তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে অনলাইনে সাইবার অপরাধে জড়িতরা বা সাইবার স্ক্যাম সেন্টারগুলোতে বাংলাদেশ থেকে শুধু মানব পাচারই হচ্ছে না, বরং প্রতারকদের ‘হাব’ হয়ে ওঠার ঝুঁকিতেও আছে বাংলাদেশ।
গেল বুধবার ঢাকায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে প্রকাশিত জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ সংক্রান্ত সংস্থার (ইউএনওডিসি) এক আঞ্চলিক প্রতিবেদনে এ উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
‘ট্রাফিকড টু স্ক্যাম: সাউথ এশিয়ান রেসপন্সেস টু ট্রাফিকিং ইন পারসন্স ফর দ্য পারপাস অব ফোর্সড ক্রিমিনালিটি ইন স্ক্যাম অপারেশনস’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার পাঁচটি দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অর্থায়নে পরিচালিত ‘প্রিভেন্টিং অ্যান্ড অ্যাড্রেসিং ট্রাফিকিং ইন হিউম্যান বিইংস অ্যান্ড স্মাগলিং অব মাইগ্র্যান্টস ইন সাউথ এশিয়া (২০২৪–২০২৭)’ প্রকল্পের অংশ হিসেবে এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ, ভুটান, মালদ্বীপ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা—এ অঞ্চলের প্রতিটি দেশই এখন এই নতুন ধারার মানবপাচারের শিকার হচ্ছে।
১০৩ জন ভুক্তভোগীর দেওয়া তথ্য ও গবেষণার ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়। প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছে—বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা এখন কেবল সাইবার অপরাধে মানবপাচারের প্রধান উৎসস্থলই নয়, বরং চক্রগুলোর নতুন কেন্দ্র বা ‘হাবে’ পরিণত হচ্ছে।

এক মাসেই দুই ‘চক্র’ ধরা
শুধু চলতি মাসেই কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে সাইবার অপরাধে যুক্ত থাকার অভিযোগে দুটি আন্তর্জাতিক চক্রের কয়েকজনকে আটক করেছে পুলিশ।
গেল ১০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের খুলশী থানার কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার সাত তলা একটি ভবনে অভিযান চালিয়ে চীন, পাকিস্তান, লাউস, নেপাল ও ভিয়েতনামের ২০ নারীসহ ৬৩ নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ।
এসব বিদেশি নাগরিকরা বৈশ্বিকভাবে ‘অনলাইন প্রতারণার’ ফাঁদ তৈরি করছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ বলছে, ‘সুবিধাজনক’ স্থান ভেবে চক্রটি বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছে।
মামলার তদন্ত এবং অভিযানে থাকা একাধিক পুলিশ সদস্য বিডিনিউজ টেয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, মূলত এ চক্রটি বিভিন্ন ধরনের সাইট খুলে অনলাইন মার্কেটিংয়ের নামে ‘প্রতারণার’ আশ্রয় নিত এবং ‘হ্যানি ট্র্যাপের’ মত ঘটনা ঘটাত বলে তাদের কাছে প্রাথমিক তথ্য আছে।
তারা বলেছেন, এ বিদেশিদের ‘প্রতারণার’ প্রথম বিষয় ছিল অনলাইন শপিং সাইটের মাধ্যমে বিভিন্ন পণ্যের অর্ডার নিয়ে নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ ও পণ্য না দিয়ে টাকা আত্মসাৎ করা।
তারা বিভিন্ন ধরনের ওয়েবসাইট অ্যাপ হ্যাক করার প্রক্রিয়া করেছিলেন, এজন্য ভবনের ফ্ল্যাটে বিভিন্ন ধরনের ডিভাইস স্থাপন করেছিলেন।
তাদের কাছ থেকে প্রতারণায় ব্যবহৃত ১৩৪টি মোবাইল ফোন, ৫৭টি ল্যাপটপ, ১টি অ্যাপল ট্যাব, সিপিইউ, মনিটর, পেনড্রাইভ, সিমকার্ডসহ বিপুল পরিমাণ ডিজিটাল, সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া তিনটি পাকিস্তানি ও একটি কম্বোডিয়ার জাতীয় পরিচয়পত্রও জব্দ করা হয়েছে।
এর আগে গেল ৩ সেপ্টেম্বর রাত থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত কক্সবাজার শহরের হোটেল সি-প্যালেসে অভিযান চালিয়ে ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন, ৪০টি ল্যাপটপ ও যোগাযোগ সরঞ্জামসহ চীনের ছয় নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ।
অনলাইনভিত্তিক প্রতারণার অভিযোগে করা মামলায় তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
কক্সবাজারে চীনা চক্র আটকের ঘটনায় প্রথমে অভিযোগ করা হয়েছিল রামু থানায়।
জানতে চাইলে রামু থানা পুলিশের পরিদর্শক মো. মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মামলাটি বর্তমানে সিআইডি ঢাকা তদন্ত করছে। সাইবার স্ক্যাম সেন্টার চালানোর অভিযোগে ওই চক্রটির বিরুদ্ধে থানায় একজনের অভিযোগের পর অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়।”

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে কী আছে?
তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) খাতে ডাটা এন্ট্রি, আইটি স্পেশালিস্ট, কাস্টমার সার্ভিসসহ নানা পদে উচ্চবেতনে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশি তরুণদের থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ায় পাচার করা হচ্ছে বলে ইউএনওডিসি আঞ্চলিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
অন্যান্য উপায়ের পাশাপাশি নতুন পদ্ধতিতে প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনানুষ্ঠানিক দালালের ফাঁদে ফেলে ট্যুরিস্ট ভিসায় তাদের বিদেশে নিয়ে যাওয়া হয়।
সেখানে পৌঁছানোর পর পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে তাদের বন্দি করা হচ্ছে সুরক্ষিত ‘স্ক্যাম কম্পাউন্ডে’ এবং জোরপূর্বক বাধ্য করা হচ্ছে ‘আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টোকারেন্সি’ ও ‘রোমান্স স্ক্যাম’ পরিচালনা করতে।
প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০২২ সাল থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্ক্যাম সেন্টারগুলোতে বাংলাদেশি ভুক্তভোগীদের উপস্থিতি শনাক্ত হচ্ছে। প্রধানত সামাজিক যোগাযোগামাধ্যম, অনুমোদিত এজেন্সি বা স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে ৮০০ থেকে দেড় হাজার ডলার বেতনের চাকরির লোভ দেখানো হয়।
দালালি ফি বাবদ ২ হাজার থেকে ৫ হাজার ডলার তুলতে অনেক পরিবার জমি বন্ধক রাখে। অন্যান্য দেশের ভুক্তভোগীরা উচ্চশিক্ষিত হলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে গ্রাম বা মফস্বলের ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী অপেক্ষাকৃত কম শিক্ষিত তরুণরা এই চক্রের মূল নিশানা।
এ ছাড়া থাইল্যান্ড, কানাডা বা অস্ট্রেলিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাতে যাওয়ার কথা বলেও অনেককে কম্বোডিয়ায় নেওয়া হয়।
অন্যদিকে পশ্চিম এশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদেরও উচ্চ বেতনের ‘টোপ’ দিয়ে পরবর্তীতে এসব স্ক্যাম সেন্টারে পাচার করার তথ্য মিলেছে।
গেল শনিবার কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেন থেকে ৯ বাংলাদেশিকে সাইবার স্ক্যাম সেন্টার থেকে আটক করা হয়েছে বলে খবর এসেছে।
সেখান থেকে কম্পিউটারসহ বিভিন্ন আলামত জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া লাওস চলতি সপ্তাহে বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিট বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে।
৩ হাজার ডলারে তরুণকে বিক্রি
প্রতিবেদনে যুক্ত করা এক বাংলাদেশি ভুক্তভোগীর সুনির্দিষ্ট কেস স্টাডিতে অপরাধের ভয়াবহ রূপ ফুটে উঠেছে।
ডাটা এন্ট্রি ও আইটি স্পেশালিস্টের লোভনীয় চাকুরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে ট্যুরিস্ট ভিসায় ওই বাংলাদেশি তরুণকে কম্বোডিয়া নেওয়া হয়। এর জন্য দালালি ফি হিসেবে নেওয়া হয় ৩ হাজার ডলার।
পৌঁছানোর পরপরই তার পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয় এবং চার মাসের ব্যবধানে তাকে তিনটি ভিন্ন স্ক্যাম কম্পাউন্ডে বিক্রি করে দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগীর বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাকে প্রতিদিন ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা কম্পিউটার বা মোবাইলের সামনে বসিয়ে ভূয়া প্রেমের অভিনয় বা ক্রিপ্টো বিনিয়োগের প্রলোভনে বিদেশি নাগরিকদের ঠকানোর লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হত।
লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হলে বা কথা না শুনলে শারীরিক নির্যাতন, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করা এমনকি পানিতে ডুবিয়ে রাখার মতো শাস্তি দেওয়া হত।
এশিয়ায় কোথায় কী ধরনের স্ক্যাম সেন্টার?
ইউএনওডিসি তাদের প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার অভ্যন্তরীণ অপরাধের প্রকৃতি এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় স্ক্যাম সেন্টারগুলোর ধরনে কিছু পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে।
তাতে বলা হয়েছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কম্বোডিয়া, মিয়ানমার ও লাওসে সশস্ত্র পাহারা, কাঁটাতার ও বৈদ্যুতিক বেষ্টনীতে ঘেরা বড় বড় ‘কম্পাউন্ড’ বা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলকে (এসইজেড) কেন্দ্র করে কোটি কোটি ডলারের স্ক্যাম সেন্টার পরিচালনা করা হয়।
অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়া ও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অপরাধীরা একই ছাতা বা বড় কম্পাউন্ডের বদলে ছদ্মবেশে ছোট ছোট এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে কাজ করছে।
তারা আবাসিক হোটেল, ভাড়া করা ফ্ল্যাট, প্রাইভেট ভিলা কিংবা বৈধ রেজিস্টার্ড আইটি কোম্পানির আড়ালে লুকিয়ে এসব স্ক্যাম সেন্টার ও অবৈধ অনলাইন জুয়ার নেটওয়ার্ক চালাচ্ছে।
বাড়িওয়ালাকে গোপন রাখার বিনিময়ে চড়া হারে অতিরিক্ত ভাড়া দেওয়ার প্রমাণও মিলেছে।
ফলে অপরাধী চক্রগুলোকে সহজে শনাক্ত করা কিংবা সেখানে বন্দি থাকা পাচারের শিকার ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চট্টগ্রামের খুলশীতে যে ভবন থেকে বিদেশিদের আটক করা হয়, সে ভবনটির মালিক একজন প্রবাসী। দেড় মাস আগে তারা ভবনটি ভাড়া নিয়েছিলেন। মহসিন নামে এক ব্যক্তি এই বিদেশিদের ভবনটি ভাড়া করে দিয়েছিলেন, যার সঙ্গে চীনা নাগরিকদের সখ্যতা আছে।
নগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের উপ-কমিশনার শামীম হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “রাকিব নামে অপর এক জনের মাধ্যমে মহসিন ভবনটি ভাড়া নিয়েছিলেন বলে নিশ্চিত হয়েছি। তবে ভাড়া নেওয়ার সময় ভাড়াটিয়া বা তাদের প্রতিনিধির সাথে বাড়িওয়ালার যে চুক্তিপত্র হয়েছে তার কোনো কপি থানায় জমা দেওয়া হয়নি।”
অপরাধী না ভুক্তভোগী?
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সাইবার স্ক্যামে পাচার হওয়া ভুক্তভোগীদের ৭৪ শতাংশকেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নেওয়া হয়েছিল, যার বড় অংশই ছিলেন প্রযুক্তি ও ভাষায় দক্ষ ১৮ থেকে ৪০ বছর বয়সি পুরুষ।
প্রতিবেদনে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বলা হয়েছে, প্রতারণা কার্যক্রমে যুক্ত ব্যক্তিদের সবাইকে সরাসরি ‘অপরাধী’ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
প্রতারণা, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও শারীরিক নির্যাতনের মুখে পড়ে অনেকে এসব অনলাইন অপরাধে যুক্ত হতে বাধ্য হন। আপাতদৃষ্টিতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে দেখা গেলেও তারা প্রকৃতপক্ষে মানবপাচারের ‘ভুক্তভোগী’।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় বেশ কিছু আইনি ও কৌশলগত জটিলতা চিহ্নিত করেছে ইউএনওডিসি।
তারা বলছে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হল জোরপূর্বক অপরাধে বাধ্য হওয়া ব্যক্তিদের শাস্তি না দিয়ে ‘ভুক্তভোগী’ হিসেবে আলাদা করা। কিন্তু এ নীতি প্রয়োগ হয় না।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনো স্ক্যাম সেন্টারে অভিযান চালালে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের সরাসরি ‘অপরাধী’ হিসেবে ধরে ফেলে।
প্রচলিত মানবপাচার বিরোধী অবকাঠামো মূলত নারী ও শিশুদের কেন্দ্র করে তৈরি। ফলে প্রতারণার অপরাধ যাদের দিয়ে জোর করে করানো হয় সেই ভুক্তভোগী প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষরা আইনি ও পুনর্বাসনের কোনো সুনির্দিষ্ট সহায়তা পাচ্ছেন না।
কেবল ভুক্তভোগীদের মৌখিক জবানবন্দির ওপর তদন্ত নির্ভর করায় হোতারা ধরা পড়ে না। ক্রিপ্টো লেনদেন, অনলাইনে অপরাধীদের তথ্য ও কর্মকাণ্ডের চিহ্ন খোঁজা বা নজরদারির ক্ষেত্রে দক্ষতার অভাব রয়ে গেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সাইবার ক্রাইম ইউনিট, ইমিগ্রেশন ও মানবপাচার বিরোধী সেলগুলোর মধ্যে তথ্যের আদান-প্রদানও আশানুরূপ নয় বলছে জাতিসংঘ।
ইউএনওডিসির পর্যবেক্ষণ, বাংলাদেশের আইনি কাঠামোর ক্ষেত্রে ২০২৬ সালে প্রণীত নতুন আইনে ‘জোরপূর্বক অপরাধে বাধ্য করা’-কে মানবপাচারের অন্তর্ভুক্ত করা হলেও তদন্তের ক্ষেত্রে বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মূলত স্থানীয় দালালদের গ্রেপ্তারেই সীমাবদ্ধ থাকে, আন্তর্জাতিক হোতারা অধরাই থেকে যায়। সেই সঙ্গে ডিজিটাল ও আর্থিক তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের দক্ষতার অভাব রয়েছে। বিচারে দীর্ঘসূত্রতার কারণে ভুক্তভোগীরা আদালতের বাইরে টাকা নিয়ে আপস করতে বাধ্য হয়।
এছাড়া বিদেশ থেকে ফেরত আসা বাংলাদেশিদের পাচারের শিকার কী না তা ইমিগ্রেশনে নিয়মিত যাচাই করা হয় না।
সরকারি অনুদান কেবল বৈধ অভিবাসীদের জন্য বরাদ্দ থাকায় অবৈধভাবে যাওয়া ভুক্তভোগীদের নিজ খরচে ফিরতে হয়, যা তাদের আবার নতুন ঋণে ফেলে পুনঃপাচারের ঝুঁকিতে বাড়ায়।
আইনে বাধ্য হয়ে অপরাধ করা ভুক্তভোগীদের সাজা না দেওয়ার বিধান থাকলেও সঠিক প্রক্রিয়ার অভাবে অনেক সময় ভুক্তভোগীরাই উল্টো মামলার মুখোমুখি হন।
কম্বোডিয়াভিত্তিক মানবপাচার ও সাইবার স্ক্যাম চক্রের শিকার হয়ে সর্বস্ব হারিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের বাসিন্দা ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, রেস্টুরেন্টে ভালো চাকরির লোভে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তিনি ও তার চাচাতো বোন জামাই ফাহিম মোল্লা কম্বোডিয়া যান। রাব্বি হাসান নামের এক দালাল তাদের ভালো সুযোগ-সুবিধার প্রলোভন দেখান।
যাওয়ার জন্য ব্যাংক থেকে ৪ লাখ টাকা ঋণ এবং শ্বশুরের কাছ থেকে ২ লাখ টাকা ধার করে মোট ৬ লাখ টাকা দিয়েছিলেন তিনি।
কিন্তু কম্বোডিয়া পৌঁছানোর পর তাদের কোনো চাকরি না দিয়ে সাইবার স্ক্যাম সেন্টারে আটকে রেখে জিম্মি করা হয়। প্রায় তিন মাস চরম ভোগান্তির পর টিকিট ও হোটেলের বিপুল খরচ বহন করে চলতি মাসের ৩ তারিখে তারা দেশে ফেরেন।
দেশে ফিরলেও ইব্রাহিমের সংকট কাটেনি। তার প্রবাসে থাকার সময় ১৩ বছর বয়সী এক সন্তান মারা যায় এবং সম্প্রতি আরেকটি সন্তান জন্মগ্রহণ করে। ব্যাংক ঋণ ও সুদের বোঝা বেড়ে বর্তমানে তার দেনার পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টাকা ছাড়িয়েছে, যার ফলে পাওনাদারদের চাপে তিনি চরম মানসিক ও সামাজিক সংকটে পড়েছেন।
কম্বোডিয়া থেকে ফিরে আইনি প্রতিকার চাইতে গেলে সেখানেও নতুন হয়রানির শিকার হন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
কঠিন অবস্থায় নিয়ে যাচ্ছে’
সাইবার স্ক্যাম ও অনলাইনে ভুয়া নিয়োগের মাধ্যমে অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক তাসনিম সিদ্দিকী।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এটা একেবারেই ভীষণ কঠিন একটা অবস্থায় আমাদেরকে নিয়ে যাচ্ছে।”
এজন্য চাকরিপ্রার্থীরা যেন কোনো অবস্থাতেই জনশক্তি কর্মসংস্থান প্রশিক্ষণব্যুরো-বিএমইটি ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের যাচাই ছাড়া অনলাইন অফারে বিদেশে না যায়, সে বিষয়ে রেডিও ও টিভিসহ সব মাধ্যমে জোর প্রচার চালানোর বিষয়ে জোর দেন অধ্যাপক তাসনিম।
“প্রচলিত বিএমইটি ছাড়পত্রের বাইরে গিয়ে ব্যক্তি পর্যায়ে বা অনলাইনে পাওয়া চাকরির ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের (যেমন: পররাষ্ট্র বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়) পূর্ব অনুমতি বা ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক করতে হবে।”
তার মতে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যেসব দেশে এসব স্ক্যাম সেন্টার গড়ে উঠেছে, সেসব দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে আলোচনার মাধ্যমে অপরাধীদের যৌথভাবে চিহ্নিত করা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, “২০১৪ সালে থাইল্যান্ড-মালয়েশিয়া সীমান্তে সাগরপথে নৌকায় পাচারের পর যে গণকবরের ঘটনা ঘটেছিল, বর্তমানের এই ডিজিটাল স্ক্যামগুলো একই ধরনের পাচারের একটি আধুনিক ও শিক্ষিতদের লক্ষ্য করে চালানো রূপ। তাই দ্রুত গ্লোবাল ফোরামে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তুলে ধরা প্রয়োজন।”
ইউএনওডিসির প্রতিবেদনেও এ বিষয়ে কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে।
>> বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের সাত দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা বিষয়ক জোট বিমসটেক ও আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সহায়তায় দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে রিয়েল-টাইম তথ্য আদান-প্রদান করা।
>> বিদেশগামী অভিবাসীদের ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির বিষয়ে সচেতন করতে বিশেষ প্রচারণা চালানো।
>> ডিজিটাল ও ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করে হুন্ডি ও ক্রিপ্টো নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া।
বাংলাদেশেও তৎপর? সরকার কী করছে?
বাংলাদেশেও সম্প্রতি অনলাইন জুয়া, ডিজিটাল আর্থিক জালিয়াতি ও টেলিগ্রামভিত্তিক স্ক্যাম সেন্টারের উপস্থিতি ধরা পড়েছে এবং চীনা নাগরিকসহ বেশ কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়েছে।
তবে দেশের ভেতরের এসব স্ক্যাম সেন্টারে কোনো মানব পাচারের শিকার ব্যক্তি ব্যবহার হচ্ছে কি না, তার নির্দিষ্ট তথ্য সরকারের কাছে নেই।
ইউএনওডিসির ভাষ্য, দেশে অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাই-টেক পার্কের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলকে অপরাধীরা নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করলেও বাংলাদেশে এই ঝুঁকি কম বলে মনে করা হয়।
তবে বিশেষ আইনের আওতায় পরিচালিত এসব অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা শ্রম পরিদর্শকদের নিয়মিত তদারকি না থাকাটা একটি বড় ঝুঁকি।
কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে ধরা পড়া দুটি চক্রই দেশের অভ্যন্তরে বসে স্ক্যাম সেন্টার চালাতো ও চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল বলে খবরে এসেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়য়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম বলেন, “আন্তর্জাতিক চক্রের মাধ্যমে তরুণদের প্রতারিত হওয়া ঠেকাতে এবং সাইবার স্ক্যাম প্রতিরোধে ইউএনওডিসির সহায়তায় সরকারের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ও স্কিম রয়েছে। এ লক্ষ্যে যৌথভাবে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করা হচ্ছে।”
ইমিগ্রেশনে নজরদারির ঘাটতি নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “ইমিগ্রেশন পুলিশ ও সীমান্ত সুরক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীগুলো বন্দরে নিয়মিত স্ক্রিনিং করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে প্রতারক চক্র বিএমইটির বৈধ ছাড়পত্র বা সনদের মতো নথিপত্রের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে পার পেয়ে যায়, যা ইমিগ্রেশনে আটকানো কঠিন হয়ে পড়ে।”
মনজুর মোর্শেদ বলেন, “প্রতারণা পুরোপুরি বন্ধ করতে হলে বিদেশগামী তরুণ ও সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো সবচেয়ে বেশি জরুরি। এ ধরনের প্রতারণামূলক ক্যাম্পেইন রুখতে এবং নাগরিকদের সতর্ক করতে গণমাধ্যমসহ সকল পক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন।”
ভবিষ্যতে ইউএনওডিসির সঙ্গে বড় পরিসরে সচেতনতামূলক প্রচার চালানের উদ্যোগ নেওয়া হবে, বলেন তিনি।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহিরাগমন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বলেন, “বিষয়টি নিয়ে আমরা সতর্ক আছি এবং চেষ্টা চালাচ্ছি অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে ফেলার। এই প্রতিবেদনটা সেক্ষেত্রে আমাদের জন্য সহায়ক হয়েছে।”
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে অনলাইনে সাইবার অপরাধে জড়িতরা বা সাইবার স্ক্যাম সেন্টারগুলোতে বাংলাদেশ থেকে শুধু মানব পাচারই হচ্ছে না, বরং প্রতারকদের ‘হাব’ হয়ে ওঠার ঝুঁকিতেও আছে বাংলাদেশ। গেল বুধবার ঢাকায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে প্রকাশিত জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ সংক্রান্ত সংস্থার (ইউএনওডিসি) এক আঞ্চলিক প্রতিবেদনে এ উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। ‘ট্রাফিকড টু স্ক্যাম: সাউথ এশিয়ান রেসপন্সেস টু ট্রাফিকিং ইন পারসন্স ফর দ্য পারপাস অব ফোর্সড ক্রিমিনালিটি ইন স্ক্যাম অপারেশনস’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার পাঁচটি দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অর্থায়নে পরিচালিত ‘প্রিভেন্টিং অ্যান্ড অ্যাড্রেসিং ট্রাফিকিং ইন হিউম্যান বিইংস অ্যান্ড স্মাগলিং অব মাইগ্র্যান্টস ইন সাউথ এশিয়া (২০২৪–২০২৭)’ প্রকল্পের অংশ হিসেবে এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ, ভুটান, মালদ্বীপ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা—এ অঞ্চলের প্রতিটি দেশই এখন এই নতুন ধারার মানবপাচারের শিকার হচ্ছে। ১০৩ জন ভুক্তভোগীর দেওয়া তথ্য ও গবেষণার ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়। প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছে—বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা এখন কেবল সাইবার অপরাধে মানবপাচারের প্রধান উৎসস্থলই নয়, বরং চক্রগুলোর নতুন কেন্দ্র বা ‘হাবে’ পরিণত হচ্ছে। এক মাসেই দুই ‘চক্র’ ধরা শুধু চলতি মাসেই কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে সাইবার অপরাধে যুক্ত থাকার অভিযোগে দুটি আন্তর্জাতিক চক্রের কয়েকজনকে আটক করেছে পুলিশ। গেল ১০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের খুলশী থানার কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার সাত তলা একটি ভবনে অভিযান চালিয়ে চীন, পাকিস্তান, লাউস, নেপাল ও ভিয়েতনামের ২০ নারীসহ ৬৩ নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। এসব বিদেশি নাগরিকরা বৈশ্বিকভাবে ‘অনলাইন প্রতারণার’ ফাঁদ তৈরি করছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশ বলছে, ‘সুবিধাজনক’ স্থান ভেবে চক্রটি বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছে। মামলার তদন্ত এবং অভিযানে থাকা একাধিক পুলিশ সদস্য বিডিনিউজ টেয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, মূলত এ চক্রটি বিভিন্ন ধরনের সাইট খুলে অনলাইন মার্কেটিংয়ের নামে ‘প্রতারণার’ আশ্রয় নিত এবং ‘হ্যানি ট্র্যাপের’ মত ঘটনা ঘটাত বলে তাদের কাছে প্রাথমিক তথ্য আছে। তারা বলেছেন, এ বিদেশিদের ‘প্রতারণার’ প্রথম বিষয় ছিল অনলাইন শপিং সাইটের মাধ্যমে বিভিন্ন পণ্যের অর্ডার নিয়ে নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ ও পণ্য না দিয়ে টাকা আত্মসাৎ করা। তারা বিভিন্ন ধরনের ওয়েবসাইট অ্যাপ হ্যাক করার প্রক্রিয়া করেছিলেন, এজন্য ভবনের ফ্ল্যাটে বিভিন্ন ধরনের ডিভাইস স্থাপন করেছিলেন। তাদের কাছ থেকে প্রতারণায় ব্যবহৃত ১৩৪টি মোবাইল ফোন, ৫৭টি ল্যাপটপ, ১টি অ্যাপল ট্যাব, সিপিইউ, মনিটর, পেনড্রাইভ, সিমকার্ডসহ বিপুল পরিমাণ ডিজিটাল, সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া তিনটি পাকিস্তানি ও একটি কম্বোডিয়ার জাতীয় পরিচয়পত্রও জব্দ করা হয়েছে। এর আগে গেল ৩ সেপ্টেম্বর রাত থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত কক্সবাজার শহরের হোটেল সি-প্যালেসে অভিযান চালিয়ে ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন, ৪০টি ল্যাপটপ ও যোগাযোগ সরঞ্জামসহ চীনের ছয় নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। অনলাইনভিত্তিক প্রতারণার অভিযোগে করা মামলায় তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। কক্সবাজারে চীনা চক্র আটকের ঘটনায় প্রথমে অভিযোগ করা হয়েছিল রামু থানায়। জানতে চাইলে রামু থানা পুলিশের পরিদর্শক মো. মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মামলাটি বর্তমানে সিআইডি ঢাকা তদন্ত করছে। সাইবার স্ক্যাম সেন্টার চালানোর অভিযোগে ওই চক্রটির বিরুদ্ধে থানায় একজনের অভিযোগের পর অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়।” জাতিসংঘের প্রতিবেদনে কী আছে? তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) খাতে ডাটা এন্ট্রি, আইটি স্পেশালিস্ট, কাস্টমার সার্ভিসসহ নানা পদে উচ্চবেতনে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশি তরুণদের থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ায় পাচার করা হচ্ছে বলে ইউএনওডিসি আঞ্চলিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অন্যান্য উপায়ের পাশাপাশি নতুন পদ্ধতিতে প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনানুষ্ঠানিক দালালের ফাঁদে ফেলে ট্যুরিস্ট ভিসায় তাদের বিদেশে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে তাদের বন্দি করা হচ্ছে সুরক্ষিত ‘স্ক্যাম কম্পাউন্ডে’ এবং জোরপূর্বক বাধ্য করা হচ্ছে ‘আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টোকারেন্সি’ ও ‘রোমান্স স্ক্যাম’ পরিচালনা করতে। প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০২২ সাল থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্ক্যাম সেন্টারগুলোতে বাংলাদেশি ভুক্তভোগীদের উপস্থিতি শনাক্ত হচ্ছে। প্রধানত সামাজিক যোগাযোগামাধ্যম, অনুমোদিত এজেন্সি বা স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে ৮০০ থেকে দেড় হাজার ডলার বেতনের চাকরির লোভ দেখানো হয়। দালালি ফি বাবদ ২ হাজার থেকে ৫ হাজার ডলার তুলতে অনেক পরিবার জমি বন্ধক রাখে। অন্যান্য দেশের ভুক্তভোগীরা উচ্চশিক্ষিত হলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে গ্রাম বা মফস্বলের ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী অপেক্ষাকৃত কম শিক্ষিত তরুণরা এই চক্রের মূল নিশানা। এ ছাড়া থাইল্যান্ড, কানাডা বা অস্ট্রেলিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাতে যাওয়ার কথা বলেও অনেককে কম্বোডিয়ায় নেওয়া হয়। অন্যদিকে পশ্চিম এশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদেরও উচ্চ বেতনের ‘টোপ’ দিয়ে পরবর্তীতে এসব স্ক্যাম সেন্টারে পাচার করার তথ্য মিলেছে। গেল শনিবার কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেন থেকে ৯ বাংলাদেশিকে সাইবার স্ক্যাম সেন্টার থেকে আটক করা হয়েছে বলে খবর এসেছে। সেখান থেকে কম্পিউটারসহ বিভিন্ন আলামত জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া লাওস চলতি সপ্তাহে বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিট বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। ৩ হাজার ডলারে তরুণকে বিক্রি প্রতিবেদনে যুক্ত করা এক বাংলাদেশি ভুক্তভোগীর সুনির্দিষ্ট কেস স্টাডিতে অপরাধের ভয়াবহ রূপ ফুটে উঠেছে। ডাটা এন্ট্রি ও আইটি স্পেশালিস্টের লোভনীয় চাকুরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে ট্যুরিস্ট ভিসায় ওই বাংলাদেশি তরুণকে কম্বোডিয়া নেওয়া হয়। এর জন্য দালালি ফি হিসেবে নেওয়া হয় ৩ হাজার ডলার। পৌঁছানোর পরপরই তার পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয় এবং চার মাসের ব্যবধানে তাকে তিনটি ভিন্ন স্ক্যাম কম্পাউন্ডে বিক্রি করে দেওয়া হয়। ভুক্তভোগীর বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাকে প্রতিদিন ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা কম্পিউটার বা মোবাইলের সামনে বসিয়ে ভূয়া প্রেমের অভিনয় বা ক্রিপ্টো বিনিয়োগের প্রলোভনে বিদেশি নাগরিকদের ঠকানোর লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হত। লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হলে বা কথা না শুনলে শারীরিক নির্যাতন, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করা এমনকি পানিতে ডুবিয়ে রাখার মতো শাস্তি দেওয়া হত। এশিয়ায় কোথায় কী ধরনের স্ক্যাম সেন্টার? ইউএনওডিসি তাদের প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার অভ্যন্তরীণ অপরাধের প্রকৃতি এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় স্ক্যাম সেন্টারগুলোর ধরনে কিছু পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কম্বোডিয়া, মিয়ানমার ও লাওসে সশস্ত্র পাহারা, কাঁটাতার ও বৈদ্যুতিক বেষ্টনীতে ঘেরা বড় বড় ‘কম্পাউন্ড’ বা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলকে (এসইজেড) কেন্দ্র করে কোটি কোটি ডলারের স্ক্যাম সেন্টার পরিচালনা করা হয়। অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়া ও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অপরাধীরা একই ছাতা বা বড় কম্পাউন্ডের বদলে ছদ্মবেশে ছোট ছোট এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে কাজ করছে। তারা আবাসিক হোটেল, ভাড়া করা ফ্ল্যাট, প্রাইভেট ভিলা কিংবা বৈধ রেজিস্টার্ড আইটি কোম্পানির আড়ালে লুকিয়ে এসব স্ক্যাম সেন্টার ও অবৈধ অনলাইন জুয়ার নেটওয়ার্ক চালাচ্ছে। বাড়িওয়ালাকে গোপন রাখার বিনিময়ে চড়া হারে অতিরিক্ত ভাড়া দেওয়ার প্রমাণও মিলেছে। ফলে অপরাধী চক্রগুলোকে সহজে শনাক্ত করা কিংবা সেখানে বন্দি থাকা পাচারের শিকার ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। চট্টগ্রামের খুলশীতে যে ভবন থেকে বিদেশিদের আটক করা হয়, সে ভবনটির মালিক একজন প্রবাসী। দেড় মাস আগে তারা ভবনটি ভাড়া নিয়েছিলেন। মহসিন নামে এক ব্যক্তি এই বিদেশিদের ভবনটি ভাড়া করে দিয়েছিলেন, যার সঙ্গে চীনা নাগরিকদের সখ্যতা আছে। নগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের উপ-কমিশনার শামীম হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “রাকিব নামে অপর এক জনের মাধ্যমে মহসিন ভবনটি ভাড়া নিয়েছিলেন বলে নিশ্চিত হয়েছি। তবে ভাড়া নেওয়ার সময় ভাড়াটিয়া বা তাদের প্রতিনিধির সাথে বাড়িওয়ালার যে চুক্তিপত্র হয়েছে তার কোনো কপি থানায় জমা দেওয়া হয়নি।” অপরাধী না ভুক্তভোগী? প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সাইবার স্ক্যামে পাচার হওয়া ভুক্তভোগীদের ৭৪ শতাংশকেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নেওয়া হয়েছিল, যার বড় অংশই ছিলেন প্রযুক্তি ও ভাষায় দক্ষ ১৮ থেকে ৪০ বছর বয়সি পুরুষ। প্রতিবেদনে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বলা হয়েছে, প্রতারণা কার্যক্রমে যুক্ত ব্যক্তিদের সবাইকে সরাসরি ‘অপরাধী’ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। প্রতারণা, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও শারীরিক নির্যাতনের মুখে পড়ে অনেকে এসব অনলাইন অপরাধে যুক্ত হতে বাধ্য হন। আপাতদৃষ্টিতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে দেখা গেলেও তারা প্রকৃতপক্ষে মানবপাচারের ‘ভুক্তভোগী’। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় বেশ কিছু আইনি ও কৌশলগত জটিলতা চিহ্নিত করেছে ইউএনওডিসি। তারা বলছে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হল জোরপূর্বক অপরাধে বাধ্য হওয়া ব্যক্তিদের শাস্তি না দিয়ে ‘ভুক্তভোগী’ হিসেবে আলাদা করা। কিন্তু এ নীতি প্রয়োগ হয় না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনো স্ক্যাম সেন্টারে অভিযান চালালে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের সরাসরি ‘অপরাধী’ হিসেবে ধরে ফেলে। প্রচলিত মানবপাচার বিরোধী অবকাঠামো মূলত নারী ও শিশুদের কেন্দ্র করে তৈরি। ফলে প্রতারণার অপরাধ যাদের দিয়ে জোর করে করানো হয় সেই ভুক্তভোগী প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষরা আইনি ও পুনর্বাসনের কোনো সুনির্দিষ্ট সহায়তা পাচ্ছেন না। কেবল ভুক্তভোগীদের মৌখিক জবানবন্দির ওপর তদন্ত নির্ভর করায় হোতারা ধরা পড়ে না। ক্রিপ্টো লেনদেন, অনলাইনে অপরাধীদের তথ্য ও কর্মকাণ্ডের চিহ্ন খোঁজা বা নজরদারির ক্ষেত্রে দক্ষতার অভাব রয়ে গেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সাইবার ক্রাইম ইউনিট, ইমিগ্রেশন ও মানবপাচার বিরোধী সেলগুলোর মধ্যে তথ্যের আদান-প্রদানও আশানুরূপ নয় বলছে জাতিসংঘ। ইউএনওডিসির পর্যবেক্ষণ, বাংলাদেশের আইনি কাঠামোর ক্ষেত্রে ২০২৬ সালে প্রণীত নতুন আইনে ‘জোরপূর্বক অপরাধে বাধ্য করা’-কে মানবপাচারের অন্তর্ভুক্ত করা হলেও তদন্তের ক্ষেত্রে বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মূলত স্থানীয় দালালদের গ্রেপ্তারেই সীমাবদ্ধ থাকে, আন্তর্জাতিক হোতারা অধরাই থেকে যায়। সেই সঙ্গে ডিজিটাল ও আর্থিক তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের দক্ষতার অভাব রয়েছে। বিচারে দীর্ঘসূত্রতার কারণে ভুক্তভোগীরা আদালতের বাইরে টাকা নিয়ে আপস করতে বাধ্য হয়। এছাড়া বিদেশ থেকে ফেরত আসা বাংলাদেশিদের পাচারের শিকার কী না তা ইমিগ্রেশনে নিয়মিত যাচাই করা হয় না। সরকারি অনুদান কেবল বৈধ অভিবাসীদের জন্য বরাদ্দ থাকায় অবৈধভাবে যাওয়া ভুক্তভোগীদের নিজ খরচে ফিরতে হয়, যা তাদের আবার নতুন ঋণে ফেলে পুনঃপাচারের ঝুঁকিতে বাড়ায়। আইনে বাধ্য হয়ে অপরাধ করা ভুক্তভোগীদের সাজা না দেওয়ার বিধান থাকলেও সঠিক প্রক্রিয়ার অভাবে অনেক সময় ভুক্তভোগীরাই উল্টো মামলার মুখোমুখি হন। কম্বোডিয়াভিত্তিক মানবপাচার ও সাইবার স্ক্যাম চক্রের শিকার হয়ে সর্বস্ব হারিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের বাসিন্দা ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ। তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, রেস্টুরেন্টে ভালো চাকরির লোভে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তিনি ও তার চাচাতো বোন জামাই ফাহিম মোল্লা কম্বোডিয়া যান। রাব্বি হাসান নামের এক দালাল তাদের ভালো সুযোগ-সুবিধার প্রলোভন দেখান। যাওয়ার জন্য ব্যাংক থেকে ৪ লাখ টাকা ঋণ এবং শ্বশুরের কাছ থেকে ২ লাখ টাকা ধার করে মোট ৬ লাখ টাকা দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কম্বোডিয়া পৌঁছানোর পর তাদের কোনো চাকরি না দিয়ে সাইবার স্ক্যাম সেন্টারে আটকে রেখে জিম্মি করা হয়। প্রায় তিন মাস চরম ভোগান্তির পর টিকিট ও হোটেলের বিপুল খরচ বহন করে চলতি মাসের ৩ তারিখে তারা দেশে ফেরেন। দেশে ফিরলেও ইব্রাহিমের সংকট কাটেনি। তার প্রবাসে থাকার সময় ১৩ বছর বয়সী এক সন্তান মারা যায় এবং সম্প্রতি আরেকটি সন্তান জন্মগ্রহণ করে। ব্যাংক ঋণ ও সুদের বোঝা বেড়ে বর্তমানে তার দেনার পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টাকা ছাড়িয়েছে, যার ফলে পাওনাদারদের চাপে তিনি চরম মানসিক ও সামাজিক সংকটে পড়েছেন। কম্বোডিয়া থেকে ফিরে আইনি প্রতিকার চাইতে গেলে সেখানেও নতুন হয়রানির শিকার হন বলে অভিযোগ করেন তিনি। কঠিন অবস্থায় নিয়ে যাচ্ছে’ সাইবার স্ক্যাম ও অনলাইনে ভুয়া নিয়োগের মাধ্যমে অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক তাসনিম সিদ্দিকী। তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এটা একেবারেই ভীষণ কঠিন একটা অবস্থায় আমাদেরকে নিয়ে যাচ্ছে।” এজন্য চাকরিপ্রার্থীরা যেন কোনো অবস্থাতেই জনশক্তি কর্মসংস্থান প্রশিক্ষণব্যুরো-বিএমইটি ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের যাচাই ছাড়া অনলাইন অফারে বিদেশে না যায়, সে বিষয়ে রেডিও ও টিভিসহ সব মাধ্যমে জোর প্রচার চালানোর বিষয়ে জোর দেন অধ্যাপক তাসনিম। “প্রচলিত বিএমইটি ছাড়পত্রের বাইরে গিয়ে ব্যক্তি পর্যায়ে বা অনলাইনে পাওয়া চাকরির ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের (যেমন: পররাষ্ট্র বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়) পূর্ব অনুমতি বা ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক করতে হবে।” তার মতে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যেসব দেশে এসব স্ক্যাম সেন্টার গড়ে উঠেছে, সেসব দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে আলোচনার মাধ্যমে অপরাধীদের যৌথভাবে চিহ্নিত করা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, “২০১৪ সালে থাইল্যান্ড-মালয়েশিয়া সীমান্তে সাগরপথে নৌকায় পাচারের পর যে গণকবরের ঘটনা ঘটেছিল, বর্তমানের এই ডিজিটাল স্ক্যামগুলো একই ধরনের পাচারের একটি আধুনিক ও শিক্ষিতদের লক্ষ্য করে চালানো রূপ। তাই দ্রুত গ্লোবাল ফোরামে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তুলে ধরা প্রয়োজন।” ইউএনওডিসির প্রতিবেদনেও এ বিষয়ে কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। >> বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের সাত দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা বিষয়ক জোট বিমসটেক ও আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সহায়তায় দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে রিয়েল-টাইম তথ্য আদান-প্রদান করা। >> বিদেশগামী অভিবাসীদের ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির বিষয়ে সচেতন করতে বিশেষ প্রচারণা চালানো। >> ডিজিটাল ও ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করে হুন্ডি ও ক্রিপ্টো নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া। বাংলাদেশেও তৎপর? সরকার কী করছে? বাংলাদেশেও সম্প্রতি অনলাইন জুয়া, ডিজিটাল আর্থিক জালিয়াতি ও টেলিগ্রামভিত্তিক স্ক্যাম সেন্টারের উপস্থিতি ধরা পড়েছে এবং চীনা নাগরিকসহ বেশ কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়েছে। তবে দেশের ভেতরের এসব স্ক্যাম সেন্টারে কোনো মানব পাচারের শিকার ব্যক্তি ব্যবহার হচ্ছে কি না, তার নির্দিষ্ট তথ্য সরকারের কাছে নেই। ইউএনওডিসির ভাষ্য, দেশে অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাই-টেক পার্কের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলকে অপরাধীরা নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করলেও বাংলাদেশে এই ঝুঁকি কম বলে মনে করা হয়। তবে বিশেষ আইনের আওতায় পরিচালিত এসব অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা শ্রম পরিদর্শকদের নিয়মিত তদারকি না থাকাটা একটি বড় ঝুঁকি। কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে ধরা পড়া দুটি চক্রই দেশের অভ্যন্তরে বসে স্ক্যাম সেন্টার চালাতো ও চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল বলে খবরে এসেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়য়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম বলেন, “আন্তর্জাতিক চক্রের মাধ্যমে তরুণদের প্রতারিত হওয়া ঠেকাতে এবং সাইবার স্ক্যাম প্রতিরোধে ইউএনওডিসির সহায়তায় সরকারের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ও স্কিম রয়েছে। এ লক্ষ্যে যৌথভাবে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করা হচ্ছে।” ইমিগ্রেশনে নজরদারির ঘাটতি নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “ইমিগ্রেশন পুলিশ ও সীমান্ত সুরক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীগুলো বন্দরে নিয়মিত স্ক্রিনিং করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে প্রতারক চক্র বিএমইটির বৈধ ছাড়পত্র বা সনদের মতো নথিপত্রের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে পার পেয়ে যায়, যা ইমিগ্রেশনে আটকানো কঠিন হয়ে পড়ে।” মনজুর মোর্শেদ বলেন, “প্রতারণা পুরোপুরি বন্ধ করতে হলে বিদেশগামী তরুণ ও সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো সবচেয়ে বেশি জরুরি। এ ধরনের প্রতারণামূলক ক্যাম্পেইন রুখতে এবং নাগরিকদের সতর্ক করতে গণমাধ্যমসহ সকল পক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন।” ভবিষ্যতে ইউএনওডিসির সঙ্গে বড় পরিসরে সচেতনতামূলক প্রচার চালানের উদ্যোগ নেওয়া হবে, বলেন তিনি। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহিরাগমন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বলেন, “বিষয়টি নিয়ে আমরা সতর্ক আছি এবং চেষ্টা চালাচ্ছি অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে ফেলার। এই প্রতিবেদনটা সেক্ষেত্রে আমাদের জন্য সহায়ক হয়েছে।”
দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় গত ৮ সেপ্টেম্বর ‘রাষ্ট্রীয় সংস্থার আইটি সেবায় এখনো জয়ের বন্ধুর কোম্পানি’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে দেশীয় তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ডিভাইন আইটি লিমিটেড এবং প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইকবাল আহমেদ ফখরুল হাসানকে ঘিরে রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের আইটি প্রকল্পে কাজ পাওয়ার বিষয়ে অভিযোগ ও তথ্য তুলে ধরা হয়। প্রকাশিত প্রতিবেদনের পর ডিভাইন আইটি কর্তৃপক্ষ এর প্রতিবাদ জানিয়ে একটি লিখিত বক্তব্য প্রকাশ করে। সেখানে প্রতিবেদনে উল্লিখিত কয়েকটি তথ্য ও অভিযোগের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে ভুল ও বিভ্রান্তিকর বলে দাবি করা হয়েছে। খবর৭১-এর পাঠকদের জন্য মূল প্রতিবেদনের দাবি এবং ডিভাইন আইটির বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো এখানে পৃথকভাবে তুলে ধরা হলো। মূল প্রতিবেদনে যে অভিযোগ ও তথ্য তুলে ধরা হয়েছে দৈনিক আমার দেশের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি (বিএমটিএফ)-এর মতো প্রতিষ্ঠানে ডিভাইন আইটির আইটি সেবা দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে ও সাবেক তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকের সঙ্গে ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্প পাওয়া হয়েছে। এছাড়া ‘আমরা প্রবাসী’ প্রকল্প, জাতীয় ডিজিটাল নিরাপত্তা সংস্থা এবং বিএমটিএফ-এ ডিভাইন আইটির কাজ বা সেবা প্রদানের বিষয়ও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ডিভাইন আইটির বক্তব্য প্রকাশিত প্রতিবেদনের প্রতিবাদ জানিয়ে ডিভাইন আইটির সিইও ইকবাল আহমেদ ফখরুল হাসান দাবি করেন, প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠান ও তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য সঠিকভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। প্রতিষ্ঠানের প্রতিবাদলিপিতে প্রধানত যেসব বিষয় বলা হয়েছে: - রাজনৈতিক যোগাযোগের দাবি: সজীব ওয়াজেদ জয় বা সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকের সঙ্গে তার কোনো ব্যক্তিগত, ব্যবসায়িক বা রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল না বলে দাবি করেছেন ইকবাল আহমেদ ফখরুল হাসান। - ‘আমরা প্রবাসী’ প্রকল্প: ডিভাইন আইটির দাবি, ‘আমরা প্রবাসী’ প্রকল্পের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা ছিল না। - বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থা: প্রতিবেদনে উল্লিখিত বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকল্প এবং জাতীয় ডিজিটাল নিরাপত্তা সংস্থাকে ডিভাইন আইটি তাদের গ্রাহক তালিকার অংশ নয় বলে দাবি করেছে। - বিএমটিএফের ERP সেবা: বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরিতে ডিভাইন আইটি ERP সেবা দিয়েছে—প্রতিবেদনের এই তথ্যও প্রতিষ্ঠানটি অস্বীকার করেছে। - আইনি ও দরপত্র প্রক্রিয়া: ডিভাইন আইটির বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি সরকারি ও বেসরকারি প্রকল্পে প্রচলিত আইন, নিয়ম এবং দরপত্র প্রক্রিয়া অনুসরণ করে কাজ করেছে। তথ্য যাচাইয়ের গুরুত্ব এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে কোনো পক্ষের বক্তব্যকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা না করে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি, টেন্ডার ডকুমেন্ট, চুক্তিপত্র, প্রকল্পের কার্যাদেশ এবং অন্যান্য যাচাইযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে বিষয়গুলো মূল্যায়ন করা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম বা বিশেষ সুবিধা নেওয়ার মতো অভিযোগ প্রকাশিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য প্রকাশের সুযোগ দেওয়াও সাংবাদিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ডিভাইন আইটির পক্ষ থেকে প্রতিবেদনের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অস্বীকার করা হয়েছে। ফলে এসব দাবির চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি ও স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য তথ্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। খবর৭১-এর পর্যবেক্ষণ ডিভাইন আইটি লিমিটেড দীর্ঘদিন ধরে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রতিষ্ঠানটির সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে কাজের ইতিহাস রয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের পূর্ববর্তী কাজের অভিজ্ঞতা যেমন তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সত্য বা মিথ্যা প্রমাণ করে না, তেমনি রাজনৈতিক যোগাযোগের অভিযোগও কেবল সম্পর্কের দাবি বা অনুমানের ভিত্তিতে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করা যায় না। সাংবাদিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে এ ধরনের বিষয়ে অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য এবং যাচাইযোগ্য দাপ্তরিক তথ্য—এই তিনটি বিষয় পৃথকভাবে উপস্থাপন করাই অধিকতর বস্তুনিষ্ঠ পদ্ধতি। ডিভাইন আইটির প্রতিবাদে প্রতিবেদনে উল্লিখিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরাসরি অস্বীকার করা হয়েছে। এসব দাবির সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি ও স্বাধীন যাচাইয়ের সুযোগ রয়েছে কি না, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। খবর৭১ মনে করে, দেশীয় তথ্যপ্রযুক্তি খাতের যেকোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে ঘিরে অভিযোগের ক্ষেত্রে তথ্যের যথাযথ যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য এবং প্রমাণভিত্তিক সাংবাদিকতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অনুসন্ধান ও প্রকাশ করাও গণমাধ্যমের দায়িত্ব
বড় ধরনের কারিগরি বিভ্রাটের কারণে চ্যাটজিপিটি ব্যবহারে সমস্যা দেখা দিয়েছে। ওপেনএআইয়ের এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চ্যাটবটের ওয়েবসাইটে ঢুকতে গিয়ে অনেক ব্যবহারকারী নানা ধরনের অস্বাভাবিক আচরণের মুখোমুখি হচ্ছেন। কারও কারও ক্ষেত্রে ওয়েবসাইট থেকে একটি অচেনা ফাইল ডাউনলোডের চেষ্টাও দেখা গেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় রাত ৯টার দিকে এ সমস্যা দেখা দেয়। তবে (বৃহস্পতিবার রাত ১০টা) এ সমস্যা ঠিক হয়েছে। চ্যাটজিপিটি ব্যবহারে সমস্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেই সংবাদ হয়েছে। ডাউনডডিটেকটরের ওয়েবসাইট চ্যাটজিপিটি বিভ্রাট নিয়ে অনেক অভিযোগও জমা পড়েছে। চ্যাটজিপিটি কাজ না করায় অনেক ব্যবহারকারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মজা করে বলেছেন, এবার কাজে নিজেদের মেধাই ব্যবহার করতে হবে। তবে এই বিভ্রাটের প্রভাব শুধু চ্যাটজিপিটিতেই সীমাবদ্ধ নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিভিন্ন সুবিধার জন্য ওপেনএআইয়ের প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল বেশ কিছু ওয়েবসাইট ও অ্যাপেও সমস্যা দেখা দিয়েছে। এদিকে চ্যাটজিপিটির পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বী কয়েকটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেবায়ও সমস্যার কথা জানিয়েছেন কিছু ব্যবহারকারী। অ্যানথ্রপিকের ক্লড এবং এক্সের গ্রক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে এসব সেবায় সমস্যার ব্যাপকতা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। অনেক ব্যবহারকারী স্বাভাবিকভাবে সেবাগুলো ব্যবহার করতে পেরেছেন। বন্ধ হওয়ার বিষয়ে চ্যাটজিপিটিকের প্রশ্ন করলে উত্তর আসে এমন, ‘...তবে আজকের ঘটনাটা শুধু চ্যাটজিপিটিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না-ক্লড ও গ্রকও একই সময়ে সমস্যায় পড়েছিল, আর কিছু অঞ্চলে জেমিনাইতের সমস্যা দেখা যায়। আর মজার ব্যাপার হলো, ৩ সেপ্টেম্বরের আগেও কয়েক দিনের মধ্যে চ্যাটিজিপিটিতে একাধিক ছোটখাটো ইনসিডেন্ট হয়েছিল—যেমন ৩১ আগস্ট ওয়ার্ক মোডে ল্যাটেন্সি/এরর এবং ১ সেপ্টেম্বর ফ্রি/গো ব্যবহারকারীদের কথোপকথনে এলিভেটেড এররস হয়েছিল। তাই আপনি যদি আজ আমাকে কিছুক্ষণ আগে না পেয়ে থাকেন, সম্ভবত আপনার দোষ ছিল না।’ সূত্র: ইনডিপেনডেন্ট ডটকো ডটইউকে, ডাউনডডিটেক্টর, হিন্দুস্তান টাইমস