খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) পাকিস্তান থেকে আমদানি করা চাল ফেরত দিলেও সরকারি পর্যায়ে (জিটুজি) চুক্তির মাধ্যমে দেশটি থেকে ৫০ হাজার টন চাল আমদানির প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ। সরকারি খাদ্য মজুত শক্তিশালী করা, অভ্যন্তরীণ চালের বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং ভবিষ্যতের চাহিদা মেটাতে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
জুলাইয়ের শুরুতেই সরকারি কর্মকর্তাদের এ সংক্রান্ত চুক্তি সই করার কথা রয়েছে। তবে অতীতে ইইউ পাকিস্তানি চালের চালান ফেরত পাঠানোয় বাংলাদেশের এই আমদানি পরিকল্পনা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
অবশ্য ইইউ পাকিস্তানের সব চাল আমদানি নিষিদ্ধ করেনি। পাকিস্তান এখনো বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম চাল রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে প্রতি বছর লাখ লাখ টন চাল রপ্তানি করে আসছে। তবে বছরের পর বছর ধরে ইইউর কঠোর খাদ্য নিরাপত্তা ও আমদানি মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হওয়া নির্দিষ্ট কিছু চালান প্রত্যাখ্যান করেছে ইউরোপীয় কর্তৃপক্ষ।
লিসবন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানি চালের চালান প্রত্যাখ্যানের মূল কারণ ছিল ইইউর নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি কীটনাশকের উপস্থিতি। কৃষি রাসায়নিকের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব থেকে ভোক্তাদের রক্ষা করতে ইইউ বিশ্বের অন্যতম কঠোর কীটনাশক নীতি বজায় রাখে। প্রতিটি আমদানি করা খাদ্যপণ্য সেখানে ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মুখোমুখি হয় এবং এই আইনি সীমা অতিক্রম করলে চালান প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না, তা ফেরত পাঠানো হয় কিংবা ধ্বংস করা হয়।
উদ্বেগের আরেকটি বড় বিষয় ছিল আফলাটক্সিন দূষণ। এটি ছত্রাক দ্বারা উৎপাদিত একটি প্রাকৃতিক বিষ, যা শস্য মজুত, পরিবহন বা প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণ না করলে তৈরি হতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত আফলাটক্সিনের দীর্ঘস্থায়ী সংস্পর্শ লিভারের ক্ষতি করতে পারে এবং লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। এই স্বাস্থ্য ঝুঁকির কারণে ইইউ আমদানি করা চাল ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যে আফলাটক্সিনের উপস্থিতি যাতে অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে বেশি না হয়, তা কঠোরভাবে নিশ্চিত করে থাকে।
এ ছাড়া নথিপত্রের সমস্যা, উৎপাদন উৎস শনাক্তকরণে ব্যর্থতা (ট্রেসেবিলিটি ফেইলিউর), অনুপযুক্ত লেবেলিং বা স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলার কারণেও ইউরোপীয় কর্তৃপক্ষ পাকিস্তানের কিছু চালের চালান প্রত্যাখ্যান করেছে।
ইইউ আইন অনুযায়ী, রপ্তানিকারকদের অবশ্যই খাদ্যপণ্যের উৎপত্তিস্থল স্পষ্টভাবে দেখাতে হয়, বিস্তারিত উৎপাদন রেকর্ড রাখতে হয় এবং খাদ্য নিরাপত্তার সনদ দিতে হয়। ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় বড় কোনো দূষণ না মিললেও এই প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তা পূরণে ব্যর্থ হলে আমদানি করা পণ্যের চালান আটকে দেওয়া হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে, জিটুজি ব্যবস্থার মাধ্যমে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের ৫০ হাজার টন চাল আমদানির সিদ্ধান্তটি জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। সরকারি কর্মকর্তারা যুক্তি দিচ্ছেন, জাতীয় খাদ্য মজুত শক্তিশালী করতে, বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কম হলে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে এই চাল আমদানি করা প্রয়োজন। তাছাড়া অন্যান্য চাল রপ্তানিকারক দেশের তুলনায় দাম তুলনামূলকভাবে কম থাকাও পাকিস্তান থেকে চাল আমদানির অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করছেন তারা।
তবে খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন, কোটি কোটি বাংলাদেশির প্রতিদিনের প্রধান খাদ্য আমদানির ক্ষেত্রে দাম একমাত্র বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত নয়। তাদের যুক্তি, বাংলাদেশে প্রবেশ করা প্রতিটি চালান স্থানীয় বাজারে ছাড়ার আগে কীটনাশকের উপস্থিতির সীমা, আফলাটক্সিন, ভারী ধাতু এবং অন্যান্য দূষকের উপস্থিতি রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে ব্যাপক ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাওয়া উচিত। যখনই আমদানি করা খাদ্য এমন কোনো চালান বা সরবরাহ শৃঙ্খল থেকে আসে, যা আগে আন্তর্জাতিক নিরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছে, তখন স্বাধীন গুণমান যাচাইকরণ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
একইভাবে ইইউর পদক্ষেপকে ভুলভাবে না বোঝাও গুরুত্বপূর্ণ। নির্দিষ্ট কিছু চালান প্রত্যাখ্যানের মানে এই নয় যে, পাকিস্তানি চালের প্রতিটি চালানই অনিরাপদ। খাদ্য নিরাপত্তা পরিদর্শন চালানো হয় প্রতিটি চালান ধরে ধরে এবং চাষের পদ্ধতি, কীটনাশকের ব্যবহার, মজুতের অবস্থা ও গুণমান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে এই মানদণ্ড বজায় রাখার বিষয়টি ভিন্ন হতে পারে। যে চাল বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা বিধিমালা পূরণ করবে এবং স্বাধীন ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে, তা আইনি ও নিরাপদভাবে দেশে প্রবেশ করতে পারে।
এমন প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের চাল আমদানির লক্ষ্য পরিকল্পিত জিটুজি চুক্তিটি বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের ওপর এক বিশাল দায়িত্ব অর্পণ করছে। এ ক্ষেত্রে ভোক্তাদের প্রত্যাশা- খাদ্য সংগ্রহ ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলো কঠোর পরিদর্শন পদ্ধতি প্রয়োগ করবে, উপযুক্ত ক্ষেত্রে ল্যাবরেটরির ফলাফল প্রকাশ করবে এবং সম্পূর্ণ আমদানি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে। এই ধরনের পদক্ষেপ শুধু জনস্বাস্থ্যকেই সুরক্ষা দেবে না, বরং সরকারের ক্রয় সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের ওপর জনগণের আস্থা বাড়াবে।
জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশ যখন চুক্তি স্বাক্ষরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন মূল বিষয়টি চাল পাকিস্তান থেকে আসছে কি না তা নয়, বরং প্রতিটি আমদানি করা চালানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা মানদণ্ড সম্পূর্ণভাবে মানা হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করা।
যদি ব্যাপক পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, আমদানি করা চালের চালানের কীটনাশকের উপস্থিতি নির্ধারিত সীমার মধ্যে রয়েছে এবং তা আফলাটক্সিন এবং অন্যান্য ক্ষতিকারক দূষণ থেকে মুক্ত, তবে ভোক্তারা এর নিরাপত্তার বিষয়ে আরও বেশি আশ্বস্ত হতে পারবেন। তবে পর্যাপ্ত পরীক্ষা করা না হলে এই আমদানির অর্থনৈতিক সুবিধা থাকা সত্ত্বেও খাদ্যের গুণমান এবং জনস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ থেকে যেতে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে রাজধানীর সংসদ ভবন ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় সব ধরনের অস্ত্রশস্ত্র ও বিস্ফোরক বহন এবং সভা-সমাবেশ, মিছিল, শোভাযাত্রা ও বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ স্বাক্ষরিত এক গণবিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আগামী ২৭ আগস্ট ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শুরু হবে। অধিবেশন নির্বিঘ্নে চলা নিশ্চিত করতে শেরেবাংলা নগরস্থ জাতীয় সংসদ ভবন ও পার্শ্ববর্তী এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় এ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা অনুযায়ী, ২৬ আগস্ট (বুধবার) রাত ১২টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ওই এলাকায় সব ধরনের অস্ত্রশস্ত্র, বিস্ফোরক দ্রব্য, অন্যান্য ক্ষতিকারক ও দূষণীয় দ্রব্য বহন এবং যে–কোনো ধরনের সমাবেশ, মিছিল, শোভাযাত্রা ও বিক্ষোভ প্রদর্শন নিষিদ্ধ থাকবে। নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত এলাকার মধ্যে রয়েছে-ময়মনসিংহ রোডের মহাখালী ক্রসিং থেকে পুরাতন বিমানবন্দর হয়ে বাংলামটর ক্রসিং পর্যন্ত এলাকা, বাংলামটর লিংক রোডের পশ্চিম প্রান্ত থেকে হোটেল সোনারগাঁও রোডের সার্ক ফোয়ারা পর্যন্ত, পান্থপথের পূর্ব প্রান্ত থেকে গ্রিন রোডের সংযোগস্থল হয়ে ফার্মগেট পর্যন্ত এবং মিরপুর রোডের শ্যামলী মোড় থেকে ধানমন্ডি-১৬ (পুরাতন ২৭) নম্বর সড়কের সংযোগস্থল পর্যন্ত এলাকা। এছাড়া, রোকেয়া সরণির সংযোগস্থল থেকে পুরাতন ৯ম ডিভিশন (উড়োজাহাজ) ক্রসিং হয়ে বিজয় সরণি, পর্যটন ক্রসিং, ইন্দিরা রোডের পূর্ব প্রান্ত থেকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের পশ্চিম প্রান্ত, জাতীয় সংসদ ভবনের সংরক্ষিত এলাকা এবং এসব সীমানার মধ্যে থাকা সব রাস্তা ও গলিপথও নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকবে। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ আদেশ বলবৎ থাকবে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত জোরিস ভ্যান বোমেল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সকালে রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি (পলিটিক্যাল অ্যাফেয়ার্স) জাওয়াদ আজাউই এবং সিনিয়র পলিটিক্যাল অ্যাডভাইজার লুবাইন চৌধুরী মাসুম উপস্থিত ছিলেন। সাক্ষাতে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে ডা. শফিকুর রহমান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নেদারল্যান্ডসের সহযোগিতার প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানবিক সহায়তায় দেশটির বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। অন্যদিকে নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের সংসদে বিরোধী দলের গঠনমূলক ভূমিকার প্রশংসা করেন। বাংলাদেশের উন্নয়ন ও বিনিয়োগের পরিবেশ আরও শক্তিশালী করতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে নিয়মিত সংলাপের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। বৈঠকে বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডসের বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও জোরদার হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়। সাক্ষাৎ শেষে ডা. শফিকুর রহমান রাষ্ট্রদূতকে তার সরকারি বাসভবনে জুলাই আন্দোলন ঘিরে তৈরি বিভিন্ন গ্রাফিতি ঘুরে দেখান। এ সময় বিরোধীদলীয় নেতার পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম আরমান এবং পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির সদস্য আলী আহমাদ মাবরুর উপস্থিত ছিলেন।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের ঢল নামে। দেখতে দেখতে সেই সংকট পেরিয়েছে নয় বছর। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট ২০২৬) শুরু হলো সংকটের দশম বছর। দীর্ঘ এই সময়ে বাংলাদেশে একাধিক সরকার পরিবর্তন হলেও রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরানোর কার্যকর ও টেকসই ব্যবস্থা এখনো সম্ভব হয়নি। প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয়, খাদ্য, চিকিৎসা ও মানবিক সহায়তা দিয়ে আসছে। কিন্তু প্রত্যাবাসনের বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় সংকট ক্রমেই দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিচ্ছে। বর্তমান সরকারও বলছে, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনই সংকটের স্থায়ী সমাধান। একই সঙ্গে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, যে সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে, তার সমাধানের দায়িত্বও মূলত মিয়ানমারের। যাচাই প্রক্রিয়ায় ধীরগতি: রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে পরিচয় যাচাই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ এরই মধ্যে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার তথ্য মিয়ানমারের কাছে দিয়েছে। চলতি আগস্টে মিয়ানমার জানিয়েছে, বাংলাদেশের দেওয়া ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকা থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করার দাবি করেছে দেশটি। অন্যদিকে ৪ হাজার ২৪১ জনকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত’ এবং ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে মিয়ানমার। তবে মিয়ানমারের বিভিন্ন বক্তব্য ও পরিসংখ্যান নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে বাংলাদেশ। ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জাতিসংঘের ব্যবস্থাপনায় নিবন্ধিত তথ্যই রোহিঙ্গাদের প্রকৃত সংখ্যা ও পরিচয়ের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ভিত্তি। বাংলাদেশ আরও বলেছে, যাচাই প্রক্রিয়ায় শিবিরে জন্ম নেওয়া শিশু এবং ২০১৭ সালের পর বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা নতুন রোহিঙ্গাদের তথ্যও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। বারবার পিছিয়েছে প্রত্যাবাসন: রোহিঙ্গাদের ফেরাতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে প্রত্যাবাসন শুরু করা যায়নি। ২০১৯ সালে দুই দফায় প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে যেতে রাজি হয়নি। নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, অধিকার ও ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে তারা প্রত্যাবাসনে আস্থা রাখতে পারেনি। এরপর কোভিড-১৯ মহামারি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ২০২১ সালে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে। ফলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াও কার্যত থমকে যায়। চীনের মধ্যস্থতায় ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগসহ বিভিন্ন প্রচেষ্টায় রোহিঙ্গাদের ফেরানোর আলোচনা হলেও সেগুলোও কার্যকর ফল দেয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সংঘাত তীব্র হওয়ায় রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের ওপর বাড়ছে চাপ: দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার ফলে বাংলাদেশের ওপর অর্থনৈতিক, সামাজিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাগত চাপ বাড়ছে। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ এলাকায় ৩৩টি শরণার্থী শিবিরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বসবাস করছে। বাংলাদেশের কর্মকর্তারা বলছেন, মানবিক সহায়তা দিয়ে পরিস্থিতি সাময়িকভাবে সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও এটি স্থায়ী সমাধান নয়। দীর্ঘমেয়াদি সংকট শরণার্থী জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও চাপ বাড়াচ্ছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ সম্প্রতি বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকটকে কোনোভাবেই ১০ বছর থেকে ২০ বছরে পরিণত হতে দেওয়া উচিত নয়। বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয়—উভয় পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের চেষ্টা চালিয়ে যাবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ মানবিক সহায়তা দিতে পারে এবং আশ্রয় দিতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশ যে সংকট সৃষ্টি করেনি, তার স্থায়ী সমাধান একা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়। সংকটের সমাধানে আন্তর্জাতিক ভূমিকা জরুরি: পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম মনে করেন, রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্কের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এর প্রভাব বঙ্গোপসাগর, আসিয়ান ও বৃহত্তর ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলেও পড়ছে। তার মতে, বাস্তুচ্যুতির পেছনে থাকা রাজনৈতিক, আইনি ও নিরাপত্তাগত সমস্যার সমাধান ছাড়া শুধু মানবিক সহায়তা দিয়ে সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রত্যাবাসনের জন্য বিশ্বাসযোগ্য কাঠামো এবং দ্রুত ও কার্যকর তথ্য যাচাই প্রক্রিয়া প্রয়োজন। সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন প্রত্যাবাসন: ২০১৭ সালের আগস্টে কয়েক মাসের মধ্যে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এর আগে থেকেই কক্সবাজারের বিভিন্ন শিবিরে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছিল। ফলে বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সংখ্যা আরও বেড়েছে। এক দশকের দ্বারপ্রান্তে এসে তাই প্রশ্ন উঠছে—আর কতদিন রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দিতে হবে? বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট—নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনই সংকটের একমাত্র স্থায়ী সমাধান। তবে সেই প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের সদিচ্ছা, নিরাপদ পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর চাপ—তিনটিই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। বছর পেরোচ্ছে, কিন্তু রোহিঙ্গারা ফিরতে পারছে না। ফলে সংকটের দশম বছরে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে—এই দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকটকে আর কতদিন টেনে নেওয়া হবে।