কক্সবাজারের উখিয়ায় ইনানীর পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকায় টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ আগুনে অন্তত ১০ জন পর্যটক প্রাণ হারিয়েছেন। শনিবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে কাঠের তৈরি ওই রিসোর্টে আগুন লাগে; ফায়ার সার্ভিসের তৎপরতায় বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
এ দুর্ঘটনায় প্রাথমিকভাবে পাঁচটি, পরে ছয়টি এবং শেষ পর্যন্ত ১০টি মরদেহ উদ্ধারের খবর নিশ্চিত করেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। নিহতদের মধ্যে শিশুসহ নারী-পুরুষ রয়েছেন; ছয়জন দগ্ধ অবস্থায় কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
দুর্ঘটনা নয়, ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা!
এ ঘটনাকে কেবল ‘দুর্ঘটনা’ বলে পাশ কাটানো যাবে না। ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স ছিল না এবং গত জুনেই এটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছিল।
কাঠের তৈরি একটি পর্যটন স্থাপনায় অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, লাইসেন্স, সতর্কতা ব্যবস্থা ও দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা না থাকা মানে পর্যটকদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলে ব্যবসা চালানো। যে স্থাপনা আগেই ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত হয়েছিল, সেটি কেন চালু ছিল—এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষকেই।
তদন্ত ও জবাবদিহি
এ ঘটনার পর পুলিশ রিসোর্টটির ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনকে ঘটনাস্থল থেকে আটক করেছে। আটক হওয়া একটি শুরু; মূল কাজ হলো অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, বৈদ্যুতিক ত্রুটি বা অন্য কোনো উৎস, নির্মাণ উপাদান, নিরাপত্তা ঘাটতি, অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা—সবকিছু স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তে বের করে আনা।
এক্ষণে আমাদের চাওয়া-- তদন্ত যেন শুধু একজন ম্যানেজারের দায়ে সীমাবদ্ধ না থাকে। যারা ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা পরিদর্শন করেছিল, সতর্ক করেছিল কিন্তু বন্ধ করায় ব্যর্থ হয়েছে, তাদের দায়ও নির্ধারণ করতে হবে। দায় এড়াতে কেবল নিম্নস্তরের কর্মীকে শাস্তি দেওয়া হলে ভবিষ্যতে এমন ট্র্যাজেডি ঠেকানো সম্ভব হবে না।
পর্যটনে নিরাপত্তাই মূল অবকাঠামো
কক্সবাজার বাংলাদেশের শীর্ষ পর্যটন গন্তব্য; সেখানে পর্যটকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকার ও ব্যবসায়ীদের অপরিহার্য দায়িত্ব। সমুদ্রসৈকতের সৌন্দর্য বা রিসোর্টের আকর্ষণ যত বড়ই হোক, আগুনের ঝুঁকি, জরুরি প্রস্থানপথ, অগ্নিনিরোধক যন্ত্র, স্মোক অ্যালার্ম, প্রশিক্ষিত কর্মী এবং নিয়মিত পরিদর্শন ছাড়া কোনো রিসোর্ট পর্যটকদের জন্য নিরাপদ নয়।
দুর্ঘটনার পর কর্তৃপক্ষের উচিত শুধু ওই একটি রিসোর্ট নয়, ইনানী-মেরিন ড্রাইভসহ কক্সবাজারের সব রিসোর্ট, হোটেল ও রেস্টুরেন্টের বিশেষ অডিট করা। লাইসেন্সবিহীন, ঝুঁকিপূর্ণ বা অগ্নিনিরাপত্তাবিহীন স্থাপনা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
কক্সবাজারের পর্যটনে সম্ভাব্য ক্ষতি
এ ট্র্যাজেডি কক্সবাজারের পর্যটন খাতের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্ট অনেকেরই। কক্সবাজারে বছরে প্রায় ৬০ থেকে ৮০ লাখ দেশি-বিদেশি পর্যটক ভ্রমণ করেন এবং পাঁচ শতাধিক হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ও গেস্টহাউসে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার পর্যটকের রাতযাপনের ব্যবস্থা রয়েছে বলে জানা যায়।
এই ঘটনার ফলে পর্যটকদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হতে পারে, যা চলমান পিক সিজন ছাড়াও আগামী মৌসুমে বুকিং ও ভ্রমণে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে দুর্গাপূজার মতো পিক সিজনে যেখানে ৬ লাখেরও বেশি পর্যটকের সমাগমের প্রত্যাশা ছিল, সেখানে এই ধরনের ঘটনা বুকিং বাতিল ও পর্যটক সংখ্যা হ্রাসের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আগের অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় মাত্র চার দিনেই কক্সবাজারের পর্যটন খাতে প্রায় ১০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছিল এবং ৫০ হাজার বুকিং বাতিল হয়েছিল। এই অগ্নিকাণ্ডের পরেও একই ধরনের বা তার চেয়ে বেশি ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন কেউ কেউ, কারণ নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা পর্যটকদের আস্থা দ্রুত ফিরিয়ে আনা সহজ নয়।
এখন থেকে অনুসরণীয় সতর্কতা
-অবিলম্বে সব রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তা অডিট: কক্সবাজারের সব হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স, অগ্নিনিরোধক যন্ত্র, স্মোক ডিটেক্টর ও জরুরি প্রস্থানপথ পরীক্ষা করতে হবে।
-লাইসেন্সবিহীন স্থাপনা বন্ধ: যেসব স্থাপনার লাইসেন্স নেই বা ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত, সেগুলো অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
-কাঠ ও দাহ্য উপাদানে নির্মিত স্থাপনায় বিশেষ নজরদারি: এসব স্থাপনায় অগ্নিনিরোধক উপাদান ব্যবহার ও নিয়মিত পরিদর্শন নিশ্চিত করতে হবে।
-প্রশিক্ষিত জনবল ও জরুরি ড্রিল: প্রতিটি রিসোর্টে অগ্নিনিরোধ প্রশিক্ষিত কর্মী রাখা এবং নিয়মিত জরুরি অনুশীলন করা জরুরি।
-পর্যটকদের সচেতনতা: পর্যটকরা থাকার আগে জরুরি প্রস্থানপথ, অগ্নিনিরোধক ব্যবস্থা ও লাইসেন্স সম্পর্কে জানার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
-তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ ও দায়ীদের বিচার: তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ করে দায়ীদের আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
ভবিষ্যতের শিক্ষা
এই ট্র্যাজেডি আমাদের কাছে কিছু অপরিহার্য শিক্ষা রেখে গেছে, যেমন:
-পর্যটন স্থাপনায় অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা এবং লাইসেন্স ছাড়া পরিচালনা রোধ করা।
-কাঠ, পলিথিন বা দাহ্য উপাদানে নির্মিত রিসোর্টে বিশেষ ঝুঁকি মূল্যায়ন ও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা।
-প্রতিটি রিসোর্টে অগ্নিনিরোধক যন্ত্র, স্মোক ডিটেক্টর, জরুরি প্রস্থানপথ, সাইনবোর্ড ও প্রশিক্ষিত জনবল রাখা।
-ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষিত স্থাপনা সতর্কবার্তা দিয়েই চালু রাখার সংস্কৃতি বন্ধ করা।
-দুর্ঘটনার পর তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে দায়ীদের আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
সবশেষে বলা যায়-- ইনানীর পাটুয়ারটেকে টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টের অগ্নিকাণ্ড কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়; এটি আমাদের পর্যটন খাতের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তাহীনতা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অবহেলা ও জবাবদিহিতার ঘাটতির এক ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি। গত ১১ জুনই ফায়ার সার্ভিস রিসোর্টটিকে ২১ দিনের মধ্যে ই-ফায়ার লাইসেন্স নেওয়ার নোটিশ দিয়েছিল, অথচ সেই নোটিশ কার্যকর হয়নি—ফলাফল হলো ১০টি অমূল্য প্রাণের বিনিময়ে এক অবর্ণনীয় ট্র্যাজেডি।
এখন প্রশ্ন শুধু আগুন কোথা থেকে লেগেছিল তা নয়; আরও বড় প্রশ্ন হলো—যে স্থাপনাকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল, সেটি কেন বন্ধ করা হয়নি। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে গঠিত পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি যেন শুধু আগুনের উৎস নয়, বরং লাইসেন্সহীন পরিচালনা, নির্মাণ উপাদানের ঝুঁকি, পরিদর্শন ব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের ভূমিকাও তদন্ত করে।
পর্যটন মন্ত্রণালয় ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা ও অগ্নিনিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ দিয়েছে; কিন্তু নির্দেশনা দেওয়াই যথেষ্ট নয়—এর বাস্তবায়ন ও ফলাফল নিশ্চিত করাই মূল চ্যালেঞ্জ। নিহতদের পরিবারের জন্য যথাযথ ক্ষতিপূরণ, আহতদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—এই ট্র্যাজেডি যেন শুধু কিছুদিনের আলোচনায় সীমাবদ্ধ না থাকে। সারা দেশের রিসোর্ট, হোটেল ও রেস্টুরেন্টে বাধ্যতামূলক অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স, নিয়মিত অডিট, ডিজিটাল রেজিস্ট্রি এবং কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। পর্যটন শিল্পের প্রথম পূর্বশর্ত কেবল সৌন্দর্য নয়, নিরাপত্তাও—এই শিক্ষাটি যদি আমরা এখনই গ্রহণ না করি, তবে ইনানীর ধোঁয়া ভবিষ্যতে আরও বড় ট্র্যাজেডির ইঙ্গিত হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
কক্সবাজারের উখিয়ায় ইনানীর পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকায় টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ আগুনে অন্তত ১০ জন পর্যটক প্রাণ হারিয়েছেন। শনিবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে কাঠের তৈরি ওই রিসোর্টে আগুন লাগে; ফায়ার সার্ভিসের তৎপরতায় বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এ দুর্ঘটনায় প্রাথমিকভাবে পাঁচটি, পরে ছয়টি এবং শেষ পর্যন্ত ১০টি মরদেহ উদ্ধারের খবর নিশ্চিত করেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। নিহতদের মধ্যে শিশুসহ নারী-পুরুষ রয়েছেন; ছয়জন দগ্ধ অবস্থায় কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। দুর্ঘটনা নয়, ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা! এ ঘটনাকে কেবল ‘দুর্ঘটনা’ বলে পাশ কাটানো যাবে না। ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স ছিল না এবং গত জুনেই এটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছিল। কাঠের তৈরি একটি পর্যটন স্থাপনায় অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, লাইসেন্স, সতর্কতা ব্যবস্থা ও দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা না থাকা মানে পর্যটকদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলে ব্যবসা চালানো। যে স্থাপনা আগেই ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত হয়েছিল, সেটি কেন চালু ছিল—এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষকেই। তদন্ত ও জবাবদিহি এ ঘটনার পর পুলিশ রিসোর্টটির ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনকে ঘটনাস্থল থেকে আটক করেছে। আটক হওয়া একটি শুরু; মূল কাজ হলো অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, বৈদ্যুতিক ত্রুটি বা অন্য কোনো উৎস, নির্মাণ উপাদান, নিরাপত্তা ঘাটতি, অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা—সবকিছু স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তে বের করে আনা। এক্ষণে আমাদের চাওয়া-- তদন্ত যেন শুধু একজন ম্যানেজারের দায়ে সীমাবদ্ধ না থাকে। যারা ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা পরিদর্শন করেছিল, সতর্ক করেছিল কিন্তু বন্ধ করায় ব্যর্থ হয়েছে, তাদের দায়ও নির্ধারণ করতে হবে। দায় এড়াতে কেবল নিম্নস্তরের কর্মীকে শাস্তি দেওয়া হলে ভবিষ্যতে এমন ট্র্যাজেডি ঠেকানো সম্ভব হবে না। পর্যটনে নিরাপত্তাই মূল অবকাঠামো কক্সবাজার বাংলাদেশের শীর্ষ পর্যটন গন্তব্য; সেখানে পর্যটকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকার ও ব্যবসায়ীদের অপরিহার্য দায়িত্ব। সমুদ্রসৈকতের সৌন্দর্য বা রিসোর্টের আকর্ষণ যত বড়ই হোক, আগুনের ঝুঁকি, জরুরি প্রস্থানপথ, অগ্নিনিরোধক যন্ত্র, স্মোক অ্যালার্ম, প্রশিক্ষিত কর্মী এবং নিয়মিত পরিদর্শন ছাড়া কোনো রিসোর্ট পর্যটকদের জন্য নিরাপদ নয়। দুর্ঘটনার পর কর্তৃপক্ষের উচিত শুধু ওই একটি রিসোর্ট নয়, ইনানী-মেরিন ড্রাইভসহ কক্সবাজারের সব রিসোর্ট, হোটেল ও রেস্টুরেন্টের বিশেষ অডিট করা। লাইসেন্সবিহীন, ঝুঁকিপূর্ণ বা অগ্নিনিরাপত্তাবিহীন স্থাপনা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। কক্সবাজারের পর্যটনে সম্ভাব্য ক্ষতি এ ট্র্যাজেডি কক্সবাজারের পর্যটন খাতের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্ট অনেকেরই। কক্সবাজারে বছরে প্রায় ৬০ থেকে ৮০ লাখ দেশি-বিদেশি পর্যটক ভ্রমণ করেন এবং পাঁচ শতাধিক হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ও গেস্টহাউসে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার পর্যটকের রাতযাপনের ব্যবস্থা রয়েছে বলে জানা যায়। এই ঘটনার ফলে পর্যটকদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হতে পারে, যা চলমান পিক সিজন ছাড়াও আগামী মৌসুমে বুকিং ও ভ্রমণে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে দুর্গাপূজার মতো পিক সিজনে যেখানে ৬ লাখেরও বেশি পর্যটকের সমাগমের প্রত্যাশা ছিল, সেখানে এই ধরনের ঘটনা বুকিং বাতিল ও পর্যটক সংখ্যা হ্রাসের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আগের অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় মাত্র চার দিনেই কক্সবাজারের পর্যটন খাতে প্রায় ১০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছিল এবং ৫০ হাজার বুকিং বাতিল হয়েছিল। এই অগ্নিকাণ্ডের পরেও একই ধরনের বা তার চেয়ে বেশি ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন কেউ কেউ, কারণ নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা পর্যটকদের আস্থা দ্রুত ফিরিয়ে আনা সহজ নয়। এখন থেকে অনুসরণীয় সতর্কতা -অবিলম্বে সব রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তা অডিট: কক্সবাজারের সব হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স, অগ্নিনিরোধক যন্ত্র, স্মোক ডিটেক্টর ও জরুরি প্রস্থানপথ পরীক্ষা করতে হবে। -লাইসেন্সবিহীন স্থাপনা বন্ধ: যেসব স্থাপনার লাইসেন্স নেই বা ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত, সেগুলো অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। -কাঠ ও দাহ্য উপাদানে নির্মিত স্থাপনায় বিশেষ নজরদারি: এসব স্থাপনায় অগ্নিনিরোধক উপাদান ব্যবহার ও নিয়মিত পরিদর্শন নিশ্চিত করতে হবে। -প্রশিক্ষিত জনবল ও জরুরি ড্রিল: প্রতিটি রিসোর্টে অগ্নিনিরোধ প্রশিক্ষিত কর্মী রাখা এবং নিয়মিত জরুরি অনুশীলন করা জরুরি। -পর্যটকদের সচেতনতা: পর্যটকরা থাকার আগে জরুরি প্রস্থানপথ, অগ্নিনিরোধক ব্যবস্থা ও লাইসেন্স সম্পর্কে জানার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। -তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ ও দায়ীদের বিচার: তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ করে দায়ীদের আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ভবিষ্যতের শিক্ষা এই ট্র্যাজেডি আমাদের কাছে কিছু অপরিহার্য শিক্ষা রেখে গেছে, যেমন: -পর্যটন স্থাপনায় অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা এবং লাইসেন্স ছাড়া পরিচালনা রোধ করা। -কাঠ, পলিথিন বা দাহ্য উপাদানে নির্মিত রিসোর্টে বিশেষ ঝুঁকি মূল্যায়ন ও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা। -প্রতিটি রিসোর্টে অগ্নিনিরোধক যন্ত্র, স্মোক ডিটেক্টর, জরুরি প্রস্থানপথ, সাইনবোর্ড ও প্রশিক্ষিত জনবল রাখা। -ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষিত স্থাপনা সতর্কবার্তা দিয়েই চালু রাখার সংস্কৃতি বন্ধ করা। -দুর্ঘটনার পর তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে দায়ীদের আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। সবশেষে বলা যায়-- ইনানীর পাটুয়ারটেকে টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টের অগ্নিকাণ্ড কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়; এটি আমাদের পর্যটন খাতের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তাহীনতা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অবহেলা ও জবাবদিহিতার ঘাটতির এক ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি। গত ১১ জুনই ফায়ার সার্ভিস রিসোর্টটিকে ২১ দিনের মধ্যে ই-ফায়ার লাইসেন্স নেওয়ার নোটিশ দিয়েছিল, অথচ সেই নোটিশ কার্যকর হয়নি—ফলাফল হলো ১০টি অমূল্য প্রাণের বিনিময়ে এক অবর্ণনীয় ট্র্যাজেডি। এখন প্রশ্ন শুধু আগুন কোথা থেকে লেগেছিল তা নয়; আরও বড় প্রশ্ন হলো—যে স্থাপনাকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল, সেটি কেন বন্ধ করা হয়নি। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে গঠিত পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি যেন শুধু আগুনের উৎস নয়, বরং লাইসেন্সহীন পরিচালনা, নির্মাণ উপাদানের ঝুঁকি, পরিদর্শন ব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের ভূমিকাও তদন্ত করে। পর্যটন মন্ত্রণালয় ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা ও অগ্নিনিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ দিয়েছে; কিন্তু নির্দেশনা দেওয়াই যথেষ্ট নয়—এর বাস্তবায়ন ও ফলাফল নিশ্চিত করাই মূল চ্যালেঞ্জ। নিহতদের পরিবারের জন্য যথাযথ ক্ষতিপূরণ, আহতদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—এই ট্র্যাজেডি যেন শুধু কিছুদিনের আলোচনায় সীমাবদ্ধ না থাকে। সারা দেশের রিসোর্ট, হোটেল ও রেস্টুরেন্টে বাধ্যতামূলক অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স, নিয়মিত অডিট, ডিজিটাল রেজিস্ট্রি এবং কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। পর্যটন শিল্পের প্রথম পূর্বশর্ত কেবল সৌন্দর্য নয়, নিরাপত্তাও—এই শিক্ষাটি যদি আমরা এখনই গ্রহণ না করি, তবে ইনানীর ধোঁয়া ভবিষ্যতে আরও বড় ট্র্যাজেডির ইঙ্গিত হয়ে দাঁড়াতে পারে।