রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও জাতীয় সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীদের অনুকূলে আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্স ও রিটেইনার নিয়োগ নীতিমালা, ২০২৫ প্রকাশ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সোমবার রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনি এতে স্বাক্ষর করেন।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখা এবং নির্বাচনকালীন সহিংসতা প্রতিরোধের লক্ষ্যে রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও জাতীয় সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীদের অনুকূলে আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্স ও রিটেইনার নিয়োগের জন্য এই নীতিমালা প্রণয়ন ও জারি করা হয়েছে।
নীতিমালা অনুযায়ী, একজন রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা পদপ্রার্থীর জন্য সর্বোচ্চ একজন রিটেইনার নিয়োগ করা যাবে। নির্ধারিত মেয়াদ শেষে রিটেইনারের নিয়োগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে।
লাইসেন্সপ্রাপ্তির যোগ্যতা
ক) সরকার কর্তৃক স্বীকৃত রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হতে হবে।
খ) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য মনোনয়নপত্র দাখিল করতে হবে।
গ) উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে গোয়েন্দা সংস্থা) কর্তৃক যাচাইকৃত নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকতে হবে।
ঘ) শারীরিক ও মানসিকভাবে সক্ষম হতে হবে।
ঙ) আগ্নেয়াস্ত্র সংরক্ষণের জন্য নিরাপদ ব্যবস্থা থাকতে হবে।
চ) এই নীতিমালার অধীনে লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারিকৃত অন্যান্য নীতিমালা ও বিধান প্রযোজ্য হবে। তবে ব্যক্তিগত আয়কর প্রদানের শর্ত শিথিলযোগ্য থাকবে।
লাইসেন্সের মেয়াদ
ক) এই নীতিমালার আওতায় অনুমোদিত লাইসেন্সের মেয়াদ নির্বাচন ফলাফল ঘোষণার তারিখ থেকে পরবর্তী ১৫ দিন পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। উক্ত সময় অতিক্রান্ত হলে লাইসেন্স স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল বলে গণ্য হবে। তবে অন্যান্য শর্ত পূরণ সাপেক্ষে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই সাময়িক লাইসেন্সকে সাধারণ লাইসেন্সে রূপান্তর করতে পারবে।
খ) লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বা লাইসেন্স বাতিল হলেও কোনো ব্যক্তি আগ্নেয়াস্ত্র নিজ দখলে রাখলে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
রিটেইনার নিয়োগের শর্ত
১) কেবল প্রকৃত নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকলে রিটেইনার নিয়োগ অনুমোদনযোগ্য হবে।
২) রাজনৈতিক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার বা ভয়ভীতি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে রিটেইনার নিয়োগ বা অনুমোদন দেওয়া যাবে না।
৩) কোনো রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা পদপ্রার্থী লাইসেন্সপ্রাপ্তির যোগ্য হলেও আগ্নেয়াস্ত্র ক্রয়ে অসমর্থ বা অনিচ্ছুক হলে, বৈধ লাইসেন্সধারী ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারে সক্ষম এবং রিটেইনার হিসেবে কাজ করতে ইচ্ছুক কোনো ব্যক্তিকে আগ্নেয়াস্ত্রসহ রিটেইনার হিসেবে নিয়োগ দিতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন বাধ্যতামূলক হবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এবং দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের তাৎপর্যপূর্ণ মোড় বলে মন্তব্য করেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যেমন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করেছে, তেমনি ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরও দেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। জাতীয় ইতিহাসের এসব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকে সুস্পষ্ট ধারণা দিতে হবে। এজন্য ইতিহাসচর্চা ও পাঠ্যবইয়ে যথাযথ আলোচনা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। আজ রাজধানীর মোহাম্মদপুরে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ আয়োজিত বার্ষিক সাংস্কৃতিক ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাস কোনো নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর ইতিহাস নয়; এটি আমাদের দেশের, আমাদের জাতির এবং আমাদের পরিচয়ের ইতিহাস। আন্তর্জাতিক পরিম-লে একজন বাংলাদেশির প্রথম পরিচয় বাংলাদেশ। তাই নিজের দেশ, দেশের জন্ম, ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানা প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব। নতুন প্রজন্ম যেন দেশের ইতিহাস সম্পর্কে আরও ভালোভাবে জানতে পারে, সে লক্ষ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সন্তানদের ভালোবাসা ও সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি করতে হবে। অতিরিক্ত সুরক্ষার নামে শিশুদের স্বাভাবিক খেলাধুলা, বাইরের পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ সীমিত করা উচিত নয়। শিশুদের সুস্থ বিকাশে খেলাধুলা, প্রকৃতির সংস্পর্শ এবং সামাজিক পরিবেশের সঙ্গে মেলামেশা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরও বলেন, সন্তানদের ভবিষ্যৎ গঠনে অভিভাবকদের পাশাপাশি শিক্ষকদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের মেধা, সৃজনশীলতা ও নিজস্ব চিন্তার বিকাশে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ জিয়াউল আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মোহাম্মদপুর থানা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও থানা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। এ সময় কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। এর আগে তিনি গাউসিয়া ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা আয়োজিত জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ শনিবার সকাল সাড়ে ৯টায় রাজধানীর বনানীর আর্মি স্টেডিয়ামে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে যোগ দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব শাহরিয়ার পামির এ তথ্য জানান। তিনি জানান, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় এবং সশস্ত্র বাহিনীর তত্ত্বাবধানে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানের বিশেষ প্রদর্শনীতে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেটকোরের (বিএনসিসি) ৩ হাজার ক্যাডেট এবং বাংলাদেশ স্কাউটসের ৫০০ সদস্য অংশ নিচ্ছেন। অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা, মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবৃন্দ, সংসদ সদস্য, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক ও রাষ্ট্রদূতরা উপস্থিত রয়েছেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর একটি বহুল আলোচিত ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন। স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায় একের পর এক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, সামরিক অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও রাষ্ট্রীয় অস্থিরতায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ। সেই উত্তাল ও অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান দেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের মধ্য দিয়েই জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। তিনি হয়ে ওঠেন এই অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান ও কেন্দ্রীয় চরিত্র। সেদিনের ঘটনাপ্রবাহকে আধিপত্যবাদ, ষড়যন্ত্র ও সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে সিপাহি-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এই পটপরিবর্তনের পর খাদের কিনারায় থাকা দেশের রাজনীতিতে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়। ১৯৭৫ সালটি বাংলাদেশের ইতিহাসে গভীর সংকটের প্রতীক। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ, দুর্ভিক্ষ, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক বিরোধের কারণে রাষ্ট্র পরিচালনায় তৈরি হয়েছিল নানা সংকট। এর চূড়ান্ত ও মর্মান্তিক পরিণতি দেখা যায় ১৫ আগস্ট। এদিন শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। এই কলঙ্কজনক ঘটনার মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। তবে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে তৈরি হয় চেইন অব কমান্ডের চরম সংকট, মতবিরোধ ও ক্ষমতার তীব্র দ্বন্দ্ব। অস্থিরতার ধারাবাহিকতায় ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে ঘটে আরেকটি সামরিক অভ্যুত্থান। এ সময় সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে গৃহবন্দি করা হয়। সেনাসদস্যদের মধ্যে এ খবর ছড়িয়ে পড়লে সেনানিবাসের ভেতরে নতুন করে উত্তেজনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ৩ নভেম্বর থেকে ৭ নভেম্বর-এই চার দিনের রুদ্ধশ্বাস ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর ভোরে ঢাকা সেনানিবাসে শুরু হয় সিপাহিদের বিদ্রোহ। সেনাবাহিনীর বিভিন্ন স্তরের সদস্যদের মধ্যে পুঞ্জীভূত অসন্তোষ, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এই বিদ্রোহের পটভূমি তৈরি করেছিল। বিদ্রোহী সৈনিকরা গৃহবন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত করেন জিয়াউর রহমানকে। মুহূর্তেই বদলে যায় পরিস্থিতি। সেনাবাহিনীর সাধারণ সদস্যদের পাশাপাশি রাজপথে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে ঘটনাটি রূপ নেয় ‘সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানে’। ঢাকার রাজপথে বেরিয়ে আসে সৈনিকদের ট্যাঙ্ক ও ট্রাকের বহর। সাধারণ মানুষের উল্লাস ও স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে রাজধানী। কেন কেন্দ্রীয় চরিত্রে জিয়াউর রহমান? ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহে জিয়াউর রহমান হয়ে ওঠেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কেন্দ্রীয় চরিত্র। তিনি তখন দেশের সেনাপ্রধান। ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পর তাকে গৃহবন্দি করে রাখার বিষয়টি সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে অসন্তোষের জন্ম দেয়। বিশ্লেষকদের মতে, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা রক্ষার প্রশ্নে জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন জনপ্রিয় ও দৃঢ়চেতা সামরিক কর্মকর্তা। তার মুক্তির মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার সমীকরণে পরিবর্তন আসে। একই সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনায় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার নতুন পথ তৈরি হয়। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে আবির্ভূত হন জিয়াউর রহমান। বীর মুক্তিযোদ্ধা থেকে রাষ্ট্রনায়কের আসনে জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থান আকস্মিক কোনো ঘটনা ছিল না। এর শিকড় প্রোথিত ছিল ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে। ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর অপারেশন সার্চলাইটের পর তিনি বিদ্রোহ করেন এবং চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করে আলোচনায় আসেন। মুক্তিযুদ্ধে জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত হন। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের পর জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক অবস্থান দ্রুত শক্তিশালী হতে থাকে। তবে তিনি সেদিনই সরাসরি রাষ্ট্রপতি হননি। তৎকালীন বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। জিয়াউর রহমানসহ তিন বাহিনীর প্রধানকে উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ধীরে ধীরে রাষ্ট্রক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ তার হাতে কেন্দ্রীভূত হতে থাকে। ১৯৭৬ সালের ১৯ নভেম্বর তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরে ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল বিচারপতি সায়েম পদত্যাগ করলে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। বিএনপি প্রতিষ্ঠা ও নতুন রাজনৈতিক ধারার সূচনা রাষ্ট্রক্ষমতা সুসংহত করার পর জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ নেন। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’কে রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে সামনে রেখে তিনি নতুন একটি রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলেন। তার শাসনামলে দেশের অর্থনীতিতে বেশ কিছু পরিবর্তন আসে। মুক্তবাজার অর্থনীতি, বেসরকারি খাতের বিকাশ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাল খনন কর্মসূচি এবং বৈদেশিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের ওপর তিনি গুরুত্ব দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আলমগীর হোসেন সম্রাট বলেন, ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হন। তবে তার প্রতিষ্ঠিত বিএনপি আজও দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে টিকে আছে। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর কেবল একটি দিন নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিচয়ের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদল। বাস্তবতাকে অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহই জিয়াউর রহমানের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। গৃহবন্দি এক সেনাপ্রধান থেকে তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন রাষ্ট্রক্ষমতার সবচেয়ে শক্তিশালী ও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে। বাংলাদেশের ইতিহাসে ৭ নভেম্বর ও জিয়াউর রহমান তাই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়েই থাকবেন। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সিপাহি-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে দেশকে গভীর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সংকট থেকে উত্তরণের একটি নতুন পথ তৈরি হয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তিনি বলেন, ‘জিয়াউর রহমান শুধু একজন সেনা কর্মকর্তা ছিলেন না, তিনি ছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন বীর সেনানায়ক। স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধে তার সাহসী ভূমিকা জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ তার নেতৃত্বকে জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে আসে।’ তিনি আরও বলেন, ৭ নভেম্বরের প্রকৃত ইতিহাস নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা অত্যন্ত জরুরি। এই দিনটি আমাদের জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও জাতীয় ঐক্যের চেতনার সঙ্গে জড়িত। শহীদ জিয়াউর রহমানের অবদান কোনো রাজনৈতিক বিতর্ক দিয়ে মুছে ফেলা যাবে না। শামসুজ্জামান দুদু বলেন, আজকের প্রজন্মকে জানতে হবে, কী প্রেক্ষাপটে ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছিল এবং কীভাবে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ইতিহাসের যথাযথ মূল্যায়নের মধ্য দিয়েই আমরা তার অবদান স্মরণ করতে চাই।