গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স) বছরের পর বছর অবহেলায় রুগ্ণ হয়ে আছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও গ্যাস অনুসন্ধানসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিদেশি কম্পানিগুলো যেখানে প্রতি চারটি কূপ খননে গড়ে একটিতে সাফল্য পেয়েছে, সেখানে বাপেক্স দুটিরও কম কূপ খনন করে একটি সাফল্য পেয়েছে।
সফলতার হারে এগিয়ে থাকলেও বাপেক্সের প্রতি বিগত সরকারের দীর্ঘদিনের অবহেলায় এটি রুগ্ণ সংস্থায় পরিণত হয়েছে।
দেশে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমের সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্তরা জানান, পুরোনো ও প্রয়োজনের তুলনায় কম রিগ (কূপ খননযন্ত্র) দিয়ে অনুসন্ধান কার্যক্রম চালানো হয়। বাড়ানো হয়নি বাপেক্সের জনবল। দীর্ঘ সময় এর সরকারি অর্থায়ন করা হয়নি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত বুধবার জাতীয় সংসদে জানান, ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি নতুন কূপ খননের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাসের উৎস অনুসন্ধানে ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিমি দ্বিমাত্রিক ও ৪ হাজার ২০০ বর্গকিমি ত্রিমাত্রিক সিসমিক সার্ভে পরিচালনা করা হচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার দেশের জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিতে যখন এ পদক্ষেপ নিচ্ছে তখন বাপেক্সকে আর অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই।
জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরুল ইমাম বলেন, ‘বিগত সরকারের গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম বিদেশি কোম্পানিগুলোকে দিয়ে করানোর প্রবণতা ছিল।
এ কারণে বাপেক্স কখনো উঠে দাঁড়াতে পারেনি। দেশে যে গ্যাস কূপগুলো আছে তার অনেকটিই বাপেক্স আবিষ্কার করেছে। তাই এর পৃষ্ঠপোষকতা দরকার। সরকারি অর্থায়ন দরকার।’
বাপেক্সের কর্মকর্তারা জানান, সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে বাপেক্সের নিজস্ব কোনো জাহাজ নেই।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বাপেক্সের জনবলের যে প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেট লাগবে তা-ও নেই। বিনিয়োগেও সীমাবদ্ধতা আছে। আবার কোনো প্রকল্প অনুমোদন করতে হলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বাপেক্সের কাজের গতি কমিয়ে দেয়।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাপেক্সকে রুগ্ণ রেখে বিদেশি কোম্পানি দিয়ে দেশে গ্যাস অনুসন্ধান করানো হয়। অন্তর্বর্তী সরকার বাপেক্সের আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও কোনো অগ্রগতি হয়নি।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানান, বিগত স্বৈরাচারের সময় সরকারি প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে রীতিমতো পঙ্গু করে রাখা হয়েছিল। ফলে অপর্যাপ্ত গ্যাস অনুসন্ধান বা আমদানিনির্ভরতার কারণে বর্তমানের জ্বালানিসংকট সৃষ্টি হয়।
তিনি জানান, বাপেক্সকে শক্তিশালী করতে আরো দুটি নতুন রিগ কেনার প্রক্রিয়া চলছে।
পুরোনো পাঁচ রিগ, কেনা হচ্ছে আরো দুটি : খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমানে বাপেক্সের রিগের সংখ্যা ৫। এগুলো হলো বিজয়-১০, বিজয়-১১, বিজয়-১২, বিজয়-১৮ ও আইডিএস-১। কিন্তু বাপেক্সের এ রিগুগুলোর কোনো সার্টিফিকেট নেই। রিগগুলো গড়ে ১০ থেকে ২৫ বছরের পুরোনো। বাধ্য হয়েই দেশে কূপ খননের কাজে পুরোনো রিগগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা যায়, দুটি আধুনিক অনুসন্ধান কূপ খনন রিগ কেনার প্রস্তাব এরই মধ্যে চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার হর্সপাওয়ারের একটি রিগ কেনার মূল্যায়ন প্রক্রিয়া চলছে। এর সঙ্গে ১ হাজার ৫০০ হর্সপাওয়ার ক্ষমতার আরেকটি রিগ কেনার জন্য একটি বিস্তারিত প্রকল্প প্রস্তাব প্রস্তুত করা হচ্ছে। এটি চূড়ান্ত হওয়ার পর অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে।
কম বেতন, মেধাবীদের আগ্রহ কম : যেখানে ভারতের ওএনজিসির কর্মীদের বেতন জাতীয় স্কেলের দ্বিগুণ, সেখানে বাংলাদেশের জাতীয় বেতন স্কেলের চেয়ে কম বেতন পান বাপেক্স কর্মীরা। স্বাভাবিক কারণে বাপেক্সে মেধাবীদের কাজের আগ্রহ কম। তারা বহুজাতিক তেল-গ্যাস কম্পানিতে উচ্চবেতনে চাকরি করার জন্য চলে যান।
প্রয়োজন দক্ষ জনবল : বিশেষজ্ঞদের মতে বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়াতে সংস্থাটিকে রিগ কিনে দেওয়ার কথা সব সময় আগে আসে। নতুন যে রিগ কেনার প্রক্রিয়া চলছে তার জন্য যে জনবল প্রয়োজন তা নেই। সক্ষমতা অর্জনের জন্য আগে দক্ষ জনবল তৈরি করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বাপেক্সের জনবলের যে প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেট তা এ সংস্থার নেই। বাপেক্স যে ফিল্ডগুলো চালাচ্ছে, সেখানে সক্ষম টিম গঠন করতে হবে।
দেশের গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িতরা জানান, বাপেক্সের পাঁচটি রিগের মধ্যে দুটি ওয়ার্কওভার কাজের জন্য আর তিনটি ড্রিলিং রিগ। এ রিগগুলো চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল সংস্থায় নেই। অথচ ড্রিলিং সাইটে ২৪ ঘণ্টাই জনবল লাগে। বিদেশি কম্পানিগুলো বছরে সাত থেকে আটটি কূপ খনন করে। আর বাপেক্স দক্ষ জনবলের অভাবে বছরে মাত্র একটি কূপ খনন করে।
প্রয়োজন আধুনিক সফটওয়্যার ও প্রযুক্তি : বাপেক্সের জিওলজিক্যাল ও জিওফিজিক্যাল বিভাগের অনুসন্ধান কার্যক্রম আরো আন্তর্জাতিক মানের করতে নতুন সফটওয়্যার ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। বাপেক্সে যে থ্রিডি সিসমিক সার্ভে করা হয়, এর বিভিন্ন হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার আছে। এগুলো প্রতিনিয়ত আপডেট করতে হয়। এ ক্ষেত্রে সরকারের ক্রয়প্রক্রিয়ায় বিষয়টি বাপেক্সের জন্য ডেডিকেটেড করতে হবে। সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান করতে হলে বাপেক্সের জন্য থ্রিডি প্রযুক্তিসম্পন্ন জাহাজ প্রয়োজন। কিন্তু এ ধরনের জাহাজ বাপেক্সকে কিনে দেওয়া হচ্ছে না। বিগত সময়ে সরকার বাপেক্সকে নৌবাহিনীর জাহাজ থেকে সহায়তা নেওয়ার কথা বলেছে।
আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পিছিয়ে বাপেক্স : বাপেক্স কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খননপ্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে প্রথমেই ডিপিপি বা উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব প্রণয়ন করতে হয়। এটি বাপেক্সের বোর্ডে ওঠে। বোর্ড অনুমোদন দিলে তারপর পেট্রোবাংলার বোর্ডে যায়। সেখানে অনুমোদন দিলে মন্ত্রণালয়ে যাবে। মন্ত্রণালয় থেকে অর্থের সংস্থান করতে হবে। তারপর পরিকল্পনা কমিশনে যাবে। সেখানে বেশ কিছু বৈঠকের পর একনেকে যাবে। একনেক অনুমোদন দিলে ডিপিপি আসবে, এরপর টেন্ডার হবে এবং কূপ খনন শুরু হবে।
এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করলে বছরে একটি কূপও খনন করা সম্ভব নয়। কিন্তু বাপেক্সের জন্য যদি আলাদা অর্থ বরাদ্দ থাকে, তাহলে বছরে তিনটি করে কূপ খনন করা সম্ভব হবে। এ ক্ষেত্রে ভূমি প্রস্তুত থাকলে কূপ খনন সহজ হয়। তা না হলে ভূমি অধিগ্রহণ করতে দুই বছর লাগবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাপেক্সের খনন বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বাপেক্সে সর্বোচ্চ দুটি রিগ চালানোর মতো জনবল আছে। এখন কিছু জনবল বাড়ানো হলেও এ ধরনের টেকনিক্যাল কাজে দক্ষতা এত দ্রুত অর্জন করা সম্ভব নয়। ন্যূনতম চার-পাঁচটি কূপে কাজ করার পর নতুনদের দক্ষতা তৈরি হবে।’
তিনি বলেন, ‘নতুন সরকার আসার পর বাপেক্সের উন্নয়নে উদ্যোগ নিয়েছে। মন্ত্রণালয় পর্যায় থেকে একটি কমিটি হয়েছে জনবল নিয়োগের জন্য। তবে ছয় মাসের মধ্যেই ফল মিলবে এমন নয়, এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। এর ফল পেতে কমপক্ষে দেড়-দুই বছর লাগবে।’
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘বাপেক্সকে একটি আন্তর্জাতিক ক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হলে এর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, কারিগরি দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার দরকার আছে। তবে এর উন্নয়নের কোনো কাজই বিগত সরকারগুলো করেনি।’
তিনি বলেন, ‘দ্রুত এ সংস্থার সক্ষমতা বাড়াতে হলে বিশ্বব্যাপী মেধাবীদের খোঁজ করে উচ্চবেতনে নিয়োগ দিতে হবে। আন্তর্জাতিক কম্পানিগুলোর সঙ্গে কাজ করতে যে জ্ঞান দরকার তা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বাপেক্সের কর্মকর্তাদের শিখতে হবে।’
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স) বছরের পর বছর অবহেলায় রুগ্ণ হয়ে আছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও গ্যাস অনুসন্ধানসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিদেশি কম্পানিগুলো যেখানে প্রতি চারটি কূপ খননে গড়ে একটিতে সাফল্য পেয়েছে, সেখানে বাপেক্স দুটিরও কম কূপ খনন করে একটি সাফল্য পেয়েছে। সফলতার হারে এগিয়ে থাকলেও বাপেক্সের প্রতি বিগত সরকারের দীর্ঘদিনের অবহেলায় এটি রুগ্ণ সংস্থায় পরিণত হয়েছে। দেশে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমের সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্তরা জানান, পুরোনো ও প্রয়োজনের তুলনায় কম রিগ (কূপ খননযন্ত্র) দিয়ে অনুসন্ধান কার্যক্রম চালানো হয়। বাড়ানো হয়নি বাপেক্সের জনবল। দীর্ঘ সময় এর সরকারি অর্থায়ন করা হয়নি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত বুধবার জাতীয় সংসদে জানান, ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি নতুন কূপ খননের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাসের উৎস অনুসন্ধানে ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিমি দ্বিমাত্রিক ও ৪ হাজার ২০০ বর্গকিমি ত্রিমাত্রিক সিসমিক সার্ভে পরিচালনা করা হচ্ছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার দেশের জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিতে যখন এ পদক্ষেপ নিচ্ছে তখন বাপেক্সকে আর অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরুল ইমাম বলেন, ‘বিগত সরকারের গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম বিদেশি কোম্পানিগুলোকে দিয়ে করানোর প্রবণতা ছিল। এ কারণে বাপেক্স কখনো উঠে দাঁড়াতে পারেনি। দেশে যে গ্যাস কূপগুলো আছে তার অনেকটিই বাপেক্স আবিষ্কার করেছে। তাই এর পৃষ্ঠপোষকতা দরকার। সরকারি অর্থায়ন দরকার।’ বাপেক্সের কর্মকর্তারা জানান, সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে বাপেক্সের নিজস্ব কোনো জাহাজ নেই। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বাপেক্সের জনবলের যে প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেট লাগবে তা-ও নেই। বিনিয়োগেও সীমাবদ্ধতা আছে। আবার কোনো প্রকল্প অনুমোদন করতে হলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বাপেক্সের কাজের গতি কমিয়ে দেয়। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাপেক্সকে রুগ্ণ রেখে বিদেশি কোম্পানি দিয়ে দেশে গ্যাস অনুসন্ধান করানো হয়। অন্তর্বর্তী সরকার বাপেক্সের আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও কোনো অগ্রগতি হয়নি। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানান, বিগত স্বৈরাচারের সময় সরকারি প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে রীতিমতো পঙ্গু করে রাখা হয়েছিল। ফলে অপর্যাপ্ত গ্যাস অনুসন্ধান বা আমদানিনির্ভরতার কারণে বর্তমানের জ্বালানিসংকট সৃষ্টি হয়। তিনি জানান, বাপেক্সকে শক্তিশালী করতে আরো দুটি নতুন রিগ কেনার প্রক্রিয়া চলছে। পুরোনো পাঁচ রিগ, কেনা হচ্ছে আরো দুটি : খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমানে বাপেক্সের রিগের সংখ্যা ৫। এগুলো হলো বিজয়-১০, বিজয়-১১, বিজয়-১২, বিজয়-১৮ ও আইডিএস-১। কিন্তু বাপেক্সের এ রিগুগুলোর কোনো সার্টিফিকেট নেই। রিগগুলো গড়ে ১০ থেকে ২৫ বছরের পুরোনো। বাধ্য হয়েই দেশে কূপ খননের কাজে পুরোনো রিগগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে। পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা যায়, দুটি আধুনিক অনুসন্ধান কূপ খনন রিগ কেনার প্রস্তাব এরই মধ্যে চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার হর্সপাওয়ারের একটি রিগ কেনার মূল্যায়ন প্রক্রিয়া চলছে। এর সঙ্গে ১ হাজার ৫০০ হর্সপাওয়ার ক্ষমতার আরেকটি রিগ কেনার জন্য একটি বিস্তারিত প্রকল্প প্রস্তাব প্রস্তুত করা হচ্ছে। এটি চূড়ান্ত হওয়ার পর অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে। কম বেতন, মেধাবীদের আগ্রহ কম : যেখানে ভারতের ওএনজিসির কর্মীদের বেতন জাতীয় স্কেলের দ্বিগুণ, সেখানে বাংলাদেশের জাতীয় বেতন স্কেলের চেয়ে কম বেতন পান বাপেক্স কর্মীরা। স্বাভাবিক কারণে বাপেক্সে মেধাবীদের কাজের আগ্রহ কম। তারা বহুজাতিক তেল-গ্যাস কম্পানিতে উচ্চবেতনে চাকরি করার জন্য চলে যান। প্রয়োজন দক্ষ জনবল : বিশেষজ্ঞদের মতে বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়াতে সংস্থাটিকে রিগ কিনে দেওয়ার কথা সব সময় আগে আসে। নতুন যে রিগ কেনার প্রক্রিয়া চলছে তার জন্য যে জনবল প্রয়োজন তা নেই। সক্ষমতা অর্জনের জন্য আগে দক্ষ জনবল তৈরি করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বাপেক্সের জনবলের যে প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেট তা এ সংস্থার নেই। বাপেক্স যে ফিল্ডগুলো চালাচ্ছে, সেখানে সক্ষম টিম গঠন করতে হবে। দেশের গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িতরা জানান, বাপেক্সের পাঁচটি রিগের মধ্যে দুটি ওয়ার্কওভার কাজের জন্য আর তিনটি ড্রিলিং রিগ। এ রিগগুলো চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল সংস্থায় নেই। অথচ ড্রিলিং সাইটে ২৪ ঘণ্টাই জনবল লাগে। বিদেশি কম্পানিগুলো বছরে সাত থেকে আটটি কূপ খনন করে। আর বাপেক্স দক্ষ জনবলের অভাবে বছরে মাত্র একটি কূপ খনন করে। প্রয়োজন আধুনিক সফটওয়্যার ও প্রযুক্তি : বাপেক্সের জিওলজিক্যাল ও জিওফিজিক্যাল বিভাগের অনুসন্ধান কার্যক্রম আরো আন্তর্জাতিক মানের করতে নতুন সফটওয়্যার ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। বাপেক্সে যে থ্রিডি সিসমিক সার্ভে করা হয়, এর বিভিন্ন হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার আছে। এগুলো প্রতিনিয়ত আপডেট করতে হয়। এ ক্ষেত্রে সরকারের ক্রয়প্রক্রিয়ায় বিষয়টি বাপেক্সের জন্য ডেডিকেটেড করতে হবে। সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান করতে হলে বাপেক্সের জন্য থ্রিডি প্রযুক্তিসম্পন্ন জাহাজ প্রয়োজন। কিন্তু এ ধরনের জাহাজ বাপেক্সকে কিনে দেওয়া হচ্ছে না। বিগত সময়ে সরকার বাপেক্সকে নৌবাহিনীর জাহাজ থেকে সহায়তা নেওয়ার কথা বলেছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পিছিয়ে বাপেক্স : বাপেক্স কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খননপ্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে প্রথমেই ডিপিপি বা উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব প্রণয়ন করতে হয়। এটি বাপেক্সের বোর্ডে ওঠে। বোর্ড অনুমোদন দিলে তারপর পেট্রোবাংলার বোর্ডে যায়। সেখানে অনুমোদন দিলে মন্ত্রণালয়ে যাবে। মন্ত্রণালয় থেকে অর্থের সংস্থান করতে হবে। তারপর পরিকল্পনা কমিশনে যাবে। সেখানে বেশ কিছু বৈঠকের পর একনেকে যাবে। একনেক অনুমোদন দিলে ডিপিপি আসবে, এরপর টেন্ডার হবে এবং কূপ খনন শুরু হবে। এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করলে বছরে একটি কূপও খনন করা সম্ভব নয়। কিন্তু বাপেক্সের জন্য যদি আলাদা অর্থ বরাদ্দ থাকে, তাহলে বছরে তিনটি করে কূপ খনন করা সম্ভব হবে। এ ক্ষেত্রে ভূমি প্রস্তুত থাকলে কূপ খনন সহজ হয়। তা না হলে ভূমি অধিগ্রহণ করতে দুই বছর লাগবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাপেক্সের খনন বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বাপেক্সে সর্বোচ্চ দুটি রিগ চালানোর মতো জনবল আছে। এখন কিছু জনবল বাড়ানো হলেও এ ধরনের টেকনিক্যাল কাজে দক্ষতা এত দ্রুত অর্জন করা সম্ভব নয়। ন্যূনতম চার-পাঁচটি কূপে কাজ করার পর নতুনদের দক্ষতা তৈরি হবে।’ তিনি বলেন, ‘নতুন সরকার আসার পর বাপেক্সের উন্নয়নে উদ্যোগ নিয়েছে। মন্ত্রণালয় পর্যায় থেকে একটি কমিটি হয়েছে জনবল নিয়োগের জন্য। তবে ছয় মাসের মধ্যেই ফল মিলবে এমন নয়, এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। এর ফল পেতে কমপক্ষে দেড়-দুই বছর লাগবে।’ জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘বাপেক্সকে একটি আন্তর্জাতিক ক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হলে এর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, কারিগরি দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার দরকার আছে। তবে এর উন্নয়নের কোনো কাজই বিগত সরকারগুলো করেনি।’ তিনি বলেন, ‘দ্রুত এ সংস্থার সক্ষমতা বাড়াতে হলে বিশ্বব্যাপী মেধাবীদের খোঁজ করে উচ্চবেতনে নিয়োগ দিতে হবে। আন্তর্জাতিক কম্পানিগুলোর সঙ্গে কাজ করতে যে জ্ঞান দরকার তা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বাপেক্সের কর্মকর্তাদের শিখতে হবে।’ সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার একটি গ্রামে মাদকের টাকা জোগাড় করতে চার পরিবারের পাঁচ শিশুকে অর্থের বিনিময়ে অন্যের কাছে তুলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, বিভিন্ন সময়ে ২০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিময়ে শিশুদের দেওয়া হয়েছে। ঘটনাগুলো ঘটেছে উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের উত্তর চরপুক্ষিয়া গ্রামে। অভিযোগ রয়েছে, প্রথমে যাদের কাছে শিশুদের দেওয়া হয়েছিল, তাদের কেউ কেউ পরবর্তীতে আরও বেশি অর্থের বিনিময়ে অন্য ব্যক্তির কাছে শিশুদের তুলে দিয়েছেন। ফলে শিশুদের বর্তমান অবস্থান ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। স্থানীয়দের ভাষ্য, গ্রামটিতে দীর্ঘদিন ধরে মাদকের বিস্তার বেড়েছে। তাদের দাবি, শতাধিক নারী-পুরুষ মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছেন। মাদকের অর্থ জোগাড় করতে কয়েকটি পরিবার সন্তানদেরও অন্যের কাছে দিয়ে দিয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুলাল মিয়ার ছেলে জাকির হোসেন ও তার স্ত্রী ফারজানার নবজাতক সন্তানকে গত ২ সেপ্টেম্বর ৬০ হাজার টাকার বিনিময়ে অন্যের কাছে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া জজ মিয়ার ছেলে সাদ্দাম হোসেনের দুই স্ত্রীর সন্তানদের মধ্যে একজনকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং অপর শিশুকে ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে দেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন। অন্যদিকে, আসাদ মিয়ার ছেলে জাকির হোসেন তার সন্তানকে ৭৭ হাজার টাকা এবং মৃত মফিজ উদ্দিনের ছেলে আসাদ মিয়া তার সন্তানকে দুই লাখ টাকার বিনিময়ে অন্যের কাছে তুলে দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। স্থানীয়দের আরও দাবি, এসব শিশুর কয়েকজনকে পরবর্তীতে প্রথম গ্রহীতাদের কাছ থেকে আরও বেশি অর্থের বিনিময়ে অন্যত্র দেওয়া হয়েছে। তবে শিশুদের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য দিতে পারেননি তারা। চরপুক্ষিয়া গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, মাদকের বিস্তারের কারণে গ্রামের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলতে গেলেও তারা ভয় পান। তাদের অভিযোগ, প্রতিবাদ করলে হামলা বা হয়রানির শিকার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। স্থানীয় কয়েকজন আরও অভিযোগ করেন, শিশুদেরও মাদকের সংস্পর্শে আনা হচ্ছে। প্রায় পাঁচ বছর বয়সী একটি শিশুকে মাদক সেবন করানোর অভিযোগও করেছেন তারা। কিছু পরিবারে স্বামী-স্ত্রী ও সন্তান একসঙ্গে মাদক গ্রহণ করেন বলেও দাবি করেন স্থানীয়রা। এক বাসিন্দা বলেন, “আমাদের সন্তানরাও ছোট। মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলতে চাই। কিন্তু প্রতিবাদ করলে আমাদের সন্তানদেরও নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেওয়ার ভয় আছে।” এদিকে গ্রামের বাসিন্দা হওয়ায় সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার অভিযোগ করেছে কটিয়াদী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী। তার ভাষ্য, গ্রামের নাম বললেই অনেকে মাদকাসক্তদের গ্রাম বলে মন্তব্য করে। এতে সামাজিকভাবে বিব্রত হতে হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, কটিয়াদী মডেল থানা থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরে হলেও এলাকায় মাদকের বিস্তার ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। তারা মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার এবং শিশুদের তুলে দেওয়ার অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। অভিযোগের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর বাড়িতে গেলে তাদের সদস্যরা সাংবাদিকদের উপস্থিতির খবর পেয়ে অন্যত্র চলে যান। ফলে তাদের বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। জালালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “উত্তর চরপুক্ষিয়া গ্রামে মাদকের ছোবল ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। মাদক সেবনের টাকা জোগাড় করতে বিভিন্ন সময়ে পাঁচটি শিশু সন্তান বিক্রি করে দেওয়ার কথা শুনেছি। মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে সামাজিক ও প্রশাসনের সহযোগিতায় কাজ করব।” কটিয়াদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “দারিদ্র্যতা ও মাদকের টাকা জোগাড় করতে সন্তানদের টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ পেয়েছি। মাদক নির্মূলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।” শিশুদের বিক্রির অভিযোগের সত্যতা, শিশুদের বর্তমান অবস্থান এবং তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
বিরোধী দলের নানা আপত্তি ও সমালোচনার মুখেই বহুল আলোচিত ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে বাংলাদেশ পুলিশের আওতাধীন ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি) নামে একটি নতুন বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের বিধান রেখে বিলটি পাস করা হয়। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বিলটি কণ্ঠভোটে দিলে সেটি পাস হয়। এর আগে গত ৩ সেপ্টেম্বর বিলটি সংসদে উত্থাপন করা হয় এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য তা সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়। বুধবার কমিটির প্রতিবেদন সংসদে উত্থাপিত হলেও সেখানে বিলটির বিভিন্ন ধারার ওপর বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সাতটি বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট বা আপত্তি জানানো হয়। তবে সংসদীয় কমিটির সুপারিশসহ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি পাসের জন্য উত্থাপন করলে বিরোধী দলীয় নেতাসহ অন্যান্য বিরোধী সদস্যরা এর তীব্র বিরোধিতা করেন। বিরোধী দলীয় নেতা তার বক্তব্যে বলেন, র্যাব বিলুপ্ত করে কেবল নতুন নামে একই ধাঁচের বাহিনী গঠন জনগণ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রত্যাশা পূরণ করবে না। তাই কোনো অবস্থাতেই এই আইন পাস করা উচিত নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। বিরোধী দলের সদস্যরা তাদের আপত্তিতে উল্লেখ করেন যে, র্যাব বিলুপ্তির পর পর্যাপ্ত জাতীয় পরামর্শ এবং শক্তিশালী ও স্বাধীন জবাবদিহি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না হলে এসআরবি শেষ পর্যন্ত র্যাবেরই নতুন রূপ ধারণ করতে পারে। এজন্য তারা রাজনৈতিক দল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচারক, আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মী ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনার দাবি জানান। বিশেষ করে র্যাবের পুরোনো নথি, গুমের আলামত ও রেকর্ডপত্র সরাসরি স্থানান্তরের আগে আলাদা তালিকা তৈরি ও সংরক্ষণের দাবি তোলা হয়, যেন কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ নষ্ট বা পরিবর্তন না হতে পারে। পাস হওয়া আইনের ৪ ধারা অনুযায়ী, বাংলাদেশ পুলিশের অধীন এসআরবি নামে একটি বিশেষায়িত ইউনিট থাকবে, যার সদর দপ্তর স্থাপন করা হবে ঢাকায়। সরকারের প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ ও অন্যান্য শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের পদায়ন বা প্রেষণে নিয়োগের মাধ্যমে এটি গঠন করা হবে। এই বাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন মহাপরিচালক, যিনি পুলিশ বাহিনীর অন্তত অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি) পদমর্যাদার কর্মকর্তা হবেন। তিনি বাহিনীর প্রশাসনিক, আর্থিক ও অপারেশনাল ক্ষমতা পরিচালনা করবেন। আইনের ১০ ও ১২ ধারায় এসআরবির মূল দায়িত্ব ও ক্ষমতার পরিধি নির্ধারণ করা হয়েছে। জননিরাপত্তা রক্ষা, সন্ত্রাসবাদ, সংঘবদ্ধ অপরাধ, সাইবার অপরাধ, গুম, ভূঁইফোড় ভূমিদস্যুতা, মানবপাচার, গুম ও মাদক দমনে বাহিনীটি কাজ করবে। অপরাধীদের গ্রেপ্তারি, তল্লাশি ও আলামত জব্দের ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসরণ করতে হবে। তবে গ্রেপ্তার ব্যক্তি বা জব্দ করা আলামত এসআরবির কাছে নিজস্ব হেফাজতে রাখা যাবে না, বরং আইন অনুযায়ী অনতিবিলম্বে নিকটবর্তী থানা কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। বাহিনীর সাব-ইন্সপেক্টর বা তার চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আদালত, সরকার বা পুলিশ প্রধানের নির্দেশনায় এসব অপরাধের আনুষ্ঠানিক তদন্ত পরিচালনা করতে পারবেন। বিলে বাহিনীর সদস্যদের জন্য কঠোর শৃঙ্খলাভঙ্গ ও শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। দায়িত্বে অবহেলা, মদ্যপ অবস্থা, বেআইনি দখলদারি, হেফাজতে থাকা ব্যক্তির প্রতি নির্যাতন বা বল প্রয়োগ, প্ররোচনা দেওয়া এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আদেশ অমান্য করাকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে ধরা হয়েছে। প্রমাণ সাপেক্ষে বরখাস্ত, পদাবনতি, বাধ্যতামূলক অবসর বা বেতন-ভাতা বাজয়াপ্তের পাশাপাশি তিরস্কার ও জরিমানা মতো শাস্তির সুযোগ রাখা হয়েছে। সদস্যদের বিরুদ্ধে ওঠা ব্যক্তিগত অভিযোগ বা অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ নিরসনে একটি বিশেষ ‘অভিযোগ প্রতিকার কমিটি’ গঠিত হবে। আইনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিলে স্পষ্ট বলা হয়েছে, পরিবর্তিত সামাজিক ও ভৌগোলিক পরিস্থিতিতে অপরাধের বৈচিত্র্যময় রূপ এবং নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দ্রুত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে এমন আধুনিক ও দক্ষ বাহিনীর প্রয়োজন ছিল। র্যাব বিলুপ্তির মাধ্যমে সেই শূন্যতা পূরণ করে স্বচ্ছতা, পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহিমূলক আধুনিক বিশেষায়িত বাহিনী হিসেবে এসআরবিকে তৈরি করা হয়েছে। আইনটি দ্রুত কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে র্যাব সংক্রান্ত আগের সব বিধান বাতিল বলে গণ্য হবে এবং বিলুপ্ত র্যাবের সমস্ত সম্পদ, ব্যাংক হিসাব, তহবিল ও নথি এসআরবিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ন্যস্ত হবে।