উপদেষ্টা পরিষদ নিজেরাই নির্বাচন প্রক্রিয়া ব্যাহত করতে চায় বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শুক্রবার (৭ নভেম্বর) জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত র্যালি-পূর্ব সমাবেশে তিনি এ মন্তব্য করেন।
বক্তব্যে মির্জা ফখরুল বলেন, শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দেশে একদলীয় শাসন ‘বাকশাল’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্রের সূচনা করে নতুন বাংলাদেশের পথ দেখান। তিনি দেশের রাজনৈতিক সংস্কার ও গণতান্ত্রিক চর্চার নতুন ধারা শুরু করেছিলেন।
বিএনপি মহাসচিব আরও বলেন, দেশপ্রেমিক সৈনিক ও জনগণ একত্রিত হয়ে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জিয়াউর রহমানকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তার নেতৃত্বে দেশ নতুনভাবে এগিয়ে যেতে শুরু করে।
তিনি অভিযোগ করেন, উপদেষ্টা পরিষদ আলোচনার মাধ্যমে যেসব বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো হয়েছিল, তারা এখন সেসব থেকে সরে গিয়ে নতুন প্রস্তাব দিয়েছে। এসব প্রস্তাবে এমন অনেক বিষয় রয়েছে যা বিএনপির কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ফখরুল বলেন, “তারা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বাদ দিয়েছে, তাতে আমরা একমত নই।
মির্জা ফখরুল প্রশ্ন তোলেন, “রাজনৈতিক দলগুলোকে যদি শেষ পর্যন্ত নিজেদের সিদ্ধান্ত নিতে বলা হয়, তবে এতদিন ধরে হওয়া আলোচনা ও ঐকমত্যের অর্থই বা কী?
তিনি আরও অভিযোগ করেন, কিছু রাজনৈতিক দল নির্বাচনের আগে গণভোটের দাবিতে চাপ সৃষ্টি করছে। তাদের বক্তব্য, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের দিনই গণভোট হতে হবে, অন্যথায় জাতি তা মেনে নেবে না।
ফখরুল দাবি করেন, উপদেষ্টা পরিষদ পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করছে এবং এমন পরিবেশ সৃষ্টি করতে চাইছে যাতে নির্বাচনের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। তার অভিযোগ, দেশের কিছু রাজনৈতিক দল নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংঘটিত এজাহারভুক্ত হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ও মিরাজ হোসেন পলাতক রয়েছেন। ব্যাংক প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খুনের শিকার কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুল হালিম ছিলেন কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেনের নাম রয়েছে। তারা বর্তমানে নিজেদের সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। ব্যাংক সূত্রে গেছে, তারা চাঁদাবাজি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এসব আসামিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেন। এতে আরও যুক্ত রয়েছেন ডিজিএম সৈয়দ লিয়াকত হোসেন, হাবিব উন নবী, ডিএমডি খালেকুজ্জামান জুয়েল ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে আব্দুল হালিমের মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক সজীব কুমার সিং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জানান, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাত ১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান। হালিমের ছেলে ফয়সাল বলেন, তার বাবা ২০১৪ সাল থেকে কৃষি ব্যাংক সিবিএর সভাপতি ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গত নভেম্বরেই মতিঝিল থানায় একটি জিডি (নং ০৫/১১/২০২৪ - ৩৩৫) করেছিলেন তার বাবা। তিনি আরও বলেন, বুধবার রাতে আমার বাবাকে তার অফিসের সহকর্মীরা মারধর করে হত্যা করেছে। সিবিএর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জানান, ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হই। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট বিনা নির্বাচনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে আমাদের অফিস দখল করে নেয় ফয়েজ ও মিরাজ। এ নিয়ে মামলা চলছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা অস্থায়ী জামিনে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন—যাদের মধ্যে আছেন ড্রাইভার সাইফুল, শাহেদ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মেহেদী ও অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনার সিরাজ। এদিকে, মামলার ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের প্রধান মহাব্যবস্থাপক জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। কারণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য না করার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বাঁধানোর পর আড়াই মাস পেরিয়ে গেছে; সেই যুদ্ধের কারণে পারস্য উপসাগরে আটকা পড়া হাজার দেড়েক জাহাজের ২০ থেকে ২২ হাজার নাবিক এখনো হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার অপেক্ষায় দিন গুনে চলেছেন। তবে বার বার চেষ্টা করেও প্রণালি পার হতে ব্যর্থ হওয়া বাংলাদেশি জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’র নাবিকরা বলছেন, অন্য জাহাজের ক্রুদের তুলনায় নিজেদের আরো বেশি দুর্ভাগা মনে হচ্ছে তাদের। তুলনামূলক ‘কম খরচায়’ বিপদজনক এলাকা ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার একটি সুযোগ তারা হাতছাড়া হয়ে যেতে দেখেছেন কয়েক দিন আগে। এখন তারা দেখতে পাচ্ছেন, ভারত ও পাকিস্তানসহ অন্য দেশগুলো যেখানে তাদের জাহাজে দীর্ঘ সময় ধরে আটকে থাকা নাবিকদের বদলি হিসেবে ‘রিলিফ ক্রু’ পাঠাচ্ছে, ‘বাংলার জয়যাত্রা’র ক্ষেত্রে তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। ৫ লাখ ৭৮ হাজার ডলার টোল দিয়ে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার একটি সুযোগ দিয়েছিল ইরান। ওই অর্থকে নাবিকরা ‘তুলনামূলক কম খরচ’ বলছেন, কারণ এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে বন্ধুপ্রতীম কিছু দেশের জাহাজের ক্ষেত্রে এর পাঁচগুণ টোল দিতে হয়েছিল। সে সময় ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সঙ্গে যোগাযোগের কথা স্মরণ করে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের (বিএসসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক বলেন, একটি মুসলিম দেশ হিসেবে আমরা ছাড় চেয়েছিলাম। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, টাকা কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু ইরানকে টোল দিলে মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় পড়ার ঝুঁকি ছিল, তাই আমাদের হাতে আর কোনো বিকল্প ছিল না। পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বাংলাদেশের ‘অতি সতর্ক অবস্থান’ শুরু থেকেই ইরানের সঙ্গে পেশাদার ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার সুযোগ নষ্ট করেছে। কূটনৈতিকভাবে বারবার ভুল পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ। বাংলার জয়যাত্রায় আটকে থাকা ৩১ নাবিকের মধ্যে অন্তত এক ডজন ক্রু ইতোমধ্যে দেশে ফেরার আবেদন করেছেন। তাদের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। যুদ্ধকবলিত অঞ্চলে থাকার জন্য প্রতিদিন অতিরিক্ত ৫ ডলার ‘যুদ্ধ ভাতা’ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও তারা আর চুক্তি নবায়ন করতে আগ্রহী নন। রাশিয়াসহ অনেক দেশই দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকা নাবিকদের মানসিক ও শারীরিক ঝুঁকি কমাতে ক্রু পরিবর্তনের ব্যবস্থা করছে। মাহমুদুল বলেন, আমাদের নাবিক ও জাহাজকে বিপদজনক এলাকা থেকে বের করে আনতে সাধ্যমতো সব কিছুই আমরা করছি। তবে বদলি ক্রু পাঠানোর কোনো চিন্তা আমাদের নেই। আমরা এটাকে কোনো বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করছি না। তার মানে হল, জাহাজটি যতদিন ওই এলাকায় আটকে থাকবে, ততদিন বর্তমান নাবিকদেরই জাহাজে রাখার পরিকল্পনা করেছে বিএসসি। সাবেক কূটনীতিক ও পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ সংকট কোন দিকে যাবে তা বলা কঠিন। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে এটা কয়েক বছর ধরেও চলতে পারে। তাদের মতে, যুদ্ধ দ্রুত শেষ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু পরিস্থিতি যদি আরও খারাপ হয়, তখন জ্বালানি সরবরাহ থেকে শুরু করে আটকে থাকা নাবিকদের উদ্ধারের মত বিষয়ে আপৎকালীন পরিকল্পনা থাকা জরুরি। আর বাংলার জয়যাত্রার ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম বলছেন, আমাদের দেশে ফিরতেই হবে। আমরা অনির্দিষ্টকাল এভাবে আটকে থাকতে পারি না। ‘রিলিভার’ পাঠাচ্ছে অন্য দেশ বাংলাদেশি জাহাজটির ৩১ নাবিকের এক-তৃতীয়াংশ ইতোমধ্যে টানা নয় মাস সমুদ্রে কাটিয়েছেন। আরও ১০ জন সাত মাস ধরে জাহাজে আছেন। এর মধ্যে দুই মাস কেটেছে দিন-রাত আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র ছুটে যেতে দেখে, আতঙ্কের মধ্যে। কিছু ক্ষেপণাস্ত্র তো খুব কাছে এসে পড়েছে। স্বাভাবিক সময়ে অনেক নাবিকই ছয় থেকে দশ মাস সমুদ্রে থাকেন। জাহাজের যে নাবিকদের সঙ্গে ফোনে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কথা হয়েছে, মানসিকভাবে তাদের স্থিতিশীল মনে হলেও তারা বলছেন, ছয় মাসের বেশি সময় ধরে সমুদ্রে থাকলে নানা ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। আবদ্ধ জায়গায় বারবার একই কাজ করা এবং ভারী জিনিস তোলার কারণে প্রায়ই পিঠ, ঘাড় ও জয়েন্টে পেশি ও হাড়ের ব্যথা হয়। অনিয়মিত শিফট ও রাতের পাহারার কারণে ক্লান্তি ও ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাও একটি সাধারণ বিষয়। পাশাপাশি বৈরী আবহাওয়ায় মোশন সিকনেস, মাথা ঘোরা ও পানিশূন্যতাও দেখা যায়। চাপপূর্ণ কর্মপরিবেশ হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। পাশাপাশি একটানা রোদ, লবণাক্ত পানি ও আর্দ্রতার সংস্পর্শে ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া, রোদে পোড়া ও নানা ধরনের সংক্রমণ হতে পারে। একজন নাবিক বলেন, এখনও কেউ অসুস্থ হয়নি। কিন্তু উদ্ধার করা না হলে আমরা অসুস্থ হয়ে পড়ব। এই পরিস্থিতিতে চিরকাল থাকা যায় না। কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা আছে, এমন নাবিকরাও বলছেন, ধেয়ে আসা মিসাইলের ভয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকার মত এমন মানসিক চাপ তাদের আগে কখনো সহ্য করতে হয়নি। যুদ্ধ যখন পুরোদমে চলছিল, তখন নোঙর করার মত নিরাপদ জায়গা খুঁজতে গিয়ে পরিস্থিতির জটিলতা হাড়ে হাড়ে বুঝেছেন এই নাবিকরা। হরমুজ প্রণালির যতটা সম্ভব কাছাকাছি থাকার পাশাপাশি নাবিকদের জিপিএস ও মোবাইল ফোন নেটওয়ার্কে থাকাও প্রয়োজন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ঘন ঘন নেটওয়ার্ক জ্যামিংয়ের কারণে সেটা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার যে দেশের সীমানায় জাহাজ নোঙর করা হচ্ছে, সেই দেশকে ফি দিতে হয়। বাড়তি খরচ এড়াতে উপকূলের ১২ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে থাকার চেষ্টা করেন নাবিকরা। কারিগরি কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। বাংলার জয়যাত্রার নোঙর ২৭০ মিটার। এ জাহাজ ৫০ মিটারের বেশি গভীর পানিতে নিরাপদে নোঙর করে থাকতে পারে না। দুবাই ও শারজাহ থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে নোঙর করা এই জাহাজের ক্রুরা ভালো করেই জানেন, বাংলাদেশ থেকে বিশেষ কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়া তারা সংযুক্ত আরব আমিরাতে নামতে পারবেন না। অনেক বিদেশি নাবিকের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাত সবচেয়ে নিরাপদ এবং পালানোর সহজ পথ হয়ে উঠেছে। তারা নৌকায় করে তীরে গিয়ে এরপর বিমানে চড়ে দেশে ফেরেন। তবে মানবিক কোনো কারণ না থাকলে সাধারণত বাংলাদেশি নাবিকদের সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয় না। দেশে ফেরার ফ্লাইট ধরতে সৌদি আরব বা আশপাশের অন্য কোনো দেশে যেতে হলেও সংঘাতপূর্ণ এই অঞ্চলের মধ্য দিয়ে ১০০ থেকে ১৫০ নটিক্যাল মাইল পাড়ি দিতে হবে। যে যাত্রা রূপ নিল দুঃস্বপ্নে বিএসসির মালিকানাধীন ‘বাংলার জয়যাত্রা’ সিঙ্গাপুরভিত্তিক কোম্পানি দাওয়া শিপিংয়ের অধীনে ভাড়ায় পরিচালিত হচ্ছে। জাহাজটির ৩১ নাবিকের সবাই বাংলাদেশি। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি কাতারের মেসাইদ বন্দর থেকে ৩৮ হাজার ৮০০ টন স্টিল কয়েল নিয়ে দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দরের বহির্নোঙরে আসে জাহাজটি। কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরু হলে পণ্য খালাস বিলম্বিত হয়। ভেড়ার একদিন পরেই জাহাজ থেকে ২০০ মিটার দূরত্বে একটি তেল রিজার্ভারে মিসাইল হামলার পর আগুন ধরে যায়। এমন পরিস্থিতিতে জাহাজটির ৩১ বাংলাদেশি নাবিকের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। তবে কয়েকদিন পর জাহাজ থেকে পণ্য খালাস শুরু হয়। কথা ছিল পণ্য খালাস শেষে জাহাজটির পুনরায় কাতারে যাবে। যুদ্ধ পরিস্থিতে সেটি বাতিল হয়। এরপর বাংলার জয়যাত্রার মুম্বাই যাওয়ার কথা ছিল। সেখানে যেতে হলে জাহাজটিকে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে হত। সেই উদ্দেশ্যে রওনাও দেয় জাহাজটি। কিন্তু বেশি দূর এগোতে পারেনি। দাওয়া শিপিং পরে নির্দেশনা দেয়, মুম্বাই নয়, সার নিয়ে যেতে হবে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন ও ডারবানে। কিন্তু হরমুজ না খোলায় জটিলতা থেকেই যায়। মার্চে একবার এবং এপ্রিলে দুবার হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করেছে বাংলার জয়যাত্রা, কোনোবারই সফল হতে পারেনি। জাহাজটি সবশেষ মে মাসের শুরুতে শারজাহ থেকে পানি কেনার জন্য মিনা সাকর বন্দরে ছেড়েছিল। ওই বন্দর ইরানের ফায়ারিং লাইন থেকে ৪৭ নটিক্যাল মাইল এবং হরমুজ প্রণালি থেকে ৭০ মাইল দূরে। শারজাহ থেকে ১৯০ টন পানি কিনে ফিরে যাওয়ার পথে নাবিকরা আইআরজিসির নতুন এক ঘোষণা শুনতে পান। সেখানে বলা হয়, আগে যেখানে জাহাজ নোঙর করা ছিল, সেদিকে এগোলে হামলার ঝুঁকিতে পড়বে। ফলে ৫ মে জাহাজকে নতুন অবস্থানে নিয়ে যেতে বাধ্য হন নাবিকরা। কিন্তু যুদ্ধে অবসান না হলে বাংলার জয়যাত্রাকে আবারও জায়গা বদলাতে হবে, অন্তত পানি কেনার জন্য হলেও। সাধারণত জাহাজগুলো নিজেদের পানি নিজেরাই শোধন করে নিতে পারে। বাংলার জয়যাত্রাও মূল ইঞ্জিনের তাপ ব্যবহার করে পানযোগ্য পানি উৎপাদন করতে পারে। কিন্তু জাহাজ নোঙর করে থাকায় এখন তা সম্ভব হচ্ছে না। পানির ব্যবহার অর্ধেকে নামিয়ে আনার পর জাহাজে এখন প্রায় এক মাস চলার মত পানি রয়েছে। গোসল ও অন্যান্য কাজের জন্য প্রতিদিন মাত্র আধা ঘণ্টা সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। স্বাভাবিক অবস্থায় এ জাহাজে প্রতিদিন ১২ টন পানির প্রয়োজন হয়। ইঞ্জিনের জরুরি কার্যক্রমের জন্য সবসময় ৪০ টন পানির মজুত রাখতেই হয়। জাহাজের চিফ ইঞ্জিনিয়ার রাশেদুল হাসান বলছেন, জাহাজে থাকা খাবার দিয়ে আরও দুই মাস চলতে পারে। এছাড়া জ্বালানি হিসেবে আছে ৪০০ টন হেভি ফুয়েল অয়েল এবং প্রায় ১৫০ টন ডিজেল। কূটনীতিতে ‘ভুল’ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সরকারি বিবৃতিগুলো থেকে দেখা যায়, কাতার, কুয়েত, সৌদি আরবসহ পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলো থেকে জ্বালানি পরিবহনের সময় হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে পারাপারের জন্য বাংলাদেশ মার্চের মাঝামাঝি সময়ে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে। এপ্রিলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এবং জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা তুরস্কের আনতালিয়া ডিপ্লোম্যাসি ফোরামসহ বিভিন্ন জায়গায় বার বার বলেন যে, সমস্যার সমাধান হয়েছে। পরে তা সংবাদমাধ্যমেও ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়। ইরানি দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, বাংলাদেশের প্রাথমিক কূটনৈতিক অবস্থানে তেহরানের ক্ষোভ তৈরি হলেও পরে আলোচনার জন্য বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষকে আইআরজিসির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরুর একদিন পর বাংলাদেশ একটি বিবৃতি দেয়। সেখানে ইরানের পাল্টা হামলাকে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর ‘সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন’ বলে নিন্দা জানানো হয়, যদিও ইরান বলেছিল তারা ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করেই হামলা চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার কারণেই যে এ সংঘাত শুরু করেছিল, সে কথাও বিবৃতিতে এড়িয়ে যাওয়া হয়। যুদ্ধ শুরুর দিন ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মেয়েদের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বোমা হামলায় শতাধিক শিশু নিহত হলেও বাংলাদেশ তার নিন্দা জানায়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, শিশু হত্যার নিন্দা না করে আমরা কার্যকর ও পেশাদার কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করেছি। বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্য অনেক দেশের মত বাংলাদেশও ধরে নিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোট দ্রুত যুদ্ধে জয়ী হবে। কিন্তু পরিস্থিতি এখন অনেক জটিল। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বাড়ায় ইরান পথ খুলে দিতে আগ্রহী হলেও ছাড় দেওয়ার সুযোগ কমে গেছে। সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদের প্রশ্ন, এরকম পরিস্থিতিতে আমরা কীভাবে আশা করতে পারি যে ইরান বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করবে? নিজের অস্তিত্বই যখন হুমকির মুখে, তখন ইরান কীভাবে অন্য জাহাজগুলোকে পার হতে দেবে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান অনুমতি দিলেও কিছু দেশ হয়ত হরমুজ প্রণালি পার হতে চাইবে না, কারণ তাতে তেহরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের কালো তালিকায় পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটিতে মেরিটাইম ল অ্যান্ড পলিসির শিক্ষক সৈয়দ জাকারিয়া বকশ ইমরান বলেন, এই সংকটের একটি বড় শিক্ষা হল, শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখাই যথেষ্ট নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালিই বাংলাদেশের সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি পাওয়ার একমাত্র পথ। সেই বাস্তবতায় ন্যূনতম নৈতিক অবস্থান বজায় না রেখে প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রঘেঁষা অবস্থান নেওয়ায় জাতীয় স্বার্থ ঝুঁকিতে পড়েছে। জাকারিয়া বলেন, আমাদের ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। আমাদের নিরপেক্ষ ও নৈতিক হতে হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এস এম মাহবুবুল আলম, যিনি পশ্চিম এশিয়া ডেস্কেরও দায়িত্বে ছিলেন, সাম্প্রতিক বদলির কারণ দেখিয়ে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। জ্বালানি বিভাগ বা বিদেশে বাংলাদেশের মিশনের কর্মকর্তারাও হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল নিয়ে ইরানের সঙ্গে আলোচনার বর্তমান অবস্থা ব্যাখ্যা করেননি। বিএসসির এমডি মাহমুদুল বলেন, কোনো এক জায়গায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। হয়ত যুদ্ধ নিয়ে আইআরজিসি খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
জনগণের অর্থে কপ-২৯ সম্মেলনে ৭৯ জনের টিম নিয়ে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের আজারবাইজান সফরের যৌক্তিকতা ও ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় অর্থের কৃচ্ছ্রসাধনের বহু গল্প শোনালেও নিজ সফরে রাষ্ট্রীয় অর্থের সর্বোচ্চ অপব্যবহার করেছেন ইউনূস।’ সোমবার (১১ মে) ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে তিনি এ দাবি করেন। পোস্টে জুলকারনাইন সায়ের লেখেন, ‘কপ-২৯ সম্মেলনে ৭৯ জনের টিম নিয়ে আজারবাইজান গিয়েছিলেন সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সম্পূর্ণ তালিকাটি আপনাদের সুবিধার্থে প্রকাশ করা হলো।’ পোস্টের সঙ্গে আজারবাইজানে ড. ইউনূসের সফরসঙ্গীদের বিশাল তালিকাও তুলে ধরেন জুলকারনাইন সায়ের। তিনি লেখেন, ‘ইউনূস সরকার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর রাষ্ট্রীয় অর্থের কৃচ্ছ্রসাধনের বহু গল্প শোনালেও নিজ সফরের সময় রাষ্ট্রীয় অর্থের সর্বোচ্চ ব্যবহার তিনি করেছেন—যেমন ধরুন, ব্রিটিশ রাজার কাছ থেকে ব্যক্তিগত পুরস্কার আনতে তিনি যখন যুক্তরাজ্যে এসেছিলেন, তখন তিনি ও তার দলের ৩৯ জন সদস্যের জন্য যুক্তরাজ্যের অন্যতম ব্যয়বহুল হোটেল দ্য ডরচেস্টারে ৪ রাতের জন্য যে ৩৭টি রুম রিজার্ভ করা হয়—হোটেল বিলের একটি কপি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ৩৯ জনের সফরকারী দল চার রাত অবস্থানের জন্য ব্যয় করেছে ২,১০,৩২৫ ব্রিটিশ পাউন্ড বা প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা (১ পাউন্ড = ১৬৬ টাকা হিসাবে, ৯ জুন ২০২৫ হিসেবে)। সাবেক প্রধান উপদেষ্টা যে কক্ষে ছিলেন, সেই কক্ষের দৈনিক ভাড়া ছিল ৬০৪৫ পাউন্ড বা ১০ লাখ টাকা, ৪ দিনে কেবল তার কক্ষেরই বিল আসে ৪০ লাখ টাকা বা ২৪,১৮০ পাউন্ড। জুলকারনাইন সায়ের আরো লেখেন, ‘আর সর্বনিম্ন দরের কক্ষটির জন্যও দৈনিক ব্যয় হয়েছিল ৮২৫ পাউন্ড বা ১ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। আচ্ছা, আজারবাইজানের কপ-২৯ সম্মেলনে ৭৯ জন সদস্যের খরচ কেমন হতে পারে? দেখি একটু খোঁজ নিয়ে।’
বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সন্ন্যাসী চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের জামিনের আবেদন খারিজ করে দিল সে দেশের হাই কোর্ট। আইনজীবী হত্যা মামলায় এখনও জেলে রয়েছেন তিনি। ইতিমধ্যেই ওই মামলার বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশ দিয়েছে চট্টগ্রামের নিম্ন আদালত। চিন্ময়কৃষ্ণের আইনজীবী অপূর্ব ভট্টাচার্য জানান, যেহেতু এই মামলায় নিম্ন আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া চলছে, তাই হাই কোর্ট জামিনের আবেদন খারিজ করে দিয়েছে। বিচারপতি কেএম জাহিদ সারওয়ার ও বিচারপতি শেখ আবু তাহেরের দুই বিচারপতির বেঞ্চে জামিনের মামলার শুনানি ছিল। আইনজীবী অপূর্ব জানান, আইনজীবী হত্যা মামলার জামিনের আবেদন খারিজ হলেও অন্য চারটি মামলার জামিনের শুনানি হবে সোমবার। আদালতে জামিনের সপক্ষে চিন্ময়কৃষ্ণের অসুস্থতার কথা তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার অবমাননা এবং রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় ২০২৪ সালের শেষের দিকে গ্রেফতার করা হয়েছিল চিন্ময়কৃষ্ণকে। তাঁর গ্রেফতারিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে অসন্তোষ ছড়িয়েছিল। চট্টগ্রাম-সহ একাধিক এলাকায় অশান্তি হয়। গ্রেফতারির পর চট্টগ্রাম আদালতে জামিনের আবেদন করেন চিন্ময়কৃষ্ণ। তবে সে বছর নভেম্বরে চিন্ময়কৃষ্ণের জামিনের মামলাকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম আদালত চত্বরে অশান্তি হিংসাত্মক রূপ নিয়েছিল। সেই হিংসায় প্রাণ যায় আইনজীবী সাইফুল ইসলামের। অভিযোগ, আদালত চত্বরে কুপিয়ে এবং পিটিয়ে নৃশংস ভাবে হত্যা করা হয় সাইফুলকে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে আইনজীবী হত্যা মামলায় চিন্ময়কৃষ্ণকে গ্রেফতার করতে চেয়ে আবেদন জানিয়েছিলেন তদন্তকারীরা। আবেদন মঞ্জুর হওয়ার পরই তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। একা চিন্ময়কৃষ্ণকে নয়, এই মামলায় আরও বেশ কয়েক জনকে গ্রেফতার করে বাংলাদেশ পুলিশ। তবে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় ইতিমধ্যেই জামিন পেয়েছেন চিন্ময়কৃষ্ণ।