সিঅ্যান্ডএফ (ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং) এজেন্ট লাইসেন্স প্রদানের জন্য মৌখিক পরীক্ষার সময়সূচি প্রকাশ করেও তা স্থগিত করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এর আগে ঢাকঢোল পিটিয়ে চট্টগ্রামের একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লাইসেন্স প্রদানের জন্য প্রথমবারের মতো লিখিত পরীক্ষার আয়োজন করে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট ট্রেনিং একাডেমি (সিইভিটিএ)।
২ হাজার ৫২১ লাইসেন্সপ্রত্যাশী এই পরীক্ষায় অংশ নেন। যাদের অধিকাংশই ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী। বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীপন্থি ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিতরাও অংশ নেন পরীক্ষায়। কিন্তু ফলাফলে দেখা যায়, রাজনৈতিক পরিচয়ে অংশ নেওয়া নেতাকর্মীদের এক-দুজন ছাড়া কেউ পাস করতে পারেননি লিখিত পরীক্ষায়। ফলে পরীক্ষার পর থেকেই অদৃশ্য চাপ তৈরি হয় এনবিআরের ওপর।
নিয়মানুযায়ী পরীক্ষার দিনই ফল প্রকাশের কথা থাকলেও সময় লাগে ১৫ দিন। ১ জুন প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়, ২১০ জন পাস করেছেন। তবে তার মধ্যে দলীয় নেতাকর্মীরা নেই একেবারেই। এতেই তোলপাড় শুরু হয়। শাসক দলের একাধিক নেতাকর্মী প্রকাশিত ফলাফল নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রকাশ্যে। সবশেষ গত ১৭ জুন লিখিত পরীক্ষায় পাস করা লাইসেন্স-প্রত্যাশীদের মৌখিক পরীক্ষার নোটিস ইস্যু করে এনবিআর। ২১ থেকে ২৪ জুন পর্যন্ত চারটি ধাপে মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এই নোটিস জারির এক দিন পর ১৮ জুন অনিবার্য কারণ দেখিয়ে সেই মৌখিক পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। পাস করা লাইসেন্সপ্রত্যাশীদের ধারণা, দলীয় নেতাকর্মীদের লাইসেন্স দিতেই নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটি স্থগিত করা হয়েছে।
পরীক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আমদানি-রপ্তানি, পণ্য খালাস ও জাহাজীকরণ কার্যক্রমে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা আমদানিকারক কিংবা রপ্তানিকারকের অনুমোদিত প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের আমলে দলীয় বিবেচনায় ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপেই লোভনীয় এই কাজের লাইসেন্স দেওয়া হতো। কিন্তু সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট লাইসেন্সিং বিধিমালা-২০২৬ অনুযায়ী, লাইসেন্স দেওয়ার জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, আবেদন যাচাই-বাছাই, পরীক্ষা গ্রহণ ও লাইসেন্স দেওয়ার দায়িত্ব কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট ট্রেনিং একাডেমির (সিইভিটিএ) ওপর ন্যস্ত করা হয়, যা এই খাতে জবাবদিহিতা ফিরিয়ে আনার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে গত জানুয়ারিতে নতুন করে সিঅ্যান্ডএফ লাইসেন্স প্রদানের জন্য আবেদন আহ্বান করে এনবিআর। লাইসেন্স পেতে আবেদন করেন প্রায় সাড়ে তিন হাজার লাইসেন্সপ্রত্যাশী। যাচাই-বাছাই করে লিখিত পরীক্ষার জন্য ২৯৮৭ আবেদনকারীকে মনোনীত করা হয়। গত ১৬ মে চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই পরীক্ষার আয়োজন করা হয়। মনোনীত প্রায় তিন হাজার লাইসেন্সপ্রত্যাশীর মধ্যে ২৫২১ জন সরাসরি পরীক্ষায় অংশ নেন। ৮০ নম্বরের পরীক্ষায় পাস মার্ক নির্ধারণ করা হয় ৪০, যা অর্জন করতে পেরেছেন মাত্র ২১০ লাইসেন্সপ্রত্যাশী।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পরীক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন কাস্টমস কর্মকর্তা জানান, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও ঠিকাদাররা লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিলেও পাস করতে পারেননি কেউ। ফলে পরীক্ষার পর থেকে ফলাফলে অনৈতিক হস্তক্ষেপ শুরু হয় রাজনৈতিক মহল থেকে। একপর্যায়ে ১১০ জনের একটি তালিকাও ধরিয়ে দেওয়া হয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ঘোষণা করার জন্য। তালিকাটি এনবিআরের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা সিইভিটিএ’র কাছে পৌঁছে দিয়ে বলেন, এই ১১০ জনকে পাস করাতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের চাপ আছে। কিন্তু এনবিআরের কোনো কর্মকর্তা তালিকা পৌঁছে দিয়েছেন কিংবা সরকারের উচ্চপর্যায় বলতে কী বোঝাতে চাচ্ছেন— এমন প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর দেননি ওই কাস্টমস কর্মকর্তা।
তিনি জানান, পরীক্ষার ফলাফলে অনৈতিক হস্তক্ষেপ মেনে নেওয়া হবে না এমন সিদ্ধান্তে অটল থাকেন তারা। পরীক্ষার দিন ১৬ মে মধ্যরাতেই ফলাফল চূড়ান্ত হয়ে যায়। ২১০ জনের তালিকাসহ প্রতিবেদন তৈরি করে কমিটির ছয় সদস্য সই করেন।
বিধি অনুযায়ী, পরদিনই ফল প্রকাশ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে টানাপোড়েনের কারণে নির্ধারিত সময়ে ফলাফল প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। সবশেষ পরীক্ষা নেওয়ার ১৫ দিন পর ১ জুন বিভিন্ন গণমাধ্যমে ফলাফল না দেওয়ার বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর ২১০ জন উত্তীর্ণ লাইসেন্স প্রত্যাশীর তালিকা প্রকাশ করা হয়।
এরপর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ জানান, লাইসেন্স প্রদান পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সরকারি দলের নেতা-কর্মীরা। প্রকাশ্যে বিভিন্ন সভা সেমিনারেও ক্ষোভ জানান তারা। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আহমেদুল আলম চৌধুরী রাসেল তার ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘দীর্ঘ ১৭টা বছর মামলা, হামলা, জেল খেটে ব্যবসা বাণিজ্য ও চাকরি-বাকরি কিছুই জোটেনি দলের নেতাকর্মীদের। আজ সিঅ্যান্ডএফ লাইসেন্সে বঞ্চিত হলো অসংখ্য নেতাকর্মী। ১৭ বছর বিএনপি করার অপরাধে বঞ্চিত, এখনো বিধি ও আত্মীয়দের কারণে বঞ্চিত দলের নেতাকর্মীরা।’
চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি সৌরভ প্রিয় পাল লেখেন, ‘আওয়ামী দোসরদের লাইসেন্স দিচ্ছে অথচ আমরা রাস্তায়’। সৌরভ প্রিয় পাল জানান, পরীক্ষার পরদিন ফলাফল প্রকাশ করার কথা ছিল। কিন্তু ১৫ দিন পর ফলাফল দিয়েছে। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া বিএনপি নেতাকর্মীরা সবাই ফেল করেছেন, কিন্তু উত্তীর্ণদের মধ্যে অনেক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরাও রয়েছেন। এটা রহস্যজনক বলেই ক্ষোভ জানিয়েছেন তিনি।
পরীক্ষাসংশ্লিষ্ট কাস্টমস কর্মকর্তারা জানান, লিখিত পরীক্ষার ফলাফলে অনৈতিক হস্তক্ষেপের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর থেকে নতুন লাইসেন্স প্রদানের এই প্রক্রিয়া বন্ধ করতে উঠে পড়ে লাগে প্রভাবশালী একটি চক্র। গত বৃহস্পতিবার এনবিআরের কাস্টমস মামলা ও বিরোধ নিষ্পত্তি শাখা থেকে ‘অনিবার্য কারণ’ দেখিয়ে মৌখিক পরীক্ষা স্থগিতের নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে স্থগিতাদেশের সুনির্দিষ্ট কারণ জানানো হয়নি। তার দাবি, বিধিমালায় এনবিআরের পক্ষ থেকে পরীক্ষার তারিখ পরিবর্তন করার এখতিয়ার থাকলেও স্থগিত করার কোনো বিধান নেই।
তিনি জানান, ‘বিধিমালা অনুযায়ী ২৪ জুনের মধ্যে মৌখিক পরীক্ষা সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা ছিল। কিন্তু মৌখিক পরীক্ষার সময়সূচি প্রকাশ না করার জন্যও বিভিন্ন পর্যায় থেকে চাপ দেওয়া হচ্ছিল। সেই চাপ উপেক্ষা করে সিইভিটিএ গত ১৭ জুন মৌখিক পরীক্ষার সময়সূচি প্রকাশ করে। কিন্তু পরদিনই এনবিআর থেকে পরীক্ষা স্থগিতের নির্দেশ আসে।’
সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট লাইসেন্সিং বিধিমালা অনুযায়ী, প্রথমবারের মতো এই পরীক্ষার আয়োজন করে এনবিআর-অধীনস্থ সংস্থা সিইভিটিএ। আবেদন যাচাই-বাছাই, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, পরীক্ষা পরিচালনা ও ফল প্রকাশের জন্য ছয় সদস্যের কমিটিও গঠন করা হয়। পরীক্ষা কমিটির সদস্যদের দাবি, এনবিআরের পক্ষ থেকে পাঠানো তালিকায় এমন পরীক্ষার্থীর নামও ছিল, যারা লিখিত পরীক্ষায় ১০ নম্বরও পাননি। তাদের অন্তর্ভুক্ত না করায় পরীক্ষা স্থগিত করা হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ করছেন তারা।
পরীক্ষার আয়োজক প্রতিষ্ঠান সিইভিটিএ মহাপরিচালক ম সফিউজ্জামান জানান, ‘বিধিমালা অনুযায়ী দুই মাসের মধ্যে পরীক্ষা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কথা। আমরা সে অনুযায়ী মৌখিক পরীক্ষার সময়সূচি প্রকাশ করেছিলাম। কিন্তু এনবিআরের পক্ষ থেকে পরীক্ষাটি আপাতত স্থগিত রাখতে বলা হয়েছে। সে অনুযায়ী স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে কী কারণে স্থগিত করা নির্দেশ দেয়া হয়েছে তা তিনি জানেন না।
এনবিআরের এমন এখতিয়ার আছে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সিনিয়র কর্মকর্তারা কোনো নির্দেশনা দিলে সেটার এখতিয়ার তার আছে কি না এমন প্রশ্ন করার অধিকার জুনিয়র কর্মকর্তাদের নেই। তবে এনবিআর যখন এমন নির্দেশনা দিয়েছে, সেটা বিচার বিবেচনা করেই দিয়েছে।
পরীক্ষার ফলাফলে কোনো রাজনৈতিক চাপ ছিল কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে সিইভিটিএ’র মহাপরিচালক জানান, তার ওপর এমন কোনো রাজনৈতিক চাপ ছিল না। এমনকি পরীক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তার অধীনস্ত কর্মকর্তারাও কেউ এমন অভিযোগ তার কাছে করেননি। ১১০ জনের যে তালিকার কথা বলা হচ্ছে, এই বিষয়েও তার কিছু জানা নেই বলে জানান।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে বক্তব্য চেয়ে এসএমএস পাঠালেও সাড়া মেলেনি।
চট্টগ্রাম সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাইফুল ইসলাম জানান, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের তালিকাভুক্ত প্রায় তিন হাজার সিঅ্যান্ডএফ লাইসেন্স আছে। এটাই অতিরিক্ত। সবাই কাজ পায় না। কাজ না থাকায় অনেকে লাইসেন্স বিক্রিও করে দিয়েছেন। এই বাস্তবতায় নতুন লাইসেন্স দেয়ার তেমন প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। তারপরও সরকার নতুন লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। আবার প্রক্রিয়া স্থগিতও করেছে। কেন উদ্যোগ নিল আর কেন তা স্থগিত করল- সেটা অবগত নই।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
রাজধানীর হাজারীবাগে থানা সংলগ্ন টি জে কর্পোরেশনের একটি ডাইং কারখানায় অভিযান চালিয়ে দুটি অবৈধ গ্যাস সংযোগ শনাক্ত করেছে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ। এ সময় প্রতিষ্ঠানটিকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। রোববার (৯ আগস্ট) দুপুরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অভিযান পরিচালনা করেন। তিতাস কর্তৃপক্ষ জানায়, কারখানাটিতে ৩ টন ধারণক্ষমতার একটি বয়লার এবং ৫০০ কেজি ধারণক্ষমতার আরেকটি বয়লার রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে ১৪টি ড্রায়ার মেশিন। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ গ্যাস সংযোগ ব্যবহার করে আসছিল। এতে বছরে প্রায় ৪ কোটি টাকার গ্যাস অবৈধভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। অভিযান চলাকালে প্রায় আড়াই ঘণ্টা তল্লাশি চালিয়ে কারখানাটিতে দুটি অবৈধ গ্যাস সংযোগের লাইন শনাক্ত করা হয়। পরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রতিষ্ঠানটিকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করেন। ধানমন্ডি জোনের তিতাস গ্যাসের ম্যানেজার প্রকৌশলী লুৎফরনেসা লতা বলেন, এর আগেও ২০২০-২১ সালে টি জে কর্পোরেশনে অভিযান চালানো হয়েছিল। সে সময় অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে জরিমানা করা হয়। এরপরও প্রতিষ্ঠানটি অবৈধভাবে গ্যাস ব্যবহার করে আসছিল। এবার প্রায় আড়াই ঘণ্টা অভিযান চালিয়ে দুটি অবৈধ গ্যাস সংযোগ শনাক্ত করা হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটিকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিরুদ্ধে তিতাস গ্যাসের অভিযান ধারাবাহিকভাবে চলবে। হাজারীবাগ থানার ওসি মোশাররফ হোসেন বলেন, তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের অভিযানে পুলিশ সদস্যরা সার্বিক সহযোগিতা করেছেন। অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে।
মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ে একটি মার্কেটে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। তবে ফায়ার সার্ভিসের দ্রুত ও দক্ষ তৎপরতায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসায় একই ভবনে থাকা হাসপাতাল, ব্যাংক ও আশপাশের বহু দোকান বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। রবিবার (৯ আগস্ট) সকাল ৬টা ৫ মিনিটে লৌহজং ফায়ার স্টেশনে খবর আসে, উপজেলার মালির অংক বাজারে একটি তিনতলা ভবনের নিচতলার মার্কেটে আগুন লেগেছে। খবর পেয়ে লৌহজং ফায়ার স্টেশনের দুটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। প্রায় এক ঘণ্টার প্রচেষ্টায় আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। মুন্সীগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক মুহাম্মদ সফিকুল ইসলাম জানান, আগুন লাগার পর ভবনটিতে প্রচুর ধোঁয়া সৃষ্টি হলে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ভবনটির নিচতলায় মার্কেট, দ্বিতীয় তলায় ইসলামি জেনারেল হাসপাতাল এবং যমুনা ব্যাংকের কার্যক্রম ছিল। তিনি জানান, হাসপাতালটিতে ভর্তি থাকা চারজন মহিলা সিজারিয়ান রোগীসহ আবাসিক অংশে থাকা লোকজনকে নিরাপদে নিচে নামিয়ে আনা হয়। ফায়ার সার্ভিসের দ্রুত পদক্ষেপের কারণে আগুন নিচতলার একটি কাপড়ের দোকানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব হয়। এতে একই ভবনে থাকা হাসপাতাল ও ব্যাংকসহ আশপাশের বহু দোকান বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের হাত থেকে রক্ষা পায়। অগ্নিকাণ্ডে আমির হোসেন বস্ত্রালয়ের কাপড় ও আসবাবপত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দোকানটির মালিক আমির হোসেন। ফায়ার সার্ভিস জানায়, প্রাথমিকভাবে আগুন লাগার কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানা যায়নি। তদন্তের পর অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল বক্তব্যের অনুষ্ঠানে উপস্থাপক হিসেবে যাকে দেখা গেছে, তার নাম আবু ওবাইদাহ অরিন। ২৫ বছর বয়সী এই তরুণের বাড়ি বাংলাদেশের সাতক্ষীরায়। তিনি কীভাবে পলাতক হাসিনার সংস্পর্শে এলেন, আর কীভাবেই বা ওই অনুষ্ঠানের উপস্থাপক হলেন, সেটি নিয়ে সাতক্ষীরায় চলছে তুমুল আলোচনা। ৫ আগস্ট নয়াদিল্লি থেকে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল বক্তব্যের আয়োজনটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করে। ভারত সরকার এই বক্তব্যের অনুমতি দেওয়ায় বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। এমন একটি বিতর্কিত আয়োজনে উপস্থাপক হিসেবে হাজির হন সাতক্ষীরার ওই তরুণ। তবে তার বিষয়ে স্থানীয় পুলিশের কাছে কোনো তথ্য নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অরিনের নাম-পরিচয় ছড়িয়ে পড়ার পর শনিবার রাত ১২টার দিকে তাঁর বাড়িসংলগ্ন এলাকায় গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেন এই প্রতিবেদক। সাতক্ষীরা সদর থানার পাশের মুনজিতপুর নিচুতলা এলাকায় তার বাড়ি বলে স্থানীয়রা জানান। বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মূল ফটক বন্ধ। তার বাবা আবু সোয়েব এবেলের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। অরিনের প্রতিবেশী ও স্থানীয় মুদি দোকানি শাহজাহান বলেন, ‘অরিন নামের ছেলেটাকে অনেক দিন ধরে দেখি না। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগে শেষবার তাকে দেখেছি। এরপর আর দেখিনি। শুনেছি, সে ভারতে পড়াশোনা করে। তার বাবা-মা অবশ্য বাড়িতেই থাকেন।’ পাশের আরেক দোকানিকে নয়াদিল্লির অনুষ্ঠানের একটি ছবি দেখানো হলে ছবিতে থাকা তরুণকে তিনি অরিন হিসেবে শনাক্ত করেন। তার ভাষায়, ‘এ তো অরিন! এত বড় নেতা হয়ে গেছে দেখছি। একেবারে মন্ত্রীদের পাশে বসে আছে।’ অরিনের বাবা আবু সোয়েব এবেলের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান জাহান প্রেসে গিয়েও তার বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হয়। সেখানে রাতের নিরাপত্তাকর্মী রমেশ চন্দ্র বলেন, এবেল সাহেব সাতক্ষীরাতেই থাকেন এবং মাঝে মাঝে প্রতিষ্ঠানে আসেন। তবে ওই দিন সন্ধ্যার পর থেকে তাকে আর দেখিনি। স্থানীয় সূত্র ও পারিবারিক পরিচয় অনুযায়ী, আবু ওবাইদাহ অরিন সাতক্ষীরা সদর থানার পাশের মুনজিতপুর নিচুতলা এলাকার বাসিন্দা এবং জাহান প্রেসের মালিক আবু সোয়েব এবেলের বড় ছেলে। লেখাপড়ার জন্য তিনি ভারতে যান। স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে তার সঙ্গে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য মীর মোস্তাক আহমেদ রবির ঘনিষ্ঠতার আলোচনা রয়েছে। একই সঙ্গে সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির এক নেতার সঙ্গেও পারিবারিকভাবে তার আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে। অরিনের বিষয়ে পুলিশ এখনো অন্ধকারে। তার বিষয়ে পুলিশ কিছু জানে কি না, তা জানতে সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার আবু সালেহ মো. আশরাফুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করে কালবেলা। তিনি বলেন, এ বিষয়ে তারা অবগত নন। বিষয়টি জানতে সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি। পরে সাতক্ষীরা সদর থানার ওসি মাসুদুর রহমানের নম্বরে কল দিলে তিনি প্রতিবেদকের কলটি কেটে দেন।