সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে সরকারের অভ্যন্তরীণ পুঞ্জীভূত ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৫৩ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের এই পরিসংখ্যান সাড়ে ১১ লাখ কোটি টাকার রেকর্ড সীমা অতিক্রম করল। এক বছরে ঋণ বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারের পুঞ্জীভূত অভ্যন্তরীণ ঋণ ছিল ১০ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার ঋণ করেছে ১ লাখ ৩১ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত অর্থবছরে ব্যাংকব্যবস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার ঋণ করেছে ১ লাখ ৩১ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা। এ সময়ে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু সরকার এ সময় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৬ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা বেশি ঋণ নেয়। ফলে অর্থবছর শেষে সরকারের পুঞ্জীভূত অভ্যন্তরীণ ঋণ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে যায়।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকের সম্পদের মান যাচাই, মূলধন ঘাটতি মোকাবিলা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদারে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত এবং বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ স্বাভাবিক করতে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে আগামী মার্চ-এপ্রিলের মধ্যে ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার দৃশ্যমান উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান বুধবার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) আয়োজনে ১১তম বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলন (এবিসি) ২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন। এছাড়া বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের ডিভিশন ডিরেক্টর জন পিসুমে, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান মো. আবদুল হাই সরকার এবং সিটি ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ লিমিটেডের (এবিবি) চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর বলেন, সংকট মোকাবিলায় প্রথম পর্যায়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠন, বকেয়া বৈদেশিক দায় পরিশোধ এবং বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রায় ছয় মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সমপরিমাণ রিজার্ভ গড়ে তোলার লক্ষ্যও অর্জিত হয়েছে। তিনি বলেন, বৈশ্বিক আর্থিক সংকট ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশেও আর্থিক স্থিতিশীলতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ব্যাংকিং খাতের সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা নিরূপণ এবং আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে ইতোমধ্যে ১৫টি ব্যাংকে সম্পদের গুণগত মান পর্যালোচনা সম্পন্ন হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় এ কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩৬ শতাংশ, যা বর্তমানে ৩১ শতাংশে নেমেছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এ হার আরও কমবে আশা প্রকাশ করে অর্থঋণ আদালত আইন এবং নতুন বিশেষ সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন এ ক্ষেত্রে সহায়ক হবে বলে মত দেন তিনি। মূলধন ঘাটতিতে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধারও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্যতম অগ্রাধিকার। এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা গেলে আগামী বছরের মার্চ-এপ্রিলের মধ্যে ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার উন্নতি দৃশ্যমান হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ২০০৮ সালে বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের সময় যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তারল্য সহায়তা এবং সরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশেও ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের পর ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্বাস্থ্য, সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে দেওয়া, ব্যবস্থাপনাকে জবাবদিহির আওতায় রাখা এবং ঝুঁকি ও পরিপালন বিভাগকে কার্যকর ক্ষমতা দেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি। তিনি ঋণ অনুমোদনে প্রভাব বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের পরিবর্তে ঋণগ্রহীতার পরিশোধ সক্ষমতা, নগদ প্রবাহ ও ব্যবসার বাস্তব সম্ভাবনা বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে ঋণের সঠিক শ্রেণীকরণ, পর্যাপ্ত প্রভিশন সংরক্ষণ এবং মূলধন পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি আরও বলেন, ব্যাংকগুলোর তারল্য ও মূলধন ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে নিয়মিত স্ট্রেস টেস্ট করতে হবে। রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়া, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, বিনিময় হারের পরিবর্তন এবং আমানত প্রত্যাহারের চাপ একসঙ্গে মোকাবিলায় ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা যাচাই জরুরি। সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল জালিয়াতি প্রতিরোধ এবং গ্রাহকসেবা অব্যাহত রাখার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। ব্যাংক পুনর্গঠন ও দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনায় একটি ‘ব্যাংক পুনর্গঠন ও রেজল্যুশন তহবিল’ গঠনের উদ্যোগের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে সরকারি অর্থের ওপর নির্ভরতা না বাড়িয়ে কার্যকর ও ব্যয়সাশ্রয়ী উপায়ে দুর্বল ব্যাংকের সমস্যা মোকাবিলার সুযোগ তৈরি হবে। আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থায় পরিবর্তনের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, কর্মদক্ষতাভিত্তিক ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা এবং নগদবিহীন লেনদেন সম্প্রসারণেও কাজ চলছে। বিইএফটিএন, আরটিজিএস, এনপিএসবি ও বাংলা কিউআরের পাশাপাশি আগামী বছর অন্তর্ভুক্তিমূলক পেমেন্ট ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি জানান, মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে আর্থিক ব্যবস্থার ভেতরে বিদ্যমান সম্পদ ও অর্থায়নের ভারসাম্য পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্যাকেজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ রয়েছে।
দেশের রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করতে আগামী ১৫ থেকে ১৭ নভেম্বর দ্বিতীয়বারের মতো ‘গ্লোবাল সোর্সিং এক্সপো’ আয়োজন করতে যাচ্ছে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)। রাজধানীর পূর্বাচলে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী প্রদর্শনী কেন্দ্রে (বিসিএফইসি) তিন দিনব্যাপী এ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে। ইপিবি’র ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত সচিব) মোহাম্মদ হাসান আরিফ আজ রাজধানীর একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় ইপিবি আয়োজিত এ প্রদর্শনীতে দেশি-বিদেশি উৎপাদক, রপ্তানিকারক, আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও বাণিজ্য প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। এতে বিভিন্ন ধরনের পণ্য ও সেবা উৎপাদনে বাংলাদেশের সক্ষমতা তুলে ধরা হবে। এবারের প্রদর্শনীতে রপ্তানিমুখী ১২টি খাতের ২০০টির বেশি স্টল থাকবে। গত বছর প্রথমবারের আয়োজনে আটটি খাতের পণ্য প্রদর্শিত হয়েছিল। তৈরি পোশাকশিল্পের বাইরে অন্যান্য খাতেও রপ্তানি সম্প্রসারণে সরকারের গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি এ উদ্যোগে প্রতিফলিত হয়েছে। হাসান আরিফ বলেন, এ প্রদর্শনী বাংলাদেশের উৎপাদকদের সঙ্গে বিদেশি ক্রেতাদের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি করবে। বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং জ্বালানি নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের রপ্তানি সম্ভাবনা নিয়ে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, প্রতিকূল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির মধ্যেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয় ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। এটি দেশের রপ্তানিকারক ও উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা ও দৃঢ়তার পরিচায়ক। এ প্রদর্শনীর মাধ্যমে উৎপাদকরা নতুন ব্যবসার সুযোগ খুঁজে পাবেন, অধিক মূল্য সংযোজিত পণ্য তুলে ধরতে পারবেন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে। দ্বিতীয়বারের এ আয়োজনে তৈরি পোশাক ও বস্ত্র, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হস্তশিল্প ও পাটজাত পণ্য, প্লাস্টিক পণ্য ও রান্নাঘরের সামগ্রী, আসবাব ও গৃহসজ্জা, ওষুধ, কৃষি ও কৃষিপ্রক্রিয়াজাত পণ্য, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, কাগজ ও মোড়কজাতকরণ, মোটরযান, হালকা প্রকৌশল এবং সিরামিক ও টেবিলওয়্যার খাতের পণ্য প্রদর্শিত হবে। এ সম্প্রসারিত আয়োজনের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিল্পভিত্তির বৈচিত্র্য তুলে ধরা এবং প্রচলিত রপ্তানি পণ্যের বাইরেও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রথমবারের প্রদর্শনীতে ১২৫টি প্রতিষ্ঠান ১৬৪টি স্টল নিয়ে অংশ নিয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এবার স্টলের সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছে ইপিবি। ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা যেখানে সাধারণ ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের জন্যও উন্মুক্ত, সেখানে বৈশ্বিক পণ্য সংগ্রহ প্রদর্শনীটি মূলত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগ (বি-টু-বি) বাড়ানোর লক্ষ্যে আয়োজন করা হচ্ছে। এর প্রধান উদ্দেশ্য দেশীয় উৎপাদকদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক আমদানিকারক, পণ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক অংশীদারের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করা। এ প্ল্যাটফর্মে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের পণ্য প্রদর্শন, পণ্যের ধরন ও মূল্য নিয়ে আলোচনা, সরবরাহের ব্যবস্থা নির্ধারণ এবং বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সহযোগিতার সুযোগ খুঁজতে পারবে। এছাড়াও, বৈশ্বিক পণ্য সংগ্রহ প্রদর্শনীর পর আগামী ১৮ ও ১৯ নভেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে বাংলাদেশ অ্যাপারেল অ্যান্ড টেক্সটাইল এক্সপোজিশন (ব্যাটেক্সপো)। হাসান আরিফ বলেন, পরপর দুটি আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর আয়োজনের ফলে বিদেশি ক্রেতারা এক সফরেই বাংলাদেশের একাধিক রপ্তানিমুখী খাত পরিদর্শনের সুযোগ পাবেন। এতে তাদের অংশগ্রহণ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। এ ব্যবস্থা ক্রেতাদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, ব্যবসায়িক যোগাযোগ সম্প্রসারণ এবং বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের প্রচারমূলক কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে সহায়তা করবে। বৈশ্বিক পণ্য সংগ্রহ প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়া আন্তর্জাতিক ক্রেতারা পরবর্তী সময়ে ব্যাটেক্সপোতে দেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্পের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার আগে অন্যান্য উৎপাদন খাতের পণ্যও দেখার সুযোগ পাবেন। একই সফরে একাধিক প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়ার সুযোগ বিদেশি পণ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্য প্রতিনিধিদের বাংলাদেশ সফরকে আরও সুবিধাজনক করবে বলে আশা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের অংশগ্রহণ উৎসাহিত করতে নিবন্ধিত বিদেশি প্রতিনিধিদের জন্য আবাসন ও বিমানভাড়ায় বিশেষ সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে ইপিবি। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, নিবন্ধিত বিদেশি প্রতিনিধিরা ঢাকার অংশগ্রহণকারী পাঁচ তারকা হোটেলগুলোতে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় পেতে পারেন। এ ছাড়া জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা ও বেসরকারি বাংলাদেশি বিমান সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে মূল বিমানভাড়ায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের জন্য অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে ডিজিটাল ব্যবসায়িক যোগাযোগ স্থাপনের ব্যবস্থাও গড়ে তুলছে ইপিবি। এর মাধ্যমে বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশে আসার আগেই প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য জানতে এবং ব্যবসায়িক বৈঠকের সময় নির্ধারণ করতে পারবেন। আগাম বৈঠকের এ ব্যবস্থা প্রদর্শনীতে ক্রেতাদের সময়ের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করবে এবং অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্ভাব্য ক্রেতা শনাক্ত করতে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ ছাড়া আগ্রহী ক্রেতাদের জন্য কারখানা পরিদর্শনের ব্যবস্থা থাকবে। এর মাধ্যমে তারা ওষুধ ও তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন খাতের উৎপাদনব্যবস্থা সরেজমিনে দেখতে পারবেন। কারখানা পরিদর্শনের সুযোগ সম্ভাব্য আমদানিকারকদের উৎপাদনপ্রক্রিয়া, পণ্যের গুণগত মান এবং চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা যাচাই করতে সহায়তা করবে। পণ্য প্রদর্শন ও ব্যবসায়িক বৈঠকের পাশাপাশি তিন দিনব্যাপী এ আয়োজনে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে-এমন বিভিন্ন বাণিজ্যনীতি বিষয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। সেমিনারে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ-পরবর্তী প্রস্তুতি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) প্রস্তুতি, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তিসহ (ইপিএ) বিভিন্ন অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি, যুক্তরাজ্যের উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বাণিজ্য কর্মসূচি (ডিসিটিএস) এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের বিষয়গুলো আলোচনায় আসবে। বাজারে প্রবেশাধিকার, বাণিজ্য সুবিধা, নিয়ন্ত্রক শর্ত এবং পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে এসব সেমিনারে আলোচনা হবে। নতুন বাজারে প্রবেশ এবং বিদ্যমান বাজারে অবস্থান সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের শর্ত ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড সম্পর্কে রপ্তানিকারকদের সচেতনতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি জোরদার করার বিষয়েও নীতিনির্ধারক, রপ্তানিকারক ও বাণিজ্য প্রতিনিধিরা মতবিনিময়ের সুযোগ পাবেন। প্রদর্শনীতে বিদেশি প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ বাড়াতে ঢাকায় অবস্থিত বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক মিশন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য উন্নয়ন সংস্থা, যৌথ বাণিজ্য চেম্বার এবং ক্রেতা সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে ইপিবি। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ইউরোপের পর্তুগাল, ফ্রান্স, স্পেন ও যুক্তরাজ্য, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও আফগানিস্তান এবং আমেরিকা অঞ্চলের আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল থেকে সম্ভাব্য প্রতিনিধিদলের প্রাথমিক ইতিবাচক সাড়া ও অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে। এসব দেশের ক্রেতা ও ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের নতুন বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলা, ক্রেতাদের চাহিদা সম্পর্কে ধারণা লাভ এবং নতুন রপ্তানি বাজার চিহ্নিত করার সুযোগ সৃষ্টি করবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থা ও ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ দেশীয় উৎপাদকদের সঙ্গে বিদেশি পণ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর যোগাযোগ বাড়াতেও সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতা ও রপ্তানি সম্ভাবনা তুলে ধরতে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমকে প্রদর্শনীটির ব্যাপক প্রচারের আহ্বান জানান হাসান আরিফ। বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি ভিত্তি সম্প্রসারণ, তৈরি পোশাকবহির্ভূত খাতের অবদান বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা জোরদারের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হচ্ছে। বিভিন্ন শিল্পখাতকে একটি বিশেষায়িত পণ্য সংগ্রহের প্ল্যাটফর্মে একত্র করার মাধ্যমে ইপিবি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানো এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধির নতুন সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়েছে। অনুষ্ঠানে ইপিবির মহাপরিচালক-১ মোহাম্মদ শাফায়াত উল্লাহ বক্তব্য দেন। ইপিবির মেলা ও প্রদর্শনী বিভাগের পরিচালক (উপসচিব) মো. ওয়ারেস হোসেন অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন।
আগামী ১৫ বছরে এশিয়ার জ্বালানি খাতে বছরে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে। সেই হিসাবে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ১৫ ট্রিলিয়ন ডলার। শিল্পায়ন, ডেটা সেন্টারের সম্প্রসারণ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার তাগিদে এ বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ম্যাককিনজি প্রকাশিত বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, ২০৪০ সাল পর্যন্ত বিশ্বে নিট জ্বালানি চাহিদা যতটা বাড়বে, তার প্রায় ৭০ শতাংশ আসবে এশিয়া থেকে। ২০৪০ সালে এ অঞ্চলের জ্বালানি চাহিদা দাঁড়াতে পারে এক বছর আগের পূর্বাভাসের চেয়ে ১৫ শতাংশ বেশি। চাহিদা বাড়লেও এশিয়ার জ্বালানি রূপান্তর সহজ হবে না। সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ছে, কিন্তু বিদ্যুৎ ও শিল্পের চাহিদা মেটাতে কয়লার ব্যবহারও দীর্ঘ সময় গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। একই সঙ্গে তেল ও গ্যাস আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানোর চাপ বাড়ছে। ম্যাককিনজির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এশিয়ার প্রাথমিক জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় ৪৭ শতাংশ কয়লা থেকে আসে। তেলের হিস্যা ২৫ শতাংশ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের ১২ শতাংশ। চীনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণে কয়লার চাহিদা কমার সম্ভাবনা থাকলেও ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাড়তি চাহিদা আঞ্চলিকভাবে কয়লার ব্যবহারকে দীর্ঘ সময় ধরে রাখতে পারে। আগামী এক দশকে এশিয়ায় কয়লার চাহিদা মোটামুটি স্থিতিশীল থাকার পূর্বাভাস দিয়েছে ম্যাককিনজি। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সৌরশক্তির উত্থান স্পষ্ট। গবেষণা প্রতিষ্ঠান কার্বন ব্রিফের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ১২ মাসে এশিয়ায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন দাঁড়ায় ১ হাজার ৭২৭ টেরাওয়াট-ঘণ্টা। একই সময়ে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ১ হাজার ৭১১ টেরাওয়াট-ঘণ্টা। এর মধ্য দিয়ে এশিয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের তৃতীয় বৃহত্তম উৎস হয়ে ওঠে সৌরশক্তি। এ প্রবৃদ্ধির বড় চালিকা শক্তি চীন; ভারত ও পাকিস্তানেও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে বিনিয়োগও বাড়াতে হবে। ম্যাককিনজির হিসাবে, এশিয়ায় সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ অবকাঠামো গড়ে তুলতে বছরে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে। ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এ বিনিয়োগের বড় অংশ যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় কমার পাশাপাশি ব্যাটারিতে বিদ্যুৎ সংরক্ষণের প্রযুক্তিও সস্তা হচ্ছে। ফলে সূর্যালোক বা বাতাস না থাকলেও বিদ্যুৎ সরবরাহ ধরে রাখার সুযোগ বাড়ছে। প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা বৃদ্ধির গতি অবশ্য আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরে কমতে পারে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে কিছু দেশ কয়লা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে শিল্প খাতে তেল ও কয়লার বিকল্প হিসেবে গ্যাসের ব্যবহার বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে ম্যাককিনজি। জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে জৈব জ্বালানিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ম্যাককিনজির হিসাবে, ২০৪০ সালের মধ্যে এশিয়ায় জৈব জ্বালানির ব্যবহার বাড়িয়ে বছরে ৯০ থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হতে পারে। ভারত পেট্রলে ইথানল মেশানোর কর্মসূচি সম্প্রসারণ করছে। আর বিশ্বের বৃহত্তম পাম তেল উৎপাদক ইন্দোনেশিয়া ডিজেলের সঙ্গে পাম তেলভিত্তিক জৈব জ্বালানি মেশানোর উদ্যোগ নিয়েছে। দেশটি ৫০ শতাংশ জৈব ডিজেল মিশ্রণের লক্ষ্যে এগোচ্ছে। তবে জৈব জ্বালানির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে কাঁচামালের জোগান, উৎপাদন ব্যয় এবং খাদ্য ও জ্বালানির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জও রয়েছে। এশিয়ার জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের প্রয়োজন তাই শুধু উৎপাদন বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমদানিনির্ভরতা কমানো, সরবরাহব্যবস্থাকে ঝুঁকিমুক্ত করা এবং বাড়তে থাকা চাহিদা মেটানোও এর লক্ষ্য। কয়লা, গ্যাস ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে তৈরি হবে, তার ওপরই নির্ভর করবে এশিয়ার জ্বালানি রূপান্তরের গতি। সূত্র: ম্যাককিনজি, রয়টার্স ও অয়েলপ্রাইসডটকম।