পাকিস্তানের পানির প্রতিটি ফোঁটাকে ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমারেখা হিসেবে ঘোষণা করে প্রতিবেশী ভারতকে কঠোর বার্তা দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। তিনি বলেছেন, পাকিস্তান শান্তি চায়, তবে সেই অবস্থানকে দুর্বলতা হিসেবে দেখা উচিত নয়। ভারতের পক্ষ থেকে পানির অধিকার নিয়ে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ হলে পাকিস্তান তার সরাসরি জবাব দেবে।
বৃহস্পতিবার (১৪ আগস্ট) পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে রাজধানী ইসলামাবাদে নবনির্মিত ‘ইয়াদগার-ই-ফাতাহ’ (বিজয় স্মৃতিস্তম্ভ) উদ্বোধন অনুষ্ঠানে দেওয়া ভাষণে তিনি এ মন্তব্য করেন। সাম্প্রতিক সময়ে সিন্ধু নদের পানি বণ্টন ইস্যুতে ভারত-পাকিস্তানের উত্তেজনার মধ্যেই তার এই বক্তব্য বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
বিজয় স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন
দেশপ্রেম ও জাতীয় উদ্দীপনার পরিবেশে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি, প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং সেনাবাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনির যৌথভাবে স্মৃতিস্তম্ভটির উদ্বোধন করেন।
শেহবাজ শরিফ বলেন, ‘ইয়াদগার-ই-ফাতাহ’ পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা, আত্মত্যাগ ও সাহসিকতার প্রতীক। তিনি পাকিস্তানের সরকারি ভাষ্যে ‘মারকা-ই-হক’ নামে পরিচিত সামরিক অভিযানে ভূমিকার জন্য ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ও তার নেতৃত্বাধীন বাহিনীকে অভিনন্দন জানান।
তিনি আরও জানান, মাত্র আট মাসের মধ্যে বিশেষ নকশায় স্মৃতিস্তম্ভটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে।
‘পানির প্রতিটি ফোঁটাই রেড লাইন’
ভারতের উদ্দেশে কড়া বার্তা দিয়ে শেহবাজ বলেন, পাকিস্তান এই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চায়। তবে সেই অবস্থানকে দুর্বলতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।
তিনি বলেন, “পাকিস্তানের পানির প্রতিটি ফোঁটাই আমাদের জন্য রেড লাইন। আমাদের পানির অধিকার নিয়ে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ মেনে নেওয়া হবে না।”
বিশ্লেষকদের মতে, এই মন্তব্যের মাধ্যমে পাকিস্তান স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিয়েছে যে, সিন্ধু নদের পানি বণ্টন এখন তাদের কাছে শুধু অর্থনৈতিক নয়, জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়েও পরিণত হয়েছে।
সামরিক সাফল্যের দাবি
শেহবাজ শরিফ তার ভাষণে বলেন, পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীর সাফল্যে পুরো জাতির মাথা উঁচু হয়েছে এবং প্রতিপক্ষকে “লজ্জাজনক পরাজয়” বরণ করতে হয়েছে।
পাকিস্তানের সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের সঙ্গে চার দিনের সংঘাতে দেশটির বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সাফল্য অর্জন করে।
তবে ওই সংঘাতের প্রকৃতি, উভয় পক্ষের ক্ষয়ক্ষতি এবং যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার মতো দাবিগুলোর বিষয়ে ভারত ও পাকিস্তানের বক্তব্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে এবং এসব দাবির অনেকগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও আঞ্চলিক কূটনীতি
ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বলেন, নতুন সংঘাত এড়াতে তার দেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকারও প্রশংসা করেন।
ভবিষ্যতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইসলামাবাদের সম্পর্ক আরও জোরদার হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
কাশ্মীর, ফিলিস্তিন ও আফগানিস্তান প্রসঙ্গ
মধ্যপ্রাচ্যের প্রসঙ্গে তিনি মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে মন্তব্য করেন এবং কাশ্মীর ও ফিলিস্তিন ইস্যুতেও পাকিস্তানের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, ফিলিস্তিনিদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে পাকিস্তানের সমর্থন অব্যাহত থাকবে এবং কাশ্মীরিদের আত্মত্যাগ বৃথা যাবে না।
একই সঙ্গে আফগানিস্তানের অন্তর্বর্তী প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আফগান ভূখণ্ড যেন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত না হয়।
জাতীয় ঐক্যের আহ্বান
দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রসঙ্গে শেহবাজ বলেন, “ঐক্যবদ্ধ জাতিকে কোনো পরাশক্তি পরাজিত করতে পারে না।”
তিনি রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে শত্রুতায় রূপ না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে সব পক্ষকে দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানান।
সিন্ধু পানিচুক্তি নিয়ে উত্তেজনা
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ১৯৬০ সালের সিন্ধু পানিবণ্টন চুক্তি দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের পানি ব্যবস্থাপনার প্রধান কাঠামো হিসেবে কাজ করেছে।
পাকিস্তানের দাবি, ভারত চুক্তিটি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর থেকেই ইসলামাবাদ পানির অধিকারকে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে দেখছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শেহবাজ শরিফের সর্বশেষ বক্তব্যে পানিকে সরাসরি ‘রেড লাইন’ ঘোষণা করা এবং ভারতকে “সঠিক পথে” ফেরার আহ্বান দুই দেশের চলমান উত্তেজনাকে আরও নতুন মাত্রা দিয়েছে। বর্তমানে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের টানাপোড়েনে পানি শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, বরং কৌশলগত রাজনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।