সাফল্যের শিখরে পৌঁছাতে হলে একটি সুস্থ শরীর ও শান্ত মনের বিকল্প নেই। আমরা অনেক সময় ক্যারিয়ারের পেছনে ছুটতে গিয়ে নিজের স্বাস্থ্যকে অবহেলা করি, যা দীর্ঘমেয়াদে বড় ব্যর্থতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
মহানবী (সা.) তাঁর জীবনে শুধু আধ্যাত্মিক সাধনাই করেননি, বরং শরীরচর্চা, খাদ্যাভ্যাস এবং মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখার ক্ষেত্রেও এক অনন্য আদর্শ স্থাপন করেছেন। সাফল্যের এই যাত্রায় তাঁর জীবন থেকে ১০টি বৈপ্লবিক সূত্র তুলে ধরা হলো:
১. স্বাস্থ্যকে নেয়ামত ভাবা
সাফল্যের জন্য সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো সুস্থতা। নবীজি (সা.) একে অলসভাবে নষ্ট না করার তাগিদ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “দুটি নেয়ামতের বিষয়ে অধিকাংশ মানুষ ধোঁকায় পড়ে আছে (অর্থাৎ এর মূল্য বোঝে না); তা হলো সুস্থতা ও অবসর।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪১২)
২. পরিমিত আহারের অভ্যাস
অতিরিক্ত ভোজন অলসতা ও রোগের মূল কারণ। নবীজি (সা.) পাকস্থলীর এক-তৃতীয়াংশ খাদ্য, এক-তৃতীয়াংশ পানীয় এবং এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য খালি রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “মানুষ তার পেটের চেয়ে নিকৃষ্ট আর কোনো পাত্র পূর্ণ করে না।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৮০)
৩. শরীরচর্চা ও সক্রিয় জীবন
নবীজি (সা.) নিজে শারীরিকভাবে অত্যন্ত ফিট ছিলেন। তিনি কুস্তি লড়া, ঘোড়দৌড় ও দ্রুত হাঁটার মাধ্যমে শরীরকে কর্মক্ষম রাখতেন। তিনি বলেছেন, “দুর্বল মুমিনের চেয়ে শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় ও উত্তম।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৬৪)
৪. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা
সুস্থ থাকার প্রধান শর্ত হলো পরিচ্ছন্নতা। নবীজি (সা.) একে ইমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। বলেছেন, “পবিত্রতা ইমানের অর্ধেক।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২৩)
৫. মেসওয়াক ও মৌখিক যত্ন
দাঁত ও মুখের পরিচ্ছন্নতা শুধু শারীরিক নয়, সামাজিক ব্যক্তিত্বের জন্যও জরুরি। নবীজি (সা.) প্রতিদিন বহুবার মেসওয়াক করতেন। তিনি বলেছেন, “যদি আমার উম্মতের জন্য কষ্টকর মনে না করতাম, তবে প্রত্যেক নামাজের সময় তাদের মেসওয়াক করার নির্দেশ দিতাম।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৮৭)
৬. রাগ নিয়ন্ত্রণ
মানসিক প্রশান্তি নষ্ট হওয়ার প্রধান কারণ হলো রাগ। নবীজি (সা.) রাগের মাথায় কোনো সিদ্ধান্ত নিতে নিষেধ করেছেন। এক ব্যক্তি তাঁর কাছে উপদেশ চাইলে তিনি তিনবার বললেন, “রাগ করো না।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১১৬)
৭. ক্ষমা ও পরমতসহিষ্ণুতা
হৃদয়ে ঘৃণা পুষে রাখলে মানসিক চাপ বাড়ে। ক্ষমা করার গুণটি মানুষকে মানসিকভাবে হালকা রাখে এবং বড় লক্ষ্য অর্জনে সাহায্য করে। রাসুল (সা.) বলেছেন, “ক্ষমার মাধ্যমে আল্লাহ বান্দার সম্মান শুধু বাড়িয়েই দেন।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৮)
৮. দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তির প্রার্থনা
অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা মানুষের কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়। নবীজি (সা.) অলসতা, অক্ষমতা ও দুশ্চিন্তা থেকে বাঁচার জন্য নিয়মিত দোয়া করতেন। তিনি প্রার্থনা করতেন, “হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাচ্ছি দুশ্চিন্তা ও দুঃখ-বেদনা থেকে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৮৯৩)
৯. ইতিবাচক চিন্তা
অন্যের সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখা মনের শান্তি বজায় রাখে। নবীজি (সা.) সন্দেহপ্রবণ হওয়া থেকে বেঁচে থাকতে বলেছেন। রাসুল (সা.) বলেছেন, “তোমরা ধারণা (সন্দেহ) করা থেকে বেঁচে থাকো; কারণ ধারণা করা বড় মিথ্যা কাজ।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫১৪৩)
১০. নিয়মিত ঘুম ও বিশ্রামের ভারসাম্য
রাত জাগা শরীরের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। নবীজি (সা.) এশার পর দ্রুত ঘুমানোর এবং শেষ রাতে জেগে ইবাদতের মাধ্যমে শরীর ও মনের সমন্বয় করতেন। রাসুল (সা.) বলেছেন, “নিশ্চয়ই তোমার শরীরের ওপর তোমার হক (অধিকার) রয়েছে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯৭৫)
শেষ কথা
রাসুল (সা.)-এর এই ১০টি সূত্র প্রমাণ করে যে, প্রকৃত সাফল্য শুধু বৈষয়িক উন্নতিতে নয়, বরং একটি সুশৃঙ্খল ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মাধ্যমে অর্জিত হয়। শরীর সুস্থ থাকলে এবং মন শান্ত থাকলে যেকোনো বাধা অতিক্রম করা সহজ হয়।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
সাফল্যের শিখরে পৌঁছাতে হলে একটি সুস্থ শরীর ও শান্ত মনের বিকল্প নেই। আমরা অনেক সময় ক্যারিয়ারের পেছনে ছুটতে গিয়ে নিজের স্বাস্থ্যকে অবহেলা করি, যা দীর্ঘমেয়াদে বড় ব্যর্থতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মহানবী (সা.) তাঁর জীবনে শুধু আধ্যাত্মিক সাধনাই করেননি, বরং শরীরচর্চা, খাদ্যাভ্যাস এবং মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখার ক্ষেত্রেও এক অনন্য আদর্শ স্থাপন করেছেন। সাফল্যের এই যাত্রায় তাঁর জীবন থেকে ১০টি বৈপ্লবিক সূত্র তুলে ধরা হলো: ১. স্বাস্থ্যকে নেয়ামত ভাবা সাফল্যের জন্য সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো সুস্থতা। নবীজি (সা.) একে অলসভাবে নষ্ট না করার তাগিদ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “দুটি নেয়ামতের বিষয়ে অধিকাংশ মানুষ ধোঁকায় পড়ে আছে (অর্থাৎ এর মূল্য বোঝে না); তা হলো সুস্থতা ও অবসর।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪১২) ২. পরিমিত আহারের অভ্যাস অতিরিক্ত ভোজন অলসতা ও রোগের মূল কারণ। নবীজি (সা.) পাকস্থলীর এক-তৃতীয়াংশ খাদ্য, এক-তৃতীয়াংশ পানীয় এবং এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য খালি রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “মানুষ তার পেটের চেয়ে নিকৃষ্ট আর কোনো পাত্র পূর্ণ করে না।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৮০) ৩. শরীরচর্চা ও সক্রিয় জীবন নবীজি (সা.) নিজে শারীরিকভাবে অত্যন্ত ফিট ছিলেন। তিনি কুস্তি লড়া, ঘোড়দৌড় ও দ্রুত হাঁটার মাধ্যমে শরীরকে কর্মক্ষম রাখতেন। তিনি বলেছেন, “দুর্বল মুমিনের চেয়ে শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় ও উত্তম।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৬৪) ৪. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সুস্থ থাকার প্রধান শর্ত হলো পরিচ্ছন্নতা। নবীজি (সা.) একে ইমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। বলেছেন, “পবিত্রতা ইমানের অর্ধেক।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২৩) ৫. মেসওয়াক ও মৌখিক যত্ন দাঁত ও মুখের পরিচ্ছন্নতা শুধু শারীরিক নয়, সামাজিক ব্যক্তিত্বের জন্যও জরুরি। নবীজি (সা.) প্রতিদিন বহুবার মেসওয়াক করতেন। তিনি বলেছেন, “যদি আমার উম্মতের জন্য কষ্টকর মনে না করতাম, তবে প্রত্যেক নামাজের সময় তাদের মেসওয়াক করার নির্দেশ দিতাম।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৮৭) ৬. রাগ নিয়ন্ত্রণ মানসিক প্রশান্তি নষ্ট হওয়ার প্রধান কারণ হলো রাগ। নবীজি (সা.) রাগের মাথায় কোনো সিদ্ধান্ত নিতে নিষেধ করেছেন। এক ব্যক্তি তাঁর কাছে উপদেশ চাইলে তিনি তিনবার বললেন, “রাগ করো না।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১১৬) ৭. ক্ষমা ও পরমতসহিষ্ণুতা হৃদয়ে ঘৃণা পুষে রাখলে মানসিক চাপ বাড়ে। ক্ষমা করার গুণটি মানুষকে মানসিকভাবে হালকা রাখে এবং বড় লক্ষ্য অর্জনে সাহায্য করে। রাসুল (সা.) বলেছেন, “ক্ষমার মাধ্যমে আল্লাহ বান্দার সম্মান শুধু বাড়িয়েই দেন।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৮) ৮. দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তির প্রার্থনা অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা মানুষের কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়। নবীজি (সা.) অলসতা, অক্ষমতা ও দুশ্চিন্তা থেকে বাঁচার জন্য নিয়মিত দোয়া করতেন। তিনি প্রার্থনা করতেন, “হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাচ্ছি দুশ্চিন্তা ও দুঃখ-বেদনা থেকে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৮৯৩) ৯. ইতিবাচক চিন্তা অন্যের সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখা মনের শান্তি বজায় রাখে। নবীজি (সা.) সন্দেহপ্রবণ হওয়া থেকে বেঁচে থাকতে বলেছেন। রাসুল (সা.) বলেছেন, “তোমরা ধারণা (সন্দেহ) করা থেকে বেঁচে থাকো; কারণ ধারণা করা বড় মিথ্যা কাজ।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫১৪৩) ১০. নিয়মিত ঘুম ও বিশ্রামের ভারসাম্য রাত জাগা শরীরের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। নবীজি (সা.) এশার পর দ্রুত ঘুমানোর এবং শেষ রাতে জেগে ইবাদতের মাধ্যমে শরীর ও মনের সমন্বয় করতেন। রাসুল (সা.) বলেছেন, “নিশ্চয়ই তোমার শরীরের ওপর তোমার হক (অধিকার) রয়েছে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯৭৫) শেষ কথা রাসুল (সা.)-এর এই ১০টি সূত্র প্রমাণ করে যে, প্রকৃত সাফল্য শুধু বৈষয়িক উন্নতিতে নয়, বরং একটি সুশৃঙ্খল ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মাধ্যমে অর্জিত হয়। শরীর সুস্থ থাকলে এবং মন শান্ত থাকলে যেকোনো বাধা অতিক্রম করা সহজ হয়।
সাগরপারের বিস্তীর্ণ মাঠ। যেখানে জমিতে থাকা লোনাপানি সূর্যের তাপে শুকিয়ে হয়ে ওঠে সাদা লবণ। শ্রমিকরা সেই লবণ তুলে স্তূপ করেন মাঠের পাশে। কক্সবাজার কিংবা উপকূলীয় অঞ্চলের পরিচিত সেই দৃশ্যই যেন লবণচাষের চেনা গল্প। কিন্তু পিরোজপুরের নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠি) উপজেলার ডুবি গ্রামে গিয়ে সেই ধারণা বদলে যায়। সাগর নেই, উপকূলও নেই, তবু এখানে তৈরি হচ্ছে লবণ। তাও আবার কোনো আধুনিক প্রযুক্তিতে নয়, প্রায় অর্ধশত বছরের পুরোনো এক পদ্ধতিতে। পরিত্যক্ত লবণমিশ্রিত মাটির সঙ্গে পানি মিশিয়ে তা আগুনে সিদ্ধ করে তৈরি হচ্ছে ঝরঝরে সাদা লবণ। পিরোজপুর জেলা শহর থেকে প্রায় ৬৫ কিলোমিটার দূরের ডুবি গ্রামের এই লবণশিল্পের পেছনে রয়েছে এক মর্মস্পর্শী গল্প। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময় দেশে দেখা দেয় লবণের তীব্র সংকট। সেই সময় ঝালকাঠির লবণ পরিশোধন কারখানার আশপাশের লবণমিশ্রিত পরিত্যক্ত মাটি সংগ্রহ করে তাতে পানি মিশিয়ে আগুনে জ্বাল দিয়ে লবণ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই উদ্যোগের পথিকৃৎ ছিলেন গ্রামের বাসিন্দা আবু বক্কর ফরাজী। নেছারাবাদের (স্বরূপকাঠি) পাশেই বাণিজ্যনগরী ঝালকাঠি। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগ থেকেই সেখানে লবণ পরিশোধনের কারখানা ছিল। দুর্ভিক্ষের সময় যখন লবণ পাওয়া কঠিন হয়ে ওঠে, তখন ডুবি গ্রামের আবু বক্কর ফরাজী ছুটে যান ঝালকাঠিতে। সেখানকার কারখানার আশপাশের মাটি সংগ্রহ করে বাড়িতে নিয়ে আসেন। সেই মাটির সঙ্গে পানি মিশিয়ে রেখে দেন। পরে পানিতে লবণের ঘনত্ব তৈরি হলে তা আগুনে ফুটিয়ে তৈরি করেন লবণ। শুরুটা ছিল কেবল পরিবারের চাহিদা মেটানোর জন্য। কিন্তু বিষয়টি দ্রুত আলোচনায় এলে এলাকার মানুষও আগ্রহী হয়ে ওঠেন এই পদ্ধতিতে লবণ উৎপাদনে। ১৯৭৫ সালের শুরুর দিকে নিজ বাড়িতে ছোট পরিসরে লবণ উৎপাদনের মিল স্থাপন করেন আবু বক্কর ফরাজী। তার দেখাদেখি ডুবি গ্রামের আরও কয়েকজন লবণ উৎপাদনে যুক্ত হন। পরে পাশের সোহাগদল, সারেংকাঠি, এমনকি বরিশালের বানারীপাড়া ও উজিরপুরের কিছু পরিবারও একই পদ্ধতিতে লবণ তৈরি শুরু করে। এই লবণ তৈরির কারিগর আবু বক্কর বর্তমানে আর বেঁচে নেই। তার শুরু করা ব্যবসা এখন পরিচালনা করছেন ভাই আবুল হোসেন ফরাজী। তিনি বলেন, ‘ভাই প্রথম মাটি দিয়ে ঝরঝরে লবণ তৈরি করেছিলেন। প্রথমে গ্রামের মানুষের চাহিদা মিটত। পরে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু হলে একে একে অনেকে এই শিল্পে আসেন।’ অর্ধশত বছর পেরিয়ে গেলেও ডুবি গ্রামের লবণশিল্প এখনো টিকে আছে। বর্তমানে অন্তত ১১ জন ব্যবসায়ীর ২০টি কারখানায় চলছে লবণ উৎপাদন। এসব কারখানায় রয়েছে প্রায় অর্ধশত চুলা। স্থানীয়দের মতে, প্রতিমাসে প্রায় ৩২০ টন লবণ উৎপাদন হয়। শুধু উৎপাদন নয়, এ শিল্পকে ঘিরে জীবিকা গড়ে উঠেছে বহু মানুষের। প্রায় ৫০০ পরিবার কোনো-না-কোনোভাবে জড়িত এ কাজের সঙ্গে। কেউ মাটি বহন করেন, কেউ পানি ছেঁকে পরিষ্কার করেন, কেউ আবার চুল্লির আগুন সামলান ঘণ্টার পর ঘণ্টা। লবণ তৈরির পুরো প্রক্রিয়াটিও বেশ ব্যতিক্রমী। কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, খুলনা কিংবা ঝালকাঠির লবণ পরিশোধন কারখানা থেকে লবণমিশ্রিত পরিত্যক্ত মাটি ডুবি গ্রামে আনা হয়। বড় বড় স্তূপ করে সেই মাটি সংরক্ষণ করা হয়। এরপর মাটির সঙ্গে পানি মিশিয়ে গলানো হয়। কয়েক ধাপে উপরের ময়লা অপসারণ করে আলাদা করা হয় লবণাক্ত পানি। সেই পানি পরে চুল্লির ওপর রাখা চারকোনা ডোঙ্গায় ঢেলে তীব্র আগুনে ফোটানো হয়। প্রায় সাত ঘণ্টা জ্বাল দেওয়ার পর পানি বাষ্প হয়ে উড়ে যায়। শেষে ডোঙ্গার তলায় পড়ে থাকে সাদা ঝরঝরে লবণ। লবণ তৈরির কারিগররা বলছেন, দীর্ঘ সময় জ্বাল দেওয়ায় লবণ জীবাণুমুক্ত হয়ে যায়। পরে মেশিনের মাধ্যমে আয়োডিন মিশিয়ে বাজারজাত করা হয় খাবার লবণ হিসাবে। শিল্পকারখানায়ও ব্যবহার হয় এ লবণের একটি অংশ। ডুবি গ্রামের মনির হোসেন প্রায় ২৫ বছর এ পেশায় আছেন। প্রতিদিন চুল্লির আগুন, ধোঁয়া আর তাপের মধ্যে কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা দুইজনে মিলে দিনে প্রায় ৩০ মন লবণ তৈরি করি। এতে গড়ে ১ হাজার ৮০০ টাকা আয় হয়। আগুনে জ্বাল দেওয়ার কারণে লবণ ভালো থাকে। পরে আয়োডিন মিশিয়ে বাজারে বিক্রি করি।’ একসময় এ শিল্পের ব্যাপক চাহিদা ছিল বলে জানান ব্যবসায়ীরা। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে বানারীপাড়ার একটি বাজারে সপ্তাহে দুইদিন প্রায় দেড় হাজার মন লবণ বিক্রি হতো। ডুবি গ্রামের পদ্ধতি অনুসরণ করে ঢাকা, কক্সবাজারের পটিয়া ও নারায়ণগঞ্জেও গড়ে উঠেছিল লবণ উৎপাদনের কারখানা। তবে গ্যাস সংকটসহ নানা কারণে সেসব কারখানার বেশির ভাগ এখন বন্ধ। মেসার্স সোনালী সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক সেলিম মিয়া বলেন, আমার কারখানায় আয়োডিন মেশানোর মেশিন রয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ৪০ জন শ্রমিক এখানে কাজ করেন। তবে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আগের মতো লাভ নেই।’ ডুবি গ্রামের মানুষ শুধু লবণ উৎপাদন বা বিক্রি করছেন না। ধরে রেখেছেন দুর্ভিক্ষের সময় বেঁচে থাকার তাগিদে জন্ম নেওয়া এক প্রাচীন শিল্পের ইতিহাস।
ঠাকুরগাঁওয়ে জামায়াতে ইসলামীকে জড়িয়ে বিএনপি মহাসচিব ও এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দেওয়া বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার ফখরুলের বক্তব্যকে দায়িত্বজ্ঞানহীন, উসকানিমূলক ও অসত্য বলে বর্ণনা করেন। বুধবার (২০ মে) দেওয়া বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে যে গৎবাঁধা মিথ্যাচার ও বিষোদ্গার করেছেন, তা অত্যন্ত দুঃখজনক, অনভিপ্রেত ও দায়িত্বজ্ঞানহীন। রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব এবং সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার উদ্দেশ্যেই তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মতো একটি সুশৃঙ্খল ও গণমুখী ইসলামী দলের বিরুদ্ধে ন্যক্কারজনকভাবে কুৎসা রটানোর পথ বেছে নিয়েছেন।’ গোলাম পরওয়ার বলেন, “মির্জা ফখরুল অভিযোগ করেছেন ‘আমরা নাকি ধর্মের নামে রাজনীতি করি বা মিথ্যা বলি।’ অথচ দেশবাসী ভালো করেই জানে, জামায়াতে ইসলামী একটি নিয়মতান্ত্রিক, আদর্শিক ও প্রকাশ্য ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল। আমরা ধর্ম নিয়ে কখনো কোনো ধরনের হীন ব্যবসা বা চাতুরীর আশ্রয় নেই না। বরং ধর্ম নিয়ে প্রকৃত ব্যবসা ও ভণ্ডামি করে বিএনপি নিজেই। সারা বছর তাদের বড় বড় নেতাদের নামাজের কোনো খবর থাকে না, অথচ নির্বাচন ঘনিয়ে এলেই তাদের গায়ে পাজামা-পাঞ্জাবি ও মাথায় টুপি পরে, হাতে তসবিহ দেখা যায় এবং আতর মেখে মসজিদে ঢুকতে দেখা যায়। জনগণের ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে ক্ষমতায় যাওয়ার এই সস্তা ও ভণ্ডামিপূর্ণ রাজনীতি বিএনপির জন্যই বেশি প্রযোজ্য, জামায়াতের নয়। তিনি বলেন, মির্জা ফখরুল অমূলক দাবি করেছেন ‘এ দেশের মানুষ জামায়াতকে কোনো দিন ক্ষমতায় বসাবে না।’ তাকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, জামায়াতে ইসলামী এ দেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেওয়া একটি দল। অতীতে একাধিকবার সংসদ নির্বাচনে দেশপ্রেমিক জনতা জামায়াতকে ভোট দিয়ে সংসদে পাঠিয়েছে এবং আমাদের মন্ত্রীরা সততা ও দক্ষতার সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনার নজির স্থাপন করেছেন। জনগণের এই রায়কে যারা অস্বীকার করে, তারা আসলে গণতন্ত্রেই বিশ্বাস করে না। তিনি আরো বলেন, ‘ঠাকুরগাঁওয়ের সভায় দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করার হীন উদ্দেশ্যে যে সস্তা নাটক তিনি মঞ্চস্থ করার অপচেষ্টা করেছেন, তা তার মতো একজন সিনিয়র রাজনীতিকের কাছে কখনো কাম্য নয়। অপপ্রচার চালিয়ে মিথ্যাকে সত্যে পরিণত করা যায় না।’ জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, ‘স্বাধীনতা যুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে জামায়াতকে জড়িয়ে তিনি যে পুরনো ও অসত্য বয়ান দিয়েছেন, তা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ছাড়া আর কিছুই নয়। জামায়াতে ইসলামী সব সময় দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার পক্ষে অতন্দ্র প্রহরীর মতো ভূমিকা পালন করে আসছে এবং ভবিষ্যতেও পালন করবে ইনশাআল্লাহ।’ তিনি বলেন, ‘আমরা স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, মিথ্যা এবং কুৎসার ওপর ভিত্তি করে কখনো টেকসই রাজনীতি করা যায় না। রাজনীতি করতে হবে সত্য, সততা এবং জনকল্যাণমূলক আদর্শের ওপর ভিত্তি করে, যা জামায়াতে ইসলামী জন্মলগ্ন থেকেই করে আসছে। তাই নিজেদের রাজনৈতিক ব্যর্থতা ঢাকতে জামায়াতের বিরুদ্ধে অসত্য ও উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া বন্ধ করার এবং এ ধরনের অসত্য মন্তব্য প্রত্যাহার করার জন্য আমি মির্জা ফখরুলের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’