বিশ্বজুড়ে নিরাপত্তা উদ্বেগ, যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালে সামরিক খাতে ব্যয় নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপ্রি)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত বছর বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় প্রায় ২ লাখ ৯০ হাজার কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে—যা টানা ১১তম বছরের মতো বৃদ্ধি নির্দেশ করে। গবেষকদের মতে, বিশ্বব্যাপী নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি এবং সামরিক শক্তি বাড়ানোর প্রতিযোগিতাই এই ব্যয়ের মূল চালিকা শক্তি। মোট ব্যয়ের বড় অংশই এসেছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া থেকে—এই তিন দেশের সম্মিলিত ব্যয় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি ডলার, যা বৈশ্বিক ব্যয়ের অর্ধেকেরও বেশি। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে মোট সামরিক ব্যয় বেড়েছে ২ দশমিক ৯ শতাংশ। তবে ব্যতিক্রম হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র কিছুটা ব্যয় কমিয়েছে। সিপ্রির গবেষক লরেনৎসো স্কারাৎসাতো জানান, যুক্তরাষ্ট্রের এই কমতি ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলোর বাড়তি ব্যয় দিয়ে পুষিয়ে গেছে। তিনি বলেন, “বিশ্ব ক্রমেই নিজেকে অনিরাপদ ভাবছে, আর সেই কারণেই দেশগুলো প্রতিরক্ষা খাতে বেশি বিনিয়োগ করছে।” একই সঙ্গে, বৈশ্বিক জিডিপির তুলনায় সামরিক ব্যয়ের হার ২০০৯ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক খাতে ব্যয় করেছে ৯৫ হাজার ৪০০ কোটি ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ কম। এর পেছনে অন্যতম কারণ ইউক্রেনকে নতুন সামরিক সহায়তা অনুমোদন না হওয়া। তবে এই প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে, কারণ ২০২৬ সালের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ১ লাখ কোটি ডলারের বেশি প্রতিরক্ষা বাজেট অনুমোদন করেছে। ইউরোপে সামরিক ব্যয় সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে এই অঞ্চলে ব্যয় ১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৮৬ হাজার ৪০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইউরোপকে নিজস্ব প্রতিরক্ষা জোরদারের চাপও এই বৃদ্ধির একটি কারণ। জার্মানি ২০২৫ সালে সামরিক ব্যয়ে চতুর্থ অবস্থানে উঠে এসেছে, তাদের ব্যয় ২৪ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১১ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। স্পেনের ব্যয়ও এক বছরে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৪ হাজার ২০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। রাশিয়ার সামরিক ব্যয় বেড়ে হয়েছে ১৯ হাজার কোটি ডলার, যা তাদের জিডিপির ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। অন্যদিকে ইউক্রেন ব্যয় ২০ শতাংশ বাড়িয়ে ৮ হাজার ৪১০ কোটি ডলারে উন্নীত করেছে—যা দেশটির জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ। মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক ব্যয় তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও সামগ্রিকভাবে সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে ইসরায়েল ও ইরান উভয়ই ব্যয় কমিয়েছে। ইরানে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ব্যয় কমে ৭৪০ কোটি ডলারে নেমেছে, আর গাজায় যুদ্ধবিরতির প্রভাবে ইসরায়েলের ব্যয় কমে হয়েছে ৪ হাজার ৮৩০ কোটি ডলার। এশিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলেও সামরিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালে এই অঞ্চলে ব্যয় ৮ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৬৮ হাজার ১০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে—যা ২০০৯ সালের পর সর্বোচ্চ। চীন এখানে প্রধান চালিকাশক্তি, যার সামরিক ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৬০০ কোটি ডলার। চীনের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির প্রতিক্রিয়ায় জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানও নিজেদের প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়িয়েছে। জাপানের ব্যয় ৯ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ৬ হাজার ২২০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যা ১৯৫৮ সালের পর সর্বোচ্চ। বিশ্বব্যাপী এই প্রবণতা স্পষ্ট করে দিচ্ছে—নিরাপত্তা উদ্বেগ যত বাড়ছে, ততই সামরিক ব্যয় বাড়ছে দেশগুলোর মধ্যে।
বাংলাদেশের পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় যুক্ত হতে যাচ্ছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে। আজ থেকে কেন্দ্রটির চুল্লিতে পারমাণবিক জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) প্রবেশ করানোর প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে, যা দেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী ৩৩তম দেশে পরিণত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের অগ্রগতি নয়, বরং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার বড় অর্জন। কী ঘটছে রূপপুরে পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে ইউরেনিয়াম জ্বালানি স্থাপন করা হচ্ছে। এই জ্বালানি চুল্লির ভেতরে তাপ উৎপন্ন করবে, যা থেকে বাষ্প তৈরি হয়ে টারবাইন ঘুরবে এবং সেখান থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। প্রথম ধাপে এটি পরীক্ষামূলকভাবে পরিচালিত হবে। এরপর ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়িয়ে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ শুরু করা হবে। বিদ্যুৎ সরবরাহের সম্ভাব্য সময়সূচি সরকারি সূত্র অনুযায়ী, আগামী আগস্টের মধ্যেই পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে। পুরোপুরি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে আরও কয়েক মাস সময় লাগবে। প্রকল্পের গুরুত্ব রূপপুর প্রকল্পটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প। এখানে দুটি ইউনিটে মোট ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। এটি দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১০–১২ শতাংশ পূরণ করতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়লা ও গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় এটি দীর্ঘমেয়াদে বেশি সাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব, কারণ এতে কার্বন নিঃসরণ অনেক কম। নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি পারমাণবিক জ্বালানি অত্যন্ত উচ্চ নিরাপত্তার মধ্যে সংরক্ষণ ও ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রতিটি জ্বালানি রড ও বান্ডিল আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA)-এর নজরদারিতে রয়েছে। ব্যবহৃত জ্বালানি রাশিয়ায় ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থাও চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত। বাস্তবায়নের দীর্ঘ পথ রূপপুর প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয় কয়েক দশক আগে। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন ধাপে অগ্রগতি হয় এবং ২০১১ সালে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে চুক্তির মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তব রূপ পায়। ২০১৫ সালে নির্মাণ চুক্তি স্বাক্ষরের পর কাজ দ্রুত এগিয়ে চলে। চ্যালেঞ্জ ও ব্যয় প্রকল্পটি নানা কারণে দেরিতে বাস্তবায়িত হচ্ছে—যেমন করোনা মহামারি, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি ও ডলার সংকট। এতে ব্যয়ও বেড়ে প্রায় ১.৩৮ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রূপপুর চালু হলে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি আমদানি নির্ভরতা কমাতে পারবে। একই সঙ্গে এটি দেশের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সব মিলিয়ে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন শুধু একটি প্রকল্প নয়—এটি বাংলাদেশের জ্বালানি ভবিষ্যতের একটি নতুন দিগন্তের সূচনা।
বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাতে নতুন অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু সংস্থা রোসাটমের মহাপরিচালক অ্যালেক্সি লিখাচেভ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। এই বৈঠককে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের অগ্রযাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও প্রযুক্তিগত মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) সকাল ১০টায় বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রধানমন্ত্রীর দফতরে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে বাংলাদেশ-রাশিয়ার পারমাণবিক সহযোগিতা, রূপপুর প্রকল্পের চলমান অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এই প্রকল্প শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেই নয়, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, দক্ষ জনবল তৈরি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। রোসাটম মহাপরিচালক অ্যালেক্সি লিখাচেভ বাংলাদেশের সঙ্গে রাশিয়ার দীর্ঘদিনের সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে বলেন, রূপপুর প্রকল্প নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে যাচ্ছে এবং এটি বাংলাদেশ-রাশিয়া বন্ধুত্বের একটি বড় প্রতীক হয়ে উঠেছে। তিনি প্রকল্পের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক মান এবং প্রযুক্তিগত নির্ভরযোগ্যতার বিষয়েও আশ্বস্ত করেন। সাক্ষাৎকালে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রী ফকির মাহাবুব আনাম স্বপন এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। এছাড়া ঢাকায় নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার গ্রিগোরিয়েভিচ খোজিনও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। এদিকে একই দিনে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে আরও একটি ঐতিহাসিক ধাপ শুরু হচ্ছে। মঙ্গলবার বিকেলে প্রকল্পটির প্রথম ইউনিটে ‘ফুয়েল লোডিং’ কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে বড় অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই ফুয়েল লোডিং কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো রিঅ্যাক্টরে পারমাণবিক জ্বালানি প্রবেশ করবে, যা ভবিষ্যতে পরীক্ষামূলক উৎপাদন এবং পরে বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথ খুলে দেবে। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে কেন্দ্র করে রূপপুর প্রকল্প এলাকায় বিশেষ আয়োজন রাখা হয়েছে। এতে অংশ নিচ্ছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহাবুব আনাম এবং রোসাটমের মহাপরিচালক অ্যালেক্সি লিখাচেভ। এছাড়া আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-এর মহাপরিচালক রাফায়েল মারিয়ানো গ্রসি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির সঙ্গে যুক্ত থাকবেন বলে জানা গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রূপপুর প্রকল্পের এই ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন হলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে একটি নতুন যুগের সূচনা হবে এবং আমদানি-নির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর চাপও অনেকটাই কমবে।
দেশে নিষিদ্ধ ঘোষিত অন্তত নয়টি জঙ্গি সংগঠনের ৩৭০ জন সদস্য এখনো পলাতক থাকায় জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত এসব ব্যক্তির অবাধ চলাফেরা এবং নজরদারির ঘাটতি আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, পলাতকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে জামাআতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)-এর সদস্য, যার সংখ্যা ১৮৫। এছাড়া হিযবুত তাহরীরের ৫৯ জন, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি)-এর ৫৮ জন, আনসার আল ইসলাম-এর ২৫ জন, হরকাতুল জিহাদ ইসলামী (হুজি)-এর ১৬ জন, নিও-জেএমবি’র ১৬ জনসহ অন্যান্য সংগঠনের সদস্যরাও তালিকায় রয়েছে। এই পলাতকদের মধ্যে ১৩০ জন কখনো গ্রেপ্তারই হয়নি। তদন্ত চলাকালে জামিন পেয়ে আত্মগোপনে গেছে ৬১ জন, বিচারাধীন অবস্থায় পালিয়েছে ৮৩ জন এবং ৯৬ জনের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই। কারা অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন মামলার ২ হাজার ২৫০ জন আসামি কারাগার থেকে পালিয়ে যায়। এখনো তাদের মধ্যে ৭০০ জন ধরা পড়েনি, যার মধ্যে ৯ জন জঙ্গি সংশ্লিষ্ট। অন্যদিকে, ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ১ হাজার ২৩১ জন সন্দেহভাজন জঙ্গি জামিনে মুক্তি পেয়েছে। এরপর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত আরও ৩৮০ জন জামিন লাভ করে, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ বিভিন্ন নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত দেশের ১৬টি কারাগারে মোট ১৬২ জন সন্দেহভাজন জঙ্গি বন্দি ছিল। তাদের মধ্যে ৫৯ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত, ৪৬ জন যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত এবং বাকিরা বিচারাধীন বা অন্যান্য শ্রেণিতে রয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর অনেকেই আবার সংগঠিত হয়ে তাদের নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করছে। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওমর ফারুকের মতে, বিষয়টি রাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। দ্রুত আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় না আনলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। একই ধরনের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক। তিনি বলেন, এসব পলাতক সদস্য পুনরায় উগ্র কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়লে তা সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় ও অনিরাপত্তা তৈরি করবে। তিনি জামিন ব্যবস্থার দুর্বলতা পর্যালোচনার পাশাপাশি নিয়মিত হাজিরা বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করেন। এদিকে সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিট জানিয়েছে, পলাতকদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং জামিনে থাকা ব্যক্তিদের ওপরও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। বিমানবন্দরে বাড়তি সতর্কতা: গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সম্ভাব্য হামলার গোয়েন্দা সতর্কতার পর দেশের সব বিমানবন্দরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন সংবেদনশীল স্থানে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পুলিশ সদর দপ্তরের সতর্কবার্তার পর উচ্চ সতর্কতা জারি করে প্রবেশপথ, টার্মিনাল ও আশপাশের এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। উল্লেখ্য, গত ২৩ এপ্রিল গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় সম্ভাব্য সমন্বিত হামলার আশঙ্কায় বাংলাদেশ পুলিশ উচ্চমাত্রার সতর্কতা জারি করেছিল।
ইরানের সাম্প্রতিক প্রস্তাব নিয়ে সন্তুষ্ট নন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুদ্ধবিরতি এবং পরমাণু কর্মসূচি সংক্রান্ত সমঝোতার লক্ষ্যে দেওয়া এই প্রস্তাবে মূল ইস্যুগুলো যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি বলে মনে করছেন তিনি। ট্রাম্প প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানান, নতুন প্রস্তাবটি প্রেসিডেন্টের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। বিশেষ করে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বিষয়ে এতে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বলে তার মত। এদিকে প্রস্তাবটি নিয়ে ট্রাম্প তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন বলে জানা গেছে। গত ১১ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা কমাতে তিন ধাপের একটি নতুন পরিকল্পনা দেয় ইরান। মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের মাধ্যমে সেই প্রস্তাব ইতোমধ্যে ওয়াশিংটনের কাছে পৌঁছানো হয়েছে। প্রস্তাবের প্রথম ধাপে সম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতি এবং ইরান ও লেবাননে হামলা বন্ধের নিশ্চয়তা চাওয়া হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কাছে। দ্বিতীয় ধাপে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করার কথা বলা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তৃতীয় ধাপে, পূর্ববর্তী দুই স্তরে সমঝোতা হলে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরু করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, ইসলামাবাদে প্রায় ২১ ঘণ্টার আলোচনার পরও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেননি। এরপর দ্বিতীয় দফা সংলাপের আহ্বান জানানো হলেও এখনো তা শুরু হয়নি। ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি আবার আলোচনায় বসতে রাজি হয়, তবে নতুন প্রস্তাবের ভিত্তিতেই সেই সংলাপ এগোতে পারে। সূত্র : রয়টার্স
দীর্ঘ এক দশক ধরে পরিবারের কাছে নিখোঁজ ও মৃত বলে ধরা হওয়া সৌদি প্রবাসী আফরোজা আক্তার অবশেষে জীবিত অবস্থায় দেশে ফিরেছেন। হঠাৎ করে মেয়েকে ফিরে পেয়ে তাঁর পরিবারে নেমে আসে আবেগঘন এক মুহূর্ত—বাবা-মা আনন্দে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন। জানা গেছে, দেশে ফিরে নিজের পরিচয় বা ঠিকানা জানাতে না পারায় হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কর্তৃপক্ষ প্রথমে তাঁকে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের কাছে হস্তান্তর করে। পরে সংস্থাটির প্রচেষ্টায় তাঁর পরিবারের সন্ধান পাওয়া যায় এবং তিনি স্বজনদের কাছে ফিরে যেতে সক্ষম হন। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের বাসিন্দা আফরোজা দারিদ্র্যের কারণে ২০১৬ সালে দালালের মাধ্যমে সৌদি আরবে পাড়ি জমান। প্রথমদিকে প্রায় দেড় বছর নিয়মিত পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন এবং অর্থও পাঠাতেন। কিন্তু হঠাৎ করেই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ প্রায় নয় বছর কোনো খোঁজ না পেয়ে পরিবার ধরে নেয়, তিনি হয়তো আর বেঁচে নেই। মেয়েকে ফিরে পেয়ে তাঁর মা ফাতেমা বেগম আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, তিনি কখনো ভাবেননি যে আবার মেয়েকে ফিরে পাবেন। এই ফিরে পাওয়া তাঁর কাছে এক অলৌকিক আশীর্বাদের মতো। সৌদিতে কাটানো সময়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে আফরোজা জানান, তিনি সেখানে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। কিন্তু এক বছর পর থেকেই তাঁর বেতন বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ায় পরিবারের সঙ্গে সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অবশেষে সৌদি পুলিশের সহায়তায় গত ১৭ এপ্রিল দেশে ফেরার সুযোগ পান তিনি। বিমানবন্দরে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখে নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁকে শনাক্ত করেন এবং পরে প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের মাধ্যমে ব্র্যাকের কাছে পাঠানো হয়। সংস্থাটির সহায়তায় তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। এ ধরনের ঘটনার জন্য সংশ্লিষ্টরা বিদেশে কর্মরত নারীদের সুরক্ষায় দূতাবাসগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারের ব্যবস্থাপক আল আমিন নয়ন বলেন, বিদেশে যাওয়া কর্মীদের নিয়মিত খোঁজখবর রাখা এবং তাদের অবস্থার অনলাইন পর্যবেক্ষণ জরুরি। তা না হলে আফরোজার মতো ঘটনা বারবার ঘটতে পারে। ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, গত আট বছরে মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়া থেকে এভাবে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া প্রায় দেড় শতাধিক নারী কর্মীকে পরিবারের কাছে ফিরতে সহায়তা করেছে সংস্থাটি।
বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা নতুন করে মাথাচাড়া দেওয়ার আশঙ্কা ঘিরে উদ্বেগ বাড়ছে। সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সতর্কবার্তা জারির পর বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। প্রশ্ন উঠছে—দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা উগ্রপন্থী সংগঠনগুলো কি পুরোনো যোগাযোগ ও নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে আবার সংগঠিত হচ্ছে? আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, মানবাধিকার কর্মী ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, জঙ্গি সংগঠনগুলো সাধারণত পুরোপুরি বিলুপ্ত হয় না। বরং পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকলে তারা সাময়িকভাবে আড়ালে চলে যায়। এই সময়টিকে তারা পুনর্গঠন, সদস্য সংগ্রহ, যোগাযোগ জোরদার এবং সক্ষমতা বাড়ানোর কাজে ব্যবহার করে। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, এই নীরবতা অনেক সময় পরিকল্পিত কৌশলের অংশ। রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও সামাজিক ঝুঁকির সুযোগ পেলেই তারা আবার সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করে। সীমান্তপারের যোগাযোগ নিয়ে উদ্বেগ: বাংলাদেশে জঙ্গি সংগঠনগুলোর আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের বিষয়টি নতুন নয়। অতীতে লস্কর-ই-তইবা ও জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ—জেএমবির মতো সংগঠনের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে। সম্প্রতি পাকিস্তানভিত্তিক তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপি ঘিরে নতুন করে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে জানা গেছে, বাংলাদেশে কিছু ব্যক্তির সঙ্গে টিটিপির সম্ভাব্য যোগাযোগের বিষয়টি তদন্তাধীন। এ উদ্বেগ আরও বাড়ে যখন চট্টগ্রামের একটি ঘাঁটি থেকে নিখোঁজ বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এক ওয়ারেন্ট অফিসারকে টিটিপি পরিচালিত একটি ক্যাম্পে পাওয়া যায়। ঘটনাটি সশস্ত্র বাহিনীতে উগ্রপন্থী অনুপ্রবেশের আশঙ্কা সামনে এনেছে এবং এ নিয়ে বিস্তৃত তদন্ত শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশকে জানিয়েছে, ওই ব্যক্তি টিটিপির হয়ে কাজ করছিলেন। পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই চালানো এই সংগঠনটির সঙ্গে আফগান তালেবানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশে টিটিপি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির উপস্থিতির তথ্য আগেও পাওয়া গেছে। ২০১৩ সালের মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিবেদনে বাংলাদেশে তিন টিটিপি সদস্য গ্রেপ্তারের কথা বলা হয়েছিল। গত বছর পাকিস্তানের সামরিক অভিযানে টিটিপি-সংযুক্ত অন্তত চার বাংলাদেশি নিহত হওয়ার খবরও পাওয়া যায়। এই প্রেক্ষাপটে বিমানবাহিনীর জহুরুল হক, এ কে খন্দকার ও মতিউর রহমান ঘাঁটিসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। কারাগার থেকে পলাতক জঙ্গি ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তন: আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক উদ্বেগের পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের সময় কারাগার থেকে বিপজ্জনক বন্দিদের পালিয়ে যাওয়া। অস্থিরতার ওই সময়ে কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে বহু বন্দি পালায়। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পালানো ২০২ জনের মধ্যে ১৩৩ জন এখনো পলাতক। কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পলাতক ও জামিনে মুক্ত জঙ্গি সন্দেহভাজনদের বিষয়ে মাঠপর্যায়ে স্পষ্ট নির্দেশনার ঘাটতি রয়েছে। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও আইজিপির পক্ষ থেকে বারবার “বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ নেই”—এমন বক্তব্য আসায় মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পাকিস্তানের ভিসা প্রক্রিয়া সহজ হওয়ায় যাতায়াত বেড়েছে। এতে আঞ্চলিক যোগাযোগ ও নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া আফগান তালেবান প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সফর এবং এ বিষয়ে সরকারি পর্যায়ে দৃশ্যমান প্রতিক্রিয়ার অভাব নিয়েও নিরাপত্তা মহলে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধবিজ্ঞানী ড. মো. তৌহিদুল হক ঘটনাটিকে গুরুতর সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন। তার মতে, এটি শুধু কোনো বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার বিষয় নয়; বরং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে উগ্রপন্থী প্রভাব তৈরি হলে তা বড় ধরনের ঝুঁকি ডেকে আনতে পারে। মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটনও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতি আকস্মিক নয়; বরং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যার ফল। তিনি বলেন, জঙ্গিরা হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। তারা দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্র, সমাজ ও বিভিন্ন ব্যবস্থার ভেতরে নানা স্তরে অবস্থান করে এসেছে। নিষ্ক্রিয়তার সময়েও তারা গোপনে সংগঠিত কার্যক্রম চালিয়েছে। নূর খান মনে করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক পরিবর্তন উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে নতুন করে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। কেরানীগঞ্জের একটি মাদ্রাসায় সাম্প্রতিক বিস্ফোরণের ঘটনাকেও তিনি সম্ভাব্য জঙ্গি তৎপরতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা, সেখানে তৈরি বিস্ফোরক দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহের পরিকল্পনা থাকতে পারে। তার ভাষায়, জঙ্গিরা শুধু সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে না, তারা বিভিন্ন ধরনের প্রস্তুতিও নিচ্ছে। তবে বিষয়টি সামনে আসায় সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। সতর্ক থাকার কথা বলছে পুলিশ: অতিরিক্ত আইজিপি (অপরাধ ও অপারেশনস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জঙ্গি তৎপরতা প্রতিরোধে সর্বদা সতর্ক রয়েছে। তিনি জানান, সিটিটিসি ও অ্যান্টি-টেরোরিজম ইউনিটসহ বিশেষায়িত সংস্থাগুলো পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। গত দেড় বছরে জামিনে মুক্ত কয়েকজন জঙ্গি সন্দেহভাজনকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অন্যদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তবে পুলিশ সদস্যদের জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার বিষয়ে এখনো কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর যেকোনো সময় বাংলাদেশিদের জন্য ওমানের শ্রমবাজার আবারও চালু হতে পারে—এমন সম্ভাবনায় আশাবাদী হয়ে উঠেছেন কর্মপ্রত্যাশীরা। বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক তৎপরতাও জোরদার হয়েছে। গত জানুয়ারিতে রিয়াদে এক সম্মেলনের ফাঁকে ওমানের শ্রমমন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, দুই মাসের মধ্যেই বাংলাদেশিদের জন্য নতুন ওয়ার্ক ভিসা চালু করা হতে পারে। সে অনুযায়ী মার্চের মধ্যেই প্রক্রিয়া স্বাভাবিক হওয়ার কথা থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক অস্থিরতার কারণে তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় শ্রমবাজার পুনরায় চালুর লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে। কূটনৈতিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ওমানের সুলতান হাইথাম বিন তারিকের কাছে একটি ব্যক্তিগত বার্তা পাঠানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবীর সম্প্রতি মাস্কাটে ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ বদর বিন হামাদ আল-বুসাইদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সেই বার্তা পৌঁছে দেন। এর কিছুদিন পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানও মাস্কাটে ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। যদিও ওই বৈঠকে সরাসরি শ্রমিক ভিসা চালুর বিষয়টি আলোচনায় আসেনি, তবে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর নানা দিক নিয়ে আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, উচ্চপর্যায়ের এসব যোগাযোগ, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদারের প্রচেষ্টার ফলেই শিগগিরই ওমানের শ্রমবাজার নিয়ে ইতিবাচক ঘোষণা আসতে পারে।
ফরিদপুর সদরে ভয়াবহ এক হত্যাকাণ্ডে একই পরিবারের দুই সদস্যসহ তিনজন নিহত হয়েছেন। সোমবার (২৭ এপ্রিল) রাত প্রায় ১০টার দিকে সদর উপজেলার আলিয়াবাদ ইউনিয়নের গদাধরডাঙ্গী গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত আকাশ মোল্লা (৪০) কোদাল দিয়ে কুপিয়ে ও আঘাত করে তার দাদি আমেনা বেগম (৭৫) ও ফুপু সালেহা বেগমকে (৫৫) হত্যা করেন। এ সময় বাধা দিতে এগিয়ে এলে প্রতিবেশী কাবুল চৌধুরী (৪৯)কেও আঘাত করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় রিয়াজুল ইসলাম (৩৮) নামে আরও এক প্রতিবেশী গুরুতর আহত হয়েছেন। তাকে উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি মো. রাজ্জাক শেখ জানান, আকাশ দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। তার আচরণে অস্বাভাবিকতা থাকায় পরিবার তাকে বিয়ে করায়নি। কখনো স্বাভাবিক থাকলেও মাঝে মাঝে তার আচরণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেত বলে জানান তিনি। অভিযুক্ত আকাশ ফরিদপুর যক্ষা হাসপাতালে পিয়ন পদে কর্মরত ছিলেন বলেও জানা গেছে। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে। তবে অভিযুক্ত এখনো পলাতক রয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে। এদিকে, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. শামছুল আজম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। নিহতদের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।
ড. মোহাম্মদ রইসউদ্দিন আহমেদ
মোস্তফা মাহমুদ
মোস্তফা কামাল আকন্দ
বিশ্বজুড়ে নিরাপত্তা উদ্বেগ, যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালে সামরিক খাতে ব্যয় নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপ্রি)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত বছর বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় প্রায় ২ লাখ ৯০ হাজার কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে—যা টানা ১১তম বছরের মতো বৃদ্ধি নির্দেশ করে। গবেষকদের মতে, বিশ্বব্যাপী নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি এবং সামরিক শক্তি বাড়ানোর প্রতিযোগিতাই এই ব্যয়ের মূল চালিকা শক্তি। মোট ব্যয়ের বড় অংশই এসেছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া থেকে—এই তিন দেশের সম্মিলিত ব্যয় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি ডলার, যা বৈশ্বিক ব্যয়ের অর্ধেকেরও বেশি। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে মোট সামরিক ব্যয় বেড়েছে ২ দশমিক ৯ শতাংশ। তবে ব্যতিক্রম হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র কিছুটা ব্যয় কমিয়েছে। সিপ্রির গবেষক লরেনৎসো স্কারাৎসাতো জানান, যুক্তরাষ্ট্রের এই কমতি ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলোর বাড়তি ব্যয় দিয়ে পুষিয়ে গেছে। তিনি বলেন, “বিশ্ব ক্রমেই নিজেকে অনিরাপদ ভাবছে, আর সেই কারণেই দেশগুলো প্রতিরক্ষা খাতে বেশি বিনিয়োগ করছে।” একই সঙ্গে, বৈশ্বিক জিডিপির তুলনায় সামরিক ব্যয়ের হার ২০০৯ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক খাতে ব্যয় করেছে ৯৫ হাজার ৪০০ কোটি ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ কম। এর পেছনে অন্যতম কারণ ইউক্রেনকে নতুন সামরিক সহায়তা অনুমোদন না হওয়া। তবে এই প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে, কারণ ২০২৬ সালের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ১ লাখ কোটি ডলারের বেশি প্রতিরক্ষা বাজেট অনুমোদন করেছে। ইউরোপে সামরিক ব্যয় সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে এই অঞ্চলে ব্যয় ১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৮৬ হাজার ৪০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইউরোপকে নিজস্ব প্রতিরক্ষা জোরদারের চাপও এই বৃদ্ধির একটি কারণ। জার্মানি ২০২৫ সালে সামরিক ব্যয়ে চতুর্থ অবস্থানে উঠে এসেছে, তাদের ব্যয় ২৪ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১১ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। স্পেনের ব্যয়ও এক বছরে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৪ হাজার ২০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। রাশিয়ার সামরিক ব্যয় বেড়ে হয়েছে ১৯ হাজার কোটি ডলার, যা তাদের জিডিপির ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। অন্যদিকে ইউক্রেন ব্যয় ২০ শতাংশ বাড়িয়ে ৮ হাজার ৪১০ কোটি ডলারে উন্নীত করেছে—যা দেশটির জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ। মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক ব্যয় তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও সামগ্রিকভাবে সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে ইসরায়েল ও ইরান উভয়ই ব্যয় কমিয়েছে। ইরানে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ব্যয় কমে ৭৪০ কোটি ডলারে নেমেছে, আর গাজায় যুদ্ধবিরতির প্রভাবে ইসরায়েলের ব্যয় কমে হয়েছে ৪ হাজার ৮৩০ কোটি ডলার। এশিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলেও সামরিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালে এই অঞ্চলে ব্যয় ৮ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৬৮ হাজার ১০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে—যা ২০০৯ সালের পর সর্বোচ্চ। চীন এখানে প্রধান চালিকাশক্তি, যার সামরিক ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৬০০ কোটি ডলার। চীনের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির প্রতিক্রিয়ায় জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানও নিজেদের প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়িয়েছে। জাপানের ব্যয় ৯ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ৬ হাজার ২২০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যা ১৯৫৮ সালের পর সর্বোচ্চ। বিশ্বব্যাপী এই প্রবণতা স্পষ্ট করে দিচ্ছে—নিরাপত্তা উদ্বেগ যত বাড়ছে, ততই সামরিক ব্যয় বাড়ছে দেশগুলোর মধ্যে।
ইরানের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশের অভিযোগে ৬৯ জন নাগরিকের নাগরিকত্ব বাতিল করেছে উপসাগরীয় দেশ বাহরাইন। দেশটির হাই ক্রিমিনাল কোর্ট এই রায় দিয়েছে বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তাসংস্থা বাহরাইন নিউজ এজেন্সি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের ‘শত্রুতাপূর্ণ ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে’ সমর্থন বা সহানুভূতি দেখানোর দায়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বাতিল হওয়া নাগরিকদের মধ্যে একই পরিবারের একাধিক সদস্যও রয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের দীর্ঘদিনের বিরোধ মূলত পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে ঘিরে। সম্প্রতি এই উত্তেজনা চরমে পৌঁছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে বিমান হামলা চালালে শুরু হয় সংঘাত। পাল্টা জবাবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, যার প্রভাব পড়ে সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানেও। এই হামলায় বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি হতাহতের ঘটনাও ঘটে। বিশেষ করে কুয়েত ও বাহরাইন সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে। পরবর্তীতে গত ৮ এপ্রিল থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও সংঘাত চলাকালে ইরানের প্রতি সমর্থন জানানো অভিযোগে মার্চ মাসে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে বাহরাইন কর্তৃপক্ষ। সেই মামলার রায়ের অংশ হিসেবেই এবার ৬৯ জনের নাগরিকত্ব বাতিল করা হলো।
ইরানের দেওয়া নতুন প্রস্তাব নিয়ে পর্যালোচনায় নেমেছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন জানিয়েছে, বিষয়টি খতিয়ে দেখার পর খুব শিগগিরই আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হবে। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট সোমবার এক ব্রিফিংয়ে বলেন, এ বিষয়ে ইতোমধ্যে অভ্যন্তরীণ আলোচনা হয়েছে। তবে এখনই বিস্তারিত কিছু জানাতে চাননি তিনি। তার ভাষায়, খুব শিগগিরই প্রেসিডেন্ট নিজেই এ বিষয়ে বক্তব্য দেবেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা নিরসন এবং স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে সম্প্রতি তিন ধাপের একটি প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই প্রস্তাব ইতোমধ্যে ওয়াশিংটনের কাছে পৌঁছেছে। প্রস্তাবের প্রথম ধাপে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি এবং ইরান ও লেবাননে সব ধরনের সামরিক হামলা বন্ধের নিশ্চয়তা চাওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনা করার কথা বলা হয়েছে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শেষ ধাপে, পূর্ববর্তী দুই ধাপে সমঝোতা হলে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরু করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। উল্লেখ্য, পরমাণু কর্মসূচি ইস্যুকে কেন্দ্র করে টানা প্রায় ৪০ দিনের সংঘাতের পর ৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। এরপর ১১ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে উভয় পক্ষের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনাও হয়, তবে কোনো চুক্তি ছাড়াই সেই বৈঠক শেষ হয়। এ পরিস্থিতিতে দ্বিতীয় দফা সংলাপ আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ইরান জানিয়েছে, নতুন প্রস্তাবের ভিত্তিতেই পরবর্তী আলোচনায় এগোতে চায় তারা।
ইরানের সাম্প্রতিক প্রস্তাব নিয়ে সন্তুষ্ট নন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুদ্ধবিরতি এবং পরমাণু কর্মসূচি সংক্রান্ত সমঝোতার লক্ষ্যে দেওয়া এই প্রস্তাবে মূল ইস্যুগুলো যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি বলে মনে করছেন তিনি। ট্রাম্প প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানান, নতুন প্রস্তাবটি প্রেসিডেন্টের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। বিশেষ করে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বিষয়ে এতে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বলে তার মত। এদিকে প্রস্তাবটি নিয়ে ট্রাম্প তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন বলে জানা গেছে। গত ১১ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা কমাতে তিন ধাপের একটি নতুন পরিকল্পনা দেয় ইরান। মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের মাধ্যমে সেই প্রস্তাব ইতোমধ্যে ওয়াশিংটনের কাছে পৌঁছানো হয়েছে। প্রস্তাবের প্রথম ধাপে সম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতি এবং ইরান ও লেবাননে হামলা বন্ধের নিশ্চয়তা চাওয়া হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কাছে। দ্বিতীয় ধাপে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করার কথা বলা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তৃতীয় ধাপে, পূর্ববর্তী দুই স্তরে সমঝোতা হলে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরু করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, ইসলামাবাদে প্রায় ২১ ঘণ্টার আলোচনার পরও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেননি। এরপর দ্বিতীয় দফা সংলাপের আহ্বান জানানো হলেও এখনো তা শুরু হয়নি। ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি আবার আলোচনায় বসতে রাজি হয়, তবে নতুন প্রস্তাবের ভিত্তিতেই সেই সংলাপ এগোতে পারে। সূত্র : রয়টার্স
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।