কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার বড়কামতা ইউনিয়নের ছোট্ট একটি বাজার বটতলী। বাজারে সাত বছর ধরে চা বিক্রি করেন পঞ্চাশোর্ধ্ব জীবন চন্দ্র দে। মঙ্গলবার সকালে তাঁর দোকানে ঢুকতেই কানে ভেসে এল ভোটের আলাপ। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে একজন জিজ্ঞেস করলেন, ‘ভোট দিতে যাবেন না?’ উত্তর এল, ‘ভোট দিলেও যা, না দিলেও তা।’
দুজনের কথোপকথনে বোঝা গেল কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনে তেমন নির্বাচনী উত্তাপ নেই। শুধু বটতলী বাজারই নয়, গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত দেবীদ্বারের কয়েকটি এলাকা ঘুরে একই চিত্র দেখা গেছে।
চা-দোকানি জীবন চন্দ্র দে প্রথম আলোকে বলেন, এ আসনে ভোটে লড়ছেন এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ। তাঁর সঙ্গে লড়াই করার মতো অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থী নেই। বিএনপির একজন থাকলেও বাদ পড়েছেন। এ জন্য ভোটাররা মনে করছেন, হাসনাত খুব সহজে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবেন। এ কারণে আসনে ভোটের উত্তাপ সেভাবে নেই।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ কুমিল্লা-৪ আসনে ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন। এখানে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন চারবারের সাবেক সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী। রিটার্নিং কর্মকর্তা তাঁর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করলেও ঋণখেলাপি হওয়ার তথ্য গোপন করায় নির্বাচন কমিশন তা বাতিল করে। পরে আদালতে আপিল করলেও প্রার্থিতা ফিরে পাননি তিনি।
এমন অবস্থায় ‘শক্ত’ প্রতিদ্বন্দ্বী নেই হাসনাত আবদুল্লাহর। অনেকে হাসনাতের বিজয়কে ‘সময়ের ব্যাপার’ বলছেন। তবু ভোটের মাঠে ঘাম ঝরাচ্ছেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তাঁর দাবি, তাঁর কাছে প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো প্রার্থীই দুর্বল নন; সবাইকে তিনি হেভিওয়েট হিসেবে দেখছেন।
গতকাল সকাল সাড়ে সাতটায় উপজেলার মোহনপুর এলাকায় উঠান বৈঠকের মাধ্যমে নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করেন হাসনাত। সর্বশেষ রাত ৯টায় উপজেলার ছোট আলমপুর এলাকায় উঠান বৈঠকে বক্তৃতা করেন। সারা দিনে মোট ১১টি সভা ও উঠান বৈঠকে অংশ নেন তিনি। বেলা একটার দিকে বড়কামতা ইউনিয়নের ব্রাহ্মণখাড়া এলাকার বটতলী বাজারে তাঁর নির্বাচনী সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভার এক ফাঁকেই প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘মাঠে অনেক প্রার্থী আছেন। আমার কাছে প্রত্যেক প্রার্থীই চ্যালেঞ্জিং। জনগণের রায় নিয়েই আমাদের সংসদে যেতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘ভোট কিন্তু জনগণের কাছে। আমাদের প্রত্যেক ভোটারের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। শুধু একবার নয়, আমার কর্মী-সমর্থকেরা প্রত্যেক ভোটারের কাছে একাধিকবার করে যাচ্ছেন। এ ছাড়া ভোটের মাঠে যেসব প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী আছেন, তাঁরাও কিন্তু ঘরে বসে নেই। তাঁরা ভোটারদের কাছে একবার গেলে আমাদের পাঁচবার যেতে হবে।’
নির্বাচিত হলে প্রথমে কোন কাজ করবেন প্রশ্ন করলে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘আমি নির্বাচিত হলে রাস্তাঘাটসহ মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে অবকাঠামোগত সমস্যা নিয়ে প্রথমে কাজ করব। দেবীদ্বারের অনেক এলাকা শিক্ষায় পিছিয়ে আছে। এখনো অনেক এলাকায় উচ্চবিদ্যালয় নেই। আমি শিক্ষা খাতে বেশি জোর দেব। মাদক, জুয়া, চাঁদাবাজমুক্ত দেবীদ্বার গড়ব।’
পরে নির্বাচনী সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘অতীতে যেটা হয়েছে, প্রার্থী ভোটারদের খাইয়েছে, টাকা দিয়েছে। ভোটারদের প্রার্থী ঘুষ দিয়েছে, বাড়িতে সিএনজি-অটোরিকশা পাঠিয়েছে কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য। আপনি যখন ভোটের আগেই প্রার্থীর কাছ থেকে ঘুষ খাবেন, তাহলে আপনার কি প্রার্থীর ঘুষ ধরার কোনো অধিকার আছে? আপনার হাতে এক দিনের ক্ষমতা ছিল, আপনি সেটির অপব্যবহার করেছেন। সুতরাং আপনার পাঁচ বছর নেতার দুর্নীতি নিয়ে কথা বলার অধিকারও থাকবে না। আমরা চাই, জনগণ তাদের হারিয়ে ফেলা ক্ষমতা এই নির্বাচনে পুনরুদ্ধার করবে।’ তিনি বলেন, ‘ভোট আপনার অধিকার। পায়ে হেঁটে কেন্দ্রে গিয়ে নিজের অধিকার আপনাকে বুঝে নিতে হবে। আপনি যদি ভোটের আগে আপনার অধিকার বিক্রি করে দেন, তাহলে পাঁচ বছর আপনাকে গোলাম হয়ে থাকতে হবে। একই সঙ্গে আপনাকে আজাদির জন্য গণভোটে হ্যাঁ ভোট দিতে হবে।’
হাসনাত ছাড়াও এ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মো. আবদুল করিম হাতপাখা প্রতীক, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের প্রার্থী ইরফানুল হক সরকার আপেল প্রতীক এবং গণ অধিকার পরিষদের মো. আ. জসিম উদ্দিন ট্রাক প্রতীক নিয়ে মাঠে আছেন। খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মোহাম্মদ মজিবুর রহমান দেয়ালঘড়ি বরাদ্দ পেলেও ইতিমধ্যে তিনি হাসনাতকে সমর্থন দিয়ে সরে দাঁড়িয়েছেন।
গতকাল দেবীদ্বারের বড়কামতা, ইউসুফপুর, মোহনপুর ও জাফরগঞ্জ ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম ঘুরে বিভিন্ন এলাকায় হাসনাত আবদুল্লাহর কিছু নির্বাচনী ব্যানার টানানো দেখা গেছে। তবে অন্য প্রার্থীদের তেমন কোনো তৎপরতা চোখে পড়েনি। বড়কামতা এলাকার রফিকুল ইসলাম বলেন, এলাকার ভোটাররা বিশ্বাস করছেন, ১২ ফেব্রুয়ারি হাসনাত বিজয়ী হবেন। কারণ, ভোটের মাঠে তাঁর মোকাবিলা করার মতো তেমন কোনো প্রার্থী নেই। তাঁর বিজয় এখন সময়ের ব্যাপার।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংঘটিত এজাহারভুক্ত হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ও মিরাজ হোসেন পলাতক রয়েছেন। ব্যাংক প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খুনের শিকার কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুল হালিম ছিলেন কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেনের নাম রয়েছে। তারা বর্তমানে নিজেদের সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। ব্যাংক সূত্রে গেছে, তারা চাঁদাবাজি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এসব আসামিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেন। এতে আরও যুক্ত রয়েছেন ডিজিএম সৈয়দ লিয়াকত হোসেন, হাবিব উন নবী, ডিএমডি খালেকুজ্জামান জুয়েল ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে আব্দুল হালিমের মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক সজীব কুমার সিং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জানান, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাত ১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান। হালিমের ছেলে ফয়সাল বলেন, তার বাবা ২০১৪ সাল থেকে কৃষি ব্যাংক সিবিএর সভাপতি ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গত নভেম্বরেই মতিঝিল থানায় একটি জিডি (নং ০৫/১১/২০২৪ - ৩৩৫) করেছিলেন তার বাবা। তিনি আরও বলেন, বুধবার রাতে আমার বাবাকে তার অফিসের সহকর্মীরা মারধর করে হত্যা করেছে। সিবিএর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জানান, ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হই। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট বিনা নির্বাচনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে আমাদের অফিস দখল করে নেয় ফয়েজ ও মিরাজ। এ নিয়ে মামলা চলছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা অস্থায়ী জামিনে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন—যাদের মধ্যে আছেন ড্রাইভার সাইফুল, শাহেদ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মেহেদী ও অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনার সিরাজ। এদিকে, মামলার ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের প্রধান মহাব্যবস্থাপক জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। কারণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য না করার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
গ্রামে পুরনো দিনের ঈদ উপভোগ করছি। দুপুর থেকে বিদ্যুৎবিহীন আছি। ইফতারের সময় অনেকদিন পর মোম কিনেছিলাম। মোমের আলো খারাপ লাগল না চার্জ শেষ হয়ে মোবাইল বন্ধ হওয়ার পথে। এর আগে শরীয়তপুর পল্লী বিদ্যুতের নড়িয়া অঞ্চলে ডিজিএমকে ফোন দিয়েছিলাম। তিনি ঈদের ছুটিতে আছেন, অভিযোগ কেন্দ্রে কল দিতে বললেন। কিন্তু সেই ফোন কেউ ধরে না! এবারের ঈদে যে সেবার ভোগান্তি হবে, তা বোঝা যাচ্ছে। স্বজনদের সঙ্গে আনন্দ-ফুর্তিতে ঈদ উদযাপনে গ্রামের বাড়িতে গিয়ে বিদ্যুৎ বিড়ম্বনায় নাকাল হয়ে মজার ছলে তিক্ত এ অভিজ্ঞতার কথা ফেইসবুকে তুলে ধরলেন রাজধানী ঢাকায় সাংবাদিকতা করা শরীয়তপুরের আতাউর রহমান। ‘চান রাতে’ তার দেওয়া এ পোস্টের অভিজ্ঞতা মিলে গেল দেশের আরেক প্রান্তের কুমিল্লায় বুড়িচংয়ের একজনের সঙ্গে। ঈদের ছুটি কাটাতে বুড়িচংয়ের শিকারপুর গ্রামে যাওয়া স্মৃতি দাশের স্মৃতিতেও গ্রামের বিদ্যুৎ বিড়ম্বনায় ভোগার সময়টি সুখকর হল না। গ্রামে পৌঁছান তিনি ঈদের আগের দিন। বলেন, “আজকে বাড়িতে এসেছি। এখন পর্যন্ত এক ঘণ্টার জন্যও ঠিকমত বিদ্যুৎ পাই নাই।” শহুরে জীবনে অভ্যস্ত ছেলে মেয়েদের নিয়ে বিদ্যুৎহীন এমন বিড়ম্বনার কথা তিনি বলেন। তাদের মতো অনেকেই বিদ্যুৎ না থাকার ভোগান্তিতে পড়ার কথা বললেন এবারের ঈদ। তবে বৃষ্টি ও ঝড়ের পর শীতল বাতাসে তাপমাত্রা নেমে যাওয়ায় চৈত্রের এ সময়ে নগর থেকে গ্রামে যাওয়া লাখো মানুষ ভ্যাপসা গরম থেকে কিছুটা রক্ষা পেয়েছেন। তবে অনেক গ্রামে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ঠিক থাকার কথাও জানা গেছে। কেউ আবার বিদ্যুৎ থাকা বা না থাকার মাঝের সময়টুকুকে ‘স্বাভাবিকভাবেই’ দেখছেন। ঝড়-বৃষ্টির বদৌলতে তাপমাত্রা কমার পাশাপাশি ঈদের লম্বা ছুটিতে শিল্প কারখানা বন্ধ থাকায় বিদ্যুতের উৎপাদন ও চাহিদা নিম্নমুখী হয়েছে। তবুও গ্রামে চলছে বিদ্যুতের ভেলকি—অনেকক্ষণ পর আসছে আর অল্প সময় পরই চলে যাচ্ছে। তবে বরাবরের মতো শহর ও নগরীগুলোতে বিদ্যুতের এমন যাওয়া-আসা নেই। এক দেশে দুই চিত্র নিয়ে এ ক্ষোভ অবশ্য অনেক দিনের। ‘সংকট নেই’ কাগজে-কলমে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) দৈনন্দিন তথ্য বলছে, হঠাৎ বৃষ্টিতে বিদ্যুতের চাহিদা শীতের সময়কার অবস্থায় নেমেছে। ঈদের দুদিন আগে চাহিদা ১১ হাজার মেগাওয়াটের বেশি থাকলেও তা গত দুই-তিন দিনে গড়ে ছয় থেকে সাত হাজার মেগাওয়াটে নেমেছে। উৎপাদনও হচ্ছে চাহিদার সমপরিমাণ বিদ্যুৎ। পিডিবির সচিব মুহ. রাশেদুল হক প্রধান বলেন, বিদ্যুতের হালনাগাদ তথ্যে উৎপাদন ও বিতরণে কোনো সংকট নেই। কর্মকর্তারা বলছেন, এখন যে পরিমাণ চাহিদা রয়েছে তা কয়লা ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রেখেই মেটানো সম্ভব। ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে গ্যাস সাশ্রয় করতে গিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখার দরকার নেই। এখন যে উৎপাদন হচ্ছে সেগুলোর মধ্যে অর্ধেকের মত তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি আসছে গ্যাসচালিত কেন্দ্র থেকে। বৃষ্টি ও আবহাওয়াজনিত কারণে বিদ্যুৎ না থাকার কিছু সমস্যা থাকলেও উৎপাদন বা বিতরণে কোনো সমস্যা দেখছেন না দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। তাহলে সমস্যা কোথায়? লোডশেডিং না থাকার সরকারি হিসেবের সঙ্গে শহর ও নগরের বাইরে দীর্ঘসময় বিদ্যুৎ না থাকার চিত্র মিলছে না কেন—এমন প্রশ্ন ভুক্তভোগীদের। রাজধানী ঢাকারও কিছু অংশে গত দুদিনে লোডশেডিংয়ের তথ্য মিলেছে। বিদ্যুতের সংকট না থাকলে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি গ্রাহকরা কেন হচ্ছেন, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। এর কারণ হিসেবে পিডিবিসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সমস্যা মূলত বিতরণ ব্যবস্থায়। ‘যেখানে বিদ্যুৎ মাঝে মাঝে বেড়াতে আসে’ দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকার বেশিরভাগ এলাকা পল্লী বিদ্যুৎ বোর্ডের আওতাধীন। কুমিল্লার মুরাদনগরের এক বাসিন্দা লিখেছেন, “এখানে বিদ্যুৎ মাঝে মাঝে বেড়াতে আসে। গত ৩ দিন ধরে বিদ্যুৎ নেই বললেই চলে।” দাউদকান্দি, বরিশাল, টাঙ্গাইল, গাজীপুরসহ বিভিন্ন জায়গা থেকেও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা উঠে এসেছে। ঘাপলা কোথায়? বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ঝড়-বৃষ্টির কারণে অনেক জায়গায় লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে গাছপালার ভেতর দিয়ে বিদ্যুতের লাইন যাওয়ায় ঝড়ে সহজেই সমস্যা তৈরি হয়। পল্লী বিদ্যুৎ বোর্ডের সদস্য (বিতরণ ও পরিচালন) মো. আব্দুর রহিম মল্লিক বলেন, প্রতিদিন কোথাও না কোথাও ঝড় হচ্ছে। এতে লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং তা পুনরুদ্ধারে সময় লাগে। তিনি জানান, এসব সমস্যা এখন অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। পিডিবির সদস্য জহুরুল ইসলাম বলেন, বিদ্যুৎ বিভ্রাট উৎপাদন ঘাটতির কারণে নয়; বরং প্রতিকূল আবহাওয়া ও বিতরণ নেটওয়ার্কের সমস্যার কারণে হচ্ছে। জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, গ্রামীণ বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই দুর্বল। বিশেষ করে কালবৈশাখী মৌসুমে এ সমস্যা আরও প্রকট হয়। বর্তমান পরিস্থিতি এই দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। জাতীয় গ্রিড আধুনিকায়ন এবং গ্রামাঞ্চলের বিতরণ নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা আরও জোরালো হয়ে উঠেছে। উৎপাদনের চিত্র দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯৪৯ মেগাওয়াট। অথচ চাহিদা অনেক সময় ৬-৭ হাজার মেগাওয়াটের নিচে নেমে এসেছে। গত কয়েক দিনে সর্বোচ্চ চাহিদাও ছিল ১১ হাজার মেগাওয়াটের নিচে। সেই চাহিদাও পূরণ করা সম্ভব হয়েছে। বিদ্যুতের বড় অংশ উৎপাদিত হচ্ছে গ্যাস থেকে। এছাড়া কয়লা, তেল, হাইড্রো, সৌর ও আমদানি করা বিদ্যুৎও যোগ হচ্ছে। পিডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, কোথাও লোডশেডিং নেই। তবে ঝড়ের কারণে বিচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা হতে পারে।
কুমিল্লায় রেলক্রসিংয়ে বাসের সঙ্গে ট্রেনের সংঘর্ষে নিহত ১২ জনের লাশ নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে দিতে ১১টি অ্যাম্বুল্যান্স ভাড়া করেছে জামায়াতে ইসলামী। এ ছাড়া আহতদের মধ্যে যারা বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আগ্রহী তাদের চিকিৎসার ব্যয় বহন করার ঘোষণা দিয়েছে জামায়াত। আজ রবিবার (২২ মার্চ) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কুমিল্লা মহানগরীর সহকারী সেক্রেটারি ও প্রচার সম্পাদক কামরুজ্জামান সোহেল। এর আগে দুপুরে পদুয়ার বাজার এলাকায় দুর্ঘটনাকবলিত স্থান পরিদর্শন ও বিকালে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আহতদের চিকিৎসার খোঁজখবর নিতে এসে এমন ঘোষণা করেছেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এ টি এম মাসুম ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও কুমিল্লা মহানগরীর আমির কাজী দ্বীন মোহাম্মদ। এ সময় জামায়াতের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।কুমিল্লা মহানগরীর আমীর কাজী দ্বীন মোহাম্মদ বলেন, নিহতদের লাশ সম্মানের সঙ্গে নিজ নিজ বাড়িতে পৌঁছে দিতে ১১টি অ্যাম্বুল্যান্স ব্যবস্থা করা হয়েছে। অ্যাম্বুল্যান্সগুলো নিহতদের স্বজনদের নিয়ে নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে লাশ পৌঁছে দেবে। এ ছাড়া যারা আহত হয়েছেন তাদের মধ্যে কেউ যদি উন্নত চিকিৎসার জন্য বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন তাদেরকে সম্পূর্ণ বিনা খরচে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে। এ জন্য কুমিল্লা মহানগরী জামায়াতের পক্ষ থেকে ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম নামে একটি সমন্বয় টিম গঠন করা হয়েছে। তাঁরা আহতের খোঁজখবর ও অ্যাম্বুল্যান্স পরিচালনায় সার্বক্ষণিক কাজ করবেন। কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আহতদের খোঁজখবর নেওয়া শেষে জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এ টি এম মাসুম বলেন, এ ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা রোধে রেলক্রসিংয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থার অবহেলা ছিল, যাদের অবহেলার কারণে এতগুলো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে তাদেরকে শুধু বরখাস্ত করলেই হবে না, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। যাতে করে ভবিষ্যতে রেলক্রসিংয়ে যারা গেটম্যানের দায়িত্ব পালন করবে তারা যেন এমন অবহেলা না করেন। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা করা হয়েছে। এ ছাড়া আমরা সরকারের কাছে যারা আহত বা নিহত হয়েছেন তাদের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ, আহতদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা ও ঝুঁকিপূর্ণ রেলক্রসিংগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করার দাবি জানাচ্ছি। প্রসঙ্গত, শনিবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে ট্রেনের সঙ্গে বাসের ভয়াবহ সংঘর্ষে ১২ জন নিহত এবং ১৫ জন আহত হয়েছেন। দায়িত্বে অবহেলার দায়ে দুই গেটম্যানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ঘটনায় রেলওয়ে ও জেলা প্রশাসন কর্তৃক পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
পাশাপাশি দুটি ভবনেই সুনসান নীরবতা। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলেও তেমন কোনো সাড়াশব্দ মেলে না। পঞ্চম তলার একটি কক্ষে জানান দেয় ষাটোর্ধ্ব এক মানুষের উপস্থিতি। দরজায় কড়া নাড়তেই ভেতরে প্রবেশের ইঙ্গিত মেলে। ঘরে ঢুকেই চোখে পড়ে টেবিলে সারিবদ্ধভাবে সাজানো বিভিন্ন লেখকের বই, পাশে দৈনিক পত্রিকা। কম্পিউটারের ডেস্কটপে দেশ-বিদেশের খবর দেখেন তিনি। তবুও একাকীত্বের কথা মনে পড়লে নীরবে ডুকরে কেঁদে ওঠেন। এভাবেই দিনের পর দিন একা জীবন কাটাচ্ছেন প্রবীণ নিবাসের বাসিন্দারা। পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিনটিও কেটেছে স্বজনহীনতায়। রাজধানীর আগারগাঁওয়ের একটি প্রবীণ নিবাসে থাকা কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে এমন বাস্তবতা। ঈদের দিন উপলক্ষে বিশেষ খাবারের আয়োজন ছিল। সকালে ভুনা খিচুড়ির সঙ্গে ডিম ও মিষ্টান্ন, দুপুরে পোলাও, মুরগির রোস্ট ও খাসির মাংস, আর রাতে ভাত, মুরগি ও ডাল পরিবেশন করা হয়। কিন্তু খাবারের এই আয়োজনও তাদের একাকীত্ব ভোলাতে পারেনি। প্রবীণ নিবাসে বসবাসরত সলিমুল্লাহ খন্দকার বেশ কয়েক বছর ধরেই একাকী জীবনযাপন করছেন। ২০১৮ সালে বেসরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর ধীরে ধীরে নিঃসঙ্গতা তাকে গ্রাস করে। প্রায় এক বছর তিন মাস আগে তিনি এখানে ওঠেন। তার দুই ছেলে ভালো চাকরি করলেও বাবাকে সঙ্গে নেওয়ার কথা বলেন না। ৬৮ বছর বয়সে সবকিছু থাকলেও যেন কিছুই নেই তার। ঈদের দিনটি নিজের কক্ষেই কাটান তিনি। সন্ধ্যায় হালকা নাশতা সেরে পত্রিকা পড়েন, এরপর কম্পিউটারে ইউটিউবে খবর দেখেন। সময় কাটাতে বই, পত্রিকা আর ইন্টারনেটই তার ভরসা। নিজের জীবনের দিকে ফিরে তাকিয়ে সলিমুল্লাহ বলেন, কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কারণেই শেষ বয়সে এই বাস্তবতায় পড়তে হয়েছে তাকে। তার ভাষায়, এখানে সবারই আলাদা গল্প আছে, কিন্তু সবচেয়ে বড় সত্য হলো—একাকীত্ব। তিনি জানান, আগে ঢাকার একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন, তখন আরও বেশি নিঃসঙ্গ লাগত। মারা গেলেও হয়তো কয়েক দিন কেউ জানত না। এখানে অন্তত সেই ভয় নেই। খাওয়া-দাওয়ার চিন্তাও করতে হয় না। তবে সংসারের মতো আনন্দ আর কোথাও নেই—দিনশেষে তিনি একাই। ঈদের প্রসঙ্গ আসতেই তার কণ্ঠে ভেসে ওঠে স্মৃতির ভার। শৈশবে গ্রামের বাড়িতে মা-বাবার সঙ্গে দারিদ্র্যের মধ্যেও ঈদের আনন্দ ছিল অন্যরকম। নতুন কাপড় না থাকলেও গুড় দিয়ে রান্না করা সেমাইয়ের স্বাদ ছিল অমলিন। এখন সব থাকলেও সেই আনন্দ নেই। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তার কণ্ঠে জমে ওঠে নিঃশব্দ হাহাকার। তিনি বলেন, কেউ যেন কখনও বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে বাধ্য না হয়। এখানে থাকা মানে যেন মৃত্যুর অপেক্ষা। পরিবারের সঙ্গে থাকলে হয়তো আরও কিছুদিন বেশি বাঁচা যেত। এখন শুধু চান সুস্থভাবে জীবনের শেষটা কাটাতে। একই নিবাসে সত্তরোর্ধ্ব এক নারী প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে বসবাস করছেন। তার দুই ছেলে পরিবারসহ যুক্তরাজ্যে থাকেন। তারা নিয়মিত খরচ পাঠালেও মায়ের সঙ্গ দিতে পারেন না। দীর্ঘদিনের একাকীত্ব এখন তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। আরেকজন অবসরপ্রাপ্ত নারী আইনজীবীও এখানে বসবাস করছেন। স্বামী মারা যাওয়ার পর আর নতুন করে সংসার শুরু করেননি। সন্তান না থাকায় আত্মীয়দের ওপর নির্ভর না করে নিজেই প্রবীণ নিবাসকে নিজের ঠিকানা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। অবসরের পরও সময় পেলেই আদালত অঙ্গনে যান তিনি। তার মতে, এখানে যারা থাকেন তারা অধিকাংশই সচ্ছল পরিবারের। অর্থের অভাব নয়, বরং পারিবারিক দূরত্ব ও ব্যক্তিগত পরিস্থিতিই তাদের এখানে নিয়ে এসেছে। সব মিলিয়ে, ঈদের মতো আনন্দের দিনও এই প্রবীণদের কাছে হয়ে ওঠে নিঃসঙ্গতা আর স্মৃতির ভারে ভরা এক দীর্ঘ সময়।