ক্ষমতাচ্যূত আওয়ামী লীগ সরকারের চেয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সেবা খাতে দুর্নীতির পরিমাণ ১০ শতাংশের বেশি বেড়েছিল- এমন তথ্য জানানো হয়েছে দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবি'র জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫'র প্রতিবেদনে।
তবে ২০১৭ সাল থেকে টিআইবির একই ধরনের আগের জরিপগুলোতে সেবাখাতে দুর্নীতি ক্রমশ বেড়েছে বলেই দেখা যাচ্ছে।
যদিও দুর্নীতি আর ঘুষ নেওয়ার প্রবণতা বাড়ার সাথে ক্ষমতায় থাকা সরকারের চেয়ে সামগ্রিক কাঠামোকেই মূল কারণ হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকরা।
তারা বলছেন, দুর্নীতি হচ্ছে মূলত মাঠ পর্যায়ে। সরকার বদলালেও কাঠামো বরাবরই একই রকম ছিল। দুর্নীতি, ঘুষ কিংবা অবৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণের অপরাধে শাস্তির উদাহরণ না থাকায় তা সময়ের সাথে সাথে বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেওয়া বেশিরভাগ সিদ্ধান্তই ছিল রাজনীতিকেন্দ্রিক। দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাদের মুখে জোরালো আওয়াজ শোনা গেলেও তা কমাতে বাস্তবিক কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়নি। এমনকি কমিশন গঠন ছাড়া মাঠ পর্যায়ে যেহেতু দুর্নীতি দমনে বিশেষ কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, ফলে স্বাভাবিকভাবেই "যেভাবে দুর্নীতি হয়েছে সেই পরিস্থিতিরই অব্যাহত ধারা" দেখা গেছে।
তাছাড়া নির্বাচিত সরকার না হওয়ায় মাঠ পর্যায়ে চলা দুর্নীতি দমানো কিংবা কমানোর 'ক্যাপাসিটি' না থাকায় আগের সরকারের তুলনায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এ ধরনের প্রবণতা বেড়েছে বলেও মনে করছেন কেউ কেউ।
এদিকে, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল টিআইবির দেওয়া তথ্যকে তৃণমূল পর্যায়ের দুর্নীতি উল্লেখ করে বলছেন, "সেখানে দুর্নীতির যতটুকু বৃদ্ধি হয়েছে, প্রতি বছরের মুদ্রাস্ফীতির তুলনায় তা বেশি নয়"।
সেবা খাতে দুর্নীতির মাত্রা জানতে ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ১৫ হাজার ৭১৫টি খানার ওপর জরিপ চালায় টিআইবি।
জরিপের ফলাফলে বলা হয়েছে, গ্রাম ও শহরাঞ্চল মিলিয়ে দেশের ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ খানা কমপক্ষে একটি সেবা খাতে দুর্নীতির শিকার হয়েছে, যা ২০২৩ সালে ছিল ৭০.৯ শতাংশ।
একইভাবে ২০২৫ সালে ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ খানা কমপক্ষে একটি সেবা খাতে ঘুষের শিকার হয়েছে; ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ছিল ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ।
টিআইবি জানায়, দুই বছরের ব্যবধানে দুর্নীতি আর ঘুষ দুই ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীর সংখ্যা বেড়েছে যথাক্রমে ১০ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ১২ দশমিক ৮ শতাংশ।
তাদের আগের জরিপগুলোতেও দুর্নীতির হার ক্রমান্বয়ে বাড়তে দেখা গেছে। যেমন- ২০১৭ সালে সব মিলিয়ে দুর্নীতির শিকার হয়েছিল সাড়ে ৬৬ শতাংশ মানুষ। পাঁচ বছর পর ২০২১ সালের জরিপে এই সংখ্যা বেড়ে ৭০ দশমিক আট শতাংশে দাঁড়ায় বলেও জানানো হয়।
তবে ঘুষের ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতি ছিল কিছুটা আলাদা, বলছে টিআইবি। ২০১৭ সালে তাদের জরিপ প্রতিবেদনে যে সংখ্যা ছিল ৪৯ দশমিক আট শতাংশ, পাঁচ বছরের ব্যবধানে তা কমে ৪০ দশমিক এক শতাংশে দাঁড়ায়।
এই একটি বাদে বাকি সব উপাত্তেই পর্যায়ক্রমে দুর্নীতি ও ঘুষের পরিমাণ বাড়তে থাকার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী ব্যবস্থা না নেওয়ায় সময়ের সাথে সাথে নিয়মিতভাবে দুর্নীতি বাড়ার এই প্রবণতা একটি কাঠামো হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। ফলে যেই সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, দৃশ্যপট থাকছে অভিন্ন।
বেসরকারি সংস্থা সিপিডির গবেষণা পরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, খাতভিত্তিক দুর্নীতির বেশিরভাগই হয় মাঠ পর্যায়ে। আর এই জায়গাগুলোতে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও কোনো পরিবর্তন আসেনি, কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের মূল লক্ষ্য ছিল 'পলিটিক্যাল ট্রানজিশন' বা রাজনৈতিক রূপান্তর।
"যতটুকু পরিবর্তন আমরা দেখেছি, সেটা একেবারে ম্যাক্রো লেভেলে পলিটিক্যাল লিডারশিপ পর্যায়ে (রাজনৈতিক নেতৃত্বের তৃণমূল পর্যায়ে)। কাঠামোগতভাবেও অন্তর্বর্তী সরকারের অল্প সময়ে এই পরিবর্তনগুলো (দুর্নীতিবিষয়ক) সম্ভব নয়"।
"দুর্নীতি এখানে সবার জন্যই কমন ফেনোমেনা বা একই পরিস্থিতি। এটার সাথে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, অন্তর্বর্তী বলে কিছু নাই। রাজনৈতিক কোনো চরিত্র নাই দুর্নীতির। সো সেটির ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব পড়েনি," বলছিলেন তিনি।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ভবিষ্যতে পরিবর্তন আনার জন্য কিছু ক্ষেত্রে কমিশন গঠন করা হলেও মাঠপর্যায়ে গিয়ে প্রেক্ষাপট বদলানো কিংবা তার মাধ্যমে সংস্কার বা দুর্নীতির ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার তাদের 'প্রায়োরিটি' না থাকায় পরিস্থিতির অব্যাহত ধারা দেখা গেছে বলে মন্তব্য করেন মি. মোয়াজ্জেম।
একইসাথে নির্বাচিত সরকার না হওয়ায় রাজনৈতিকভাবে বিষয়গুলো সামলানোর যে প্রবণতা অন্য সরকারগুলোর কাছে থাকে, সেটাও অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে না থাকায় "আগের সরকারের তুলনায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুর্নীতি বেড়েছে" বলে মনে করেন এই পর্যবেক্ষক।
অন্যদিকে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জমান বলছেন, জরিপে আনা মন্তব্যগুলোতে দেখা গেছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় করা সরকারি কর্মকর্তাদের কিংবা অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের সম্পদ প্রকাশের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন হয়নি।
"একদিকে এই অঙ্গীকারের প্রতি অবিশ্বাস, আস্থাহীনতা; অন্যদিক থেকে যারা এটা করে, তারা এটাকে স্বাভাবিক হিসেবে নিয়ে নিয়েছে। এই দৃষ্টান্তগুলো নেই, সে কারণে এই অবস্থা বেড়েছে", বলছিলেন তিনি।
'বিচ্ছিন্নভাবে' কিছু পরিসংখ্যান দেখে ব্যর্থতা খোঁজাকে 'অজ্ঞতার পরিচায়ক' হিসেবে বর্ণনা করেছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল।
তার দাবি, টিআইবি যে তথ্য দিয়েছে তা তৃণমূল পর্যায়ের দুর্নীতির। সেখানে দুর্নীতির যতটুকু বৃদ্ধি হয়েছে, প্রতিবছরের মুদ্রাস্ফীতির তুলনায় তা বেশি নয়।
"অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বরং বড় বড় ক্ষেত্রে, যেমন ব্যাংকিং ও করপোরেট খাতে, নতুন করে দুর্নীতির ঘটনা ঘটেনি। এর প্রতিফলন আমরা রিজার্ভ ও রেমিট্যান্সের ব্যাপক বৃদ্ধি এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে আসার মধ্যে দেখতে পাই। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু পরিসংখ্যান দেখে আমাদের ব্যর্থতা খোঁজা তাই অজ্ঞতার পরিচায়ক," অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় দুর্নীতি বাড়ার প্রসঙ্গে বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
"তবে এটিও ঠিক যে, আমরা সব ক্ষেত্রে বা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় দুর্নীতি কমাতে পারিনি। আমরা দুর্নীতি রোধে প্রকিউরমেন্ট আইন, ব্যাংকিং সংক্রান্ত আইন, দেওয়ানি ও ফৌজদারী কার্যবিধি আইনসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইনগত সংস্কার করেছি; বিএমইটিসহ বহু প্রতিষ্ঠানে ডিজিটালাইজেশন করেছি; বিদ্যুৎক্ষেত্রে দায়মুক্তি আইন বাতিল করেছি, ডিজিটাল বেইল বন্ড ও অনলাইন সত্যায়নসহ কিছু ব্যবস্থা চালু করেছি," বলেন আসিফ নজরুল।
তিনি দাবি করেন, ক্ষমতাচ্যূত আওয়ামী লীগ আমলে দুর্নীতি এত বিস্তৃত ও গভীরভাবে সমাজে অনুপ্রবেশ করেছে যে এসব ব্যবস্থা যথেষ্ট নয় এবং এসবের সুফলও এত দ্রুত পাওয়া সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ দুর্নীতির শিকার হওয়ার তথ্য খুবই উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। তারা বলছেন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে না বলেই তা বিকশিত হচ্ছে আর বর্তমানে তা স্বাভাবিক বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে।
জরিপে অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত খাতের তালিকায় শীর্ষে উঠে এসেছে পাসপোর্ট, বিআরটিএ, বিচারসংশ্লিষ্ট সেবা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও ভূমি খাত।
জরিপে ঘুষের শিকার ব্যক্তিদের ৮৬ শতাংশের বেশি মানুষ বলেছেন, ঘুষ না দিলে তারা সেবা পান না।
পরিস্থিতি সামাল দিতে পুরো ব্যবস্থাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার সুপারিশ করেছে জরিপে অংশগ্রহণকারীরা।
"যাদের ওপর দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব, তারা নিজেরাই দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। এটাতো একটা চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে গেছে," বলছিলেন ড. ইফতেখারুজ্জমান।
অন্যদিকে দুর্নীতির যে পর্যায়ে বাংলাদেশ পৌঁছেছে সেখানে কোনো কার্যকর উদ্যোগ না নিয়ে কেবল উদ্বেগের কথা জানানোর আর কোনো অবকাশ নেই বলে মনে করছেন ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
"প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা দুর্নীতির এতকিছু জেনেও যে উদ্যোগ নিচ্ছি না, সে জায়গাটা উদ্বেগের এবং সরকারগুলো সব জেনেও যে চোখ বুঁজে থাকছেন সেটা উদ্বেগের," বলছিলেন তিনি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের প্রায় ২৯ শতাংশ বেকার। উচ্চশিক্ষিত কর্মীদের প্রায় অর্ধেক এমন কাজ করছেন, যেখানে তাদের শিক্ষা ও দক্ষতার পুরো ব্যবহার হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের নাম ‘রিজিওনাল ইকোনমিক আউটলুক: এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিক’। এটি গত বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) প্রকাশিত হয়েছে। এতে ২ অক্টোবর পর্যন্ত পাওয়া তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। আইএমএফ বলছে, নতুন স্নাতকদের চাকরির বাজারে ঢোকার পথে বড় বাধা হলো দক্ষতার অমিল। চাকরিপ্রার্থীদের যে দক্ষতা আছে, নিয়োগদাতারা তা চান না। দক্ষতার ঘাটতির কারণে অনেকে অনেক দিন চাকরি পান না। চাকরি পেলেও অনেকে যোগ্যতার চেয়ে কম দক্ষতার কাজ করতে বাধ্য হন। এশিয়ার অনেক দেশে কৃষিসহ অনানুষ্ঠানিক খাতে বেশি মানুষ কাজ করেন। এসব কাজে চাকরির নিরাপত্তা কম। আনুষ্ঠানিক চুক্তিও থাকে না। পেশায় এগিয়ে যাওয়ার সুযোগও সীমিত। তাই শুধু বেকারত্বের হার দেখে শ্রমবাজারের আসল দুর্বলতা বোঝা যায় না বলে মনে করে আইএমএফ। আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা আরও বাড়বে। এই জনশক্তিকে কাজে লাগাতে পারলে অর্থনীতির জন্য বড় সুযোগ তৈরি হবে। এজন্য উৎপাদন ও সেবা খাতে ভালো মানের কাজ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। না হলে তরুণদের হতাশা বাড়বে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও বাধার মুখে পড়তে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের বিস্তার শ্রমবাজারের চ্যালেঞ্জ আরও বাড়াচ্ছে। আইএমএফ এশিয়ার ১৯টি অর্থনীতির ৪ কোটি অনলাইন চাকরির বিজ্ঞাপন বিশ্লেষণ করেছে। তাতে দেখা গেছে, এআইয়ের প্রভাব বেশি, এমন পেশায় কর্মীর চাহিদা প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে এআই-সংক্রান্ত দক্ষতা আছে, এমন কর্মীর চাহিদা বেড়েছে। আইএমএফ আরও বলছে, এখন যে দেশগুলোতে এআইয়ের প্রভাব কম, সেগুলোও ভবিষ্যতে সমস্যায় পড়তে পারে। কারণ উৎপাদন ও সেবা খাতে যেসব নতুন চাকরি তৈরি হবে, তার অনেকই এআইয়ের কারণে বদলে যেতে পারে। শ্রমবাজারের দুর্বলতার সঙ্গে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও কমিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির পূর্বাভাস, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৩ দশমিক ২ শতাংশ হারে বাড়তে পারে। অন্যদিকে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়ানো হয়েছে। প্রযুক্তি ও এআইনির্ভর অর্থনৈতিক উত্থানের সুবিধা পাওয়া দেশগুলোর প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা বেড়েছে। তবে নিম্ন আয়ের দেশগুলো উচ্চ জ্বালানি খরচ ও মূল্যস্ফীতির চাপে আছে।
সারা দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। এতে চলতি বছর মশাবাহিত রোগটিতে এ পর্যন্ত মোট প্রাণহানি ৩৪২ জনে দাঁড়াল। এ ছাড়া গত একদিনে ডেঙ্গু নিয়ে নতুন করে ১ হাজার ৮৭২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। শনিবার (১৭ অক্টোবর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু-বিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট ৩৪২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এরমধ্যে অক্টোবরের প্রথম ১৬ দিনে ৯৭ জন মারা গিয়েছে। এছাড়া সেপ্টেম্বরে সর্বোচ্চ ১৪৮ জন, আগস্টে ৪৩ জন, জুলাইয়ে ৩৬ জন, জুনে ১৩ জন, মে মাসে একজন এবং জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দু’জন করে ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১ হাজার ৮৭২ জন ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে চলতি বছর হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৩১২ জনে। গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ১ হাজার ৯৯১ জন। এ পর্যন্ত মোট ১ লাখ ৪ হাজার ৪৯১ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছেন ঢাকা বিভাগে ৮৬৫ জন। এছাড়া চট্টগ্রামে ২৬০ জন, খুলনায় ২৩৩ জন, বরিশালে ১৯০ জন, রাজশাহীতে ১৭৩ জন, ময়মনসিংহে ৬৭ জন এবং রংপুরে ৫৯ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।
নরসিংদীতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মোসাদ্দেক হাসান (২৬) নামে এক কলেজশিক্ষকের মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে নরসিংদী ১০০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। চলতি বছর জেলায় হাসপাতালে ভর্তি থেকে ডেঙ্গুর চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের মধ্যে এটিই প্রথম মৃত্যুর ঘটনা বলে জানিয়েছেন সিভিল সার্জন। শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকালে বিষয়টি নিশ্চিত করেন নরসিংদীর সিভিল সার্জন ডা. বুলবুল কবির। মোসাদ্দেক হাসান নরসিংদী মডেল কলেজের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ের প্রভাষক ছিলেন। তিনি পলাশ উপজেলার ডাঙ্গা ইউনিয়নের খিলপাড়া এলাকার মোশাররফ মিয়ার ছেলে। নিহতের স্বজনেরা জানান, প্রায় এক মাস আগে মোসাদ্দেক ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হওয়ার পর তিন দিন আগে আবারও জ্বরে আক্রান্ত হন তিনি। পরে তাকে নরসিংদী জেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শুক্রবার দুপুরে তার জ্বর বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি খিঁচুনি শুরু হয়। চিকিৎসকেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও তাকে বাঁচাতে পারেননি। শুক্রবার রাত ১০টায় খিলপাড়া ঈদগাহ মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তার মরদেহ দাফন করা হয়। সিভিল সার্জন ডা. বুলবুল কবির জানান, চলতি বছর নরসিংদীতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন ২ হাজার ৯৬ জন। তাদের মধ্যে শুক্রবার চিকিৎসাধীন অবস্থায় একজনের মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি থাকা অবস্থায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে জেলায় এটিই প্রথম মৃত্যুর ঘটনা। এদিকে, গত ১২ অক্টোবর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে তারতীলুল কোরআন একাডেমি নামের একটি বেসরকারি মাদ্রাসার পরিচালক হাফেজ শামসুল ইসলামের মৃত্যু হয়। তিনি ৯ অক্টোবর থেকে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে নিজ বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। তার ছেলে আজহারুল ইসলাম জাহিদ মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।