বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে জ্বালানি খাতে বাড়তি ব্যয়ের চাপ মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। এ বিষয়ে সংস্থাটির সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং দুই পক্ষের মধ্যে একটি কাঠামোগত চুক্তি নিয়ে কাজ এগোচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
সোমবার (১২ অক্টোবর) থাইল্যান্ডে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভার কার্যক্রম শুরুর সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী জানান, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। এই চাপ মোকাবিলায় আর্থিক সহায়তা ও সুরক্ষা প্রয়োজন। এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংক ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। ভবিষ্যতেও সংস্থাটির সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতা কেবল বিদ্যমান তহবিলের ব্যবহারে সীমাবদ্ধ নয়। বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং জ্বালানি খাতের সংকট থেকে সৃষ্ট অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায়ও পারস্পরিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয় নিয়ে সংস্থাটির সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে কাঠামোগত চুক্তির বিষয়ে আলোচনা ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়াগত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। দুই পক্ষের অংশীদারত্বের মাধ্যমে কীভাবে সহযোগিতার পরিধি ও কার্যকারিতা বাড়ানো যায়, তা নিয়েও কাজ করা হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত লক্ষ্য ও অগ্রাধিকারের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে নেওয়া উদ্যোগগুলোর সামঞ্জস্য বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে সমন্বয়ের মাধ্যমে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।
আলোচনার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তিনি জানান, বিষয়টি এখনো প্রক্রিয়াধীন এবং এ নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ সঠিক পথে এগোচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে বিশ্বব্যাংকের সম্ভাব্য সহায়তার পরিমাণ, অর্থায়নের ধরন কিংবা চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার সময়সীমা সম্পর্কে প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে জ্বালানি খাতে বাড়তি ব্যয়ের চাপ মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। এ বিষয়ে সংস্থাটির সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং দুই পক্ষের মধ্যে একটি কাঠামোগত চুক্তি নিয়ে কাজ এগোচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সোমবার (১২ অক্টোবর) থাইল্যান্ডে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভার কার্যক্রম শুরুর সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন। অর্থমন্ত্রী জানান, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। এই চাপ মোকাবিলায় আর্থিক সহায়তা ও সুরক্ষা প্রয়োজন। এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংক ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। ভবিষ্যতেও সংস্থাটির সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী। আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতা কেবল বিদ্যমান তহবিলের ব্যবহারে সীমাবদ্ধ নয়। বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং জ্বালানি খাতের সংকট থেকে সৃষ্ট অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায়ও পারস্পরিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয় নিয়ে সংস্থাটির সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তিনি আরও জানান, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে কাঠামোগত চুক্তির বিষয়ে আলোচনা ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়াগত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। দুই পক্ষের অংশীদারত্বের মাধ্যমে কীভাবে সহযোগিতার পরিধি ও কার্যকারিতা বাড়ানো যায়, তা নিয়েও কাজ করা হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত লক্ষ্য ও অগ্রাধিকারের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে নেওয়া উদ্যোগগুলোর সামঞ্জস্য বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে সমন্বয়ের মাধ্যমে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে। আলোচনার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তিনি জানান, বিষয়টি এখনো প্রক্রিয়াধীন এবং এ নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ সঠিক পথে এগোচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে বিশ্বব্যাংকের সম্ভাব্য সহায়তার পরিমাণ, অর্থায়নের ধরন কিংবা চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার সময়সীমা সম্পর্কে প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।
ব্যাংক খাতকে ব্যাপক ‘আর্থিক লুটপাট ও কাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি’ থেকে পুনরুদ্ধারে পাঁচ থেকে আট বছর পর্যন্ত জাতীয় বাজেট থেকে প্রতিবছর ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। শনিবার (১০ অক্টোবর) রাজধানীর ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে (ইউআইইউ) ওয়ান ব্যাংক পিএলসি আয়োজিত বাংলা কিউআর লেনদেনের প্রচার অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। আর্থিক খাতের অর্থপাচার ও অনিয়মের ব্যাপকতা তুলে ধরে গভর্নর বলেন, তিনি যখন গভর্নরের দায়িত্ব নেন, তখন ব্যাংকিং ব্যবস্থার মোট তহবিলের এক-তৃতীয়াংশই লুট হয়ে গিয়েছিল। আর্থিক খাত থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগব্যয় তুলে ধরে গভর্নর বলেন, এই পরিমাণ অর্থ দিয়ে সরকার দুই কোটি পরিবারকে সহায়তা দিতে পারত অথবা পদ্মা সেতুর মতো দুটি বড় অবকাঠামো প্রকল্প নির্মাণ করতে পারত। ব্যাংকিং ব্যবস্থার তারল্য সংকটের জন্য দায়ীদের কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, এ অপরাধের ভয়াবহতা বোঝাতে প্রচলিত শব্দ যথেষ্ট নয়। মোস্তাকুর রহমান বলেন, লুটেরা গোষ্ঠী জনগণের অর্থ লুট করেছে। এটি সাধারণ চুরি নয়; এটি ছিল লুটপাট। গভর্নর আশ্বস্ত করে বলেন, ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম ও অর্থপাচারের সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং লুট হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারে ইতোমধ্যে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। সূত্র: ইউএনবি
একটি ফ্ল্যাটের নির্মাণ বা বিক্রি হলো না—ক্ষতি কি শুধু একজন আবাসন ব্যবসায়ীর? মোটেও নয়। একটি ফ্ল্যাটের নির্মাণ থেমে যাওয়া মানে থেমে যেতে পারে রডের অর্ডার, সিমেন্টের উৎপাদন, টাইলসের বিক্রি, কাচের সরবরাহ, বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের ব্যবসা। কাজ হারাতে পারেন নির্মাণশ্রমিক। কমতে পারে ট্রাকের ভাড়া। কমতে পারে ব্যাংকের ঋণ বিতরণ। অর্থাৎ আবাসন খাতের দেয়ালে যখন ফাটল ধরে, তার কম্পন পৌঁছে যায় অর্থনীতির বহু প্রান্তে। তাহলে প্রশ্ন—আবাসন খাত বাঁচলে আসলে কত শিল্প বাঁচবে? বাংলাদেশের আবাসন বাজারে এখন এক ধরনের নিঃশব্দ স্থবিরতা বিরাজ করছে। চাহিদা আছে, কিন্তু ক্রয়ক্ষমতা চাপে। প্রকল্প আছে, কিন্তু বিনিয়োগে সতর্কতা। ফ্ল্যাট আছে, কিন্তু অনেক সম্ভাব্য ক্রেতা অপেক্ষায়। উচ্চ সুদের হার, নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, কর ও নিবন্ধন ব্যয় এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে আবাসন ব্যবসার সমীকরণ কঠিন হয়ে উঠেছে। খাত সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার আবাসিক ফ্ল্যাট বিক্রির গতি আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আর এখানেই তৈরি হচ্ছে একটি বড় অর্থনৈতিক প্রশ্ন—মানুষ কি ফ্ল্যাট কিনতে চাইছে না, নাকি কিনতে পারছে না? একটি ভবনকে বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়—ইট, বালি, সিমেন্ট আর রডের সমষ্টি। কিন্তু অর্থনীতির চোখে একটি ভবন আসলে একটি বিশাল সাপ্লাই চেইন। রড আসে স্টিল কারখানা থেকে। সিমেন্ট আসে কারখানা থেকে। বালি-পাথর আসে সরবরাহকারীর কাছ থেকে। এরপর টাইলস, স্যানিটারি পণ্য, কাচ, অ্যালুমিনিয়াম, রং, বৈদ্যুতিক তার, সুইচ, লিফট—একটির পর একটি শিল্প যুক্ত হয়। আর এসব পণ্য এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পৌঁছে দেয় পরিবহন খাত। অর্থাৎ একটি আবাসিক প্রকল্প মানেই একসঙ্গে বহু খাতে অর্থের প্রবাহ। আবাসন খাতের মন্দার প্রথম বড় অভিঘাত পড়ে নির্মাণসামগ্রীর বাজারে। নতুন ভবন কম হলে রডের চাহিদা কমে। কমে সিমেন্টের চাহিদা। কমে ইট, বালি, পাথর ও অন্যান্য উপকরণের বিক্রি। আর যখন চাহিদা কমে যায়, তখন উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও কারখানা অনেক সময় পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারে না। এর ফলে শুধু বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়—ছোট সরবরাহকারী থেকে পরিবহন ব্যবসায়ী পর্যন্ত সবাই চাপের মুখে পড়ে। অর্থাৎ আবাসনের মন্দা শুরু হয় একটি ভবন থেকে, কিন্তু তার অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে একটি শিল্পশৃঙ্খলে। এবার আসা যাক সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গায়—মানুষের জীবনে। একটি ভবন নির্মাণে শুধু প্রকৌশলী বা স্থপতিই কাজ করেন না। সেখানে কাজ করেন রাজমিস্ত্রি, রডমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি, ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার, টাইলস মিস্ত্রি, রংমিস্ত্রি এবং অসংখ্য শ্রমিক। নির্মাণকাজ কমলে তাদের আয়ও কমে যায়। আর আয় কমলে কমে বাজারে মানুষের খরচ। এখানেই আবাসন খাতের সংকট একটি বড় মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্টে রূপ নেয়। একজন শ্রমিক কম আয় করলে শুধু তার পরিবারই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না—যে দোকান থেকে তিনি বাজার করেন, যে পরিবহনে যাতায়াত করেন, যে সেবা নেন—সেখানেও চাহিদা কমে। আবাসন খাতের সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু হলো—ব্যাংক। মধ্যবিত্তের বড় একটি অংশ গৃহঋণের ওপর নির্ভর করে ফ্ল্যাট কেনেন। কিন্তু ঋণের সুদ যত বাড়ে, মাসিক কিস্তিও তত ভারি হয়। ফলে সম্ভাব্য ক্রেতা হিসাব করেন— আজ ফ্ল্যাট কিনব, নাকি অপেক্ষা করব? আর এই অপেক্ষাই বাজারের জন্য বড় সংকেত। কারণ একজন ক্রেতা ঋণ নিলে সেই অর্থ যায় ডেভেলপারের কাছে। ডেভেলপার সেই অর্থ ব্যয় করেন নির্মাণে। নির্মাণ কোম্পানি অর্থ দেয় শ্রমিক ও সরবরাহকারীদের। আর সরবরাহকারীরা আবার সেই অর্থ ব্যয় করেন নিজেদের ব্যবসায়। অর্থাৎ গৃহঋণের অর্থ অর্থনীতির ভেতরে ঘুরে বহুবার কর্মকাণ্ড সৃষ্টি করে। গল্প এখানেই শেষ নয়। একটি পরিবার যখন নতুন ফ্ল্যাটে ওঠে, তখন শুরু হয় আরেক অর্থনৈতিক চক্র। প্রয়োজন হয় খাট, সোফা, ডাইনিং টেবিল, পর্দা, ফ্রিজ, টেলিভিশন, এসি, লাইটিং, ইন্টারনেট। অর্থাৎ আবাসন খাত সচল হলে শুধু নির্মাণ শিল্প নয়—ফার্নিচার, ইলেকট্রনিকস, হোম ডেকর, ইন্টারনেটসহ ভোক্তাপণ্য খাতও লাভবান হয়। তাই আবাসন খাতকে অনেকটা অর্থনীতির স্পন্দনশীল হৃৎপিণ্ডের মতো দেখা যায়—এখানে অর্থের প্রবাহ বাড়লে তার ঢেউ অন্য বাজারেও পৌঁছায়। তাহলে প্রশ্ন—সমস্যার মূল কোথায়? একক কোনো জায়গায় নয়। একদিকে নির্মাণ ব্যয় বেড়েছে। অন্যদিকে মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় চাপ। গৃহঋণের খরচ বেশি। ডলারের অস্থিরতা আমদানিনির্ভর কাঁচামালের খরচ বাড়ায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নীতিগত ও ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা। ফলে বাজারে তৈরি হয়েছে বিপজ্জনক কয়েকটি বিষয়—ক্রেতা অপেক্ষা করছেন। ডেভেলপার অপেক্ষা করছেন। বিনিয়োগকারী অপেক্ষা করছেন। আর অর্থনীতিতে এই অপেক্ষা যত দীর্ঘ হয়, অর্থের প্রবাহ তত ধীর হয়ে যায়। তাহলে সবচেয়ে বড় সংকট কী? আবাসন খাতকে বাঁচাতে শুধু ফ্ল্যাটের দাম কমানোর কথা বললেই হবে না। প্রয়োজন একটি সমন্বিত নীতি। প্রথমত—সাশ্রয়ী গৃহঋণ। দ্বিতীয়ত—মধ্যবিত্তের জন্য দীর্ঘমেয়াদি হাউজিং ফাইন্যান্স। তৃতীয়ত—রেজিস্ট্রেশন ও করব্যবস্থায় যৌক্তিকতা। চতুর্থত—নির্মাণসামগ্রীর সরবরাহ ও খরচ কমানোর উদ্যোগ। পঞ্চমত—জমি ও প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়া সহজ করা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—নীতির ধারাবাহিকতা। কারণ আবাসনে আজ বিনিয়োগ করে আগামীকাল লাভ পাওয়া যায় না। এটি দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসা। তাই বিনিয়োগকারীর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শুধু করছাড় নয়—ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চয়তা। আবাসন খাতকে চাঙা করতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার দাবিও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। বিশ্লেষকদের যুক্তি—অর্থ যদি দেশের বাইরে চলে যাওয়ার বদলে দেশে বিনিয়োগ হয়, তাহলে আবাসনসহ সংশ্লিষ্ট শিল্পে অর্থের প্রবাহ বাড়তে পারে। একটি অর্থনীতির শক্তি শুধু তার জিডিপির সংখ্যায় মাপা যায় না। মাপা যায়—কত মানুষ কাজ করছে, কত কারখানা চলছে, কত উদ্যোক্তা বিনিয়োগ করছেন এবং কত পরিবার ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী। আবাসন খাত তাই শুধু ইট-পাথরের গল্প নয়। এটি রড-সিমেন্টের গল্প। এটি শ্রমিকের মজুরির গল্প। এটি ব্যাংকের ঋণের গল্প। এটি ফার্নিচার, সিরামিক, কাচ, ইলেকট্রিক্যাল ও পরিবহন শিল্পের গল্প। সর্বোপরি—এটি অর্থনীতিতে আস্থার গল্প। আবাসন খাতের চাকা থেমে গেলে তার অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে বহু শিল্পে। আর সেই চাকা আবার ঘুরতে শুরু করলে তার সঙ্গে ঘুরতে পারে অর্থনীতির আরো বহু চাকা। কারণ একটি ভবনের ভিত শক্ত হলে শুধু ভবন দাঁড়ায় না—তার সঙ্গে দাঁড়ায় একটি অর্থনীতির বহু স্তম্ভ।