ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, দক্ষিণ ইরানে মার্কিন হামলার জবাবে তারা বাহরাইনে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
এর আগে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) দাবি করে, হরমুজ প্রণালির কাছে একটি মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার ঘটনায় ‘আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা’ হিসেবে তারা ইরানের কয়েকটি সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবে ইরানের দৃঢ়তা পরীক্ষা করার চেষ্টা করছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে কোনো হামলা বা হুমকি এলে তার জবাব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে অঞ্চল ছেড়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
তবে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি দাবি করেছেন, মার্কিন হেলিকপ্টার লক্ষ্য করে ইরান কোনো ইচ্ছাকৃত হামলা চালায়নি।
এদিকে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় মঙ্গলবার প্রায় ২০ জন নিহত হয়েছেন। নতুন সামরিক অভিযানের আগে ইসরায়েল কয়েকটি এলাকায় বাসিন্দাদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দিলে হাজারো মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন।
অন্যদিকে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অভিযোগ করেছে, চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে ইচ্ছুক ১৬ হাজার ৫০০-এর বেশি ফিলিস্তিনিকে গাজা ছাড়তে বাধা দেওয়ায় অনেক রোগীর মৃত্যু ঘটছে। তাদের দাবি, চিকিৎসা বিলম্বিত হওয়ার কারণে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
তথ্যসূত্র : আলজাজিরা।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত ফার্নেস তেলের দাম কমিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। আগস্ট মাসের জন্য প্রতি লিটার ফার্নেস তেলের নতুন দাম ১০০ টাকা ৩৯ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) কমিশনের এক বার্তায় এ তথ্য জানানো হয়। নতুন মূল্য আজ রাত থেকেই কার্যকর হবে বলে জানিয়েছে বিইআরসি। এর আগে জুলাই মাসের জন্য ফার্নেস তেলের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ১০৯ টাকা ১০ পয়সা প্রতি লিটার, যা তার আগের মাসে ছিল ১১৩ টাকা ৫৪ পয়সা। সর্বশেষ সিদ্ধান্তে জুলাইয়ের তুলনায় প্রতি লিটারে ৮ টাকা ৭১ পয়সা এবং আগের উচ্চমূল্যের তুলনায় ১৩ টাকা ১৫ পয়সা কমলো। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত ফার্নেস তেলের মূল্য কমানোয় তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ব্যয় কিছুটা কমতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের পরিবর্তনের সঙ্গে সমন্বয় করেই বিইআরসি এ ধরনের মূল্য সমন্বয় করে থাকে।
হরমুজ প্রণালিকে ইরান যেভাবে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে, তার নিন্দা জানিয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তবে গণহত্যার দায়ে ওয়ারেন্টভুক্ত এই আসামি মনে করেন, ভবিষৎতে এই প্রণালির গুরুত্ব এতটা আর থাকবে না। কারণ হিসেবে নেতানিয়াহু বলেছেন, নতুন পাইপলাইনের কথা। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন তারা এই চোকপয়েন্ট উদ্ধার করতে পারবেন। তবে ইরান যে এই পথ বন্ধ করে দেবে, তা নিয়ে ধারণা ছিল না নেতানিয়াহুর। তিনি বলেন, কেউই নির্ভুলভাবে বলতে পারত না, ইরান শেষ পর্যন্ত কী করবে। সাক্ষাৎকারে তিনি আরও দাবি করেন, আজ বিশ্বের সবাই বুঝতে পারছে, বিশ্বশান্তির জন্য ইরান কতটা বড় হুমকি। হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ কৌশলগত গুরুত্ব নিয়েও মন্তব্য করেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী। তার ভাষায়, জ্বালানি পরিবহনের রুট ধীরে ধীরে হরমুজ এড়িয়ে লোহিত সাগর, ইসরায়েল এবং সেখান থেকে ভূমধ্যসাগরমুখী হলে এই জলপথের ওপর নির্ভরতা কমে যাবে। নেতানিয়াহু বলেন, মানুষ জ্বালানি পাইপলাইন হরমুজ এড়িয়ে লোহিত সাগরে, সেখান থেকে ইসরাইল হয়ে ভূমধ্যসাগরে স্থানান্তর করবে। আমরা এই চোকপয়েন্টের ওপর নির্ভরতা ভেঙে দিতে পারব, এবং আমরা তা করব। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজ চলাচল করে। তাই এ জলপথে যেকোনো উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
গত পাঁচ মাস ধরে একটি আঞ্চলিক সংঘাত এড়িয়ে চলার আপ্রাণ চেষ্টা করে আসছিল সৌদি আরব। এমনকি যখন ইরানি ড্রোনগুলো তাদের তেল শিল্পে আঘাত হানছিল, তখনও তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগের পথ খোলা রেখেছিল রিয়াদ। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তারা চারপাশ থেকে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। বর্তমানে সৌদি আরবকে তিনটি ভিন্ন দিক থেকে শত্রুর মোকাবিলা করতে হচ্ছে— ইরান এবং ইরাক ও ইয়েমেনে থাকা তাদের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো। গত এক সপ্তাহে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের মিসাইল হামলা, ইরাকের ইরানপন্থী মিলিশিয়াদের ড্রোন হামলা এবং তেহরানের নতুন হুমকির সম্মুখীন হয়েছে সৌদি আরব। মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) স্থানীয় সময় ভোরে এটি স্পষ্ট হয়ে যায় যে রিয়াদের জন্য সংযম দেখানোর সুযোগ আর অবশিষ্ট নেই। মার্কিন যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি সৌদি আরবের ফাইটার জেটগুলোও পূর্ব ইরাকে হামলা চালিয়েছে। তবে এর পরিণতি হতে পারে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। একটি বৃহত্তর সংঘাতে জড়িয়ে পড়া রিয়াদের জন্য সম্ভাব্য ব্যয়বহুল একটি বিকল্প। গত এক দশক ধরে তারা রাজ্যটিকে বিদেশী বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করা এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত করার দিকে মনোনিবেশ করেছিল। এই লক্ষ্যেই ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় ইরানের সাথে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু তিন দিক থেকে অসম যুদ্ধে পারদর্শী অপ্রত্যাশিত শত্রুদের মোকাবিলা করা যেকোনো সামরিক পরিকল্পনাকারীর জন্যই দুঃস্বপ্নের মতো এবং তাদের সেই দীর্ঘমেয়াদী কৌশল এখন চরম হুমকির মুখে। ইয়েমেন ফ্রন্ট এবং হুথিদের হুমকি সপ্তাহান্তে হুথিরা লোহিত সাগরের উপকূলে দুটি সৌদি তেল স্থাপনায় মিসাইল নিক্ষেপ করে। স্যাটেলাইট ইমেজ এবং জিওলোকেটেড ভিডিওতে ইয়েমেন সীমান্তের কাছে জাজানের একটি স্থাপনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র দেখা গেছে। হুথিরা বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সৌদি জাহাজগুলোর ওপর অবরোধ ঘোষণা করার পর লোহিত সাগরে দুটি সৌদি ট্যাংকারের ওপরও হামলা চালায়। সৌদি আরবের জন্য এই অবরোধ একটি বড় ধরনের উত্তেজনা বৃদ্ধির সংকেত। হরমোজ প্রণালি অবরুদ্ধ থাকায় সৌদিরা তাদের তেল রপ্তানির বড় একটি অংশ লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের মাধ্যমে পরিচালনা করছিল। আগামী তিন বছরে লোহিত সাগর দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৯০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। কিন্তু এশিয়ার বাজারে যেতে হলে ইয়ানবু থেকে ছেড়ে যাওয়া ট্যাংকারগুলোকে অবশ্যই বাব আল-মানদেব অতিক্রম করতে হবে, যা তাদের রপ্তানির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ হুথিদের হামলার ঝুঁকিতে ফেলছে। ২০১৫ সালে হুথিদের উৎখাত করতে ব্যর্থ হয়ে সৌদি আরব সাত বছর ধরে লড়াই চালিয়েছে, যা বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটের জন্ম দেয়। ২০২২ সালে একটি যুদ্ধবিরতি হলেও তা কখনোই পূর্ণাঙ্গ শান্তিতে রূপ নেয়নি। সম্প্রতি হুথিরা অভিযোগ করেছে যে ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির শেষকৃত্য থেকে ফেরা একটি হুথি প্রতিনিধিদলকে বহনকারী বিমানকে বাধা দিতে সৌদি আরব সানা বিমানবন্দরে বোমা হামলা চালিয়েছে। এর জের ধরেই নতুন করে সহিংসতার সূত্রপাত হয়। বিশ্লেষকদের মতে, রিয়াদ আপাতত বিমান হামলার মাধ্যমেই এর জবাব দেবে। ইতোমধ্যে ট্যাংকারে হামলার প্রতিশোধ হিসেবে গত শুক্রবার হুথিদের নিয়ন্ত্রিত হুদাইদাহ বন্দরে হামলা চালিয়েছে সৌদি বিমান বাহিনী। ইরাক থেকে আসা নতুন বিপদ সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, সোমবার ও মঙ্গলবার দক্ষিণ ইরাকের পাম গ্রোভস থেকে ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়ারা সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং রাজধানী রিয়াদকে লক্ষ্য করে পরপর ড্রোন হামলা চালায়। বিশ্লেষকদের ধারণা, হুথিরা এসব মিলিশিয়াকে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে থাকতে পারে। অবশেষে রিয়াদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায় এবং মঙ্গলবার ভোরে তারা পূর্ব ইরাকে মিলিশিয়াদের ওপর সুনির্দিষ্ট হামলা চালায়। সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে যে তারা সংঘাত বাড়াতে চায় না, তবে যেকোনো আগ্রাসনের কঠোর জবাব দেওয়া হবে। ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, এই যৌথ অভিযানটি ছিল ৩০টিরও বেশি ড্রোন হামলার একটি কঠোর প্রতিক্রিয়া, যা ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল বলে তারা দাবি করেছে। সৌদি কর্মকর্তারা ২০১৯ সালে আবকাইক শোধনাগারে হওয়া সেই বিধ্বংসী হামলার কথা ভোলেননি, যা সৌদির তেল উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক বন্ধ করে দিয়েছিল। সেই হামলার উৎসও ইরাক বলে গোয়েন্দা তথ্যে উঠে এসেছিল। ইরানের ছায়া এবং ভূ-রাজনৈতিক সংকট গত মার্চ ও এপ্রিলে যখন ইরানের শাহেদ ড্রোনগুলো সৌদির পূর্ব উপকূলের তেল স্থাপনায় আঘাত হেনেছিল, তখন সৌদি কর্তৃপক্ষ অ্যান্টি-ড্রোন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রিয়াদ সফর করে ইরানি ড্রোন প্রতিরোধে একটি সমন্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রস্তাব দেন। তবে এ ধরনের ব্যবস্থা রাতারাতি স্থাপন করা সম্ভব নয়। যদিও এপ্রিলের পর থেকে ইরান সরাসরি সৌদি আরবকে লক্ষ্যবস্তু করেনি, তবে চলতি সপ্তাহে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ স্বাধীনভাবে ইরানের ওপর সামরিক হামলায় অংশ নিয়েছে। এর আগে সংঘাতের শুরুর দিকে সৌদি আরব ইরানের ওপর কিছু সতর্কতামূলক বিমান হামলা চালিয়েছিল, যা মূলত যুক্তরাষ্ট্র পাশে না থাকলেও নিজেদের রক্ষা করার সক্ষমতা প্রমাণের একটি বার্তা ছিল। বর্তমানে সৌদি আরবকে তিনমুখী লড়াইয়ের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। ইয়েমেনে হুথি গোষ্ঠী তেল স্থাপনায় মিসাইল হামলা ও বাব আল-মানদেব প্রণালীতে ট্যাংকার অবরোধ করছে এবং এর জবাবে সৌদি আরব হুথি নিয়ন্ত্রিত হুদাইদাহ বন্দরে সরাসরি বিমান হামলা পরিচালনা করেছে। অন্যদিকে ইরাক থেকে ইরানপন্থী মিলিশিয়ারা রিয়াদ ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালাচ্ছে, যার প্রত্যুত্তরে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যৌথভাবে পূর্ব ইরাকে সামরিক অভিযান চালিয়েছে রিয়াদ। মূল ইন্ধনদাতা হিসেবে ইরান সরাসরি হামলার প্রচ্ছন্ন হুমকি ও স্বল্প-পাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল আতঙ্ক তৈরি করেছে। এ কারণে অ্যান্টি-ড্রোন প্রযুক্তিতে দ্রুত বিনিয়োগ এবং সতর্কতামূলক প্রতিরক্ষা অবস্থান গ্রহণ করেছে সৌদি আরব। এই বহুমুখী সংঘাতের কারণে সৌদি আরব ইতোমধ্যেই একটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। যুদ্ধের প্রভাব এবং ধীর অর্থনীতির মোকাবিলায় ব্যয় বাড়ানোর ফলে ২০১৮ সালের পর থেকে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে সবচেয়ে বড় ত্রৈমাসিক ঘাটতি রেকর্ড করেছে দেশটি। তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে এই ঘাটতি কিছুটা পূরণ হলেও তেল উৎপাদন ও রপ্তানিতে আরও বিঘ্ন ঘটলে তা চরম ঝুঁকিতে পড়বে। সৌদির অনেক মেগা-প্রজেক্টের পরিধি ইতোমধ্যেই কমিয়ে আনা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান ও গাজা নীতির আকস্মিক পরিবর্তনে সৌদি কর্মকর্তারা বিস্মিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সামরিক সহযোগিতা নিবিড় থাকলেও, মার্কিন আগ্রহ কমে গেলে একটি আরও বেশি আক্রমণাত্মক ইরানের মুখোমুখি একা হওয়ার আশঙ্কা রিয়াদকে তাড়া করছে। একই সাথে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে সম্পর্ক মেরামতের কাজও সবেমাত্র শুরু হয়েছে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে সৌদি আরব স্পষ্টতই সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে তারা আর নীরবে মার খাবে না; বরং পাল্টা আঘাত করার সময় এসেছে।