ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে ইন্টারপোল নোটিশ জারির প্রক্রিয়া চলছে। তাঁরা দুজনই মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি।
পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) তাঁদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়ার পর ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারির জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুতের কাজ চলছে। গত বছরের ‘ছাত্র–জনতার জুলাই অভ্যুত্থান’ চলাকালে নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড ও দমন-পীড়নের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে আইসিটি গত ১৭ নভেম্বর শেখ হাসিনা ও কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেন।
নোটিশ জারি হলে দুইজনকে দেশে ফেরত আনার আইনি প্রক্রিয়া আরও দ্রুত এগোবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংঘটিত এজাহারভুক্ত হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ও মিরাজ হোসেন পলাতক রয়েছেন। ব্যাংক প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খুনের শিকার কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুল হালিম ছিলেন কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেনের নাম রয়েছে। তারা বর্তমানে নিজেদের সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। ব্যাংক সূত্রে গেছে, তারা চাঁদাবাজি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এসব আসামিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেন। এতে আরও যুক্ত রয়েছেন ডিজিএম সৈয়দ লিয়াকত হোসেন, হাবিব উন নবী, ডিএমডি খালেকুজ্জামান জুয়েল ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে আব্দুল হালিমের মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক সজীব কুমার সিং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জানান, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাত ১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান। হালিমের ছেলে ফয়সাল বলেন, তার বাবা ২০১৪ সাল থেকে কৃষি ব্যাংক সিবিএর সভাপতি ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গত নভেম্বরেই মতিঝিল থানায় একটি জিডি (নং ০৫/১১/২০২৪ - ৩৩৫) করেছিলেন তার বাবা। তিনি আরও বলেন, বুধবার রাতে আমার বাবাকে তার অফিসের সহকর্মীরা মারধর করে হত্যা করেছে। সিবিএর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জানান, ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হই। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট বিনা নির্বাচনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে আমাদের অফিস দখল করে নেয় ফয়েজ ও মিরাজ। এ নিয়ে মামলা চলছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা অস্থায়ী জামিনে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন—যাদের মধ্যে আছেন ড্রাইভার সাইফুল, শাহেদ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মেহেদী ও অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনার সিরাজ। এদিকে, মামলার ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের প্রধান মহাব্যবস্থাপক জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। কারণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য না করার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
হঠাৎ করে গত কয়েক দিন ধরে ভারত থেকে ৪২৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ায় দেশে বিদ্যুৎ পরিস্থিতিতে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে আদানি গ্রুপের ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট মেরামতের জন্য বন্ধ রয়েছে। এর ওপর অর্থসংকটে পর্যাপ্ত ফার্নেস অয়েল মজুত না থাকায় সামগ্রিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ফলে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে কাটছাঁটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে সারা দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহে। শীতকাল হওয়া সত্ত্বেও বৃহস্পতিবার সারা দেশে সান্ধ্যকালীন পিক আওয়ারে ২০০ থেকে ৩০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হয়েছে। তবে বিশেষ বিবেচনায় রাজধানী ঢাকাকে লোডশেডিংয়ের বাইরে রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আদানি গ্রুপের ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৮০০ মেগাওয়াটের প্রথম ইউনিটটি বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য গত ১৬ জানুয়ারি থেকে বন্ধ রয়েছে। একই সময়ে ভারত থেকে বেসরকারিভাবে আমদানিকৃত ৯০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের সরবরাহ গত চার দিন ধরে কমিয়ে মাত্র ৪৭৩ মেগাওয়াটে নামিয়ে আনা হয়েছে। এতে করে হঠাৎ করেই বিদ্যুৎ সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। এ বিষয়ে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সদস্য (উৎপাদন) মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, “যান্ত্রিক সমস্যার কারণে ভারত মাঝেমধ্যে বিদ্যুৎ রপ্তানি কমিয়ে দেয়। বর্তমানে সম্ভবত সে কারণেই সরবরাহ হ্রাস পেয়েছে।” অন্যদিকে বিদ্যুৎ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, ভারত কেন বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়েছে সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন। বিষয়টি খোঁজ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। বর্তমানে মাঘ মাস চললেও বিদ্যুৎ সরবরাহ বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছে পিডিবি। সান্ধ্যকালীন পিক আওয়ারে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১১ হাজার ৯০০ মেগাওয়াট হলেও সর্বোচ্চ সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে ১১ হাজার থেকে ১১ হাজার ৬০০–১১ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট। এতে করে আসন্ন গ্রীষ্ম মৌসুমে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এবার গরমে বিদ্যুতের চাহিদা ১৭ থেকে ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে। সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের সবচেয়ে সস্তা বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে। দেশে থাকা ৫০টি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে মোট ১২ হাজার ৯২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও পেট্রোবাংলা প্রয়োজনের অর্ধেক গ্যাসও সরবরাহ করতে পারছে না। ফলে উৎপাদন সীমিত হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াটে। এর মধ্যেই মঙ্গলবার চট্টগ্রামের মদুনাঘাট–করেরহাট গ্রিড লাইনে ট্রিপের ঘটনা ঘটে। এতে এস আলম গ্রুপের কয়লাভিত্তিক ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এসএস পাওয়ার প্ল্যান্টের একটি ৬৬০ মেগাওয়াট ইউনিট বন্ধ হয়ে যায়। এসএস পাওয়ারের চিফ ফিন্যান্সিয়াল অফিসার মোহাম্মদ এমদাদ হোসেন জানান, বুধবার রাতে ইউনিটটি পুনরায় চালু করা হয়েছে এবং বৃহস্পতিবার থেকে প্রায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। পিডিবি জানায়, ইউনিটটি চালু হওয়ায় বৃহস্পতিবার থেকে লোডশেডিং কিছুটা কমেছে। সরকারি কর্মকর্তারা জানান, সাধারণত শীতকালে সান্ধ্যকালীন পিক আওয়ারে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। কিন্তু সংকট মোকাবিলায় সোমবার থেকে বুধবার পর্যন্ত তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়েছে। তবে এসএস পাওয়ারের ইউনিট চালু হওয়ায় বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টায় তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৮৫ মেগাওয়াটে। পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, তেলের মজুতও সীমিত। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ অত্যন্ত বেশি। প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় হয় ২২ থেকে ২৪ টাকা, অথচ পিডিবি তা বিক্রি করে মাত্র ৬ টাকা ৬৫ পয়সায়। ফলে তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ালে সরকারের লোকসান বাড়ে। গত অর্থবছরে পিডিবি বিদ্যুৎ কিনে মোট ৫৫ হাজার কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। সরকার ভর্তুকি দিয়েছে ৩৮ হাজার কোটি টাকা, বাকি ১৭ হাজার কোটি টাকার দায় থেকে গেছে পিডিবির ওপর। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, এই সময় তেলভিত্তিক কেন্দ্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাড়ালে গ্রীষ্ম মৌসুমে ব্যাপক লোডশেডিং দেখা দিতে পারে। কারণ তখন বাড়তি ভর্তুকি বা অর্থ বরাদ্দ পাওয়া অনিশ্চিত। এদিকে ভারতের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ট্রান্সফরমারে সমস্যার কারণে গত তিন দিন ধরে ভেড়ামারা দিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমানো হয়েছে। ভারতীয় সরকারি ও বেসরকারি তিনটি প্রতিষ্ঠান এই পথে মোট ৯০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করে থাকে। বর্তমানে সেখানে আসছে মাত্র ৪৭৩ মেগাওয়াট। সংশ্লিষ্টরা জানান, সেমকন কোম্পানির একটি কেন্দ্রে ট্রান্সফরমার সমস্যার কারণে ৪২০ মেগাওয়াট সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। ২৬ জানুয়ারির পর সমস্যা সমাধান হলে পূর্ণমাত্রায় সরবরাহ স্বাভাবিক হবে। উল্লেখ্য, ভেড়ামারা দিয়ে আমদানিকৃত বিদ্যুতের গড় মূল্য প্রতি ইউনিট প্রায় সাড়ে ৮ টাকা। এ ছাড়া ত্রিপুরা হয়ে আরও ১১৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হচ্ছে, যা বর্তমানে স্বাভাবিক রয়েছে। সব মিলিয়ে ভারত থেকে সরকার প্রায় ২ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করে থাকে। পূর্বঘোষণা অনুযায়ী আদানি গ্রুপের ৮০০ মেগাওয়াটের ইউনিটটি আগামী মাসের ৯ তারিখে পুনরায় চালু হওয়ার কথা রয়েছে। সেটি সময়মতো চালু হলে এবং ভারত থেকে পূর্ণ সরবরাহ স্বাভাবিক হলে বর্তমান বিদ্যুৎ সংকট অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট দিতে দেশবাসীকে ভোরবেলায় কেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ‘জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা দরকার, জনগণের সরকারই কেবল মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে। অনেকেই বলে, ফজরের নামাজ পড়ে ভোটের লাইনে দাঁড়াতে হবে। আমি বলব— এবার তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে। ভোটকেন্দ্রের সামনে গিয়ে জামায়াতে ফজরের নামাজ পড়ে তারপর ৭টায় গিয়ে ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিতে হবে। মনে রাখতে হবে— এবারের ভোট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হবিগঞ্জ জেলার শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলা পরিষদ মাঠে নির্বাচনী সমাবেশে ভোটারদের প্রতি এ আহ্বান জানান তারেক রহমান। মাগরিবের নামাজের পূর্বক্ষণে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের গাড়িবহর শায়েস্তাগঞ্জ পৌঁছায়। তারেক রহমান মঞ্চে উঠে জামায়াতে মাগবিরের নামাজ আদায় করেন। বিএনপি চেয়ারম্যান প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘এ দেশটা কার? এই দেশ জনগণের। কারো ব্যক্তি সম্পত্তি নয়। এই সমাবেশে আমার সামনে যে হাজার হাজার মানুষ বসে আছেন, আপনারাই এ দেশের মালিক। কাজেই আপনাদেরকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে— আপনারা কীভাবে দেশ পরিচালনা করতে চান এবং ভোটের মাধ্যমে সেই সিদ্ধান্ত আপনাদেরকে দিতে হবে।’ একটি দলের লোকজন বাড়ি বাড়ি গিয়ে এনআইডি নম্বর নিচ্ছে, মা-বোনদের মোবাইল নম্বর নিচ্ছে অভিযোগ করে তারেক রহমান বলেন, ‘তারা নাকি সৎ মানুষের শাসন কায়েম করবে? বিকাশ নম্বর নিচ্ছে, ফোন নম্বর নিচ্ছে, টাকা পাঠাচ্ছে, অনেকে ধরাও পড়েছে। নির্বাচনের আগে যারা মানুষকে অর্থ প্রদান করে, আগেই যারা অসৎ কাজ করে, কোনোভাবেই তাদের পক্ষে সৎ কাজ করা সম্ভব নয়। এ দেশে একমাত্র শহীদ জিয়া ও বেগম খালেদা জিয়া দেখিয়েছেন কীভাবে দুর্নীতি দমন করতে হয়।’ তিনি বলেন, ‘সেজন্যই বললাম, যারা এখনই মানুষকে বিকাশে টাকা পাঠায়, ভোট কিনতে চায়, নির্বাচনের আগেই যারা অসৎ কাজ করে, তারা কীভাবে সৎ মানুষের শাসন কায়েম করবে? যদি সৎ মানুষের শাসন কায়েম করতে হয়, তাহলে একমাত্র আল্লাহর রহমতে বিএনপির পক্ষেই করা সম্ভব। এই দেশে একমাত্র ধানের শীষ বা বিএনপিই মানুষের কথা চিন্তা করে।’ সবাইকে সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘এরই ভেতরে কিন্তু ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। বর্তমান সরকার প্রবাসীদের ভোটের ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু, একটি রাজনৈতিক দল সবগুলো পোস্টাল ব্যালট দখলের চেষ্টা করছে। সজাগ থাকতে হবে। আগে যেভাবে ভোট ডাকাতি হয়েছে, এখন তারা ভোট দখলের চেষ্টা করছে, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চেষ্টা করছে। শুধু সজাগ না, সতর্ক থাকতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘একই সাথে একটি রাজনৈতিক দল অনেক সময় বলছে অমুককে দেখেছেন, তমুককে দেখেছেন, এবার আমাদের দেখেন। ৭১ সালে লাখো মানুষের প্রাণের বিনিময়ে এই দেশ স্বাধীন হয়েছিল। সেদিন ওই রাজনৈতিক দল কাদের পক্ষ নিয়েছিল? যারা এই দেশকে স্বাধীন হতে দিতে চায়নি। এ কারণে এ দেশের বহু মানুষ প্রাণ দিয়েছে, বহু নারী ইজ্জত হারিয়েছেন। নতুন করে তাদের দেখার কিছু নেই। একমাত্র রাস্তা হলো জনগণের শাসন কায়েম করা, যারা এই দেশের মানুষের কাছে জবাব দিতে বাধ্য থাকবে।’ হবিগঞ্জের এই সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বিএনপির স্থানীয় সরকার বিষয়ক সম্পাদক শাম্মী আখতার। এসময় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এর আগে দুপুরে সিলেট ও সুনামগঞ্জে নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য রাখেন তারেক রহমান। পরে মৌলভীবাজারের শেরপুরে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়ে তিনি শায়েস্তাগঞ্জে পৌঁছান। দিনভর মাঠের উত্তর পাশে তৈরি করা অস্থায়ী রাস্তা দিয়ে জেলার ৯টি উপজেলা, ছয়টি পৌরসভা ও ৭৮টি ইউনিয়ন থেকে মিছিল নিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীরা উপজেলা পরিষদ মাঠে প্রবেশ করেন। তাদের মাথায় তারেক রহমানের ছবি সম্বলিত ক্যাপ, হাতে দলীয় পতাকা ও রঙিন ফেস্টুন দেখা যায়। হাজারো নেতাকর্মী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতিতে শায়েস্তাগঞ্জের মাঠটি কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। মাঠের চারপাশে পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, ফায়ার সার্ভিস ও আনসার সদস্যরা নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেন। পাশাপাশি গণঅভ্যুত্থানে শহীদ, আহত ও গুম হওয়া পরিবারের সদস্যদের জন্য মঞ্চের দক্ষিণ পাশে আলাদা একটি মঞ্চ প্রস্তুত করা হয়।
চলতি অর্থবছরের নভেম্বর পর্যন্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার কোটি টাকা। ডিসেম্বর পর্যন্ত ঘাটতি আরও বেড়ে ৪৬ হাজার কোটি টাকা হয়েছে। প্রস্তাবিত নতুন বেতনকাঠামোয় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন হবে সর্বনিম্ন ২০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এক্ষেত্রে বর্তমান কাঠামোর চেয়ে ১০০ থেকে ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বেতন-ভাতা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। অর্থাৎ কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিদ্যমান বেতন-ভাতার চেয়ে দ্বিগুণের বেশি বাড়বে। আর এ সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারকে অতিরিক্ত ব্যয় করতে হবে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। তবে বেতনের ধাপ শেষ পর্যন্ত ২০টিই থাকছে। বুধবার (২১ জানুয়ারি) অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে বেতন কমিশনের জমা দেওয়া প্রতিবেদনে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২৩ সদস্যের বেতন কমিশন এই সুপারিশ করেছে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বুধবার এই প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী ও অর্থ সচিব খায়রুজ্জামান মজুমদারসহ কমিশনের সদস্যরা। সরকার পে-কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে বেতন-ভাতা বৃদ্ধির পরিমাণ চূড়ান্ত করতে একটি কমিটি গঠন করবে। এরপর ওই প্রস্তাব নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদে আলোচনা শেষে চূড়ান্ত পে-স্কেল অনুমোদন করা হবে। তবে জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন সপ্তাহ আগে বিষয়টির সুরাহা হচ্ছে না। অন্তর্বর্তী সরকার হয়তো পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে যেতে পারবে। কিন্তু সবকিছু চূড়ান্ত হবে পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের মেয়াদে। কার্যত সরকারি কর্মচারীদের বিশাল ব্যয় বৃদ্ধির চাপ পড়বে নির্বাচিত সরকারের ওপর। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, বেতন কমিশন ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। এটি অত্যন্ত অযৌক্তিক এবং অস্বাভাবিক। বেতন বৃদ্ধির এ সুপারিশ অত্যন্ত বেশি। এর আগে কোনো কমিশন এই হারে বেতন বাড়ানোর সুপারিশ করেনি। এই সুপারিশ আর্থিক শৃঙ্খলা নষ্ট করবে। তিনি বলেন, এই পরিমাণ ব্যয়ের ভার বহন করার সক্ষমতা দেশের অর্থনীতির নেই। এর ফলে পরবর্তী সরকারের ওপর চাপ তৈরি হবে। বেসরকারি খাতেও চাপ বাড়বে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে দেশের অর্থনীতি এক দুষ্টচক্রের মধ্যে রয়েছে। কারণ রাজস্ব বাজেটের ৭০ শতাংশ চলে যায় বেতন-ভাতায়। ২৫ শতাংশ যায় ঋণের সুদ পরিশোধে। এ অবস্থায় বেতন কমিশনের এই সুপারিশ বাস্তবায়ন হলে এর পরিমাণ আরও বাড়বে। এ কারণে সুপারিশ বাস্তবায়ন আরও বিলম্ব করা উচিত। তার মতে, সরকারি চাকরিজীবীদের আকার আরও ছোট করতে হবে। কারণ দেশে এতগুলো মন্ত্রণালয় দরকার নেই। মন্ত্রণালয়গুলো দিয়ে শুধু ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে। বেতন বাড়ানোর আগে অবশ্যই এই বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। পে-কমিশনের সুপারিশ করা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সরকারি চাকরিজীবীরা আগের মতো ২০টি স্কেলেই বেতন পাবেন। সর্বনিম্ন বেতন স্কেল (মূল বেতন) ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন স্কেল ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। কমিশনপ্রধান জাকির আহমেদ খান বলেন, প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করতে হলে অতিরিক্ত এক লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। বর্তমানে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের ব্যয় হচ্ছে এক লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের জন্য স্বাস্থ্যবিমা প্রবর্তন, পেনশন ব্যবস্থার সংস্কার, সরকারি কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড পুনর্গঠন, সার্ভিস কমিশন গঠন, বেতন গ্রেড ও স্কেলের যৌক্তিক পুনর্বিন্যাস, সরকারি দপ্তরগুলোয় ভাতাসমূহ পর্যালোচনার জন্য কমিটি গঠন এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে মানবসম্পদ উন্নয়নের সুপারিশ করা হয়েছে। চলতি ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আংশিক বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। এটি পুরো মাত্রায় কার্যকর হবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দিন অর্থাৎ আগামী ১ জুলাই থেকে। এছাড়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে। ১০ম ধাপ থেকে ২০তম পর্যন্ত সরকারি চাকরিজীবীদের যাতায়াতের ভাতাও বাড়ানো হবে। পেনশনভোগীদের পেনশনের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। প্রতিবেদন গ্রহণ করে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি কমিশনের সদস্যদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন। ড. ইউনূস বলেন, ‘এটি একটি মস্ত বড় কাজ। সরকারি চাকরিজীবীরা বহুদিন ধরে এর জন্য অপেক্ষা করছে। আউটলাইন দেখে বুঝলাম, এটি খুবই সৃজনশীল কাজ হয়েছে।’ এ সময়ে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, এই প্রস্তাব বাস্তবায়নই এখন পরবর্তী কাজ। এ লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করা হবে। ওই কমিটি বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করবে। কমিশনপ্রধান সাবেক সচিব জাকির আহমেদ খান বলেন, গত এক দশকে বৈশ্বিক ও জাতীয় পর্যায়ে অর্থনীতির প্রায় সব সূচকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে নিত্যপণ্যের মূল্য বহুগুণ বেড়েছে। কিন্তু সময়োপযোগী ও যথাযথ বেতন কাঠামো নির্ধারণ না হওয়ায় সরকারি কর্মচারীদের জন্য জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে সুস্পষ্ট কার্যপরিধি নির্ধারণপূর্বক বিদ্যমান বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাদি পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষ্যে কমিশন কাজ করে। নির্ধারিত কার্যপরিধি অনুসরণ করে সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত সুপারিশ প্রণয়নের উদ্দেশ্যে কমিশন বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে অনলাইন ও অফলাইনে ১৮৪টি সভা করে এবং ২,৫৫২ জনের মতামত ও প্রস্তাব গ্রহণ করে। পাশাপাশি বিভিন্ন সমিতি ও অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা সভার আয়োজন করে ব্যাপক মতবিনিময় করা হয়। কমিশনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আর্থিক সংস্থান নির্ধারণ এবং এর বাস্তবায়নযোগ্যতা পর্যালোচনা করা। গত বছরের ২৭ জুলাই সরকার ২৩ সদস্যবিশিষ্ট নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে। কমিশনকে ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে অনলাইন জরিপের মাধ্যমে ২ লাখ ৩৬ হাজার অংশগ্রহণকারী মতামত দিয়েছেন। ২০১৩ সালে অষ্টম বেতন কমিশন গঠনের পর দীর্ঘ ১২ বছর পর এই কমিশন গঠিত হয়। কমিশনের প্রতিবেদন দাখিলের নির্ধারিত শেষ তারিখ ছিল আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি। কমিশন তাদের জন্য নির্ধারিত বাজেটের মাত্র ১৮ শতাংশ ব্যয় করে তিন সপ্তাহ আগে প্রতিবেদন দিতে সক্ষম হয়েছে। এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের (প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তাদের সংগঠন) সভাপতি ও উপসচিব আব্দুল খালেক বলেন, ‘কমিশন প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। আমরা গণমাধ্যমে দেখেছি। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন এখনো হাতে পাইনি। বৃহস্পতিবার (আজ) এই প্রতিবেদন পাব। এরপর পুরো প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে প্রতিক্রিয়া জানাব। তবে আমি অবশ্যই চাইব, কমিশন যে সুপারিশ করেছে, তা যেন চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে বাস্তবায়ন হয়।’