বরেন্দ্র অঞ্চলের অন্তর্গত রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলা। খরাপ্রবণ এই উপজেলাটি একসময় কৃষিনির্ভর অর্থনীতির চাপে নুইয়ে ছিল। তবে গত এক দশকে এখানকার কৃষিতে এসেছে বড় ধরনের পরিবর্তন। এখন ধান, পাট ও গমের পাশাপাশি অর্থকরী ফসল হিসেবে চাষ হচ্ছে টমেটো, পেয়ারা, ড্রাগন, মালটা ও কমলার মতো ফল।
কৃষকরা বলছেন, উঁচু-নিচু এসব জমিতে একসময় খরার কারণে বছরে ধান বা গমের চাষ হতো। এখন সেখানে সারা বছরই বিভিন্ন ফল ও সবজির চাষ হচ্ছে। এতে কৃষকের আয় যেমন বেড়েছে, তেমনি স্থানীয় অর্থনীতিতেও গতি এসেছে। তবে যাদের হাতে ফসল ফলন হতো তাদেরই এখন ধান বা গম কিনে খেতে হয়।
তবে কৃষকদের অভিযোগ, ফসল ও ফল সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে পচন ঝুঁকিতে পড়ে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। কৃষি অফিসের একটি সূত্র জানায়, প্রতি বছর রাজশাহীতে পাঁচ লাখ মেট্রিক টনের বেশি সবজি উৎপাদন হয়। সংরক্ষণের অভাবে এর ৫ থেকে ১০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। এতে সবচেয়ে বেশি লোকসান গুনতে হয় প্রান্তিক পর্যায়ের চাষি ও ব্যবসায়ীদের।

রাজশাহীর ৯টি উপজেলার মধ্যে বরেন্দ্র অঞ্চল পড়ে তানোর ও গোদাগাড়ীতে। তানোরের তুলনায় গোদাগাড়ী উপজেলা ফল ও ফসলে বেশি সমৃদ্ধ। এই উপজেলায় চাষাবাদযোগ্য জমি রয়েছে ৪১ হাজার ১৯৯ হেক্টর। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে মোটা দাগে এসব জমিতে ধান, সবজিসহ ২২ ধরনের ফসল উৎপাদিত হয়। এছাড়া আম, পেয়ারা, ড্রাগন, মালটা ও কমলার চাষও হচ্ছে। এর ফলে এই এলাকায় হাজারো বেকারের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, পাশাপাশি অর্থনীতিতেও এসেছে গতি।
গোদাগাড়ী উপজেলা কৃষি অফিস বলছে, চলতি বছরে এই উপজেলায় টমেটোর চাষ হয়েছে ২ হাজার ৭১০ হেক্টর জমিতে। যার উৎপাদন ধরা হয়েছে ৯৭ হাজার ৫৬০ টন। ২৫ টাকা কেজিতে বাজারমূল্য ধরা হয়েছে ২৪৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এছাড়া মাল্টা ১৬৫ হেক্টর জমিতে চাষ হলেও এর উৎপাদন ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৫২ টন। প্রতি কেজি ৯০ টাকা হারে বাজারমূল্যে দাঁড়ায় ১ কোটি ৪৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ড্রাগন ১৯৫ হেক্টর জমিতে চাষ হলেও উৎপাদন ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৯০০ টন। প্রতি কেজি ১৪০ টাকা হারে বাজারমূল্যে দাঁড়ায় ২ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। ১ হাজার ২৫ হেক্টর জমিতে পেয়ারার চাষ হয়েছে। যার উৎপাদন ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫৮০ টন। ৭০ টাকা হারে বাজারমূল্যে দাঁড়ায় ৭ কোটি ১৪ লাখ টাকা। এছাড়া সাড়ে ৮ হেক্টর জমিতে কমলার চাষ হয়েছে। যার উৎপাদন ধরা হয়েছে ১৩৫ টন। ১২০ টাকা হারে বাজারমূল্যে দাঁড়ায় ৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
গোদাগাড়ীর হুজরাপুরে পেয়ারা ও মাল্টা চাষি হাবিবুর রহমান বলেন- ‘আগে এসব জমিতে বছরে একবার ধানের চাষ হতো। ধান বিক্রি করে যে টাকা হতো তাতে বছর পার করতে কষ্ট হতো। কিন্তু এখন এসব জমিতে ফলের বাগান করা হয়েছে। বাগান বিক্রি করে প্রতি বছর মোট অঙ্কের টাকা পাওয়া যায়। সেই টাকা দিয়ে অনেকেই মৌসুমে অল্প দামে ধান কিনে নেই। সারা বছর সেই ধানের ভাত খাই। বরেন্দ্র অঞ্চলের জলবায়ু ও মাটির গঠন ফলচাষের জন্য অনুকূল। গেল ১০ বছরে টমেটো ও ফলজাত ফসলের আবাদ বেড়েছে কয়েকগুণ। এর ফলে এলাকার অর্থনীতিতে এসেছে গতি।’

রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহাসড়কের পাশে বেশকিছু ড্রাগনের বাগান চোখে পড়বে। একই সঙ্গে রয়েছে পেয়ারা, মাল্টার বাগান। উপজেলার রাজাবাড়ি থেকে হুজরাপুর, কাঁকনহাট অংশে বেশি পেয়ারা, মাল্টর বাগান রয়েছে। রাজাবাড়ি হয়ে আগুলপুর, বিড়ইল, লালাটিয়া, ভাদুপাড়া, সেনাডাঙ্গা, যোগপুর, কুন্দলীয়া এলাকার সড়কের দুই পাশে শত শত বিঘা জমিতে বিভিন্ন ফলের বাগান গড়ে উঠেছে ব্যক্তি উদ্যাগে।
মাল্টা চাষি আলী নয়ন বলেন, চাষিরা ধান, গমসহ বিভিন্ন ফসল ফলন কমিয়ে দিয়েছে। কারণ এসব ফসল ফলাতে চাষিদের খরচ বেশি। কিন্তু লাভ কম। তাই মানুষ বিভিন্ন ফল চাষে আগ্রহী হয়েছে। বাজারে সবচেয়ে বেশি ভালো ধানের দাম প্রতি মণ ১৩০০ থেকে ১৫০০ টাকা। এই দাম আবার সবসময় থাকে না। আর ৪০ টাকা কেজি দরে এক মণ পেয়ারার দাম পড়ে ১৬০০ টাকা। এই দাম বছরের বেশিরভাগ সময় থাকে। এর চেয়ে অনেক সময় দাম ৮০ থেকে ৯০ টাকাও ছাড়িয়ে যায়। পেয়ারা ছাড়া অন্যসব ফল চাষে সার, কিটনাশ, সেচ ছাড়াও সবধানের খরচ কম।
পাইকারি বিক্রিতা আব্দুস সালাম বলেন, গোদাগাড়ী এলাকার পেয়ারা, মাল্টা ও ড্রাগনের স্বাদ ভালো। এই সব ফলগুলোর রাজশাহীর বাজারে ভালোই চাহিদা রয়েছে। এছাড়া এসব রাজশাহী ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবারহ করা হয়। চাষিরা এই ফলগুলো চাষে বেশি আগ্রহী। কারণ তারা বাগান থেকে সরাসরি টাকা পেয়ে যাচ্ছে। এই কারণে তাদের দিন দিন অর্থকরী ফলস হিসেবে পরিচিত পেয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজশাহী কৃষিতে যেমন সম্ভাবনা রয়েছে। তেমনি সংকটও রয়েছে। সঙ্কটের দিক থেকে কৃষি পণ্য সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা নেই। খাদ্যের অপচয়, কৃষকের অর্থনৈতিক ক্ষতি দেখা দেবে। কারণ পণ্য পচে যাওয়া, দাম কমে যায়, এবং সরবরাহ শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে যা খাদ্য সংকট সৃষ্টি করবে। রাজশাহী অঞ্চলের কৃষির প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে- অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও অবকাঠামো উন্নয়নের আবাদি জমির হ্রাস, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা (যেমন খরা ও অতিবৃষ্টি), সার ও উপকরণের অভাব ও মূল্য বৃদ্ধি, অপর্যাপ্ত সেচ ও পানির সংকট, এবং বাজারজাতকরণ ও ন্যায্য মূল্যের অভাব। যা কৃষকদের লাভ কমিয়ে দিচ্ছে।
অপরদিকে, রাজশাহী অঞ্চলের কৃষির সম্ভাবনা অনেক, বিশেষত ফল, সবজি (যেমন- আম, লিচু, আলু, পেঁপে) এবং সুগন্ধি ধানের (যেমন কালিজিরা, নাজিরশাইল) উৎপাদনে, যা কৃষি প্রক্রিয়াকরণ শিল্প (অমৎড়-ঢ়ৎড়পবংংরহম) ও রপ্তানির অপার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। তবে রাসায়নিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা করা জরুরি।
গোদাগাড়ী উপজেলায় ধান, পাট ছাড়া ২২ ধরনের সবজি ও মসলা জাতীয় ফসল ফলে। এছাড়া ফলের দিক থেকে আম, পেয়ারা মাল্টা, কমলা ড্রাগন ও বরই রয়েছে। গেল ১০ বছর আগেই এসব ফলের আধিক্য ছিল না বরেন্দ্র এই অঞ্চলে। বছরজুড়ে কয়েক ধরনের ধান, পাটের চাষ হতো। তবে পানির ব্যবহার কমাতে এসব জমিতে অর্থকরি ফসল হিসেবে ঢুকে গেছে এসব বিভিন্ন ফল।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গেল ৫ বছরের (২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫) হিসেবে জেলার গোদাগাড়ীতে বেশ কিছু ফসলের চাষ কমেছে। কিন্তু বেড়েছে ফলের চাষ। সেই হিসেবে ২০২০-২১ সালে এই উপজেলায় আমন ধানের চাষ হয়েছিল ২৪ হাজার ৬৯৫ হেক্টর জমিতে। চলতি ২০২৪-২৫ সালে কমে দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৭৪৫ হেক্টর জমিতে। আউশ ধানের ক্ষেত্রে ১৩ হাজার ৯৭৪ হেক্টর থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৭৬৫ হেক্টরে। বোরো ধানের ক্ষেত্রে ১৫ হাাজর ৫০ হেক্টর থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৭৩৫ হেক্টরে। গমের চাষ ৬ হাজার ৪০০ হেক্টর থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৩৫ হেক্টরে। তবে ভুট্টার ক্ষেত্রে ৪ হাজার ২০ হেক্টর থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৯০০ হেক্টরে। একইভাবে আলু ১ হাজার ৮৫৩ হেক্টর থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২১৪ হেক্টরে। এছাড়া উল্লেখ যোগ্যহারে বেড়েছে মিষ্টি আলুর চাষ। গেল পাঁচ বছরে এই উপজেলায় ৩০ হেক্টর থেকে মিষ্টি আলু চাষের জমি দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩০৫ হেক্টরে।
গেল পাঁচ বছরে ৩৬ হেক্টর থেকে ৩৫ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে আখের চাষ। ৮১০ হেক্টর থেকে বেড়েছে পাটের চাষ দাঁড়িয়েছ ৮৭৫ হেক্টরে। সবজির চাষ ৬ হাজার ৬৮৮ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৭৮৩ হেক্টরে, সরিষা ৭ হাজার ২১০ হেক্টর থেকে বেড়ে ১৯ হাজার ৬৩০ হেক্টরে, তিল ১২০ হেক্টর থেকে বেড়েছে হয়েছে ৭২৫ হেক্টর, মসুর ১২০ থেকে বেড়েছে ৫ হাজার ১৮৫ হেক্টর। তবে কমেছে ছোলা চাষ। ১ হাজার ৩২৫ হেক্টর থেকে হয়েছে ৫৪৮ হেক্টর, মুগ ডাল ১২৫ হেক্টর থেকে হয়েছে ৬ হেক্টর, মাসকালাই ১ হাজার ১২০ হেক্টর থেকে কমে হয়েছে ৮১০ হেক্টর, খেসারী ১৭৫ হেক্টর থেমে কমে হয়েছে ১৪৫ হেক্টর। এছাড়া মসলার মধ্যে ১ হাজার ৪৪৫ হেক্টর থেকে কমে ১ হাজার ২৬৭ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে। ১৬০ হেক্টর থেকে কমে রসুন চলতি বছরে চাষ হয়েছে ১৫০ হেক্টর, ৪৪৫ হেক্টর থেকে কমে মরিচ চাষ হয়েছে ৩৬৫ হেক্টরে।
তবে ধান, পাট, আখের থেকে ভিন্ন চিত্র ফলে। গেল পাঁচ বছর এই উপজেলায় বেড়েছে ফলের চাষ। চাষিদের দাবি- ফল সরাসরি বিক্রি করা হয়। সুদ্বাদু হওয়ার কারণে চাহিদাও ভালো এই অঞ্চলের ফলের। তাই দিন দিন পেয়ারা, মাল্টা, কমলা, ড্রাগন তাদের কাছে অর্থকরী ফসল হয়ে উঠেছে। এই উপজেলায় গেল পাঁচ (২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫) বছরের চিত্র বলছে- ২০২০-২১ সালে পেয়ারার চাষ হয়েছিল ৬৯০ হেক্টর জমিতে। পাঁচ বছরে বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ২৫ হেক্টর। ২ হাজার ২৭৫ হেক্টর থেকে পাঁচ বছরের বেড়ে ১৬৫ হেক্টর জমিতে মল্টার চাষ হয়েছে। এক হেক্টর থেকে বেড়ে কমলার চাষ দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৮ ক্টেররে। এছাড়া ২০ হেক্টর থেকে গেল পাঁচ বছরে ড্রাগনের চাষ বেড়েছে ১৯৫ হেক্টর।
গোদাগাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মরিয়াম আহমেদ বলেন- ‘গোদাগাড়ী উপজেলার বরেন্দ্র এলাকায় টমেটো, ড্রাগন ফল, মাল্টা, কমলা ও পেয়ারা বাম্পার ফলন হওয়া এ অঞ্চলের কৃষির জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। খরা-প্রবণ ও উঁচু জমিতেও এসব ফসল চাষ করে কৃষকরা ভালো লাভের মুখ দেখছেন। বরেন্দ্র এলাকার মাটি ও জলবায়ু এসব উচ্চমূল্যের ফল ও সবজি উৎপাদনের জন্য উপযোগী প্রমাণিত হয়েছে। এ সব ফসল পুষ্টি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি কৃষকের আয় বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি ফসল বৈচিত্র্য বৃদ্ধি পাওয়ায় বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি এখন আরও টেকসই ও লাভজনক হয়ে উঠছে।’
চলতি বছরে এই উপজেলায় টমেটোর চাষ হয়েছে ২ হাজার ৭১০ হেক্টর জমিতে। যার উৎপাদন ধরা হয়েছে ৯৭ হাজার ৫৬০ টন। যার মধ্যে ২২ হাজার টন টমেটো কেনে প্রাণ গ্রুপ। তারা টমেটো দিয়ে সস থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের খাবার তৈরি করে।
রতন আলী নামের আরেক চাষি বলেন- ‘এখন টমেটো, পেয়ারা চাষে ভালো লাভ। টমেটো আগাম চাষ করতে পারলে মৌসুমে ভালো দাম পাওয়া যায়। আর পেয়ারা তো সারা বছর বিক্রি করা যায় কমবেশি। ধান, গম ফসলের পাশাপাশি নতুন জাতের এসব ফল চাষে আগ্রহী হচ্ছেন তরুণরা। অনেকে বাগান তৈরি করেছেন ড্রাগন, মালটা ও কমলার। বিক্রি ভালোই হচ্ছে তাদের।’
টমেটো ব্যবসায়ী সাদিকুল ইসলাম বলেন, ‘টেমেটো বাজারজাত করণের লক্ষ্যে প্রতিদিন তার সঙ্গে কাজ করেন ৩০ থেকে ৩৫ জন পুরুষ। তাদের প্রতিদিন মুজুরী হিসেবে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা দিতে হয়। তারা বিভিন্ন জমিতে তোলা টমেটোগুলো গাড়িতে করে একটা নিদীষ্ট জায়গায় রাখবে। নষ্টগুলো বাদ দিয়ে ঝুঁড়িয়ে রেখে ওজন করবেন। এসব টমেটোগুলো প্রাণ ছাড়াও বিভিন্ন কোম্পানীর কাছে বিক্রি করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরে পাঠানো হয়।’
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের জনসংযোগ বিভাগের প্রধান মো. তৌহিদুজ্জামান জানান, রাজশাহী, বাগেরহাট, গোপালগঞ্জ, খুলনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, দিনাজপুর, পঞ্চগড় এবং ঠাঁকুরগাও জেলায় প্রাণ এর চুক্তিভিত্তিক কৃষকেরা টমেটো উৎপাদন করে থাকে। তবে বেশিরভাগ টমেটো রাজশাহী অঞ্চল থেকে নেওয়া হয়। গত মৌসুমে প্রাণ কৃষকদের কাছ থেকে ২২ হাজার টন টমেটো সংগ্রহ করেছে। রাজশাহীর গোদাগাড়ী বরেন্দ্র ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে এবং নাটোরের একডালায় প্রাণ এগ্রো লিমিটেড কারখানাতে আম ও টমেটো সংগ্রহ ও পাল্পিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে প্রাণ গ্রুপ।
এ বিষয়ে রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, এই এলাকায় পানির সঙ্কট। চাষিরা চাই অল্প পানি ব্যবহার করে ফসল ফলাতে। আমরাও তাদের সেই বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে থাকি। ধান চাষে পানির সেচ লাগে। কিন্তু সেই হিসেবে পেয়ারা, ড্রাগন বা মাল্টা চাষে সেই রকম পানির প্রয়োজন পরে না। আর চাষিরা যে ফসল চাষে লাভবান হবে তারা সেই দিকেই ঝুঁকবে। এটাই স্বাভাবিক।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী জুলফিকার আলী বলেন, চাষিরা ধান চাষ করছে না, এর মূল কারণ লাভ কমে গেছে। আমের উৎপাদন খরচের সঙ্গে দাম তেমন পাচ্ছে না চাষিরা। ফলে তারা বিকল্প হিসেবে বিভিন্ন ফলের চাষ করছে। বরেন্দ্র এলাকায় পানের সঙ্কট। সেখানে ধান বা অন্য ফসল চাষের ক্ষেত্রে পানি ব্যবহার বেশি। কিন্তু পেয়ারা, মাল্টা, ড্রাগনের চাষে পানি কম লাগে। এরসব ফলের মার্কেটও ভালো। চাষিরা সুবিধা মতো সময়ে বাগান থেকে সরাসরি বিক্রি করতে পারেন। পচন বা নষ্টের ঝুঁকি কম থাকে।
রাজশাহী অঞ্চলে সবজি বা পচনশীল ফসল সংক্ষেণের ব্যবস্থার বিষয়ে তিনি বলেন, সবজি বা পচনশীল ফসল সংক্ষেণের ব্যবস্থা নেই। ফলে প্রতিবছর অনেক সবজি নষ্ট হয়। কোনো সরকার সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণে উদ্যোগী হয় না। রাজশাহীতে কৃষি ব্যাংক আছে তারাও সংরক্ষণের জন্য ব্যবস্থার দিকে আগায় না। সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকলে প্রান্তিক চাষিরা লাভবান হবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
অনলাইনে (জুম প্ল্যাটফর্ম) আয়োজিত সেমিনার ও কর্মশালার বিভিন্ন খাতের সম্মানীর হার পুনর্নির্ধারণ করেছে সরকার। এ-সংক্রান্ত একটি পরিপত্র জারি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ। গতকাল মঙ্গলবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রে বলা হয়েছে, সরকার পরিচালন বাজেটের আওতায় অনলাইনে (জুম প্ল্যাটফর্ম) আয়োজিত সেমিনার বা কর্মশালার জন্য সম্মানীর নতুন হার নির্ধারণ করেছে। জারির তারিখ থেকেই এ পরিপত্র কার্যকর হবে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, সেমিনার বা কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপকের সম্মানী নির্ধারণ করা হয়েছে সাড়ে ৪ হাজার টাকা। সেমিনার বা কর্মশালার সঞ্চালক পাবেন ৪ হাজার টাকা। একই হারে, অর্থাৎ জনপ্রতি ৪ হাজার টাকা করে সর্বোচ্চ তিন আলোচককে সম্মানী দেওয়া হবে। এ ছাড়া র্যাপোর্টিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালনকারীদের জন্য সম্মানীর হার জনপ্রতি আড়াই হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ খাতে সর্বোচ্চ দুজনকে সম্মানী দেওয়া যাবে। অন্যদিকে সেমিনার বা কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীকে ১ হাজার টাকা করে সম্মানী প্রদানের বিধান রাখা হয়েছে। পরিপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়, অনলাইনে আয়োজিত সেমিনার ও কর্মশালার খাতভিত্তিক সম্মানীর হারসংক্রান্ত অর্থ বিভাগের ২০২১ সালের ২৫ আগস্ট জারি করা ২২৯ নম্বর স্মারকটি বাতিল করা হয়েছে। ফলে নতুন পরিপত্র অনুযায়ী ভবিষ্যতে সব অনলাইন সেমিনার ও কর্মশালার সম্মানী দেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, অনলাইনভিত্তিক সরকারি সভা, সেমিনার ও কর্মশালার সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় সম্মানীর হার পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। ফলে অনলাইনভিত্তিক জ্ঞান বিনিময়, প্রশিক্ষণ ও নীতিনির্ধারণী আলোচনায় অংশগ্রহণকারীদের উৎসাহ আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
জাতীয় সংসদ সদস্যদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি ফ্ল্যাটে ওয়াশিং মেশিন ও মাইক্রোওয়েভ ওভেন সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য মু. মিজানুর রহমান। জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব দাবি করেন তিনি। পাশাপাশি ফ্ল্যাটের জানালা ও দরজায় পর্দা ঝুলানো হয়নি বলেও জানান তিনি। বুধবার (১৭ জুন) বিকাল ৩টা ২ মিনিটে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের (বীরবিক্রম) সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হয়। এর আগে, গত ২১ এপ্রিল জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে গাড়ি চেয়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেন জামায়াতের জোটসঙ্গী এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। ওইদিন হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছিলেন, ‘এই পার্লামেন্টের সেকেন্ড মোস্ট জুনিয়র হিসেবে একটা কথা বলছি। সেটা হচ্ছে যে, আমাদের ইউএনওর একটা, উপজেলা চেয়ারম্যানেরও একটা গাড়ি থাকে। আমাদের ভাড়ায় গাড়ি চালাইতে হয়। আমরা লজ্জায় এটা বলতে পারি না। এখন আমাদের একটা বসার ব্যবস্থা করে দিছে, এখন মানুষের কাছে যাওয়ার জন্য যদি একটা গাড়ির ব্যবস্থা করে দেয়, তাহলে আমাদের জন্য একটু সুবিধা হয়, মানুষের কাছে একটু যাইতে পারি।’
হাতে থাকা ছোট একটি লোহার টুকরা দিয়ে ইটের ওপর থেকে পলেস্তারা সরাচ্ছিলেন পারুল বেগম। একটি ইট কিছুটা পরিষ্কারের পর তিনি দেয়াল থেকে পরের ইটটি আলাদা করতে শুরু করেন। মাথার ওপর পাহাড়সম মাটির স্তূপ। সেই মাটির নিচেই চাপা পড়েছে তাঁর শেষ সম্বলের ঘর। পুনর্বাসন না করেই নদী খননের মাটি ঘরের ওপর ফেলায় পারুলসহ দেড় শতাধিক মানুষ বিপদে পড়েছেন। আশ্রয়ণের শেষ সম্বল হারিয়ে দিশাহারা অবস্থায় দিন পার করছেন তাঁরা। খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার আপার ভদ্রা নদী পুনঃখননের কাজের কারণে চুকনগর আশ্রয়ণ প্রকল্পের পারুল বেগমসহ দেড় শতাধিক মানুষের ঘরের এখন কোনো অস্তিত্ব নেই। মাটি সরিয়ে পারুলের ইট সরানোর কারণ—ভবিষ্যতে যদি কখনো আবার ঘর তৈরির সুযোগ পাওয়া যায়। পারুল বেগম এখন চুকনগর গরুর হাটের মাঠে একটি অস্থায়ী খুপরিতে থাকছেন। তাঁর মতো আরও অসংখ্য পরিবার সেখানে অস্থায়ী আবাস গড়েছে। আমাদের ঘর, বাথরুম কিছুই নেই। সব ভেঙে দিয়েছে। সবকিছু ভেঙেচুরে মাটির তলে। আমাদের কোনো আশ্রয় নেই। এখন কোনো পথ দেখছি না। সেখানকার বাসিন্দা রিজিয়া বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘গাঙকাটা ওয়ালারা ঘর একদম ভেঙে দিয়ে গেছে। পাঁচ-ছয় মাস হয়ে গেছে এই ঘটনা। আমরা এখন গরুর হাটের মাঠে থাকছি। ভোটের আগে নেতারা এসে বলেছিল, ঘর দেবে। কিন্তু এখন তো কেউ কিছু বলে না। আমাদের ঘর নেই, বাথরুম নেই। একটু বৃষ্টি হলে মাঠে পানি ওঠে। পানির তলে ভাসতিছি। কয়টা টিউবওয়েল ছিল এখানে, একটাও নেই। সব মাটির নিচে।’ রিজিয়ার সঙ্গে কথা বলার সময় পাশে ছিলেন হাজেরা। আশ্রয়ণের ১৭ নম্বর ঘরটি তাঁর ছিল। হতাশ কণ্ঠে বললেন, ‘যখন কাটতে আসছিল, তখন চাপায়–চুপায়ে দেছে। আমরা ঘর বাঁচাতি পারিনি। শুধু টিনগুলো খুলে নিয়েছিলাম। এখন গরুর হাটের মাঠে আছি, ইজারাদারেরা উঠে যেতে বলে। এমপি পুনর্বাসনের আশ্বাস দিয়েছেন। ইউএনও একবার এসেছিলেন। পরে ডেকে নিয়ে ৩০ কেজি চাল দিয়েছেন। ওই শেষ।’ হাজেরার কথা শেষ হওয়ার আগেই আরও কয়েকজন এসে জড়ো হলেন। রাবেয়া বেগম নামের একজন বলেন, ‘আমাদের ঘর, বাথরুম কিছুই নেই। সব ভেঙে দিয়েছে। সবকিছু ভেঙেচুরে মাটির তলে। আমাদের কোনো আশ্রয় নেই। এখন কোনো পথ দেখছি না।’ চুকনগর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে কাঁঠালতলা আশ্রয়ণ প্রকল্প। আপার ভদ্রা নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা ওই আশ্রয়ণের ঘরের ওপরও মাটির স্তূপ জমেছে। সেখানে ১৩টি ঘরের ওপর এখন মাটির স্তূপ। কোনো ঘরের চাল ভেঙেছে, কোনো ঘরের দরজা-জানালা মাটিচাপা পড়েছে। আবার কোনোটির দেয়াল মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৩টি ঘরের বেশির ভাগেই এখন কেউ থাকছেন না। কাঁঠালতলা আশ্রয়ণের ক্ষতিগ্রস্ত ৭০ নম্বর ঘরের বাসিন্দা তানিয়া বেগম বলেন, ‘কোরবানির ঈদের পর এই অবস্থা হয়েছে। আগেও মাটির স্তূপ ছিল, তবে ঘরের এত ক্ষতি হয়নি। এখন টিনের চালে মাটি উঠে গেছে, বারান্দা ভেঙে পড়েছে। এখানে ১৩টি ঘরে কেউ কেউ আছে, কেউ কেউ অন্য জায়গায় চলে গেছে। এখন সরকার যদি সাহায্য করে, তা ছাড়া আর কী করব।’ চুকনগর ও কাঁঠালতলা আশ্রয়ণ প্রকল্পের পাশাপাশি বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পেরও ২৪টি ঘর মাটিচাপা পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সম্প্রতি সেখানে ঘরের ওপর মাটি ফেলার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। শুক্লি বিবি চুকনগর আশ্রয়ণ প্রকল্পে থাকতেন। সেখানে ঘর মাটিচাপা পড়ায় কাঁঠালতলা আশ্রয়ণে মেয়ের ঘরে এসে উঠেছেন। তিনি বলেন, ‘চুকনগরে পাওয়া ঘরের সামনে শাকসবজি লাগিয়েছিলাম। ওখানে তো আর জায়গা নেই। আমার ঘর ভেঙে দিছে। কোনো চিহ্ন নেই। কাঁঠালতলায় জামাইয়ের বাড়ি আসছি। আমি এখানে থাকায় মেয়ের সংসারে অসুবিধা হচ্ছে।’ কাঁঠালতলা থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্প। সেখানেও ২৪টি ঘর মাটিচাপা পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সম্প্রতি সেখানে ঘরের ওপর মাটি ফেলার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। গত সোমবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, মাটিচাপা পড়ে ২৪টি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখান থেকে মাটি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। কেউ কেউ নিজেরাই মাটি সরিয়ে ঘর বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত ঘরগুলো মেরামতের কাজও শুরু হয়েছে। বরাতিয়া আশ্রয়ণের ৫৪ নম্বর ঘরের বাসিন্দা তপতী দাস প্রথম আলোকে বলেন, ‘তিন-চার দিন আগে মাটি ঘরের ওপর ফেলা হয়েছে। আমাদের টয়লেট বন্ধ। কেউ টয়লেট ব্যবহার করতে পারছে না। মাটির চাপে ঘরের দরজা–জানালা খোলা যাচ্ছে না। চাল ভেঙে গেছে। ঘর এখন ঠিক করে দিচ্ছে; কিন্তু বাথরুমের কোনো ব্যবস্থা হয়নি।’ স্বামী রাশেদ শেখকে সঙ্গে নিয়ে পাশের ঘরের ভেতর থেকে মাটি সরাচ্ছিলেন তহমিনা খাতুন। তিনি বলেন, ‘দুই দিন ধরে মাটি সরাচ্ছি। দেখি কতক্ষণ লাগে। ঘরের চাল, বাথরুম সব ভেঙে গেছে। এখানকার কলটা মাটির নিচে ডুবে গেছে।’ আরেক বাসিন্দা আসমা বেগম বলেন, এখানে ৪৮টি ঘরের মধ্যে ২৪টির ক্ষতি হয়েছে। এই মাটি কিনেছেন শাহজাহান জমাদ্দার নামের এক ইটভাটার ব্যবসায়ী। তিনি সময়মতো মাটি সরাননি। সেই মাটির ওপর আবার মাটি ফেলায় এ অবস্থা হয়েছে। তবে শাহজাহান জমাদ্দারের মালিকানাধীন ইটভাটার ব্যবস্থাপক কৃষ্ণপদ মণ্ডল বলেন, নদী খননের মাটি কীভাবে কেনা হয়েছে, তা শাহজাহান জমাদ্দার জানেন। বরাতিয়া প্রকল্পের পাশের মাটি তাঁদের। সেখানকার মাটি সরানো হয়েছে। অল্প কিছু মাটি সরানো বাকি। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের বিষয়ে সেনাবাহিনী ব্যবস্থা নেবে। তিনি বলেন, আগে মাটি সরানোর পরিবেশ ছিল না। এখানে জায়গা কম। এ জন্য মাটি সরাতে একটু সময় লেগেছে। বরাতিয়া প্রকল্পের একটু সামনে এগিয়ে গিয়ে দেখা গেল, ক্ষতিগ্রস্ত একটি ঘর মেরামতের কাজ চলছে। ঘরটি ইমন ধরের। তিনি বলেন, ‘চার-সাড়ে চার বছর ধরে এখানে আছি। গাঙ কাটার সময় এখানে মাটি পড়ে উঁচু ছিল। পরে আবার মাটি তুলেছে। তখন ঘরের ক্ষতি হয়েছে। এখন ঠিকাদারের লোক ঠিক করে দিচ্ছে।’ ঘর মেরামতের কাজ করা আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘এখানে যে কয়টা ঘর নষ্ট হয়েছে, সব ঠিক করা হবে। আজ দুপুরে আমরা কাজ শুরু করেছি।’ এ বিষয়ে ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সবিতা সরকার প্রথম আলোকে বলেন, নদী খননের প্রকল্পটি যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তত্ত্বাবধানে সেনাবাহিনী বাস্তবায়ন করছে। বরাতিয়ায় আশ্রয়ণের ঘরের পাশে যে মাটি ফেলা হয়েছে, তিনি নিজে গিয়েছেন। পাউবোর যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা হয়েছে। ইতিমধ্যে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাধানে মাটি সরানো শুরু হয়েছে। কারও ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হলে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে বলে পাউবো জানিয়েছে। কাঁঠালতলা আশ্রয়ণের বিষয়ে ইউএনও বলেন, ‘যশোর পাউবো সব বিষয়ে অবগত আছে এবং ব্যবস্থা নিচ্ছে।’ চুকনগরের বিষয়ে বলেন, ‘চুকনগরে আমরা কয়েকবার গিয়েছি। তাঁদের কেউ গরুর হাটের মাঠে আছেন, কেউ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় অন্য জায়গায় চলে গেছেন। নতুন করে পুনর্বাসনের বিষয়টি সময়সাপেক্ষ। আমাদের কিছু আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর ফাঁকা পড়ে আছে। সেখানে সাময়িকভাবে তাঁদের থাকার অনুরোধ করলেও তাঁরা রাজি হননি। নতুন করে তাঁদের পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে। আমরা এসব বিষয় কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য লিখেছি।’ পুনর্বাসন না করে ঘরের ওপর মাটি ফেলা হলো কেন—প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা নিয়ে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বললে ভালো হয়।’ এ বিষয়ে জানতে পাউবো যশোর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পাউবোর যশোর কার্যালয় সূত্র জানায়, কপোতাক্ষ নদের জলাবদ্ধতা দূরীকরণ প্রকল্পের (দ্বিতীয় পর্যায়) আওতায় সেনাবাহিনী ছয়টি নদী পুনঃখননের কাজ করছে। এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩৯ কোটি ৯৮ লাখ ১৯ হাজার টাকা। প্রকল্পের আওতায় অভয়নগরের ভবদহ ২১-ভেন্ট স্লুইসগেট থেকে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার কাশিমপুর পর্যন্ত হরি নদের ১৫ কিলোমিটার, কাশিমপুর থেকে কুলবাড়িয়া পর্যন্ত তেলিগাতী নদীর ৫ কিলোমিটার, যশোরের মনিরামপুর উপজেলার বাকোশপোল থেকে কেশবপুর উপজেলার বরেঙ্গা পর্যন্ত হরিহর নদের ৩৫ কিলোমিটার, কেশবপুর উপজেলার বরেঙ্গা থেকে কাশিমপুর পর্যন্ত আপার ভদ্রা নদীর ১৮ দশমিক ৫০ কিলোমিটার, অভয়নগর উপজেলার গোঘাটা থেকে ভবদহ ২১-ভেন্ট স্লুইসগেট পর্যন্ত টেকা নদীর ৭ কিলোমিটার এবং মনিরামপুর উপজেলার লেহালপুর বাজার এলাকায় শ্রী নদীর ১ কিলোমিটার পুনঃখনন করা হচ্ছে। আগামী বছরের জুন মাসে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা। নদী কাটার পর সেনাবাহিনীর কাছ থেকে নকশা অনুযায়ী কাজ বুঝে নেওয়া হবে। নদীর সীমানা নির্ধারণ করেছে সেনাবাহিনী। সেই অনুযায়ী নদী খননের কাজ চলছে। কপোতাক্ষ নদের জলাবদ্ধতা দূরীকরণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ও পাউবো যশোর পানি উন্নয়ন সার্কেল খুলনার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বি এম আবদুল মোমিনের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। ফলে তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।