২০২৫ সালের ৩ মার্চ। স্থানীয় সময় দুপুর ২টা। ইরাকের দুর্গম পশ্চিম মরুভূমিতে এক বেদুইন শিবিরের বাসিন্দারা একটি ট্রাক যেতে দেখেন। এটি ছিল স্থানীয় এক মেষপালকের গাড়ি। গাড়িটি কাছেই আল-নুখাইব শহরের দিকে যাচ্ছিল।
তবে কয়েক ঘণ্টা পর ট্রাকটি ফিরে আসতে দেখেন তারা। তবে সেটি আর অক্ষত ছিল না। যেন অসংখ্য গুলিতে ট্রাকটি ঝাঁঝড়া হয়ে গেছে। ট্রাকটির কোনো অংশ আগুনও জ্বলছিল।
শিবিরের তিনজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, একটি হেলিকপ্টার ট্রাকটিকে ধাওয়া করছিল এবং সেখান থেকে অনবরত গুলি ছোড়া হচ্ছিল। একপর্যায়ে ট্রাকটি মরুভূমিতে থেমে যায়।
ট্রাকটি চালাচ্ছিলেন ২৯ বছর বয়সি আওয়াদ আল-শাম্মারি। তিনি বাজার করার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন। পথে এ হামলার ঘটনা ঘটে। আওয়াদের চাচাতো ভাই আমির আল-শাম্মারি নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানান, আওয়াদ ঘটনাবশত এমন এক গোপন ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটির সন্ধান পেয়েছিলেন, যা ইরাকের মরুভূমিতে গোপন অবস্থায় ছিল। তাদের ধারণা, এই ঘাঁটির সন্ধান পাওয়ার কারণেই হয়ত আওয়াদের প্রাণ গেছে।
আওয়াদের এই সন্ধানের মধ্যে দিয়ে এটা স্পষ্ট যে, ইরাকে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে গোপনে ইসরায়েলি দুটি ঘাঁটি পরিচালিত হয়ে আসছিল। উল্লেখ্য, ইসরায়েলকে শত্রু রাষ্ট্র হিসেবে মনে করে ইরাক।
আঞ্চলিক সামরিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আওয়াদ এক সময় ইরাকের আঞ্চলিক সামরিক কমান্ডে ফোন করে জানিয়েছিলেন, তিনি কিছু সৈন্য, হেলিকপ্টার এবং তাঁবু দেখতে পেয়েছেন। ইরাকের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনায় সহায়তার জন্য ইসরায়েল সেখানে এই ঘাঁটি পরিচালনা করছিল।
ইরাকে ইসরায়েলি ঘাঁটির উপস্থিতির খবর এর আগে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল প্রকাশ করেছিল। তবে ইরাকের কর্মকর্তারা নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানান, পশ্চিম মরুভূমিতে আরও একটি দ্বিতীয় গোপন ঘাঁটি ছিল, যা আগে প্রকাশিত হয়নি।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মতে, আওয়াদ যে ঘাঁটির সন্ধান পেয়েছিলেন, সেটি যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার সাম্প্রতিক যুদ্ধের আগেই স্থাপন করা হয়েছিল এবং ২০২৫ সালের জুনে তেহরানের বিরুদ্ধে ১২ দিনের যুদ্ধে এটি ব্যবহার করা হয়েছিল।
একজন আঞ্চলিক কর্মকর্তা জানান, ভবিষ্যৎ সংঘাতের কথা মাথায় রেখে ইসরায়েল ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকেই অস্থায়ী এই ঘাঁটি তৈরির প্রস্তুতি শুরু করেছিল এবং দূরবর্তী এলাকাগুলো চিহ্নিত করছিল।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর কাছে এসব ঘাঁটি ও আওয়াদের হত্যাকাণ্ড নিয়ে বারবার জানতে চাইলেও তারা কোনো জবাব দেয়নি।
আওয়াদের মৃত্যুর প্রত্যক্ষদর্শীরা নিরাপত্তাজনিত কারণে নাম প্রকাশ করতে চাননি। একইভাবে, ইসরায়েলি ঘাঁটি নিয়ে কথা বলা অধিকাংশ কর্মকর্তাও পরিচয় গোপন রাখতে চান।
তাদের দেওয়া তথ্য থেকে বোঝা যায়, অন্তত একটি ঘাঁটির বিষয়ে, অর্থাৎ যেটি আওয়াদ আবিষ্কার করেছিলেন, সেটির বিষয়ে ওয়াশিংটন ২০২৫ সালের জুন বা তারও আগে থেকেই জানত। এর অর্থ হতে পারে, ইরাকের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ইরাককে এটা জানায়নি যে তাদের ভূখণ্ডে একটি শত্রু শক্তি (ইসরায়েলি বাহিনী) সক্রিয় রয়েছে।
ইরাকি আইনপ্রণেতা ওয়াদ আল-কাদু বলেন, 'এটি ইরাকের সার্বভৌমত্ব, সরকার, নিরাপত্তা বাহিনী এবং জনগণের মর্যাদার প্রতি প্রকাশ্য অবজ্ঞা।'
আঞ্চলিক কর্মকর্তারা বলেন, ইরাকে গোপনে কার্যক্রম চালানো নিরাপদ হবে— এমন সিদ্ধান্ত নিতে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরাকের নিরাপত্তা সহযোগিতাকেই বিবেচনায় নিয়েছিল।
দুই ইরাকি নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, গত বছরের যুদ্ধ এবং বর্তমান সংঘাত উভয় সময়েই ওয়াশিংটন ইরাককে তাদের রাডার ব্যবস্থা বন্ধ রাখতে বাধ্য করেছিল, যাতে মার্কিন বিমান নিরাপদে চলাচল করতে পারে। এর ফলে শত্রু তৎপরতা শনাক্ত করতে বাগদাদকে আরও বেশি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে হয়।
এই ঘাঁটির তথ্য প্রকাশ পাওয়ায় ইরাকের জন্যও অস্বস্তিকর কিছু প্রশ্ন সামনে এসেছে। যেমন— একজন মেষপালক বিষয়টি প্রকাশ না করা পর্যন্ত কি সত্যিই ইরাকি বাহিনী বিদেশি উপস্থিতি সম্পর্কে জানত না? নাকি তারা জানার পরেও চুপ ছিল?
যে সম্ভাবনাই সত্য হোক না কেন, এ থেকে স্পষ্ট হয় যে ওয়াশিংটন ও তেহরানের দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের মধ্যে আটকে থাকা ইরাক এখনো নিজের ভূখণ্ডের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।
ওয়াদ আল-কাদু বলেন, 'আমাদের নিরাপত্তা নেতাদের অবস্থান লজ্জাজনক।'
ইরাকি সামরিক বাহিনীর পশ্চিম ইউফ্রেটিস ফোর্সের কমান্ডার মেজর জেনারেল আলি আল-হামদানি বলেন, মেষপালকের আবিষ্কারের এক মাস আগেই সেনাবাহিনী মরুভূমিতে ইসরায়েলি উপস্থিতির সন্দেহ করেছিল।
তিনি বলেন, 'এখন পর্যন্ত সরকার এ বিষয়ে নীরব রয়েছে।'
ইসরায়েলি ঘাঁটির বিষয়টি স্বীকার করা ইরাক সরকারের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর। কারণ, ইরাকের সঙ্গে ইসরায়েলের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই এবং দেশটির জনগণ ইসরায়েলকে শত্রু হিসেবেই দেখে।
ইরাকের নিরাপত্তা বাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাদ মান নিউ ইয়র্ক টাইমসকে বলেন, 'ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটির অবস্থান সম্পর্কে ইরাকের কাছে কোনো তথ্য নেই।'
দুই আঞ্চলিক নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, আওয়াদ যে ঘাঁটিটি উন্মোচন করেছিলেন, সেটি ইসরায়েল বিমান সহায়তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং চিকিৎসা সেবার জন্য ব্যবহার করত।
ঘাঁটিটি স্থাপন করা হয়েছিল যাতে ইসরায়েলি বিমানকে ইরানে পৌঁছাতে কম দূরত্ব অতিক্রম করতে হয়। এটি মূলত অস্থায়ী উপস্থিতি হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল, বিশেষ করে ২০২৫ সালের জুনের যুদ্ধের মতো সামরিক অভিযানে সহায়তার জন্য। কর্মকর্তাদের মতে, সেই যুদ্ধে ঘাঁটিটি অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়।
গত বছরের যুদ্ধের পর দেওয়া এক ভাষণে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জামির বলেন, ইসরায়েলের সামরিক অভিযান সফল করা সম্ভব হয়েছে 'বিমান বাহিনী ও স্থল কমান্ডো বাহিনীর সমন্বয় এবং কৌশলগত বিভ্রান্তিমূলক তৎপরতার' মাধ্যমে।
পেন্টাগনের সেন্ট্রাল কমান্ড ইরাকে ইসরায়েলি কার্যক্রম নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। জানতে চাইলেও এটি ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগের কথা জানায়।
তবে অঞ্চলটিতে দায়িত্ব পালন করা সাবেক মার্কিন সামরিক কমান্ডার, পেন্টাগন কর্মকর্তা ও কূটনীতিকরা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিবেচনায় পশ্চিম ইরাকে ইসরায়েলি উপস্থিতির বিষয়ে সেন্ট্রাল কমান্ড কিছুই জানত না — এমনটা কল্পনাও করা যায় না।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংঘটিত এজাহারভুক্ত হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ও মিরাজ হোসেন পলাতক রয়েছেন। ব্যাংক প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খুনের শিকার কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুল হালিম ছিলেন কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেনের নাম রয়েছে। তারা বর্তমানে নিজেদের সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। ব্যাংক সূত্রে গেছে, তারা চাঁদাবাজি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এসব আসামিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেন। এতে আরও যুক্ত রয়েছেন ডিজিএম সৈয়দ লিয়াকত হোসেন, হাবিব উন নবী, ডিএমডি খালেকুজ্জামান জুয়েল ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে আব্দুল হালিমের মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক সজীব কুমার সিং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জানান, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাত ১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান। হালিমের ছেলে ফয়সাল বলেন, তার বাবা ২০১৪ সাল থেকে কৃষি ব্যাংক সিবিএর সভাপতি ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গত নভেম্বরেই মতিঝিল থানায় একটি জিডি (নং ০৫/১১/২০২৪ - ৩৩৫) করেছিলেন তার বাবা। তিনি আরও বলেন, বুধবার রাতে আমার বাবাকে তার অফিসের সহকর্মীরা মারধর করে হত্যা করেছে। সিবিএর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জানান, ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হই। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট বিনা নির্বাচনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে আমাদের অফিস দখল করে নেয় ফয়েজ ও মিরাজ। এ নিয়ে মামলা চলছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা অস্থায়ী জামিনে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন—যাদের মধ্যে আছেন ড্রাইভার সাইফুল, শাহেদ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মেহেদী ও অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনার সিরাজ। এদিকে, মামলার ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের প্রধান মহাব্যবস্থাপক জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। কারণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য না করার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
২০২৫ সালের ৩ মার্চ। স্থানীয় সময় দুপুর ২টা। ইরাকের দুর্গম পশ্চিম মরুভূমিতে এক বেদুইন শিবিরের বাসিন্দারা একটি ট্রাক যেতে দেখেন। এটি ছিল স্থানীয় এক মেষপালকের গাড়ি। গাড়িটি কাছেই আল-নুখাইব শহরের দিকে যাচ্ছিল। তবে কয়েক ঘণ্টা পর ট্রাকটি ফিরে আসতে দেখেন তারা। তবে সেটি আর অক্ষত ছিল না। যেন অসংখ্য গুলিতে ট্রাকটি ঝাঁঝড়া হয়ে গেছে। ট্রাকটির কোনো অংশ আগুনও জ্বলছিল। শিবিরের তিনজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, একটি হেলিকপ্টার ট্রাকটিকে ধাওয়া করছিল এবং সেখান থেকে অনবরত গুলি ছোড়া হচ্ছিল। একপর্যায়ে ট্রাকটি মরুভূমিতে থেমে যায়। ট্রাকটি চালাচ্ছিলেন ২৯ বছর বয়সি আওয়াদ আল-শাম্মারি। তিনি বাজার করার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন। পথে এ হামলার ঘটনা ঘটে। আওয়াদের চাচাতো ভাই আমির আল-শাম্মারি নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানান, আওয়াদ ঘটনাবশত এমন এক গোপন ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটির সন্ধান পেয়েছিলেন, যা ইরাকের মরুভূমিতে গোপন অবস্থায় ছিল। তাদের ধারণা, এই ঘাঁটির সন্ধান পাওয়ার কারণেই হয়ত আওয়াদের প্রাণ গেছে। আওয়াদের এই সন্ধানের মধ্যে দিয়ে এটা স্পষ্ট যে, ইরাকে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে গোপনে ইসরায়েলি দুটি ঘাঁটি পরিচালিত হয়ে আসছিল। উল্লেখ্য, ইসরায়েলকে শত্রু রাষ্ট্র হিসেবে মনে করে ইরাক। আঞ্চলিক সামরিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আওয়াদ এক সময় ইরাকের আঞ্চলিক সামরিক কমান্ডে ফোন করে জানিয়েছিলেন, তিনি কিছু সৈন্য, হেলিকপ্টার এবং তাঁবু দেখতে পেয়েছেন। ইরাকের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনায় সহায়তার জন্য ইসরায়েল সেখানে এই ঘাঁটি পরিচালনা করছিল। ইরাকে ইসরায়েলি ঘাঁটির উপস্থিতির খবর এর আগে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল প্রকাশ করেছিল। তবে ইরাকের কর্মকর্তারা নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানান, পশ্চিম মরুভূমিতে আরও একটি দ্বিতীয় গোপন ঘাঁটি ছিল, যা আগে প্রকাশিত হয়নি। আঞ্চলিক নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মতে, আওয়াদ যে ঘাঁটির সন্ধান পেয়েছিলেন, সেটি যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার সাম্প্রতিক যুদ্ধের আগেই স্থাপন করা হয়েছিল এবং ২০২৫ সালের জুনে তেহরানের বিরুদ্ধে ১২ দিনের যুদ্ধে এটি ব্যবহার করা হয়েছিল। একজন আঞ্চলিক কর্মকর্তা জানান, ভবিষ্যৎ সংঘাতের কথা মাথায় রেখে ইসরায়েল ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকেই অস্থায়ী এই ঘাঁটি তৈরির প্রস্তুতি শুরু করেছিল এবং দূরবর্তী এলাকাগুলো চিহ্নিত করছিল। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর কাছে এসব ঘাঁটি ও আওয়াদের হত্যাকাণ্ড নিয়ে বারবার জানতে চাইলেও তারা কোনো জবাব দেয়নি। আওয়াদের মৃত্যুর প্রত্যক্ষদর্শীরা নিরাপত্তাজনিত কারণে নাম প্রকাশ করতে চাননি। একইভাবে, ইসরায়েলি ঘাঁটি নিয়ে কথা বলা অধিকাংশ কর্মকর্তাও পরিচয় গোপন রাখতে চান। তাদের দেওয়া তথ্য থেকে বোঝা যায়, অন্তত একটি ঘাঁটির বিষয়ে, অর্থাৎ যেটি আওয়াদ আবিষ্কার করেছিলেন, সেটির বিষয়ে ওয়াশিংটন ২০২৫ সালের জুন বা তারও আগে থেকেই জানত। এর অর্থ হতে পারে, ইরাকের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ইরাককে এটা জানায়নি যে তাদের ভূখণ্ডে একটি শত্রু শক্তি (ইসরায়েলি বাহিনী) সক্রিয় রয়েছে। ইরাকি আইনপ্রণেতা ওয়াদ আল-কাদু বলেন, 'এটি ইরাকের সার্বভৌমত্ব, সরকার, নিরাপত্তা বাহিনী এবং জনগণের মর্যাদার প্রতি প্রকাশ্য অবজ্ঞা।' আঞ্চলিক কর্মকর্তারা বলেন, ইরাকে গোপনে কার্যক্রম চালানো নিরাপদ হবে— এমন সিদ্ধান্ত নিতে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরাকের নিরাপত্তা সহযোগিতাকেই বিবেচনায় নিয়েছিল। দুই ইরাকি নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, গত বছরের যুদ্ধ এবং বর্তমান সংঘাত উভয় সময়েই ওয়াশিংটন ইরাককে তাদের রাডার ব্যবস্থা বন্ধ রাখতে বাধ্য করেছিল, যাতে মার্কিন বিমান নিরাপদে চলাচল করতে পারে। এর ফলে শত্রু তৎপরতা শনাক্ত করতে বাগদাদকে আরও বেশি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে হয়। এই ঘাঁটির তথ্য প্রকাশ পাওয়ায় ইরাকের জন্যও অস্বস্তিকর কিছু প্রশ্ন সামনে এসেছে। যেমন— একজন মেষপালক বিষয়টি প্রকাশ না করা পর্যন্ত কি সত্যিই ইরাকি বাহিনী বিদেশি উপস্থিতি সম্পর্কে জানত না? নাকি তারা জানার পরেও চুপ ছিল? যে সম্ভাবনাই সত্য হোক না কেন, এ থেকে স্পষ্ট হয় যে ওয়াশিংটন ও তেহরানের দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের মধ্যে আটকে থাকা ইরাক এখনো নিজের ভূখণ্ডের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। ওয়াদ আল-কাদু বলেন, 'আমাদের নিরাপত্তা নেতাদের অবস্থান লজ্জাজনক।' ইরাকি সামরিক বাহিনীর পশ্চিম ইউফ্রেটিস ফোর্সের কমান্ডার মেজর জেনারেল আলি আল-হামদানি বলেন, মেষপালকের আবিষ্কারের এক মাস আগেই সেনাবাহিনী মরুভূমিতে ইসরায়েলি উপস্থিতির সন্দেহ করেছিল। তিনি বলেন, 'এখন পর্যন্ত সরকার এ বিষয়ে নীরব রয়েছে।' ইসরায়েলি ঘাঁটির বিষয়টি স্বীকার করা ইরাক সরকারের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর। কারণ, ইরাকের সঙ্গে ইসরায়েলের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই এবং দেশটির জনগণ ইসরায়েলকে শত্রু হিসেবেই দেখে। ইরাকের নিরাপত্তা বাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাদ মান নিউ ইয়র্ক টাইমসকে বলেন, 'ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটির অবস্থান সম্পর্কে ইরাকের কাছে কোনো তথ্য নেই।' দুই আঞ্চলিক নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, আওয়াদ যে ঘাঁটিটি উন্মোচন করেছিলেন, সেটি ইসরায়েল বিমান সহায়তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং চিকিৎসা সেবার জন্য ব্যবহার করত। ঘাঁটিটি স্থাপন করা হয়েছিল যাতে ইসরায়েলি বিমানকে ইরানে পৌঁছাতে কম দূরত্ব অতিক্রম করতে হয়। এটি মূলত অস্থায়ী উপস্থিতি হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল, বিশেষ করে ২০২৫ সালের জুনের যুদ্ধের মতো সামরিক অভিযানে সহায়তার জন্য। কর্মকর্তাদের মতে, সেই যুদ্ধে ঘাঁটিটি অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়। গত বছরের যুদ্ধের পর দেওয়া এক ভাষণে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জামির বলেন, ইসরায়েলের সামরিক অভিযান সফল করা সম্ভব হয়েছে 'বিমান বাহিনী ও স্থল কমান্ডো বাহিনীর সমন্বয় এবং কৌশলগত বিভ্রান্তিমূলক তৎপরতার' মাধ্যমে। পেন্টাগনের সেন্ট্রাল কমান্ড ইরাকে ইসরায়েলি কার্যক্রম নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। জানতে চাইলেও এটি ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগের কথা জানায়। তবে অঞ্চলটিতে দায়িত্ব পালন করা সাবেক মার্কিন সামরিক কমান্ডার, পেন্টাগন কর্মকর্তা ও কূটনীতিকরা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিবেচনায় পশ্চিম ইরাকে ইসরায়েলি উপস্থিতির বিষয়ে সেন্ট্রাল কমান্ড কিছুই জানত না — এমনটা কল্পনাও করা যায় না।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ড্রোন হামলা হয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি চলার মধ্যে এ ঘটনায় নতুন করে আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। আবুধাবি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রোববার আল-ধাফরা এলাকায় অবস্থিত এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের সীমানার ভেতরে ড্রোন হামলায় জেনারেটরে আগুন ধরে যায়। এতে তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের কোনও খবর পাওয়া যায়নি এবং তেজস্ক্রিয়ার মাত্রাও স্বাভাবিক রয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। আমিরাতের পারমাণবিক কেন্দ্র পরিচালনা সংস্থা জানিয়েছে, আরব উপদ্বীপের প্রথম নির্মিত এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্যক্রম এই হামলার কারণে ব্যাহত হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে সংস্থাটি জানিয়েছে, সব ইউনিট স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে। তাৎক্ষণিকভাবে কেউ এই ড্রোন হামলার দায় স্বীকার করেনি। অন্যদিকে, আরব আমিরাতও প্রকাশ্যে কোনও দেশকে দায়ী করেনি। পরে এক বিবৃতিতে আমিরাতের প্রতিরক্ষামন্ত্রণালয় বলেছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ‘সফলভাবে’ দুটি ড্রোন ঠেকিয়েছে। তবে তৃতীয় একটি ড্রোন বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছে জেনারেটরে আঘাত হেনেছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ড্রোনগুলো ‘পশ্চিম সীমান্ত’ থেকে উড়ে এসেছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনও তথ্য দেওয়া হয়নি। হামলা কোথা থেকে হয়েছে তা নিশ্চিত করে জানতে তদন্ত চলছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর হামলা শুরুর পর থেকে এর প্রতিক্রিয়ায় তেহরানের কাছ থেকে বারবার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে আরব আমিরাত। রোববার আমিরাতের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার বিষয়ে আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, এ ঘটনার ফলে একটি চুল্লিকে সাময়িকভাবে জরুরি ডিজেল জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। আইএইএ প্রধান রাফায়েল গ্রোসি ড্রোন হামলার ঘটনায় ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, পারমাণবিক স্থাপনার জন্য হুমকি হয়, এমন কোনও সামরিক তৎপরতা গ্রহণযোগ্য নয়।
দক্ষিণ লেবাননে চলমান সংঘাতে আরও এক ইসরায়েলি সেনা কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। এর ফলে গত ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া লেবানন যুদ্ধে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২০ জনে দাঁড়িয়েছে। শনিবার ইসরায়েলি সেনাবাহিনী নিহত কর্মকর্তার পরিচয় প্রকাশ করে জানায়, তার নাম ক্যাপ্টেন মাওজ ইসরায়েল রেকানাতি (২৪)। তিনি অধিকৃত পশ্চিম তীরের ইতামার বসতির বাসিন্দা ছিলেন এবং গোলানি ব্রিগেডের ১২তম ব্যাটালিয়নের প্লাটুন কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। মৃত্যুর পর তাকে লেফটেন্যান্ট থেকে ক্যাপ্টেন পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এদিকে হিজবুল্লাহ একাধিক বিবৃতিতে দাবি করেছে, তারা দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি সেনা, ট্যাংক, বুলডোজার ও সামরিক যানবাহিনীর ওপর হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের সুর, বিনতে জবেইল ও নাবাতিয়েহ জেলার বিভিন্ন গ্রামে বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণ চালিয়েছে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২ মার্চ থেকে ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৯৬৯ জন নিহত এবং ৯ হাজার ১১২ জন আহত হয়েছেন। শনিবারই হিজবুল্লাহ সম্ভাব্য কোনো শান্তি চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে। সংগঠনটি অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের চাপে লেবাননের কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন ছাড় দিচ্ছে। হিজবুল্লাহর মতে, ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা দেশটির দখলদারিত্ব ও লেবাননের ভূখণ্ড ও সম্পদের ওপর তাদের ‘আকাঙ্ক্ষাকে’ বৈধতা দেবে। তারা শান্তি চুক্তির পরিবর্তে পুরোপুরি ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার, সব ধরনের হামলা বন্ধ, বন্দি মুক্তি এবং শর্তহীন পুনর্গঠনের দাবি জানিয়েছে। উল্লেখ্য, গত ১৫ মে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত তৃতীয় দফা আলোচনায় লেবানন ও ইসরায়েল ৪৫ দিনের জন্য যুদ্ধবিরতি বাড়াতে সম্মত হয়। একই সঙ্গে উভয় পক্ষ শান্তি চুক্তির লক্ষ্যে চতুর্থ দফা আলোচনায় বসার সিদ্ধান্ত নেয়।