শুধুমাত্র তারিখ ঘোষণার বাকি। ত্রয়োদশ ভোটের অন্য সব আয়োজন চলছে পুরোমাত্রায়। দেশ এখন নির্বাচনের মহাসড়কে। ব্যস্ত সময় পার করছেন রাজনৈতিক দলগুলো ও তাদের মনোনীত প্রার্থীরা। এতোদিন ভোট দিতে না পারার যন্ত্রণায় কাতর সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও আগ্রহ ব্যাপক। সবার প্রত্যাশা একটি উৎসবমুখর, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আশায় বুক বেঁধেছে দেশের মানুষ। সর্বজনীন ভোটাধিকারে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে এগিয়ে যাবে দেশ। আর হারাবে না পথ।
এমন সন্ধিক্ষণেও গণভোট ইস্যুতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে রাজনীতিকরা। সন্দিহান একে অপরের প্রতি। প্রকৃত গণতান্ত্রিক রূপান্তরের যাত্রাপথে এ নিয়ে আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুর তোলা যাচ্ছে না মোটেও। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনও সন্তোষজনক মাত্রা পায়নি। রাজনীতিকদের অনৈক্যে জন্ম হচ্ছে নতুন নতুন সঙ্কট। তপশিল ঘোষণার কাউন্টডাউন। অন্তর্বর্তী সরকার ব্যর্থ হতে চায় না কোনোভাবেই।
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস নির্বাচন প্রসঙ্গে বারবার নিজের শক্ত অবস্থান পরিস্কার করেছেন। যত খেলা আর ষড়যন্ত্রই হোক না কেন নির্বাচন ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প দেখছেন না। তিনি জানেন, গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিই হচ্ছে প্রত্যেক নাগরিকের ভোটের অধিকার। নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্র কোনভাবেই পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না। আলোয় আলোয় ঝকঝক জীবনে প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের মাধ্যমে তাই ক্ষমতার প্রকৃত মালিক জনগণের হাতেই ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে বদ্ধপরিকর।
নির্বাচনকে যিনি মনে করেন একটি ‘টিম ওয়ার্ক’। এই টিম স্পিরিটে সফলতা অর্জনে দেশপ্রেমিক বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সহায়তা চেয়েছেন এক সপ্তাহে দু’বার। দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি দেশের জনসাধারণের আস্থা-বিশ্বাস-ভরসা-নির্ভরতা অনুরণিত হয়েছে তার কণ্ঠেও। প্রথমবার বুধবার (১৯ নভেম্বর) মিরপুর সেনানিবাসে ডিএসসিএসসি কোর্স-২০২৫-এর গ্র্যাজুয়েশন সনদ বিতরণ অনুষ্ঠানে ও দ্বিতীয়বার গত শুক্রবার (২১ novembre) সেনাকুঞ্জে সশস্ত্র বাহিনী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে।
প্রধান উপদেষ্টা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন, ‘বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে। একটি নির্বিঘ্ন ও উৎসবমুখর নির্বাচন আয়োজনে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের দক্ষতা ও পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানাচ্ছি।’ প্রথম অনুষ্ঠানটিতেও তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা নির্বাচনের অপেক্ষায় আছি। আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। আবারও আমাদের সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সব ধরনের সহযোগিতা প্রয়োজন।’
এই নভেম্বরের প্রথম দিনেই সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান ও বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেদিন দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সামরিক বাহিনীর সদস্যদের কঠোর পরিশ্রমের জন্য সাধুবাদ জানান সরকারপ্রধান। তিনি বলেছিলেন, ‘গত ১৫ মাসে সেনাবাহিনীসহ সব বাহিনীর সদস্যরা দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করেছে।’
আসন্ন নির্বাচন যেন নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা থাকে, সে জন্যও তিন বাহিনীকে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেন। গত ১৯ ও ২১ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টার আহ্বানের পরপরই শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে সরকারকে ও নির্বাচন কমিশনকে সর্বাত্মক সহযোগিতার কথা জানিয়েছেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ও নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, রোববার (২৩ নভেম্বর) সশস্ত্র বাহিনী দিবস উপলক্ষে ‘আর্মি মাল্টিপারপাস কমপ্লেক্স’-এ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সেনাপ্রধান বলেছেন, ‘দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনী নিয়োজিত রয়েছে… সুন্দর একটা নির্বাচন পেতে আমরা যথাযথভাবে সরকারকে এবং নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করবো।’
একদিন পরেই (২৪ নভেম্বর) বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নবীন নাবিকদের কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে নৌবাহিনী প্রধান বলেছেন, ‘সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে আগামী নির্বাচন আয়োজনে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে নৌবাহিনী সার্বিক সহায়তা প্রদান করবে।’
দেশের প্রতিটি সঙ্কটে ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে সশস্ত্র বাহিনী। সামরিক বাহিনী-ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসেই বিরল এক গণঅভ্যুত্থানে বিজয়ী হয়েছে দেশ। এই ঐক্যই পতিত সরকারের জগদ্দল পাথর সরিয়েছে। নতুন সম্ভাবনার পথে এগিয়ে যেতে অন্তর্বর্তী সরকারকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছে।
সামনেও নতুন সৌন্দর্যের আবাহনে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে সেনা, নৌ, বিমান বাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ—প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য থেকেও সেটি স্পষ্ট।
একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পূর্বশর্ত হলো স্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। গত ১৫ মাসে সশস্ত্র বাহিনী দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে নিজেদের অপরিহার্যতা তুলে ধরেছে। সাধারণ রিকশা চালক থেকে কর্পোরেট কর্মকর্তা, আমলা–শিক্ষক–আইনজীবী—সকলেই জানেন, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কেবল সশস্ত্র বাহিনীর পূর্ণ সহযোগীতাতেই সম্ভব।
এই কারণেই ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সশস্ত্র বাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে মাঠে রাখছে সরকার। এতে ভোট সহিংসতা ও কারচুপি প্রতিরোধ সহজ হবে এবং রাজনৈতিক চাপও কম পড়বে।
এক্স-ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশনের সেমিনারে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. রোকন উদ্দিন বলেছেন, ‘ভোট কারচুপিতে দলীয় প্রশাসন মূল ভূমিকা রাখে। তাই সশস্ত্র বাহিনীকে পূর্ণ ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে মাঠে নামানো জরুরি।’
প্রধান উপদেষ্টা বারবার ‘সবচেয়ে সুন্দর নির্বাচন’ আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যদিও এখনো হাটে-ঘাটে-প্রবাসে নির্বাচন নিয়ে আলোচনায় অনেকে পর্দার আড়ালের নোংরা খেলায় উদ্বিগ্ন। কারণ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখনো আস্থার সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি।
দেশে এখনও বিপুল অবৈধ অস্ত্র ছড়িয়ে আছে—যা উদ্ধার না হলে নির্বাচনের আগে–পরে সহিংসতা বাড়তে পারে। ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়া সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। একইসঙ্গে সুশাসন, অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও এই নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এই বাস্তবতায় রাজনৈতিক দলগুলোর সহনশীল আচরণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। মুসলিম মনীষীদের বাণী—‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব’—রাজনীতিকদের মনে রাখা প্রয়োজন।
গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার সমাধানসূত্র মানা না হলে দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নাজুক হতে পারে। ব্যর্থ রাষ্ট্রের দিকে যাত্রা রোধ করতে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনই একমাত্র পথ।
ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দিতে হবে নির্বাচন বানচালে সক্রিয় অপশক্তির কারসাজিকে। তবেই দেশে টেকসই গণতন্ত্রের সূর্য উঠবে—কুয়াশা সরিয়ে উজ্জ্বল রোদ্দুর উঁকি দেবে। আলোয় ভরা বাংলাদেশে সাধারণ মানুষ হাসবে, বিজয়ী হবে একাত্তর ও চব্বিশের চেতনাসম্পন্ন বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
১১ দলীয় জোট আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কোনো মিছিল বা কর্মসূচি পালন করে না—বিএনপির এমন অভিযোগ সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) রাতে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে এনসিপির মিছিল শেষে রাজধানীর নেভিগলিতে দাঁড়িয়ে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি একথা বলেন। তিনি বলেন, সংস্কার ও বিচারের প্রধান তিনটি দাবি সরকার মেনে নিলে ঢাকা শহরে আর কোনো ধরনের ককটেল বিস্ফোরণ ঘটবে না। বিএনপির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী জানান, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে রাজপথে তাদের কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে এবং গতকালও দুটি মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা তো বলছি আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশে বাদ দিতে হলে সংস্কার দরকার। ১১ দলীয় জোট শুরু থেকেই এই অবস্থান নিয়ে কথা বলে আসছে।’ আন্দোলনের মূল ইস্যুগুলো তুলে ধরে এনসিপির এই মুখ্য সংগঠক আরও বলেন, ‘গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও জুলাইয়ের ঘটনার বিচারসহ নির্দিষ্ট তিনটি দাবিতে আমরা রাজপথে আছি। কিন্তু সরকার এই দাবিগুলো মানছে না। সরকার আমাদের দাবিগুলো মেনে নিলে ঢাকা শহরে আর ককটেল ফুটবে না।’ বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি মূলত বোঝাতে চেয়েছেন, তাদের তোলা দাবিগুলো বাস্তবায়িত হলে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হবে। আর দলটি নিষিদ্ধ হলে তাদের নেতাকর্মীরাও ঢাকা শহরে নাশকতা বা ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানোর কোনো সুযোগ পাবে না।
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘সারাদেশে এখন জনমনে আতঙ্ক যে, বাংলাদেশের মানুষের জননিরাপত্তা নেই। শিশুদের নিরাপত্তা নেই।’ শনিবার (১৯ জুলাই) রাতে রংপুর জেলা স্কুল মাঠে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-রংপুর লং মার্চের সমাপনী সমাবেশে এসব কথা বলেন তিনি। নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘সারাদেশে এখন জনমনে আতঙ্ক যে, বাংলাদেশের মানুষের জননিরাপত্তা নেই। শিশুদের নিরাপত্তা নেই।’ আমাদের মা-বোনদের নিরাপত্তা নেই। কেন এই নিরাপত্তা নেই? কেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যর্থ হচ্ছেন? তিনি তার জবাবদিহিতা সংসদে দিচ্ছেন না।’ জবাবদিহি চাওয়া হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠেন’ এবং বিভিন্নভাবে হুমকি দেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তার দাবি, ‘গুম আইন’ করে গুমের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। বিরোধী দল দমনে পুলিশকে আবারও ব্যবহারের চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘এই চেষ্টা ব্যর্থ হবে। কারণ বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা আর কাউকেই স্বৈরাচারী হতে দেবে না।’ কেউ স্বৈরাচারী হওয়ার চেষ্টা করলে রংপুরের মাটি থেকেই ‘প্রথম বিদ্রোহ, প্রথম বিপ্লবের আহ্বান’ আসবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি। জুলাই গণহত্যার একটি মামলার রায় ঘোষণার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘রায় তাদের জন্যই আসে, মৃত্যুদণ্ড তাদের জন্যই আসে যারা দেশে নেই। যারা দেশে অবস্থান করছে, তাদের মৃত্যুদণ্ডের রায় কেন আসে না? আমরা তাদের মৃত্যুদণ্ডের রায় দেখতে চাই। রায় কার্যকর দেখতে চাই।’ দেশজুড়ে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ‘সারা দেশে নজিরবিহীন দলীয়করণ হয়েছে। সকল প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ করা হচ্ছে। চাঁদাবাজি, দখলদারিত্বসহ সন্ত্রাসের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশের ক্যাম্পাস ও বিভিন্ন এলাকা।’ তিনি বলেন, এসব পরিস্থিতি থেকে দেশকে মুক্ত করতে আমরা আট দফা দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছি। ২০২৪ সালের মতো জনগণ ঐক্যবদ্ধ থাকলে আট দফা দাবি আদায় করেই ঘরে ফিরবেন বলেও প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। দেশের বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সার সংকটের কথাও তুলে ধরেন তিনি। রংপুরের কৃষিনির্ভর মানুষের দুর্ভোগের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘এই রংপুর অঞ্চলের মানুষ বেশিরভাগ কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। আজকে তারা সার, গ্যাস, বিদ্যুৎ পাচ্ছে না।’ ১১ দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, বিভিন্ন জায়গায় জোটের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করা হচ্ছে। সিরাজগঞ্জে একজন নেতাকর্মীকে হামলা করে আহত করার খবর পেয়েছেন বলেও জানান তিনি। ঘটনাটি সত্য হলে রাজপথে এর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, ‘এগারো দলের জোটের নেতাকর্মীদের কারো গায়ে যদি হাত তোলা হয়, পাল্টা আঘাতের জন্য আমরা প্রস্তুত আছি। সরকারকেও প্রস্তুত থাকতে হবে।’ রংপুরবাসীর কাছে ক্ষমা চেয়ে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ‘এই রংপুরবাসীকে এখন শুনতে হচ্ছে যে, বিরোধী দলে ভোট দেওয়ার কারণে রংপুরবাসী কোনো উন্নয়নের বরাদ্দ পাবে না।’ রংপুরের মানুষের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্য ও অবহেলা করা হচ্ছে দাবি করে তিনি বলেন, উত্তরবঙ্গের মানুষের জন্য তাদের আট দফার একটি দাবি বিশেষভাবে রাখা হয়েছে। সেটি হলো তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন। তিনি বলেন, ‘এটা শুধু কথার কথা নয়, এটা শুধু দাবির দাবি নয়। আমরা সত্যিকার অর্থে বাস্তবায়ন দেখতে চাই। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।’ সরকারের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার অভিযোগ, বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিত করতে সরকার সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা কেন বাস্তবায়ন হচ্ছে না? কেন দিল্লির সঙ্গে তারা নেগোশিয়েট করতে পারছে না? কেন ভূ-রাজনীতিতে তারা বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ আদায় করতে পারছে না?’ তিনি বলেন, এসব ঘটনা থেকেই তারা মনে করেন, সরকার বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ নয়, বরং নিজেদের দলীয় স্বার্থ আদায়ের জন্য ক্ষমতায় গেছে। গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে এ লংমার্চের আয়োজন করে ১১-দলীয় ঐক্য। আয়োজকদের পক্ষ থেকে এটিকে জোটের দ্বিতীয় বড় লংমার্চ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা–চট্টগ্রাম লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়। লংমার্চের বহর রংপুরের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে সকাল ৭টায় রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে উদ্বোধনী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। পরে সকাল ৮টার দিকে বহরটি রওনা হয়। পথে গাজীপুরের ভোগরা বাইপাস, টাঙ্গাইলের নগর জালপাই, সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল, বগুড়ার মাটিডালি বিমান মোড় ও গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া কয়েকটি স্থানে অনানুষ্ঠানিকভাবে পথসভা শেষে সন্ধ্যায় রংপুর জিলা স্কুল মাঠে সমাপনী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। জামায়াতের নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলামের সভাপতিত্বে সমাবেশে বিরোধীদলীয় নেতা ও দলের আমির ডা শফিকুর রহমান, এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ, জামায়াতের নায়েবে আমির মুজিবুর রহমান, সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান (ইরান), লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রেসিডিয়াম সদস্য ওমর ফারুক, এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন প্রমুখ বক্তব্য দেন। এ ছাড়া এনসিপির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমির আবদুল কাইয়ুম সুবহানী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দিন আহমদ, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম এবং ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি সিবগাতুল্লাহ সিবগাসহ ১১ দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা বক্তব্য দেন।
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১১–দলীয় ঐক্যের লংমার্চসহ ধারাবাহিক কর্মসূচির ওপর নজর রাখছে বিএনপি। পাশাপাশি বিরোধী দলের এমন কর্মসূচির রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ক্ষমতাসীন দলটির নেতারা। বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা প্রথম আলোকে বলেন, সংসদে ও রাজনৈতিক বক্তব্যে জবাব দিলেও তাঁরা বিরোধী দলের এসব কর্মসূচিকে এখনই বড় কোনো রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করছেন না। পাল্টা কোনো কর্মসূচির কথাও ভাবছেন না। বিএনপির নেতাদের ভাষ্য, সরকারে থেকে বিরোধীদের কর্মসূচির পাল্টা কর্মসূচি দেওয়ার চেয়ে সংশ্লিষ্ট সমস্যার সমাধানে পদক্ষেপ নেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সরকার সেদিকেই মনোযোগ দিচ্ছে। তবে দলের নেতাদের একটি অংশ মনে করেন, জনসম্পৃক্ত ইস্যুতে বিরোধীরা ধারাবাহিকভাবে মাঠে থাকলে তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। জ্বালানি, বিদ্যুৎ–সংকটসহ বিভিন্ন ইস্যুতে জামায়াতের নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলো মাঠের কর্মসূচি পালন করছে। লংমার্চসহ এসব কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারকে চাপে রাখার চেষ্টা করছে তারা। বিপরীতে বিএনপির কোনো পাল্টা কর্মসূচি নেই। এ অবস্থায় বিরোধীদের তৎপরতাকে ক্ষমতাসীন দল কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে, সেই প্রশ্নও রাজনৈতিক মহলে উঠেছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা বিরোধী দলের লংমার্চ কর্মসূচিকে গণতান্ত্রিক চর্চার একটা অংশ হিসেবে দেখছি। রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করার অধিকার সবার আছে। আমরা এটাকে সেভাবেই দেখছি, এর বেশি কিছু না।’ তবে বিএনপির এই অবস্থানকে ভিন্নভাবে দেখছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিরোধী দলের কর্মসূচিকে গুরুত্ব না দিলে কি সংসদে প্রতিক্রিয়া দেয়? আমরা মনে করি, সরকারি দলের পাল্টা কর্মসূচি দেওয়ার ক্যাপাসিটি নেই, বিএনপির আগের সেই নৈতিক অবস্থানও নেই।’ জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ–সংকটের সমাধান, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের চেতনা ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন দাবিতে জামায়াতের নেতৃত্বে ১১–দলীয় জোট ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত লংমার্চ করে। আজ জোটের রংপুর অভিমুখে লংমার্চ। পর্যায়ক্রমে খুলনা ও সিলেটসহ অন্যান্য বিভাগীয় শহর অভিমুখেও একই কর্মসূচি করার ঘোষণা রয়েছে জোটের। এর আগে প্রথম দফা লংমার্চের বিভিন্ন পথসভা থেকে সরকারকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিরোধী দলের নেতারা। একাধিক পথসভায় জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, দেশে বিদ্যুৎ নেই, গ্যাস নেই, জ্বালানি তেল নেই। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। চারদিকে নাই আর নাই শব্দ। ফেনীর মহিপালের পথসভায় সরকারকে আরও সরাসরি আক্রমণ করে তিনি বলেন, এ সরকার জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা শুরু করেছে। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কারও চোখ রাঙানি সহ্য করব না। আমরা যেখানে বাধা পাব, সেখানে প্রতিরোধ গড়ে তুলব।’ বিরোধীদের এসব বক্তব্য ও কর্মসূচির প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি এখন পর্যন্ত সংসদ ও রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যেই সীমিত থাকছে। প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানও লংমার্চের উদ্দেশ্য ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। জ্বালানিসংকটের সমাধানে লংমার্চ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেন, ‘আমরা দেখলাম, একটি বিশাল গাড়ির লংমার্চ আয়োজন করা হয়েছিল। বাইরে বিভিন্ন মানুষ একটি কথা বলে যে জনগণকে অযথা উত্তেজিত করে অন্য কিছু করার অপচেষ্টা করা হয়েছিল কি না? গাড়ির লংমার্চ করে যদি গ্যাস বা বিদ্যুতের সমস্যার সমাধান করাই যেত, তাহলে আমরাই সবচেয়ে আগে লংমার্চের আয়োজন করতাম।’ সরকারি দলের অন্য নেতারাও বিরোধীদের লংমার্চের সমালোচনা করেছেন। তাঁদের বক্তব্যে মূলত এই কর্মসূচির যৌক্তিকতা, জ্বালানিসংকটের বাস্তবতা এবং সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের বিষয়গুলো সামনে আসছে। পাল্টা কর্মসূচির প্রয়োজন দেখছে না বিএনপি বিএনপির উচ্চপর্যায়ের নেতারা বলছেন, বিরোধী দলগুলোর ধারাবাহিক কর্মসূচির কারণে এখনই এমন কোনো রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে তাঁরা মনে করছেন না, যার জন্য দলকে পাল্টা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামতে হবে। বিরোধীদের কর্মসূচি নজরে রাখলেও রাজপথে একই ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে জবাব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তাঁরা অনুভব করছেন না। দলটির নেতাদের মতে, কর্মসূচি পালন বিরোধী দলের রাজনৈতিক অধিকার। তবে কোনো কর্মসূচির মাধ্যমে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হলে বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে সরকার সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। ফলে আপাতত সরকারি কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে বিরোধীদের মোকাবিলার কৌশলেই থাকছে বিএনপি। বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের বক্তব্য ও সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করে রাজনৈতিক কর্মীদের অনেকে মনে করছেন, বিরোধীদের কর্মসূচিকে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে না ক্ষমতাসীন দল। দলটির নেতাদের একটি অংশেরও বক্তব্য, ক্ষমতায় আসার পর বিএনপির রাজনৈতিক অগ্রাধিকার বদলেছে। প্রায় দুই দশক বিরোধী রাজনীতিতে থাকার সময় রাজপথের আন্দোলন ছিল দলের প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ার। এখন সরকার পরিচালনাই প্রধান দায়িত্ব। তাই বিরোধীদের কর্মসূচির জবাবে একই ধরনের কর্মসূচিতে যাওয়ার তাগিদ নেই। তবে দলের ভেতরেই কেউ কেউ মনে করেন, জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও দ্রব্যমূল্যের মতো জনসম্পৃক্ত ইস্যুতে বিরোধীরা নিয়মিত কর্মসূচি দিতে থাকলে সরকারের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা জনগণের কাছে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার প্রয়োজন হতে পারে। সাংগঠনিক তৎপরতা নিয়েও আলোচনা বিরোধী দলগুলো যখন ধারাবাহিক কর্মসূচিতে মাঠে রয়েছে, তখন বিএনপির সাংগঠনিক তৎপরতা অনেকটাই সীমিত। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আলোচনা থাকলেও মাঠপর্যায়ে দলীয় প্রস্তুতির বড় কোনো কর্মসূচি এখনো দৃশ্যমান নয়। সম্ভাব্য প্রার্থীদের কেউ কেউ নিজেদের উদ্যোগে এলাকায় সক্রিয় আছেন। তবে কেন্দ্রীয়ভাবে দলীয় কর্মসূচির মাধ্যমে মাঠ গোছানোর তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। ক্ষমতায় আসার পর দলীয় সংগঠন কতটা সক্রিয় রয়েছে, সেই প্রশ্নও বিএনপির সামনে আসছে। দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের বড় অংশ ব্যস্ত মন্ত্রিসভা, সংসদ ও প্রশাসনিক কাজে। সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিকভাবে বিএনপি কতটা সক্রিয় হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিরোধী দলগুলো নিয়মিত কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক উপস্থিতি জানান দেওয়ায় ক্ষমতাসীন দলের সাংগঠনিক তৎপরতার বিষয়টিও আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে।