আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার থেকে সারা দেশে শুরু হয়েছে প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা। তবে এই প্রচার ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের শঙ্কা, সামনের দিনগুলোতে সংঘাত ও সহিংসতা বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে অতীতে লুণ্ঠিত পুলিশের অস্ত্র এবং অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে।
তবে পুলিশ বলছে, নির্বাচনকেন্দ্রিক যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত। গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে দেড় লাখের বেশি পুলিশ সদস্যকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি ড্রোন, সিসিটিভি, ডগ স্কোয়াড ও বডি ওর্ন ক্যামেরার ব্যবহার শুরু করেছে পুলিশসহ অন্যান্য বাহিনী।
নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের কড়া নির্দেশনা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী ও পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আনুষ্ঠানিক প্রচারণার প্রথম দিনই পৃথক অভিযানে অস্ত্র ও গুলিসহ দুজনকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। রাজধানীর শ্যামপুর এলাকা থেকে দুইটি অবৈধ পিস্তল, চারটি ম্যাগাজিন ও ২১ রাউন্ড গুলিসহ অস্ত্র ব্যবসায়ী আজগর আলী ভোলাকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ভোলা জানায়, এসব অস্ত্র ঢাকার বাইরে থেকে এনে একটি রাজনৈতিক দলের এক নেতার কাছে বিক্রির পরিকল্পনা ছিল। একই দিনে কুমিল্লা থেকে একটি পিস্তল, ১০ রাউন্ড গুলি ও অন্যান্য সরঞ্জামসহ কে আই এম মাসুদুল হক মাসুম নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি কুমিল্লা মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমির একেএম এমদাদুল হক মামুনের ছোট ভাই।
নির্বাচনি নিরাপত্তা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, এবারের জাতীয় নির্বাচন হবে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর নির্বাচন। তিনি জানান, প্রথমবারের মতো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ, বডি ওর্ন ক্যামেরা, সিসিটিভি, ড্রোন ও ডগ স্কোয়াড ব্যবহারের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দেশজুড়ে দুই ধাপে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হবে—প্রথম ধাপে চলমান মোতায়েন অব্যাহত থাকবে এবং দ্বিতীয় ধাপে ভোটকেন্দ্রিক দায়িত্ব পালন করবেন সদস্যরা, যা ৮ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) ড. নাঈম আশফাক চৌধুরী বলেন, প্রত্যাশিত মাত্রায় নিরাপত্তা প্রস্তুতি না থাকায় তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করেও সংঘাত-সহিংসতা ঘটছে। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের আবরণে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থে পরিকল্পিতভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে।
অন্যদিকে আইজিপি বাহারুল আলম দাবি করেন, নিরাপত্তা প্রস্তুতিতে কোনো ঘাটতি নেই। কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে সঙ্গে সঙ্গে আইনের আওতায় আনা হবে। বডি ওর্ন ক্যামেরার মাধ্যমে ঘটনাস্থলের সবকিছু রেকর্ড করা হচ্ছে—ফলে মিথ্যা অভিযোগ কিংবা অপরাধ করে পার পাওয়ার সুযোগ নেই। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান আগের চেয়ে আরও জোরদার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
পুলিশ সদর দপ্তরের এক ডিআইজি জানান, সম্প্রতি সারা দেশের রেঞ্জ ডিআইজি, মেট্রোপলিটন কমিশনার ও পুলিশ সুপারদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে আইজিপি নির্দেশ দিয়েছেন—নির্বাচনি পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে কাউকে ছাড় দেওয়া যাবে না। সব প্রার্থীর সঙ্গে সমান আচরণ করতে হবে এবং যেসব প্রার্থীর নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে, তাদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও গানম্যান দিতে হবে।
ডিএমপি কমিশনার শেখ সাজ্জাত আলী জানান, নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব বজায় রেখে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেউ দায়িত্বে অবহেলা করলে তার বিরুদ্ধে স্ট্যান্ড রিলিজসহ কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম জানান, ১৩ ডিসেম্বর থেকে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে ৯০ হাজারের বেশি চেকপোস্ট পরিচালনা করা হয়েছে। এ সময়ে ১৩ লাখের বেশি যানবাহন তল্লাশি করে প্রায় ৫৮ হাজার ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের আগস্টে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সময় বিভিন্ন থানা ও পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় পাঁচ হাজারের বেশি আগ্নেয়াস্ত্র এবং বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ লুণ্ঠিত হয়। এর একটি অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। পুলিশের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাৎ হোসাইন জানান, এসব অস্ত্র নির্বাচনে ব্যবহারের আশঙ্কা মাথায় রেখেই অভিযান জোরদার করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০ শতাংশ অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে এবং বাকি অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান আরও তীব্র করা হবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
জাতীয় সংসদে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক অবস্থান, মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা এবং নির্বাচনী ইশতেহার নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ। তিনি দাবি করেন, দলটির নামের সঙ্গে ‘ইসলাম’ থাকলেও তাদের ঘোষিত নীতিমালায় ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা বা শরিয়াহভিত্তিক শাসনের কোনো সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি নেই। রোববার (২৮ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব মন্তব্য করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জামায়াতে ইসলামীর ৯৩ পৃষ্ঠার নির্বাচনী ইশতেহারে শরিয়াহ আইন, ইসলামী রাষ্ট্র, ইসলামী সমাজব্যবস্থা কিংবা ইসলামী অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে কোনো অঙ্গীকার নেই। এ প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, দলটি নিজেদের ইসলামী দল হিসেবে কীভাবে উপস্থাপন করছে। তিনি আরও বলেন, শিক্ষা বিষয়ে দলটির প্রস্তাবে কেবল মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, অথচ দেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থী সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত। জামায়াতের অতীত রাজনৈতিক ইতিহাস তুলে ধরে সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, দলটি ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির বিরোধিতা করেছিল এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষেও অবস্থান নেয়নি। মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন পাকিস্তানপন্থী প্রশাসনের সঙ্গে দলটির নেতাদের সম্পৃক্ততার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক জোটে অংশগ্রহণকে ‘সুবিধাবাদী রাজনীতি’ বলে আখ্যা দেন। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি দাবি করেন, বর্তমান সময়ে অপরাধ সংঘটিত হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং মামলা গ্রহণ ও তদন্ত প্রক্রিয়াও আগের তুলনায় অধিক কার্যকর হয়েছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট ঘটনায় দ্রুত আসামিদের গ্রেপ্তার ও অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে মাদক ও জুয়া নিয়ন্ত্রণে আধুনিক আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। বাজেট প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ৯ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট দেশের অর্থনীতিকে আরও স্বনির্ভর করার লক্ষ্য নিয়ে প্রণয়ন করা হয়েছে। উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানো এবং রাজস্ব ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখার ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এ সময় ইসলামী ব্যাংক ও ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালসের শেয়ার বিক্রি নিয়ে ওঠা বিতর্কেরও জবাব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি দাবি করেন, এ বিষয়ে তার বক্তব্যের পক্ষে প্রয়োজনীয় অডিট রিপোর্ট ও দালিলিক তথ্য সরকারের কাছে রয়েছে।
বিগত সরকারের আমলে হওয়া প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাট ও অর্থপাচারের তীব্র সমালোচনা করার পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসের সময়কালেরও যাবতীয় কর্মকাণ্ডের ওপর দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) তদন্তের নির্দেশ দিতে প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। রোববার (২৮ জুন) জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এই দাবি জানান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) গত কয়েকদিনে একটি রিপোর্ট দিয়েছে, যেখানে বর্তমান সরকারের সময়েও সর্বোচ্চ দুর্নীতির কথা বলা হয়েছে। যদিও সেই পত্রিকা বা রিপোর্টটি এই মুহূর্তে আমার কাছে নেই, তবুও বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। তাই ১৮ মাসের অস্থির সময়ে কোথায় দুর্নীতি হয়েছে, কীভাবে হয়েছে এবং কারা এর পেছনে জড়িত, তার সবকিছুই দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে খুঁজে বের করা উচিত। তিনি স্পষ্ট করেন যে, বর্তমান সরকারের ভিত্তি হচ্ছে স্বচ্ছতা, তাই যেকোনো ধরনের অভিযোগেরই নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশের অতীত ও বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেন। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বাধীন শ্বেতপত্রের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে তিনি জানান, বিগত ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশে গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার অভাবে এক ধরনের লুটেরা অর্থনীতি ও ক্রনি ক্যাপিটালিজম গড়ে উঠেছিল। সেই সময়কালে প্রতি বছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং গত ১৫ বছরে সব মিলিয়ে প্রায় ২৯ থেকে ৩০ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে লোন স্ক্যাম, রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংক দখল এবং মেগা প্রজেক্টের নামে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় বাড়িয়ে বিপুল পরিমাণ জনগণের টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক ছিল আইনি মোড়কে দুর্নীতি বা লেজিসলেটিভ ম্যানিপুলেটেড করাপশন, যার মাধ্যমে কুইক রেন্টাল ও ক্যাপাসিটি চার্জের মতো বিতর্কিত বিষয়গুলোকে ইনডেমনিটি দিয়ে আইনি বৈধতা দেওয়া হয়েছিল। এর পাশাপাশি আদম ব্যবসার মাধ্যমে ১৩ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর ৭৩ শতাংশ বরাদ্দ রাজনৈতিক বিবেচনায় অপাত্রে দেওয়ার খতিয়ানও তিনি তুলে ধরেন। বিগত আমলের এই ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থা এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গত ১৮ মাসের চরম অস্থির সময় পার করে সরকার ৯ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেশ করেছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক মুদ্রা ব্যবস্থার পতন ও ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মধ্যেও একটি নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। যমুনার অভ্যন্তরে ও কিনারে মিলিয়ে যে বহুমুখী সংকট ছিল, সেই অস্থির সময়ে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করেই জুলাই সনদে সমঝোতার মাধ্যমে স্বাক্ষর করতে হয়েছে। দেশের মানুষের কল্যাণে বর্তমান নেতৃত্ব সবসময় সময়ের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, প্রথম ক্যাবিনেট মিটিংয়েই কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদাসল ঋণ মওকুফের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এবারের বাজেটকে ‘এ বাজেট অব নিউ ইকোনমিক অর্ডার’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, পুরাতন ধ্যান-ধারণা থেকে বেরিয়ে ফরাসি অর্থনীতিবিদ ফ্রেডরিক বাস্টিয়া কিংবা ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রী উইলিয়াম ইওয়ার্ট গ্ল্যাডস্টোনের জনকল্যাণমুখী দর্শনের আলোকে এই বাজেট তৈরি করা হয়েছে। টেকনাফের সীমান্তের একজন অসহায় বিধবা মহিলাও যেন এই বাজেটের সুফল পান, সেই লক্ষ্যেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর কোনো ধরনের ট্যাক্স বাড়ানো হয়নি। বাজেটের মূল দর্শন হিসেবে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং স্মার্ট রূপান্তরের কথা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিঙ্গাপুরের লি কুয়ান ইউ এবং ড. গোহ-এর সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের সফল মডেলের উদাহরণ দেন। নোবেলজয়ী জোসেফ স্টিগলিৎসের তত্ত্বের আলোকেই বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও মাল্টি-পোলার বিশ্বে বাংলাদেশকে নিজস্ব সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি পুনর্বিন্যাস করতে হয়েছে বলে তিনি জানান। ২০২৬ সালের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বলেন, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে মিল রেখে এই বাজেটে রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার, বৈষম্যহীন আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনরুদ্ধারসহ পাঁচটি মূল ভিত্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড এবং ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে ১৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
বাবা-মায়ের ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে প্রণীত ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩’ সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত সংশোধিত আইনে শাস্তির মেয়াদ, জরিমানার পরিমাণ এবং কারাদণ্ডের বিধানে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হবে। রোববার (২৮ জুন) জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নাজমুন নাহারের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে সমাজকল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন এই তথ্য জানান। সংসদকে সমাজকল্যাণমন্ত্রী জানান, সংশ্লিষ্ট অংশীজন বা স্টেকহোল্ডারদের মতামতের ভিত্তিতে পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩ সংশোধনের এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আইনটি যুগোপযোগী করতে এবং এর কার্যকারিতা বাড়াতে সংশোধিত আইনে শাস্তির মেয়াদ, জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা রাখা হবে। এদিকে একই অধিবেশনে দেশের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতা বিতরণে অতীতের রাজনৈতিক বিবেচনা ও নানা অনিয়মের অভিযোগের বিষয়েও কথা বলেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী। নওগাঁ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হুদার এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী স্বীকার করে বলেন, বিগত বছরগুলোতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতা দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা ও অনিয়মের বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে এসব অভিযোগের বিষয়ে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিচ্ছে। মন্ত্রী আরও জানান, প্রকৃত দুস্থ, অসচ্ছল ও যোগ্য ব্যক্তিদের ভাতার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে এবং ভুয়া কিংবা অযোগ্য সুবিধাভোগীদের বাদ দিতে এরইমধ্যে দেশব্যাপী একটি শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে। এই লক্ষ্যে ভাতাভোগীদের বর্তমান তালিকা পুনরায় যাচাই করার জন্য গত ১৯ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উদ্যোগে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা মাঠপর্যায়ে যাচাই-বাছাইয়ের কাজ করছে।