বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে যোগান–চাহিদার ভারসাম্য বজায় রাখতে নিয়মিত হস্তক্ষেপ অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর অংশ হিসেবে মাল্টিপল প্রাইস অকশন (এমপিএ) পদ্ধতিতে ১৩টি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ২০২ মিলিয়ন ডলার কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এ ক্রয়ে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ১২২ টাকা ২৭ পয়সা থেকে ১২২ টাকা ২৯ পয়সা। এ নিয়ে চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে মোট ডলার ক্রয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫১৪ মিলিয়ন (প্রায় আড়াই বিলিয়ন) ডলার।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়লেও চাহিদা কমে যাওয়ায় দামের ওপর নিম্নচাপ তৈরি হয়েছে। দাম অতিমাত্রায় নিচে নেমে গেলে রপ্তানিকারক ও প্রবাসী আয়ের প্রেরণকারীরা নিরুৎসাহিত হতে পারেন। তাই একটি নির্দিষ্ট সীমার নিচে দাম নেমে না যাওয়ার লক্ষ্যে বাজারে হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে।
আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী গত মে মাসে চালু হওয়া বাজারভিত্তিক এক্সচেঞ্জ রেট এখন ব্যাংকগুলোকে সরবরাহ–চাহিদার ভিত্তিতে দাম নির্ধারণের সুযোগ দিচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এলসি খোলার প্রবণতা বৃদ্ধি, রমজানকে সামনে রেখে পণ্য আমদানি এবং আমদানিতে বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল হওয়ায় ডলারের চাহিদা আবারও বেড়েছে।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, রমজানের আগে ডলারের চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে, কিন্তু সেই সময়েই বাংলাদেশ ব্যাংকের ডলার কেনা বাজারে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। বছরের শেষ দিকে অনেক ব্যাংক অতিরিক্ত মুনাফার জন্য ডলারের দাম বাড়ায়, যা আমদানিকারকদের জন্য নতুন আর্থিক চাপ তৈরি করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র জানিয়েছেন ডলার কেনা হচ্ছে শুধুমাত্র অতিরিক্ত ডলারধারী ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে নিলামের মাধ্যমে। এটা কোনো কৃত্রিম হস্তক্ষেপ নয়। সাম্প্রতিক সময়ে রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, যার ফলে বাজারে সরবরাহও বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী
নভেম্বর মাসে এলসি খোলা হয়েছে ৫৫৬ কোটি ৬৬ লাখ ডলার
এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ৪৮৬ কোটি ৯৯ লাখ ডলার
জুলাই–নভেম্বর (প্রথম পাঁচ মাস)
এলসি খোলা হয়েছে ২,৯৪১ কোটি ডলার গত বছরের তুলনায় ৪.৫৯% বেশি
এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ২,৭১৯ কোটি ৪৫ লাখ ডলার গত বছরের তুলনায় ২.৬৬% কম
প্রবাসী আয়
চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে দেশে এসেছে ১৩.০৩ বিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয়, টাকায় যার পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
রিকশা ও রিকশাভ্যান চালক, দিনমজুরদের সকাল, দুপুর কিংবা বিকালের ক্ষুধা মেটাতে চায়ের সঙ্গে বনরুটি বা স্লাইস কেকের মতো বেকারি পণ্যই ভরসা, যার দাম বাড়ার ঘোষণা আসছে এবার। মোহাম্মদপুরের শিয়া মসজিদের পূর্ব পাশের কোণায় ফুটপাতের চা দোকানের মালিক ষাটোর্ধ্ব রহমতউল্লাহ বলেন, চা দিয়া একটা রুটি চুবাইয়া খায় মানুষজন। সেটাও দাম বাড়বো। সাপ্লাইয়ার বলে গেল শনিবার থেকে বাড়তি দেওয়া লাগবো। তিনি বলেন, “প্রতিটা মিনিমাম পাঁচ টাকার নিচে বাড়াইবো না। বাড়লে ঝামেলা দেখা দিবে। খাওয়ার পর বেশি দাম শুনে কথা কাটাকাটি হইবো। আমাদের কাস্টমার কমে যাইবো।” চকবাজার এলাকা থেকে বেকারি পণ্য কিনে রায়েরবাজারের পাড়া-মহল্লায় ভ্যানে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করেন রিপন শেখ। বেকারি পণ্যের দাম বাড়বে শুনে তিনিও চিন্তিত। রায়েরবাজারের বিপরীত পাশে বাগানবাড়ি গলিতে বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার দিকে কথা হয় তার সঙ্গে। রিপন বলেন, “আমাদের সীমিত লাভ। দোকানের চাইতে আমরা একটু কম দামে বিক্রি করি। এখন যে দামে বিক্রি করি, মোটামুটি কিছু থাকে। “বেকারিতে দাম বাড়ালে আমাদেরও দামটা বাড়াতে হবে। তখন জনগণ আমাদের কাছ থেকে খাইতে চাইবে না। যার কারণে আমরা অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হব।” ভ্রাম্যমাণ এ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলেন, ২০০ টাকা কেজি বা তার কাছাকাছি দরে ড্রাই কেক, বিস্কুটসহ অন্য বেকারি পণ্য বিক্রি করেন তিনি। “কেজিতে ২০ টাকাও যদি বাড়ায়, কমসে কম আড়াইশ’ টাকা কেজি বিক্রি করতে হবে আমাদের। আমাদের তো ২০/৩০ টাকা লাভ রাখতে হবে। এটাও যদি না থাকে, সারাদিন ঘাম ঝরাইয়া, এই গাড়ি (ভ্যান) নিয়া হাইটা আমাদের কিছুই থাকবে না।” বেকারি পণ্য তৈরির কাঁচামালের দাম যেন নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়, সরকারের প্রতি সেই আহ্বান রেখে রিপন বলেন, “এই যে আটা, চিনি-এগুলোর দাম বাড়ায়, বেকারির তো কোনো দোষ নাই। সরকার যদি না চাইতো এগুলোর দাম বাড়তো না।” বান, পাউরুটি, বিস্কুট ও কনফেকশনারি পণ্যের প্রধান কাঁচামালের মধ্যে রয়েছে ময়দা, ভোজ্যতেল, ডালডা ও চিনি। এসব কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় বেকারি পণ্যের দাম সমন্বয়ের কথা বলছেন এ খাতের ছোট ব্যবসায়ীরা। রাজধানীর বছিলা এলাকার একটি বেকারির স্বত্বাধিকারী মনির খান বলেন, “খরচ অনেক বাড়ছে। সবকিছু আগের চেয়ে ডবল হয়ে গেছে। ময়দার বস্তা কিনতে হয় ৩২০০ টাকা দরে। দুই মাস আগে কিনেছি ২৪০০ টাকায়।” দাম বাড়ার পাশাপাশি বিক্রি কমার কথা বলেছেন তিনি। “মানুষ কি করবে। সব কিছুর দাম বাড়ার কারণে বেকারি পণ্যের বেচাকেনাও কমে গেছে। ভাত খাওয়ার পরেই মানুষ অন্য কিছু খাওয়ার চিন্তা করে।” মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারে ৫০ কেজির এক বস্তা ময়দা বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ১০০ টাকায়। যা এক বছর আগে ছিল ২ হাজার ৩০০ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) চিনির দাম ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা দাম বেড়ে হয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা। বাজারে প্রতি ১৮৫ কেজির সয়াবিন তেলের ড্রামের দাম এক বছরের ব্যবধানে ৫ হাজার টাকা বেড়ে ৩৪ হাজার ৫০০ থেকে ৩৫ হাজার টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে। ১৬ কেজির এক কার্টন ডালডার দাম ৮০০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে মানভেদে ৩ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৪ হাজার টাকা। এছাড়া ইস্টসহ বেকারি পণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত অন্য উপকরণের দামও বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট। একদিকে কাঁচামালের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে উৎপাদনে প্রয়োজনীয় জ্বালানিরও সংকট তৈরি হয়েছে। পাইপলাইনের গ্যাসের বিকল্প হিসেবে সিলিন্ডার ব্যবহার করতে হচ্ছে অনেক বেকারিকে। তাতে বাড়ছে উৎপাদন খরচ। এ পরিস্থিতিতে পণ্যের দাম সমন্বয়ের ঘোষণা দিয়েছে বেকারি পণ্যের ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ ব্রেড, বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতি। শনিবার থেকে নতুন দামে বনরুটি ও বিস্কুট বিক্রি শুরু হবে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি। তবে সব পণ্যে একইভাবে দাম বাড়ানো হচ্ছে না। কম দামের কিছু পণ্যের ওজন কমানো হবে, আর তুলনামূলক বেশি দামের পণ্যের দাম বাড়ানো হবে। ২০২২ সালের জুনে রুটি, বিস্কুট, কেকসহ নিত্যদিনের বেকারি পণ্যের দাম ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছিল। সেটিকে বেকারি পণ্যের দামের ‘ইতিহাসে সর্বোচ্চ’ বৃদ্ধি বলা হয়েছিল। এবার কত শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়ানো হচ্ছে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্রেড, বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন বলেন, বড় কোনো মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, “আমরা কোথাও বলিনি ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াবো। ব্যবসায়িক বাস্তবতায় সব মালিকরা একত্রিত হয়ে একটু সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।” রাজধানী ঢাকার নারিন্দা এলাকায় কয়েক পুরুষ ধরে বেকারি পণ্যের ব্যবসায় যুক্ত জালাল উদ্দিনের পরিবার। তিনি বলেন, ৪০ বা ৫০ টাকা দামের পণ্যের দাম বাড়বে। এগুলোতে ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বাড়বে। ১২ টাকার কেক হবে ১৫ টাকা। “আমরা শুধু একটা আইটেমে (বনরুটি) ওজন কমাচ্ছি। এগুলো খেটে খাওয়া মানুষ খায়—তাই দাম ১০ টাকাই রাখছি। “দাম ঠিক থাকলেও আগে যেখানে ৪০০ গ্রাম ওজনের যে পাউরুটি মিলত, তা কমে ৩২০ থেকে ৩৫০ গ্রামে নেমে আসবে।” কাঁচামালের দাম বাড়ার কারণে দাম সমন্বয় না করে উপায় নেই দাবি করে জালাল উদ্দিন বলেন, “গত ছয় মাসের ভেতরে ময়দা ২৫শ’ টাকা থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা হয়ে গেছে। আজকেও তিনশ’ টাকা বস্তায় বেড়েছে। চিনির দাম বেড়েছে। তেলের দাম সরকার ঘোষণা দিয়েই বাড়িয়েছে।” সমিতির তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ক্ষুদ্র বেকারি রয়েছে প্রায় ৭ হাজার। এর মধ্যে রাজধানীতে সাত শতাধিক। এসব বেকারির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২০ লাখ মানুষ জড়িত বলে দাবি সংগঠনটির। সংগঠনের দীর্ঘদিনের এই সভাপতি বলেন, কাঁচামালের দাম আরেক দফা বাড়লে আর পণ্যের দাম বাড়ানো সম্ভব হবে না। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের কথাও তুলে ধরেন তিনি। “পাইপলাইনে গ্যাস না থাকায় এলপিজি ব্যবহার করতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে ঠিকমতো উৎপাদন করা যাচ্ছে না। শ্রমিকদের বসে থাকতে হচ্ছে। ফলে খরচও বাড়ছে।” বেকারি মালিক সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, বেকারি ভেদে ১০ টাকা দামের গোল বনরুটির ওজন এখন ৪০ গ্রাম, ৫ গ্রাম কমানো হবে। এখন ৪০০ গ্রামের ওজনের পাউরুটির দাম ৫০ থেকে ৬০ টাকা। দাম ঠিক থাকলে ৪০০ গ্রাম ওজন কমে ৩২০ থেকে ৩৫০ গ্রামে নেমে আসবে। যদি দাম বাড়ানো হয় তাহলে ৫ থেকে ১০ টাকা বাড়বে। শিয়া মসজিদ এলাকার চা দোকানের রহমতউল্লাহর সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল, সেখানে ছিলেন রিকশাচালক আমিন। তিনি বলছিলেন, কয়েক ট্রিপ রিকশা চালানোর পর কিছু খেতে হয়। চায়ের সঙ্গে বনরুটি বা দুই/এক পিস কেক খেয়ে থাকেন। একবার খেতে যে খরচ হয়, তা তুলে ধরে আমিন বলেন, “এখনই আসে একবারে ৩০/৪০ টাকা। দাম বাড়ালেই সেটা পড়বে ৫০ টাকা। সবকিছুর দাম বাড়াইলে আমরা যামু কৈ? প্যাডে কিছু না দিলে রিকশাই বা চালামু কেমনে?” মহাখালী এলাকার একটি চায়ের দোকানের স্বত্বাধিকারী মো. মানিক বেকারি পণ্যের দাম বাড়ানোকে অযৌক্তিক বলে মনে করছেন। বনরুটি ও কেক তৈরির জন্য দরকারি উপকরণের দামের হিসাব দিয়ে তিনি দাবি করেন, ১০ টাকার একটি গোল বনরুটির ওজন ৫০ গ্রাম। বানাতে খরচ পড়ছে আড়াই টাকা, বেকারি ব্যবসায়ীরা বিক্রি করছেন ৫ টাকা। তাদের ৫০ শতাংশ লাভ থাকছে। মানিক বলেন, “তাহলে দাম বাড়াতে হবে কেন?” তবে বেকারি পণ্যের দাম বাড়ানোকে পুরোপুরি অস্বাভাবিক মনে করছেন না কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান। এতে যে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়বে সে কথাও বলেছেন তিনি। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সাবেক এই মহাপরিচালকের ভাষ্য, বেকারি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত প্রায় প্রতিটি উপকরণের দাম বেড়েছে। ফলে ব্যবসা চালিয়ে রাখতে হলে হয় দাম বাড়াতে হবে, নয়তো উৎপাদন বন্ধ করতে হবে। “এখন দেখার বিষয় তারা অযৌক্তিকভাবে বাড়াচ্ছে কিনা।” সফিকুজ্জামানের অভিযোগ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লেও তা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেই। দাম নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে যে যার মতো দাম বাড়াবে, আর তাতে জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। আগস্টে তা কমে হয়েছে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ, যা ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। তবে বাজারের বাস্তবতার সঙ্গে এই পরিসংখ্যানের মিল নেই বলে মনে করেন সাবেক এই আমলা। তিনি বলেন, “পণ্যের দাম বাড়ার কারণে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পণ্যের দাম বাড়াতে হচ্ছে। বাজারে সবকিছুর দাম বাড়তি। চুরি বন্ধ না করে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে সবার ওপরে বিলের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে। কিন্তু বিবিএস তথ্য দিয়েছে মূল্যস্ফীতি কমেছে। বাজারে তার কোনো প্রতিফলন নেই।” সাবেক সচিব সফিকুজ্জামান বলেন, “আমি যখন সরকারে ছিলাম, আমি নিজেও বিবিএসের ডেটায় আস্থা রাখতাম না।”
বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরো জোরদার করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে ছয়টি প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিসিসিসিআই)। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে বন্ডেড ওয়্যারহাউসের অপব্যবহার বন্ধ, চীনে বাংলাদেশি পণ্যের স্থায়ী প্রদর্শনী কেন্দ্র স্থাপন এবং বড় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়ানো। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বিসিসিসিআই সভাপতি মোহা. খোরশেদ আলমের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল সচিবালয়ে বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এসব প্রস্তাব তুলে ধরে। বৈঠকে বন্ডেড ওয়্যারহাউসের অপব্যবহারের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। বিসিসিসিআই বলেছে, বন্ডেড সুবিধায় আমদানি করা পণ্য অনুমোদন ছাড়া স্থানীয় বাজারে বিক্রি হওয়ায় নিয়ম মেনে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানগুলো অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছে। একই সঙ্গে এ ধরনের অনিয়ম চীনের সম্ভাব্য বিদেশি বিনিয়োগকারীদেরও নিরুৎসাহিত করছে। সংগঠনটি বন্ডেড পণ্যের ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনায় আরো কঠোর নজরদারি এবং আইন প্রয়োগের দাবি জানিয়েছে। তাদের মতে, এতে বৈধ ব্যবসায়ীদের জন্য সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হবে এবং বিদেশি বিনিয়োগের আস্থাও বাড়বে। বিসিসিসিআইর অন্য প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে চীনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য অন্তত ২০টি স্থায়ী প্রদর্শনী কেন্দ্র স্থাপন। পাশাপাশি চীনের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ এবং দেশটির বড় বড় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আরো জোরদারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশে একটি চীনা ব্যাংকের শাখা স্থাপনে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা এবং চীনের সঙ্গে কারিগরি ও কারিগরি শিক্ষাভিত্তিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি। বৈঠকে কুনমিংয়ে অনুষ্ঠিত ১০ম চায়না-সাউথ এশিয়া এক্সপোতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন প্রতিনিধিদলের সদস্যরা। তারা বলেন, এ ধরনের আন্তর্জাতিক মেলায় বাংলাদেশি পণ্যের প্রচার এবং চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণের আরো সুযোগ রয়েছে। বৈঠকে বিসিসিসিআইর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হান জিংচাও, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এ জেড এম আজিজুর রহমান, মহাসচিব জামিলুর রহমান এবং নির্বাহী পরিচালক মো. আবু তাহের উপস্থিত ছিলেন।
আগস্টে বড় ধরনের মূল্য বৃদ্ধির পর সেপ্টেম্বর মাসের জন্যও আরেক দফায় বেড়েছে জেট ফুয়েলের দাম। সেপ্টেম্বরে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম ১৫৯ টাকা ৫২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৬৫ টাকা ৬৫ পয়সা করা হয়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের জন্য প্রতি লিটার ফুয়েলের দাম ১ দশমিক শূন্য ৩৫৮ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১ দশমিক শূন্য ৭৭০ করা হয়েছে। টানা তিন দফায় উড়োজাহাজের জ্বালানি জেট ফুয়েলের দাম কমার পর গত আগস্টে এসে এই জ্বালানির দাম লিটারে ২৮ টাকা ৫৩ পয়সা হারে বাড়িয়েছিল সরকার। সেপ্টেম্বরে এসে দাম লিটার প্রতি ৬ টাকা ১৩ পয়সা বাড়ল। গত মঙ্গলবার (৯ সেপ্টেম্বর) রাতে জেট ফুয়েলের নতুন দর ঘোষণা করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বিইআরসি। কমিশনের আদেশে বলা হয়, গত ৫ আগস্ট থেকে ৪ সেপ্টেম্বরের মধ্যে জেট এ-১-এর প্লাটস রেটের গড়, একই সময়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) এলসি সেটেলমেন্টে ডলারের বিনিময় হার বিবেচনায় শুনানি শেষে নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। সবশেষ জুলাই মাসে জুলাই মাসে অভ্যন্তরীণ রুটে প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম ১৯ টাকা ২২ পয়সা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ রুটে প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম ১৩০ টাকা ৯৯ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তার আগে জুনের জন্য দাম ১৬৫ টাকা ৮৮ পয়সা থেকে কমিয়ে ১৫০ টাকা ২১ পয়সা করা হয়। ২৩ মে মধ্যবর্তী সমন্বয়ে দাম ২০৫ টাকা ৪৫ পয়সা থেকে কমিয়ে ১৬৫ টাকা ৮৮ পয়সা করা হয়েছিল। এর আগে ৭ মে প্রতি লিটার দাম ২২৭ টাকা ৮ পয়সা থেকে কমিয়ে ২০৫ টাকা ৪৫ পয়সা নির্ধারণ করা হয়।