রাজধানীর গণপরিবহনব্যবস্থায় যুক্ত হতে যাচ্ছে আরো একটি বড় মেট্রো রেল রুট। রাজধানীর পশ্চিম প্রান্তের গাবতলী থেকে পুরান ঢাকা পেরিয়ে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত সরাসরি মেট্রো রেল চালুর বড় পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত এই রুটের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩০.৪ কিলোমিটার। এর মধ্যে ২২.৯০ কিলোমিটার হবে এলিভেটেড আর ৭.৫০ কিলোমিটার হবে ভূগর্ভস্থ। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রাথমিকভাবে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সব প্রক্রিয়া ঠিকভাবে এগোলে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর থেকে প্রকল্পের কাজ শুরু হতে পারে।
কাজ শেষ করার লক্ষ্য ধরা হয়েছে ২০৩৬ সালের ডিসেম্বর। অর্থাৎ পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় ১০ বছর সময় লাগতে পারে। ঢাকা মাস ট্রানজিট কম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) আওতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত মেট্রো রেলটি গাবতলী থেকে শুরু হয়ে ঢাকা উদ্যান, বছিলা, মোহাম্মদপুর, জিগাতলা, সায়েন্স ল্যাব, নিউমার্কেট, আজিমপুর, লালবাগ, চকবাজার ও মিটফোর্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দিয়ে যাবে।
এরপর নয়াবাজার, ধোলাইখাল, দয়াগঞ্জ, কাজলা, ডেমরিপাড়া, সারুলিয়া ও সাইনবোর্ড হয়ে রুটটি নারায়ণগঞ্জের দিকে এগোবে। পথে ভুইগড়, জালকুড়ি ও শিবু মার্কেট পেরিয়ে নারায়ণগঞ্জে গিয়ে শেষ হবে।
এই রুট চালু হলে রাজধানীর পশ্চিম ও দক্ষিণ অংশের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের সরাসরি মেট্রো রেল যোগাযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে গাবতলী, মোহাম্মদপুর, ধানমণ্ডি, পুরান ঢাকা, ডেমরা ও নারায়ণগঞ্জের মানুষের যাতায়াত সহজ হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। প্রতিদিন নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসা-যাওয়া করা বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য এটি বড় ধরনের স্বস্তি আনতে পারে।
ব্যয় ৬০ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা
প্রকল্পের প্রাথমিক হিসাবে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন বা জিওবি থেকে দেওয়া হবে ১৫ হাজার ৩৮ কোটি টাকা। আর প্রকল্প ঋণ হিসেবে ৪৫ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ প্রকল্পের বড় অংশের অর্থ বিদেশি ঋণ বা উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
প্রস্তাবে বলা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প সহায়তা নেওয়া হবে। সম্ভাব্য অর্থায়নের উৎস হিসেবে যেকোনো উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাকে বিবেচনা করা হবে। তবে এখনই প্রকল্পের ব্যয় চূড়ান্ত বলা যাচ্ছে না। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষ হওয়ার পর প্রকল্পের প্রকৃত ব্যয় নির্ধারণ করা হবে।
বেশির ভাগ পথ এলিভেটেড
প্রস্তাবিত ৩০.৪ কিলোমিটার মেট্রো রেল রুটের বেশির ভাগই উড়ালপথে নির্মাণ করা হবে। প্রায় ২২.৯০ কিলোমিটার থাকবে মাটির ওপরে। আর ৭.৫০ কিলোমিটার হবে ভূগর্ভস্থ। পাশাপাশি ডেমরা ও মাতুয়াইল মৌজায় প্রায় ১৬৩.৮৬৬ একর জমিতে মেট্রো রেলের ডিপো নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
মেট্রো রেলের প্রযুক্তি ও সংকেতব্যবস্থা বাংলাদেশের বর্তমানে চালু থাকা মেট্রো রেল ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। একই ধরনের মেট্রো রেল কোচ ভবিষ্যতে একে অন্যের সঙ্গে ব্যবহার করা যায়—এমন ব্যবস্থাও রাখার কথা বলা হয়েছে।
আগে ছিল গাবতলী-ডেমরা
এমআরটি লাইন-২ নিয়ে এর আগে গাবতলী থেকে ডেমরা পর্যন্ত রুটের পরিকল্পনা ছিল। পরে রাজধানীর হালনাগাদ পরিবহন পরিকল্পনায় নারায়ণগঞ্জকে যুক্ত করার সুপারিশ করা হয়। সেই সুপারিশের ভিত্তিতেই এখন গাবতলী থেকে ডেমরা হয়ে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত রুট করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সরকারি প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সম্ভাব্যতা সমীক্ষার সময় দুটি রুট পরীক্ষা করা হবে। একটি হলো গাবতলী-ডেমরা এবং অন্যটি গাবতলী-ডেমরা-নারায়ণগঞ্জ। অর্থাৎ সমীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী শেষ পর্যন্ত রুটের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
দিনে যাত্রী হতে পারে ১৪ লাখ
রাজধানীর ভবিষ্যৎ পরিবহন চাহিদার কথা বিবেচনা করে এমআরটি লাইন-২-কে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে দেখা হয়েছে। হালনাগাদ কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় এটি মধ্যমেয়াদি অগ্রাধিকার প্রকল্পের তালিকায় রয়েছে।
পরিবহন পরিকল্পনার ২০৪৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, উন্নয়নের ধরনভেদে এমআরটি লাইন-২ দিয়ে দিনে ১০ লাখের বেশি থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ১৪ লাখ ১৮ হাজার যাত্রী যাতায়াত করতে পারে। সর্বোচ্চ পরিবহন চাহিদার পরিস্থিতিতে এই রুটে দৈনিক প্রায় ১৪ লাখ ১৮ হাজার যাত্রী হওয়ার সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে।
এ কারণে ভবিষ্যতে রাজধানীর গণপরিবহনে এই রুট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে প্রকল্প প্রস্তাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মেট্রো রেলের মাধ্যমে দ্রুত, নিরাপদ, সময়সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব যাতায়াতব্যবস্থা গড়ে তোলাই প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য।
আগে হবে সমীক্ষা
মেট্রো রেল নির্মাণের আগে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও প্রাথমিক নকশার কাজ করা হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ানো এবং কর্মকর্তাদের দক্ষতা উন্নয়নের কাজও করা হবে। এসব কাজের জন্য প্রাথমিকভাবে প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে।
সমীক্ষা তদারকির জন্য ডিএমটিসিএলের কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন ইউনিট গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, মেট্রো রেল সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রকৌশল বিষয়ে ডিএমটিসিএলের প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক সক্ষমতা রয়েছে।
এদিকে প্রকল্পে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়েও কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। স্থানীয় ও দেশীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে কাজের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি নির্মাণকাজের প্যাকেজ এমনভাবে করার সুপারিশ করা হয়েছে, যাতে দেশীয় ঠিকাদাররাও অংশ নিতে পারেন। এতে প্রকল্পের ব্যয় কমানোর পাশাপাশি দেশীয় দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
যানজট কমানোর বড় সুযোগ
রাজধানীর সবচেয়ে বড় সমস্যা দীর্ঘ যানজট। প্রতিদিন রাজধানীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কে আটকে থাকতে হয়। এর সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ থেকে রাজধানীতে আসা মানুষের দীর্ঘ যাত্রাও যুক্ত হয়। এমন বাস্তবতায় গাবতলী থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত সরাসরি মেট্রো রেল চালু হলে সড়কনির্ভর যাতায়াতের ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বিশেষ করে পুরান ঢাকা, ডেমরা ও নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে রাজধানীর অন্যান্য এলাকার দ্রুত যোগাযোগ তৈরি হলে কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ যাত্রীদের সময় বাঁচবে। বিদ্যুত্চালিত মেট্রো রেল হওয়ায় পরিবেশের ওপর চাপও তুলনামূলকভাবে কম রাখার লক্ষ্য রয়েছে।
তবে ৬০ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্প এখনো চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি। এটি বর্তমানে প্রকল্প প্রস্তাবের পর্যায়ে রয়েছে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, নকশা, অর্থায়ন এবং প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদনের পরই প্রকল্পের চূড়ান্ত রূপ নির্ধারণ করা হবে। একই সঙ্গে সমীক্ষায় রুটের বিকল্পগুলোও যাচাই করা হবে।
পরিকল্পনা কমিশন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে গাবতলী থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত তৈরি হবে রাজধানীর একটি দীর্ঘ মেট্রো রেল করিডর। রাজধানীর পশ্চিম থেকে পুরান ঢাকা হয়ে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল এবং নারায়ণগঞ্জকে একই দ্রুতগতির গণপরিবহনব্যবস্থার আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হবে। এতে রাজধানীর যানজট কমানোর পাশাপাশি রাজধানী ও নারায়ণগঞ্জের মানুষের যাতায়াতে আসতে পারে বড় পরিবর্তন।
বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল হক বলেন, ‘প্রস্তাবিত মেট্রো রেল প্রকল্পটি ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে একই সময়ে আরো একটি ব্যয়বহুল মেট্রো রেল প্রকল্প নেওয়ার আগে সতর্ক হওয়া দরকার।’