দুই দশক ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে প্রথম বাজেট দিতে যাচ্ছে, যেখানে পাঁচটি খাতকে অগ্রাধিকারে রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে।
তবে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের অর্থমন্ত্রীর যেমন প্রশ্ন আছে, তেমনি অর্থনীতির গবেষকও সংশয় প্রকাশ করেছেন।
গেল ১৮ মে তারেক রহমানের সরকার আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন করেছে, যা বাস্তবায়নের সক্ষমতা বিবেচনায় ‘উচ্চাভিলাষী’ মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপির ৫০ শতাংশ বরাদ্দ বাড়িয়ে যে উন্নয়ন ছক আঁকা হয়েছে, সরকার সেখানে পরিবহন ও যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জ্বালানি এবং গৃহায়ন ও কমিউনিটি সুবিধাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অভিষেক হওয়া তারেক রহমানের সরকার বাজেট দিতে যাচ্ছে আগামী ১১ জুন, যার আকার ৯ লাখ কোটি টাকার বেশি হতে পারে বলে আলোচনা আছে।
এবার বাজেট প্রণয়ন ও পরিকল্পনার নেতৃত্ব দিচ্ছেন অর্থমন্ত্রী ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, তার ওপরই সংসদে বাজেট উপস্থাপনের ভার পড়েছে। তিনি এক সময় বিএনপি সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সামলেছেন।
খোদ অর্থমন্ত্রী উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আমলাতন্ত্রের ভূমিকা নিয়ে খেদ প্রকাশ করে বলেছেন, ব্যুরোক্রেসির’ যে অবস্থা, আমাদের মানুষের যে মন মানসিকতা, দুঃখের বিষয় বলতে হয়। কেমনে বাস্তবায়ন করব (উন্নয়ন প্রকল্প)?
অবকাঠামো ঘিরে আওয়ামী লীগ আমলে যে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চলছিল তা থেকে বেরিয়ে মানবসম্পদ তৈরির দিকে ঝোঁকার বার্তা দিচ্ছে বিএনপি সরকার।
তবে এক অর্থবছরের ব্যবধানে ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে যে উন্নয়ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়নে অর্থায়ন হবে কীভাবে? অর্থের অপচয় রোধ সম্ভব হবে কিনা, দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে পারবে কিনা, এসব প্রশ্ন সামনে আছে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম দশ মাসে উন্নয়ন কর্মসূচিতে যে অর্থ ব্যয় হয়েছে, এর মধ্যে ৩২ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা এসেছে ঋণ থেকে। সরকারি তহবিল থেকে খরচ হয়েছে ৪৮ হাজার ৯০১ কোটি টাকা আর সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ৫ হাজার ৩৫ কোটি টাকা।
এডিপির বরাদ্দ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সংশোধিত এডিপি বরাদ্দের ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ বরাদ্দ পরিকল্পনা করা হয় ঋণ থেকে।
ফলে নতুন করে ঋণের বোঝা বাড়িয়ে অর্থনীতিকে আরো চাপে ফেলার পরিস্থিতি তৈরি হবে কিনা, সেই আলোচনাও আছে।
বরাদ্দ বাড়িয়ে কেবল প্রতিশ্রুতির বাজেট দিলেও তা বাস্তবায়নে জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করা গেলে অপচয় ও দুর্নীতি বাড়বে বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন।
তিনি বলেন, একটা জবাবদিহিতার সিস্টেম যদি না করা যায়, তাহলে ওই বরাদ্দ দিয়ে খুব একটা লাভ হবে না। তখন বেশি বরাদ্দ হয়তো হবে, কিন্তু সেখানে শুধুমাত্র অপচয় হবে, দুর্নীতি হবে।
অপরদিকে উন্নয়ন বাজেট ঘিরে যে পরিকল্পনা সাজাচ্ছে সরকার, তা বাস্তবায়নে অর্থ মিলবে কিনা সেই শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্ব ব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।
তিনি বলেন, প্রশ্নটা হল যে এত বড় আকারের বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য হবে কিনা? এইটার জন্য যে অর্থের প্রয়োজন, সেই অর্থটা পাওয়া যাবে কিনা? আর সেইটা যদি না করতে পারেন, তাহলে প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন বাজেটে থাকলেও বাস্তবে কিন্তু সেইটা দেখা যাবে না।
ইশতেহারের পাঁচ স্তম্ভের ছকে এডিপি
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দেশের হাল ধরে।
তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ঠিকাদার ও প্রকল্প পরিচালকদের অনুপস্থিতি এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ‘ধীরে চলা’ নীতির কারণে গেল দুই অর্থবছর দেশে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা বিরাজ করছিল।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্টতা পেয়ে সরকার গঠনের পর এখন তাদেরকেই সামলাতে হবে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার এই কঠিন ‘চ্যালেঞ্জ’।
বিএনপি তার নির্বাচনি ইশতেহারে যে পাঁচ স্তম্ভের কথা বলেছিল, তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনার ছক আঁকছে তারেক রহমানের সরকার।
পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, রাষ্ট্র সংস্কার, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, আঞ্চলিক ভারসাম্য এবং সাংস্কৃতিক-সামাজিক সংহতিকে ‘সমন্বিতভাবে’ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
এরজন্য বিচার ও আইনগত সেবা সম্প্রসারণ, আদালত ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং বিচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রশাসনিক কার্যক্রম প্রযুক্তিনির্ভর করার পরিকল্পনা হাতে নেওয়ার কথা বলছেন তারা।
এছাড়াও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে ‘অগ্রাধিকারমূলক’ বরাদ্দ পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বরাদ্দ বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জোর দিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৩ লাখ কোটি টাকার এডিপি হাতে নিয়েছে সরকার।
বৃহৎ অবকাঠামোর চেয়ে মানবসম্পদ উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়ে সাজানো এডিপিতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া পাঁচ খাতের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সর্বাধিক বরাদ্দ পাচ্ছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাত। এই খাতে ৫০ হাজার ৯২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে শিক্ষা খাত বরাদ্দ পেয়েছে ১৫.৮৬ শতাংশ বা ৪৭ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা।
তৃতীয় সর্বোচ্চ ১১.৮৪ শতাংশ বা ৩৫ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে আলোচিত স্বাস্থ্য খাতে। চলতি অর্থবছরের ১৮ হাজার ১৪৮ কোটি টাকার তুলনায় স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
বরাবরের মতো জ্বালানি ও বিদ্যুতে ভর্তুকি বাড়তে থাকায়, বিশ্ব বাজারে জ্বালানির দামের ওঠানামা ও সংকট থাকায় এ খাতে চতুর্থ সর্বোচ্চ বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৩২ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা।
গৃহায়ন ও কমিউনিটি সুবিধা বাড়াতে এ খাতে রাখা হয়েছে ২০ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা, যা এডিপির পঞ্চম সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
সরকার বৃহৎ (মেগা) প্রকল্পের দিকে হাত না বাড়ালেও অবকাঠামোতে বরাদ্দ কম রাখা হয়নি। মোট বরাদ্দের ১৬.৭০ শতাংশ যে পরিবহন ও যোগাযোগ এবং ১০.৯০ শতাংশ জ্বালানি খাতে, তার বড় অংশের অর্থ যাবে অবকাঠামো উন্নয়নে।
পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “জাতীয় ও আঞ্চলিক অবকাঠামো উন্নয়ন, রেল ও নৌ যোগাযোগ সম্প্রসারণ, বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন, গ্যাস অনুসন্ধান এবং শিল্পপার্ক ও অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ প্রেক্ষিতেই পরিবহন ও যোগাযোগ খাত এবং জ্বালানি খাতে মোট বরাদ্দের সাড়ে ২৭ শতাংশের মতো বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ সাড়ে ৮২ হাজার কোটি টাকার মতো অর্থ খরচা হবে অবকাঠামোর সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রকল্পে।
এছাড়া বিশেষ প্রয়োজনে সামাজিক উন্নয়ন সহায়তা বাবদ থোক ১৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বাস্তবায়নে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, ‘কৃষক কার্ড’ বাস্তবায়নে ১ হাজার ৪০০ কোটি এবং মসজিদ ও অন্যান্য উপাসনালয়ের কর্মরতদের সম্মানীতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বরাদ্দ না দেওয়া, অর্থ খচরের সক্ষমতার ঘাটতি ও দুর্নীতি নিয়ে বরাবরই সমালোচনা হয়ে আসছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ-এনইসির সভায় নতুন অর্থবছরের জন্য এডিপি অনুমোদনের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
অর্থনীতির নানামুখী সংকটের মধ্যেও এডিপির আকার বাড়ানো ‘উচ্চাভিলাষী’ সিদ্ধান্ত কিনা, সেই প্রশ্নে মন্ত্রী বলেন, “অবশ্যই। এইখানে আমরা কিন্তু সব কথাগুলো স্পষ্টভাবে বলেছি। স্বাস্থ্য, শিক্ষাক্ষাত, ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ (তরুণ জনসংখ্যার আধিক্যের সুবিধা) এবং এই যুব সমাজের উন্নয়ন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, এগুলো কিন্তু সবকিছু এক জায়গায়।
\
এবং এই জায়গায় বাজেট না দিলে আমরা ‘ইউনিভার্সেল হেলথ কেয়ারের’ যে কথাটা বলছি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, এটার সাথে আরও অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা, এগুলো বাস্তবায়ন করতে গেলেতো আপনাকে বাজেট দিতে হবে, তাই না?
তিনি বলেন, শিক্ষার বেলাতেও তাই। শিক্ষার কিন্তু আমরা বিস্তৃতিটা বাড়াচ্ছি, এখানে কিন্তু প্রচুর ‘স্কিল ডেভেলপমেন্ট’ হবে, আপনার দক্ষতা বাড়ানো। এখানে প্রচুর ইনস্টিটিউশন হবে।
‘উন্নয়নহীন’ দুই অর্থবছর
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর উন্নয়ন প্রকল্পের গতি প্রায় থমকে যায়। বহু প্রকল্পের ঠিকাদার ও প্রকল্প পরিচালকদের খুঁজে না পাওয়ায় মাঠপর্যায়ের কাজ স্থবির হয়ে পড়ে।
সে সংকটময় পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিগত অর্থবছরের বাজেট সংস্কার ও প্রকল্প কাটছাঁটের নীতি বেছে নেয়, ফলে উন্নয়ন খাতে এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়।
প্রকল্প বাস্তবায়নের মন্থর গতি ও রাজস্ব আদায়ে লক্ষাধিক কোটি টাকার ঘাটতির শঙ্কায় অর্থবছরের মাঝপথে এসে অন্তর্বর্তী সরকার আরও প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আঁটসাঁট নীতি গ্রহণ করে।
এতে করে চলতি অর্থবছরের ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার এডিপিতে কোপ পড়ে। জানুয়ারিতে এসে কাটছাঁটের পর সংশোধিত এডিপির আকার দাঁড়ায় ২ লাখ কোটি টাকা।
সবচেয়ে বড় কোপ পড়ে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের বরাদ্দে। স্বাস্থ্যসেবা খাতে বরাদ্দ কমেছে ৭৩ শতাংশ; আর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষায় কমেছে ৫৫ শতাংশ।
বিএনপি সরকার বাজেট ঘোষণার আগে চলতি অর্থবছরের প্রায় চার মাস পেলেও তাতে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পালে হাওয়া লাগাতে পারেনি। এর মধ্যে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের অনেক প্রকল্প বাদ দেওয়ারও পরিকল্পনার কথা বলছে সরকার।
গেল ২ জুন বাজেট বিষয়ক এক সেমিনারে অর্থমন্ত্রী এদিকে ইঙ্গিত করে বলেন, “বিগত দিনের ১ হাজার ৩০০ প্রজেক্ট নিয়ে আমরা দায়িত্ব নিয়েছি, এর মধ্যে অনেক প্রজেক্ট এই মানদণ্ড মিট করছে না।
এরমধ্যে আমরা অনেক বাতিল করে দেব। আর যেগুলো অনেক খরচ করে ফেলেছে, ওইগুলো আমরা ‘রিপারপাসিং’ করে আরও ‘বেস্ট রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট’ করা যায়, আমরা চেষ্টা করছি।
প্রকল্প বাছাইয়ের মানদণ্ড বিষয়ে তিনি বলেন, “আমরা প্রজেক্টের চারটা মানদণ্ড দিয়েছি। প্রত্যেকটা প্রজেক্টের চারটা মানদণ্ড। একটা হচ্ছে ‘ভ্যালু ফর মানি’- আমি যে টাকাটা খরচ করলাম, এটার মূল্যমান থাকতে হবে। আরেকটা হচ্ছে ‘রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট’- যে ‘প্রজেক্টটা’ করছি এটার ‘রিটার্নটা’ আমার কী হবে-এটার হিসাব করতে হবে।
তৃতীয় হচ্ছে ‘জব ক্রিয়েশন’ হচ্ছে কিনা। চতুর্থ হচ্ছে আমাদের ‘এনভাইরনমেন্টাল কনসিডারশনটা’ ঠিক হচ্ছে কিনা। আমরা ছোট দেশ, এতগুলো লোক আমরা বাস করি, পরিবেশ ধ্বংস করে দিয়ে আমরা অর্থনীতি গঠন করলে আমাদের জন্য ক্ষতিকর হবে। আমাদের প্রত্যেকটা প্রকল্প বাছাইয়ে এই চারটা মানদণ্ড যেটা পূরণ করবে না, ওই সমস্ত প্রকল্প আমরা বাতিল করে দিচ্ছি।
আওয়ামী লীগ সরকারের অনেক প্রকল্প কাটছাঁটের দিকে গেলেও এডিপিতে মেট্রোরেলের তিন প্রকল্পেই বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৩ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা।
এর মধ্যে এমআরটি-৫ লাইনের জন্য রাখা হয়েছে ৭ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা, এমআরটি-১ এর জন্য ৩ হাজার ৯০৯ কোটি এবং চালু থাকা এমআরটি-৬ এর জন্য ১ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
এডিপির সবশেষ হালচাল
জুলাই অভ্যুত্থানের পর এডিপি বাস্তবায়নে যে ধাক্কা লেগেছিল, তা অব্যাহত আছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে ৪১ দশমিক ৪১ শতাংশ।
তাতে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত ৮৬ হাজার ৫১৬ কোটি ৮ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতেও অর্থবছরের বাকি দুই মাসে (মে ও জুন) ১ লাখ ২২ হাজার ৪২০ কোটি টাকা খরচ করতে হবে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম দশ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) ৯৩ হাজার ৪২৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা খরচ হয়েছিল। বাস্তবায়নের হার ছিল ৪১ দশমিক ৩১ শতাংশ।
সে হিসাবে গত অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ের চেয়ে চলতি অর্থবছরের একই সময়ে ৬ হাজার ৯০৯ কোটি টাকা কম ব্যয় হয়েছে।
আইএমইডির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং প্রশাসনে রদবদলের ধাক্কায় এডিপি বাস্তবায়নে যে ধীরগতি দেখা দিয়েছিল, তা এখনও চলছে।
চলতি অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া ১৫ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের গড় বাস্তবায়নের হার ৫০ দশমিক ৭৬ শতাংশ। এই অর্থবছরের ২ লাখ ৮ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকা এডিপির ৭০.৯৭ শতাংশই বরাদ্দ ছিল এসব মন্ত্রণালয় ও বিভাগে।
‘সরকারে সক্ষমতা বাড়ার ইঙ্গিত’
এডিপির এই বিশাল আকারকে ‘উচ্চাভিলাষী’ বলা হলেও সরকারের পক্ষ থেকে একে সক্ষমতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গেল ১৮ মে নতুন অর্থবছরের এডিপি অনুমোদনের পর অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু বলেন, “চলমান অর্থবছরের তুলনায় এটি বড় আকারের উন্নয়ন কর্মসূচি, যা সরকারের বিনিয়োগ ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত। বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনার যে প্রস্তাবটি দেওয়া হয়েছে, এটিতে আমরা ধরে নিয়েছি একটি নির্বাচিত সরকারের সক্ষমতা অনেক বেশি।
এফিসিয়েন্সি অনেক বেশি থাকবে এবং এটার বাস্তবায়ন ক্ষমতাও বেশি হবে।
বাস্তবায়ন নিয়ে মন্ত্রী বলেছিলেন, এখন বাস্তবায়ন হবে কি না, এটা তো অপেক্ষা করতে হবে। বাস্তবায়ন তো করতেই হবে, না হলে আমরা আমাদের প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, রপ্তানি আর শিল্পের উৎপাদন কীভাবে অর্জন করব? এগুলো সব একটার সাথে একটা ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
গেল ২ জুন বাজেট বিষয়ক সেমিনারেও বাস্তবায়নে বাধাগুলো কী কী তা তুলে ধরেন আমির খসরু। এরমধ্যে আমলাতন্ত্রের প্রসঙ্গও টানেন।
তিনি বলেন, বড় বাজেট বাস্তবায়িত হয় না। একদম সঠিক কথা। বাস্তবায়িত হয় না, বাস্তবায়িত করতে পারে না। কার কারণে পারে না, কেন পারে না, কোথায় পারে না, কোথায় বাধাগ্রস্ত, আমরা তো ‘আইডেন্টিফাই’ করতেছি।
জবাবদিহিতা ও সক্ষমতায় জোর
বরাদ্দ বাড়ালেই যে ফল মিলবে, তা মনে করেন না অর্থনীতির গবেষকরা। তারা ব্যবস্থাপনার দিকেও নজর দিতে বলেছেন।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, এখানে দুটো বিষয়—একটা হচ্ছে যে অর্থ খরচ, দ্বিতীয় হচ্ছে গুণগত মান বজায় রেখে খরচ করা, যাতে প্রকল্প থেকে লক্ষণীয় ফল আসে।
সরকারের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক খাতে বরাদ্দের উদ্যোগ নিয়ে তিনি বলেন, “আমরা বাজেটে বরাদ্দ নিয়ে অনেক সময় বলি যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক খাতগুলোতে বরাদ্দ এত কম। তুলনীয় দেশগুলোর চাইতে কম। এটা একটা আমাদের আক্ষেপ কিংবা ‘কমপ্লেইন’ বলতে পারেন। কিন্তু অন্যদিকে এটাও মাথায় রাখা যে বরাদ্দ বাড়ালেই কী সবাই শিক্ষিত হয়ে যাবে বা শিক্ষার গুণগত মান বেড়ে যাবে? এটা হয়ে যাবে, তা তো না।
আবার স্বাস্থ্যসেবা খুব মান বেড়ে যাবে, এটাও না। পৃথিবীর বহু দেশেই, এটা আমাদের দেশেও বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে দুটো বিষয় এক না।
এই গবেষকের মতে, বরাদ্দ বাড়িয়ে সরকার দেখাতে চায় যে তার একটা দায়বদ্ধতা আছে, এই খাতটাকে সে গুরুত্ব দিচ্ছে। শুধুমাত্র রাস্তাঘাট ও ভৌত অবকাঠামো না, সামাজিক অবকাঠামোতেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু পরবর্তী যে কাজ, সেটা কিন্তু আর করা হয় না।
প্রকল্পের অগ্রগতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতার গুরুত্ব তুলে ধরে ফাহমিদা খাতুন বলেন, ওই রকম একটা জবাবদিহিতার সিস্টেম যদি না করা যায়, তাহলে ওই বরাদ্দ দিয়ে খুব একটা লাভ হবে না। তখন বেশি বরাদ্দ হয়তো শুধুমাত্র অপচয় হবে, দুর্নীতি হবে।
বড় বাজেট ও এডিপি হাতে নেওয়ার মাধ্যমে নির্বাচনি ‘প্রতিশ্রুতি’ পূরণের পথে হাঁটা শুরু করেছে সরকার, সেরকম একটা বার্তা দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা জাহিদ হোসেন।
তিনি প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যবস্থাপনার দিকেও নজর দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন।
দরিদ্র, দুঃস্থ ও সচ্ছলদের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের আওতায় শতাধিক কর্মসূচি থাকার কথা তুলে ধরে জাহিদ হোসেন বলেন,
এগুলোর ‘পারফরম্যান্স’ দেখি, যাদের জন্য কর্মসূচিগুলো দেওয়া হয়েছিল, তাদের কাছে পৌঁছাতে পারে না।
এর কারণ ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ব্যবস্থাপনার সমস্যা আছে, যার কারণে ১ টাকা দিতে গিয়ে আপনার দেড় টাকা খরচ হয়। এই সমস্যাগুলো, এই যে নতুন কর্মসূচিতে এগুলো থাকবে না, সেটা তো আমরা ধরে নিতে পারি না।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবান ধাতুর দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। মঙ্গলবার রুপা, প্লাটিনাম ও প্যালাডিয়ামের দাম বেড়েছে। খবর রয়টার্সের। বাজারের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, স্পট মার্কেটে প্রতি আউন্স রুপার দাম শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ৫৮ দশমিক ৬৬ ডলারে পৌঁছেছে। এদিকে, প্লাটিনামের দাম ১ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি আউন্স ১ হাজার ৬৫৩ দশমিক ৫৩ ডলারে লেনদেন হয়েছে। অন্যদিকে, প্যালাডিয়ামের দাম ১ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ১ হাজার ২৮০ দশমিক ৫০ ডলারে উন্নীত হয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সুদনীতি এবং ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে মূল্যবান ধাতুর বাজারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বজায় রয়েছে। এদিকে মঙ্গলবার গ্রিনিচ মান সময় সকাল ৯টা ৫ মিনিটে স্পট মার্কেটে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম প্রায় অপরিবর্তিত থেকে ৪,০৫২ দশমিক ৮৬ ডলারে লেনদেন হয়। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের স্বর্ণের ফিউচার চুক্তির দাম শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৪,১১১ দশমিক ৭০ ডলারে পৌঁছায়।
তারল্য সরবরাহ ও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বাড়াতে নীতি সুদহার কমানোর ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) বাংলাদেশ ব্যাংক এক বিজ্ঞপ্তিতে এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে। এতে বলা হয়, নীতি সুদহার কমানোর এ সিদ্ধান্ত ২ আগস্ট থেকে কার্যকর হবে। তারল্য ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটারি পলিসি বিভাগ নীতি সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, বৃহস্পতিবার মনিটারি পলিসি কমিটির (এমপিসি) ১৩তম চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও কমিটির সভাপতি মো: মোস্তাকুর রহমান এফসিএমএ-এর সভাপতিত্বে বোর্ডের মিটিং রুমে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ডেপুটি গভর্নর ড. মো: হাবিবুর রহমান, আইআরএনএম-এর নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তফা কামাল মুজেরী, বিআইডিএস-এর মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. ফেরদৌসী নাহার, বাংলাদেশ ব্যাংকের চিফ ইকোনমিস্ট ড. মোহাম্মদ আক্তার হোসেন এবং নির্বাহী পরিচালক ড. ইমাম আবু সাইদসহ কমিটির অন্যান্য সদস্যবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সভায় উপস্থিত সদস্যরা অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, দেশীয় বিনিয়োগ, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির শ্লথ গতিধারাসহ আন্তর্জাতিক লেনদেন ভারসাম্য সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন অর্থনৈতিক চলকসমূহের গতিপ্রকৃতি পর্যালোচনার পর নীতি সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তারল্য ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখা এবং সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতির অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটারি পলিসি বিভাগ। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নীতি সুদহার বা রেপো রেট ১০ শতাংশ থেকে দশমিক ৫০ শতাংশীয় পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে পুন:নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলো যে টাকা ধার করবে, তার সুদহার কমবে। অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংক এবার সম্প্রসারণমূলক মুদ্রা সরবরাহের পথে হাঁটছে। এছাড়া নীতি সুদহার করিডোরের ঊর্ধ্বসীমা স্ট্যান্ডিং ল্যান্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) সুদহার ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে দশমিক ৫০ শতাংশীয় পয়েন্ট কমিয়ে ১১ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে এবং আভার নাইট রেপো সুদহার নীতি ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত থাকবে। খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, নীতি সুদহার কমানোর ফলে ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে তুলনামূলক কম সুদে অর্থ ধার নিতে পারে। এর ফলে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের কাছেও ব্যাংকগুলো কম সুদে ঋণ দিতে পারে। এতে ঋণ নেওয়ার আগ্রহ বাড়ে এবং বাজারে অর্থের সরবরাহ বৃদ্ধি পায়। তবে অর্থের সরবরাহ ও ভোগ চাহিদা বাড়লে, পণ্যের দামও বাড়তে পারে। এর ফলে মুদ্রাস্ফীতির চাপ সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করছেন-অর্থনীতিবিদরা। চলতি অর্থবছরের মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণের লক্ষ্য বেশি থাকলেও তা পূরণ হয়নি। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ৮ শতাংশ লক্ষ্য ঠিক করেছিল। কিন্তু চলতি বছরের মে মাসে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬ দশমিক ৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে প্রবৃদ্ধি অর্জনের তুলনায় বাড়ানো হয়েছে। এদিকে অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ১০ দশমিক ৫ শতাংশ।
কার্ড থেকে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) ব্যক্তিগত হিসাবে ‘অ্যাড মানি’ বা টাকা স্থানান্তরের ক্ষেত্রে নতুন নিরাপত্তা নির্দেশনা বাস্তবায়নের সময়সীমা চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে এই প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা কার্যকর করার জন্য আগামী ৩১ জুলাই পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছিল, সময়সীমা পেরিয়ে গেলে ১ আগস্ট থেকে কার্ড থেকে এমএফএস হিসাবে অ্যাড মানি করার সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে। নতুন নির্দেশনায় সেই সময়সীমা আরও ছয় মাস বাড়ানো হলো। ১ জানুয়ারি থেকে কঠোর ব্যবস্থা: বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, সংশোধিত সময়সীমার মধ্যে কোনো ব্যাংক বা এমএফএস প্রতিষ্ঠান নতুন নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হলে আগামী ১ জানুয়ারি থেকে ওই প্রতিষ্ঠানের কার্ড থেকে এমএফএস হিসাবে অ্যাড মানি করার সুবিধা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হবে। কী থাকছে নতুন নিয়মে? নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী— নিজের নামে নিবন্ধিত এমএফএস হিসাবে অন্য কোনো ব্যক্তির কার্ড ব্যবহার করে টাকা আনা যাবে না। কার্ডধারী ও এমএফএস হিসাবধারী একই ব্যক্তি হতে হবে। নামের মিল না থাকলে কার্ড সংযুক্ত করা যাবে না। প্রথমবার যুক্ত করতে হবে ‘টোকেন লেনদেন’ প্রযুক্তিগত ও নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে প্রথমবার কোনো নতুন কার্ড এমএফএস ওয়ালেটে যুক্ত করার সময় সর্বোচ্চ ৫০০ টাকার একটি পরীক্ষামূলক বা ‘টোকেন লেনদেন’ করতে হবে। এই লেনদেন সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার ২৪ ঘণ্টা পর সংশ্লিষ্ট কার্ডটি ওই এমএফএস হিসাবের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত হবে এবং এরপর নিয়মিত লেনদেন চালু হবে। ‘মার্চেন্ট পেমেন্ট’ নয়, ‘ফান্ড ট্রান্সফার’: এতদিন কার্ড থেকে এমএফএসে টাকা আনার প্রক্রিয়াটি অনেক ক্ষেত্রে ‘মার্চেন্ট পেমেন্ট’ হিসেবে দেখানো হতো। এখন থেকে এটি সরাসরি ‘ফান্ড ট্রান্সফার’ হিসেবে চিহ্নিত করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়া কোন নির্দিষ্ট এমএফএস ওয়ালেট নম্বরে টাকা জমা হচ্ছে, সেই তথ্য কার্ড ইস্যুকারী ব্যাংকের কাছে স্পষ্ট ও দৃশ্যমান থাকতে হবে। আগের অন্যান্য নিয়ম বহাল: বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এমএফএস ব্যক্তিগত হিসাবের মাধ্যমে অন্যান্য নিয়মিত লেনদেনের ক্ষেত্রে আগের নিয়মগুলো যথারীতি বহাল থাকবে। সংশোধিত সময়সীমা ও নতুন নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।