০ কোটি মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় এসেছে। এ সময়ে বৈধ পথে প্রবাসী আয় বেড়েছে ২০ দশমিক ২ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩০ কোটি ২০ লাখ ডলার বেশি। রোববার (১৯ জুলাই) বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ১ থেকে ১৮ জুলাই পর্যন্ত দেশে মোট ১৭৯ কোটি ৮০ লাখ (এক দশমিক ৭৯ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ১৪৯ কোটি ৬০ লাখ ডলার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, শুধু ১৬ থেকে ১৮ জুলাই— এই তিন দিনেই দেশে এসেছে ১৬ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলারের প্রবাসী আয়। এর আগে চলতি মাসের প্রথম পাঁচ দিনে এসেছিল ৫৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার। মাসজুড়ে ধারাবাহিকভাবে রেমিট্যান্সপ্রবাহ অব্যাহত থাকায় ১৮ দিনের মাথায় মোট প্রবাসী আয় পৌঁছেছে ১৭৯ কোটি ৮০ লাখ ডলারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি অর্থবছরের প্রথম ১৮ দিনে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৩০ কোটি ২০ লাখ ডলার, যা ২০ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির সমান। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা বৃদ্ধি, বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ ও প্রণোদনার কারণে প্রবাসী আয়ের ইতিবাচক ধারা বজায় রয়েছে। এ প্রবাহ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, আমদানি ব্যয় মেটানো এবং বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।