একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) এখন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ‘বোঝা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওই নির্বাচনের আগে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকায় এই ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনগুলো কিনেছিল কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন। ওই নির্বাচনে মাত্র ৬টি আসনে ইভিএমে ভোট গ্রহণ করা হয়। পরবর্তীকালে বিভিন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও ইভিএম ব্যবহার করা হয়। তারপর থেকে দেশের বিভিন্ন গুদামে এগুলো পড়ে আছে।
ইসির সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অব্যবহৃত এই ইভিএমের রক্ষণাবেক্ষণের পেছনে ব্যয় বাড়ছে। এই খরচ বহন করতে অনাগ্রহ দেখিয়েছে ইসি।
বিপাকে ইসি
ইভিএম প্রকল্পের মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর। তবে আরও একবছর বাড়ানো হয় প্রকল্পের সময়। সেই সময়ও শেষ হয়েছে ২০২৪ সালের জুন মাসে। পরে ২০২৬ সালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএমের ব্যবহার বাতিল করে এ এম এম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন কমিশন। পাশাপাশি গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) থেকেও বাদ দেওয়া হয় ইভিএমের অংশ।
ইসির যুগ্মসচিব মো. মঈন উদ্দিন খান বলেন, ‘‘ইভিএম নিয়ে এখনও অনেক জটিলতা রয়েছে। এ নিয়ে দুদকের দায়ের করা একটি মামলা এখনও চলমান। তাই এ বিষয়ে কোনও পদক্ষেপ নিতে গেলেই বিষয়টি জটিল হয়ে পড়ে।’’
তিনি বলেন, ‘‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নির্বাচন সংস্কার কমিশন বলেছিল, ইভিএম আর ব্যবহার করার দরকার নেই। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে, তারাও একই মত দিয়েছে। ফলে ইসি এখন আর ইভিএম ব্যবহার করতে চায় না। কিন্তু সমস্যা হলো— এগুলো তো সরকারি সম্পদ। ব্যবহার না করলে সেগুলোর কী হবে, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’’
মঈন উদ্দিন বলেন, ‘‘তবে এখানে আরেকটি জটিলতা আছে। যেহেতু ইভিএম নিয়ে মামলা হয়েছে, তাই এগুলো এখন মামলার আলামতের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ ইভিএম এখন একধরনের আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। চাইলেই এগুলো সরিয়ে ফেলা বা অন্যভাবে ব্যবহার করা সম্ভব নয়।’’
ইভিএম নিয়ে ইসির পরিকল্পনা জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ‘‘মোটামুটি দেড় লাখের মতো ইভিএম আছে। আমাদের অবস্থান হলো— আমরা শুধু ইনভেন্টরি করে সরকারের ঘাড়ে দায়িত্ব দিতে চাই।’’
তিনি বলেন, কমিশনের পরিকল্পনা হচ্ছে, একটা ইনভেন্টরি করা হবে। স্যাম্পলিংয়ের মাধ্যমে দেখা হবে কতগুলো আছে, কী অবস্থায় আছে। তারপর সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে বলা হবে— আপনারা এগুলো নিয়ে যান। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ভবিষ্যতে নির্বাচন কমিশন এগুলো দিয়ে আর নির্বাচন করবে না। এগুলোর মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে।’’
রহমানেল মাছউদ বলেন, ‘‘দুর্নীতি দমন কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করে মামলার জন্য কিছু নমুনা রেখে দেওয়া হবে। বাকিগুলো সরকারকে দিয়ে বলা হবে— আপনারা নিষ্পত্তি করেন। যেটা ব্যবহারযোগ্য, ব্যবহার করেন। যেটা ফেলে দিতে হয়, ফেলে দেন। যেটা বিক্রি করা যায়, বিক্রি করেন। আর যদি সরকার কোনোভাবেই নিতে না চায়, তাহলে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে নিলামে বিক্রি করবো।’’
কত ইভিএম কোথায় আছে, ইসির ব্যয় কত?
ইসি সূত্র থেকে জানা যায়, গাজীপুরের বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির গুদামসহ দেশের বিভিন্ন গুদামে বর্তমানে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫২২টি ইভিএম রয়েছে। গুদাম ভাড়া বাবদ জমছে বকেয়ার বিশাল অঙ্ক।
সূত্র আরও জানায়, বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি-বিএমটিএফ তাদের গুদামের প্রতি বর্গফুটের ভাড়া ধরেছে ১৫১ টাকা করে। আর সে হিসাবে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে বকেয়া ভাড়া বাবদ ৭০ কোটি টাকা দাবি করেছে বিএমটিএফ। জানা গেছে, ইসি এখন পর্যন্ত এই টাকা পরিশোধ করেনি। অপরদিকে দেশের বিভিন্ন গুদামে রাখা ইভিএমের জন্য ভাড়া বাবদ ইসিকে প্রতি মাসে ১৫ শতাংশ ভ্যাটসহ গুনতে হচ্ছে ৩৩ লাখ ৪৮ হাজার ৮১৮ টাকা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ‘‘কোটি কোটি টাকা ভাড়া যাচ্ছে। আমরা বলছি, এই ভাড়া কীভাবে দেবো? তাই আমরা চিন্তা করছি একটি ইনভেন্টরি করার।’’
বিএমটিএফের ভাড়া বাবদ বকেয়া ৭০ কোটি টাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘আমরা তাদের মৌখিকভাবে বলেছি— আমাদের কোনও টাকা নেই, দিতে পারবো না। তারা টাকা চাইছে, আর আমরা বিষয়টা ঝুলিয়ে রেখেছি।’’
রহমানেল মাছউদ বলেন, একটা প্রকল্প হলে তার মেইনটেন্যান্স, স্টোরেজ— এসবের বাজেটও থাকার কথা। যদি ৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প হয়, তাহলে স্টোরেজের জন্যও বরাদ্দ থাকা উচিত ছিল। কোথায় রাখবো, কীভাবে রাখবো— এসবের পরিকল্পনা থাকা দরকার ছিল। আমাদের হাতে এ ধরনের কোনও খাত নেই, যেখান থেকে এই টাকা দেবো। জেলা পর্যায়েও বিভিন্ন জায়গায় স্টোর ভাড়া করা হয়েছে। সেখানেও সমস্যা আছে। প্রাইভেট কোম্পানিগুলো ভাড়া চাচ্ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান হলে একভাবে কথা বলা যায়, কিন্তু ব্যক্তিগত গুদামের মালিকদের তো কিছু না কিছু দিতেই হবে। আমার ব্যক্তিগত মত হলো—কম হোক, বেশি হোক— তাদের (ব্যক্তিগত গুদামের মালিকদের) সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে কিছু ভাড়া নির্ধারণ করে তা দেওয়া উচিত।’’
ইভিএম নিয়ে টিআইবি’র সুপারিশ
অব্যবহৃত-অকেজো ইভিএমের সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে একাধিক সুপারিশ জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। তাদের দেওয়া সুপারিশগুলো হলো:
১. ইভিএম সংরক্ষণের জন্য প্রতি মাসে বিপুল অর্থ ব্যয়সহ রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় রোধ এবং পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে ইভিএম সংক্রান্ত চলমান মামলা দ্রুততার সঙ্গে নিষ্পত্তির উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
২. নির্বাচন-সংক্রান্ত তথ্য ও ভোটারের তথ্য অপব্যবহারের ঝুঁকি হ্রাসে নিলামের আগেই ইভিএমে সংরক্ষিত সব তথ্য মুছে ফেলা এবং সব হার্ডওয়্যার উপযুক্তভাবে ভেঙে ফেলতে হবে এবং তা যে করা হয়েছে— তা নিশ্চিত করতে একটি ‘নিষ্পত্তি সনদ’ বাধ্যতামূলক করতে হবে।
৩. ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য (ই-বর্জ্য) ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২১ অনুসরণ করে ইভিএমকে ই-বর্জ্য হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করতে হবে এবং একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ ইভিএম লট আকারে নিলামে বিক্রয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদফতরের অধীনে নিবন্ধিত অভিজ্ঞ ই-বর্জ্য রিসাইক্লিং কোম্পানিদের কাছে দরপত্র আহ্বানের ব্যবস্থা করতে হবে— যাদের খ্যাতনামা আইটি ব্র্যান্ড, মোবাইল টেলিফোন সেবাপ্রতিষ্ঠান, পুলিশ ও প্রতিরক্ষা বিভাগের সংবেদনশীল ই-বর্জ্য ও যন্ত্রপাতি ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা রয়েছে, যেন নিরাপদ ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ ও পরিবেশগত ঝুঁকি নিরসনের পাশাপাশি সম্ভাব্য রাজস্ব প্রাপ্তির স্বার্থে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা যায়।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
জনতা ব্যাংক থেকে ঋণের নামে বেক্সিমকো গ্রুপের ৩০ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ঋণ শাখার ১০ কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তারা বেক্সিমকো গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারির সময় ব্যংকে যারা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। বৃহস্পতিবার ৪১৬ কোটি টাকার একটি মামলায় রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। দুদকের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) তানজির আহমেদ এ তথ্য নিশ্চিত করেন।। দুদক জানায়, টাস্কফোর্সের আওতায় বেক্সিমকো গ্রুপের দুর্নীতির ঘটনায় একাধিক মামলা ও তদন্ত চলমান রয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপের ৪১৬ কোটি টাকার একটি ঋণ জালিয়াতি মামলায় তাদের তলব করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই জনতা ব্যাংকের ঋণ সংক্রান্ত শাখায় কর্মরত এসব ব্যাংকারকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদকের একটি দল। দুদকের তথ্য অনুযায়ী, বেক্সিমকো গ্রুপের বিরুদ্ধে শুধু জনতা ব্যাংক থেকেই ঋণের নামে ৩০ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এই বিশাল জালিয়াতির অনুসন্ধানে বিভিন্ন নথিপত্র সংগ্রহ ও সংশ্লিষ্টদের তলব করা হচ্ছে। এছাড়াও ভুয়া প্রতিষ্ঠান খুলে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সালমান এফ রহমান, জনতা ব্যাংকের তৎকালীন এমডিসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে এরইমধ্যে ১০টি মামলা করেছে দুদক।
দেশে হাম ও উপসর্গে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ১৭১ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর ফলে চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত এ রোগে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৭৯ জনে। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানানো হয়। ব্রিফিংয়ে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত আটজনই হামের উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সারা দেশে হাম ও উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং সংশ্লিষ্ট জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে বলেও জানানো হয়।
দেশের বিভিন্ন স্থানে আরবি হরফ লেখা পতাকা প্রদর্শনের ঘটনায় কারা জড়িত প্রশ্নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, কিছু মানুষ ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের চেষ্টা করতে পারে। কিছু সংগঠনকে চরমপন্থি বলা যেতে পারে। তবে দেশে কোনও সংগঠিত জঙ্গিবাদী তৎপরতা বা বড় ধরনের উগ্রবাদী সংগঠনের অস্তিত্ব আছে বলে আমরা মনে করি না। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে সমসাময়িক বিষয় নিয়ে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন। ব্রিফিংয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, বিদেশে গ্রেফতার আসামিদের প্রত্যর্পণ, শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানো, মাদকবিরোধী অভিযান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদের তালিকা, পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীও স্পষ্ট করেছেন যে, বাংলাদেশে উগ্রবাদী বা মৌলবাদী কোনও শক্তির উত্থান ঘটতে দেওয়া হবে না। মাদকবিরোধী অভিযানে ডগ স্কোয়াড, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ বরিশালের আগৈলঝাড়া থানায় মাদক ব্যবসায়ীদের হামলায় পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত হওয়ার ঘটনা এবং পরবর্তী মামলায় বিপুলসংখ্যক অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করার অভিযোগ প্রসঙ্গে সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ লিখিতভাবে দেওয়া হলে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা হবে। তিনি বলেন, মাদকের বিস্তার, বাণিজ্য ও অপব্যবহার রোধে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। সম্প্রতি কঠোর মাদকবিরোধী আইন পাস করা হয়েছে। তবে আইনটির পূর্ণাঙ্গ প্রয়োগের আগে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। মন্ত্রী জানান, অধিদফতরে ডগ স্কোয়াড গঠন, কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সরবরাহ, পরীক্ষাগার স্থাপন এবং তদন্তক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য আর্থিক সংস্থান ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে কিছুটা সময় লাগবে। তিনি বলেন, আগে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের নিরস্ত্র কর্মকর্তাদের অস্ত্রধারী মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান করতে হতো। অনেক কর্মকর্তা গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। ভবিষ্যতে সে অবস্থা থাকবে না। নতুন আইন গেজেট প্রকাশের সঙ্গে কার্যকর হয়েছে উল্লেখ করে সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, এখন থেকেই ওই আইনের অধীনে মামলা ও তদন্ত চলবে। শক্তিশালী শাস্তির বিধান নিজেই অপরাধীদের জন্য প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করবে। চাঁদাবাজি ও জুয়া ঠেকাতে আইন সংস্কারের উদ্যোগ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শুধু মাদক নয়, জুয়া, চাঁদাবাজিসহ অন্যান্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণেও বিদ্যমান আইনের দুর্বলতা রয়েছে। দণ্ডবিধিতে চাঁদাবাজির শাস্তি ও মামলার প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা যায় কি না, সরকার তা পর্যালোচনা করছে। তিনি বলেন, বর্তমানে চাঁদাবাজির শিকার ব্যক্তি মামলা না করলে অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ বা রাষ্ট্র নিজে থেকে মামলা করতে পারে না। এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে শক্তিশালী আইনি ভিত্তি তৈরি করা প্রয়োজন। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, মাদকমুক্ত ও চাঁদাবাজিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় শক্তিশালী আইন যেমন দরকার, তেমনই মানুষের মানসিক পরিবর্তন ও সামাজিক উদ্বুদ্ধকরণও প্রয়োজন। যুবসমাজকে রক্ষায় গণমাধ্যমকে জনসচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে হবে। অনিয়মকারী পুলিশের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে পুলিশ সদস্যদের পুরস্কৃত করার পাশাপাশি যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তাদের তালিকা প্রকাশের দাবি প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পেশাদারত্ব বজায় রাখতে ব্যর্থ পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা যেমন ভালো কাজের জন্য পুরস্কৃত করছি, তেমনই অনিয়মের জন্য তিরস্কার ও শাস্তিও দিচ্ছি। চট্টগ্রামে একজন ক্রিকেটারকে হয়রানির ঘটনায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তেজগাঁওয়ের একটি হোটেলে বিএনপির পরিচয় দিয়ে তিন সাংবাদিককে হয়রানি ও দীর্ঘ সময় আটকে রাখার অভিযোগ সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ঘটনাটি তার নজরে আসেনি। লিখিত অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক তদন্তের ব্যবস্থা করা হবে। শহীদের প্রকৃত সংখ্যা দুই হাজারের বেশি হতে পারে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদের সংখ্যা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘের প্রতিবেদনে প্রায় এক হাজার ৪০০ জনের মৃত্যুর কথা বলা হলেও সরকারের ধারণা, প্রকৃত সংখ্যা দুই হাজারের বেশি হতে পারে। তিনি বলেন, স্বৈরাচারী সরকারের পতনের আগে অনেক হাসপাতাল থেকে নথিপত্র গায়েব করা হয়েছে। অনেককে চিকিৎসা দেওয়া হয়নি, লাশ গুম করা হয়েছে এবং অজ্ঞাত হিসেবে দাফন করা হয়েছে। এখনও অনেক স্বজন কবর খুঁজে বেড়াচ্ছেন। গণকবর থেকে উদ্ধার মরদেহের ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হলে শহীদের তালিকা আরও বাড়বে বলে জানান তিনি। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে গেজেটভুক্ত শহীদ এবং আহতদের তিনটি শ্রেণিতে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে উল্লেখ করলেও ব্রিফিংয়ের সময় সঠিক সংখ্যা তার সামনে নেই বলে জানান মন্ত্রী। ভুয়া মামলা ও হাজারো আসামি নিয়ে আবার বৈঠক জুলাই আন্দোলনে নিহত দেখিয়ে মামলা করা হলেও কথিত নিহত ব্যক্তি বিদেশে জীবিত রয়েছেন– এমন ঘটনার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অভিযোগের ভিত্তিতে অনেক তালিকা তৈরি হয়েছিল। পর্যাপ্ত তদন্তের সুযোগ না থাকায় সেখানে ভুল থাকতে পারে। তিনি বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্তে কেউ জীবিত প্রমাণিত হলে তার নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে। হাজার হাজার মানুষকে আসামি করে দায়ের করা মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, তদন্তে নির্দোষ ব্যক্তিদের শনাক্ত করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩ ধারার পুলিশ প্রতিবেদনের মাধ্যমে অভিযোগপত্র দেওয়ার আগেই বাদ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, এটা নিয়ে আমরা আবার বসবো। মিথ্যা অভিযোগকারী বাদীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পুলিশ তদন্ত প্রতিবেদনে মিথ্যা অভিযোগের বিষয়টি উল্লেখ করতে পারে। তবে বাদীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত আদালতের এখতিয়ার। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে সহযোগিতা বাড়াবে বাংলাদেশ সাম্প্রতিক বিদেশ সফর সম্পর্কে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তিনি জাতিসংঘ পুলিশপ্রধানদের সম্মেলনে অংশ নিতে গিয়েছিলেন। বাংলাদেশ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অন্যতম বৃহৎ অংশগ্রহণকারী দেশ হওয়ায় সম্মেলনটি দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি জানান, সফরে জাতিসংঘের তিন জন আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেলের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। শান্তিরক্ষা কার্যক্রম, শান্তি বিনির্মাণ এবং লজিস্টিক সহায়তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বর্তমান সরকারের সম্পর্ক সম্পর্কে মন্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক খুবই ভালো। নির্বাহী আদেশে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের পক্ষে নয় সরকার রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নির্বাহী বা প্রশাসনিক আদেশে কোনও রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হোক– এটি বিএনপি ও সরকারের নীতিগত অবস্থান নয়। আমরা চাই, সবকিছু বিচারিক ও আইনানুগ প্রক্রিয়ায় হোক। তবে রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তদন্ত চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, আইন সংশোধনের ফলে মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে এখন ব্যক্তির পাশাপাশি সংগঠনেরও বিচার করা যায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা এবং দেশবাসী মনে করি, আওয়ামী লীগ দল হিসেবে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দায়ী। তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে অভিযোগ দাখিল হলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার শুরু হবে। তদন্ত দ্রুত শেষ করতে সংশ্লিষ্ট তদন্ত দলকে অনুরোধ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।