মাঝরাতে আকাশ থেকে বৃষ্টির মতো আছড়ে পড়তে লাগল একের পর এক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র। চোখের পলকেই হুড়মুড় করে ধসে পড়ল বহুতল ভবন। চারদিকে শুধু আগুন, ধোঁয়া আর মানুষের আর্তনাদ। ভয়ংকর এই হামলায় প্রাণ গেল অন্তত ২১ জনের, আর আহত হয়েছেন দুই শিশুসহ ৮৫ জন।
ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রাশিয়ার এই ভয়াবহ হামলা ঘটেছে। শহরের মেয়র এটিকে রাজধানীর ওপর হওয়া ‘সবচেয়ে বড় হামলা’ বলে জানিয়েছেন।
টানা ১১ ঘণ্টা ধরে চলে এই ধ্বংসযজ্ঞ।
ইউক্রেন জানিয়েছে, রাশিয়া রাতে ৭৪টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ৪৯৬টি ড্রোন ছুড়েছে। এর মধ্যে ২৫টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ১২টি ড্রোন শহরের ৩৩টি জায়গায় সরাসরি আঘাত হানে। হামলায় একটি ৯ তলা আবাসিক ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়ে। রাস্তায় থাকা গাড়িগুলো দুমড়ে-মুচড়ে গেছে, চারপাশ ঢেকে গেছে বারুদের ধূসর ছাইতে।
ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের বাঁচাতে স্বজনদের কান্নার মাঝেই জোর তৎপরতা চালাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে রেড ক্রসের একটি বড় গুদাম। সেখানে থাকা প্রায় ১৩ লাখ পাউন্ড মূল্যের ৩ লাখ ২০ হাজার ত্রাণসামগ্রী পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। প্রাণ বাঁচাতে ওই রাতে প্রায় ৫২ হাজার মানুষ মাটির নিচে মেট্রো স্টেশনে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
হামলার ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে ওলেক্সি নামের আহত এক ব্যক্তি জানান, তিনি সিগারেট খেতে বাইরে বের হতেই বোমার আঘাতে উড়ে আসা কাচে আহত হন। অন্যদিকে, সভিতলানা নামের আরেক নারী জানান, এর আগের রুশ হামলায় তিনি তার মা ও ছেলেকে হারিয়েছেন, তাই বোমার শব্দে নতুন করে তিনি ভয় পাননি।
সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করতেই রাশিয়া একই সময়ে নানা ধরনের অস্ত্র দিয়ে এই চতুর হামলা চালিয়েছে।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ জানিয়েছেন, নিজেদের লক্ষ্য পূরণে তারা কিয়েভের ওপর এমন চাপ বাড়ানো অব্যাহত রাখবেন। তবে ইউক্রেন এই দাবি উড়িয়ে দিয়ে বলেছে, রাশিয়া ইচ্ছে করে নিরীহ মানুষ মারছে। এই মহাধ্বংসযজ্ঞের পর আকাশ সুরক্ষিত রাখতে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আরও উন্নত ‘প্যাট্রিয়ট’ ক্ষেপণাস্ত্র চেয়েছেন।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
নিয়োগের কোটা পূরণে অপহরণ, জোরপূর্বক নিয়োগ ও অর্থের বিনিময়ে তরুণদের এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় হস্তান্তরের অভিযোগ উঠেছে জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে। সামরিক বাহিনীতে লোকবলসংকটের সুযোগে গড়ে উঠেছে নিয়োগের অবৈধ বাণিজ্য। সবচেয়ে বেশি বিপাকে দরিদ্র পরিবারের তরুণেরা। মিয়ানমারের দক্ষিণাঞ্চলীয় কারেন রাজ্যের রাজধানী হপা-আনে সন্ধ্যার পর রাস্তায় বের হতে ভয় পান তরুণেরা। বিশেষ করে যাদের বয়স কম এবং শারীরিকভাবে সক্ষম, তাদের জন্য রাতের বেলা বাইরে থাকা এখন প্রায় নিষিদ্ধের মতো। গত কয়েক মাসে শহরটিতে এমন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু ২৬ বছর বয়সী টুকটুকচালক জাও মিনের (নিরাপত্তার কারণে ছদ্মনাম) ঘরে বসে থাকার সুযোগ নেই। জীবিকার তাগিদে তাকে প্রতিদিন রাস্তায় নামতে হয়। আর প্রতিবার বের হওয়ার সময় পরিবারের সদস্যরা তাকে সতর্ক করে দেন- যাত্রী নিয়ে বেশি দূরে যাওয়া যাবে না, কাকে গাড়িতে তোলা হচ্ছে, সে বিষয়ে সাবধান থাকতে হবে। জাও মিন বলেন, “আমি চরম উদ্বিগ্ন থাকি, কিন্তু কাজের জন্য আমাকে বের হতেই হয়। পরিবারের লোকজন বারবার ফোন করে সতর্ক করেন। সব সময় সতর্ক থাকতে হয়।” তার ভাষায়, “মানুষ আতঙ্কিত ও ভীত। আমার পরিচিত কয়েকজনকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।” স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মিয়ানমারের সামরিক জান্তার সাদাপোশাকধারী সদস্য ও সমর্থকেরা হপা-আনের রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তারা নির্বিচারে কিশোর, বিশের কোঠার তরুণ এবং ত্রিশের কাছাকাছি বয়সী পুরুষদের আটক করে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করছেন। বিবিসি বার্মিজের দেখা ফাঁস হওয়া নথি অনুযায়ী, বিভিন্ন প্রশাসনিক এলাকায় সেনাবাহিনীর নিয়োগের নির্ধারিত কোটা কঠোরভাবে পূরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী, গণতন্ত্রপন্থী সংগঠন ও বেসামরিক প্রতিরোধ আন্দোলনের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জান্তা যখন ক্রমাগত চাপের মুখে, তখন সেনাসদস্যের সংখ্যা বাড়াতেই এ উদ্যোগ। নিয়োগের ভয়ে ঘরছাড়া তরুণেরা জাও মিনের ভাইবোনদের মধ্যে তিনিই কেবল বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের বয়সসীমায় পড়েছেন। তার ভাষ্য, তার বয়সী অনেক তরুণই বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছেন। কেউ গেছেন প্রতিবেশী দেশ থাইল্যান্ডে, কেউ আবার দূরের আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। যারা এখনও এলাকায় রয়েছেন, তাদের অনেকের জন্য পরিবারের নির্দেশ- সন্ধ্যা নামার আগেই বাড়ি ফিরতে হবে। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত নেত্রী অং সান সু চিকে ক্ষমতাচ্যুত করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। এরপর থেকেই দেশটিতে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ চলছে। অভ্যুত্থানের তিন বছর পর, যুদ্ধক্ষেত্রে একের পর এক পরাজয়, সেনাসদস্যদের মনোবল কমে যাওয়া এবং পলায়নের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার মধ্যে ২০২৪ সালে বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ আইন কার্যকর করে জান্তা সরকার। এ আইনে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী সব পুরুষ এবং ১৮ থেকে ২৭ বছর বয়সী নারীদের অন্তত দুই বছর সামরিক বাহিনীর অধীনে কাজ করার বিধান রাখা হয়। নিয়োগ প্রত্যাখ্যান করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধানও রয়েছে। মিয়ানমার ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি ইনস্টিটিউটের (এমডিএসআই) সামরিকবিষয়ক কর্মকর্তা এবং জান্তা ছেড়ে আসা সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর নাউং ইয়ে বলেন, বাধ্যতামূলক নিয়োগ আইন কার্যকর করা সামরিক অভ্যুত্থানের পর বেসামরিক জনগণের ওপর নেওয়া সবচেয়ে কঠোর ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপগুলোর একটি। গত আড়াই বছরে এ ব্যবস্থায় আনুমানিক এক লাখ তরুণকে সেনাবাহিনীতে নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের অনেককেই জোরজবরদস্তি, চাঁদাবাজি কিংবা অপহরণের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। হপা-আন এখন সেই অভিযানের নতুন লক্ষ্যবস্তু। নাউং ইয়ের অভিযোগ, নিরাপত্তা বাহিনী তরুণদের চলাফেরা নজরদারিতে রাখছে, আইন অনুযায়ী নিয়োগযোগ্য হওয়ার অজুহাতে তাদের আটক করছে এবং আটকের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় করছে। বাড়ির বাসিন্দাদের তালিকা যাচাইয়ের মতো প্রশাসনিক কার্যক্রমের সময়ও তরুণদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। বিবিসি এ প্রতিবেদনে উল্লিখিত জোরপূর্বক নিয়োগ ও সাম্প্রতিক অপহরণের অভিযোগ সম্পর্কে মিয়ানমার সরকারের সামরিক নিয়োগবিষয়ক কেন্দ্রীয় সংস্থার কাছে জানতে চেয়েছিল। তবে কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানায়। স্বামীকে সেনাবাহিনীতে ‘বিক্রি’, অভিযোগ স্ত্রীর বাধ্যতামূলক নিয়োগ আইনকে কেন্দ্র করে মিয়ানমারে গড়ে উঠেছে তরুণদের সেনাবাহিনীতে সরবরাহের একটি চক্র। নির্ধারিত কোটা পূরণে প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে নিয়োগকে ঘিরে অর্থ লেনদেন ও অনিয়মের সুযোগও তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ। এর শিকার হয়েছেন ইয়াঙ্গুনের বাসিন্দা মা মোয়ে সান পান। ২০২৫ সালের ৮ মে সকালে তিনি তার ৩৩ বছর বয়সী স্বামী ফিও ওয়াইকে শেষবারের মতো দেখেছিলেন। সেদিন স্বামীর সঙ্গে ঝগড়ার পর তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। মন খারাপ হওয়ায় বিষয়টি তিনি তার এক আত্মীয়কে জানান। ওই আত্মীয় স্থানীয় ওয়ার্ড প্রশাসন কার্যালয়ে কাজ করতেন। স্ত্রী তাকে স্বামীকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনার অনুরোধ করেন। এর দুই দিন পর ফিও ওয়াই ফোন করে জানান, তিনি শহরের অন্য প্রান্তে একটি সামরিক নিয়োগকেন্দ্রে রয়েছেন। মা মোয়ে সান পানের অভিযোগ, তার আত্মীয় প্রথমে ফিও ওয়াইকে ওয়ার্ড প্রশাসন কার্যালয়ে নিয়ে যান। পরে ওই কার্যালয় থেকে তাকে অন্য একটি ওয়ার্ডের কাছে ৪০ লাখ কিয়াটের বিনিময়ে হস্তান্তর করা হয়, যাতে ওই ওয়ার্ড সামরিক নিয়োগের নির্ধারিত কোটা পূরণ করতে পারে। সে সময় ৪০ লাখ কিয়াটের মূল্য ছিল প্রায় ৯০০ মার্কিন ডলার। বিবিসি ওই মা মোয়ে সান পানের ওই আত্মীয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি। স্বামীকে ফিরিয়ে আনার মরিয়া চেষ্টায় মা মোয়ে সান পান আরও প্রতারণার শিকার হন। কয়েকজন ব্যক্তি তার স্বামীকে মুক্ত করে দেওয়ার মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে তার কাছ থেকে সাড়ে ৪৫ লাখ কিয়াট হাতিয়ে নেন। যে ওয়ার্ডে ফিও ওয়াইকে পাঠানো হয়েছিল, সেই ওয়ার্ডের প্রশাসক উ মাউং মাউং লুইন পরে বিবিসির কাছে স্বীকার করেন, ফিও ওয়াইকে সামরিক নিয়োগ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর প্রক্রিয়ায় তার ভূমিকা ছিল। নিজ এলাকার বাইরে থেকে লোক এনে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোনও ওয়ার্ড নিজেদের নির্ধারিত কোটা পূরণ করতে না পারলে অন্য এলাকা থেকে লোক নেওয়ার ঘটনা ঘটে। তবে এ ধরনের হস্তান্তরে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি। ফিও ওয়াইকে জোর করে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রেও অর্থ লেনদেন হয়নি বলে দাবি করেন। মা মোয়ে সান পান বলেন, “আমার স্বামী আমাকে জানিয়েছিলেন, তাকে সাহায্য করার কথা বলে কিছু কাগজে সই করানো হয়েছিল।” তিনি আরও বলেন, “স্বামীকে যদি স্বাভাবিক ও আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় সামরিক নিয়োগের জন্য বাছাই করা হতো, তাহলে হয়তো আমি তা মেনে নিতে পারতাম। কিন্তু আমাদের নিজেদের ওয়ার্ড প্রশাসন কার্যালয় তাকে অন্য একটি ওয়ার্ডের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে- এটা আমি মেনে নিতে পারি না। আত্মীয়ের ওপর বিশ্বাস করেছিলাম, সেটাও এখন আমার অনুশোচনার কারণ।” স্বামীকে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে মা মোয়ে সান পান দুটি বিষয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছেন- স্বামীকে সামরিক বাহিনীতে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ এবং মুক্ত করে দেওয়ার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার কাছ থেকে সাড়ে ৪৫ লাখ কিয়াট হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা। তার দাবি, পুলিশ অভিযোগ গ্রহণ করলেও মানব পাচারের অভিযোগ যুক্ত করতে অস্বীকৃতি জানায়। পুলিশের যুক্তি ছিল, কাউকে বিদেশে বিক্রি করা হলেই কেবল মানব পাচারের মামলা করা যায়। স্বামী এখন কোথায় আছেন, তা জানেন না মা মোয়ে সান পান। কোটা পূরণে অপহরণ ও অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ ফিও ওয়াইয়ের ঘটনা জান্তা সরকারের বাধ্যতামূলক নিয়োগব্যবস্থার একটি উদ্বেগজনক দিক তুলে ধরেছে। কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে নিয়োগের চাপ বাড়তে থাকায় স্থানীয় প্রশাসন ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে নির্ধারিত কোটা পূরণের জন্য অনিয়মের প্রবণতা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ। নিয়োগযোগ্য তরুণের চাহিদা বাড়লেও তাদের পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ায় অবৈধ বাজার গড়ে উঠেছে। নাউং ইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, সড়কের তল্লাশিচৌকিতে তরুণদের আটক করা, কর্মস্থলে যাতায়াতের পথে তাদের গতিবিধি অনুসরণ করে ধরে ফেলা, ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ফাঁদে ফেলা এবং জোর করে বাড়িতে ঢুকে লোক ধরে নিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। তিনি বলেন, “বাধ্যতামূলক নিয়োগ আইনের আড়ালে এসব জবরদস্তিমূলক আটক ও নিয়োগ অভিযান কার্যত আধুনিক দাসত্ব এবং মানব পাচারের একটি ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।” গত আগস্টের শেষ দিকে ইয়াঙ্গুনে চার তরুণকে অপহরণ করে সামরিক নিয়োগের জন্য বিক্রি করার চেষ্টার অভিযোগে অগ্নিনির্বাপণ বিভাগের এক সদস্য এবং তার জামাতাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। অগ্নিনির্বাপণ বিভাগটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন। অভিযোগ অনুযায়ী, রিজার্ভ ফায়ার ব্রিগেডের ওই ইউনিট কমান্ডার চাকরির সুযোগ দেওয়ার কথা বলে চার তরুণকে প্রলুব্ধ করে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে বিশেষভাবে তৈরি কয়েকটি আটককক্ষে তাদের আটকে রাখা হয়। ২৫ আগস্ট পুলিশ বাড়িটিতে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে। কাউকে বেআইনিভাবে আটকে রাখার উদ্দেশ্যে অপহরণ বা তুলে নেওয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এ অপরাধে তার সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। তাকে যেখানে আটক রাখা হয়েছে, সেই থানার সঙ্গে যোগাযোগের একাধিক চেষ্টা করেও সফল হয়নি বিবিসি বার্মিজ। নাউং ইয়ে বলেন, স্থানীয় প্রশাসনের নিম্নপর্যায়ের কর্মকর্তা, সামরিক সদস্য এবং অপরাধী চক্র নানা কৌশলে তরুণদের ধরে সেনাবাহিনীতে পাঠাচ্ছে। জনবলের ঘাটতিতে থাকা সামরিক ইউনিট ও আঞ্চলিক কমান্ডের কাছে তাদের হস্তান্তর করা হচ্ছে। আবার আর্থিকভাবে সচ্ছল ব্যক্তিরা নিজেরা নিয়োগ এড়াতে অর্থ দিলে তাদের পরিবর্তে দরিদ্র পরিবারের লোকজনকে নিয়োগের জন্য পাঠানো হচ্ছে। দরিদ্রদের ওপরই সবচেয়ে বেশি চাপ আইন অনুযায়ী, প্রতিটি গ্রাম, ওয়ার্ড বা শহরকে জনসংখ্যার অনুপাতে নির্দিষ্টসংখ্যক নিয়োগপ্রার্থী সরবরাহ করতে হয়। কাগজে-কলমে এই নিয়ম সবার জন্য সমান হলেও বাস্তবে অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ এড়ানোর সুযোগ থাকায় বৈষম্য বাড়ছে বলে অভিযোগ। সচ্ছল ব্যক্তিরা অর্থ দিয়ে নিজেদের বদলে অন্য কাউকে সামরিক বাহিনীতে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে পারছেন। অন্যদিকে দরিদ্র পরিবারের তরুণদের সেই সুযোগ নেই। ফলে তাদেরই বেশি ঝুঁকি নিতে হচ্ছে। নাউং ইয়ের মতে, প্রতি মাসে নিয়োগের কোটা পূরণ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে তরুণদের নিয়োগের জন্য হাতবদল করে অর্থ উপার্জনের সুযোগ তৈরি হওয়ায় এ ধরনের কর্মকাণ্ড আরও বাড়ছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও ফোর্টিফাই রাইটসের মতো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বেসামরিক মানুষকে অপহরণ করে জোরপূর্বক সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের অভিযোগ তুলেছে। গত জুলাইয়ে উন্মুক্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণকারী সংস্থা মিয়ানমার উইটনেস জানায়, তারা ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ফেসবুকে প্রকাশিত নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান চেয়ে দেওয়া শত শত বিজ্ঞপ্তি বিশ্লেষণ করেছে। তাদের অনুসন্ধানে দেখা যায়, জানুয়ারি মাসে নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তির সংখ্যা ২০২১ সালে ছিল চারটি; ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮২টিতে। গবেষকদের উপসংহারে বলা হয়, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীতে নিয়োগের বড় একটি অংশ আনুষ্ঠানিকভাবে ডেকে পাঠানোর পরিবর্তে আটক, জবরদস্তি ও নিখোঁজ করে দেওয়ার মাধ্যমে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই পরিবারের সদস্যদের কিছু জানানো হচ্ছে না। নিখোঁজদের মধ্যে পুরুষ ও কিশোরদের সংখ্যাই বেশি। জনবলসংকটে জান্তার মরিয়া চেষ্টা সামরিক নিয়োগের ভয়ে তরুণদের পালিয়ে যাওয়া শুধু পরিবারগুলোকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলছে না, দেশের অর্থনীতি ও শ্রমবাজারেও প্রভাব ফেলছে। কেউ সশস্ত্র প্রতিরোধে যোগ দিতে বাড়ি ছাড়ছেন, আবার কেউ নিজ দেশের মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেওয়া এড়াতে পালিয়ে যাচ্ছেন। বছরের পর বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধের মধ্যে তরুণদের অপহরণ ও জোরপূর্বক নিয়োগের আশঙ্কা অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে শ্রমিকসংকটে বিপর্যস্ত অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি হচ্ছে। অনেকে নিরাপত্তার খোঁজে প্রতিবেশী দেশগুলোতে পাড়ি জমাচ্ছেন। সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সামরিক অধ্যয়নবিষয়ক শিক্ষক ও গবেষক সানদীপ সিংয়ের মতে, অনিচ্ছুক তরুণদের যুদ্ধে নামানোর জন্য জান্তার এটি আরেকটি পদক্ষেপ। তার ভাষায়, এই উদ্যোগ দেশটির গৃহযুদ্ধে জান্তার নাজুক অবস্থারই প্রতিফলন। তিনি বলেন, নিয়মিত অপহরণের আশঙ্কা মিয়ানমারের তরুণদের ওপর নতুন করে দুর্ভোগ চাপিয়ে দিয়েছে। দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধেই তারা আগে থেকে বিপর্যস্ত; এখন তাদের পরিবারগুলোকেও প্রতিনিয়ত উদ্বেগের মধ্যে থাকতে হচ্ছে। মিয়ানমারের ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি ইনস্টিটিউট জুনে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলেছে, সামরিক আইন ব্যবহার করে নাগরিকদের একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামানোর সুযোগ নিয়ে জেনারেলরা লাভবান হচ্ছেন। নিজ দেশের মানুষের বিরুদ্ধে ছয় বছরেরও বেশি সময় ধরে যুদ্ধ চালানোর পর জান্তা সরকার এখন বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ আইনকে দমন-পীড়নের আরেকটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। তরুণদের ধরে নিয়ে সেনাবাহিনীতে পাঠানোর অভিযোগ সেই সংকটকেই সামনে আনছে- যে বাহিনী যুদ্ধ চালিয়ে যেতে জনবল খুঁজছে, আর সেই জনবল জোগাড়ের চাপে সাধারণ মানুষই হয়ে উঠছেন সবচেয়ে অসহায়। সূত্র: বিবিসি
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাকে 'নজিরবিহীন' ও অগ্রহণযোগ্য' বলে আখ্যা দিয়েছেন এ বছর নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী নাভি পিল্লাই। দক্ষিণ আফ্রিকার বংশোদ্ভূত জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার নাভি পিল্লাইকে শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইন প্রসারে অসামান্য ভূমিকা রাখার জন্য এ বছর মর্যাদাপূর্ণ নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। নরওয়ের নোবেল কমিটি জানায়, তার এই অবদান এক সুসংহত বৈশ্বিক আইনি কাঠামোর পথ সুগম করেছে। তবে বিজয়ী হিসেবে আইসিসির সাবেক বিচারক নাভি পিল্লাইয়ের নাম ঘোষণার পরপরই ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ওয়াশিংটন আইসিসির বিরুদ্ধে কঠোর ও নিষেধাজ্ঞা জারি করে। মার্কিন এই পদক্ষেপকে আইনের শাসন এবং আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর মূল ভিত্তির ওপর মারাত্মক আঘাত বলে অভিহিত করেছে আইসিসি। শনিবার অসলোর নোবেল পিস সেন্টারে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ভার্চুালি যুক্ত হয়ে ৮৫ বছর বয়সী নাভি পিল্লাই বলেন, 'আন্তর্জাতিক বিচারালয়গুলো, বিশেষ করে দ্য হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো— কেবল বিচারিক আদেশ বা রায় দেওয়ার অপরাধে একটি নির্দিষ্ট দেশ থেকে বিচারকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হচ্ছে। এমন ঘটনা ইতিহাসে নজিরবিহীন ও সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।' মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এর আগে জানান, আইসিসির সঙ্গে মার্কিন কোনো প্রতিষ্ঠানের লেনদেনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির মূল উদ্দেশ্য হলো 'আমেরিকার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা'। তিনি আদালতটির বিরুদ্ধে মার্কিন নাগরিকদের বিচার করার চেষ্টার অভিযোগ আনেন। এর আগেও আইসিসির ১৭ বিচারক ও কর্মকর্তার ওপর ব্যক্তিগত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল ওয়াশিংটন। তবে এবার সরাসরি পুরো আইসিসির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলো। নতুন নিষেধাজ্ঞার কিছু শর্ত পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হওয়ার আগে ৬ মাসের ছাড় দিয়েছে মার্কিন প্রশাসন। এর অর্থ দাঁড়ায়, সদস্য রাষ্ট্রগুলো আপাতত সংস্থাটির কার্যক্রম চালানোর তহবিল দিয়ে যেতে পারবে। ওয়াশিংটনের দাবি, তাদের উদ্বেগগুলো সমাধানে সমঝোতায় পৌঁছার জন্য সদস্য দেশগুলোকে সময় দিতে এই সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের অভিযোগ, আইসিসি পরিচালনা করছে একদল 'বিশ্বায়নবাদী', যারা মার্কিন সার্বভৌমত্বের জন্য বড় হুমকি। এর আগে আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের যুদ্ধাপরাধ সংক্রান্ত তদন্ত ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইসিসি প্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির ঘটনায় চরম ক্ষুব্ধ ওয়াশিংটন। তবে নতুন নিষেধাজ্ঞার নোটিশে ওই পরোয়ানা প্রত্যাহার করতে হবে- এমন শর্ত দেওয়া হয়নি। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস মার্কিন সিদ্ধান্তকে আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থার যৌথ প্রচেষ্টায় ওপর মারাত্মক আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্তে তীব্র দ্বিমত প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্য, কানাডা, ডেনমার্ক, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, জাপান ও নেদারল্যান্ডস। বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের সাবেক আইনজীবী নাভি পিল্লাই তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে রুয়ান্ডা, মিয়ানমার ও গাজায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো স্পর্শকাতর ঘটনা তদন্তে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ২০২৬ সালের শান্তিতে নোবেল বিজয়ী হিসেবে তার নাম ঘোষণাকে 'লজ্জাজনক ও অপমানজনক' বলে মন্তব্য করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি একে 'নরওয়ের গায়ে এক চিরস্থায়ী দাগ' বলে অভিহিত করেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন, মর্যাদাপূর্ণ এই পুরস্কার তারই পাওয়া উচিত।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের বিশাল মজুত, নিজস্ব সামরিক সরঞ্জাম তৈরির সক্ষমতা এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক সমীকরণ ও পরিকল্পনাকে চরম জটিলতার মুখে ফেলেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে আল মায়াদিন জানিয়েছে, ইরানের সামরিক অবকাঠামো ও স্থাপনায় হামলার পরও দেশটির প্রতিরোধ ও পুনরায় অস্ত্র তৈরির সামর্থ্য এখনো অটুট রয়েছে। ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সাম্প্রতিক সংঘাতগুলোতে ইরান তার শক্তিশালী পাল্টাহামলার সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। দেশটির ভেতরে নিজস্ব প্রযুক্তিতে সামরিক সরঞ্জাম তৈরির সুবিধা থাকায় ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থাপনাগুলো দ্রুত পুনরুদ্ধার ও ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত আবার পূর্ণ করার ক্ষমতা রয়েছে তাদের। ফলে কেবল সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করেই ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা প্রতিরোধ ক্ষমতা পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব নয় বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা। পাশাপাশি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালী ব্যবস্থাপনায় ইরানের নিয়ন্ত্রণ থাকায় মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক কৌশলবিদদের হিসাব-নিকাশ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। এই প্রতিবেদনটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর প্রশাসনের সাম্প্রতিক দাবিগুলোর সম্পূর্ণ বিপরীত ছবি ফুটিয়ে তোলে। এর আগে গত সেপ্টেম্বরে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ দাবি করেছিলেন যে ওয়াশিংটন ইরানের সামরিক শিল্প সক্ষমতা এবং পুরো প্রতিরক্ষা ভিত ধ্বংস করে দিয়েছে। এমনকি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও বারবার দাবি করে আসছেন যে মার্কিন হামলায় ইরানের সামরিক শক্তি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে চলতি বছরের জুনে প্রকাশিত অপর এক পশ্চিমা গোয়েন্দা তথ্যে দেখা যায়, যুদ্ধ বিরতির সুযোগে ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র অর্ধেকেরও বেশি পুনর্গঠন করেছে এবং পূর্বের মজুতের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। ব্লুমবার্গের এই সাম্প্রতিক মূল্যায়নটি ওয়াশিংটনের সেই সব দাবির সত্যতাকে আবারও বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলে দিল।