সমকালীন বাংলা সাহিত্যের ‘রাজপুত্র’ হুমায়ূন আহমেদ। বিস্ময়কর প্রতিভাধর এই সব্যসাচী তাঁর জিয়নকাঠির আলো ছড়িয়ে জনপ্রিয়তায় নিজেকে অসামান্য উচ্চতায় স্থাপন করেছিলেন। ‘নন্দিত নরকে’ দিয়ে সাহিত্য গগনে অতি অকস্মাৎ ধূমকেতুর মতো আবির্ভাব ঘটেছিল কিংবদন্তী হুমায়ূন আহমেদের। ক্ষণজন্মা হুমায়ূন আহমেদ (১৯৪৮-২০১২) উজ্জ্বলপ্রভ এক অভিনব কণ্ঠস্বর নিয়ে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে প্রবেশ করেন যাদু বাস্তবতা নিয়ে। নাগরিক মধ্যবিত্ত, তারুণ্য-শাসিত আবেগে-আকাঙ্ক্ষায় উচ্চকিত হুমায়ূন আহমেদ জীবনার্থ সন্ধানে স্বপ্নময় ভবিষ্যতে বিশ্বাসী ছিলেন। শুরু থেকেই তাঁর উপন্যাসের ভাষা ছিল সহজ-সরল, স্বচ্ছন্দ ও গতিময়। গল্প বলার অসাধারণ এক সম্মোহনী শক্তি ছিল তাঁর। এই গল্প বলার জাদুকরী শক্তিই তাঁকে অতিদ্রুত খ্যাতির চূড়ায় স্থাপন করেছিল। উত্তরকালে হুমায়ূন আহমেদ হয়ে ওঠেন জীবনরসিক, রূপদক্ষ এক অসাধারণ জননন্দিত কথাশিল্পী। তিনি অনিবার্যভাবে বাংলা সাহিত্যে মধ্যবিত্ত শ্রেণির যাপন ও দিনবদলের কথাকার। আজন্ম তিনি লিখে গেছেন মধ্যবিত্ত প্রেম এবং তার টানাপড়েন। তিনি আপন প্রতিভার ক্ষুরধারে দ্রুত হয়ে ওঠেন সময়ের শ্রেষ্ঠ এবং জনপ্রিয় কথাশিল্পী। কাহিনি-বর্ণনায় টানটান উত্তেজনা, কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনার বিন্যাস, চমকপ্রদ নাটকীয়তা, বৈচিত্র্যময় ও বিশ্বাসযোগ্য চরিত্র সৃষ্টি এবং গভীর অন্তর্দৃষ্টি হুমায়ূন আহমেদকে পাঠকপ্রিয়তার তুঙ্গে তুলে আনে। স্বাধীনতা-উত্তর শহরকেন্দ্রিক গড়ে ওঠা নতুন মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্তের শিক্ষিত শ্রেণিই মূলত হুমায়ূন আহমেদের প্রধান পাঠক। একাধারে উপন্যাস, ছোটগল্প, ভ্রমণ-আখ্যান, ব্যক্তিগত রচনা, আত্মজীবনী, রস-রহস্য, কবিতা, গান, নাটক, চলচ্চিত্র, ছবি আঁকা, ছোটদের রচনা, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি, হিমু, শুভ্র, মিসির আলি, রুপা, মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস, রাজনৈতিক উপন্যাস, ঐতিহাসিক উপন্যাস– বিচিত্র সৃষ্টিসম্ভারে তিনি আমাদের সাহিত্যকে সমৃদ্ধ সুশোভিত করেছেন। তিন শতাধিক গ্রন্থের জনক এ মানুষটিকে বলা হয় বাংলা সায়েন্স ফিকশনের পথিকৃৎ। বাংলা কথাসাহিত্যে তিনি সংলাপপ্রধান নতুন শৈলীর জনক।
নাটক ও চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবেও তিনি অসম সমাদৃত। বাদ যায়নি গীতিকার কিংবা চিত্রশিল্পীর পরিচয়ও। সৃজনশীলতার প্রতিটি শাখায় তাঁর সমান দক্ষতার বিচরণ ছিল। অর্জন করেছেন সর্বোচ্চ সফলতা এবং তুমুল জনপ্রিয়তা। স্বাধীনতা পরবর্তী বাঙালি জাতিকে হুমায়ুন আহমেদ উপহার দিয়েছেন তাঁর অসামান্য গল্প উপন্যাস, নাটক এবং চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রের বদৌলতে মানুষকে করেছেন হলমুখী। হুমায়ূন আহমেদের কল্যাণে এ দেশের প্রকাশনাশিল্প জেগে ওঠে, পাঠক তৈরিতে নতুন এক ইতিহাস রচনা করেন। হুমায়ূন আহমেদের প্রতিটি নতুন বইয়ের জন্য তৃষ্ণার্ত হয়ে পাঠক অধীর অপেক্ষায় থাকতেন। প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে তিনি ক্রমাগত লিখে গেছেন, পাঠক-তৃষ্ণা মিটিয়েছেন।
ঘটনাপ্রধান, পরিবারভিত্তিক উপন্যাসগুলোতে হুমায়ূন আহমেদ আত্মকথন বা উত্তমপুরুষে বর্ণিত রীতিকে ব্যবহার করেছেন। যেমন নন্দিত নরকে, শঙ্খনীল কারাগার, এইসব দিন রাত্রি, বহুব্রীহি, কোথাও কেউ নেই ইত্যাদি। চরিত্রকথন রীতির উপন্যাসগুলোতে তিনি সংলাপের মাধ্যমে যেমন চরিত্রকে জীবন্ত করে তোলেন, তেমনি ঘটনাপ্রবাহকে এগিয়ে নিয়ে যান। চরিত্রের নাটকীয় বাঁক পরিবর্তন ও কাহিনির সফল পরিণতি দান করতে এ-পদ্ধতির জুড়ি মেলা ভার। মিসির আলি এবং হিমু চরিত্র সিরিজের উপন্যাসগুলোতে হুমায়ূন আহমেদ এই চরিত্রকথন রীতির সফল প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। বর্ণনামূলক রীতির উপন্যাসেও হুমায়ূন আহমেদ অভিনবত্ব দেখিয়েছেন। বর্ণনার ধরাবাঁধা পথে তিনি হাঁটেননি। কাহিনি বর্ণনার প্রথাবদ্ধ পথে চলার বাধ্যবাধকতা না থাকায় পাঠক নিজের কল্পনাকে অবাধে মেশানোর সুযোগ পান বলে পাঠক নিজেই একাত্ম হয়ে ওঠেন। এ-ধারার উপন্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে জোছনা ও জননীর গল্প, বাদশা নামদার, দেয়াল, মধ্যাহ্ন ইত্যাদি। নাট্য গঠনরীতির উপন্যাসে হুমায়ূন আহমেদ কথার পিঠে কথা সাজিয়ে সংলাপের পথ ধরে পৌঁছে যান চরিত্রের গভীরে। উঠে আসে আবেগ আর অনুভূতির চিরন্তন সত্যগুলো। মানবজীবনের চিরন্তন সুখ-দুঃখ, আলো-অন্ধকারে ঘেরা জীবনের আত্মোন্মোচন ঘটে এ-পদ্ধতিতে। কথাসাহিত্যের সাফল্য বহুলাংশে নির্ভর করে চরিত্র সৃষ্টির ওপর। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে বলতেই হয়, হুমায়ূন আহমেদ বাংলা কথাসাহিত্যে বেশকিছু অবিস্মরণীয় চরিত্র উপহার দিয়েছেন। হিমু, মিসির আলি, শুভ্র, রুপা– কালজয়ী, প্রভাব সঞ্চারী অমর চরিত্র। তাঁর উপন্যাসের আঙ্গিক-প্রকরণের নিরীক্ষাও কম নয়। যে আঙ্গিকেই তিনি সাহিত্য রচনা করেন না কেন, আগাগোড়াই তাঁর সাহিত্য দ্যুতিময়। কোনো লেখকেরই সব রচনা সেরা হয় না, সমান মর্যাদা পায় না। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের বৈশিষ্ট্য, তাঁর সব ধরনের লেখার মধ্যে একটা সাধারণ মান বজায় রাখতে সমর্থ হয়েছেন। এভাবে যুগের সব অভিজ্ঞানকে আত্মস্থ করে তিনি হয়ে ওঠেন সমকালের আশ্চর্য এক কথক। ফলে তাঁর সৃষ্টিমালা এখনো সমানভাবে জনপ্রিয়। তাঁর লেখা উপন্যাস-সায়েন্স ফিকশন আজও বেস্ট সেলার।
২০১২ সালের ১৯ জুলাই ৬৩ বছর বয়সে নিউইয়র্কের বেলভিউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। আর মাত্র ক’দিন পরেই তাঁর ১৪ তম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হবে। বর্ণাঢ্য জীবনের জননন্দিত সাহিত্য কর্তার বাহ্যিক মৃত্যু হলেও তিনি বেঁচে থাকবেন বহু যুগ শতাব্দী অমর সাহিত্যকীর্তির মাধ্যমে। একজন হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদে পরিণত হয়েছেন। তাঁর প্রতি জীবন-কর্ম,কাজের পরিবেশ, বাস্তুভিটা, রুচিবোধ এবং তাঁর সময়কার সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা গ্রহণে বিশেষ করে তরুণ সম্প্রদায়ের মধ্যে কৌতূহল অনিঃশেষ। গুণী লেখক ও শিল্পীদের বাড়ি এবং স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহ সংরক্ষণ করা একটি জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ইতিহাস ও সাহিত্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বেশ কয়েকজন প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও শিল্পীর বাড়ি সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে ঐতিহাসিক স্মৃতিকেন্দ্র হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, আবার কিছু স্থান এখনো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
বিশ্বের বিখ্যাত ব্যক্তিদের স্মৃতি সংরক্ষণে তাদের বাসস্থানগুলোকে প্রায়শই স্মৃতি জাদুঘর বা ‘হাউস মিউজিয়াম’-এ রূপান্তর করা হয়। এই বাড়িগুলো শুধু ইতিহাসই ধরে রাখে না, বরং দর্শনার্থীদের সেইসব মনীষীদের ব্যক্তিগত জীবন ও কর্মক্ষেত্রের খুব কাছাকাছি নিয়ে যায়। সংরক্ষিত বাস্তুভিটাগুলো দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করে, যা দেশের অর্থনীতি ও পর্যটন খাতের উন্নয়ন ঘটায়। দীর্ঘদিন ধরে হুমায়ূন আহমেদের মুগ্ধ পাঠক, শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি বোদ্ধা, সুধীজনরা দাবি করে আসছেন আমাদের দেশের বিখ্যাত-প্রখ্যাত শিল্পী সাহিত্যিক গুনীজনদের বাস্তুভিটা-বাড়ি-ঘর, স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহ সংরক্ষণ করতে হবে। স্মৃতি যাদুঘর করতে হবে। দেশের প্রত্নতত্ত্ব আইন ও আন্তর্জাতিক নীতিমালার আওতায় এনে তাদের স্থাপনা দখল বা ধ্বংস হওয়া থেকে রক্ষা করার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।তাদের সৃষ্টিকর্ম, তাদের পাণ্ডুলিপি, তাদের বাড়িগুলোর স্থাপত্যশৈলী এবং ব্যবহৃত সামগ্রী থ্রিডি স্ক্যানিং ও ডিজিটাল ক্যাটালগের মাধ্যমে সংরক্ষণ করতে হবে।
দেশের সর্বস্তরের মানুষ জানেন, হুমায়ূন আহমেদের হাতে গড়া গাজীপুরের পিরুজালী গ্রামের রূপকথার রাজ্য নুহাশ পল্লী। তাঁর ধানমন্ডির দখিন হাওয়া। তাঁর জনপ্রিয় বই ও নাটকের আবহ ও গল্পে এই পরিচিত ঠিকানা ঘুরেফিরে এসেছে। নুহাশ পল্লীতে বসে লিখেছেন উপন্যাস গল্প নাটক। তাঁর নাটক এবং সিনেমার সুটিং হয়েছে। তাঁর সময় যাপনের প্রিয় ঠিকানা ছিল নিজ ও প্রিয়তম সন্তান নুহাশ হুমায়ূনের নামে প্রায় ৪০ বিঘা জমির ওপর অবস্থিত ‘নুহাশ পল্লী’ হুমায়ূন আহমেদের নিজ হাতে গড়া এক স্বপ্নভূমি ও প্রকৃতিপ্রেমের অনন্য নিদর্শন। প্রায় ৩০০ প্রজাতির ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছ, এখানে হুমায়ূন আহমেদের প্রিয় বৃষ্টিবিলাস কটেজ, ট্রি-হাউস, সুইমিং পুল এবং তার সমাধি রয়েছে। নুহাশ পল্লীতে ঢুকলেই বাম দিকে চোখে পড়বে এক মনোরম সবুজ প্রান্তর। তারই পাশে লিচু বাগানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন হুমায়ূন আহমেদ।
তিনি প্রায়শই নুহাশ পল্লীতে চলে আসতেন সময় কাটাতে। কখনো আসতেন সপরিবারে, কখনো আসতেন বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে রাতভর আড্ডা দিতে। প্রতি বছর ১লা বৈশাখে নুহাশ পল্লীতে বৈশাখি মেলার আয়োজন করা হতো। নুহাশ পল্লীতে হুমায়ূন আহমেদ শুটিং স্পট, লীলাবতী দিঘি আর তিনটি সুদৃশ্য বাংলো গড়ে তুলেছেন। একটিতে তিনি থাকতেন আর বাকি দুটিতে তিনি তার শৈল্পিক চিন্তাধারার বিকাশ ঘটিয়েছিলেন। শানবাঁধানো ঘাটের দিঘির দিকে মুখ করে বানানো বাংলোকে তিনি ‘ভূত বিলাস’ নাম দিয়েছিলেন। দুর্লভ সব ঔষধি গাছ নিয়ে যে বাগান তৈরি করা হয়েছে তার পেছনেই রূপকথার মৎস্যকন্যা আর রাক্ষসের ভাস্কর্য রয়েছে। আরও রয়েছে পদ্মপুকুর ও অর্গানিক শৈলীতে নকশা করা এবড়োথেবড়ো সুইমিং পুল। ‘বৃষ্টি বিলাস’ বাংলো থাকতেন তিনি।এক সময়ে এই বরেণ্য সাহিত্যিক তাঁর অতিথিদের নুহাশ পল্লী ঘুরে দেখাতেন। বিভিন্ন গাছের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেন। কথার জাদুকর হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা ছিলো এই নুহাশ পল্লি।
তাঁর মৃত্যুর পরে নুহাশ পল্লীর দখল ও মালিকানা নিয়ে বিতর্ক ও বিরোধ চলে আসছে। লেখকের দ্বিতীয় স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন বিগত পতিত আওয়ামী লীগ সরকারি প্রভাবে নুহাশ পল্লী করায়ত্ব করে বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ করেছেন নুহাশের পরিবার।
সচেতন মহলের অনেকে মনে করেন, লেখক ও শিল্পীদের স্মৃতি সংরক্ষণে তাঁদের বাড়ি বা আবাসস্থল সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে কবি-সাহিত্যিকদের স্মৃতিবিজড়িত অনেক ঐতিহাসিক স্থান রয়েছে, যেগুলো তাঁদের সৃষ্টি ও জীবনকর্মের অমূল্য দলিল হিসেবে টিকে আছে। লেখক ও শিল্পীদের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িঘর তাদের সৃষ্টি ও জীবনাদর্শের অনন্য দলিল। বাড়িগুলোকে জাদুঘর বা সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে রূপান্তর করে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ইতিহাস সংরক্ষণ করা যায়। তবে বর্তমানে অনেক ঐতিহাসিক ভিটা, যেমন হুমায়ুন আহমেদ বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে আবির্ভূত একজন প্রখ্যাত বাঙালি সাহিত্যিক। তাঁর স্মৃতিবিজড়িত নুহাশ পল্লী, অবহেলার শিকার হচ্ছে।
পৃথিবীর সেরা লেখক ও শিল্পীদের স্মৃতি সংরক্ষণ করা হয় তাঁদের সৃষ্টিকর্ম, ব্যবহৃত জিনিসপত্র এবং বাসভবনকে জাদুঘরে রূপান্তরের মাধ্যমে। এছাড়া, তাঁদের জীবন ও সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা, জীবনীগ্রন্থ রচনা এবং প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের মাধ্যমে তাঁদের অবিনশ্বর সৃষ্টি ও আদর্শ চিরকাল বাঁচিয়ে রাখা হয়। বিশ্ববিখ্যাত সাহিত্যিক ও শিল্পীদের শেষ জীবন বা কর্মজীবন কাটানো বাড়িগুলো সাধারণত জাদুঘরে রূপান্তরিত করা হয়। লেখক ও শিল্পীদের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িগুলো আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। সাহিত্য-সংস্কৃতিকে অমরত্ব দান করতে হলে তাদের ভালোবাসতে হবে। অজানা বিস্মৃত অধ্যায় স্বজাতির সাহিত্য-সংস্কৃতির অতীত ইতিহাস উপলব্ধি করতে হবে। স্মৃতিকে সংরক্ষণ করতে হবে। বাংলাদেশে সরকারি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ও বিভিন্ন ট্রাস্ট অনেক বাড়ি সংরক্ষণ করে থাকে। দেশ বরেণ্য সাহিত্যিক কিংবদন্তি হুমায়ূন আহমেদের বাস্তুভিটা জাতির স্মৃতির বাতিঘর। নুহাশ পল্লী অধিগ্রহণ করে হুমায়ুন আহমেদ স্মৃতি জাদুঘর বা ‘হাউস মিউজিয়াম করা জরুরি। সেইখানে ফিল্ম ইনস্টিটিউট থাকবে ক্রিয়েটিভ রাইটিং ইনস্টিটিউট থাকবে। একটা ট্রাস্টের অধীনে চলবে ৷ হুমায়ূন আহমেদের পুত্র নুহাশকে ট্রাস্টি বোর্ডে রাখা যায়।
দেশ-বিদেশে এরকমটাই হয়ে আসছে। বিখ্যাত নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের জন্মভিটা ও জীবনের শেষ সময় কাটানোর বাড়িটি বর্তমানে অতি যত্ন সহকারে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এটি দেখার জন্য সারা বিশ্বের পর্যটকরা ছুটে যান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের জীবনের শেষ ২২ বছর কাটানো বাড়িটি একটি সংরক্ষিত ঐতিহাসিক স্থান। তলস্তয়ের এস্টেট ‘ইয়াসানায়া পলিয়ানা’ আজ রাশিয়ার অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক তীর্থস্থান। বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েডের শেষ জীবনের বাড়িটি একটি জাদুঘরে রূপান্তরিত হয়েছে, যেখানে তার ব্যবহৃত বিখ্যাত সাইকিয়াট্রিস্টের কোচ এবং বইয়ের সংগ্রহ সংরক্ষিত আছে। বিখ্যাত আমেরিকান লেখক নাথানিয়েল হথর্ন-এর অনুপ্রেরণায় এই বাড়িটিকে পরবর্তীতে জাদুঘর ও স্থানীয় অভিবাসীদের কল্যাণে সেটেলমেন্ট হাউস হিসেবে গড়ে তোলা হয়। নেলসেল ম্যান্ডেলার ঐতিহাসিক বাড়িটি ‘ম্যান্ডেলা হাউস’ নামে পরিচিত। এটি একটি মিউজিয়াম হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, যেখানে তার ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ও সংগ্রামময় জীবনের ইতিহাস প্রদর্শিত হয়। ফ্রান্সে ভিক্টর হুগোর বাড়ি বা পাবলো পিকাসোর মিউজিয়াম। এটি অনুরাগীদের তাঁদের কাজের পরিবেশ অনুভব করতে সাহায্য করে, তাঁদের অরিজিনাল পাণ্ডুলিপি, চিত্রকর্ম এবং দুর্লভ স্কেচগুলো ডিজিটাল আর্কাইভ ও আর্ট গ্যালারিতে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সংরক্ষণ করা হয় যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তা থেকে শিক্ষা নিতে পারে।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম ঔপন্যাসিক মীর মশাররফ হোসেনের স্মৃতি রক্ষার্থে রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার পদমদী গ্রামে এই স্মৃতি কেন্দ্র ও জাদুঘর নির্মিত হয়েছে। জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের স্মৃতিধন্য ত্রিশালের দরিরামপুর এবং কাজীর শিমলা গ্রামের দারোগা বাড়িকে “নজরুল স্মৃতিকেন্দ্র” হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, যেখানে কবির ব্যবহৃত ঐতিহাসিক খাট ও অন্যান্য জিনিসপত্র রয়েছে। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত কুষ্টিয়ার শিলাইদহ কুঠিবাড়ি এবং সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর কাচারিবাড়ি দর্শনীয় স্থান হিসেবে সংরক্ষিত। শান্তিনিকেতনের আদি বাড়ি ও অন্যান্য বাসভবনও সুরক্ষায় রয়েছে। নোবেলজয়ী মার্কিন লেখক আর্নেস্ট হেমিংওয়ের স্প্যানিশ উপনিবেশ আমলের বাড়িটি এখন একটি জনপ্রিয় জাদুঘর, যেখানে তার লেখালেখির ঘর এবং বিড়ালদের বংশধরদের দেখা মেলে। বাংলাদেশের নরসিংদী জেলার পাঁচদোনা গ্রামে ভাষাবিদ ও গবেষক ভাই গিরিশ চন্দ্র সেনের বাড়িটি জাদুঘর হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর মুন্সীগঞ্জের রাঢ়ীখালের পৈত্রিক বাড়িটি বর্তমানে বিজ্ঞান কমপ্লেক্স ও জাদুঘর হিসেবে সংরক্ষিত। কপোতাক্ষ নদের তীরে সাগড়দাঁড়িতে অবস্থিত মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়িটিকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর “মধুপল্লী” হিসেবে রূপান্তর করে কবির স্মৃতিচিহ্ন ও জীবনালক্ষ্য সংরক্ষণ করছে। এটি একটি বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র এবং সেখানে তাঁর ব্যবহৃত জিনিসপত্র নিয়ে জাদুঘর গড়ে তোলা হয়েছে।
বাংলাদেশের ইতিহাস ও সাহিত্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বেশ কয়েকজন প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও শিল্পীর বাড়ি সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে ঐতিহাসিক স্মৃতিকেন্দ্র হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, আবার কিছু স্থান এখনো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশের নন্দিত কথাসাহিত্যিক ও নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের স্মৃতিবিজড়িত এক অনিন্দ্য সুন্দর নন্দন কানন গাজীপুরের নুহাশ পল্লী দ্রুত সংরক্ষণের বন্দোবস্ত করার দাবি উচ্চারিত হচ্ছে সর্বস্তর থেকে।
এই প্রসঙ্গে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, সাহিত্য সংস্কৃতি জগতের অনেকেই বলেছেন এবং আমার নিজের কাছে মনে হয়েছে, বরেণ্য লেখক হুমায়ূন আহমেদ আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনে একজন মহিরুহ ব্যক্তিত্ব। হুমায়ূন আহমেদ পাঠকের মনোজগৎ বদলে দিয়েছেন। তরুণ সম্প্রদায়কে বইমুখী করার অভাবনীয় কীর্তি তার। চলচ্চিত্রের গতিপ্রকৃতি বদলে দিয়েছে তার চলচ্চিত্র। হলমুখী করেছিল দর্শকদের। টেলিভিশনে তার নাটক পারিবারিক বিনোদনের নতুন অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছিল। তাঁর প্রতি মানুষের মুগ্ধতা ছিল। তার একটি অমর কীর্তি নুহাশ পল্লী। এ কারণে অনেকে হুমায়ূন আহমেদের এই নন্দন কাননকে জাতীয়ভাবে সংরক্ষণ করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছে। তবে দাবি জানালেই তো হয় না, বাস্তবতা ও আইনগত বিষয় আছে। নুহাশ পল্লী হয়তো কোনো ব্যক্তি মালিকানাধীন বা পরিবারের মালিকানায় আছে, আমরা ঠিক জানি না। এটা আমাদের খতিয়ে দেখতে হবে। আইনগত দিকগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে হবে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠান সংরক্ষণের ক্ষেত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষা পর্যবেক্ষণের অবকাশ রয়েছে। আমার মনে হয়, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ কীর্তি জাতীয়ভাবে সংরক্ষণের যৌক্তিকতা রয়েছে। এটি জনদাবি হলে সরকার খতিয়ে দেখবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
টিকা দেওয়ার পরও ময়মনসিংহে হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। গত ২৪ ঘণ্টায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত সাড়ে সাত মাস বয়সী এক ছেলে শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে হাসপাতালটিতে হাম আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৯-এ। শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাতে হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটির মৃত্যু হয়। তার বাড়ি ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলায়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে নতুন করে ৫৪ শিশুকে ভর্তি করা হয়েছে। বর্তমানে সেখানে মোট ১৩৮ শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। হাসপাতালের হিসাব অনুযায়ী, গত ১৭ মার্চ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মোট ৫ হাজার ২২২ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৫ হাজার ৫ শিশু। হাম আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যু ও নতুন রোগী ভর্তির এই পরিস্থিতিতে হাসপাতালটিতে চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রয়েছে।
গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলায় জমি-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে ছোট ভাই আজিজুল মিয়া (৫৪) হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার প্রধান আসামি বড় ভাই জসিজল হক ওরফে ডিপটিকে (৬৫) গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি-১৩)। রোববার (১৮ অক্টোবর) ভোররাতে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে পলাশবাড়ী উপজেলার পূর্ব নয়নপুর গ্রামে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সন্ধ্যায় এসআরবি-১৩-এর সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) মুহম্মদ মনিরুজ্জামান স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি জানানো হয়। গ্রেপ্তার জসিজল হক সাদুল্লাপুর উপজেলার পশ্চিম ইসবপুর গ্রামের মৃত আজিম উদ্দিনের ছেলে। নিহত আজিজুল মিয়া তার আপন ছোট ভাই। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার চার আসামির মধ্যে এখন পর্যন্ত দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এসআরবির সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, দুই ভাইয়ের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে জমি নিয়ে বিরোধ চলছিল। গত ১৪ অক্টোবর দুপুরে জসিজল ও তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আজিজুলের বাড়ির আঙিনায় প্রবেশ করে একটি পাকা গোয়ালঘর নির্মাণের কাজ শুরু করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় আজিজুল ও তার স্ত্রী শাপলা বেগম নির্মাণকাজে বাধা দিলে তাদের ওপর হামলা চালানো হয় বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে। একপর্যায়ে জসিজল বাঁশের লাঠি দিয়ে আজিজুলের মাথায় আঘাত করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে আজিজুল গুরুতর আহত হন। হামলায় তার স্ত্রীও আহত হন এবং তাকে শ্লীলতাহানি করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। পরে স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা আহত আজিজুলকে উদ্ধার করে সাদুল্লাপুর উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যান। সেখানে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৫ অক্টোবর রাত পৌনে ১১টার দিকে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় ১৬ অক্টোবর নিহতের স্ত্রী শাপলা বেগম বাদী হয়ে সাদুল্লাপুর থানায় চারজনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। মামলার নম্বর ১৯। হত্যাকাণ্ডের পর প্রধান আসামিসহ অন্যদের গ্রেপ্তারে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ায় এসআরবি-১৩। এর ধারাবাহিকতায় রোববার ভোররাতে অভিযান চালিয়ে পলাতক প্রধান আসামি জসিজলকে গ্রেপ্তার করা হয়। সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য গ্রেপ্তার আসামিকে সাদুল্লাপুর থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। এদিকে ঘটনার দিনই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য জসিজলের স্ত্রীকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল। পরে হত্যা মামলায় তাকে চার নম্বর আসামি করা হলে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
রাজবাড়ী শহরের সজ্জনকান্দায় মসজিদের সামনে গুলিতে নিহত ডিশ ব্যবসায়ী পিয়ারুল ইসলাম (৩৫) হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে। নিহতের স্ত্রী ফারজানা হক বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে রাজবাড়ী সদর থানায় মামলাটি দায়ের করেছেন। রোববার (১৮ অক্টোবর) বিকেলে মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন রাজবাড়ী সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) উত্তম কুমার ঘোষ। এর আগে শনিবার রাতে দায়ের করা মামলাটির নম্বর ২০। এতে দণ্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। নিহত পিয়ারুল ইসলাম রাজবাড়ী সদর উপজেলার রামকান্তপুর ইউনিয়নের বড় মুরারীপুর গ্রামের হারুন সরদারের ছেলে। তিনি কয়েক বছর ধরে রাজবাড়ী পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সজ্জনকান্দা পূর্বপাড়া এলাকায় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস করতেন। ওই এলাকায় ডিশ লাইনের ব্যবসা করতেন তিনি। পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পিয়ারুলের বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র, ডাকাতি ও মাদকসহ বিভিন্ন অভিযোগে একাধিক থানায় ১৪টি মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে। স্থানীয়ভাবে তিনি সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। মসজিদের সামনে গুলি মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত ১৬ অক্টোবর সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টা ৩৫ মিনিটে সজ্জনকান্দা পূর্বপাড়া জামে মসজিদে নামাজ শেষে উত্তর পাশের কলাপসিবল গেটের সামনে পাকা রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলেন পিয়ারুল। এ সময় দুটি মোটরসাইকেলে করে চারজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি সেখানে এসে থামেন। তাদের মধ্যে একজন আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে পিয়ারুলকে লক্ষ্য করে পরপর দুই রাউন্ড গুলি ছোড়েন। এতে একটি গুলি তার বুকের বাঁ পাশে লাগে। গুরুতর আহত অবস্থায় তিনি রাস্তায় পড়ে যান। গুলির শব্দ শুনে স্থানীয় লোকজন ঘটনাস্থলে ছুটে এসে তাকে উদ্ধার করেন। পরে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে অবস্থার অবনতি হওয়ায় কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। তবে অ্যাম্বুলেন্সে করে ফরিদপুরে নেওয়ার পথে রাত আনুমানিক ৮টা ৫ মিনিটে গোয়ালন্দ মোড় এলাকায় পৌঁছালে পিয়ারুলের মৃত্যু হয়। ময়নাতদন্ত শেষে দাফন পরে পিয়ারুলের মরদেহ রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে ফিরিয়ে আনা হয়। পুলিশ সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির পর ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করে। ১৭ অক্টোবর ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। ওই দিন আসরের নামাজের পর সজ্জনকান্দা ভোকেশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে পাশের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। পূর্ববিরোধের জেরে হত্যার সন্দেহ মামলার এজাহারে নিহতের স্ত্রী উল্লেখ করেছেন, পূর্ববিরোধের জেরে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা পরস্পর যোগসাজশে পূর্বপরিকল্পিতভাবে প্রকাশ্যে গুলি করে তার স্বামীকে হত্যা করেছেন বলে তিনি ধারণা করছেন। তবে হত্যাকাণ্ডের পেছনের প্রকৃত কারণ এবং জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। রাজবাড়ী সদর থানার ওসি উত্তম কুমার ঘোষ বলেন, পিয়ারুলের স্ত্রী বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছেন। পুলিশ মামলাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং এর পেছনের কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত চলছে।