মোস্তফা কামাল আকন্দ
নীতি বিশ্লেষক ও উন্নয়ন কর্মী
মানবিকতারও একটি ভূগোল আছে । মানবিকতা সীমান্ত মানে না, কিন্তু ভৌগোলিক বাস্তবতা আমাদের পরস্পরের প্রতি দায়িত্বশীল করে তোলে ।
“নগরে আগুন লাগলে দেবালয় কি এড়ায়?” —প্রশ্নটি নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের সামনে দাঁড়ালে নতুন অর্থ পায়। পাহাড়ে বিপর্যয় নামলে তার অভিঘাত কি শুধু পাহাড়েই আটকে থাকে? নদী কি সীমান্ত চেনে ? জলবায়ু কি পাসপোর্ট দেখে ? আর দুর্যোগের ঝুঁকি কি কোনো দেশের মানচিত্রের রেখা মেনে চলে ?
নেপালের উত্তরাঞ্চলীয় রসুয়া জেলায় ২৬ আগস্ট ভোতে কোশি নদী অববাহিকায় যে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত নেমে এসেছে, তা এরই মধ্যে অন্তত ১৬২ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। শত শত মানুষ এখনও নিখোঁজ। নেপালের পর্যটন কর্তৃপক্ষের হিসাবে ৫৭৯ পর্যটক নিখোঁজ, তাঁদের মধ্যে ৪০০-এর বেশি বিদেশি। উদ্ধার অভিযান চলছে; ফলে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
নিহত প্রতিটি মানুষের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও শোক। যারা এখনও নিখোঁজ, তাঁদের ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর প্রতি রইল গভীর সমবেদনা ও সহমর্মিতা। এই কঠিন সময়ে বাংলাদেশের মানুষ ও রাষ্ট্র নেপালের জনগণের পাশে আছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও আনুষ্ঠানিকভাবে নেপালের সরকার ও জনগণের প্রতি সংহতি জানিয়ে বলেছে, বাংলাদেশ উদ্ধার ও ত্রাণ প্রচেষ্টায় যেকোনো সম্ভব উপায়ে সহায়তা করতে প্রস্তুত। কিন্তু শোকের পাশাপাশি আমাদের আরেকটি দায়িত্ব আছে—এই বিপর্যয়ের ভেতর থেকে ভবিষ্যতের সতর্কবার্তাটি পড়া। কারণ নেপালের এবারের বিপর্যয়কে শুধু একটি পাহাড়ি দেশের আকস্মিক বন্যা হিসেবে দেখলে এর গভীর তাৎপর্য ধরা পড়বে না। এটি একই সঙ্গে হিমালয়ের ভূপ্রকৃতি, হিমবাহ ও বরফের পরিবর্তন, আকস্মিক বন্যা, নদীর আচরণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং আঞ্চলিক দুর্যোগ প্রস্তুতির প্রশ্ন।
আর বাংলাদেশ? আমরা নেপালের সরাসরি প্রতিবেশী নই। কিন্তু হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীগুলোর বৃহৎ অববাহিকার নিম্নপ্রান্তের একটি দেশ। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকা আমাদের ভূগোল, কৃষি, অর্থনীতি ও মানুষের জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ফলে হিমালয়ের পরিবর্তনকে বাংলাদেশের জন্য সম্পূর্ণ দূরের কোনো ঘটনা ভাবার সুযোগ নেই।
আজ নেপালের পাহাড়ে যে কান্না শোনা যাচ্ছে, সেটি হয়তো বাংলাদেশের নদীতে একইভাবে পৌঁছাবে না। কিন্তু তার সতর্কবার্তা আমাদের কাছে পৌঁছাতেই হবে।
এটি শুধু বন্যা ছিল না - নেপালের এবারের ঘটনা প্রথম দেখায় একটি আকস্মিক বন্যা। কিন্তু পাহাড়ি অঞ্চলে এমন বিপর্যয় অনেক সময় শুধু বৃষ্টির পানি বেড়ে যাওয়ার ঘটনা নয়। প্রাথমিক স্যাটেলাইট বিশ্লেষণ এবং মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা USGS-এর তথ্য বলছে, হিমবাহের বরফ ও পাথরের একটি বড় ধস এই বিপর্যয়ের মূল ট্রিগার ছিল। প্রথম দিকে যে ৪.৪ মাত্রার ভূমিকম্পকে সম্ভাব্য কারণ মনে করা হয়েছিল, পরবর্তী বিশ্লেষণে USGS জানায়, সেটি আসলে হিমবাহের বরফ-পাথর ধসের ফলে সৃষ্ট seismic energy। সেই ধসের পর বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ নদীপথে নেমে গিয়ে ভয়াবহ debris flow তৈরি করে।
বিষয়টি বোঝার জন্য বিজ্ঞানটিকে সহজ করে দেখা যাক। পাহাড়ের কোনো সংকীর্ণ নদী উপত্যকায় হঠাৎ বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর ও মাটি পড়ে নদীর প্রবাহ আটকে দিতে পারে। তখন অল্প সময়ের মধ্যে পানি জমতে থাকে। সেই প্রাকৃতিক বাধা ভেঙে গেলে পানি আর স্বাভাবিক নদীর মতো নামে না; তার সঙ্গে পাথর, কাদা, গাছ ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ মিশে তৈরি হতে পারে অত্যন্ত শক্তিশালী debris flow। এ ধরনের স্রোতের ধ্বংসক্ষমতা সাধারণ বন্যার পানির চেয়ে অনেক বেশি। এটি পানি নয় শুধু। এটি পানি, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের চলমান দেয়াল। আর পাহাড়ি উপত্যকার সরু ভূপ্রকৃতি সেই স্রোতকে আরও দ্রুত ও বিধ্বংসী করে তুলতে পারে।
তবে কি সবই জলবায়ু পরিবর্তনের ফল? এখানে একটু থামতে হবে। দুর্যোগের পরপরই সবকিছুকে জলবায়ু পরিবর্তনের ফল বলে দেওয়ার প্রবণতা আছে। কিন্তু বিজ্ঞান এত সরল নয়। নেপালের এবারের ঘটনার নির্দিষ্ট ট্রিগার এখন অনেকটাই পরিষ্কার হলেও, দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এর প্রত্যক্ষ causal link নিয়ে আলাদা attribution study প্রয়োজন। অর্থাৎ এই একটি ঘটনাকে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক হবে না। কিন্তু বৃহত্তর বাস্তবতাটিও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। হিন্দুকুশ-হিমালয় পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ cryosphere অঞ্চল—অর্থাৎ বরফ, তুষার ও হিমবাহনির্ভর জলব্যবস্থার একটি বিশাল ভাণ্ডার। IPCC-এর মূল্যায়নে এই অঞ্চলে উষ্ণায়ন, হিমবাহের ভর কমে যাওয়া, হিমবাহের পশ্চাদপসরণ, তুষার গলার ধরনে পরিবর্তন এবং permafrost বা স্থায়ীভাবে জমাট মাটির অবক্ষয়ের প্রবণতা উঠে এসেছে।
এই পরিবর্তনের অর্থ শুধু পাহাড়ে বরফ কমে যাওয়া নয়। এটি নদীর seasonal flow, পানি সরবরাহ, কৃষি, জলবিদ্যুৎ এবং পাহাড়ি দুর্যোগের ঝুঁকিকেও প্রভাবিত করতে পারে। তাই সঠিক বৈজ্ঞানিক বক্তব্যটি হলো— জলবায়ু পরিবর্তন নেপালের এবারের নির্দিষ্ট ঘটনাটি ঘটিয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত এখনই নয়; কিন্তু যে হিমালয়ীয় পরিবেশে এ ধরনের বিপর্যয় ঘটছে, সেটি দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণায়নের কারণে পরিবর্তিত হচ্ছে। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সত্যকে শক্তিশালী করার জন্য অতিরঞ্জনের প্রয়োজন নেই।
বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক কোথায়? এখানেই সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকা দরকার। নেপালের ভোতে কোশি নদীর এবারের বন্যার পানি সরাসরি বাংলাদেশের নদীতে এসে পড়বে—এমন কথা বৈজ্ঞানিকভাবে বলা ঠিক হবে না। এবারের আকস্মিক বন্যাটি মূলত ভোতে কোশি–লহেন্দে নদী ব্যবস্থার স্থানীয় ও আন্তঃসীমান্ত পাহাড়ি দুর্যোগ। কিন্তু বৃহত্তর জলবৈজ্ঞানিক সম্পর্কটি বাস্তব। হিমালয়ীয় অঞ্চল থেকে উৎপন্ন নদীগুলো দক্ষিণ এশিয়ার বিশাল জনগোষ্ঠীকে পানি, কৃষি ও জীবিকার ভিত্তি দেয়। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকার জলবায়ু ও cryosphere পরিবর্তনের প্রভাব নিচের দিকের দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ নেপালের প্রতিটি বন্যা বাংলাদেশের বন্যা নয়। কিন্তু হিমালয়ের প্রতিটি বড় পরিবেশগত পরিবর্তনকে বাংলাদেশের ঝুঁকি বিশ্লেষণের বাইরে রাখাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এই পার্থক্যটিই আমাদের বুঝতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা: আগাম সতর্কতা :নেপালের এবারের বিপর্যয় আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি রাখে, সেটি হলো—আমরা কতটা আগে জানতে পারি? পাহাড়ি আকস্মিক বন্যায় কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানও জীবন-মৃত্যুর পার্থক্য তৈরি করতে পারে। একটি নদীর উজানে অস্বাভাবিক পানি প্রবাহ দেখা গেল। কোনো হিমবাহ-হ্রদের পানির স্তর দ্রুত বাড়ছে। কোনো হিমবাহের একটি অংশ অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। কোনো পাহাড়ি ঢালে বড় ধরনের ভূমিধসের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। এই তথ্যগুলো যদি আগে পাওয়া যায় এবং দ্রুত নিচের জনপদে পৌঁছে দেওয়া যায়, তাহলে মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার সময় পাওয়া যায়। প্রযুক্তি এখন সেই সুযোগ তৈরি করেছে। Satellite imagery, remote sensing, automatic river gauges, weather radar, drones এবং AI-assisted forecasting—সবকিছুকে একসঙ্গে কাজে লাগানো সম্ভব। কিন্তু প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা প্রযুক্তি নয়। তথ্য যদি মানুষের কাছে সময়মতো না পৌঁছায়, তাহলে সবচেয়ে উন্নত পূর্বাভাসও প্রাণ বাঁচাতে পারে না।
আমাদের কি Himalayan-to-Delta Early Warning System দরকার? বাংলাদেশের জন্য এখানেই একটি নতুন চিন্তার জায়গা তৈরি হয়। হিমালয়ের উচ্চভূমি থেকে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা বদ্বীপ পর্যন্ত একটি সমন্বিত regional early-warning architecture কেমন হতে পারে? নেপাল, ভারত, ভুটান, বাংলাদেশ এবং সংশ্লিষ্ট চীনা সংস্থাগুলোর মধ্যে দুর্যোগ-তথ্য বিনিময়ের একটি কার্যকর ব্যবস্থা কি তৈরি করা যায় না? শুধু নদীর পানি নয়—হিমবাহের অবস্থা, হিমবাহ-হ্রদের পানির স্তর, বরফধসের ঝুঁকি, ভূমিধস, অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, নদীর প্রবাহ, এবং downstream flood risk— এসব তথ্যকে একটি আঞ্চলিক ব্যবস্থায় যুক্ত করার সময় এসেছে। কারণ আগামী দিনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শুধু “বন্যা আসছে” বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
প্রশ্ন হবে—কোথা থেকে আসছে, কেন আসছে, কত দ্রুত আসছে এবং কার কাছে আগে খবরটি পৌঁছানো দরকার? নেপালের এবারের ঘটনাই এই প্রশ্নকে আরও জরুরি করে তুলেছে। গত বছরের অনুরূপ বন্যার পর আন্তঃসীমান্ত দুর্যোগে real-time information sharing-এর উদ্যোগের কথা উঠলেও আনুষ্ঠানিক কাঠামো চূড়ান্ত হয়নি বলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্ধৃত তথ্যেও উল্লেখ রয়েছে।
শুধু পানি নয়, তথ্যেরও অবাধ প্রবাহ দরকার : বাংলাদেশ বন্যার সঙ্গে লড়াই করতে করতে একটি বড় শিক্ষা পেয়েছে—বন্যা সব সময় ঠেকানো যায় না, কিন্তু বন্যার ক্ষতি অনেকটাই কমানো যায়। আগাম সতর্কতা দিয়ে। মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে। স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবকদের প্রস্তুত করে। নদীর চর, হাওর ও নিম্নাঞ্চলের ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে আগে জানিয়ে। নেপালের ঘটনাও একই শিক্ষা নতুন করে সামনে এনেছে। এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনা শুধু পানি ভাগাভাগির বিষয় নয়। এটি এখন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, তথ্য বিনিময়, জলবায়ু অভিযোজন, নদী পূর্বাভাস এবং মানুষের নিরাপত্তার বিষয়ও। বাংলাদেশের পানি কূটনীতি তাই শুধু “কত পানি পাব” প্রশ্নে আটকে থাকলে চলবে না।
প্রশ্নটি হতে হবে— বিপদ এলে আমরা একে অন্যকে কত দ্রুত জানাব? পাহাড়ের বিপদ সমতলে কীভাবে প্রভাব ফেলে? এখানেও অতিরঞ্জন না করে বাস্তব বিজ্ঞানকে দেখতে হবে। হিমালয়ের একটি হিমবাহ ভেঙে গেলেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বাংলাদেশের নদীতে বন্যা হবে—এমন কোনো সরল সমীকরণ নেই। বরং দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিগুলো কয়েকটি পথে তৈরি হয়। হিমবাহ ও তুষার গলার সময় ও পরিমাণ পরিবর্তিত হলে নদীর seasonal flow বদলাতে পারে। হিমবাহ-হ্রদের আয়তন বাড়লে কিছু এলাকায় GLOF বা Glacial Lake Outburst Flood-এর ঝুঁকি বাড়তে পারে। পাহাড়ি ভূমিধস ও debris flow নদীতে বিপুল পলি নিয়ে আসতে পারে। অতিবৃষ্টি ও বৃষ্টির সময়সূচির পরিবর্তন নদীর প্রবাহের আচরণ বদলে দিতে পারে। আর এসবের সম্মিলিত প্রভাব পড়তে পারে কৃষি, জলবিদ্যুৎ, পানি নিরাপত্তা, নদীভাঙন এবং অবকাঠামোর ওপর। অর্থাৎ পাহাড়ের পরিবর্তনকে শুধু পাহাড়ের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ ক্রমেই কমছে।
বাংলাদেশের করণীয় কী? প্রথমত, হিমালয়ভিত্তিক আঞ্চলিক আগাম সতর্কতা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শুধু নদীর gauge station নয়—হিমবাহ, glacier lake এবং উচ্চভূমির ভূমিধসের ঝুঁকিও নিয়মিত পর্যবেক্ষণে আনতে হবে। তৃতীয়ত, satellite data, remote sensing এবং AI-assisted forecasting-এ বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। চতুর্থত, আন্তঃসীমান্ত পানি কূটনীতিকে দুর্যোগ কূটনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। পঞ্চমত, স্থানীয় মানুষকে early-warning system-এর কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে। কারণ একটি সতর্কবার্তা তখনই সফল, যখন সেটি বিজ্ঞানীর কম্পিউটার থেকে বেরিয়ে নদীর পাড়ের মানুষের হাতে পৌঁছায়।
নেপালের জন্য সংহতি—শুধু আবেগ নয় : বাংলাদেশ দুর্যোগের দেশ। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস—এসবের সঙ্গে লড়াই করতে করতে আমরা জানি, দুর্যোগের অভিঘাত কোনো পরিসংখ্যান নয়। একজন মৃত মানুষ মানে একটি পরিবার। একজন নিখোঁজ মানুষ মানে একটি পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষা। একটি ভেঙে যাওয়া সেতু মানে একটি জনপদের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। একটি ধ্বংস হওয়া জলবিদ্যুৎ প্রকল্প মানে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়—একটি অঞ্চলের যোগাযোগ ও জীবনযাত্রায় দীর্ঘস্থায়ী আঘাত। নেপালের মানুষ আজ সেই বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
তাই বাংলাদেশের সংহতি শুধু কূটনৈতিক সৌজন্য হওয়া উচিত নয়। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে নেপালের সরকার ও জনগণের প্রতি সংহতি জানিয়ে উদ্ধার ও ত্রাণ প্রচেষ্টায় সহায়তার প্রস্তুতির কথা বলেছে। বাংলাদেশের সংসদীয় পররাষ্ট্রবিষয়ক স্থায়ী কমিটিও এই সংহতি ও মানবিক সহায়তার অবস্থানকে সমর্থন করেছে। প্রয়োজনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, search and rescue, community-based early warning, flood forecasting এবং climate adaptation-এ বাংলাদেশ তার অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে পারে। কারণ দুর্যোগের সময়ে প্রতিবেশী হওয়া শুধু ভৌগোলিক বিষয় নয়।
মানবিকতারও একটি ভূগোল আছে- পাহাড়ের কান্না যেন সমতলের সতর্কবার্তা হয়- নেপালের এই বিপর্যয়কে যদি আমরা শুধু কয়েক দিনের সংবাদ হিসেবে দেখি, তাহলে সবচেয়ে বড় শিক্ষাটিই হারিয়ে ফেলব। আজ নেপালের পাহাড়ে বরফ, পাথর, পানি ও কাদার যে ভয়াবহ সংঘর্ষ আমরা দেখছি, সেটি আমাদের সামনে একটি প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে—
আমরা কি আগামী দিনের দুর্যোগের জন্য আজ প্রস্তুত হচ্ছি? হিমালয় বদলাচ্ছে -হিমবাহ বদলাচ্ছে- তুষার ও বৃষ্টির স্বাভাবিক ছন্দ বদলাচ্ছে- পাহাড়ের কিছু অংশ আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে- আর একই সময়ে সমতলে জনসংখ্যা, অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ছে। ঝুঁকি তাই শুধু প্রকৃতিতে নেই - ঝুঁকি আছে আমাদের প্রস্তুতির ঘাটতিতেও।
নেপালের এবারের বিপর্যয় সরাসরি বাংলাদেশের বন্যা নয়। কিন্তু এটি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ early warning—হিমালয় ও সমতলকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেখার সময় শেষ হয়ে আসছে। হিমালয়ের বিপর্যয়ও তাই শুধু হিমালয়ের নয়। পাহাড়ে যা বদলায়, তার কোনো না কোনো প্রতিধ্বনি একদিন সমতলে পৌঁছায়—কখনও নদীর পানিতে, কখনও বৃষ্টির আচরণে, কখনও কৃষকের মাঠে, কখনও খাদ্য ও পানির নিরাপত্তায়, কখনও মানুষের জীবনে।
নেপালের এই দুঃসময়ে বাংলাদেশের সংহতি তাই শুধু শোকের ভাষা নয়। এটি একটি অঙ্গীকারও হওয়া উচিত— পাহাড়ের বিপদকে আমরা সমতলের আগাম সতর্কবার্তা হিসেবে পড়ব। কারণ দুর্যোগ আসার পর প্রস্তুতি নেওয়ার সময় থাকে না।
প্রস্তুতির সময় হলো—দুর্যোগ আসার আগেই।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।