প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর শেষে দুই দেশের যৌথ ঘোষণাপত্রে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় জানিয়েছে বাংলাদেশ ও চীন।
শুক্রবার প্রকাশিত ১৫ দফার এই যৌথ ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, দুই দেশ তাদের ‘সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্ব’ আরও এগিয়ে নিয়ে ‘নতুন যুগের চীন-বাংলাদেশ অভিন্ন ভবিষ্যতের সম্প্রদায়’ গড়ে তুলবে, যাতে দুই দেশের জনগণ আরও বেশি উপকৃত হয়।
বাংলাদেশের তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের সহায়তা এবং দুই দেশের মধ্যে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা খাতে ‘টু প্লাস টু’ কৌশলগত সংলাপ চালুর মত বিষয় যৌথ ঘোষণায় এসেছে।
এছাড়া বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি এবং সামরিক খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধি; চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের আওতায় দুই দেশের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার আলোচনার পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে মিয়ানমারকে আলোচনায় আনতে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে চীন।
চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২২ থেকে ২৬ জুন চীন সফর করেন। সফরের শেষ দিন শুক্রবার তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন।
এছাড়া বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার এই সফরে দুই দেশের মধ্যে মোট ১৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।
যৌথ ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, বৈঠকগুলোতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিভিন্ন বিষয়ে ‘গভীর মতবিনিময়’ হয়েছে এবং ‘বিস্তৃত ঐকমত্যে’ পৌঁছেছেন দুই দেশের নেতারা।
১৯৭৫ সালের সম্পর্ক নতুন পর্যায়ে
যৌথ ঘোষণায় বলা হয়, ১৯৭৫ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলাদেশ ও চীন পারস্পরিক রাজনৈতিক আস্থা জোরদার করেছে, ঐতিহ্যগত বন্ধুত্বকে শক্তিশালী করেছে এবং বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।
চীন, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হওয়ায় অভিনন্দন জানিয়ে নতুন সরকারের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। একই সঙ্গে নতুন সরকারের ‘বাংলাদেশ সবার আগে’ নীতির প্রশংসা করেছে বেইজিং।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ মনে করে চীনের ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাংলাদেশের জন্য নতুন উন্নয়ন সুযোগ সৃষ্টি করবে।
উচ্চপর্যায়ের সংলাপ আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত
দুই দেশ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখা, সরকারি পর্যায়ে অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং সরকার, আইনসভা ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছে।
একই সঙ্গে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে কৌশলগত সংলাপ শুরুর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে ‘টু+টু সংলাপ’ চালুর সম্ভাবনাও যৌথভাবে খতিয়ে দেখবে ঢাকা ও বেইজিং।
‘এক চীন’ নীতিতে বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত
যৌথ ঘোষণাপত্রে বাংলাদেশ ‘এক চীন’ নীতির প্রতি দৃঢ় সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।
সেখানে বলা হয়েছে, পৃথিবীতে একটিই চীন রয়েছে, তাইওয়ান গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং বেইজিং সরকারই সমগ্র চীনের একমাত্র বৈধ সরকার।
বাংলাদেশ তাইওয়ানের স্বাধীনতার যে কোনো প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে এবং জাতীয় পুনঃএকত্রীকরণে চীনের উদ্যোগকে সমর্থন জানায়।
অন্যদিকে চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।
চীন বলেছে, বাংলাদেশের জনগণ তাদের জাতীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ যে উন্নয়নপথ বেছে নিয়েছে, তাকে তারা সম্মান করে।
বেল্ট অ্যান্ড রোডে সহযোগিতা জোরদারের অঙ্গীকার
চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আওতায় সহযোগিতা আরও এগিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে দুই দেশ।
চীন জানিয়েছে, বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে আরও সমন্বয় করে বড় অবকাঠামো প্রকল্পের পাশাপাশি ছোট কিন্তু জনকল্যাণমূলক প্রকল্পেও তারা কাজ করবে।
এ ছাড়া বাংলাদেশের শিল্পায়ন, কৃষির আধুনিকায়ন এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে নিজেদের সক্ষমতা অনুযায়ী সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বেইজিং।
বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও শিল্প খাতে সহযোগিতা
যৌথ ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, বাণিজ্য, ই-কমার্স, শিল্প ও সরবরাহ শৃঙ্খল এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও জোরদার করবে বাংলাদেশ ও চীন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বহুপক্ষীয় বাণিজ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করতেও একসঙ্গে কাজ করবে দুই দেশ।
বাংলাদেশের সব ধরনের পণ্যের জন্য শতভাগ শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা বজায় রাখায় চীনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে বাংলাদেশ।
অন্যদিকে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ঢাকা।
দুই দেশ যৌথভাবে মংলা বন্দর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার কাজ এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে।
নতুন সংযোগের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখবে দুই দেশ
যোগাযোগ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি, সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তি, দুর্যোগ প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সহযোগিতা আরও গভীর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ও চীন।
এ ছাড়া আঞ্চলিক সংযোগ সম্প্রসারণের নতুন বিকল্প খুঁজে দেখার বিষয়ে একমত হয়েছে দুই দেশ।
যৌথ ঘোষণাপত্রে বিশেষভাবে চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে সরাসরি সংযোগ প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখার কথা বলা হয়েছে।
তিস্তা প্রকল্পে সহযোগিতা
যৌথ ঘোষণাপত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল বাংলাদেশের তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি।
এতে বলা হয়েছে, সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা, পূর্বাভাস, বন্যা প্রতিরোধ, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, নদী খনন এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি বিনিময়ে সহযোগিতা আরও জোরদার করবে দুই দেশ।
চীন জানিয়েছে, নিজেদের ‘সক্ষমতা অনুযায়ী’ তারা তিস্তা প্রকল্পে সহায়তা করবে এবং প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই দ্রুত সম্পন্ন করতে দুই দেশের বিশেষজ্ঞদের কাজ এগিয়ে নিতে সহযোগিতা দেবে।
এ ছাড়া সামুদ্রিক বিষয়েও সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছে বাংলাদেশ ও চীন।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও গভীর হবে
যৌথ ঘোষণাপত্র অনুযায়ী, দুই দেশ প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণ করবে।
এর আওতায় সামরিক প্রতিনিধি বিনিময়, সফর, প্রশিক্ষণ এবং অন্যান্য সহযোগিতা জোরদার করা হবে।
একই সঙ্গে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম সংক্রান্ত বিষয়ে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও যোগাযোগ অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে চীন ও বাংলাদেশ।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গণমাধ্যম ও সংস্কৃতিতে সহযোগিতা
২০২৫ সালে চীন ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি এবং ‘চীন-বাংলাদেশ জনগণের মধ্যে বিনিময় বর্ষ’ সফলভাবে উদযাপনের প্রশংসা করেছে দুই দেশ।
যৌথ ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, গণমাধ্যম, থিংক ট্যাংক, শিক্ষা, চলচ্চিত্র, প্রকাশনা, যুব, ক্রীড়া ও সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা আরও জোরদার করা হবে।
এ ছাড়া মানবসম্পদ উন্নয়ন, বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো এবং বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য চীনে উচ্চশিক্ষার সুযোগ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে বেইজিং।
স্বাস্থ্যসেবা ও ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাব্যবস্থার ক্ষেত্রেও বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার বিষয়ে একমত হয়েছে দুই দেশ।
বাংলাদেশ স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা খাতে সহযোগিতার জন্য বিশেষভাবে ইউনান প্রদেশসহ চীনের স্থানীয় সরকারগুলোর প্রশংসা করেছে।
ব্রিকস ও এসসিওতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণে চীনের সমর্থন
যৌথ ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, মানবজাতির জন্য ‘অভিন্ন ভবিষ্যতের সম্প্রদায়’ গঠনের ধারণা এবং প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং উত্থাপিত বিভিন্ন বৈশ্বিক উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে বাংলাদেশ। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে চীনের সঙ্গে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত থাকার কথাও বলেছে ঢাকা।
অন্যদিকে, চীন জাতিসংঘসহ বিভিন্ন বহুপক্ষীয় ফোরামে বাংলাদেশের আরও সক্রিয় ভূমিকার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।
একই সঙ্গে ব্রিকসে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার অংশীদার হওয়ার জন্য বাংলাদেশের আবেদনে সমর্থনের কথা জানিয়েছে বেইজিং।
এ ছাড়া আঞ্চলিক বহুপক্ষীয় সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়া এবং এ প্রক্রিয়ায় আরও দেশকে যুক্ত করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে দুই দেশ।
জাতিসংঘভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি সমর্থন
যৌথ ঘোষণাপত্রে জাতিসংঘভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা এবং জাতিসংঘ সনদের উদ্দেশ্য ও নীতিমালার প্রতি দৃঢ় সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ ও চীন।
দুই দেশ সমতা ও শৃঙ্খলাভিত্তিক বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা এবং সবার জন্য কল্যাণকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের পক্ষে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছে।
একই সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ের ফলাফল অক্ষুণ্ন রাখা এবং ফ্যাসিবাদ ও সামরিকবাদের পুনরুত্থানের যে কোনো প্রচেষ্টার বিরোধিতা করার কথা বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে কায়রো ঘোষণা, পটসড্যাম ঘোষণা এবং জাতিসংঘ সনদসহ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর প্রতি সমর্থন জানিয়েছে দুই দেশ।
রোহিঙ্গা সংকট: মিয়ানমারকে আলোচনায় আনতে সহযোগিতা
যৌথ ঘোষণাপত্রে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীনের ‘গঠনমূলক’ ভূমিকার প্রশংসা করেছে বাংলাদেশ।
অন্যদিকে, বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত মানুষকে মানবিক সহায়তা দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রশংসা করেছে চীন।
চীন বলেছে, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি সমাধান খুঁজে বের করার প্রচেষ্টাকে তারা সমর্থন করে।
এ প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে নিজেদের ‘সক্ষমতা অনুযায়ী’ ভূমিকা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বেইজিং।
সহযোগিতা
সফরকালে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে উন্নয়ন সহযোগিতা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, কৃষি, শিক্ষা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ এবং গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা এগিয়ে নিতে এমওইউ সই হওয়ার কথা যৌথ ঘোষণাপত্রে তুলে ধরা হয়েছে।
তবে ঘোষণাপত্রে এসব চুক্তির সংখ্যা বা পৃথক বিষয়বস্তু বিস্তারিতভাবে বলা হয়নি।
চীনা নেতৃত্বকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ
সফরের শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাকে ও তার সফরসঙ্গীদের প্রতি উষ্ণ ও আন্তরিক আতিথেয়তার জন্য চীনের সরকার ও জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
একই সঙ্গে সুবিধাজনক সময়ে চীনের শীর্ষ নেতৃত্বকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান তিনি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
সীমান্ত এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে গত জুলাই মাসে ২০২ কোটি ৬৩ লাখ ৪৯ হাজার টাকা মূল্যের চোরাচালানি পণ্য জব্দ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিজিবি জানায়, জব্দ করা পণ্যের মধ্যে রয়েছে ৪ দশমিক ২৫৪ কেজি স্বর্ণ, ২১৬টি হীরার নাকফুল, ৭ দশমিক ৯৩০ কেজি রূপা, ১৩ হাজার ৬৩টি শাড়ি, ২ হাজার ৭১০টি থ্রি-পিস, শার্টের কাপড়, কম্বল ও বেডকভার, ৮ হাজার ৮৮৬টি তৈরি পোশাক, ২ হাজার ৪১৬ মিটার কাপড়, ১৫ হাজার ৫২৭টি কৃত্রিম গহনা এবং ৩ লাখ ২ হাজার ৩৯৪টি প্রসাধনসামগ্রী। এছাড়া ৮ লাখ ৬৪ হাজার ৩৫৬টি আতশবাজি, ১ হাজার ৭৫১ ঘনফুট কাঠ, ২ লাখ ২১ হাজার ৯০ কেজি কয়লা, ৬ হাজার ৪৪৬ কেজি চা পাতা, ৬২৪টি মোবাইল ফোন, ৪ হাজার ৩৬০টি মোবাইল ডিসপ্লে এবং ৩৬ হাজার ১৭০টি মোবাইল ফোনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ জব্দ করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, অভিযানে ২০ হাজার চিকিৎসা সরঞ্জাম, ৭১ হাজার ৪০০টি রেজর ব্লেড, ৩ হাজার ৭০০ জোড়া চশমা, ৪৭ হাজার ৭৭৬ কেজি জিরা, ৪২ হাজার ৯৩১ কেজি রসুন, ১৩ হাজার ৩২৯ কেজি চিনি, ১২ হাজার ৪৮৬ কেজি সার, ১৭ হাজার ৪৭৯ কেজি কারেন্ট জাল, ৩৬৭ লিটার ভোজ্যতেল-ডিজেল-অকটেন-পেট্রোল-মবিল, ১ হাজার ৮১৮ প্যাকেট কীটনাশক, ৬ লাখ ৯৪ হাজার ১৭টি ওষুধ, ১ দশমিক ০৭০ কেজি সাপের বিষ এবং ৯টি পাথর জব্দ করা হয়েছে। চোরাচালানে ব্যবহৃত ১২টি ট্রাক-কাভার্ডভ্যান, ৮টি পিকআপ, ৩টি প্রাইভেটকার, ৬টি ট্রলি, ৫৫টি সিএনজিচালিত যান-ইজিবাইক-অটোরিকশা, ৫৯টি মোটরসাইকেল, ৪৭টি সাইকেল-ভ্যান এবং ১২৭টি নৌযানও জব্দ করেছে বিজিবি। অভিযানকালে ৯টি দেশীয়-বিদেশি পিস্তল, একটি রাইফেল, ৫টি ম্যাগাজিন, ৬০ রাউন্ড গুলি এবং অন্যান্য ৭টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। জুলাই মাসে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্যও জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২১ লাখ ১০ হাজার ২৫৮টি ইয়াবা ট্যাবলেট, ২ কেজি ক্রিস্টাল মেথ বা আইস, ৭১ গ্রাম হেরোইন, ১ হাজার ২৪৩ বোতল ফেনসিডিল, ৬ হাজার ৫২৬ বোতল বিদেশি মদ, ১ হাজার ৬৩৯ দশমিক ৫ লিটার দেশীয় মদ, ৭৫৪ ক্যান বিয়ার, ১ হাজার ৮০৬ কেজি গাঁজা, ২ লাখ ৫৮ হাজার ৩৮৬টি মাদকদ্রব্যের ট্যাবলেট-ইনজেকশন, বিভিন্ন ধরনের ১৬ হাজার ৫৮০ বোতল নেশাজাতীয় সিরাপ এবং ১৮ হাজার ৬৮২টি বিভিন্ন ধরনের ওষুধ-ট্যাবলেট। এছাড়া ১ লাখ ১৯ হাজার ১৪১ প্যাকেট বিড়ি ও সিগারেট জব্দ করা হয়েছে। অভিযানে ইয়াবা ও অন্যান্য মাদকসহ বিভিন্ন ধরনের চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৯১ জন সন্দেহভাজন চোরাকারবারিকে আটক করা হয়। এছাড়া অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমের সময় ৩১ বাংলাদেশি, ৩ ভারতীয় এবং ৮১ মিয়ানমারের নাগরিককে আটক করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
তীব্র গরমে সারা দেশের লোডশেডিং অব্যাহত রয়েছে। ঢাকার বাইরে কোথাও বিদ্যুৎ থাকছে না। কোথাও ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ যাচ্ছে। কোথাও একবার গেলে কয়েক ঘণ্টায়ও আসছে না। তীব্র গরমে মানুষ চরম ভোগান্তিতে আছে। বিতরণ কোম্পানির সূত্র জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে লোডশেডিং আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। গড়ে প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং হচ্ছে। দেশজুড়ে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে তীব্র লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। শহরের তুলনায় গ্রামের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। কিছু এলাকায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। লালমনিরহাটের কালীগঞ্জে তীব্র গরমের সঙ্গে বেড়েছে লোডশেডিং। দিন-রাত মিলিয়ে ১২ থেকে ১৩ ঘণ্টা বিদুৎ ছাড়া থাকতে হচ্ছে দাগনভূঞার গ্রাহকদের। মাদারীপুরে চাহিদার বিপরীতে কম বিদ্যুৎ সরবরাহে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে বাসিন্দারা। লালমনিরহাটের কালীগঞ্জে তীব্র গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে অসহনীয় লোডশেডিং। দিনে-রাতে দফায় দফায় বিদ্যুতের ভেলকিবাজিতে স্থবির হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা। একদিকে প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ, অন্যদিকে রাতে লোডশেডিংয়ের ফলে অনেকেই না ঘুমিয়ে রাত পার করছেন। উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সন্ধ্যার পর থেকেই লোডশেডিংয়ের তীব্রতা বাড়ে, যা চলে ভোর পর্যন্ত। উপজেলার কাকিনা ইউনিয়নের ইশোরকোল গ্রামের দিনমজুর আজগার আলী আক্ষেপ করে বলেন, সারা রাত বিদ্যুৎ থাকে না, গরমে একফোঁটাও ঘুমাতে পারি না। শরীর এত দুর্বল লাগে যে সকালে কাজে যাওয়া সম্ভব হয় না। একদিন কাজ না করলে ঘরে চাল ওঠে না, পরিবার নিয়ে এখন কী করব বুঝতে পারছি না। একই ভোগান্তির কথা জানান স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও। কাকিনা বাজারের ব্যবসায়ী মমিনুর রহমান লিটন বলেন, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য একপ্রকার বন্ধ হওয়ার উপক্রম। ফ্রিজে রাখা আইসক্রিম, কোমল পানীয়সহ পচনশীল পণ্য নষ্ট হয়ে চরম লোকসানে পড়ছি। এদিকে বিদ্যুৎ না থাকায় চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা। মোমবাতি বা কুপির আলোতে তীব্র গরমে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। কাকিনা মহিমা রঞ্জন স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী আবু শাহাদত সিয়াম বলেন, সামনে তাদের টেস্ট পরীক্ষা; কিন্তু লোডশেডিংয়ের কারণে প্রস্তুতি নিতে চরম সমস্যা হচ্ছে। কালীগঞ্জ নেসকো পিএলসির (বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তরিকুল ইসলাম জানান, কালীগঞ্জে বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৬ মেগাওয়াট, অথচ তার বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৭ থেকে ৮ মেগাওয়াট। ফেনীর দাগনভূঞায় বেপরোয়া লোডশেডিংয়ে গ্রামের কোথাও সরকারি শিডিউল মানা হচ্ছে না। গ্রাহকরা অতিষ্ঠ হয়ে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জোনাল অফিস বা উপকেন্দ্রে অথবা অভিযোগ অফিসগুলোতে ফোন করলে কেউ রিসিভও করছে না। প্রতিদিন সমিতির আওতাধীন দাগনভূঞা এলাকায় ১২ থেকে ১৩ ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ থাকছে না। কোথাও কোথাও ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টাও লোডশেডিং হচ্ছে। অতিমাত্রার লোডশেডিংয়ের ফলে ক্ষুদ্র শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। আরইবির ফেনী সমিতি বলছে, তারা প্রতিদিন চাহিদার অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ পাচ্ছেন। এ কারণে তারা সরকারি শিডিউল মানতে পারছেন না। সাধারণ সময়েও সমিতিগুলো গড়ে ২ থেকে ৩ ঘণ্টা লোডশেডিং করে থাকে। এখন বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে গিয়ে সেটি ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা করতে হচ্ছে। গরম বাড়লে এ লোডশেডিং আরও ১-২ ঘণ্টা বেড়ে যায়। চাহিদা তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ মাদারীপুরবাসী। শহর থেকে গ্রাম কোনো জায়গায়ই যেন রেহাই নেই। দিন-রাত মিলিয়ে ১০-১২ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। সবচেয়ে দুর্ভোগে পড়েছেন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির গ্রাহকরা। এদিকে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ না থাকায় কারখানার উৎপাদনও নেমে গেছে অর্ধেকে। শ্রমিক-কর্মচারীরা অলস সময় কাটাচ্ছেন। এতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে জানা নেই বিদ্যুৎ বিভাগের। রংয়ের ছোঁয়া প্রেসের মালিক রুবেল মাতুব্বর বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় প্রেসের কোনো কাজই করতে পারছি না। কাস্টমার এতে বিরক্ত হচ্ছে। আর্থিকভাবে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। বিদ্যুৎ বিভাগ অফিস সূত্র জানিয়েছে, ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) প্রায় ৪০ হাজার গ্রাহকের ১৭ মেগাওয়াটের বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে ১১ মেগাওয়াট। অপরদিকে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ৪ লাখ ২৩ হাজার গ্রাহকের ১০৬ মেগাওয়াটের বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে ৫২ মেগাওয়াট। ১৪টি সাবস্টেশনের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা বিবেচনা করে লোডশেডিং ভাগ করছে কর্তৃপক্ষ।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জনগণের অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিশ্চিত করা গেলে রাষ্ট্র শক্তিশালী হয়। সাধারণ মানুষকে অভাবের মধ্যে রেখে কিংবা তাদের মুখ বন্ধ করে কোনো রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না। দেশকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাওয়াই সরকারের লক্ষ্য বলেও মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, রাজনৈতিক অধিকারের পাশাপাশি মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিশ্চিত করা জরুরি। এ জন্য দেশীয় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে উৎসাহিত করতে সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের নীতি সহায়তা দেবে। মঙ্গলবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত তিনটি পাটকল বেসরকারি দুই প্রতিষ্ঠানের কাছে লিজ দেওয়ার চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব হাসান শিপলু এ কথা জানান। অনুষ্ঠানে দেশের প্রকৃত উদ্যোক্তাদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেবে। উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা করা গেলে একদিকে মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবনের নিশ্চয়তা তৈরি হবে, অন্যদিকে সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি হবে। সরকারপ্রধান বলেন, ‘আমরা এমন একটি দেশ তৈরি করতে চাই, যেখানে সবাই এখন যে অবস্থায় আছে, তার থেকে ভালো থাকবে। এটাই আমাদের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।’ বিদেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি দেশীয় বিনিয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ অবশ্যই আসবে এবং সরকার সেটি চায়। তবে দেশের নিজস্ব বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তাদেরও উৎসাহিত করতে হবে। তাদের ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে যতটুকু নীতি সহায়তা দরকার, তা দেওয়া হবে। সরকারের নীতির মূল উদ্দেশ্য সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য সুযোগ তৈরি করা- উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, সবার সহযোগিতায় একটি সুন্দর ও শক্তিশালী দেশ গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে। তিনটি মিলের দায়িত্ব নেওয়া দুই ব্যবসায়ী গ্রুপকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী। নতুন বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠানগুলো সফল হবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম, বস্ত্র ও পাট সচিব শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান আহসান খান চৌধুরী এবং হ্যামকো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ টি এম মোস্তফা। অনুষ্ঠানে বিজেএমসি ও লিজ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।