ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির চলমান পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে ব্যাংকটির শীর্ষ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, রবিবার (১৪ জুন) বিকাল ৪টায় বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গভর্নরের সঙ্গে ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের এই সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
বৈঠকে ইসলামী ব্যাংকের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব)। এছাড়া প্রতিনিধি দলে দুজন অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) এবং ছয়জন উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) অংশ নিচ্ছেন।
সূত্র জানায়, প্রতিনিধি দল ব্যাংকের বর্তমান আর্থিক ও পরিচালনাগত পরিস্থিতি, গ্রাহকসেবা, তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং সাম্প্রতিক বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে গভর্নরকে অবহিত করবেন। একই সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলায় গৃহীত পদক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ করণীয় বিষয়েও আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় নগদ অর্থ উত্তোলন নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এ বৈঠককে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ব্যাংকটির সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা ও নির্দেশনা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তারা বৈঠক শেষে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে পারেন বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প (আরডিএস) নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের বক্তব্যের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ গ্রামীণ ক্ষুদ্র অর্থায়ন কর্মসূচিটি। মন্ত্রী দাবি করেছেন, আরডিএস প্রকল্পের মাধ্যমে মোট ২২ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে নির্বাচনের আগে ১১ হাজার কোটি টাকা এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আরও ১১ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। তবে ইসলামী ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য বলছে, বর্তমানে এ প্রকল্পের আওতায় মোট ঋণ বা বিনিয়োগ স্থিতি ৬ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, ৬ হাজার ৮৮০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প কীভাবে ২২ হাজার কোটি টাকার বিতরণে রূপ নিলো। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে উল্লেখ করা অর্থের উৎস, সময়কাল ও হিসাবের ভিত্তি কী? মঙ্গলবার (৯ জুন) জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালি বিধির ৬৮ বিধির আওতায় আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আরডিএস ইসলামী ব্যাংকের একটি ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প। এই প্রকল্পের মাধ্যমে দরিদ্র এবং বিশেষ করে নারী গ্রাহকদের ক্ষুদ্র ঋণ দেওয়া হয়। তার দাবি, নির্বাচনের আগে ভোট প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিতরণ করা হয়েছে। মন্ত্রী বলেন, ‘এই আরডিএস প্রকল্পের মধ্যে ২২ হাজার কোটি টাকা ডিস্ট্রিবিউট হয়েছে। ১১ হাজার কোটি টাকা আগে দেওয়া হয়েছিল। ৫ আগস্টের পর নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার জন্য আরও ১১ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। এর কোনও হদিস নেই।’ তার এই বক্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। অনেকে প্রশ্ন তোলেন, ইসলামী ব্যাংকের আরডিএস প্রকল্পের মোট আকারই যেখানে ৭ হাজার কোটি টাকার কম, সেখানে ২২ হাজার কোটি টাকার বিতরণের তথ্য কোথা থেকে এলো। ইসলামী ব্যাংকের তথ্য কী বলছে রবিবার (১৪ জুন) ইসলামী ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র আরডিএস প্রকল্পের সর্বশেষ তথ্য প্রকাশ করে। ব্যাংকটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত প্রকল্পটির আওতায় সক্রিয় গ্রাহক সংখ্যা ৮ লাখ ৫৩ হাজার ৫৯২ জন এবং মোট বিনিয়োগ স্থিতি ৬ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। একই সময়ে গ্রাহকদের সঞ্চয়ের পরিমাণ ২ হাজার ২৬৯ কোটি টাকা এবং আদায়ের হার ৯৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ। অর্থাৎ বর্তমানে মাঠপর্যায়ে গ্রাহকদের কাছে বকেয়া বা চলমান ঋণের পরিমাণ ৬ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। ইসলামী ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে আরডিএসের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ করা হয় ৭ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ওই বছরই ফেরত আসে ৬ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে বিতরণ করা হয় ৬ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা, যার মধ্যে ওই বছরই ফেরত আসে ৬ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে বিতরণ করা হয় ৬ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা, যার মধ্যে ফেরত আসে ৬ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা। এ ছাড়া চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জানুয়ারি-মে) বিতরণ হয়েছে ২ হাজার ৭৪৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ফেরত এসেছে ২ হাজার ৬৫২ কোটি টাকা। তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিতরণ করা অর্থের বড় অংশই একই বছরের মধ্যে আদায় হয়ে যায়। ফলে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ বিতরণ হলেও বছর শেষে স্থিতি থাকে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ থেকে ৭ হাজার কোটি টাকার মধ্যে। স্থিতি আর বিতরণ— দুই হিসাব এক নয় ব্যাংকারদের মতে, আরডিএসের মতো ক্ষুদ্র অর্থায়ন প্রকল্পে একই অর্থ একাধিকবার ঘুরে ফিরে বিতরণ হয়। একজন গ্রাহক ঋণ নিয়ে কিস্তিতে পরিশোধ করলে সেই অর্থ আবার অন্য গ্রাহককে ঋণ হিসেবে দেওয়া হয়। ফলে একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঋণের স্থিতি এবং কয়েক বছরের মোট বিতরণ—দুই ধরনের হিসাব সম্পূর্ণ আলাদা। উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, শুধু ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালেই আরডিএসের মাধ্যমে প্রায় ২১ হাজার ২০০ কোটি টাকার বেশি অর্থ বিতরণ হয়েছে। এর সঙ্গে ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসের ২ হাজার ৭৪৩ কোটি টাকা যোগ করলে মোট বিতরণ দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৯৫১ কোটি টাকা। এর মধ্যে আদায় হয়েছে বা ফেরত এসেছে ২২ হাজার ৬৫৯ কোটি টাকা। ফলে বর্তমানে চলমান ঋণের স্থিতি রয়েছে ৬ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যদি কয়েক বছরের মোট বিতরণকৃত অর্থের হিসাব উল্লেখ করে থাকেন, তাহলে ২২ হাজার কোটি টাকার অঙ্কটি ব্যাখ্যা করা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু যদি তিনি বর্তমান প্রকল্পের আকার বা বিদ্যমান ঋণ স্থিতিকে বোঝাতে এই সংখ্যা ব্যবহার করে থাকেন, তাহলে তা ইসলামী ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। নির্বাচনের আগে-পরে কত টাকা বিতরণ ইসলামী ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চার মাসে আরডিএসের আওতায় মোট ২ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে নভেম্বরে ৬৫৪ কোটি, ডিসেম্বরে ৬৭০ কোটি, জানুয়ারিতে ৫৩০ কোটি এবং ফেব্রুয়ারিতে ৫০৮ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়। একই সময়ে আদায় হয়েছে ২ হাজার ২১১ কোটি টাকা। অর্থাৎ নির্বাচন-পূর্ব ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে স্বাভাবিক ধারায় ঋণ বিতরণ ও আদায় কার্যক্রম চললেও ইসলামী ব্যাংকের প্রকাশিত পরিসংখ্যানে কোথাও ১১ হাজার কোটি কিংবা ২২ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত বিতরণের তথ্য পাওয়া যায়নি। মূল প্রশ্নের উত্তর কোথায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য এবং ইসলামী ব্যাংকের তথ্যের মধ্যে বড় ধরনের সংখ্যাগত পার্থক্য দেখা দেওয়ায় এখন মূল প্রশ্ন একটাই—২২ হাজার কোটি টাকার হিসাবটি কোন সময়ের, কোন ভিত্তির এবং কোন উৎস থেকে নেওয়া? বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকের আরডিএস প্রকল্পে ঋণের স্থিতি ৬ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। অন্যদিকে সাম্প্রতিক কয়েক বছরের মোট বিতরণকৃত অর্থ যোগ করলে তা ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে। ফলে ‘বিতরণ’ এবং ‘ঋণ স্থিতি’—এই দুই ভিন্ন হিসাবের মধ্যে বিভ্রান্তি থেকেই বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাদের মতে, বিষয়টি স্পষ্ট করতে হলে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা কিংবা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ২২ হাজার কোটি টাকার দাবির সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ প্রকাশ করা প্রয়োজন।
এবারের (২০২৬-২৭ অর্থবছর) বাজেট ৩ জায়গায় চমৎকারভাবে বিন্যাস করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন, নৌ ও রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। শনিবার (১৩ জুন) রাতে রাজধানীর ধানমন্ডিতে এক আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন। সড়কমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এত চিন্তাশীল বাজেট এর আগে হয়নি। জনপ্রত্যাশার বাজেট দেয়া হয়েছে। তিন জায়গায় চমৎকারভাবে বাজেট বিন্যাস করা হয়েছে। দক্ষ মানব সম্পদ উন্নয়ন, অবকাঠামোর উন্নয়ন ও সামাজিক উন্নয়নকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।
২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এস আলম গ্রুপের হাত থেকে ইসলামী ব্যাংককে উদ্ধার করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকটিতে নতুন পর্ষদ বসিয়ে এর নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়। দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি ব্যাংকটি সে সময় ব্যাপক ঋণ অনিয়মের ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, এস আলম গ্রুপ ও তাদের সহযোগীরা ব্যাংকটির মোট ঋণের প্রায় ৮০ শতাংশই বের করে নেয়, যার পরিমাণ ১ লাখ ৮৭ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকা। এর ফলে ২০২৩ সালের শুরু থেকেই শীর্ষ এই শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকটি অর্থ সংকটে পড়ে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগ দেওয়া পর্ষদের এক স্বাধীন নিরীক্ষায় ব্যাংকটির এই নাজুক আর্থিক অবস্থার চিত্র বেরিয়ে আসে। বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯৫ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা। তা সত্ত্বেও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তায় ব্যাংকটির নগদ অর্থের প্রবাহ স্বাভাবিক হয়ে আসে। মানুষ কোনো রকম অসুবিধা ছাড়াই নিজেদের টাকা তুলতে পারছিলেন। ঘুরে দাঁড়িয়েছিল ব্যাংকটি। কিন্তু এখন ব্যাংকটিতে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে সংকট দেখা দিয়েছে। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, আমানত তুলে নেওয়ার হিড়িক ঠেকাতে গ্রাহকদের টাকা তোলায় কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংক টিকিয়ে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জরুরি আর্থিক সহায়তাও চাওয়া হয়েছে। সরকার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও খাতে নিজেদের অনুগতদের নিয়োগ দেবে—বাংলাদেশে এটা নতুন কিছু নয়। সরকার গঠন করার পর বিএনপিও কালক্ষেপণ না করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে সরিয়ে দেয়। নতুন নিয়োগ পাওয়া গভর্নর মোস্তাকুর রহমান একজন কস্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটিরও সদস্য ছিলেন। সে সময় এই খবর অনেককেই অবাক করেছিল। তবে মোস্তাকুর রহমান তার আন্তরিক আচরণের কারণে এর মধ্যেই প্রশংসা কুড়িয়েছেন। বিভিন্ন বক্তব্যে তিনি ধারাবাহিকভাবে বলে আসছেন, কোনো রাজনৈতিক চাপের কাছে তিনি মাথা নত করবেন না এবং রাজনৈতিক প্রভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না। কিন্তু ইসলামী ব্যাংকে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের বিষয়টি অনেককে বিস্মিত ও হতবাক করেছে। ঈদের ছুটি শুরু হওয়ার আগে ২৪ মে সন্ধ্যায় এই ঘোষণা আসে। সাবেক চেয়ারম্যানের পদত্যাগের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে বসানো হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরদিন, অর্থাৎ ৬ আগস্ট কেন্দ্রীয় ব্যাংকে কর্মকর্তার দাবির মুখে বাংলাদেশ ব্যাংকের যে শীর্ষ কর্মকর্তারা পদ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন, খুরশীদ আলম তাদের একজন। অভিযোগ আছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে খুরশীদ আলমের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ ছিল। এ ছাড়া তার স্ত্রী ঋণ খেলাপি। এমন একজনকে নিয়োগ দেওয়ায় পুরো ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এস আলম যখন কয়েকটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেন এবং বড় ধরনের ঋণ অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন, তখন খুরশীদ আলম বিতর্কিত ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাই এমন নিয়োগের পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্দেশ্য নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে। এত তাড়াহুড়া করে কেন এই নিয়োগ দেওয়া হলো? কোনো রাজনৈতিক চাপ ছিল কি? যদি তা না হয়, তবে খুরশীদ আলমের বিশেষ এমন কী যোগ্যতা ছিল? এর চেয়ে যোগ্য আর কেউ কি ছিলেন না? কেন্দ্রীয় ব্যাংক কি আরও স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য ভাবমূর্তির কাউকে নিয়োগ দিতে পারত না? এসবের কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। উল্টো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র বলেছেন, খুরশীদ আলমের বিরুদ্ধে ওঠা কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি একজন স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগ দিত, তাহলে হয়তো অস্থিরতা এমন পর্যায়ে যেত না। এই অস্থিরতার কারণে শুধু জুনের প্রথম সপ্তাহেই চার হাজার কোটি টাকার বেশি আমানত তুলে নেওয়া হয়েছে। বাধ্য হয়ে ব্যাংকটিকে এখন ১০ হাজার কোটি টাকার ‘বিশেষ তারল্য সহায়তা’ চাইতে হয়েছে। ইসলামী ব্যাংকের এই নতুন নিয়োগের বিরুদ্ধে কর্মীদের পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীও সরব হয়েছে। আন্দোলনকারীদের প্রতি দলটির দৃশ্যমান সমর্থন এবং জ্যেষ্ঠ নেতাদের বক্তব্যে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ থাকে না যে তারা এই নতুন চেয়ারম্যানের বিপক্ষে। তারা রাজপথে, সংসদে এবং ব্যাংকের অভ্যন্তরে এই নিয়োগের বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নিতে প্রস্তুত। ইসলামী ব্যাংকের সাধারণ ভূমিকা এবং বিশেষ করে গত নির্বাচনে ব্যাংকটির ভূমিকা নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ দেখা গেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অভিযোগ, ব্যাংকটি জামায়াতকে সুবিধা দিয়েছে। তবে জামায়াতের সংসদ সদস্যরা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে ইসলামী দলটির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে বলা হয়ে থাকে। তবে বর্তমানে ব্যাংকটিকে ঘিরে যে অস্থিরতা চলছে (তা জামায়াতে ইসলামী শুরু করুক বা না করুক), তা চরম উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে পুরো ব্যাংকিং খাতে অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে। ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন এরই মধ্যে এ বিষয়ে বিবৃতি দিয়েছে। সংগঠনের চেয়ারম্যান মাশরুর আরেফিন সাংবাদিকদের বলেছেন, ইসলামী ব্যাংকের পরিস্থিতি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; এর প্রভাব পুরো ব্যাংক খাতে পড়ছে। বিষয়টি নিয়ে ব্যাংকাররা উদ্বিগ্ন। এই অস্থিরতা থামানোর মতো শক্তি বা সদিচ্ছা হয়তো বাংলাদেশ ব্যাংকের নেই। তবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আগেই সরকারের উচিত এই সংকট সমাধানে জরুরি ভিত্তিতে হস্তক্ষেপ করা।